Home নাটিকা কাজের ছেলে

কাজের ছেলে

মোস্তফা রুহুল কুদ্দুস

চ রি ত্র  লি পি

সফি         : কাজের ছেলে। পরে কৃতী ছাত্র
খন্দকার      : স্কুল কমিটির সভাপতি
সুমন         : খন্দকারের একমাত্র পুত্র
মহাসীন      : আদর্শ শিক্ষক
প্রধান শিক্ষক : নামেই পরিচয়
মামুন         : সহকারী শিক্ষক
রাহাত        : খন্দকারের শ্যালক, অযোগ্য শিক্ষক
রাজু          : ছাত্র। সফির সহপাঠী
রিপন         : ছাত্র। সফির সহপাঠী
শিমুল         : ছাত্র। সফির সহপাঠী
সবুজ         : ছাত্র। সফির সহপাঠী
খণ্ড চরিত্র     : দু’ পুলিশ ও কয়েক জন ছাত্র

প্রথম দৃশ্য
[খন্দকার বাড়ি। সামনে গাছগাছালী বগান। রাজু আর রিপন গুলতি নিয়ে প্রবেশ করে বাগানে]
রাজু : নাহ, দিনটাই মাটি হয়ে গেল।  সারাগ্রাম তন্নতন্ন করে একটা দোয়েল শ্যামারও দেখা পেলাম না।
রিপন : জানিস রাজু, আজ খালি হাতে বাড়ি গেলে আমাকে নির্ঘাত শাস্তি পেতে হবে। আব্বু যা কড়া, একটু চোখের আড়াল হতে দেবেন না। পাখি শিকারের কথা বলে কোনো রকম ছুটিটা মঞ্জুর করেছি।
রাজু : আর আমার আম্মু কোনো মতেই বাইরে আসতে দেবেন না। কি ভাবে এলাম জানিস? আম্মু তখন রান্না ঘরে হাঁড়ি-পাতিল নিয়ে ব্যস্ত। এই সুযোগে গুলতিটা নিয়ে ভোঁ-দৌড়।
রিপন : (ভালো করে খোঁজ করে) চুপ কর রাজু। ওই দেখ পাকুড়ের ডালে একটা ঘুঘু বসে আছে। (উভয়ে ভালো করে দেখে গুলতিটা নিয়ে প্রস্তুতি নেয়। এ সময় একটা বালতি হাতে করে খন্দকার বাড়ির কাজের ছেলে সফির প্র্রবেশ। বালতিটা রেখে পাখি মারা দেখে ও কিন্তু মিস হয়ে যায় ওদের নিরিখ। মুখ খোলে সফি)
সফি : (উপহাসের সুরে) অ্যাহ হাতে নিরিখ নেই আবার পাখি মারতে এসেছে।
রাজু : (পা থেকে মাথা পর্যন্ত দেখে নিয়ে) কে?
সফি : তোমাদের বাবা। (জবাব শুনে দুজনেই থমকে দাঁড়ায়। কিছুুুুক্ষণ চুপ থাকার পর ধমকে ওঠে রিপন)
রিপন : এই খোকা, জানিস, আমরা কারা?
সফি : খুউব জানি, হারু পার্টি।
রিপন : মানে?
সফি : একদম সোজা। যারা সব কাজে হেরে যায়, সারাদিন গুলতি নিয়ে টো-টো করে একটা পাখিও মারতে পারে, তারপর বাড়ি যেয়ে বাপের কান মলা খায়।
রাজুু : তুমি বুঝি খুউব পারো?
সফি : পাখি মারা একদম সোজা। যত দূরেই হোক সফির নিরিখ মিস্ যায় না ।
রাজু : বেশ, এই নাও গুলতিটা। এবার যোগ্যতার বহর হাতে নাতে দেখিয়ে দাও দোস্ত। কিন্তু ভুলে যেওনা, নিরিখ মিস হলে রাজু তোমাকে রেহাই দেবে না। (গুলতি নিয়ে সফি কিছুক্ষণ খোঁজাখুজি করে ছোড়ে। সাথে সাথে একটা পাখি এসে পড়ে। রিপন ছুটে গিয়ে পাখিটা নিয়ে আসে। সফি আরো পাখি খোঁজো।)
রিপন : সত্যিতো! (রিপন বিস্ময়ে মুখ চাওয়া-চাওয়ি করে)
রাজু : ছেলেটা নিশ্চয় পাকা শিকারী। (সফিকে) এই খোকা, তোমার বাড়ি কোথায়? (উত্তর দেবার আগেই আরো একটা পাখি মারে। রিপন পাখিটা নিয়ে আসে।)
সফি : (রাজুকে গুলতিটা ফেরত দিয়ে) এই নাও।
রাজু : তোমার পরিচয় কী খোকা?
সফি : কাজের ছেলে।
রাজু : সে তো বুঝতেই পারছি। তুমি সত্যি সত্যিই কাজের ছেলে। কিন্তু ওসব না। তুমি কোথায় থাক?
সফি : ওই যে, দালান বাড়ি দেখছোÑ সবাই বলে খন্দকার বাড়ি, ওই বাড়িতে কাজ করি।
রিপন : তুমি আমাদের বন্ধু হবে?
সফি : কাজের ছেলেরা বন্ধু হতে পারে? ওই দেখ বালতি নিয়ে বেরিয়েছি। সারাদিন পানি টানতে হবে। তারপর বাজার করা, থালা-বাসন মাজা, ঘর পরিষ্কার করা। কতো কাজ তার হিসেব আছে?
রাজু : ও হ্যাঁ, কথায় কথায় তোমার নামটাই ভুলে গেছি।
সফি : সফি।
রিপন : এবার থেকে তোমাকে সফি ভাই বলে ডাকবো।
সফি : তোমরা বড় বাড়ির ছেলে। নাম ধরে ডাকলে চলবে। (বাইরে থেকে ডাকতে ডাকতে খন্দকারের প্রবেশ।)
খন্দকার : সফি, এই সফি, এখানে কেন? বেলা দুপুর হতে চললো। এখনো একটা গাছেও পানি দেয়া হয়নি। এতক্ষণ কি করছিলি? ও-ছেলেদের সাথে আড্ডা দেয়া হচ্ছিল?
সফি : সকলে বাজার থেকে এসে অনেক কাজ করেছি। পানি দিতে এলাম এইমাত্র।
খন্দকার : অতো কাজের ফিরিস্তি আমাকে শোনাতে হবে না। বলি চামেলি গাছটা আউরে গেছে ফলে।
সফি : বড্ড রোদ পেয়েছে কিনা।
খন্দকার : রোদ না তোর মাথা। অমনভাবে আড্ডা দিলে একটা গাছও বেঁচে থাকবে না। যা বের হ এখান থেকে। (বালতি নিয়ে সফির প্রস্থান) ছোট লোকদের নিয়ে জ্বলে পুড়ে মরলাম।
রাজু : খুব ভালো ছেলে। মিনিটে দু-দুটো পাখি মেরেছে। একটা গুলিও মিস্ যায়নি।
খন্দকার : এতক্ষণ তাহলে পাখি শিকার করছিলো! বেশ, উচিত শিক্ষাই ওকে দেবো। তোমাদের বলছি, এই বাগানে আর কখনো ঢুকবে না। মনে রেখো, এটা খন্দকারের পারিবারিক বাগান। পাখি শিকারের জায়গা নয়। (খন্দকারের প্রস্থান। দৃশ্যান্তর।)

দ্বিতীয় দৃশ্য
[খন্দকারের একমাত্র ছেলে সুমন গৃৃহ শিক্ষক মহাসীনের কাছে বই পড়ছে। পাশেই ইট বহন করছে সফি]

