Home গল্প চাপ চাপ রক্ত

চাপ চাপ রক্ত

আহমদ মতিউর রহমান

ছিমছাম সুন্দর শহর আকিয়াব। মিয়ানমারের একেবারে পশ্চিম প্রান্তের আরাকান প্রদেশের রাজধানী। বঙ্গোপসাগর কাছে বলে সমুদ্র তীরবর্তী শহরের সব বৈশিষ্ট্য রয়েছে এ শহরে। সমুদ্র থেকে বয়ে আসা কয়েকটি নদী এঁকে বেঁকে চলে গেছে আরাকান রাজ্যের ওপর দিয়ে। ফলে পুরো এলাকাটি মনে হবে একটি দ্বীপ। আকিয়াব এই রাজ্যের রাজধানী। শত শত বছর ধরে এ নাম চলে আসছে। তবে সামরিক জান্তা এর নাম দিয়েছে সিত্তুই। শুধু তাই নয়, আরাকানের নামও বদলে করেছে রাখাইন। রোহিঙ্গা মুসলমানরা অবশ্য এ পরিবর্তন মেনে নেয়নি। আকিয়াবের কেন্দ্রস্থলে প্রশস্ত রাস্তার এক পাশে দেয়াল ঘেরা গাছগাছালিপূর্ণ বাড়িঘর। আবার পাশে উঁচু উঁচু কয়েকটি ভবন। তবে বাংলো টাইপ বাড়িই বেশি। দোতলা, এমনকি তিনতলা। ছাউনি প্রায়ই টালির, টিনেরও আছে।  কিন্তু সিমেন্টের পাকা ছাদ বলতে কম। এখন কিছু কিছু হচ্ছে বটে তবে অনেকে ঐতিহ্য ধরে রাখতেই উদগ্রীব।
বড় রাস্তার পশ্চিম পাশে দেয়ালের পাশ দিয়ে ফুটপাথ। বড় বড় গাছ আছে, আছে অনেক নারিকেল গাছ। নারিকেল গাছের সংখ্যাই বেশি। গাছের ছায়ায় ছায়ায় গ্রীষ্মের দুপুরে এই ফুটপাথ ধরে আনমনে হেঁটে চলেছে কু শি। বয়স বারো-তেরো হবে। ডাক নাম কু শি। তবে আসল নাম শমশের আলী।
ক’দিন ধরে মনটা ভাল নেই কু শির। বলতে গেলে দম বন্ধ হওয়া পরিবেশ। মাস তিনেক আগে আকিয়াব মংডুসহ বিভিন্ন এলাকায় রোহিঙ্গা মুসলমানদের সঙ্গে কী নিয়ে যেন বিরোধ বেধেছে রাখাইনদের। আর তার ফল হয়েছে উল্টো। ওরা, মুসলিম পরিবারগুলো আর স্বাভাবিক থাকতে পারছে না।
বৌদ্ধ রাখাইনরা ওদের দিকে আড়চোখে তাকায়, সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখে। মাঝে মাঝে ঘটে যায় দুঃখজনক ঘটনা। চুপ করে থাকতে না পেরে কোন রোহিঙ্গা প্রতিবাদ করলেই নেমে আসে খড়গ। মংডুতে কু শির মতো, তার ছোটভাই উ শি আর বোন মিন নি-র মতো কতো শিশুকে হত্যা করেছে হানাদার রাখাইন আর সরকারি সেনারা তার হিসাব নেই। জ্বালিয়ে দিয়েছে ওদের বাড়িঘর। আকিয়াবের মুসলিম পাড়াতেও যে হামলা হয়নি তা নয়। মারাও গেছে অনেক রোহিঙ্গা। এর পর থমথমে হয়ে গেছে মুসলিম পাড়া মহল্লাগুলো। তখন থেকেই ওদের চলাচল নিয়ন্ত্রিত। স্কুল বা জরুরি কোন কাজ না থাকলে বাড়ির বাইরে যাওয়াই বারণ।
শমশেরের দাদা তেজারত আলী শমশেরকে আদর করে ডাকেন শের আলী। বলেন, তুমি দাদু ভাই আলীর মতো বীর হবেÑ হার্মাদগুলোর সঙ্গে লড়াই করবে।
দাদার জন্য জরুরি ওষুধ কিনতে বের হয়েছে শমশের ওরফে কু শি। মিয়ানমারের রোহিঙ্গারা খাঁটি মুসলিম। ধর্মের প্রতি তাদের টান প্রাণাধিক। বর্মী জান্তা ওদের মুসলমান নাম রাখতে বারণ করে। তাই রাখাইনদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার জন্য বর্মী নাম একটা রাখতে হয় তাদের। যেমন তার নাম কু শি। আদতে কু শি নামে খুশি নয় শমশের। বরং তার কাছে শমশের বা শের আলীই ভালো লাগে। রাখাইন পাড়া প্রতিবেশীদের কাছে সে কু শি। কিন্তু বাড়িতে শের আলী। মনে মনে তারও ইচ্ছে বড় হয়ে সে বীর হবে আলীর মতো। দাদা যেমনটা ভাবেন।

দুই.
