Home উপন্যাস ভাকাট্টা লুট…

ভাকাট্টা লুট…

সোলায়মান আহসান

আমার খুব ছোটকালের কথা মনে আছে।
আমি যখন আমার বড় ভাইবোনদের সঙ্গে গল্প করতে বসি, ছোটকালের ছোট ছোট ঘটনার কথা বলি, তখন বড়রা বিশ্বাস করতে চান না।
এতো ছোটকালের কথা তোর মনে থাকার কথা নয়, তুই শুনে শুনে বলছিস। তারা বলেন।
আমি যখন ঘটনার স্থান-কাল-পাত্রের আদ্যপ্রান্ত হুবহু বর্ণনা দিয়ে ফেলি, তখন তারা চোখ গোল গোল করে বলেন, তোর তো বেশ মনে আছে।
আসলে আমার খুব মনে থাকে তা আজ দাবি করার মতো সাহস নেই। আমার ছেলেমেয়েরা আজকাল আমাকে ভুলো মনের মানুষ হিসেবেই জানে। ওষুধ খেতে ভুলে যাই। পই পই করে ছোট মেয়েটি মনে করিয়ে দেয়। ঘর হতে বের হবার সময় দরকারী জিনিসপত্তর রেখে হাঁটা দেই। গিন্নি এসে বার বার মনে করিয়ে দেয়। কিংবা দিনের কাজগুলো ঠিকঠাক মনে আছে কি না জিজ্ঞেস করে বড় মেয়েটি।
আমার এই পরনির্ভরতা, বিশেষ করে মনের ব্যাপারে, আমি বেশ উপভোগ করি। ভাবতে ভাল লাগে আমার খানিকটা বয়স হয়েছে, চুলে পাক ধরেছেÑ এই নির্ভরতা মানানসই। তা ছাড়া একটু আধটু লেখালেখি করি বলে একটা ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টি আমার প্রাপ্য বৈকি!
অবাক কাণ্ড হচ্ছে, আমার ছেলেবেলার যেই ছোট ছোট ঘটনা আজো স্মৃতিতে আকাশের তারাদের মতো জ্বল জ্বল করে, এগুলো হয়তো নিজের কাছে অনুভূতি হিসেবে একটু মূল্য থাকে অন্যের কাছে।
মানুষের স্বাভাবিক প্রবণতা হচ্ছে বর্তমান থেকে দূরে সরে অতীতের দিকে তাকানো। কিংবা ভবিষ্যতের স্বপ্ন বিলাসে বুঁদ হওয়া। তাই অতীতের ঘটনা গল্পের মতো বর্ণনা করা গেলে তাও অন্যের কাছে উপভোগ্য হয়ে থাকে।
সেরকম গল্প আজ শুনাবো।
আমরা মানে আমাদের পরিবারটি ঢাকার অদূরে এক শহরতলিতে তখন বাস করতো, নামটি এখন বলছি না। ছোট একটা সাব পোস্ট অফিসের ‘ডাকবাবু’ আমার বাবা। তখন পোস্ট অফিস ছিল মানুষের মধ্যে চিঠিপত্র, টাকা পয়সা আদান প্রদানের একমাত্র মাধ্যম। টেলিগ্রাম মাধ্যমটিও পোস্ট অফিসের অন্তর্ভুক্ত থাকায় পোস্ট অফিস মানেই মানুষের পরম বন্ধু।
পোস্ট অফিসটা আকৃতিতে খুব ছোট ছিল না। পুরনো বনেদি বিল্ডিংয়ে পোস্ট অফিসের কাজটি চলতো। পোস্ট অফিসের পেছনে লাগোয়া ছিল পোস্ট মাস্টারের বাসভবন। দেয়াল ঘেরা বিশাল প্রাঙ্গণ ছিল বাসার অন্তর্ভুক্ত। যার মধ্যে তিন চারটে রুম লন মিলে এক বিশাল বাসার অনেকাংশই অব্যবহৃত থাকতো। ছিলো রান্নাঘর, স্টোর রুম পেরিয়ে শান বাঁধানো ইন্দিরা বা কুয়া। কুয়া বা ইন্দিরা হচ্ছে পানির কূপ। দু’ধরনের কূপ ছিল তখন। ইন্দিরা যা বড় আকৃতির এবং চারিধার প্রাচীরঘেরা এবং পাড়টি শানবাঁধানো। আরেকটি হচ্ছে পাত কুয়া বা ছোট আকৃতির কুয়া তা শানবাঁধানো নাও হতে পারে। সে কালে পানির ব্যবস্থা হিসেবে কূপ বা টিউবওয়েলের প্রচলন ছিল। পুকুরও ছিল। কোন কোন বাড়িতে। খাবার পানির জন্য টিউবওয়েলের পানি সংগ্রহ করা হতো একটু দূর হতে। মফস্বলীয় পরিবেশ বলতে আজকাল যে রকমটা বোঝায় তার চেয়েও অনুন্নত ছিল ঢাকার ঐ এলাকা।
