Home সায়েন্স ফিকশন দাগ

দাগ

মুহাম্মাদ দারিন

‘এই নিয়ে দশশিশু এই একই সমস্যার জন্য এলো।’
‘বলেন কী ডাক্তার সাহেব!’
‘হ্যাঁ। আগের নয় জনেরও মুখে এমন দাগ ছিলো। কারো ছিলো চোয়ালে, কারো কপালে, কারো থুতনিতে, কারো নাকের ’পরে। তবে কারোরই ব্যথা ছিলো না। আপনাদের মতো ঐ নয় শিশুর অভিভাবকদেরও অভিযোগ তাদের সন্তানদের কোনো আঘাত লাগেনি। অথচ দাগটা আঘাত লাগলে যেমন হয় তেমনি কালচে দাগ।’
ছেলেটির নাম আম্মার খান। বয়স পাঁচ বছর। ও নার্সারীতে পড়ে। বয়সের তুলনায় একটু বেশি পাকা। জানার আগ্রহ প্রচণ্ড। যে কোনো বিষয়ে জানার আগ্রহ জাগলে প্রশ্নবানে জর্জরিত করে ছাড়ে ওর সামনে যাকে পায় তাকে। কার্টুন দেখার পোকা ও। প্রতিদিনের মতো আজও আম্মার স্কুল থেকে ফিরে গোসল করে খাওয়া-দাওয়া করে খাটে শুয়ে শুয়ে টিভিতে কার্টুন দেখছিলো।
দুপুরে আব্বু বাড়িতে এসে আম্মারকে কার্টুন দেখা অবস্থায় পায়। ওকে খাট থেকে উঠাতে চাইলে ও কান্না জুড়ে দেয়। সুতরাং ওকে আর ঘাটান না। ওর মুখে ডান চোয়ালে কিসের যেন দাগ দেখে ডান হাত দিয়ে ডলা মারেন। দাগ ওঠে না। গত কাল তিনি জাম কিনে এনেছিলেন। হয়তো জাম খেতে যেয়ে জামের দাগ লেগেছে ভেবে তিনি আর কিছু না করে খাওয়া-দাওয়া করে বাজারে চলে জান।
আম্মু হাতের সব কাজ শেষ করে আম্মারকে ঘুমাতে ডাকেন। কার্টুনপ্রিয় জেদি ছেলে কার্টুন থেকে উঠতে চায় না। আম্মু এসে ওকে জোর করে কোলে নিয়ে ওর মুখের দিকে তাকিয়ে চমকে ওঠেন। ওর ডান চোয়ালে গোল হয়ে কালচে দাগ পড়ে আছে। মনে হয় কেউ যেন ওকে মেরেছে।
আম্মু তাড়াতাড়ি বলেন, ‘কিরে কে তোকে মারলো?’
‘আম্মু কেউ মারেনি।’
‘তাহলে কি পড়ে গেছিস?’
‘কই না তো।’
‘কেউ না মারলে মুখে দাগ হলো কি করে?’ বলে আম্মু ওর দাগওয়ালা জায়গায় আলতো করে হাত বুলান যাতে ওর ব্যথা না লাগে।
আম্মার ব্যথায় কোনো আঁউ-উ-উ করছে না দেখে আম্মু আস্তে আস্তে চাপ বাড়ান দাগওয়ালা জায়গায়। দাগও ওঠে না এবং আম্মার কোনো প্রতিক্রিয়া করছে না দেখে আম্মু ভড়কে যান। সাথে সাথে ফোন করেন ওর আব্বুর কাছে।
আব্বু বলেন, ‘আমিওতো দেখে এলাম দাগ। আমি ভাবলাম জামের দাগ বুঝি।’
তারপর ছুটে আসেন শহরের সবচেয়ে বড় শিশু ডাক্তারের কাছে।
ডাক্তার কোনো টেস্ট দেন না। কেননা পূর্বের রোগীদের টেস্ট করে কোনো কিছু পাওয়া যায়নি। অগত্য কিছু ওষুধ প্রেসক্রিপশন করে বলেন, ‘দেখেন ঔষধগুলো খাওয়ালে কী হয়।’
‘তারমানে রোগ আপনি ধরতে পারেন নি।’ বলেন আম্মারের আম্মু।
‘দেখুন আমি আগেই বলেছি ইতিপূর্বে নয়শিশুর অভিভাবক একই কেস নিয়ে এসেছিলো। সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে কিছুই পাওয়া যায়নি। আপনার শিশুসহ সকল শিশুই পুরোপুরি সুস্থ। তবে দাগের কারণ বুঝতে পারছিনে। মেডিক্যাল সায়েন্সে এর কোনো অস্তিত্ব নেই।’ বললেন শিশু বিশেষজ্ঞ।
