Home তোমাদের গল্প আনন্দের এ পিঠ ও পিঠ

আনন্দের এ পিঠ ও পিঠ

কামরুল আলম

নগরীর আল হামরা শপিং সিটির আন্ডার গ্রাউন্ড ফ্লোর থেকে এই মাত্র বের হলো একটি টয়োটা ফিল্ডার। ড্রাইভিং করছেন বিশিষ্ট শিল্পপতি আহসান সোহেল। তাঁর পাশের সীটে বসেছেন স্ত্রী মাহমুদা সোহেল এবং তাঁর কোলে তাঁদের ছোট্ট মেয়ে টুকটুকি। পেছনের সীটে সোহেল দম্পতির প্রথম ও দ্বিতীয় সন্তান মিলি ও লিলি।
ঈদের শপিং করতে প্রতিদিনই এ মার্কেট থেকে ও মার্কেটে সপরিবারে ঘুরে বেড়াচ্ছেন আহসান সোহেল। কেনাকাটার কি আর শেষ আছে? চাঁদ রাত পর্যন্ত চলবে কেনাকাটা। বড়লোকদের কেনাকাটার চিত্রই ভিন্ন। দোকানে প্রবেশ করার পর যার যেটা পছন্দ হলো তাই প্যাকেটিং করা হয়। দোকান থেকে বের হওয়ার সময় দেখা গেল হাজার পঞ্চাশেক বিল উঠেছে। সেলস ম্যানদের আরো দুই-তিন হাজার বখশিশ দিয়ে অন্য দোকানে পা বাড়ানোটাই তখন প্রাধান্য পায়। এই যেমন আজকে মিলি ও লিলির এমন একটি ড্রেস পছন্দ হলো যার মূল্য সাধারণ মার্কেটে তিন থেকে চার হাজারের বেশি হবে না। তো সোহেল দম্পতির ব্যাগে যখন ওটা ঢুকলো তখন এ দু’টির মূল্য মাত্র আঠারো হাজার ধরা হলো। মোটামুটি বিশ হাজার দিয়েই তাঁরা পা বাড়ালেন পাশের শাড়ির দোকানে। ‘অনন্যা’ নামের এই দোকানটিতে সবচেয়ে কমদামে যে শাড়ি পাওয়া যায় তাঁর মূল্য দশ হাজার টাকা। মিসেস সোহেলের পছন্দ হলো একটি শাড়ি, যেটা এই মাত্র একলোক তাঁর স্ত্রীকে কিনে দিলেন। তিনি শাড়ির কাপড়ের দিকে নজর না বুলিয়ে নজর বুলালেন ওরা কত পেমেন্ট করছেন সে দিকে। যখন দেখলেন ভদ্রলোক শাড়িটির মূল্য হিসেবে এক লক্ষ বত্রিশ হাজার টাকা পরিশোধ করছেন তখনই শাড়িটি পছন্দ হয়ে গেল মিসেস মাহমুদা সোহেলের। সেলস ম্যান শাড়িটি প্যাকেট করতে যাচ্ছিল সোহেল সাহেব একটু কেশে জানতে চাইলেন, ‘এরচেয়ে আরেকটু ভাল কোয়ালিটির শাড়ি হবে?’ শাড়ির দোকানের ম্যানেজার তার চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। হেসে বলল, ‘নিশ্চয়ই হবে! এ্যাই মাসুম, একপিস স্পেশাল আইটেম বের কর তো!’ মাসুম নামের সেলস ম্যানটি দ্রুত পেছন থেকে একটা শাড়ি নিয়ে এল। ম্যানেজার সোহেল দম্পতির দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘এই কোয়ালিটি মার্কেটের কোথাও পাবেন না। স্পেশাল আইটেম। মাত্র দশ পিস এনেছিলাম। এটাসহ তিন পিস আছে।’ ম্যানেজারের কথা শুনে আনন্দে উজ্জ¦ল হয়ে গেল মিসেস মাহমুদা সোহেলের মুখমণ্ডল। আহসান সোহেল জানতে চাইলেন, ‘প্রাইস হাও মাচ?’ ম্যানেজার জবাবে বললেন, ‘দুই লাখ বিশ হাজার’। ব্যাস হয়ে গেল কেনা। টুকটুকি ছোট, তাই ওর তেমন কোন চাহিদা নেই। বাবা-মা ও বোনেরা যা কিনে দিচ্ছেন তাই নিয়ে বেশ আছে মেয়েটি। এখনও বয়স দুই বছর হয়নি। তাই ভাল করে কথাও বলতে পারছে না। তবে এনজয় করছে। মিলি ও লিলি তো রীতিমতো প্রতিযোগগিতা করে কেনাকাটা করছে।
