Home সায়েন্স ফিকশন

প্রতিদিনের মতো বেশ খোশ মেজাজে বাংলাদেশ মিনারেল রিসোর্সেস অ্যান্ড অ্যাটোমিক পাওয়ার রিসার্চ ল্যাবে ঢুকেই ল্যাবসুপার ড. আবরার নিজাম এক টানা ‘বিপ বিপ বিপ বিপ’ শব্দ শুনে আঁৎকে উঠলেন। ভয়ে তার মুখ শুকিয়ে কেবল কাঠই হয়ে যায়নি, বুকের বাম পাশে থাকা হৃৎপিণ্ডটাও পিংপং বলের মতো লাফাতে শুরু করেছে। মনে হচ্ছে এক্ষণই ওটা ফেল মেরে যাবে! এখন উপায়? তার মাথায় কিছু ঢুকছে না। নিরুপায় হয়ে বুকের মাঝে একরাশ আতঙ্ক নিয়েই চিৎকার জুড়ে দিলেন- সিকিউরিটি, সিকিউরিটি, প্লিজ হেল্প মি! আমাকে জলদি ল্যাবের বাইরে নিয়ে যাও। ল্যাবের কোথাও টাইম বোম পাতা আছে। কখন বার্স্ট হয়ে যায় কে জানে!…. সিকিউরিটি, হেল্প মি।…. আমার পা চলছে না।…. আমাকে বাঁচাও।….
ড. নিজামের আতঙ্কমাখা চিৎকার শুনে সিকিউরিটির সদস্যরাও প্রায় ঘাবড়ে গিয়ে একযোগে চারজন ছুটে আসে ল্যাব সুপারের চেম্বারে।
তখনও অনবরত ‘বিপ বিপ’ শব্দটা শোনা যাচ্ছে। কিন্তু কোন দিক থেকে বা ঠিক কোন স্থান থেকে শব্দটা আসছে ওরা কেউই আন্দাজ করতে পারলো না। বাধ্য হয়ে নিজেরাও আতঙ্কের সাথে ড. আবরার নিজামকে প্রায় কাঁধে তুলে নিয়ে দ্রুত বেরিয়ে এলো ল্যাবের বাইরে। কাল বিলম্ব না করে ম্যাগাফোনে সবাইকে ল্যাবের বাইরে বেরিয়ে আসার জন্য ঘোষণা দিয়ে রেড-অ্যালার্টের সাইরেন বাজিয়ে দিলো। তারপর ভয়ে ভয়ে পুরো স্টাফ এবং রিসার্চ ফেলোরা ল্যাবের প্রশস্ত বাগানের শেষ প্রান্তে পানিভর্তি কৃত্রিম ফোয়ারার কাছে অবস্থান নিলেন। যাতে ল্যাব উড়ে গেলেও তারা প্রাণে রক্ষা পান।
এরই মধ্যে ল্যাব সুপারের মোবাইল কল পেয়ে সাইরেন বাজিয়ে ছুটে এসেছে পুলিশ এবং ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের উদ্ধারকারী দল। তাদের সাথে আসা পুলিশের বিস্ফোরক বিশেষজ্ঞ টিম এরই মধ্যে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দুঃসাহসিকতার সাথে ঢুকে পড়েছেন ল্যাবের অভ্যন্তরে। বাইরে অপেক্ষারত ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স কর্মীরা বিদ্যুৎবেগে ল্যাবের চারপাশে বিস্ফোরণ পরবর্তী কার্যক্রমের যাবতীয় ব্যবস্থা সেরে ফেললেন। কিন্তু মাত্র পনের মিনিটের মাথায় পুলিশের বিস্ফোরক বিশেষজ্ঞ টিম অনেকটা হতাশা নিয়ে আতঙ্কিত মুখে দ্রুত বেরিয়ে এলেন ল্যাবের বাইরে। তারাও ঠিক আন্দাজ করতে পারেননি টাইম বোমার অবস্থান। পুলিশ সুপার বাধ্য হয়ে অয়্যারলেসে সম্মিলিত সামরিক বাহিনীর সদর দফতরে বিষয়টা জানালেন।
দেখতে দেখতে দুটো ভারী বুলডোজারসহ সামরিক বাহিনীর একটা কমান্ডো ইউনিটের নেতৃত্বে সেনাবাহিনীর একটা চৌকস বিস্ফোরক বিশেষজ্ঞ টিম হাজির হয়ে গেল। সামরিক বাহিনীর কমান্ডো মানে তো আর যা তা ব্যাপার নয়! তারা দশ মিনিটের অভিযান চালিয়েই বলে দিলেন আসলে ল্যাবের কোথাও কোন টাইম বোমা পেতে রাখা হয়নি। তবে ‘বিপ বিপ’ আওয়াজটা একটা রহস্যজনক ব্যাপার! শব্দটা এখন আর কোথাও শোনা যাচ্ছে না। এমনকি হাই সেনসেটিভ মাইক্রোওয়েভ রিসিভার পেতেও আপাতত শব্দটা আর রেকর্ড করা গেল না। তবে কমান্ডোরা আরেকবার ভেতরে অভিযান চালিয়ে সিগন্যাল দেবেন- ল্যাবে নিরাপদে কাজ চালানো যাবে কি যাবে না। এজন্য সবাইকে অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য ল্যাবের বাইরে অপেক্ষা করতেই হবে।