শিশু বিশেষজ্ঞের কথায় কান না দিয়ে আম্মারের আম্মু ওকে নিয়ে গেলেন শহরের বড় চর্ম বিশেষজ্ঞের কাছে।
তার ভাষ্যও শিশু বিশেষজ্ঞের মত। অগত্যা আম্মারের আব্বু-আম্মু ওকে নিয়ে বাসায় ফেরেন।
যাতায়াতের পথে আম্মারের প্রশ্ন কিন্তু থামেনি। নতুন নতুন বিষয় নিয়ে নতুন নতুন প্রশ্ন ও ওর আম্মু-আব্বুকে অনর্গল করতে থেকেছে।
ওর চোয়ালে কি হয়েছে সে বিষয়ে ওর কোনো খেয়ালই নেই। আর থাকার কথাও না। কেননা ওর বয়সটা তো আর এসব নিয়ে ভাবনা-চিন্তা করার বয়স নয়। বাসায় এসে নিত্য দিনের মতো ও ওর খেলনা নিয়ে খেলায় মেতে থাকে।
পরদিন সকালে অন্যদিনের তুলনায় একটু আগে ভাগে কে যেন ওকে ঘুম থেকে ওঠার জন্য ডাকে। বলে, ‘আম্মার ওঠো। তোমার ঘুম ভাঙার সময় হয়েছে।’
ও চোখ মেলে আশপাশে আম্মু-আব্বুকে পায় না। ঘুম ভাঙানোর জন্য রাগে ও দাঁত কিড়মিড় করতে থাকে। যেন ঘুম ভাঙানো ওয়ালাকে সামনে পেলে আস্ত চিবিয়ে খাবে।
উঠে বসে ও। দেখে কেউ নেই ঘরে। রাগের মাত্রা আরো বেড়ে যায়। হাত-পা ছুড়তে থাকে ও। কে যেন ওর হাত-পায়ের গুতা খেয়ে ‘আঁউ-উ-উ’ করে ওঠে।
চমকে ওঠে ছোট্ট আম্মার। কাউকে দেখতে পায় না ও। বন্ধ হয়ে যায় ওর হাত-পা ছুড়া। ভয়ে চোখ বন্ধ করে দুই হাতে দুই পা ধরে। হাঁটুর ভিতর মাথা গোজে ও।
কে যেন ওকে পাজাকোলা করে উঠিয়ে নিয়ে যাচ্ছে অনুভব করে ও। চোখ খোলা তো দূরে থাক। আরো এঁটে রাখে। আব্বু-আম্মুকে ডাকার মতো সাহস ওর হচ্ছে না।
বেশ কিছু সময় পর আম্মার ওর সমবয়সী কিছু শিশুর কথার আওয়াজ শুনতে পায়। বুকে কিছুটা বল ফিরে পায় ও। পিট পিট করে চায়। দেখে ওর চারপাশে ওর সমবয়সী নয়জন শিশু চেয়ারে বসে আছে। ওর চোয়ালের দাগের মতো অন্যদেরও মুখের বিভিন্ন জায়গায় দাগ আছে। ওরা সকলে বসে আছে ছোট্ট একটা ঘর মতো জায়গায়। ও বুঝে পাচ্ছে না জায়গাটা কোথায়। ভয় ওর কাছ থেকে পুরোপুরি বিদায় নেয়নি।
মাথার ওপর স্পিকার কথা বলে উঠলো। বলল, ‘ছোট্ট সোনামণিরা শোনো, আমরা এখন ভীষণ মজা করবো। তার আগে আসো আমরা সকলে নাস্তা করে নিই। তোমাদের সকলের সামনে দেখ বিভিন্ন প্রকার নাস্তা চলে এসেছে। যার যেটা প্রিয় সে সেটা খাওয়া শুরু কর।’
শিশুরা যে চেয়ারে বসেছে তার প্রত্যেকটার সামনে একটি করে ছোট খাটো ডাইনিং টেবিল মেঝে ফুড়ে অটো বের হলো। তাতে সারি সারি সাজানো বিভিন্ন প্রকার শিশুখাদ্য। মোটকু দেখে একটা ছেলে আর একটা মেয়ে মনের আনন্দে খাবার খেতে লাগলো। বোঝা গেল ওরা দু’জন খেতে ভালোবাসে। অন্যরা কেউ নাক সিটকিয়ে, কেউবা ঘাড় কাঁত করে, কেউ দুই হাতে চোখ মুখ ধরে বসে রইলো। অর্থাৎ এরাই প্রত্যেকদিন খাওয়ার সময় খেতে চায় না। নানা কৌশলে তাদেরকে খাওয়ানো হয়।
দুইজন মেয়ে নাকি সুরে কান্না জুড়ে দিল।
স্পিকারে আবার ভেসে এলো, ‘দুই মামণি, কাঁদছো কেন?’