মহাসীন : বিড়াল দুটি বানরকে কেন ডাকলো?
সুমন : পিঠা ভাগ করার জন্যে।
মহাসীন : বানর কী করল?
সুমন : একটু একটু করে সব পিঠাই খেয়ে নিলো। আচ্ছা স্যার, বানরটা খুুুব বুদ্ধিমান, তাই না?
মহাসীন : বুদ্ধির জোরেইতো পরের পিঠায় পেট ভরে নিলো।
সুমন : (উপহাসের সুরে) অ্যাহ- বুদ্ধির হাঁড়ি দেখছি। অমন বুদ্ধি আমারও আছে। হাঁড়িতে মাছ গোশত থাকলে কেউ তাতে ভাগ বসাতে পারে না।
মহাসিন : না, না অমন কাজ কক্ষনো করো না। কারো ফাঁকি দিলে নিজেই ফাঁকিতে পড়তে হয়।
সুমন : আপনিই তো বললেন, বানরটা খুব বুদ্ধিমান। বলতে বলতে কথাটা ভুলে গেলেন। আপনি দেখছি বিড়ালের চেয়েও বোকা। (ইটের বোঝা নিয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ে যায় সফি। দেখে সুমন তালি বাজিয়ে মজা করে।)
সুমন : বাঃ, বাঃ কী মজা, কী মজা!
মহাসীন : ছিঃ, ছিঃ কারো কষ্টে হাসতে নেই। (সফিকে তুলতে তুলতে) খুব ব্যথা পেয়েছ বুঝি?
সফি : গরিবের আবার ব্যথা আছে? কষ্ট করতে করতে সব সয়ে গেছে। আপনি ভাববেন না স্যার। সত্যি বলছি, আমার কিছুই হয়নি।
সুমন : স্যার, দারুণ দেখাচ্ছিল তাই না? একদম সিনেমার নায়কের মতো। ক্যামেরা থাকলে সুন্দর একটা ছবি নেয়া যেতো।
মহাসিন : সফি আমাদের মতই রক্ত-মাংসে গড়া মানুষ। ওর দুঃখে সকলকে দুঃখ পাওয়া উচিত।
সুমন : আপনি দেখছি কিছুই জানেন না। কে বলেছে ‘ও’ মানুষ। ওতো খন্দকার বাড়ির কাজের ছেলে। (দেয়াল ঘড়িতে ঢং, ঢং করে নয়টা বাজে। প্রবেশ করে খন্দকার)
খন্দকার : মাস্টার সাহেব, স্কুলের সময় হয়েছে। এবার সুমনকে ছেড়ে দিন।
সুমন : আব্বু, আমি আর স্যারের কাছে পড়বো না। স্যার কিছু জানে না।
খন্দকার : বেশ। এবার আম্মুর কাছ থেকে স্কুলের জন্যে তৈরি হয়ে এসো। (সুমনের প্রস্থান। সফি খোড়াতে খোড়াতে হট বহনের চেষ্টা করে।)
খন্দকার : কিরে, খোড়াচ্ছিস কেন?
সফি : ইট নিয়ে পড়ে গেছি স্যার।
খন্দকার : কঠিন কাজ দেখলে অমন অসুবিধা সবারই হয়। ওসব ভনিতা আমার কাছে চলবে না। শুনি, ইট বওয়ার কাজ শেষ হয়েছে?
সফি : না।
খন্দকার : মাত্র দু’হাজার ইট এখনো বওয়া হয়নি? (সফি মাথা নিচু করে দাঁড়ায়)
খন্দকার : এতক্ষণ কী করছিলি? বাজার করেছিস?
সফি : জে।
খন্দকার : পানি তোলার কাজ?
সফি : করেছি।
খন্দকার : এবার হাত-পা ধুয়ে সুমনকে স্কুলে দিয়ে আয়। বাকি কাজ এসে করবি। (সফির প্রস্থান।)
মহাসীন : ছেলেটা পড়ে যেয়ে সত্যিই ব্যথা পেয়েছে।
খন্দকার : ও কথা দ্বিতীয় বার বলবেন না। মনে রাখবেন, কুকুরকে আদর দিলে গা’র ওপর ওঠে। ওরা ছোটলোক। ওদের সাথে মিষ্টি কথা বললে আপনাকে পেয়ে বসবে। (সুমনের প্রবেশ। পেছনে বইয়ের বাক্স নিয়ে সফি)
সুমন  : আব্বু টাকা দাও।
খন্দকার : এই নাও। (টাকা দিয়ে) খবরদার, আমাকে আজও যেন স্কুলে যেতে হয় না।
সুমন : না, না, না। এই কান ধরে বলছি, আর কারো সাথে ঝগড়া করব না। (সফি বই-এর বাক্স নিয়ে আগে আগে যায়। পিছনে সুমন)
খন্দকার : হ্যাঁ, যা বলছিলাম, সুমন যেন আপনার ওপর দারুণভাবে ক্ষেপে গেছে। শোনেন, ও হচ্ছে খন্দকার বাড়ির একমাত্র ছেলে। সকলের আদর-যতেœ বড় হয়ে উঠেছে। সুতরাং ওর সাথে এমন কথা বলবেন না, যাতে মনে ব্যথা পায়।

তৃতীয় দৃশ্য
[স্কুলের মাঠ। ক্লাস শুরুর পূর্ব মুহূর্তে ছেলেদের ইতস্ততঃ বিক্ষিপ্ত ঘোরাফেরা। কেউ আসে, কেউ যায়। রাজু রিপন বাদাম খায় আর গল্প করে।]

রাজু : বাদাম খেয়ে মজা পেলাম না। মসলা হলে বেশ লাগত।
রিপন : রাখ তোর মসলা। আজকাল কোনো কিছুই আসল পাবার জো নেই। শুধু ভেজাল।
রাজু : সব জিনিসে ভেজাল চলে নাকি?
রিপন : তুই কাল অঙ্কের পিরিয়ডে নিশ্চয় বাইরে ছিলি। স্যার কত সুন্দর করে বোঝালেন জানিস? এক সের দুধে আধাসের পানি দিলে দু’টাকা লাভ হয়। ভুলে গেছিস অঙ্কটা, তাই না?
রাজু : তাহলে তুই বলতে চাস্ যারা লেখাপড়া জানে তাদের মধ্যেই ভেজাল রয়েছে?
রিপন : অনেকটা তাই। দেখিস না, কেউ আইএ, বিএ পাস করেও অনেক কিছু জানে না। অর্থাৎ, ওই না পারাদের মধ্যে ভেজাল রয়েছে। শুধু বড় বড় সার্টিফিকেট থাকলেই শিক্ষিত হওয়া যায় না, বুঝলি?
রাজু : (দূরে দেখিয়ে) এই রিপন, দেখ, দেখ আমাদের সফি ভাই আসছে না?
রিপন : (ভালো করে দেখে) হ্যাঁ, হ্যাঁ ঠিক দেখেছিস।
রাজুু : দারুণ ছেলে! দু পাঁচ গ্রামে ওর জুড়ি মেলাই ভার। (সফি ও সুমনের প্রবেশ) কেমন আছো সফি ভাই?
সফি : ভালো, তোমরা?
রাজু : কোনো রকম কেটে যাচ্ছে। তা অনেক দিন দেখা হয়নি। শিকার টিকার কেমন করছ?
সফি : কী যে বলো।
(সুমন খানিকটা অবাক হয়ে ওদের কথা শুনবে)
রাজু : জানিস সুমন, সাফি আমাদের বন্ধু হয়। খুব ভালো ছেলে। তোদের বাড়ি কাজ করে বুঝি?
সুমন : তোরা একটা বাজে ছেলে। আব্বু বলেন, ওরা ছোটলোক। ওদের সাথে মিশলে লোকে খারাপ বলে।
রাজু : আমরা আর মিশলাম কই? তোরাতো সফি ছাড়া এক পাও চলতে পারিসনে। বাড়ি থেকে স্কুলে আসবি তাও সফি। (সফিকে) সফি ভাই, এই নাও, তোমার পুরস্কার।
সফি : পুরস্কার! (রাজু প্রথমে সফি ও পরে সুমনকে বাদাম দেয়)
রাজু : সেদিনের কথা ভুলে গেলে! জানো, পাখি দুটো নিয়ে বাড়িতে গেলে আম্মু খুশিতে বাগ বাগ। এবার কিন্তু গরমের ছুটিতে পাকুড়ের বিলে যেতে হবে।
সফি : কাজের ছেলেদের আবার ছুটি আছে নাকি?
রিপন : সফি ভাই, তোমার ইচ্ছে হয় না আমাদের মত লেখাপড়া শিখে বড় হতে?
সফি : (দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে) খুউব ইচ্ছে হয়। কিন্তু হলেইবা কী। ওসব কি আর আমাদের জন্যে।
রিপন : কী যে বলো! আচ্ছা সফি ভাই, তুমি নকল পছন্দ করো? মানে যারা নকল করে পাস করে তাদের?
সফি : (অবাক হয়ে) নকল! সেকি ভাইয়া?
সুমন : বোকা কোথাকার। নকল কাকে বলে তাও জানে না।
সফি : নকল! (ভেবে নিয়ে) বুঝেছি, বুঝেছি। নকল মানে বড় বড় রসোগোল্লা। ওই যে তোমরা প্রতিদিন সকালে নাস্তা কর। নকল খুব মিষ্টি তাই না ভাইয়া?
সুমন : রসোগোল্লা না তোর মাথা। দু’বছর খন্দকার বাড়ি খেয়ে খেয়ে শুধু ঢ্যাবা হয়েছিস। ‘নকল’ মানুষ না গরু তাও জানিসনে।
সফি : তাহলে নকল মানুষ না বড় বড় শিংঅলা গরু। প্রতিদিন দশ কেজি দুধ দেয়। (স্কুলের ঘণ্টা পড়ে)
রিপন : থাক থাক আর নকল নিয়ে মাথা ঘামাতে হবে না। নকলের কথা ভাবতে গিয়েইতো লেখাপড়ার বারোটা বাজলো।
রাজু : তোরা একটা ছোট্ট কথা নিয়ে কী শুরু করলি। নকল কাকে বলে তা সফি জানবে কিভাবে। ওকি ছাত্র না শিক্ষক। ঘণ্টা পড়েছে। এক্ষুনি লাইনে দাঁড়াতে হবে। চল।
রিপন : আমরা চলি সফি ভাই। তোমার কিন্তু পাখি শিকারের দাওয়াত রইলো।
(প্রস্থান। দৃশান্তর)