চারিধারে বিল আর ঝিল। বর্ষাকালে পানিতে থৈ থৈ। ব্যাঙের ডাকাডাকিতে কান ঝালপালা। রাতে শিয়াল, ভুতুম পেঁচার ডাকে বুক হিম হয়ে যাওয়া। দিনের আলো নিভে গেলে ঘর থেকে বের হতে খালি ভয়। ভূত-প্রেতের ভয়টাই বেশি লাগতো। শুধু ভয় আর ভয় নিয়ে কষ্টে-সৃষ্টে জীবন কাটানো। আমাদের ছোট বুকে শুধু ভয় লেগে থাকতো।
আমার বয়স তখন ছয়। স্কুলে যাওয়ার তবু যোগ্যতা হয়নি। স্কুলে যাওয়া মানে বেশ অনেকটা পথ হেঁটে যেতে হবে। পথে পথে নানারকম ভয়। কুকুর কামড়ে দেবার, ছেলে ধরার, বিহারি কলোনির ছেলেদের মার খাওয়ার ভয়Ñ তাই স্কুল যাওয়া বন্ধ। বড় ভাই আমাকে সঙ্গে নিতে চায় না। ঝামেলা মনে করে। আর কেউ নেই আমাকে স্কুলে নিয়ে যায় এবং আনে। আমার স্কুল যাওয়া দেরি হতে থাকলো। বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে ঘরেই হলো হাতেখড়ি। বড় বোনের কাছে। অ আ ক খ এবং কালো রঙের স্লেট-পেন্সিল নিয়ে কসরা। কান্নাকাটি করে বড় ভাইয়ের মতো একটা লাল রঙের ব্যাগও জুটিয়ে ফেলেছি। ওটার ভেতর যতœ করে রাখা থাকতো আদর্শ লিপি, স্লেট-পেন্সিল এবং টুকটাক খেলার জিনিসপত্তর।
বড়দের স্কুলে যাওয়া। হাউজ টিউটরের কাছে পড়া ইত্যাকার কর্মকাণ্ড আমাকে ঈর্ষান্বিত করতো। আমার যোগ্যতা তাদের সমান প্রমাণের জন্য বই নিয়ে বড়দের সঙ্গে বসা স্লেট-পেন্সিলে আঁকাআঁকি করা নিয়ে মেতে থাকতাম। সবচেয়ে বড় যোগ্যতার পরিচয় দিয়ে ফেলতাম যে কবিতাটি আমার বড় ভাই মাথা দুলিয়ে দুলিয়ে ঘাড় ব্যথা করে মুখস্থ করতো দু’দিন ধরে, আমার তা শুনে শুনে মুখস্থ হয়ে যেতো। গর গর বলে যেতামÑ পাখি সব করে রব রাতি পোহাইল… আমার এই যোগ্যতা ধরা পড়ে বড় ভাইবোনদের পড়াতে আসা হাউজ টিউটর দুলাল স্যারের কাছে। আমার যোগ্যতার স্বীকৃতি হিসেবে তিনি অধিকার দেন বড়দের সঙ্গে বই এবং স্লেট-পেন্সিল নিয়ে এক সঙ্গে বসার। এতে আমিও পড়–য়াদের দলভুক্ত হয়ে সম্মান বেড়েছে ভাবতে থাকি।
সেই দুলাল স্যার এক অদ্ভুত মানুষ। এক অদ্ভুত চরিত্র। পুরো নামটি ছিল দুলাল ভট্টাচার্য। জাতে ব্রাহ্মণ। রীতি মতো মন্দিরপূজারী ছিলেন। আমার মাকে তিনি মা ডাকতেন।
ব্রাহ্মণ পূজারীদের যেসব নিয়ম মেনে চলতে হয় তিনি তেমনটি মানতেন না। বিশেষ করে মুসলমানদের সঙ্গে উঠাবসা, অন্ন গ্রহণ সব কিছুই করতেন। আমার মায়ের স্নেহ-যতœ-উদারতা আর দুলাল স্যারের আমাদের প্রতি গভীর ভালোবাসা একটা গভীর সম্পর্ক তৈরি করে উভয় পক্ষের মধ্যে।