ভিউ পয়েন্ট বিচ রোড পার হয়ে ডান দিকে মোড় নিতেই আর একটা বড় রাস্তা। ওটা পার হলেই রিভার ভ্যালি পয়েন্ট। এলাকাটা বাজারের মতো, আছে অনেক বড় বড় দোকানপাট, রেস্তোরাঁ, লন্ড্রি, টেলিফোনের বুথ, পোস্ট অফিস।
বিচ রোডের ফুটপাথ ঘেঁষে হাঁটার সময় কু শির পাশ ঘেঁষে শাঁ করে একটা কার চলে গেল। সামনে ময়লা আবর্জনার স্তূপ দেখে ফুটপাথ ছেড়ে রাস্তায় নেমে পড়েছিল কু শি। আর একটু হলে গাড়িটা ওকে চাপা দিত। আল্লাহর নাম স্মরণ করে বুকে ফুঁ দেয় কু শি। যাক বাবা এ যাত্রা বেঁচে গেছি, সাবধান হতে হবে। মনে মনে বলে সে।
রিভার ভ্যালি রেস্তোরাঁর সামনে আসতেই কু শির চোখ আটকে যায় একজনকে দেখে। ওটা কে বিয়ন কাকা না? এত লোক সঙ্গে, কী করছে ওখানে?
বিয়ন কাকা ডাকে সবাই। তার পুরো নাম বিয়ন থিন মিং। দীর্ঘদেহী রাখাইন, গোলমতো মুখ। কোথায় যেন ভাল চাকরি করেন আর করেন রাজনীতি। সারাক্ষণ লোকজন নিয়ে চলাফেরা তার।
ছোটদের বেশ আদর যতœ করেন। কখনো কখনো গানের অনুষ্ঠানে বা সভা সমিতিতে নিয়ে যান। কু শি শুধু তাকে দেখেনি। তিনিও কু শিকে দেখতে পেয়ে ডেকে বসলেন, কু শি, তুই কু শি না? এই ভরদুপুরে যাচ্ছিস কোথায়?
বিয়ন কাকা, আমি কু শি। একটু এদিকেই যাবো। ওষুধের দোকানে যাবে, ইচ্ছে করেই গোপন করলো সে।
দেরি করিস নে, পা চালিয়ে বাড়ি যা।
কু শির বাবার সঙ্গে ভাল খাতির তার। এ জন্য বোধ হয় ¯েœহের দৃষ্টি। কু শি জি আচ্ছা বলে তার সামনে থেকে কেটে পড়লো। কাছে পেলে খুঁটে খুঁটে সব জিজ্ঞাসা করবে। কে বাবা অত কথা বলতে যায়!