‘আমি আম্মুর কাছে যাব।’ শুটকো টিনটিনে মেয়েটি বলল।
অন্য মেয়েটি কোনো কিছু না বলে ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদতে লাগলো।
ছাদের স্পিকার থেকে ভেসে এলো, ‘দুই মামণি কেঁদো না। আর যারা কার্টুন দেখতে ভালোবাসো তারা তাদের চেয়ারের ডানপাশে হেডফোন আছে কানে লাগাও।’
কার্টুনের কথা বলার সাথে সাথে দশ শিশুই হেড ফোন কানে লাগালো। ভুলে গেল দু’জন কান্না। খেতে খেতে ওরা দু’জনও বাদ গেল না।
সকলের সামনে বড় এক স্ক্রিন দেখা দিল। তাতে শুরু হল কার্টুন। ত্রিশ সেকেন্ডও গেল না। প্রথমে হেডফোন খুলল আম্মার খান। চিৎকার করে বলল, ‘এগুলো পুরোনো। এগুলো পুরোনো। আমি পুরোনো কার্টুন দেখবো না।’
ওর মতো আরো একজন ছেলে আর একজন মেয়ে হেডফোন খুলে ফেলল। ওরা তিনজন এক জায়গায় হলো। শুরু করলো শিশুসুলভ গল্প। এ গল্পের কোনো শুরু নেই। নেই কোনো বিষয়বস্তু। আর শেষ হবে কিনা তারও কোনো গ্যারান্টি নেই।
আর ওদিকে দুই খাদক ও শুটকো টিনটিনে মেয়েটিসহ পাঁচজন ঘুমিয়ে পড়েছে। ওদের চেয়ারগুলোই সুন্দর শিশু উপযোগী বিছানায় পরিণত হয়েছে।
স্পিকার আবার ঘোষণা দিলো, ‘যারা গেমস খেলতে চাও তারা তাদের সিটে যেয়ে বস।’
আম্মারসহ পাঁচজনই সিটে যেয়ে বসলো। সিটের সামনে উদয় হলো কম্পিউটার আর মাউস কি-বোর্ড। পাঁচ শিশুই এক্সপার্ট গেমসের জন্য। শুরু করলো ওরা যার যেটা ভালো লাগে। খেলল বেশ কিছু সময়। প্রথমেই ক্ষান্ত দিলো আম্মার খান। কোনো কিছুই বেশি সময় ওর ভালো লাগে না। ইতিমধ্যে আরো দুইজন ঘুমিয়ে পড়েছে। না ঘুমানো এক মেয়ে ক্ষ্যান ক্ষ্যান করে কাঁদতে লাগলো। নাকি সুরে বলতে লাগলো, ‘আমি আম্মুর কাছে যাব। উঁ-উঁ-উঁ আমি আম্মুর কাছে যাব।’
মেয়েটা আস্তে আস্তে তার সিট থেকে উঁচু হলো। তারপর কারো কোলে উঠলে যেমন কাঁধে মুখ রেখে ঘুমায় ঠিক তেমনি শূন্যে ওই অবস্থায় থেকে ত্রিশ সেকেণ্ড পর ঘুমিয়ে পড়লো। শূন্যে ভাসতে ভাসতে অন্যদের মতো মেয়েটিও বেডে স্থান পেলো।
আম্মার আবার তার সিট থেকে নেমে পাশের জনের সাথে গল্প জুড়ে দিলো। কী এক কথায় ছেলেটি সায় না দিতেই আম্মার ওর চোয়ালে জেতে এক থাবা মারলো। ছেলেটি হাউমাউ করে কেঁদে উঠলো। এও ভাসলো মেয়েটির মতো শূন্যের কোলে। আম্মার ফ্যাল ফ্যাল করে তা দেখতে লাগলো। ছেলেটি ঘুমের রাজ্যে যেতেই ওরও স্থান হলো বেডে।
আম্মারের কানের কাছে কে যেন বলল, ‘তোমার এখন কী করতে মন চাচ্ছে আম্মার বাবু?’
আম্মার ঘুরে চারপাশ দেখে। কিন্তু কাউকে দেখতে পায় না।
কানের কাছে আবারও শুনতে পায়, ‘তুমি এখন কী করতে চাও আম্মার সোনা?’
‘তার আগে বল তোমাকে দেখতে পাচ্ছিনে কেন?’