রাত সাড়ে আটটায় নামাজ শুরু হয়ে দশটার দিকে শেষ হয় আল হামরা শপিং সিটির মসজিদে। এখানে নিয়মিত নামাজ পড়তে আসেন আশিক আকবর। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সদ্য পাস করে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। এখনও ‘বাপ-ভাই’ হোটেলের গ্রাহক! নামাজ থেকে বের হয়ে মার্কেট ঘুরে যাওয়ার সময় একটি পাঞ্জাবির দিকে চোখ আটকে গেল তার। ধীর পায়ে দোকানে প্রবেশ করলেন। পকেটে টিউশনি করে পাওয়া দুই হাজার টাকা রয়েছে, মনে মনে স্মরণ করে নিলেন। এই মার্কেটে সবকিছুরই দাম বেশি জানেন তিনি। তো তার পছন্দের পাঞ্জাবিটা ভাল করে দেখার আগে এর গায়ে সেঁটে দেয়া মূল্য নির্দেশক টোকেনটির দিকে নজর বুলালেন। শরীরের লোম খাড়া হয়ে গেল দ্রুত। কাঁপুনি বন্ধ রাখলেন কোন মতে। দোকানি জানতে চাইল, ‘ভাই পছন্দ হয়েছে?’ আশিক সাহেব ঢোক গিলে বললেন, ‘না, ঠিক পছন্দ হলো না! আরেকটু দেখি!’ মাত্র বারো হাজার তিনশত পঁচান্নব্বই টাকা দামের ওই পাঞ্জাবিটা তাঁর পছন্দ হয়নি ভেবে দোকানি তাঁকে চাপাচাপি করতে লাগলেন। ‘ভাই এই নিন, এটা দেখেন, নতুন ডিজাইন’ ইত্যাদি বলেই যাচ্ছেন দোকানি। আশিক আকবর বের হয়ে গেলেন দ্রুত পায়ে। মনে মনে ভাবলেন, ‘তেরো হাজার টাকা কোনদিন পকেটে থাকলেও এমন পাঞ্জাবী না কিনে ২৬ জন গরিব মানুষকে ভাগ করে দেব’। তাতে তারা প্রত্যেকে পাঁচশ’ টাকার মধ্যে অন্তত একটি করে নতুন জামা কিনতে পারবে।’
আল হামরা শপিং সিটির সামনে বিপরীত দিকের ফুটপাতে জুতো পালিশের বাক্স নিয়ে বসে আছে বাচ্চু মিয়া। সন্ধ্যার পর থেকে এই পর্যন্ত এখনও কোন কাস্টমারের দেখা মেলেনি। ঈদের আর মাত্র দু’দিন বাকি। বউকে একটা শাড়ি কিনে দেওয়ার বড় শখ বাচ্চু মিয়ার। শেফালি অবশ্য যে বাসায় কাজ করে ওই বাসা থেকে দু-একটি পুরাতন কাপড় পায় প্রতিবছরই। তবুও নিজের রোজগারের টাকা দিয়ে বউয়ের জন্য একটি শাড়ি কেনায় যে কত আনন্দ! বাচ্চু মিয়ার ধ্যান ভেঙ্গে সেখানে এসে দাঁড়ালেন একজন স্কুল মাস্টার। আব্দুল আজিজ সাহেব আজকেই স্কুল থেকে বেতন আর ঈদ বোনাসটা উঠালেন। হিসাব নিকাশ করে দেখেছেন পরিবারের সবার ঈদের জামা জুতো কিনে দেওয়ার পর যে টাকা হাতে থাকবে ওটা দিয়ে কোন মতেই সেপ্টেম্বর মাস চলবে না। তাই বড্ড চিন্তায় আছেন তিনি। হাঁটছিলেন রাস্তা দিয়ে। ফুটপাত থেকে কম দামে কাপড় কিনে যদি কিছু টাকা বাঁচানো যায়! হঠাৎই টের পেলেন পায়ের স্যান্ডেলটা ছিঁড়ে গেছে। এক হাতে ছেঁড়া স্যান্ডেলটা হাতে নিয়ে তাই এসে দাঁড়ালেন বাচ্চু মুচির সামনে। ‘সেলাই করে তলা লাগিয়ে পালিশ করে দেব, একদাম পঞ্চাশ টাকা পড়বে।’ বলল বাচ্চু মিয়া। আজিজ সাহেব বাধা দিয়ে বললেন, ‘না না, এত কিছুর দরকার নেই। শুধুমাত্র ছেঁড়া অংশটি সেলাই করে দাও দেখি!’ বাচ্চু মিয়া নাছোড় বান্দা, ‘তাই দিলে হয় নাকি! ঈদের দিন বলে কথা। একদম নতুনের মতো করে নেন। ঠিক আছে চল্লিশ ট্যাকাই দেন।’ আজিজ সাহেব আর কথা বাড়ালেন না। পরিচিত বন্ধু-বান্ধবদের কেউ দেখে ফেলতে পারে!