সামরিক বাহিনীর কমান্ডোদের কথা শুনে সবার মনে আর যাই হোক, একটা আশার আলো ফুটে উঠেছে- যাক বাবা টাইম বোমা তো নেই। আপাতত আর প্রাণ হারানোর ভয়ও নেই। এই সুবাদে ল্যাব সুপার ড. আরবার নিজামের হুট করে মনে পড়ে যায় বিশ্বে আলোড়ন সৃষ্টিকারী বাংলাদেশের ‘লিটল স্কলার’ আফনান কবীরের কথা। ক’দিন হলো সুদূর আমেরিকা থেকে স্বদেশে ফিরেছে আফনান। তাই ওর এখন আর আনন্দের শেষ নেই। কেননা, ওর কাছে জন্মভূমি বাংলাদেশ ঠিক নিজের মায়েরই মতো প্রিয়। বিশ্ব মাঝে সুজলা সুফলা শস্য শ্যামল বাংলাদেশের জুড়ি মেলা ভার। বাংলাদেশ কেবল যে প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ তা কিন্তু নয়, সামুদ্রিক সম্পদ এবং খনিজসম্পদেও ভরপুর। আফনান তো জানেই- কী নেই এ দেশে? মাটির তলায় কয়লা, চুনাপাথর, লোহা, গ্যাস আর সাগরের তলদেশে তরল সোনা- মানে, তেল আর তেল। আর তেল যেখানে আছে সেখানে সত্যি সত্যি সোনাও যে থাকতে পারে- তা আর কেউ জানুক বা না জানুক আমেরিকা প্রবাসী আফনান কিন্তু ঠিকই সে খবর রাখে।
ও যে আমেরিকার নিউজার্সি প্রদেশে ‘নাসা’ পরিচালিত সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি ইনস্টিটিউটের ভূতত্ত্ব ইউনিটের ‘লিটল স্কলার’! এমন সুযোগ সব বিদেশী মানে প্রবাসীর ভাগ্যে হয় না। বাংলাদেশের সন্তান আফনান কবীর সুপার ট্যালেন্ট বলে আমেরিকান সরকার ওকে এই সম্মান এবং সুযোগ করে দিতে বাধ্য হয়েছে। সেখানের নিউরোলজিস্টরা একমত হয়ে স্বীকার করেছেন, আফনানের বয়স পনের বছর হলেও তার মস্তিষ্ক এতোটাই সার্প যে, তা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের ক্লাস করানোর উপযোগী। এমনকি অনেক জটিল বিষয়ে গবেষণায় আত্মনিয়োগ করারও উপযোগী। তবে আফনান আপাতত শিক্ষকতা করতে রাজি নয় বলেই তাকে রিসার্চ ফেলোর মর্যাদায় ‘লিটল স্কলার’ হিসেবে স্পেশাল অনার দেয়া হয়েছে। ওর চেয়ে বয়সে বড় এবং উপরের ক্লাসের ছাত্রছাত্রীরাও ওকে সম্মান করে। অবশ্য আফনান ওর এই সম্মানকে বাংলাদেশের জন্য বিশেষ সম্মান বলেই মনে করে। এ নিয়ে ওর মনে নিজের জন্য তেমন অহঙ্কার নেই।
ভূতত্ত্ব ইউনিটের ‘লিটল স্কলার’ হওয়ার কারণে আফনানের একটা কথা ভালো করেই জানা আছে যে, বাংলাদেশে হীরার খনি আবিষ্কার হয়ে গেলেও অবাক হবার কিছু থাকবে না। কারণ, ও নিশ্চিতভাবে জানে- যেখানে কয়লার খনি আছে সেখানে ‘টার’ মানে আলকাতরা থাকতেই হবে, আর আলকাতরা থাকা মানে সেখানে স্যাকারিনও থাকবে। এই কয়লার খনির পুরো ভূ-ভাগের কোথাও না কোথাও হীরাও থাকবে। তাই বাংলাদেশ একদিন হীরার সন্ধান পাবেই পাবে। আর এ জন্যই ভাবিষ্যতের সমৃদ্ধ বাংলাদেশ এখন আফনানের স্বপ্নের দেশ।
আফনান সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি ইনস্টিটিউটের ভূতত্ত্ব ইউনিটের ‘লিটল স্কলার’ হলে হবে কী, রোবো-ইঞ্জিনিয়ারিং হচ্ছে ওর অবশোনাল সাবজেক্ট। তবে আফনান অফশোনালকে অফশোনাল ভাবতে নারাজ। রোবটের ব্যাপারে ও খুব সিরিয়াস। তাই মূল সাবজেক্টের মতো অফশোনাল সাবজেক্টকেও আফনান সমান গুরুত্ব দিয়ে পড়াশোনা করে। এরই মধ্যে ও কয়েকটা খেলনা রোবট বানিয়ে ওর স্কুিলং কর্তৃপক্ষকে অবাক করে দিয়েছে। ওর ইচ্ছে, ভবিষ্যতে পুরোদমে বিজ্ঞানী হয়ে দেশে ফিরে ভূতাত্ত্বিক অনুসন্ধানে রোবট নিয়ে কাজ চালাবে। তাতে সরকারের অনুসন্ধান খরচ অনেক কমে আসবে।
আফনানের মনের মাঝে লুকানো এই কথাটা আফনানই গত রাতে মোবাইল ফোনে আলাপকালে ড. আবরার নিজামকে জানিয়েছে। আফনানের আব্বু ড. নিজামের বাল্যবন্ধু। সে কারণে আফনানের জন্মকাল থেকেই ড. নিজাম আফনানকে খুব স্নেহ করেন। আফনানও তার বিজ্ঞানী চাচা ড. আবরার নিজামকে খুবই শ্রদ্ধা করে। তাই দেশে ফিরেই আফনান ওর শ্রদ্ধেয় নিজাম চাচার সাথে যোগাযোগ করেছে। সে সুবাদে প্রতিরাতেই চাচা-ভাতিজার মোবাইল আলাপ। তো গত রাতে আলাপে আলাপেই আফনানের মনের কথাটি তিনি জেনে নিয়েছেন। বয়সের কথা ভাবলে আফনানকে সবাই এই একরত্তি পুচকে ছেলে ভাবলেও ড. নিজাম আফনানকে দেখেন ভিন্ন চোখে। তাই এই বিপদের মুহূর্তে আফনানের কথাই মনে পড়ে গেলো তার। তিনি কাল বিলম্ব না করে মোবাইলে আফনানকে সব জানালেন। সব জেনে আফনান বিজ্ঞজনের মতো বললো, ডোন্ট ওরি আংকেল! আ-অ্যাম কামিং জাস্ট আফটার আ ফিউ টাইম।

দুই.