চতুর্থ দৃশ্য
[রাস্তার ওপর একজন ছিনতাইকারী। হাতে লাঠি। মুখে হক মাওলা । এ সময় একজন পথচারী আসলে পথ আগলে ধরে। তারপর ভালো মানুষ সেজে পকেটের সব টাকা বের করে গুনে দেখে নিজের পোটলার মধ্যে রেখে দেয়। এরপর একই প্রক্রিয়ায় হাতের আংটি ঘড়ি হাতিয়ে নেয়]

ছিনতাইকারী : আল্লাহর রহমতে ইনকাম ভালোই হলো। (হিসেব করে) কম করে হলেও ৫ হাজার টাকার মালামাল হবে। এ দিয়ে দান খয়রাত করে যা থাকবে তাতে দিনটা ভালোই কাটবে। (দূরে একজন লোককে দেখতে পেয়ে) আসুন আসুন-(বাজার করা প্যাকেট নিয়ে সফির প্রবেশ। ছিনতাইকারী যা বলে সফি নির্ভয়ে আরো দৃঢ় কণ্ঠে তারই প্রতিধ্বনি করে)
ছিনতাইকারী : এই ছেলে কী আছে?
সফি : (পা থেকে মাথা পর্যন্ত দেখে নিয়ে) এই ছেলে কী আছে?
ছিনতাইকারী : (রেগে দাঁত কটমট করে) কী আছে ঝটপট বের কর।
সফি : কী আছে ঝটপট বের কর। (সফি বুদ্ধি খাটিয়ে নিজেকে আরেক দুর্বৃৃৃৃৃৃত্ত প্রমাণের চেষ্টা করে। এক পর্যায়ে পকেটে হাত রেখে অস্ত্র বের করার ভাব দেখায়)
ছিনতাইকারী : ও কী! (ভালো করে পরখ করে) পকেট এমন উঁচু উঁচু দেখা যাচ্ছে কেন? আরে জর্দার কোটো! এই ছেলে পকেটে কী?
সফি : এক মিনিট- (বলেই বের করার ভাব দেখায় এবং ছিনতাইকারীর পথ আগলে ঘেরাও করার অভিনয় করে। ছিনতাইকারী ভড়কে যায় এবং আস্তে আস্তে পিছু হটে ভোঁ-দৌড় দেয়)
সফি : কোথায় যাচ্ছো দোস্ত, নিয়ে যাও, নিয়ে যাও, ঝটপট নিয়ে যাও। (প্রধান শিক্ষকের প্রবেশ)
প্রধান শিক্ষক : (বুকে থাপ্পড় মেরে) সাবাস! সবাস ছেলে। কী নাম তোমার?
সফি : সফি।
প্রধান শিক্ষক : জানো, সকাল থেকে, এখানে কয়েক দফা ছিনতাই হয়েছে। তুমিও সেই ছিনতাইকারীদের কবলে পড়ে গিয়েছিলে। গাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে আমি সব কিছু দেখেছি। তোমার বুদ্ধির তারিফ না করে পারা যায় না। দেখি, প্যাকেটে কী আছে।
সফি : কিছ্ইু না। প্যাকেট নিয়ে বাজারে যাচ্ছিলাম।
প্রধান শিক্ষক : সব দেখেছি সফি, সব কিছুই দেখেছি। তুমি লিখতে পড়তে পারো?
সফি : না।
প্রধান শিক্ষক : তোমার জন্যে পরের প্যাকেট বওয়া সাজে না। তুমি বড় হবে বাবা, অনেক বড় হবে। চল স্কুল পর্যন্ত একসাথে যাওযা যাক।
(উভয়ের প্রস্থান)

পঞ্চম দৃশ্য
[সুমনের পড়ার ঘরে সফি একাকি বই ওলট-পালট করছে আর সুর করে করে বলছে, সকালে উঠিয়া আমি মনে মনে বলি, সারা দিন আমি যেন ভালো হয়ে চলি। এমন সময়ে খন্দকারের প্রবেশ]

খন্দকার : (উপহাস ছলে) বাঃ, বাঃ, কত সুন্দর কথা- ‘সারাদিন আমি যেন ভালো হয়ে চলি’ (কান ধরে টেনে তুলে) এই নবাবের বাচ্চা, কী হচ্ছে এখানে?
সফি : আমার একটা বই কিনে দেবেন?
খন্দকার : বই! (হেসে) বই দিয়ে কী হবে স্যার?
সফি : পড়বো।
খন্দকার : বামুন হয়ে চাঁদ ধরার সাধ! সকাল হয়েছে কখন? এক্ষুনি আমাকে বাইরে যেতে হবে। শুনি, গোসলের জন্যে পানি তোলা হয়েছে?
সফি : না।
খন্দকার : তাহলে কাজ রেখে বিদ্যাচর্চা করা হচ্ছে ? যা বের হ এখান থেকে।
সফি : কিন্তু আমার বই?
খন্দকার : বই! (গালে চড় বসিয়ে) এ দুঃসাহস তোকে কে দিয়েছে? (গৃহশিক্ষকের প্রবেশ। সফি কাঁদে) শুনেছেন মাস্টার সাহেব, সফি নাকি বই পড়বে।
সফি : বই আমার খুউব ভালো লাগে, স্যার। কিন্তু…
খন্দকার : চোপ বেয়াদপ। ফের কথা বললে হাড্ডি-মাংস এক করে দেব। এতদিন দেখছি দুধকলা দিয়ে কালসাপ পুষেছি।
মহসিন : থাক, খন্দকার সাহেব। ছেলে-ছোকরাদের কথায় অমন রাগলে চলে?
খন্দকার : কথায় তো আর ছোট নয়। এমদম নবাবের বাচ্চা।
মহাসীন : ওর বয়সী ছেলেরা যখন বই-খাতা নিয়ে স্কুলে যায় ও তখন দু’মুঠো ভাতের জন্য কঠোর পরিশ্র্র্র্রম করে। বলুন, এ অবস্থা থেকে কে না মুক্তি চায়? ওর কি ইচ্ছে হয় না লেখাপড়া শিখতে? মানুষের মত মানুষ হতে?
খন্দকার : ওসব রাজনৈতিক বক্তৃতা বাদ দেন মাস্টার সাহেব।
মহসীন : এটাকে আপনি রাজনীতি বলছেন? ভাত-কাপড়ের মতো শিক্ষা গ্রহণের অধিকার প্রতিটি মানুষের রয়েছে।
খন্দকার : মাস্টার সাহেব, সফি হচ্ছে খন্দকার বাড়ির কাজের ছেলে। তাকে কিছু বলা না বলা আমার সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত ব্যাপার। সুতরাং কিছু বলতে হলে হিসেব নিকেশ করে বলবেন।
মহাসীন : অর্থাৎ সত্যি কথা খন্দকার বাড়িতে চলবে না, এইতো?
খন্দকার : আপনি কার সামনে কথা বলছেন জানেন?
মহাসিন : নিশ্চয়ই। কল্যাণদাহ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি খন্দকার মোহাম্মদ তোফাজ্জলের সামনে।
খন্দকার : শুধু সভাপতি নয়। বিদ্যালয়ের প্রতিটা ইটের সাথে মিশে আছে খন্দকারের গা ঘামানো অর্থ। তাছাড়া ভুলে যাবেন না, এক ঘণ্টার জন্যে হলেও আপনি আমার কেনা গোলাম।
মহাসীন : গোলাম! সুমনকে প্রাইভেট পড়াই বলে আপনি আমাকে কিনে নিয়েছেন? এত ছোটলোক আপনি? বেশ, আপনিও মনে রাখবেন, খন্দকার বাড়ির ভাত না হলে কেউ না খেয়ে মরে যাবে না। সফি, চলে এসো আমার সাথে। আজ থেকে তোমার যাবতীয় দায়-দায়িত্ব আমি নিলাম। (সফিকে নিয়ে প্রস্থানোদ্যত। সফি ইতস্ততঃ করবে)
খন্দকার : (পথ আগলে ধরে) কোথায় নিয়ে যাবেন? সফি দু’বছর ধরে খন্দকার বাড়ির যে কাপ-পিরিচ ভেঙেছে, যে চাল চুরি করে জামা-কাপড় বানিয়েছে তার দাম দিয়ে যান।
মহাসিন : (হাতের ঘড়ি খুলে দিয়ে) এই নিন। হাজার টাকার ঘড়ি দিয়ে সফিকে কিনে নিযে গেলাম। চলে এসো সফি। (সফিকে নিয়ে প্রস্থান)
খন্দকার : (কটাক্ষ করে) হ্যাঁ, হ্যাঁ, হ্যাঁ পানিতে বাস করে কুমিরের সাথে শত্র“তা। কাজটা ভালো করলেন না মাস্টার সাহেব।