‘মা, বাবা কখন আমার নতুন জামা নিয়ে আসবে?’ একটি কথাই বারবার বলে যাচ্ছে বাবলু। বাবলুর মা কোন জবাব দিতে পারছে না। নিজে বড়লোকের বাসায় কাজ করেও একমাত্র ছেলের জন্য একটা জামা কেনার পয়সা যোগাড় করতে পারেনি। বস্তিতে ঘর ভাড়া করে থাকে তারা। শিল্পপতি আহসান সোহেলের বাড়িতে কাজ করে কুলসুম। মাসে তিনশ পঞ্চাশ টাকা পায়। ঈদ উপলক্ষে বাড়তি কোন টাকা দিল না ওরা। বাবলুর বাবা ভ্যান গাড়ি চালিয়ে চার হাজার টাকা পায়। ওতেই তাদের সংসার চলে। কিন্তু এ মাসে তার বেতনের অর্ধেক পেয়েছে লাল মিয়া। মালিকের ব্যবসা ভাল চলছে না তাই ঈদে সবাইকে হাফ বেতন দেয়া হচ্ছে! লাল মিয়া তার বউয়ের টাকা সাধারণত সংসারের খরচে লাগাতে দেয় না। কিন্তু এ মাসে উপায় না থাকায় বউয়ের টাকাটাও চলে গেল। ঘর ভাড়া, চাল-ডাল আর তরি তরকারি ঠিক মতো খেতে পারে না তারা। কোন মতে দু’বেলা দু’মুঠো ভাত তাদের পেটে পড়ে! এ অবস্থায় ঈদের দিনে কে কী পরবে তা নিয়ে তাদের কোন মাথা ব্যথা নেই। এমন কি ‘ঈদ’ জিনিসটা যে কী সেটাই তারা বুঝতে পারেনি। কিন্তু চার বছর বয়সের এই ছেলেটি এবার জিদ করে বসে আছে জামা কিনবে। বস্তির সকল ছেলেমেয়েই ঈদের দিনে নাকি নতুন জামা পরে বের হবে। বাবলু তাই তার বাবাকে একটা সুন্দর জামা কিনে দিতে বলল। লাল মিয়ারও খুব ইচ্ছে করছে ছেলেকে একটা টুকটুকে লাল জামা কিনে দিতে। কিন্তু দেড় থেকে দুইশ’ টাকার কমে কোন জামাই পাওয়া যাচ্ছে না। কোন মতে একশ’ টাকা যোগাড় করেছে লাল মিয়া। ফুটপাতে ফুটপাতে ঘুরে বেড়াচ্ছে। ঈদের চাঁদ দেখা গেছে সন্ধ্যায়। কাল ঈদ হবেই। এখন জামা না নিয়ে ঘরে ফেরা যাবে না। হাঁটতে হাঁটতে কখন যে ভোর হয়ে গেছে খেয়ালই করেনি লাল মিয়া। হঠাৎ মাইকে ‘ঈদ মোবারক’ ঘোষণা শুনে চমকে উঠল লাল মিয়া। ছেলেটা তার পথ চেয়ে বসে আছে! আর দেরি করা যাবে না। লাল মিয়া ফুটপাতের দোকান থেকে একটি জামা কেনার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চালাতে লাগলো। দোকানদার কোন অবস্থাতেই একশ’ বিশ টাকার কমে দিতে চাইছে না। লাল মিয়া অনুরোধ করলো। বলল সে পরে বিশটা টাকা দিয়ে যাবে। অনেক অনুনয় বিনয় করার পর লাল মিয়ার বস্তির ঠিকানা লিখে রেখে নগদ একশ’ টাকা আর বাকিতে বিশ টাকায় একটি লাল জামা দিয়ে দিল দোকানি। আনন্দে চোখে জল এসে গেল লাল মিয়ার। সে তার ছেলেকে একটি লাল টুকটুকে জামা কিনে দেবে বলেছিল! বস্তির দিকে ছুটে চলছে লাল মিয়া।