গাড়ি নিয়ে বেরোবার প্রস্তুতি দেখে আফনানের আম্মু ছুটে আসেন গাড়ির সামনে- এই ছেলে দাঁড়াও দাঁড়াও, এই সকাল সকাল আবার কোন বন্ধুর বাসায় যাচ্ছ? ফিরবে কখন?
আম্মুর কথায় আফনান একগাল হেসে বলে- হ্যাঁ, বন্ধুই তো! নিজাম চাচা তো আমাকে বন্ধুর মতোই ভালোবাসেন। চাচা এখন খুব বিপদে আছেন শুনলাম। তাই বন্ধুর বিপদে বন্ধু ছুটে যাচ্ছি।
আফনানের পাকামো কথা শুনে ওর আম্মুও একগাল হাসলেন। তারপর বললেন, তোমার চাচার আবার বিপদ-আপদ। দেখ গিয়ে কোন যন্ত্রপাতি নিয়ে সমস্যায় পড়েছেন। আর সেটাই হচ্ছে তার জন্য মহাবিপদ। ঠিক আছে যাও। তবে জলদি জলদি ফিরে এসো। আজ বিকেলে আমরা সেন্টমার্টিন রওনা হবো।
আম্মুর সাথে আর কথা বাড়ায় না আফনান। একটানে গাড়ি ড্রাইভ করে পৌঁছে যায় বাংলাদেশ মিনারেল রিসোর্সেস অ্যান্ড অ্যাটোমিক পাওয়ার রিসার্চ ল্যাবে। সেখানে পৌঁছে অবস্থা দেখে আফনান খানিকটা অবাক হয়ে যায়। আর এই বিপদের মাঝে একটা সাধারণ ছেলেকে গাড়ি ড্রাইভ করে ল্যাবে আসতে দেখে উপস্থিত লোকেরাও অবাক হয়ে যায়। আর্মি বিস্ফোরক বিশেষজ্ঞ টিমের কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার মাহি আহবাব হোসেন অনেকটা প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে আফনানের দিকে তাকাতেই ড. নিজাম ছুটে এসে আফনানকে বুকে জড়িয়ে ধরে ওকে ব্রিগেডিয়ার সাহেবের সাথে পরিচয় করিয়ে দেন। তিনি অবাক হয়ে হাত এগিয়ে দেন আফনানের দিকে। মনে মনে বলেন, এই সেই বাংলাদেশের সোনার ছেলেটি! মুখে বলেন, হ্যালো! হাউ আর ইউ?
-ফাইন। হটস দ্যা প্রব্লেম স্যার? ইস দেয়ার এনি রং?
– ইয়া, মাই বয়। উই আর ট্রাই টুবি ফাইন্ডিং।
– ক্যান আই হেল্প ইউ?
– ও! নট নাউ। বাট আ-উইল কনসাল্ট উইথ ’উ।
– মেনি থ্যাংকস।
ড. নিজাম ওদের কথা কেড়ে নিয়ে বললেন, ওহে খুদে বিজ্ঞানী তোমার সাথে আমাদের বসতেই হবে। আপাতত চলো আমরা দু’জন ওই শ্যাডোতে গিয়ে তোমাকে সব খুলে বলি। ব্রিগেডিয়ার সাহেবকে আর আটকে রেখো না। উনি এখন ভীষণ ব্যস্ত।
কথাগুলো শেষ করে ব্রিগেডিয়ার সাহেবের সাথে হ্যান্ডশেক করে আফনানকে নিয়ে ড. নিজাম খানিক দূরে সিকিউরিটি শ্যাডোতে এসে ঢুকলেন। এতক্ষণে একটু ফ্যানের নিচে বসতে পেরে হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন। একটু দম নিয়ে তারপর সব ঘটনার আগাগোড়া খুলে বললেন আফনানকে। সব শুনে আফনানও খানিকটা চিন্তায় পড়ে গেলো। ও ভেবে পেল না- যেখানে কোনো টাইম বোমা নেই সেখানে টাইম বোমার মতো ‘বিপ বিপ’ আওয়াজটা এলো কী করে? তাছাড়া কেবল তো ‘বিপ বিপ’ শব্দ! সাথে সাথে ঘড়ির কাঁটার টিক টিক শব্দ তো শোনা যায়নি, তাহলে? তা ছাড়া এ যাবৎ যে সময় গড়িয়েছে, কোথাও টাইম বোমা পাতা হয়ে থাকলে এতক্ষণে পুরো ল্যাব সত্যি সত্যি উড়ে যাবার কথা। পুলিশ এবং সেনা বিস্ফোরক বিশেষজ্ঞরা ঠিকই বলেছেন। এটা আসলে একটা রহস্যজনক সাউন্ড। এর একটা সুরাহা ড. নিজাম চাচাকেই করতে হবে। তবে তাকে আমি সাহায্য করবো। কিন্তু কিভাবে?