অক্টোবরের প্রথম। রোদে এখনো তেজ বেশ। রাস্তার পিচের ওপর পা ফেলা যায় না। স্যান্ডেল আঁকড়ে ধরে।
দোকানটা খোলা পাওয়া গেল। এই দুপুর সময়টাতে ওদের মহল্লার ওষুধের দোকানগুলো বন্ধ থাকে। আর সব দোকানে দাদুর ওষুধ পাওয়াও যায় না। দাদুর ওষুধ কেনা হয়নি দু’দিনÑ আজ না হলেই নয়। দাদুর অসুখ বেড়ে যাবে। কু শির আব্বার আসার অপেক্ষা না করে কু শির মা ওকেই পাঠিয়ে দিয়েছেন বড় রাস্তায় ওষুধ আনতে।
ওর আব্বা এখন ভারি ব্যস্ত। দোকান সামলে আর রাখাইন হার্মাদদের সঙ্গে লড়াই সংগ্রাম করে পেরে ওঠেন না। তাছাড়া আব্বার মুখটা ইদানীং বেশ ভার ভার থাকে।
কু শি বুঝতে পারে কোন একটা গোলমাল হয়েছে। আব্বা তো এরকম গোমড়া মুখে থাকেন না। মা বোধ হয় অতটা টের পান না। সংসারের সব কাজ একা সারতে হয়, মায়ের অন্য দিকে খেয়াল দেয়ার সময় কোথায়?
কু শির বাবার বিষয়ে গজর গজর করতে করতে দুপুর নাগাদ আপন মনে বলছিলেন, আমার হয়েছে যত জ্বালা। আব্বার ওষুধ পথ্য ফুরিয়ে গেছে, আনবার নাম নেই। অসুখ বেড়ে গেলে দেখবে কে?
: কী বলছো মা, দাদুর ওষুধ লাগবে? টাকা দাও আমি এনে দিচ্ছি। মায়ের মুখ থেকে কথা কেড়ে নিয়ে বলে কু শি। সে জানে মনের তেজ না কমলেও দাদু তেজারত আলীর শরীরের তেজ অনেকটা কমে এসেছে। হবে না, প্রায় ৭০ বছর বয়স। কত না লড়াই সংগ্রাম করে বর্মা মুল্লুকে দ্বীন ধর্ম নিয়ে এখনো টিকে আছেন। নিজের দু’খানা দোকান ছিল আর ছিল মাছের ব্যবসা। এ তল্লাটে মুসলিম পরিবারগুলোর এ ছাড়া আর ভরসা কী। ছেলেমেয়েরা ভাল স্কুলে লেখাপড়ার সুযোগ পায় না, চাকরি পাবে কোথায়?
সামান্য লেখাপড়া শিখিয়ে দু ছেলে রিয়াসত আলী ও নেজারত আলীকে ব্যবসার লাইন ঘাট শিখিয়ে দিয়েছেন। বলতে গেলে ওরাও নিজের পায়ে দাঁড়াবার পথে।
বড় ছেলে রিয়াসত সংসারী হলেও ছোটটা নেজারত এখনো সংসারী হতে পারলো না। ওর বয়স হয়ে যাচ্ছে। নেজারত কু শির চাচা।
তো মায়ের কাছ থেকে ওষুধের টাকা ছো মেরে নিয়ে ভোঁ দৌড় দিয়ে বড় রাস্তায় উঠেছে কু শি।
ওষুধের দোকান থেকে বের হয়ে ওর শখ হলো একটা আইসক্রিম খাবে। কিন্তু বড় রাস্তার ওপর নিরাপত্তা বাহিনীর তিন চারটে গাড়ি দেখে ওর বুকটা ছাঁৎ করে উঠলো। গাড়িগুলোর সামনে ডানে করে বন্দুক নয় যেন কামানের নল তাক করা। মুহূর্তেই গুলি ছুড়ে চারদিক তছনছ করে দেবে যেন এখনি।
না, হাবভাব ভাল ঠেকছে না। এখুনি বাড়ির পথ ধরতে হবে। মনে মনে ভাবলো কু শি।
আইসক্রিম খাওয়ার চিন্তা মাথা থেকে উধাও হয়ে গেছে। এখন পড়ি মরি দৌড়ানোর অবস্থা।
ফিরতি পথে রিভার ভ্যালি রেস্তোরাঁর দিকে দৃষ্টি দেয় সামান্য। না বিয়ন কাকা ও তার দলবল নেই সেখানে। আশ্চর্য! এই কয়েক মিনিটের মধ্যে কোথায় গেল সব? অবাক হয়ে ভাবে কু শি।

তিন.