আমি কিন্তু ‘শান্তশিষ্ট লেজবিশিষ্ট’ ছিলাম না। লেজবিশিষ্টরা তো কখনো শান্ত হয় না, শিষ্ট তো নয়ই। তাই বড়দের আসরে আমার অনুপ্রবেশ খানিকটা ‘আপদ’ হিসেবে বিবেচিত হতো। আমার বড় ভাই প্রায়শ অনুযোগ করতো, পড়াশোনা রেখে দুষ্টুমি করছি। আসলে করতামও তাই। আমার তো পড়া সামান্যই।
স্লেট-পেন্সিল দিয়ে বড় বড় অ, আ, ক, খ বানানো। হ্যাঁ, আমার কাছে ওটা বানানোই ছিল।
দুলাল স্যার স্লেটে লিখে দিতেন অ, আ, ক, খ। আমি পেন্সিল দিয়ে তার আঁকা রেখার ওপর ঘুরাতাম। ঘুরাতে ঘুরাতে যতক্ষণ না অক্ষরগুলো নিজস্ব আকৃতি হারিয়ে কোনটা আলু, বেগুন, কলা কিংবা চাইনিজ বর্ণে রূপ না নিতো ততক্ষণ চলতো। মুখে উচ্চারণ এমনভাবে করতাম যাতে পাশের বড় ভাইবোনদের পড়াকে বাধাগ্রস্ত করা যায়। আপত্তি উঠলেও দুলাল স্যারের উদার ভালোবাসায় তা খুব একটা বিপদ ঘটাতে পারতো না।
দুলাল স্যারের গায়ের রঙ ছিল কালো মিশমিশে। খদ্দর কাপড়ের হাফহাতা হাওয়াই শার্ট আর সাদা ধুতি ছিল তার পোশাক। লম্বা ছিপছিপে গড়ন। লম্বাটে মুখমণ্ডল। হাসি লেগে থাকতো মুখে। সাদা ঝকঝকে দাঁতগুলো বলে দিতো তার সরল মনের খবর। অল্প দিনে আমরাও তার মনের খুব কাছাকাছি কবে এসে গেছি তা টের পাইনি। শুধু পড়াশোনার মধ্যে আর সীমাবদ্ধ থাকল না দুলাল স্যারের উপস্থিতি। পড়াশোনা শেষে আমার আব্বা-আম্মা দুলাল স্যার মিলে গল্প-গুজবে মেতে উঠতেন। অনেক রাত অবধি।
যাবার সময় আমার মা বলতেন দুলাল, ভাত খেয়ে যাও, এতো রাতে তোমাকে কে ভাত দেবে?
প্রথমে একটু না ভাব দেখালেও প্রবলভাবে আপত্তি তুলতেন না। দেন মা দেন ভাত খাইয়া যাইÑ নাইলে এখন গিয়া রান্দা খাবার দিবো কে আমারে, উপাস যাইতে অইবÑ বলে বসে যেতেন।
দুলাল স্যার একাই ছিলেন। উনিশ শ’ সাতচল্লিশের ভারত বিভক্তির ডামাডোলে এপাড় থেকে পাড়ি দেয়া মিছিলে স্যারের বাবা-মা, ভাই-বোনও যোগ দেয়। দুলাল স্যার বললেন, মাটির মায়া পূর্ব পুরুষের স্মৃতি ছাড়ন যায় না। কী বলেন মা?
তাই একাই রয়ে গেলেন। কিন্তু দুলাল স্যারের বাবা বাড়ি-জমি সব বিক্রি করে দেয়।
দুলাল স্যার এক দিকে হলেন স্বজনহারা, অপর দিকে সহায় সম্পত্তিহীন। বিয়ে থা করা হয়নি। তার ছিল না থাকার কোন নির্দিষ্ট স্থান। বিভিন্ন জ্ঞাতি-গোষ্ঠীর বাড়িতে কিংবা মন্দিরেই কাটতো রাত-বিরাত।
টাকা পয়সা আয়ের দিকে দুলাল স্যারের তেমন ঝোঁক ছিল না। মন্দিরের পূজারী হিসেবে লোকজন যে যা দিতো তা নিয়েই সন্তুষ্ট ছিলেন। একটা লাকড়ির দোকানে দিনের বেলা বসতেন। দোকানের মালিক সেই বসার জন্য দু’চার আনা মজুরি দিলে তা এসে আমাদের কল্যাণেই খরচ করতেন।
বিকেল বেলা এসেই হুকুম দিতেন বড় ভাইকে, যা খোকা, গলির দোকান থেকে গরম গরম পুুরি নিয়ে আয়।
বড় ভাইতো খুশি। পুরি আনার জন্য বকশিশ মিলবে। পুরিও খাওয়া যাবে। আর যদি গলা বাড়িয়ে আমার মা বলেন দুলাল চা খাওয়াবো যে, চা পাতা নেই। অমনি পকেটে হাত দিয়ে দু-এক আনা বের করে বলবে এই নে খোকা চা পাতা আনিস কিন্তু মনে করে!