আফনান আর ভাবতে পারে না। হঠাৎ গ্রিন সিগন্যালের সাইরেন বেজে ওঠে। সে সাথে সবার মুখে হাসিও দেখা যায়। আর্মি বিস্ফোরক বিশেষজ্ঞ টিমের কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার মাহি আহবাব হোসেন সাহেব নিশ্চিত নিরাপত্তার ঘোষণা দিয়ে সদলে বিদায় হন। ফিরে যায় পুলিশ এবং ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের বিশেষজ্ঞ টিমও। শুরু হয় ল্যাবের স্বাভাবিক কাজকর্ম।

তিন.
প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে ড. আবরার নিজামের চেম্বারেই বিজ্ঞান-প্রযুক্তি মন্ত্রী, ভূ ও খনিজসম্পদ মন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং প্রতিরক্ষা মন্ত্রীর গোপন মিটিং শুরু হয়েছে। গতকালের ঘটনার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিচার-বিশ্লেষণ করছেন তারা। প্রধানমন্ত্রী বিষয়টি নিয়ে সিরিয়াস ভেবেছেন। তিনি এই রহস্যের জট না খুলে শান্তি পাচ্ছেন না। খোদ রাষ্ট্রপতির সাথেও আলোচনা করেছেন। এ ব্যাপারে যে কোন পদক্ষেপ নেবার মত সব ধরনের অনুমতিও চেয়ে রেখেছেন। সে অনুসারে মন্ত্রীদেরও নির্দেশ দিয়েছেন। গভীর রাতে ড. নিজামের সাথেও প্রধানমন্ত্রী কিছু গোপন কথা সেরে নিয়েছেন। ড. নিজামকে কিছু বিশেষ নির্দেশও দিয়ে রেখেছেন। কারণ, প্রধানমন্ত্রী ছাত্রজীবনে ভূ-সম্পদ বিজ্ঞানের ছাত্র ছিলেন। বাংলাদেশের সমৃদ্ধ প্রাকৃতিক, ভূ ও খনিজ সম্পদ সম্পর্কে তিনি অনেক আগে থেকেই আশাবাদী এবং উৎসাহী।
বিদেশীদের এই মহামূল্য সম্পদের ওপর লোলুপ নজর থাকতেই পারে। কিন্তু জীবন গেলেও আমরা তা কাউকে বিনামূল্যে এবং বিনা কারণে দিয়ে দিতে পারি না। প্রধানমন্ত্রীরও মনে মনে একই প্রতিজ্ঞা। তাই ল্যাবের ঘটনা শুনে তার দু’চোখেও ঘুম নেই। যদিও আপাতত কোন বিপদের সম্ভাবনা নেই বলে বিশেষজ্ঞ দল জানিয়েছে। তবুও প্রধানমন্ত্রী খুবই সতর্ক। বিষয়টি মন্ত্রীদের বুঝাতে পেরে তাদেরকে কাজে নামাতে পেরেছেন। সে অনুসারে ল্যাবে আজকের এই গোপন মিটিং। মন্ত্রণালয়ে এসব মিটিং অনেক সময় সবদিক ঠিক রেখে করা যায় না। যেখানের ভাবনা সেখানে বসে করাই ভালো। গোপন সভা শেষে সিদ্ধান্ত হলোÑ ল্যাবের নিñিদ্র নিরাপত্তার জন্য এখানে চব্বিস ঘণ্টা উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন সেনসেটিভ মাইক্রোওয়েভ রিসিভার চালু রাখা হবে। আর তার থেকে প্রাপ্ত রেকর্ড প্রতি পনের মিনিট পর পর মনিটর করা হবে। এ জন্য অতিরিক্ত বিশেষজ্ঞ টিম বাইরোটেশনে কাজ করবে। পরিশেষে সমন্বিত তথ্য উপাত্ত বিচার বিশ্লেষণ করবে তিন সদস্যের একটি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন বৈজ্ঞানিক টিম।
আলোচনার এক পর্যায়ে সবদিক ভেবে ঠিক করা হলো যে, আফনান যতদিন দেশে অবস্থান করবে ওকেও এই টিমের একজন অতিরিক্ত সদস্য রাখা হবে। যদি তাতে কোন ফলাফল পাওয়া যায়। কারণ, খোদ প্রধানমন্ত্রীও একই কথা ভাবছেন। তিনি চান এই ছেলেকে এখন থেকেই যতটা সম্ভব জাতির সেবায় লাগাতে। সে কারণেই আফনানদের পরিবারের নিরাপত্তার জন্য তিনি গোয়েন্দা বিভাগের একটা চৌকস সিকিউরিটি টিম নিয়োগ করেছেন। যা খুবই গোপনীয় বিষয়। প্রধানমন্ত্রীর এই ব্যবস্থা নেবার কথা জানেন কেবল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং আইজি সাহেব। সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে আজকের সভায় সে কারণেই আফনানের মত কিশোর বিজ্ঞানীকেও নিয়ে আসা হয়েছে।
সভার শেষ দিকে আফনান বিনয়ের সাথে প্রস্তাব করলো- আজ সন্ধ্যা সাতটা থেকে টানা আগামী তিন দিন আমি ল্যাবে অবস্থান করতে চাই। যদি আপনারা অনুমতি দেন।