বেলা প্রায় ২টা। ঝাঁ ঝাঁ রোদ চারদিকে। আকিয়াবের মুসলিম অধ্যুষিত রোহিঙ্গা পাড়াটি সকাল থেকেই শান্ত সুনসান। ছাড়া ছাড়া কিছু টিনের ও সেমি পাকা বাড়িঘর। টালি ও ছনের ঘরও আছে। ফাঁকে ফাঁকে কিছু গাছগাছালি। নারকেল গাছই চোখে পড়ে বেশি।
কাজ ছাড়া এ তল্লাটের কেউ আর তেমন বাড়ি থেকে বের হয় না। তাই ভুতুড়ে না হলেও থমথমে পরিবেশ। মাঝে মাঝে মিলিটারি আর পুলিশ-নিরাপত্তা বাহিনীর গাড়ি, সাঁজোয়া যান আসা-যাওয়া করে। যাকে খুশি ধরে নিয়ে যায়। কোন ওয়ারেন্ট লাগে না।
মুসলিম রোহিঙ্গারা যেন জন্মগত অপরাধী। পুলিশ ও আর্মির সঙ্গে কোন তর্ক করা, প্রশ্ন করাই অপরাধ যেন।
এ কারণে এ তল্লাটের সবার মন বিষিয়ে আছে। আল্লাহকে ডাকা ছাড়া, আল্লাহর কাছে বিচার দেওয়া ছাড়া উপায় কী? দুপুর থেকে কামানের নল তাক করা দু’টি আর্মির গাড়ি দাঁড়িয়ে ছিল তিন রাস্তার মোড়ে। একটু আগে চলেও গেছে।
না ঠিক চলে যায়নিÑ কোথাও টহল দিতে গেছে। টহল দিয়ে আবার ঠিক ফিরে আসবে।
এমন সময় হন্তদন্ত হয়ে ঘরে ঢোকেন শের আলী মানে কু শির বাবা রিয়াসত আলী, কু শি কোথায়, উ শি কোথায়? মিন নি?
: কেন কী হলো আবার। কু শির মা জান্নাত বেগমের প্রশ্ন। ছেলেকে বাইরে পাঠিয়েছেÑ এ কথা বলতে চায় না। বললে মাথা গরম করবেন বেচারা।
: আছে আছে কাছাকাছিই আছে। তুমি কাপড় জামা ছাড়। একটু ঠাণ্ডা শরবত দেই? স্বামীকে প্রশ্ন করেন জান্নাত বেগম।
আর কিছু না বলে গজর গজর করতে করতে ঘরে ঢোকেন রিয়াসত, বুঝলে, পরিস্থিতি বিশেষ ভাল না। ওদের হাবভাব চলাফেরা ভাল ঠেকছে না। ওদের বলতে রাখাইন হার্মাদগুলোকে বোঝান তিনি।
: কেন কী হয়েছে। জান্নাত জানতে চান?
: কী হয়নি আবার। বাবাকে বিকেলে বাইরে যেতে বারণ করে দিও। কু শি-উ শিও যেন না যায়।
: কী হয়েছে বলবে তো?
: ওরা আবার মিথ্যা খবর ছড়িয়ে রোহিঙ্গাদের বাড়িঘরে হামলা করতে চায়।
: কী করেছে রোহিঙ্গারা?