৬ষ্ঠ দৃশ্য
[প্রধান শিক্ষকের কক্ষ। মাস্টার মহাসীন এসছেন সফিকে স্কুলে ভর্তি করতে]

প্রধান শিক্ষক : এ ছেলে বড় হবে, অনেক বড়। ওর মধ্যে একটা স্ফুলিঙ্গ লুকিয়ে আছে। আমি একদিনেই তা আঁচ করতে পেরেছি। তা সত্ত্বেও একটা কথা না বললেই নয়Ñ বোলতার চাকে ঢিল মারলে কী হয় জানেন? শেষ পর্যন্ত নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখাই দায় হয়ে পড়ে।
মহাসীন : খন্দকারের লোকেরা সেই বোলতা, এইতো?
প্রধান শিক্ষক : সব কিছু জানা সত্ত্বেও আপনি এমন কাজটি কেন করলেন তা আমি ভাবতে পারছি না।
মহাসীন : তবে কি অন্যায়কে চোখ বুঁজে সহ্য করতে বলেন?
প্রধান শিক্ষক : এখানে চাকরি করতে এসে সেটাইতো আমাদের করতে হচ্ছে। আপনার নিশ্চয়ই জানা আছে খন্দকারের শ্যালক রাহাত সত্তুরে টেনে হিচড়ে ম্যাট্রিক পাস করে। তারপর টাকা দিয়ে ইন্টারমিডিয়েটের সার্টিফিকেট যোগাড় করে দেড় যুগেও কোনো কাজ যোটাতে পারেনি। শেষ পর্যন্ত এ স্কুলেই তাকে চাকরি দিতে হলো। শুধু কি তাই? খন্দকারের মামা, ভাগনে, ভাই, ভাতিজা সবাই এখানে চাকরি করছে। বলুন, এ অবস্থায় আপনি সত্যের জন্যে কী করে মুখ খুলবেন?
মহাসীন : সত্যকে আর কত কালইবা ধামাাচাপা দিয়ে রাখবো?
প্রধান শিক্ষক : যাই বলুন না কেন, কাজটি আপনি ভালো করলেন না, মাস্টার সাহেব। এইযে দোতলা বিল্ডিং, নামী-দামী ফার্নিচার, এসব কার দৌলতে হয়েছে? সবই তো খন্দকার সাহেবের অবদান। তার গা ঘামানো টাকা কল্যাণদহ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রতিটি ইটের সাথে মিশে আছে।
মহাসীন : যা ঘটেছে তা নিয়ে অতো ভেবে লাভ নেই। এবার ভর্তির কাজটা সেরে ফেলুন। (প্রধান শিক্ষক কলিংবেল টিপলে একজন পিয়নের প্রবেশ)
প্রধান শিক্ষক : (পিয়নকে) যাও, ওকে নিমাই বাবুর কাছে নিয়ে ভর্তির ব্যবস্থা করতে বল। (সফিকে নিয়ে পিয়নের প্রস্থান) সত্যি কথা কী জানেন? যে যুগ পড়েছে, তাতে সত্যের ওপর টিকে থাকা আগুনে হাত রাখার চাইতেও কঠিন। (ক্লাসের ঘণ্টা পড়ে)
মহাসিন : যা বলেছেন। ঈমান-আমল রাখাই এখন দায় হয়ে পড়েছে। যাই ক্লাসটা করে আসি। (প্রস্থানোদ্যত)
প্রধান শিক্ষক : হ্যাঁ, জুলাই শেষ হতে চললো। ছেলেদের বেতনের ব্যাপারে তাগিদ দিবেন।
(মাস্টারের প্রস্থান। সবুজ ও শিমুলের প্রবেশ)
সবুজ : আসতে পারি স্যার।
প্রধান শিক্ষক : এসো।
সবুজ : স্যার, এবারের পিকনিকে আমরা যাবো না।
প্রধান শিক্ষক : বার্ষিক পিকনিক। ছাত্র-শিক্ষকদের সাথে ম্যানেজিং কমিটিও এতে অংশ নেবেন। সুতরাং কেউ বাদ থাকতে পারবে না।
সবুজ : পিকনিক আজকাল মারামারি আর ঝগড়া-ফ্যাসাদে পরিণত হয়েছে। আমরা নিজেদের মধ্যে স্বেচ্ছায় তা ঘটাতে চাইনে।
প্রধান শিক্ষক : কী বলতে চাও তোমরা?
শিমুল : গতবার পিকনিকের নামে কী কাণ্ডটাই না ঘটে গেল। কেউ খেল পেট পুরে আর কারো ভাগ্যে দানাপানিও জুটলো না।
সবুজ : শুধু কি তাই? বিরানীর প্যাকেট কারো বাড়ি পর্যন্ত এসেছে।
শিমুল : আমরা যদ্দুর জানি, এজন্যে ছাত্রদের চাইতে স্কুল কর্তৃপক্ষই বেশি দায়ী। তাদের একচেটিয়া আধিপত্যের ফলে কল্যাণদহ মাধ্যমিক বিদ্যালয় আজ ব্যক্তিগত প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে।
প্রধন শিক্ষক : এবার পিকনিকের যাবতীয় দায়-দায়িত্ব আমি নিজের হাতেই রাখবো। আর অমত করো না বাবারা। যাও লেখাপড়া করোগে।
সবুজ : বেশ, আপনার কথার ওপরেই আমরা রাজি হলাম। (প্রস্থানোদ্যত)
প্রধান শিক্ষক : শোনো, এবারের পিকনিক খানিকটা ব্যতিক্রম ধরনের হবে। তোমরা কিন্তু প্রস্তুত হয়ে যেয়ো। (প্রস্থান। দৃশ্যান্তর)

সপ্তম দৃশ্য
[খন্দকারের খাস কামরা। শ্যালক রাহাতের সাথে একান্তে আলাপ করছেন তিনি]

খন্দকার : কিছু আঁচ করতে পারলি রাহাত?
রাহাত : চাকরি দিয়েছেন বছর খানেক। এরমধ্যে যা দেখলাম তাতে লক্ষণ খুব একটা ভালো মনে হচ্ছে না।
খন্দকার : শুনলাম স্কুলের ছেলেরা সমিতি করেছে?
রাহাত : শুধু সমিতি নয়। খন্দকার বাড়ির সেই কাজের ছেলেটাই সমিতির সভাপতি হয়েছে।
খন্দকার : সফি হয়েছে সভাপতি! পরের করুণা ছাড়া যার এক মুহূর্তও চলে না- সেই চালাবে সমিতি! এ স্পর্ধা ওদের কে দিয়েছে?
রাহাত : ক্লাসে ফার্স্ট হবার পর সফি এখন ছাত্র-শিক্ষকদের মাথার মণি। ও ছাড়া যেন কোনো কাজই চলে না।
খন্দকার : জানি, সব কিছুর মূলে ওই মহাসীন মাস্টার। ওর বাড়াবাড়ি সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে গেছে।
রাহাত : ঠিক ধরেছেন দুলাভাই, ঠিক ধরেছেন। ওই একটি মাত্র ব্যক্তিই সফিকে মাথায় তুলেছে।
খন্দকার : থাক ওসব। তোকে যা বলেছিলাম, তা মনে আছেতো?
রাহাত : নিশ্চয়ই।
খন্দকার : সব কিছু রেখে সে কাজটি তোকে আগে করতে হবে। মনে রাখিস, উইপোকার পাখা গজায় মরার জন্যে। খন্দকারের স্কুলে চাকরি করে খন্দকারের সাথে বিরোধিতা করার পরিণতি কত ভয়াবহ তা আমি দেখিয়ে দিতে চাই। (হেসে) এই যে গাড়ি-বাড়ি, সহায়-সম্পত্তি কিভাবে হয়েছে জানিস? বুদ্ধি, বুদ্ধি, সবই বুদ্ধির জোর। বুদ্ধি না থাকলে খন্দকার এত দিন টিকে থাকতে পারতো না। (দৃশ্যান্তর)