আফনানের কথায় সবাই মুখ চাওয়া-চাওয়ির পর ওর কাছে এর কারণ জানতে চাইলো। আফনান বেশ সুন্দর করে সবাইকে ওর প্ল্যানটা বুঝিয়ে বললে ওর তিনদিন ল্যাবে থাকার সব ব্যবস্থা করা হলো। অমনি হঠাৎ রেড অ্যালার্ট বেজে উঠলো। কিন্তু আতঙ্কিত হলেন না কেউই। ত্রিশ সেকেন্ড পর চিফ সিকিউরিটি অফিসার প্রায় হাঁপাতে হাঁপাতে এসে হাজির। তিনি ড. নিজামকে উদ্দেশ করে বললেন, স্যার! আবার সেই আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। কিন্তু ঠিক কোথা থেকে আওয়াজটা আসছে তা বুঝতে পারছি না।
আফনান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে বললো, স্যার! আমাকে এখনই বাইরে যাবার অনুমতি দিলে ভালো হয়। আমি গিয়ে দেখতে চাই ব্যাপারটি আসলে কী।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বললেন, অফকোর্স। তবে ড. নিজাম সাহেব ব্যাপারটা ভালো বলতে পারবেন।
সাথে সাথে ড. নিজাম বললেন, আপনারা অপেক্ষা করুন। আমরা আসছি। বলেই আফনানকে নিয়ে তিনি তার চেম্বার থেকে বেরিয়ে গেলেন। সোজা হাজির হলেন ল্যাবের তিন নম্বর সেক্টরে। কান পেতে শুনতে পেলেন সেই শব্দ। আফনানও অবাক হয়ে শুনতে পেল ‘বিপ বিপ বিপ বিপ’ একটানা খুবই লো-ভলিউমে শব্দটা কানে এসে লাগছে। এরই মধ্যে মন্ত্রীদের সিকিউরিটি কনভয়গুলো ডিটেকটর নিয়ে অনুসন্ধান চালাতে শুরু করেছে। কিন্তু শব্দটি ঘন ঘন স্থান পরিবর্তন করায় তারা বেশ বিপাকে পড়েছেন। তারাও নিশ্চিৎ যে এটা টাইম বোমার শব্দ হতে পারে না। কিন্তু ঠিক কিসের শব্দ বা ঠিক কোনখানে শব্দটির উৎপত্তি তা নির্ণয় করতেই হিমশিম খাবার দশা। ড. নিজাম তার রিস্টওয়াচে সেট করা ইনভিজুয়াল ক্যামেরায় পুরো এলাকাটা ভিডিও করে ফেললেন। কিন্তু এই ভিডিও ফুটেজ কম্পিউটারে ডাউনলোড নিয়ে কালচার করার পর তাৎক্ষণিকভাবে তেমন কিছুই ফুটে উঠলো না।
এরই মধ্যে ‘বিপ বিপ’ শব্দটা একবারেই থেমে গেছে। মনে হচ্ছে যে, যার মাধ্যমে শব্দটা বেরিয়ে আসছিলো সে-ই উধাও হয়ে গেছে। ব্যাপারটা সবার কাছে আরও রহস্যময় এবং জট পাকিয়ে যাওয়ার মতো মনে হতে লাগলো। ড. নিজামের চেম্বারে ফিরে এসে আফনান মন্ত্রীদের জানালো, এবার নিজ কানে শব্দটা শুনে মনে হলো এটা একটা আল্ট্রাসাউন্ড। খুবই বিভ্রান্তিকর। আমার মনে হচ্ছে সাউন্ডটি রোবোটিক। আর রোবোটিক আল্ট্রাসাউন্ডের একটা রহস্যজনক ব্যাপার হলো- এই শব্দ যে ইনফো থেকে উৎপন্ন হয় বা বেরিয়ে আসে তার থেকে মিনিমাম এ্যাক্সট্রা নয়েসে শব্দটা বিভিন্ন ডাইমেনশনে ভাইব্রেশন আকারে পাস হয়ে ঘুরপাক খেতে থাকে। সেটা নব্বই, একশ ষাট, দুইশ দশ ইত্যাদি ডিগ্রিতে একটি নির্দিষ্ট দূরত্বে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ফলে মূল ইনফোর অবস্থান চট করে নির্ধারণ করা সম্ভব হয় না। আর ইনফোটি যদি চলমান হয় এবং তার স্পিড যদি ঘণ্টায় কমপক্ষে একশ কিলোমিটার হয়- তাহলে তাকে আবিষ্কার করার আগেই সেটি নিরাপদে অন্য স্থানে চলে যেতে পারে। তবে ভাইব্রেশনের ডিগ্রি সেটাপ নিশ্চিত হতে পারলে তাকে আবিষ্কার করা সম্ভব। এটা ড. নিজাম চাচাও জানেন। আমার মনে হচ্ছে ব্যাপারটা এখানে সে রকমই ঘটে যাচ্ছে।
আফনানের কথায় মন্ত্রীরা এক সাথে হৈ হৈ করে উঠলেন। তারা বললেন, রোবট এসে ঝামেলা পাকালে তো ইনভিজুয়াল ক্যামেরায় ধরাই পড়ে যেত। তাছাড়া ওটাতো তো আর হাওয়ায় মিলিয়ে থাকতে পারবে না। আর কাছ থেকে সাউন্ড যখন শুনা যাচ্ছে তার অবস্থান তো শত কিলোমিটার দূরে হতে পারে না। ব্যাপারটা ভেবে দেখ মিস্টার লিটল সায়েন্টিস্ট। রি-থিংক প্লিজ, বিফোর অ্যাকশন।
ড. নিজামও বললেন, ভিডিও ফুটেজ তো একবারে ন্যাচারাল এবং নিল দেখা গেল।
আফনান কী মনে করে বললো, আচ্ছা চাচা! আমরা কি আবার আপনার ফুটেজটা কালচার করতে পারি?