: এক রাখাইন একটি স্বর্ণের দোকানে এসে গায়ে পড়ে ঝগড়া বাঁধিয়েছে। রটিয়ে বেড়াচ্ছে মুসলিম দোকানি ও তার লোকেরা নাকি তাকে মেরেছে। এটা একেবারে মিথ্যা কথা। ওরা আসলে একটা অজুহাত চায়। মংডুর মতো আকিয়াবেও সব জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছাড়খার করে দিতে চায়।
: ও তাই! এতক্ষণে শান্ত হন জান্নাত বেগম। তার মুখ আপনা থেকেই গম্ভীর হয়ে ওঠে।
দরজার চৌকাঠ ধরে দাঁড়িয়ে এতক্ষণ পুত্রের কথা শুনছিলেন তেজারত আলী। তার মুখটাও থমথমে হয়ে যায়। বুড়ো হয়েছেন, নানা অসুখে ধরেছে। শরীরে আর আগের মতো তাকদ নেই। যখন তাকদ ছিল একাই লড়েছেন হার্মাদগুলোর সঙ্গে। বহু সংগ্রাম করে তাকে এ পর্যন্ত আসতে হয়েছে। এখন ডায়াবেটিস ধরেছে। ওষুধ খেয়ে শরীর ঠিক রাখতে হয়। আর সকাল বিকাল হাঁটাহাঁটি। তার চোখের সামনে তার বুড়ো বাবা আর চাচাকে কুপিয়ে কুপিয়ে মেরেছে রাখাইনরা। এ কথা এখন আর মনে করতেও চান না। মনটা সত্যি ভারি হয়ে গেল তেজারত আলীর। কী জানি আল্লাহ কী রেখেছেন কপালে। বর্মীরা রোহিঙ্গাদের নাগরিক দূরে থাক মানুষ বলেই মানতে চায় না। শুধু দুই ছেলে আর নাতি নাতনীর জন্যই নয়Ñ তল্লাটের সবগুলো রোহিঙ্গা পরিবারের নিরাপত্তার কথা ভেবে উৎকণ্ঠিত হয়ে পড়েন তেজারত। আর ফাঁকে ফাঁকে অসহায় বাবা ও চাচার মুখ ভেসে ওঠে মানসপটে। উ কী ভয়ঙ্কর ছিল সে দিনগুলো!

চার.
উত্তরের জানালাটা দিয়ে একটা পাখি ফুরুত ফুরুত ঘরে ঢুকে বের হয়ে যাচ্ছে। একবার বারান্দার গ্রিলে বসছে আবার ঘরে ঢুকছে, আবার বের হচ্ছে। পাখি মানে চড়–ইÑ ঘরের কোণে বাসা বাঁধা যাদের অভ্যাস। পাখিটার আসা যাওয়া চোখে পড়লো আমিনার। শুধু চড়–ই নয়, মাঝে মাঝে টুনটুনিও আসে। নয়-দশ বছর বয়সের মেয়ে আমিনা, আমিনা জান্নাত আরা। কু শি আর উ শির আদরের একটি মাত্র বোন। মা জান্নাত বেগম তার নামের সাথে মিলিয়ে মেয়েটার নাম রেখেছেন আমিনা জান্নাত আরা। আবার বার্মিজ নামও একটা আছেÑ মিন নি। বাড়িতে সবাই আমিনাই ডাকে। মিন নি পাড়া-প্রতিবেশীদের সাথে চলাফেরার জন্য। এটাই এখানে নিয়ম। রোহিঙ্গারা বার্মিজ ভাষা যেমন শেখে তেমন শেখে আরবি ও বাংলা। বাংলাদেশের চট্টগ্রাম অঞ্চলের ভাষার সাথে রোহিঙ্গাদের ভাষার মিল, ধর্মের মিল, নামের দিক থেকে মিল। আর হবেই না বা কেন? এক সময় তো আরাকান রাজ্যেরই অন্তর্ভুক্ত ছিল আশপাশের এসব এলাকা।
আরাকান রাজা বাদশাহরা বাংলা চর্চা করে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে কত না সমৃদ্ধ করে গেছেন, বলতে গেলে এই মাত্র একশো দেড়শো বছর আগের ঘটনা।