দুলাল স্যারের কাছে আমাদের আবদারের ফর্দটাও কম বড় ছিল না। পূজাতে বেড়াতে নেওয়া। পূজার বাতাসা, নাড়–, চিঁড়া-দৈ খাওয়ানো। এমনকি ক্যারম খেলার পার্টনার কম পড়লে ডাক পড়তো স্যারের।
স্যার বলতেন, আমার আঙুল গুলান লম্বা, ক্যারম খেলা আমার কাম না।
কিন্তু আমাদের খেলাকে উৎসাহ দিতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পার্টনার হতেন। স্যার যার পার্টনার হতেন তাকে পরাজয় বরণ করতেই হতো। কারণ দলের নয়টি ঘুঁটির মধ্যে একটাকেও গর্ত দেখাতে পারতেন না তিনি। বরং তার আনাড়ি খেলার খেসারত দিতে হতো পার্টনারকে। যে ঘুঁটি অতি সহজেই ফেলা যেতো, তাকে জটিল অবস্থানে ঠেলে দিতেন। এতে পার্টনারের বিরক্তি ও উষ্মার কারণ ঘটতো।
আমার বড় ভাই ভালো খেলুড়ে ছিলো। ক্যারমসহ নানা ধরনের খেলায় তার জুড়ি পাড়ায় ছিলো না। ঘুড্ডি উড়ানো, মার্বেল খেলা, ডাঙ্গুলি, কুস্তি, হা-ডু-ডু। সিগারেটের শূন্য প্যাকেট জমিয়ে তাস খেলায় সে ছিল পাড়ার সেরা।
তার পটুতাকে সমীহ না করে উপায় ছিল না। ক্যারম খেলায় দুর্বল পার্টনার দুলাল স্যারকে নিয়ে জিতে যাবার তার চেষ্টা দেখার মতো। স্যারের ভুল মারগুলো তার জিতে যাবার জন্য বড় বাধা হয়ে দেখা দিতো। বড় ভাই কিন্তু কদাচিৎ সে জন্য স্যারের প্রতি বিরক্তি প্রকাশ করতো। দুলাল স্যারও একগাল হেসে নিজের ভুলের কথা স্বীকার করে বলতেন, নারায়ণ নারায়ণ।
কখনো কখনো বাজি ধরে খেলা হতো। বাজি মানে বাইরে থেকে কিনে ডালপুরি কিংবা জিলিপি খাওয়ানো। এসব বাজির খেলায় সগৌরবে দুলাল স্যার হেরে কী যে মহা খুশি হতেন। চিৎকার ছুড়ে ডাকতেন আমার মাকে, মা মা আমি হাইরা গেছি, হা:… হা:…হা:…
দুলাল স্যারের কাছে নিজের ছাত্রছাত্রীদের কাছে হেরে যাওয়াটা ছিল আনন্দের। পকেট হাতড়িয়ে তখনি পয়সা বের করে এগিয়ে দিতেন বাজির খেসারত দিতে।
ক্যারম খেলাটা শুধু আমাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। রাতে হারিকেন ঝুলিয়ে আমার আব্বা-আম্মা দুলাল স্যার বড় বোনদের কেউ কেউ মিলে খেলা হতো। সেসব খেলায় আমরা থাকতাম দর্শক। কিন্তু পক্ষ নিতাম সবাই দুলাল স্যারের। এতো উৎসাহ, এতো পরামর্শ কায়দা-কানুন বাতলিয়ে দিয়েও স্যারের পরাজয়কে ঠেকাতে পারতাম না। মনে মনে কষ্ট পেতাম সবাই। আবার খুশিও হতাম। বাজিতে হেরে স্যার আমাদের নগদ কিছু খাওয়াতেন বলে।
পৃথিবীতে এমন কিছু মানুষ আছেন বুঝিবা তারা পরাজিত হতেই ভালবাসেন! জীবনের পরতে পরতে পরাজয়, অবহেলা, বঞ্চনা বরণ করে কেমন করে সুখী হওয়া যায়, তার উদাহরণ ছিলেন দুলাল স্যার। কোন পরাজয় স্যারের মুখের সরল হাসি কেড়ে নিতে পারতো না। খেয়ে আছেন, না খেয়ে আছেন, রাতে ঘুমিয়ে ছিলেন কি ঘুমাননি। কোন কিছুই তার মুখের হাসি উচ্ছ্বাস কেড়ে নিতে পারতো না।
আমাদের পরিবারের পরিবেশে কিন্তু ধর্মচর্চা প্রচ্ছন্ন ছিলো। আব্বা-আম্মা নিয়মিত নামাজ রোজা ইত্যাদি পালন করতেন, বড় বোনেরাও। বলা হয়নি আমার দুই ভাইয়ের উপরের দিকে তিন বোনই বড়। তারাও কলেজ-স্কুলের মত নিয়মিত নামাজ এবং রোজা পালন করতেন। আমাদের বাসার চারপাশে কিছু হিন্দু পরিবার ছিলো। একেবারে পেছনের বাড়িটি ছিলো এক বৃদ্ধা হিন্দু বিধবার। এক ছেলে, ছেলে বউ এবং নাতি নিয়ে তার সংসার। বাড়ির আঙিনায় বড় বড় আম-কাঁঠালের গাছ ছিলো। আমগাছের শাখা বিস্তার করে থাকতো আমাদের বিল্ডিংয়ের ছাদের ওপর।

দুই.