অষ্টম দৃশ্য
[স্কুলের রাস্তা। সুমন, সবুজ ও শিমুল স্কুল থেকে বাড়ি ফিরছে আর আলাপ করছে]

সুমন : এই শুনেছিস, সফি কী করেছে?
শিমুল : সমিতির টাকায় বই কিনেছে, এইতো?
সুমন : বই নারে, বউ কিনেছে।
শিমুল : বউ মানে?
সুমন : তাও বুঝলিনে? দু’বছর ধরে সমিতির নামে যে টাকা জমিয়েছে তার একটাও তহবিলে নেই। সবটাই খরচ করেছে ও-পাড়ার চামেলির পিছনে।
সবুজ : আশ্চর্য! যাকে আমরা বিশ্বাস করে নেতা বানালাম, সেই করলো এমন কাজটা?
শিমুল : সফি ভাই তাহলে ডুবে ডুবে পানি খাচ্ছে!
সবুজ : যে যাই বলিস, এটাকে আমি সহজে মানতে পারলাম না। আমার যদ্দুর ধারণা এটা একটা চক্রান্ত।
শিমুল : তাও বা কিভাবে বলি। রাহাত স্যার নিজের চোখে দেখেছেন।
সুমন : তাছাড়া সমিতির একটা টাকাও যখন বেঁচে নেই, তখন অবিশ্বাসের আর কিইবা থাকতে পারে।
সবুজ : সফি ভাই যতো অপরাধই করুক, একটা কথা সকলকে স্বীকার করতেই হবে- বর্তমানে তার মতো ভালো ছেলের জুড়ি মেলাই ভার। (দৃশ্যান্তর)

নবম দৃশ্য
[প্রধান শিক্ষকের কক্ষ। অভিযোগ তদন্তের জন্যে রাজু ও রিপনকে ডেকেছেন তিনি]

প্রধান শিক্ষক : তোমাদের কী জন্যে ডেকেছি জানো? তোমাদের সমিতির নামে একটা লিখিত অভিযোগ এসেছে। আমার বিশ্বাস, অভিযোগ সম্পর্কে তোমরাও কমবেশি শুনেছ। এবার বলো, টাকা আত্মসাতের ঘটনাটি কী?
রাজুু : সমিতির বয়েস দু’বছর চার মাস। সফি ভাই এর উদ্যোক্তা এবং প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। আমাদের জানা মতে, এ সময়ে তার হাত দিয়ে সমিতির একটা কানাকড়িও এদিক ওদিক হয়নি।
প্রধন শিক্ষক : নিশ্চয়ই তার প্রমাণ রয়েছে।
রাজু : আমরা সমিতির টাকায় পাঁচজন ছাত্রকে নিয়মিত বৃত্তি দিয়ে আসছি। দু’বছরে বই কিনে দিয়েছি ২৩ জনকে। এছাড়া গত বছর খেলার মাঠে লিটন নামে যে ছেলেটি মারাত্মক কখম হয়, তার চিকিৎসার যাবতীয় ব্যয়ভার সমিতি বহন করেছে। সব মিলিয়ে দু’বছরে সমিতির সর্বমোট আয় ১৪ হাজার ৬ শত ৪১ টাকা ১৫ পয়সা। ব্যয় হয়েছে ১৪ হাজার ৫ শত ২৬ টাকা ৫ পয়সা। উদ্বৃত্ত ১ শত ১৫ টাকা ১০ পয়সা। এই দেখুন তার কাগজপত্র। (কাগজপত্র রাখে টেবিল)
রিপন : আর সফি ভাই সম্পর্কে যে অভিযোগ…
প্রধান শিক্ষক : থাক, আর বলতে হবে না। সব উত্তর পেয়ে গেছি। এবার তোমরা যেতে পারো।
(রাজু ও রিপনের  প্রস্থান। দৃশ্যান্তর)

দশম দৃশ্য
[পিকনিক স্পট। প্রধান শিক্ষক সবার উদ্দেশ্যে বক্তৃতা করছেন। পিছনে ব্যানার টাঙানো]