ব্রিটিশরা ভারতীয় উপমহাদেশ ছাড়ার আগে অদ্ভুত এক পদ্ধতি অনুসরণ করে তাদের বিভক্ত করে দিয়ে গেছে। তা না হলে আরাকান, টেকনাফ, কক্সবাজার চাটগাঁ তো একই রাজ্যভুক্ত থাকতো। ওদের বার্মাবাসী হয়ে এতো দুর্ভোগ পোহাতে হতো না, প্রাণের ভয়ে ছুটতে হতো না বাংলাদেশ, থাইল্যান্ড বা মালয়েশিয়ায়।
আমিনা এসব শুনেছে দাদুর কাছে। মায়ের কাছে। এগুলো জানতে পেরে মনটা তার ভারি হয়ে যায়। পাখিটার ফুরুত ফুরুত দেখতে দেখতে মায়ের ডাক শোনে আমিনা।
: আমিনা কোথায় গেলি, আম্মি আমার।
: আম্মু আসছি, এই তো আমি বারান্দায়। মায়ের ডাক শুনে ছুটে আসে আমিনা।
: উ-শি কোথায় দেখতো, দেখতে পেলে ঘরে ডেকে আন। আর এসে বাসন কোসনগুলো ধুয়ে ফেল মা। খাবার সময় হয়ে এলো।
সকালের এঁটো বাসন কোসন ধোয়া হয়নি আজ। কাপড় কেচে ঘর দোর সামলে আর একা পেরে ওঠেননি জান্নাত বেগম। আজ কেন যেন হাতে কাজ উঠছে না।
: ঠিক আছে, আম্মু দেখছি। বলে বাইরে বের হয় আমিনা। চড়–ইপাখিটাকে টাটা দিয়ে ভাই উ শিকে খুঁজতে বের হয় আমিনা। এ অঞ্চলের কয়েকটি পল্লী মূলত রোহিঙ্গা অধ্যুষিত। নাজির পাড়া, আমলা পাড়া, কসাই পাড়া। আকিয়াব শহরের এক প্রান্তে এসব মহল্লা। ঠিক গ্রাম নয় আধা শহর আধা গ্রাম। প্রায় দেড় লাখ রোহিঙ্গা প্রতিবেশী রাখাইনদের সঙ্গে মিলে মিশে বাস করছে। অনেকটা ছাড় দিয়েই ব্যবসা বাণিজ্য করে আর ক্ষেতখামার চালায় রোহিঙ্গারা। আমলা পাড়ার পর কিছুটা পাকা কিছুটা কাঁচা রাস্তাÑ তার পর কসাই পাড়া। এখানে সবাই কিন্তু কসাই নয় আছে ব্যবসায়ী, লঞ্চ জাহাজের সারেং, খালাসি, জেলে, কৃষক। তবু নাম হয়ে গেছে কসাই পাড়া। তেমনিভাবে আমলা পাড়াতেও সব আমলা বা অফিসার নয়Ñ সাধারণ মানুষও অনেক। খুঁজতে খুঁজতে কসাই পাড়ায় একটি গাছের নিচে পাওয়া গেল উ শি অর্থাৎ নওশেরকে। আট বছরের উ শি সমবয়স্কদের সঙ্গে খেলা করছে। এখানে মুসলিম, বৌদ্ধ ও মুরং লেখা নেইÑ সব পরিবারের সন্তানেরা এক সাথে খেলে। শিশুদের মধ্যে রোহিঙ্গা-রাখাইন কোন ভেদাভেদ নেই।
ডান হাতে খপ করে উ শির একটি হাত ধরে ফেলে আমিনা। বাড়ি চল, আম্মু ডাকছে।
: না, না আর একটু। আমাদের খেলা শেষ হয়নি।
: না আজ আর খেলতে হবে না। আব্বা বাড়ি ফিরেছেন, তোকে ডাকছেন।
উ শির বন্ধুরাও এ ঘটনায় থমকে যায়। এ ওর দিকে চায়। ভাবখানা এইÑ দিল ওদের আনন্দ মাটি করে।
আব্বুর কথা শুনে উ শিও আর গাঁইগুঁই না করে বাড়ির পথে হাঁটা দেয়।
ছিটু, মনা, থিয়েন শি, মো টং নামের উ শির বন্ধুরা খেলা থামিয়ে থমকে দাঁড়িয়ে থাকে।

পাঁচ.