– কেন নয়। তবে ওতে তো কিছুই দেখা গেল না। চলো আবার দেখা যাক।
কথাটা বলেই ড. নিজাম উঠে দাঁড়ালেন। তারপর কম্পিউটারে ফুটেজটা প্লে করলেন। ফুটেজে ল্যাবের তিন নম্বর সেক্টরের পরিচিত সব দৃশ্যাবলিই কেবল ফুটে উঠেছে। এক্সট্রা-অর্ডিনারি তেমন কিছু চোখে পড়ছে না। হঠাৎ একটা স্থানে এসে আফনান ‘ইউরেকা’ বলে প্রায় চিৎকার করে উঠলো। তারপর সাথে সাথে ড. নিজামকে বললো, চাচা এখানে আবার কালচার করতে হবে, ফুটেজটা সামান্য ব্যাক করে রিপ্লেতে দিন।
ড. নিজাম তাই করলেন। তবে তেমন কিছু চোখে পড়লো না। শুধু এসি’র আপ সাইডে বসে থাকা একটা মাছি সটকে বেরিয়ে গেলো জানালা গলে। এটা তো স্রেফ মামুলি ব্যাপার। কিন্তু আফনান নাছোড়বান্দা। ও বার বার ওই মাছি পালিয়ে যাবার দৃশ্যটাই দেখতে লাগলো। তাতে মন্ত্রীরা খানিকটা বিরক্ত হয়ে গেলেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বললেন, এখানে তেমন কিছু নেই। প্লান মত কাজ এগিয়ে নিন, পর্যবেক্ষণ আর সিকিউরিটি বাড়ান।
আফনানের তাতে অপমান বোধ হলেও সে বিনয়ের সাথে বললো, ঠিক আছে স্যার! আপনারা আমাকে একটু একা ছেড়ে দিন, ফুটেজটা আমি আরও কয়েক বার পর্যবেক্ষণ করি।
আফনানের কথায় ড. নিজাম এবং চারমন্ত্রী কম্পিউটার লবি থেকে উঠে গিয়ে তাদের আলাপে মনোনিবেশ করলেন।

চার.
কম্পিউটার লবিতে বসে আফনান ফুটেজটা বার বার জুম করে চলেছে। এক পর্যায়ে ও আবারও ‘ইউরেকা’ ‘ইউরেকা’ বলে চিল্লিয়ে উঠলো। তারপর আফনান অনেকটা চিৎকার জুড়ে দিল- ড. চাচা দেখে যান এটা আসলেই ন্যাচারাল মাছি নয়। ওর চলাচলের ট্রেকিং রোবোটিক। এই যে দেখুন ভিডিও ফুটেজ থেকে চারটি স্টিল কাটআউট বের করেছি। তাতে দেখা যাচ্ছে- সাধারণ যে কোন মাছির চেয়ে এই মাছিটি সামান্য বড় এবং ওর ডানার লেনথ কম করে হলেও দশ মিলিমিটার অর্থাৎ এক সেন্টিমিটার পরিমাণ বাড়তি এবং তা এক্সট্রা উইংস-এর মতো ওর বডির দু’পাশ দিয়ে পেছনের দিকে বেরিয়ে গেছে। খালি চোখে হঠাৎ করে এটা দেখতে পাওয়া কষ্টকর। মনে হচ্ছে এগুলো তৈরিতে ‘কার্বন ফাইবার’ এবং ‘পিয়েজো ইলেকট্রিক’ ব্যবহার করা হয়েছে। যা এমনিতেই আলোতেও ইনভিজুয়াল ইফেক্ট তৈরি করতে সক্ষম। অন্ধকারে মার্কারি ফ্লাশিং দিয়েও তা দেখা যাবে না। মনে হচ্ছে এই ডানাগুলো জুড়ে দেয়া হয়েছে শক্তিশালী ‘ইলেকট্রনিক মাসল’ এর সাথে। আমি নিশ্চিত ওর ভেতরকার ভাইব্রেশনাল সাউন্ড ওয়েভই ‘বিপ বিপ’ শব্দের মূল কারণ। আর তা সম্ভবত সেটাপ দেয়া হয়েছে ২৭০ ডিগ্রি অ্যাংগেল করে। যার কারণে শব্দের উৎপত্তিস্থল অর্থাৎ রোবোফ্লাইয়ের বডি থেকে উৎপাদিত শব্দ সরাসরি না ছড়িয়ে তা ২৭০ ডিগ্রি অ্যাংগেলে ছড়িয়ে বিভ্রান্তির সৃষ্টি করতে পারছে। এখন সর্বোচ্চ সতর্কতার সাথে এই রোবট মাছিটাকে আটকানোই হবে আমাদের মূল কাজ। এ জন্য হয়তো আমাদের প্লাটিনাম নেটের প্রয়োজন হবে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বড় বড় চোখ করে জানতে চাইলেন- প্লাটিনাম নেট! কেন কেন? সামান্য মাছি আটকাতে প্লাটিনাম নেট কেন?