প্রধান শিক্ষক : স্কুল কমিটির সম্মানিত সদস্যবৃন্দ, সহকর্মী শিক্ষকমণ্ডলী ও আমার স্নেহাস্পদ ছাত্ররা, আজ একটি ব্যতিক্রমধর্মী পিকনিকের আয়োজন করতে পেরে মহান আল্লাহর শুকরিয় আদায় করছি। আমরা জানতাম পিকনিক হচ্ছে শিক্ষাঙ্গনের একঘেয়েমী কাটিয়ে সেরেফ আনন্দ স্ফূর্তির জন্যে। অথচ, কল্যাণদহ মাধ্যমিক বিদ্যালয় আয়োজিত আজকের এই পিকনিকে ক্রীড়া, সংস্কৃতি, কৌতুক, ধাঁধাঁ ও সাধারণ জ্ঞান প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হলো। এর থেকে আপনারা নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছেন, পিকনিক শুধুমাত্র আনন্দ-উৎসবের জন্যে নয়। পিকনিককে আজ একটি শিক্ষাসফরে পরিণত করতে পেরে আমাদের ধারণা বদলে গেছে। সুধীমণ্ডলী, আমাদের শিক্ষণীয় বিষয়ের মধ্যে এখন রয়েছে বক্তৃতা প্রতিযোগিতা। বিষয় ‘সাবার আগে নিজকে গড়ো’। অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করছেন কল্যাণদহ মাধ্যমিক নিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মহাসীন আলী।
মহাসীন : শ্রোতামণ্ডলী, ‘সবার আগে নিজকে গড়ো’ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সময় উপযোগী সাবজেক্ট। এই প্রতিযোগিতায় যারা অংশগ্রহণ করবে তাদের নামের একটি তালিকা আমার হস্তগত হয়েছে। আমি প্রথম প্রতিযোগী রিপনকে মাইকের সামনে আসার জন্য অনুরোধ করছি।
রিপন : আমি বড় বড় বই পুস্তক ঘেটে আমার মূল্যবান ভাষণ লিখে এনেছি। আশা করি, আপনারা শুনে মুগ্ধ হবেন। (খুঁজে খুঁজে ডান পকেট থেকে একটি কাগজ বের করে বক্তৃতা স্টাইলে পড়ে) সাধের লাউ বানাইলা মোরে- দুঃখিত। (এবার বাম পকেট থেকে আরেকটা কাগজ বের করে পড়ে) বার বার চিঠি লিখেও- ধ্যেৎ! কী সব বের করছি। (এবার পকেটের সব কাগজ এক সাথে বের করে খোঁজে। কিন্তু পায় না) নাহ, পেলাম না। বন্ধুরা ইহাই হচ্ছে, সবার আগে নিজকে গড়ো। আমার মূল্যবান ভাষণ এখানেই শেষ করছি।
মহাসীন : আমি প্রতিযোগীদের বিষয় বহির্ভূত কথা পরিহার করার অনুরোধ করছি। এবার আসছে শিমুল।
শিমূল : (পুরো বক্তৃতাটাই বিষয় বহির্ভূত) মাননীয় সভাপতি, শ্রদ্ধেয় শিক্ষকমণ্ডলী, আমি আপ্রাণ চেষ্টা করিবো মূল বিষয়ের বাইরে কোনো কথা না বলিবার জন্য। আজকের প্রতিযোগিতার বিষয় হইল সবার আগে নিজেকে গড়ো। অর্থাৎ সকলকে ভালো হইতে হইবে। টাউনে গ্রামে কত ফুল পাওয়া যায়। সেদিন বৃক্ষ মেলা দেখিয়া পরানডা জুড়াইয়া গেল। আহা কী সুন্দর র‌্যালি! সারা টাউন ঘুরিয়া একখানা করিয়া জিলিপি পাইলাম। যা দাম! মাননীয় সভাপতি, কী যেন প্রতিযোগিতার বিষয় ছিল ভুলিয়া যাইতেছি। হ্যাঁ, হ্যাঁ পৃথিবীকে গড়িতে হইলে সকলকে মেম্বার হইতে হইবে। আসি স্যার, আমার সময় শেষ।
মহাসীন : এবারের প্রতিযোগী সুমনকে মাইকের সমনে আসার অনুরোধ করছি।
সুমন : (ভয়ে জড় সড় হয়ে কাঁদো কাঁদো গলায়। কখনো গলা শুকিয়ে কথা থেমে যায়) ছাত্র-ছাত্রী ভাই ও বোনেরা, প্রথমে আমার হাজার হাজার সালাম গ্রহণ করিবেন। আশা করি সবাই কুশলে আছেন। যা হোক, আমি জীবনে কখনো বক্তৃতা দেইনি। (মনে করার চেষ্টা করে কিছুই না পেয়ে ওলট পালট বকে) স্নেহের মা, বাবা… ও চাচা-চাচিরা, পৃথিবীতে… পৃথিবীতে বাঁচতে হলে… পেয়েছি পেয়েছি- পৃথিবীতে বাঁচতে হলে ভালো দেখে ওষুধ খাও। (গা ঘেমে ওঠে। মাথা চুলকাতে চুলকাতে) স্যা- স্যা- স্যার, এক গ্লাস পানি। (সময় শেষ হবার সংকেত পড়ে) স্যার, আমার পায়জামা গরম গরম লাগছে। এবার আসি। (দৌড়ে প্রস্থান)
মহাসীন : এবার আসছে অনুষ্ঠানের শেষ প্রতিযোগী সফি কামাল।
সফি : পৃথিবীকে গড়তে হলে সবার আগে নিজকে গড়ো। বিজ্ঞ বিচারকমণ্ডলী, ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বালু কণা থেকে সৃষ্টি হয় মরুভূমি। এক একজন ব্যক্তি মিলে পরিবার। পরিবার থেকে সমাজ, রাষ্ট্র। সুতরাং এক হচ্ছে সব কিছুর মূল ভিত্তি। ব্যক্তি যদি ভালো না হয় তাহলে পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র কোনো কিছুই ভালো করা সম্ভব নয়। এই বিশাল পৃথিবীকে নতুন করে সাজাতে হলে, প্রতিটি ব্যক্তিকে নতুন সাজে সজ্জিত হতে হবে। বিজ্ঞ বিচারকমণ্ডন্ডলী, আজ নানা ধরনের সমাজবিরোধী কর্মকাণ্ডে মানুষের জীবনযাত্রা দূূর্বিসহ হয়ে উঠেছে। বেড়ে চলেছে ঘুষ, দুর্নীতি, অনাচার-অবিচার। এজন্যে তৈরি হচ্ছে আইন, তৈরি হচ্ছে প্রতিরোধ কমিটি। কিন্তু কিছুতেই কাজ হচ্ছে না। সব কিছুর আগে নিজেকে গড়ে তুলতে না পারলে সমাজে পরিবর্তন আসবে না। প্রত্যেক ব্যক্তি খারাপ কাজ থেকে দূরে থাকতে পারলে সহজেই একটি সুন্দর সমাজ গড়ে উঠবে। তাই আসুন আমরা সবাই এককণ্ঠে একবাক্যে উচ্চারণ করিÑ পৃথিবীকে গড়তে হলে সবার আগে নিজকে গড়ো।
মহাসীন : সুধীমণ্ডলী, আমাদের বক্তৃতা পর্ব শেষ হলো। কল্যাণদহ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক এখনই পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা দেবেন।
প্রধান শিক্ষক : আমাদের পরবর্তী কর্মসূচি পুরস্কার বিতরণী ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। তার আগে খাবার বিরতি। আমি খাবার পরিবেশনের যাবতীয় দায়-দায়িত্ব সফি কামালের… (কথার মাঝখানে খন্দকার প্রতিবাদ করে ওঠে)
খন্দকার : থামান আপনার বক্তৃতা। একটা বেওয়ারিশ ছেলেকে নিয়ে আপনারা যা শুরু করেছেন তাতে স্কুলের বারোটা বাজিয়ে ছাড়বেন।
প্রধান শিক্ষক : বেওয়ারিশ!
খন্দকার : শুধু বেওয়ারিশ নয়- দুশ্চরিত্রও বটে।
প্রধান শিক্ষক : এসব আপনি কী বলছেন?
খন্দকার : কিছুই জানেন না তাই না?
প্রধান শিক্ষক : কী হয়েছে খুলে বলুন না?
খন্দকার : হাটে হাঁড়ি ভেঙে লাভ নেই, মাস্টার সাহেব। শুধু একটা কথাই মনে রাখবেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পিরিতির জায়গা নয়। যারা মুখে বড় বড় কথা বলে আর গোপনে পিরিতির আসর জমায় তাদের বেছে বেছে বিদায় করে দিন। (বাজু ও রিপন উঠে দাঁড়ায়)
রাজু : সফি ভাই কী করেছে আমরা পরিষ্কারভাবে জানতে চাই।
খন্দকার : তোমরা কারা হে?
রাজু : কল্যাণদহ হাইস্কুলের নগণ্য ছাত্র।
খন্দকার : খন্দকারের মুখের সামনে কথা বলে এমন সাহস কল্যাণদহে কেন- আশপাশেও কারো নেই। অথচ তোমরা…
রিপন : আপনি একজন ভালো ছাত্রের নামে দুর্নাম রটাবেন, আর আমরা কানে তুলো দিয়ে বসে থাকবো, সে আশা ত্যাগ করেন।
খন্দকার : কী! এতোবড় কথা! এ দুঃসাহস তোমাদের কে দিয়েছে? কোথায় পেয়েছো এ শক্তি? আমি জানি সব অনাসৃষ্টির মূলে ওই সফি আর মহাসীন মাস্টার। ওরা লেখাপড়া বাদ দিয়ে ছাত্রদের মাঝে গ্র“পিং সৃষ্টি করছে। (প্রধান শিক্ষককে) মাস্টার সাহেব, আমি সাফ সাফ বলে দিচ্ছি, কাল থেকে ওই শয়তানদের যেন স্কুলের বাউন্ডারিতে না দেখি। (খন্দকারের কথায় প্রথমে মৃদু গুঞ্জন পরে হৈ-চৈ শুরু হয়ে যায়। প্রধান শিক্ষক থামাবার চেষ্টা করেন)
খন্দকার : জানি, তোমাদের কোনো দোষ নেই। তোমরা নিরীহ, শান্তশিষ্ট ছেলে। তোমাদের ভাঙ্গিয়ে ওরা স্বার্থ হাসিল করতে চায়। কিন্তু সে সুযোগ আর দেয়া হবে না।
রাজু : মানে?
প্রধান শিক্ষক : তোমরা চুপ করো রাজু। সফিকে নিয়ে অতো মাথা ঘামাতে হবে না। যা করতে হয় আমিই করবো।
খন্দকার : তোমরা হচ্ছো বড় বাড়ির ছেলে। একটা বেওয়ারিশ, ছিন্নমূল ছেলেকে নেতা বানিয়ে তোমাদের আভিজাত্য বিলিয়ে দেবে- অন্তত খন্দকারের চোখের সামনে তা হতে পারে না।
রিপন : রাখেন আপনার আভিজাত্য।
রাজু : যে আভিজাত্য সত্য-মিথ্যার বাছ-বিচার করতে পারে না, গুনীকে সম্মান করতে জানে না, সে আভিজাত্যকে আমরা ঘৃণা করি।
প্রধান শিক্ষক : এই, তোমরা চুপ করলে? (খন্দকারকে) আর আপনি একজন বিচক্ষণ ব্যক্তি হয়ে ছেলে-ছোকরাদের সাথে কী শুরু করলেন? চলুন খেয়ে নিই।
(প্রস্থান। দৃশান্তর)

একাদশ দৃশ্য
[প্রধান শিক্ষকের কক্ষ। একাকী বসে কাজ করছেন তিনি। নেপথ্যে মিছিলÑ ‘সফি ভাই বাইরে কেনÑ জবাব চাই দিতে হবে। সফি ভাই’র বহিষ্কারÑ মানি না মানবো না। সফি ভাই যেখানেÑ আমরা যাবো সেখানে।…’ মিছিল শেষে কিছু ছাত্র প্রধান শিক্ষকের কাছে স্মারকলিপি দেয়।]

প্রধান শিক্ষক : (স্মারকলিপি পড়ে) সবকিছু দেখলাম। কিন্তু এটা কী করে সম্ভব? সফিকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত শুধু আমার নয়। শিক্ষক-ম্যানেজিং কমিটির যৌথ সভায় এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। তাও মাস খানেক আগের কথা। তারপর সফি পল্লী মঙ্গল হাইস্কুলে ভর্তি হয়ে যথারীতি ক্লাস করছে। এ বহিষ্কার নিয়ে আমাদের মাঝে যে মতবিরোধ দেখা দিয়েছিল তাও নিরসনের পথে। এবার বলো, এতসব ঘটনা প্রবাহের পর কী করে আবার সফিকে ফিরিয়ে আনা যায়?
ছাত্র : আমরা মনে করি, সফি ভাইকে সম্পূর্ণ অন্যায়ভাবে বহিষ্কার করা হয়েছে। আর অন্যায়ের প্রতিবাদ জানাবার জন্যেই আমরা ক্লাস ছেড়ে মাঠে নেমেছি। আমরা আশা করি, চূড়ান্ত কর্মসূচি নেয়ার আগেই স্কুল কর্র্তৃপক্ষ আমাদের দাবির প্রতি সম্মান দেখিয়ে বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করবেন।
প্রধান শিক্ষক : সোমবার শিক্ষক এবং ম্যানেজিং কমিটির আরো একটি মিটিং রয়েছে। আমি তোমাদের দাবি সেখানে তুলে ধরার চেষ্টা করবো।
ছাত্র : আমরা সেদিকেই চেয়ে রইলাম। আসি স্যার। (প্রঙ্গান। দৃশ্যান্তর)