কু শি সেই কখন ওষুধ আনতে মেইন রোডে গেছে এখনো ফেরার নাম নেই। চিন্তায় পড়েন জান্নাত বেগম। হলো কী ছেলেটার! উ শি মিন নি ঘরেই আছে, ওকে নিয়ে যত জ্বালা। স্বামী রিয়াসত ইঙ্গিত দিচ্ছিলেন কোন গোলমালের, সেই আশঙ্কায় বুকটা ধক করে ওঠে তার।
: বৌমা কু শি ফেরেনি এখনো? বুড়ো শ্বশুরও চিন্তিত। বোঝা যায় তার কথায়।
: না আব্বা। এখনো তো ওর ফেরার নাম নেই, কী যে করি এখন।
: না না, এসে পড়বেক্ষণ চিন্তার কী আছে। বৌমাকে সান্ত্বনা দেন তেজারত। তবে তার কথায় তেজ নেইÑ ভেতরে ভেতরে তিনি নিজেও শঙ্কিতÑ এটা বোঝা যায়।
এমন সময় হন্তদন্ত হয়ে ঝড়ের বেগে বাসা থেকে বের হয়ে গেলেন রিয়াসত। ছেলের খোঁজ আর করলেন না, এই যা রক্ষা জান্নাত বেগমের। যাওয়ার সময় আব্বাকে উদ্দেশ করে বলে গেলেন, বড় মসজিদে ওরা হামলা করেছে আব্বা। আগুন দিয়েছে … কোন কিছু বলার সুযোগ পেলেন না তেজারত- কুশির আম্মাও না। বড় মসজিদ মানে আকিয়াবের সেন্ট্রাল মস্ক। কেন্দ্রীয় মসজিদ। প্রাচীন প্রায় ৮০০ বছরের পুরনো একটি স্থাপনা। রোহিঙ্গা মুসলমানদের একটি দর্শনীয় ও গৌরবের স্থান। সুউচ্চ এর মিনার, আর সামনের ভেতরের কারুকাজ দেখার মতো। এটি জাতিসংঘ ঘোষিত বার্মার একটি ঐতিহাসিক স্থান- হেরিটেজ সাইট। এই মসজিদে একবার নামাজ পড়লে প্রাণ ভরে যায়।
এর ভেতরে কুরআনের তালিম হেফজ হতে থাকে সারা বছরই। ছোট নাতিকে কুরআনে হাফেজ বানানোর খুব শখ তেজারতের। সে ভাগ্য হয় কিনা কে জানে? তার মধ্যে এই অবস্থা! এবার সত্যি সত্যি ভাবনায় পড়েন তেজারত আলী।
মেইন রোডের পাশে উ ওতাসা পার্কের কাছে অবস্থিত কেন্দ্রীয় মসজিদটি রোহিঙ্গাদের গর্বের বস্তু। তাহলে কি এভাবে এটা ধ্বংস হয়ে যাবে! আর ভাবতে পারেন না তিনি। দম বন্ধ হয়ে আসে।

ছয়.