আমার বড় ভাইয়ের ডানপিটে স্বভাবের সঙ্গে আমার সহযোগী ভূমিকাও কম ছিলো না। আমার বয়স এবং যোগ্যতা অনুসারেই চলতো এসব। এমন এক ডানপিটেপনার গল্প বলছি। আগেই বলেছিÑ আমরা যেখানটাতে বাস করতাম তার চারপাশে বেশ কিছু হিন্দু পরিবার বাস করতো। এ ছাড়া ভারত থেকে বিতাড়িত হয়ে উর্দুভাষী, যাদেরকে আমরা বিহারি বলতাম এদের একটা অংশও কলোনিতে বাস করতো। বলা হতো বিহারি কলোনি। জানা যায়, এরা নাকি মুসলমান হওয়ায় হিন্দুদের দ্বারা নির্যাতিত হয়ে জীবন বাঁচাতে সর্বস্ব ত্যাগ করে পূর্ব পাকিস্তানে আসে। এরা সবাই যে ভারতের একটি রাজ্য বিহার থেকে এসেছিল এমন নয়। ভারতের অনেক রাজ্যেই সংখ্যালঘু মুসলমান উর্দুভাষীর বসবাস ছিল। এরা হিন্দুদের দ্বারা বিতাড়িত হয়ে এ দেশে আসে। কিন্তু এদের অধিকাংশের ভাষা উর্দু বা এর কাছাকাছি হওয়ায় বিহারি হিসেবেই পরিচিতি পায়। আজও বাংলাদেশে এদের পরিচয় বিহারি। প্রকৃত পরিচয় রিফিউজি বা উদ্বাস্তু।
একটা বিষয় আমি ছোটকাল থেকে লক্ষ করেছিÑ মোহররম মাস এলে এসব বিহারি, যারা শিয়া অন্তর্ভুক্ত মুসলমান, কারবালার শোকাবহ ঘটনাকে নিয়ে নানা আনুষ্ঠানিকতা নিয়ে মেতে উঠতো। তেমনি হিন্দু সম্প্রদায় শারদীয় দুর্গাপূজা শিব, সরস্বতী, লক্ষ্মী, কালী, দোল ইত্যাদি পূজা নিয়ে বেশ আনুষ্ঠানিকতা ও উৎসবে মুখর হতো। এসব ধর্মীয় অনুষ্ঠানে কোন হামলা হয়েছে বা অপ্রীতিকর কোন ঘটনা ঘটেছে, কখনো শুনিনি।
বরং আমার বড় বোনেরা দল বেঁধে হিন্দু বান্ধবীদের বাড়িতে পূজার মিষ্টি খেয়ে আসার নানান গল্প বলতে শুনেছি। আমিও বড়ভাইকে সঙ্গে নিয়ে পূজার মিষ্টি খেতে দুলাল স্যারের ঘাড়ে চড়ে বসেছি বহুবার। ঘাড় মানে গর্দানে নয় কিন্তু। হাত ধরেই। আমাদের বাসার আশপাশের হিন্দু এবং মুসলিম পরিবারদের সঙ্গে সমান সুস্পর্ক ছিল। আমাদের শৈশবকালে মানুষের ধর্মকে কেন্দ্র করে মানবিক সম্পর্ক ও বন্ধুত্বে কোন বাধা দেখিনি। অপর ধর্মকে ক্ষুদ্র জ্ঞান না করাও আমাদের ছোটকালে শিক্ষার একটি বিষয় ছিলো বোধ হয়, এ কারণেই আমার স্কুলজীবন আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছিল ভৈরব বাজার কালিবাড়ী অবৈতনিক প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। স্কুলটির নাম এমনটি ছিল কি না তা নিশ্চিত নই। তবে যে স্কুলটি ছিল ভৈরব বাজার এবং একটি কালিবাড়ী মন্দির। সে বিষয় অন্য স্থানে বলব।
হিন্দুদের পূজা পার্বণের সংখ্যা তো কম নয়। বলা হয় বারো মাসে তেরো পার্বণ ওদের। তার আমাদেরও এসব উৎসব পার্বণের অনেক আনন্দ অনুষ্ঠান নাড়া দিতো। যেমন বৃষ্টির দাপাদাপি শেষ হয়ে যখন আসে আকাশে পেঁজা তুলোর সারি সারি ভেসে যাওয়া মুগ্ধকর দৃশ্য। মাঝে মাঝে অল্প কিছু সময়ের জন্য বৃষ্টি। বাগানে শিউলি ফুলের সৌরভ। তার মানে শরৎ সমাগত। এ সময় হিন্দুদের এক মজার উৎসব ছিল।