‘তোমার ডান হাত বাড়াও, আমাকে পাবে।’
হাত বাড়িয়ে মানুষের মত কারো স্পর্শ পায় ও।
কণ্ঠটা বলে, ‘তোমার কী করতে মন চাচ্ছে।’
‘আমার ছোট মামার কাঁধের মতো তোমার কাঁধে চড়বো আমি।’ বলল আম্মার।
‘ঠিক আছে। তুমি সামনে হাত বাড়াও আমার কাঁধ পাবে।’ বলল অদৃশ্য কণ্ঠ।
আম্মার দু’হাত সামনে বাড়ায়। পেয়ে যায় দুই কাঁধ। দুইহাত অল্প একটু উপরে উঠায়। পেয়ে যায় দুইকান। দুইকান ধরে কাঁধে চেপে বসে ও। ওর ছোট মামার কাঁধ-কান আর এই কাঁধ-কানের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। পার্থক্য শুধু এতটুকু যে ছোট মামার সব দেখা যায় আর এর কিছুই দেখা যায় না।
ত্রিশ সেকেণ্ড পর ও অদৃশ্যের মাথায় চাটি মারে। যেমন মারে ওর ছোট মামার মাথায়।
‘আঁউ!’ মৃদু চিৎকার করে ওঠে অদৃশ্য কণ্ঠ।
সাথে সাথে আম্মার অদৃশ্যের দুইকান ধরে জোরে টান মারে। মাথায় দেয় জোরের সহিত পরপর তিন চাটি। জোরছে খামচে দেয় নাক-মুখ।
আম্মারের মামার মতো এতোগুলা মার হজম করার ক্ষমতা নেই অদৃশ্যের। তাই ‘আঁউ-উ-উ-উ..!’ করে ঢলে পড়ে দেয়াল ঘেসে।
আম্মার দু’হাতে ঠেকায়। তাই ওর কোনো আঘাত লাগে না। তবে কাঁত হয়ে পড়ে যায় মেঝেয়।
আম্মার উঠে নয় শিশুকেই ঘুরে ফিরে দেখে। ওরা সকলে ঘুমাচ্ছে।
ছোট্ট ঘরটায় ঘুরে ঘুরে একপাশে একটা দরজা পায় ও। প্রবেশ করে দরজা খুলে। এখানে গাড়ির সিটের মতো একটা সিট এবং সামনে অসংখ্য সুইচ। সিটে বসে আম্মার খান। ও বাংলা অক্ষর সব না চিনলেও ইংরেজি অক্ষর সব চেনে। সুইচের উপর সমস্ত ইংরেজি অক্ষরগুলো একবার পড়ে ও। উচ্চারণ না শেখায় ঐগুলো উচ্চারণ করা ওর দ্বারা সম্ভব হয় না। উচ্চারণ করে দেয়ার মতো কেউ না থাকায় রাগ সপ্তমে চড়ে ওর।
যে কোনো খেলনা দিয়ে খেলা শেষ হয়ে গেলে আম্মার ঐ খেলনা ভেঙে ফেলে দেখতে চায় কিভাবে খেলনায় কাজ করে। তেমনিভাবে সুইচগুলোর উপর গায়ের সমস্ত শক্তি দিয়ে চড়-ঘুষি, কিল-থাপ্পড় মারা শুরু করে ও।
সুইচগুলো চৌদ্দ পুরুষের কোনো আমলে এমন কমান্ড পায়নি।
ঐ এলোপাথাড়ি চাপের কারণে ভিনগ্রহের ঐ সসার পৃথিবীতে ল্যান্ড করে। উদ্ধার হয় দশশিশু।
‘আমি আপনাদেরকে প্রেস ব্রিফিংয়ের শুরুতে এ কাহিনী বললাম এজন্য যে, নয় শিশু উদ্ধারকারী শিশু আম্মার খানের চতুর্থ পুরুষ তরুণ বিজ্ঞানী জুনিয়র আম্মার খান আমাদের এবারের অভিযানের নেতৃত্ব দেবে। অর্থাৎ ভিনগ্রহের প্রাণী কর্তৃক পৃথিবীর একশত শিশু কিডন্যাপ হওয়ায় এ অভিযানের নেতৃত্ব দেবেন তিনি। অলরেডি তিনি বাংলাদেশ থেকে রওয়ানা হয়েছেন। তাছাড়া তার একমাত্র শিশুও হারিয়ে যাওয়া একশত জনের একজন। আশা করি আপনারা আর কোনো প্রশ্ন করবেন না। আমাদের সন্তান ফিরে পাওয়া অর্থাৎ এই অভিযান সফলতার জন্য আপনারা মহান স্রষ্টার দরবারে প্রার্থনা করবেন আশা করি।’ কথা শেষ করে হাতের কাগজগুলো ঠিক করে ফাইলবদ্ধ করে সঙ্গীদের নিয়ে কনফারেন্স রুম থেকে বেরিয়ে যান নাসার প্রধান ড. আউজ্যাক বেরন।

SHARE

1 COMMENT

Leave a Reply