৭ অক্টোবর ২০১২। রোববার। দুপুর ২টা। সোয়া ১টায় জোহরের জামায়াত শেষে মুসল্লিরা কেন্দ্রীয় মসজিদ থেকে বেরিয়ে যার যার বাড়ি-ব্যবসাস্থলে চলে গেছেন। দু’ একজন এখনো নামাজ পড়ছেন। তারাও একটু পর চলে গেলে সুনসান হয়ে পড়বে এলাকাটি। মসজিদের একজন খাদেম এর পর প্রধান ফটকটির কলাপসিবল গেট একটু টেনে দেবেন। ঠিক বন্ধ করবেন না। কেন না এরপরও কেউ কেউ এসে নামাজ পড়বেন। ঐ পাশে একটি কক্ষে শিশুর দল মক্তবে কুরআন শিক্ষা করতে আসবে।
হঠাৎ উ ওতামা পার্কের দিক থেকে কিছু লোক ছুটে আসতে থাকে। ওদের চলার ভঙ্গি দেখেই বুঝা যায় ওরা রাখাইনÑ আকিয়াবের সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়।
সামনের অংশেই কু শির সেই বিয়ন কাকা আর তার দলবল। তাদের হাতে লাঠিসোটা- জ্বলন্ত মশাল। আকিয়াবের সংখ্যালঘু নিরীহ মুসলমানদের এই ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে বিনা কারণে আগুন দিতে এসেছে তারা।
মসজিদের এক অংশ থেকে কয়েকজন ছাত্র প্রতিরোধ করার চেষ্টা করে। দেখতে দেখতে আরো কিছু রোহিঙ্গা মুসলিম ছুটে আসে তাদের প্রিয় উপাসনালয় রক্ষার জন্য। এর মধ্যে আছেন কু শির বাবা রিয়াসত ও কয়েকজন পাড়া-প্রতিবেশী।
উন্মত্ত রাখাইনদের সাথে আছে লুন্টিন ও পুলিশ বাহিনী। ওদের সঙ্গে রোহিঙ্গারা পারবে কিভাবে। এরই মধ্যে মসজিদের একটি অংশে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে তারা। কয়েক শ’ কুরআন, হাদিস ও ইসলামী শিক্ষা বইয়ে আগুন দেয় তারা।  রোহিঙ্গারাও ছাড়ার পাত্র নয়, প্রাণ দেবে তবু প্রাণপ্রিয় মসজিদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থের কোন ক্ষতি তারা হতে দেবে না।
রাখাইনরা কাপড়ের ভাঁজে করে আগ্নেয়াস্ত্রও এনেছে। এগুলো বের করে গুরুম গুরুম গুলি ছুঁড়তে শুরু করে এক পর্যায়ে।
দেখতে দেখতে কয়েকজন লুটিয়ে পড়ে। রক্তে সয়লাব এলাকা। দূরে দাঁড়িয়ে বর্মী সেনারা এ দৃশ্য দেখে কিছু বলে না। বোঝা যায় ওদের সায় আছে এতে। রোহিঙ্গাদের কচুকাটা করা হোক ওরাও মনে মনে চায়। গুলি শুরুর পর কিছু রোহিঙ্গা দিগি¦দিক ছুটে পালায়। কিছু লড়াই করতে করতে আল্লাহু আকবর বলে বুক পেতে দেয়। রিয়াসত আলী বীরের মতো লড়াই করে মসজিদের উত্তর অংশ রক্ষা করতে পেরেছে। তার মাথায় লাঠির আঘাত করে হার্মাদগুলো ভেগেছে। দর দর করে রক্ত পড়ছে তবে জখম গুরুতর কিছু নয়। সবাই তাকে ধরাধরি করে নিয়ে যাচ্ছে।
দক্ষিণ পাশে আগ্নেয়াস্ত্রের গুলিতে একটি কিশোর আর দু’জন রোহিঙ্গার বুক পিঠ ঝাঁজরা হয়ে গেছে। ওদের নিথর দেহ পড়ে আছে চাপ চাপ রক্তের ওপর। এই কিশোর আর কেউ নয়Ñ কু শি ওরফে শের আলী। তার হাতের ওষুধের প্যাকেট ছিটকে পড়ে আছে পাশে, রক্তের সমুদ্রে।

[এই গল্পের প্রতিটি চরিত্র কাল্পনিক। তবে ঘটনাবলি ও তথ্যাবলি ইতিহাস ও পত্রপত্রিকা থেকে নেয়া।]

SHARE

Leave a Reply