ঘুড়ি উড়ানো। নানা রঙের, নানা ডিজাইনের, নানা আকৃতির ঘুড়িতে ছেয়ে যেতো আকাশ। যাকে বলা হতো হাকরান। অর্থাৎ সাকরান। এসব ঘুড়ির আবার বাহারি নাম ছিল। যে ঘুড়ির উপরের কিছু অংশ এক রঙ তাকে বলা হতো নাকবরুঙ্গী। যে ঘুড়ির নিচের কিছু অংশ ভিন্ন রঙ তাকে বলা হতো পেট কাটা, চাপরাশ, পাঙ্গাশ ইত্যাদি। এ দিনের বেশ আগ থেকেই ধুম পড়ে যেতো ঘুড়ি উড়ানো। ঘুড়ি উড়ানোর মত মজার খেলায় ছিল না হিন্দু-মুসলমান বিহারি-বাঙালির কোনো ভেদাভেদ। নানা বয়সের ছেলে-বুড়ো (পাঁচ থেকে পঞ্চাশ) ঘুড়ি উড়াতো।
আমাদের বাসাটি অফিসসংলগ্ন হওয়া দোতলাজুড়ে ছিল কার্নিশ ঘেরা এক বিশাল ছাদ। ছাদের লাগোয়া ছিল এক মজার চিলেকোঠা। এই চিলেকোঠাটি ছিল আমার বড় ভাইয়ের এবং আমার যাবতীয় দুষ্টুমি করার সরঞ্জাম লুকিয়ে রাখার গুপ্ত স্থান। কী কী সরঞ্জাম এখানে রাখা হাতো? রাখা হতো ঘুড়ি, ঘুড়ির নাটাই, ঘুড়ির সুতোয় ‘মানজা’ দেয়ার নানা সরঞ্জাম। মানজা দেয়া মানে ঘুড়ি উড়ানোর একটি উদ্দেশ্য থাকতো অপর ঘুড়িকে প্যাঁচ খেলে ‘ভাকাট্টা’ করা। সে জন্য সুতোর ব্যাপারে বিশেষ পদ্ধতিতে যতœ নেয়া হতো। যাতে সুতো মজবুত এবং ধারালো হয়। নানা পদ্ধতি প্রয়োগ করে সুতোয় মানজা দেয়া হতো। সুতোয় নানা রঙও দেয়া হতো। তারপর চিলেকাঠায় রাখা হতো পাখি শিকারের জন্য গুলতি এবং মাটির মার্বেল। এঁটেল মাটি বিল থেকে এনে ছোট ছোট মার্বেল বানিয়ে রোদে শুকানো হতো যা গুলতি দিয়ে ছুড়ে পাখি শিকার করা হতো। এটাও ছিল এক মজার খেলা। মাঠে মাঠে বনে বনে গুলতি নিয়ে ঘুরে বেড়ানো।
চিলেকোঠায় একটা কাঠের একজনি সাইজের চৌকি ছিল। মাদুর পাতা থাকতো তাতে। এখানে এসে শুয়ে বসে যাতে সময় কাটানো যায়, রাগ-অভিমানে আত্মগোপন করায় ছিল চিলেকোঠাটি পরম আশ্রয়। শুধু আমার একার নয়, আমাদের সকল ভাইবোনের। এমনকি আম্মাও অলস দুপুরে গ্রীষ্মের রাতে এসে গা এলিয়ে দিতেন। আমরাও সঙ্গী হতাম তার।
দুলাল স্যার আমাদের শুধুমাত্র লেখাপড়ার গুরু ছিলেন না শৈশব কালে, নানা দুষ্টুমি খেলাধুলায় পারদর্শী হয়ে ওঠারও গুরু ছিলেন। এতো যে বন্ধুর মতো তিনি ছিলেন তবু পড়ার টেবিলে দেখেছি আমার বোন-ভাইদের যমের মত ভয় করতো দুলাল স্যারকে।
ঘুড়ি উড়ানো আমরা নিজে নিজে খানিকটা রপ্ত করেছি সবে। তবে ঘুড়ি বানানো, সুতোয় মানজা দেয়া এবং নাটাই বানানোÑ এসব বিদ্যে দুলাল স্যারই অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে বড় ভাইকে শিক্ষা দেন। বড় ভাই আবার পড়াশোনায় বুদ্ধিমান বালক বা ভালো ছাত্র হিসেবে প্রমাণ করতে না পারলেও এসব অপাঠ্য বিষয়ে তার বুদ্ধি ও দক্ষতার ছাপ বেশ প্রকাশ পেয়েছিল। তাই স্যারের দেয়া প্রশিক্ষণকে কাজে লাগিয়ে আমাদের ঘুড়ি বিদ্যা বেশ বিকাশ লাভ করেছিল।
একদিন বিকেলে আমার বড় ভাই ঘুড়ি উড়াবে বলে ঘুড়ি এবং সুতোর রেল বা গুটি কেনার বায়না ধরে আম্মার কাছে। উপস্থিত ছিলেন দুলাল স্যার। শুনে ফেলেন সেই আবদারের কথা।
খোকা! আমার কাছে আয়, আমি দেবো কিনে তোর সুতো এবং ঘুড্ডি। স্যার সস্নেহে ডাকলেন বড় ভাইকে।
বড় ভাই আম্মার কাছ থেকে সরে স্যারের কাছে গিয়ে দাঁড়াল। আমাদের ভরসা ছিল স্যারের ওপর। এসব ছোটখাটো আবদার তিনিই রক্ষা করতে এগিয়ে আসেন।
আমার ভাই আশ্বস্ত হয়ে জিজ্ঞেস করে, কবে?