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রী মুচকি হেসে বললেন, সেটাই তো কথা। আফনানের কথা মতো ওটা যদি সত্যি সত্যি রোবোফ্লাই হয়েই থাকে তো ওর ওড়ার গতি বুলেটের মতো। তাছাড়া ওর মাঝে পারমাণবিক পাওয়ারও কাজ করতে পারে অর্থাৎ ওর মাঝে ইউরেনিয়াম সফটওয়্যার তো থাকবেই। তা ছাড়া রোবট বলে ওর চোখগুলোর সবটাই যে পাওয়ারফুল মাইক্রো ক্যামেরা তাতে আর সন্দেহ কী! সাধারণ যে কোনো থ্রেটিং নেট এমনকি মেকানিক্যাল নেট ওকে আটকাতে পারবে না। এ জন্যই চাই প্লাটিনাম নেট। কিন্তু হঠাৎ করে সেটা পাবেন কোথায়?
ড. নিজাম মন্ত্রীর কথা কেড়ে নিয়ে বললেন, এ জন্য ভাববেন না মাননীয় মন্ত্রী। আমাদের ল্যাবে প্রায় ছত্রিশ মিটার প্লাটিনাম নেট আছে। তাও আবার মিহি বুননের। এটা আমেরিকা থেকে আনা হয়েছিল একটা ভিন্ন প্রজেক্টের জন্য। এখন সেটাকেই কাজে লাগাতে হবে। তার আগে আমি বার কয়েক ফুটেজটা আবারও পর্যবেক্ষণ করবো।
কথাটা বলতে বলতে তিনি বসে গেলেন আফনানের পাশে। প্রায় দশ মিনিট ধরে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণের পর বললেন, ইয়েস! দিস ইস আওয়ার রিয়াল এনিমি। এবার আমি নিশ্চিত যে, মাস কয়েক আগে আমাদের সমুদ্রসীমার তেল ক্ষেত্রগুলো জবর দখলে ব্যর্থ হয়েছে যে রাষ্ট্রটি- যে রাষ্ট্রটি আমাদের সাথে মামলায় হেরে আমাদের সমুদ্রসীমা ছেড়ে পাততাড়ি গোটাতে বাধ্য হয়েছে, তারাই এখন অপমানের প্রতিশোধ নেবার একটা অপকৌশল এঁটেছে। তারাই এই গোয়েন্দা রোবোফ্লাই পাঠিয়েছে আমাদের তেল অনুসন্ধানের যাবতীয় পরিকল্পনার নথিপত্র চুরি করতে।
আফনান ড. নিজামের কথার সাথে যোগ করলো, না হলে, এই ফ্লাই ল্যাব-সুপারের চেম্বার এবং ল্যাবের তিন নম্বর সেক্টরে অনুপ্রবেশ করবে কেন? হয়তো এরই মধ্যে ওটি ল্যাবের অবকাঠামোগত সব ফুটেজই তুলে নিয়ে গেছে। তবে আরেকবার অনুপ্রবেশই হবে তার শেষ অ্যাসাইনমেন্ট এবং সেখানেই তাকে চিরকালের জন্য থেমে যেতে হবে।
আফনানের কথায় মন্ত্রীগণ যেন ভরসা পেলেন। তারা একযোগে বললেন, তোমার স্টেটমেন্ট যেন সত্যি হয় হে খুদে বিজ্ঞানী।
তাদের কথায় আফনান সামান্য মুচকি হাসলো মাত্র।

পাঁচ.