দ্বাদশ দৃশ্য
[পল্লী মঙ্গল হাইস্কুল। ছাত্রদের একটি ঘরোয়া সমাবেশে বক্তৃতা দিচ্ছে সফি। কিভাবে অবহেলিত হাইস্কুলের উন্নতি এবং ছাত্রদের ভবিষ্যৎ গড়ে তোলা যায়Ñ এটাই তার বক্তব্যের বিষয়]

সফি : প্রিয় ভাইয়েরা, রাজনগর থানার সবচেয়ে অখ্যাত এবং অবহেলিত এ বিদ্যালয়। সামান্য বৃষ্টিতে চাল দিয়ে পানি পড়ে। জানালা নেই, দরোজা নেই। নেই পর্যাপ্ত চেয়ার, বেঞ্চ, খেলার মাঠ। শেষ পর্যন্ত কল্যাণদহ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের দো-তলা বিল্ডিং থেকে আমাদেরকে এই দোচালা ঘরে নেমে আসতে হলো। আমরা বিশ্বাস করি, বিল্ডিং কিংবা চাকচিক্য বড় কথা নয়। লেখাপড়া এবং স্বভাব-চরিত্রে শ্রেষ্ঠ হতে পারলে এই অখ্যাত বিদ্যালয় একদিন শ্রেষ্ঠ বিদ্যালয়ে পরিণত হবে।
সমস্বরে : ঠিক বলেছেন, ঠিক বলেছেন।
সফি : আমাদের দেশে নকল প্রবণতা আজ একটি মারাত্মক ব্যাধীতে পরিণত হয়েছে। অনেক শিক্ষক-অভিভাবকও এতে প্রত্যক্ষভাবে মদদ দিচ্ছে। ফলে দেশ ও জাতির ভবিষ্যৎ বলে পরিচিত ছাত্রসমাজ নিশ্চিত ধ্বংসের দিকে এগিয়ে চলেছে। প্রিয় ভাইয়েরা, যারা ফাঁকি দিয়ে সার্টিফিকেট অর্জন করে শিক্ষকতা করে, তাদের এক একটি হাতে হাজার হাজার অযোগ্য ছাত্রের জন্ম হবে। এ অবস্থা চলতে থাকলে এ দেশে অদূর ভবিষ্যতে বিদ্যার নাম-গন্ধও খুঁজে পাওয়া যাবে না।
সমস্বরে : উত্তম কথা, উত্তম কথা। এবার কী করতে হবে তাই বলুন?
সফি : দেশের প্রতিটা মানুষকে নকলের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। আর আমরা হতে চাই এ আন্দোলনের প্রথম সৈনিক। পল্লী মঙ্গল হাইস্কুলকে নকলমুক্ত করে আমরা দেশে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে চাই।
সমস্বরে : আমরা একমত। আমরা সবাই এতে একমত।
সফি : বেশ। আজ থেকে আমরা শপথ নিচ্ছিÑ আর মারামারি হানাহানি নয়, লেখাপড়াই হোক ছাত্রসমাজের প্রকৃত কাজ। সফল হোক আমাদের নকল প্রতিরোধ আন্দোলনের প্রথম যাত্রা। (দৃশ্যান্তর)

ত্রয়োদশ দৃশ্য
[খন্দকারের খাস কামরা। একান্তে বসে কী সব ভাবছেন তিনি। উশ্কো খুশ্কো চুল, জবু থবু চেহারা। এ সময় রাহাতের প্রবেশ]

রাহাত : দুলাভাই…
খন্দকার : (মাথা তুলে) শরীরটা ভালো নেই রাহাত। দারুণ মাথাব্যথা করছে।
রাহাত : খবর শুনেছেন, দুলাভাই? আমাদের স্কুলের সরকারি অনুদান বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।
খন্দকার : (খানিকটা অবাক হয়ে) মানে?
রাহাত : একদম পরিষ্কার। এই দেখুন চিঠি। (চিঠি দেয়)
খন্দাকার : (পড়ে) যে সব বিদ্যালয় থেকে ৩ বছরে কমপক্ষে ৩৬ জন পাস করেনি, সে সব বিদ্যালয়ের সব রকম সরকারি সুযোগ-সুবিধা স্থগিত ঘোষণা করা হয়েছে। (রাহাতকে) কল্যাণদহ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ও কি এর আওতায় পড়বে?
রাহাত : রেজাল্টশিট তো তাই বলে। ৩ বছর পাস করেছে মাত্র ১৮ জন।
খন্দকার : অর্থাৎ, তোমরা আর বেতন পাচ্ছো না, এইতো? কিন্তু কেন? ৩ বছরে কেন ৩৬ জন পাস করেনি?
রাহাত : সে জবাব আমাকে দিতে হবে?
খন্দকার : তোমাদের সকলকে দিতে হবে। এতদিন আমি মুখ খুলিনি। এবার আমি কাউকে ছাড়বো না। প্রতিটি বিষয় আমাকে কড়ায় গণ্ডায় বুঝে দিতে হবে। (পেপার হাতে ছুটতে ছুটতে সুমনের প্রবেশ)
সুমন : আব্বু, আব্বু, রেজাল্ট শুনেছেন? সফি স্ট্যান্ড করেছে। এই দেখুন, খবরের কাগজে ছবি বেরিয়েছে।
খন্দকার : এ্যাঁ! সফি স্ট্যান্ড করেছে! আর তোমরা? (কাগজটা নিয়ে দু’জনেই দেখে)
সুমন : কল্যাণদহ হাইস্কুল থেকে মাত্র ১১ জন পাস করেছে। কেউ ডিভিশন পায়নি।
খন্দকার : রাহাত, এবার কত জন পরীক্ষা দিয়েছিল?
রাহাত : ২৭ জন।
খন্দকার : অর্থাৎ কল্যাণদহ হাই স্কুলের পাসের হার শতকরা ৫০ ভাগেরও কম! না না, আর সহ্য হয় না। প্রধান শিক্ষককে আমি দেখে নেব। সারা বছর সরকারি অনুদান আর খন্দকারের গা-ঘামানো পয়সা খেয়ে কী করেছে, পাই পাই করে তার হিসেব দিতে হবে।
সুমন : আব্বু, সফিকে তাড়িয়ে আমরা ভুল করেছি, তাই না? ও থাকলে আমাদের খুব সুনাম হতো।
খন্দকার : মনে রেখ, তোমার আব্বু কখনো ভুল করে না। সফির রেজাল্ট শুনে খারাপ লাগছে এইতো? ভুলে যেয়ো না- ‘ও’ যদি সত্যি সত্যিই পাস করে, তাহলে ওই পর্যন্তই শেষ। গরিবের বাচ্চাদের আর এক কদম অগ্রসর হতে দেয়া হবে না। (দৃশ্যান্তর)

চর্তুদশ দৃশ্য
[প্রধান শিক্ষকের অফিস কক্ষ। সহকারী শিক্ষক মামুন সাহেবের সাথে একান্তে আলাপ করেছেন তিনি]