কালই তোর ঘুড্ডি আর সুতো পাবিÑ এখন মন দিয়ে পড়।
দুলাল স্যার আমাদের কাছ থেকে পড়া আদায়ের জন্য বেতের চেয়ে নানান ছোটখাটো উপহার দিয়ে তা করতেন। বেত তুলতেন হাতে নৈতিক অপরাধের জন্য বেশির ভাগ। আর যখন খুব স্নেহপ্রবণ হতেন তখন তুমির পরিবর্তে তুই ব্যবহার করতেন। তার প্রত্যেকটি আচরণে এমন আন্তরিকতা এবং হৃদয়ের তাপ থাকতো যে আমরা ছিলাম মুগ্ধ এবং ভক্ত।
পরদিন দুপুর বেলা। আমরা দুপুরের খাবার গ্রহণের প্রস্তুতি নিচ্ছি। সেদিনটা একটু বেলা গড়িয়ে গিয়েছিল। আকাশেও বেশ মেঘ জমেছে। দু-এক ফোঁটা বৃষ্টিও ঝরছে সকালটায়। দুলাল স্যার হাজির। হাতে কয়েক তা রঙিন কাগজ, কয়েকটি সুতোর গুটি আর বাঁশের কঞ্চি একখান।
স্যারের হাতে বাঁশের কঞ্চি দেখে আমাদের আত্মায় পানি নেই। আজ নির্ঘাত এই বাঁশের কঞ্চি ব্যবহার করা হবে আমাদের পিঠের ওপর। প্রমাদ গুনলেন আমার তৃতীয় বোনটি, রানু। যার প্রায়শ বাড়ির পড়া না করার অভ্যাস আছে। কিন্তু না, দুলাল স্যার সবাইকে ডেকে আশ্বস্ত করলেন এই কঞ্চি পিঠে ব্যবহারের জন্য নয়। ঘুড়ির কামানি হিসেবে ব্যবহারের জন্য। কামানি এই প্রথম আমরা শুনলাম।
খোকা! এদিকে আয়। দুলাল স্যার আবেগ নিয়ে ডাকলেন। বড় ভাই গুটিসুটি পায়ে কাছে গেলো।
শোন বোকারাম, ঘুড্ডি কিন্না কয়টা উড়াবি, ঘুড্ডি বানানোর কৌশলটা এইবার শিখাইয়া দিমু, আর কিনতে হইবো না। বিক্রিও করতে পারবি। হা: … হা: … হা:…।
দুলাল স্যার প্রাণ খুলে হাসলেন। তারপর হাওয়াই শার্টের পকেট হতে বের করলেন একটা পুরিয়া। এই যে এই পুরিয়ার মধ্যে আছে জিয়ল গাছের আঠা, বুঝলি! হা: … হা: … হা:…
কিসের আঠা স্যার? বড় ভাইয়ের প্রশ্ন।
এক ধরনের গাছ, জিয়ল গাছের কষ, যা পানিতে ভিজাইয়া তরল এক প্রকার আঠা তৈরি হয়। এই আঠা দিয়ে জোড়া দেয়া যায় কাগজ।
এসব মুখে বললে কিচ্ছু বুঝবি না। প্র্যাকটিক্যাল দেখতে হইবো। যা দৌড় দিয়া নিয়া আয় একটা মাটির ছোট পাতিল। হাতুড়ি, এক মগ পানি আর বাটি। দুলাল স্যার খুব উৎফুল্লভাবে বললেন।
বড় ভাই ভোঁ দৌড় দিলো। ফরমায়েশ মত জিনিসগুলো আনতে।
চল ছাদের চিলেকোঠায়Ñ এখানে মা, বকবেন খোকা। ছাদে আসিসÑ ড্রয়িং রুম থেকে উঠলেন দুলাল স্যার। হেলে দুলে চললেন। আমরা তার পেছন পেছন। আমি এবং মেজবোন রানু। চলে এলাম সোজা চিলেকোঠায়। এখানে এলে আমাদের মাথায় যতো সব দুষ্টুমি বুদ্ধি পাখা গজায়। দুই কাঁধে বুঝিবা পাখনা জুড়ে দেয় কেউ! অবাধ স্বাধীনতা এখানে।
আমি ছোটবেলায় আকাশে উড়েছি বহুবার।
আমাদের ঐ বাসার বিশাল ছাদ থেকে কতোবার উড়েছি! দুই পায়ের আঘাতে ¯িপ্রং করে লম্বালম্বি শূন্যে উঠে গেছি। তারপর চিৎ হওয়া ভঙ্গিতে আকাশে উড়ে বেড়ানো। কী যে মজা বোঝানো যাবে না। বেশ কিছু সময় আকাশে উড়ে আবার ছাদে এসে ধপাস। ধপাস মানে ঘুম থেকে জেগে ওঠা, এই স্বপ্নটা আমার খুব প্রিয় ছিলো। প্রায়ই দেখতাম।