ওদিকে তার ছেলে বাবলু রাত্রে কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে পড়েছিল। সকালে ঘুম ভাঙতেই দেখে বাবার হাতে লাল টুকটুকে একটি জামা। লাফিয়ে উঠে ধেই ধেই করে নাচতে শুরু করলো বাবলু। বাবলুর এই আনন্দ দেখে লাল মিয়ার চোখ দিয়ে আবারও গড়িয়ে পড়ল দু’ফোটা অশ্রু!
ঐতিহাসিক শাহী ঈদগাহ ময়দানে সকাল নয়টায় আরম্ভ হলো ঈদের জামাত। নগরের বিশিষ্ট শিল্পপতি আহসান সোহেল ঈদগাহ মাঠের পেছন দিকে মখমলের জায়নামাজ বিছিয়ে বসে আসেন। মুগ্ধ হয়ে শুনছেন হুজুরের বয়ান। তার ঠিক বামপাশে বসেছে বাচ্চু মিয়া। জায়নামাজ বা চাটাই নেই। ঈদগাহ কর্তৃপক্ষের বস্তার চটেই বসেছে সে। পরনে একটি হাফ হাতা সার্ট আর ছেঁড়া লুঙ্গি। মাথার টুপিটা দেখলে মনে হয় বুঝি বাচ্চু মিয়ার বয়সের চেয়ে টুপির বয়সই বেশি! সোহেল সাহেবের ঠিক ডান পাশে কাকতালীয়ভাবে সিট পড়েছে মাস্টার আব্দুল আজিজের। পুরনো একটা পাঞ্জাবি ইস্ত্রি করে পরেছেন। একদম নতুনের মতো লাগছে। তাদের পিছনের সারিতে বসে আছেন বেকার যুবক আশিক আকবর। পরনে একটা নতুন পাঞ্জাবি। মাত্র দু’শ পঞ্চাশ দিয়ে কেনা মণিপুরি দোকান থেকে। তবে দেখতে ওটা আহসান সোহেলের গায়ের পাঞ্জাবির চেয়ে খুব একটা খারাপ মনে হচ্ছে না! আশিক আকবরের ডান পাশে বসা এক লুঙ্গি পরা লোক। গায়ে একটি পুরনো ফতুয়া। লোকটির সঙ্গে এসেছে ছোট্ট একটি ছেলে, গায়ে লাল টুকটুকে এক জামা। ছেলেটি সবার মতো নীরবে বসে না থেকে এ দিক ওদিক নড়াচড়া করছে। হঠাৎ সামনের সারিতে বসে থাকা আহসান সোহেলের পিঠের উপর হাত রেখে দাঁড়িয়ে পড়ল ছেলেটি। বিরক্ত হয়ে ঘাড় ফেরালেন সোহেল সাহেব। ছেলেটি মিষ্টি করে হাসছে। বলল, ‘ও চাচা, বাবা আমাকে লাল টুকটুকে জামা কিনে দিয়েছে, তুমি কি তোমার বাবুকে কিনে দিয়েছো? কোথায় তোমার বাবু? ও কি ঈদের নামাজে আসবে না?’
লাল মিয়া দ্রুত ছেলেকে সরিয়ে আনলেন। আর আহসান সোহেল ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকলেন ছেলেটির দিকে।

SHARE

Leave a Reply