প্রধান শিক্ষক : ‘সত্যের কল বাতাসে নড়ে’Ñ কথাটা মিথ্যে নয় মামুন সাহেব।
মামুন : নির্ভেজাল সত্য। নইলে এক যুগ আগেও যে ছেলের কোনো পরিচয় ছিল না, কে জানতো সে ছেলেটিই জাতির গৌরব বয়ে আনবে।
প্রধান শিক্ষক : সবই ভাগ্য মামুন সাহেব, সবই ভাগ্য। (নেপথ্যে মাইকের ঘোষণা। আস্তে আস্তে আওয়াজ মিলিয়ে যায়)
ঘোষণা : … পল্লী মঙ্গল হাইস্কুল এ বছর রাজনগর থানার একমাত্র নকলমুক্ত বিদ্যালয় হিসেবে মনোনীত হওয়ায় বিদ্যালয়ের গৃহ নির্মাণ এবং কৃতী শিক্ষার্থীদের পড়ালেখার যাবতীয় দায়-দায়িত্ব সরকার গ্রহণ করেছে। একটি ঘোষণা … পল্লী মঙ্গল হাইস্কুল…
মামুন : (উৎকর্ণ হয়ে শোনার পর) যে যাই বলুক, এ কৃতিত্ব আর কারো নয়। সফিই এর একমাত্র দাবিদার।
প্রধান শিক্ষক : ঠিক বলেছেন মামুন সাহেব, ঠিক বলেছেন। সফির কথায় ও কাজে একটিই শ্লোগান ছিল, ‘সবার আগে নিজকে গড়ো’। শেষ পর্যন্ত সেই শ্লোগান থেকেই একটি বিদ্যালয় নকলমুক্ত হলো। (খন্দকারের প্রবেশ)
খন্দকার : মাইকের ঘোষণা নিশ্চয়ই শুনেছেন। এবার জবাব দেন স্কুলের অনুদান বন্ধ হলো কেন?
প্রধান শিক্ষক : কেউ পাস করেনি তাই।
খন্দকার : কেন পাস করেনি?
প্রধান শিক্ষক : সে জবাব আপনাকেই দিতে হবে।
খন্দকার : মানে?
মামুন : মানে অত্যন্ত পরিষ্কার। প্রতি বছর কল্যাণদহ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের রেজাল্ট ভালো হয় না কেন তার জবাব দেন।
প্রধান শিক্ষক : যাকে নিয়ে আমরা আশা করতাম, তাকে আপনি বিনা দোষে বহিষ্কার বরলেন। তার সাথে বিদায় নিলো আরো অনেকে। কী অপরাধ করেছিল সফি? কী অপরাধ করেছিল শিমুল, তমাল, সোহেল, মহাসীন সাহেবÑ জবাব দেন?
খন্দকার : শেষ পর্যন্ত আপনারাও আমাকে চোখ রাঙ্গাচ্ছেন?
মামুন : স্কুলের সভাপতি সেজে অযোগ্য, বেকার আত্মীয়-স্বজনের ভবিষ্যৎ নিয়েই ভেবেছেন। কিভাবে ছাত্র-ছাত্রীদের উন্নতি হয় সেদিকে নজর দেয়ার কখনো সময় পাননি। এমনকি, সফির মতো একটা অসাধারণ প্রতিভার প্রতি ঈর্ষান্বিত হয়ে নিজের ছেলেটাকেও ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিয়েছেন। আজ সব কিছু এড়িয়ে শাক দিয়ে মাছ ঢাকার চেষ্টা করছেন। জবাব দেন কল্যাণদহ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের এ বিপর্যয়ের জন্যে কে দায়ী?
প্রধান শিক্ষক : জানি, জবাব আপনি দিতে পারবেন না। আমাদের কাছ থেকেই শুনুন- তেঁতুল গাছ লাগিয়ে কখনো মিষ্টি ফল আশা করা যায় না। ভেবে দেখুনতোÑ স্কুলটা কেন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন? কেন গা-ঘামানো টাকা দিয়ে স্কুলের জৌলুস বাড়িয়েছেন?
খন্দকার : স্কুল প্রতিষ্ঠা! জৌলুস বৃদ্ধি। এসব আপনারা কী বলছেন?
মামুন : কিছুই বুঝতে পারছেন না, তাই না?
প্রধান শিক্ষক : সব কিছু মরে গেলেও আপনার বিবেক এখনো মরে যায়নি। তার কাছেই জিজ্ঞেস করুন, চোখের ধাঁধাঁ কেটে যাবে।
খন্দকার : এ্যাঁ- বিবেক! খন্দকারের বিবেক এখনো জ্যান্ত রয়েছে? জ্যা-জ্যা-জ্যান্ত রয়েছে? আমাকে ভাবতে দিন মাস্টার সাহেব, আমাকে একটু ভাবতে দিন। (মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়ে)
প্রধান শিক্ষক : ভেবে আর লাভ হবে না খন্দকার সাহেব। যা হবার অনেক আগেই হয়ে গেছে। এখন ফলাফলের জন্যে অপেক্ষা করুন।
খন্দকার : (উঠে দাঁড়িয়ে) পেয়েছি, পেয়েছি মাস্টার সাহেব। কল্যাণদহ হাইস্কুলে এসে হাজার হাজার প্রতিভা আমার জন্যেই নষ্ট হয়েছে। এ জন্যে কেউ দায়ী নয়। সব আপরাধ আমার। সব অনিষ্ট আমার জন্যেই হয়েছে। আমি- একমাত্র আমিই সব অনাসৃষ্টির জন্যে দায়ী। আমি যাই…
মামুন : কোথায় যাবেন?
খন্দকার : সফির কাছে ক্ষমা চেয়ে পাপের প্রায়শ্চিত্ব করতে চাই।
মামুন : সফির কাছে? যে আগুন ফুঁ দিয়ে নেভাতে চেয়েছিলেন তার কাছে? কিন্তু ভুলে যাবেন না, একদিনের সেই ছোট্ট আগ্নিশিখা আজ যে দাবানলের সৃষ্টি করেছে, তাতে আপনার মতো খড়কুটো জ্বলে-পুড়ে ছারখার হয়ে যাবে।
খন্দকার : সেটাই আমার যোগ্য পাওনা। সারাজীবন যে পাপ করেছি, জ্বলে-পুড়ে ছাই হয়ে গেলেও তার পাওনা শোধ হবে না। চলি মাস্টার সাহেব। (প্রস্থানোদ্যত। পিছন থেকে দু’পুলিশের প্রবেশ)
১ম পুলিশ : হ্যান্ডস্ আপ মিস্টার খন্দকার।
খন্দাকর : (পিছন ফিরে থতমত খেয়ে) কে? ও বড় বাবু! (রাহাতকে ডাকে) রাহাত, ও রাহাত শিঘ্রই আয়, মেহমান এসেছে।
১ম পুলিশ : আর রাহাতকে ডাকতে হবে না। তৈরি হোন মিস্টার খন্দকার, আপনার নামে ওয়ারেন্ট রয়েছে।
খন্দকার : ওয়ারেন্ট!
১ম পুলিশ : মানুষের চোখ ফাঁকি দিয়ে সারাজীবন যে পাপ করেছেন তার খেসারত দেয়ার জন্যে প্রস্তুত হোন।
খন্দকার : আমিতো কিছুই বুঝতে পারছি না, স্যার। চলুন বাসায় যেয়ে খেয়ে-দেয়ে সবকিছু শোনা যাবে।
১ম পুলিশ : পুলিশকে অনেক খাইয়েছেন। আর নয়। খন্দকার সাহেব, আপনার অভিযোগের ফিবিস্তি অনেক বড়। শুধু একটা কথাই শুনে রাখুন, অতি অল্প সময়ে আপনি বিশাল অর্থ-সম্পদের মালিক হয়েছেন। সরকারের গোয়েন্দা বিভাগ এটা তদন্ত করেছে। তদন্তের সংক্ষিপ্ত বিপোর্ট হচ্ছে, আপনি চোরা কারবারী, কালোবাজারি ও মজুদদারি ব্যবসাকে অবাধে চালিয়ে যাবার সুবিধার্থে স্কুল গড়ে তুলেছেন। এ জন্যে আপনার পথের কাঁটা মহাসীন মাস্টার ও সফিকে সুকৌশলে সরিয়ে দিয়েছেন। শুধু তাই নয়, এ পর্যন্ত বিভিন্ন সংস্থা-সংগঠন স্কুলের নামে যে সাহায্য দিয়েছে তার বেশির ভাগ অর্থ আপনি নিজের কাজে ব্যয় করেছেন।
খন্দকার : থাক্ থাক্ আর লজ্জা দিবেন না। এবার আমাকে শাস্তি দিন, যা ইচ্ছে তাই করুন।
১ম পুলিশ : ভেবেছিলেন পাপ চিরদিন চাপা থাকবে। কিন্তু তা আর হলো না। মনে রাখবেন, মানুষের চোখকে ফাঁকি দেয়া গেলেও আল্লাহর চোখকে কখনো ফাঁকি দেয়া যায় না। তার কাছে একদিন ধরা পড়তেই হবে। সেন্ট্র্রি, খন্দকারকে অ্যারেস্ট করে থানায় নিয়ে চল। (খন্দকারের হাতে হাতকড়া পরিয়ে নিয়ে উভয় পুলিশের প্রস্থান। অন্য পথ দিয়ে প্রধান শিক্ষক ও মামুনও স্থান ত্যাগ করে। এ সময় একটি ফুলের মালা হাতে নিয়ে দ্রুত পায়ে প্রবেশ করে সফি।)
সফি : নাহ, এখানেও নেই। তাহলে… তাহলে এ মালা আমি কার গলায় পরাবো? দেখি… (মালা নিয়ে সফি আরও দ্রুত পায়ে বেরিয়ে যাবে।)
যবনিকাপাত

SHARE

Leave a Reply