হিংসুটে শত্রু রাষ্ট্রটির রোবোফ্লাইটি এখন অচল অবস্থায় শক্তিশালী মাইক্রোস্কোপের নিচে ক্রিস্টাল গ্লাস নির্মিত স্লাইডের ওপর কাত হয়ে পড়ে আছে। ওকে প্লাটিনাম নেটের ফাঁদ পেতে ধরার দুই দিনের প্রচেষ্টার ফলাফল এটা। সুখবরটা পেয়ে কঠোর নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে খোদ প্রধানমন্ত্রী ছুটে এসেছেন বাংলাদেশ মিনারেল রিসোর্সেস অ্যান্ড অ্যাটোমিক পাওয়ার রিসার্চ ল্যাবে। তিনি যেন নিজ চোখকেই বিশ্বাস করতে পারছেন না। রোবটও এতো ক্ষুদ্রাকৃতির হতে পারে! তাও আবার মোস্ট পাওয়ারফুল!! তিনি গালে হাত ঠেকিয়ে বেশ আয়েশ করে বসে বসে ড. নিজাম এবং আফনানের কার্যকলাপ দেখছেন। সাথে আছেন চারমন্ত্রী। ড. নিজাম বিভিন্ন রকমের এন্টিরিয়েক্টর অ্যাপারেটাসের সাহায্য নিয়ে খুবই যতœ এবং সতর্কতার সাথে একে একে রোবোফ্লাইয়ের একটা একটা করে পার্টস খুলে আলাদা আলাদা প্লাটিনাম পাত্রে রাখছেন এবং সাথে সাথে গামারশ্মি প্রতিরোধক ফাইবারগ্লাস নির্মিত স্বচ্ছ ঢাকনা দিয়ে তা আটকে দিচ্ছেন। আর আফনানও সাথে সাথে সেগুলোর নির্মাণ কৌশল সম্পর্কে ডাটাবেজ তৈরি করে কম্পিউটারে রেকর্ড করছে। দেখে মনে হচ্ছে যেন, দু’জন ঘড়ির দোকানের ঘড়ি মেকার একটা ঘড়ি সারাতে ব্যস্ত। কাজ শেষ করতে তাদের প্রায় এক ঘণ্টা লেগে গেল। সবশেষে মিললো রোবোফ্লাইয়ের মাইক্রোচিপ নির্মিত হার্ড ডিস্ক। বলতে গেলে সেটা একটা বিন্দুর মতোই ক্ষুদ্রাকায়। ড. নিজাম কৌতুক করে প্রধানমন্ত্রীকে বললেন, এই দেখুন রোবট ব্যাটার প্রাণভোমরা। এখানেই জমা হয়ে আছে আমাদের এখান থেকে ওর চুরি করা সব তথ্যাবলি।
ড. নিজামের রসিকতা বুঝতে পেরে প্রধানমন্ত্রীও বেশ আয়েশ করে একগাল হাসলেন।
কম্পিউটার ডিভাইসে প্রতিটি পার্টসের ডাটাবেজ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে ড. নিজাম জানালেন, আফনানের কথাই ঠিক। রোবোফ্লাইয়ের ডানা ‘কার্বন ফাইবার’ এবং ‘পিয়েজো ইলেট্রিক’ দিয়ে খুবই সূক্ষ্মভাবে তৈরি করা হয়েছে আর তা শক্তিশালী ‘ইলেকট্রনিক মাসল’ এর সাথে জুড়ে দেয়া হয়েছে। এই মাসলের সাহায্যে স্বয়ংক্রিয়ভাবে উৎপাদিত পরমাণু বিদ্যুৎ প্রবাহের মাধ্যমে ডানা দুটোকে ঝাপটানোর ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এই প্রবাহ এতো তীব্র যে, রোবোফ্লাইটি প্রতি সেকেন্ডে ১২০ বার ডানা ঝাপটিয়ে উড়তে সক্ষম। ফলে খালি চোখে ওর লম্বা ডানা দুটোকে দেখা প্রায় একবারেই অসম্ভব। রোবট মাছিটির সামনের দিকে সেটাপ করা হয়েছে ৪০টি চোখ। আসলে ওগুলো সবই একেকটা শক্তিশালী ক্যামেরা। মাছির গতি নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা হুবহু চালকবিহীন ড্রোন বিমানের মতো। ফলে এটি ইচ্ছেমতো সামনে পেছনে একই গতিতে উড়তে সক্ষম এবং একই সাথে ৪০টি নথিপত্র বা টার্গেটের ভিডিও ছবি রেকর্ড করতে পারে।
সব দেখেশুনে প্রধানমন্ত্রী এবার চরম উত্তেজনায় ফেটে পড়লেন। তিনি আবেগকে নিয়ন্ত্রণে এনে বললেন, এমন গুরুত্বপূর্ণ কয়েক ডজন রোবোফ্লাই আমাদের চাই। বাংলাদেশকে শত্রুমুক্ত রাখতে ওদেরকে আমরা প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা বিভাগে নিয়োগ দেবো। ড. নিজাম আপনি কি আমার সাথে একমত?
– অবশ্যই একমত। তবে এগুলো তৈরি করতে যে বিপুল অঙ্কের অর্থের প্রয়োজন। জাতীয় বাজেটে চাপ পড়ে যাবে যে! প্রয়োজনে আলাদা তহবিল থেকে থোক বরাদ্দ দিতে হবে।
– হবে, হবে, সব হবে। আপনি শুধু বলুন, আপনারা রোবোফ্লাই বানাতে প্রস্তুত কি না?
– ইয়েস স্যার! আপনি অর্থের সংস্থান করতে পারলে আমরাও পারবো রোবোফ্লাই বানাতে। তা ডজন ডজন কেন? যদি বলেন শত শত, তাও সম্ভব।
– প্রধানমন্ত্রী খুশি হয়ে বললেন, নিশ্চয়ই সেটা হবে। তবে আমাদের দেশের গর্ব আমেরিকার ‘লিটল স্কলার’ আফনানের কারণেই আজকে যখন আতঙ্কজনক রোবোফ্লাইয়ের ‘বিপ বিপ’ রহস্যের সমাধান এতো তাড়াতাড়ি করা সম্ভব হলো, তা- ওকে আমরা সরকারিভাবে সম্মানজনক পিএইচডি ডিগ্রি প্রদান করছি।

SHARE

Leave a Reply