ছাদে এসে দেখা গেল ভাদ্দরের মেজাজি রোদ। এমন দিনে আম্মা পশমি কাপড়, লেফ তোশক বালিশ রোদে দিয়েছেন ছাদে। ভাদ্দরের রোদ লাগালে নাকি পোক-মাকড় কাটে না। আগে তো পোকা-মাকড়ের বিরুদ্ধে তেমন কোন ব্যবস্থা ছিলো না। নেপথলিন পাওয়া যেতো। কিন্তু ঐ নেপথলিন একবার আমার বোন রানু শুঁকতে গিয়ে নাকের ভেতর পাচার করে দিয়ে কী দশা! সেই থেকে ঐ নেপথলিন নিষিদ্ধ আমাদের বাসায়।
ছাদে ঝাঁজালো রোদ তাতে কী, চিলেকোঠা আছে না? দু’দিক দরোজা দিয়ে হু হু বাতাস ঢুকে এই চিলেকোঠায়। ভাদ্দরের তেতে ওঠা গরম বাতাস। মন্দ নয়। বাতাস গরম হোক শীতল হোক, বাতাস মানেই স্বস্তি ও আরামদায়ক।
শোন ছোটন! দুপুরে খাবারটা সেরে আয় ঘুড্ডি বানাতে। অনেক সময় লাগবে, যা। রানু তুইও যা! দুলাল স্যার বললেন।
চিলেকোঠায় চৌকিতে আমরা বসে ছিলাম। এই চৌকির নিচে আমাদের রাজ্য। আমাদের মন পড়ে আছে কিভাবে ঘুড্ডি বানাবে স্যার দেখার জন্য। খিদের কথা ভুলেই গেছি। অপেক্ষা করছি কখন বড় ভাই সরঞ্জাম নিয়ে হাজির হবে। কখন শুরু হবে ঘুড্ডি বানানো। ছোট আপু রানুর সঙ্গে চোখাচোখি করে আবার স্যারের মুখের দিকে তাকালাম আমি। আরো কিছু সময় থাকার অনুমতি চাই।
এমন সময় বড় ভাই এসে হাজির বঁটি ছাড়া। স্যার, আম্মা বঁটি দিলেন না, ধার নষ্ট হবে বলে।
ঠিক আছে আমিই যাইতাছি। ওটা মা আমারে না দিয়ে পারবেন না। দুলাল স্যার হন্তদন্ত হয়ে নামলেন। আমরা বসে রইলাম।
স্যার সোজা রান্না ঘরের দুয়ারে দাঁড়িয়ে বললেন, মা, আপনাকে একটা আরো বড় ইস্পাত খণ্ড দিয়ে বঁটি বানাইয়া দিমু। বঁটিটা একটু দেন মা, ধার নষ্ট হইলে তাও তুইলা দিমুনে!
ঠিক আছে নাও ধার নষ্ট হলে কিন্তু ধার তুলে দিবাÑ আম্মা একটা কাপড় দিয়ে পেঁচিয়ে এগিয়ে দেন বঁটিটা।
দুলাল স্যার বিজয়ের বেশে হাসিমুখে বঁটি হাতে চিলেকোঠায় ফিরে এলেন। আমরাও স্যারের বিজয়ের আনন্দে খুশি।
মনে পড়ে দুলাল স্যার ঠিকই একটা বঁটি বানিয়ে আম্মাকে দিয়েছিলেন যা বহুদিন আমাদের সংসারে কাজে লেগেছে।
তোরা সবাই যা ভাত খাইয়া আয়Ñ মা বকবেন। অনেক বেলা হইলো আমি ঘুড্ডির কামানি বানাই বইসা বইসা।
কিন্তু স্যার, আপনি খাবেন না? বড় ভাই বললেন আমতা আমতা করে।
আমি খাইয়া আইছি খিদা নাই। তোরা যা।
দুলাল স্যারকে খাওয়ার কথা বললেই চট করে এক জবাব খাইয়া আইছি। কিন্তু আম্মা ভাল করে বললে খেতে বসে যান। মুখে বলবেন মা বলতেছেনÑ মায়ের কথা ফেলা পাপ?
আমরা আর কথা না বাড়িয়ে চলে এলাম নিচে খেতে। আমাদের খাওয়া দাওয়া হতো রান্নাঘরের একটা চৌকিতে বসে। চৌকির ওপর পাটি বিছানো। তার ওপর দস্তরখান বিছিয়ে দেয়া হতো। টিনের থালায় হতো খাওয়া দাওয়া। নিয়ম ছিলো পাঁচ ভাইবোন একসঙ্গে খাওয়ার।
আম্মার সুবিধার জন্য। আব্বার খাবার দেয়া হতো শোওয়ার ঘরে।
তাও নিচে একটা পাটি বিছিয়ে।
রান্নাঘরে এসে ঢুকতেই আম্মার গর্জনÑ খালি খেললে পেট ভরবে?
আমাদের দেরি দেখে বড় দুইবোন আগেই খেয়ে দেয়ে দুপুরে অলস ঘুমের বিছানায়।
আমাদের মন পড়ে আছে চিলেকোঠায়। খাওয়া তখন নস্যি! দ্রুত হাপুস হুপুস গিলে বের হতে যাচ্ছি, আবার গর্জনÑ ও কি! দুধ দিয়ে না খেয়েই উঠে যাচ্ছিস যে!
রাতে দুধ দিয়ে খাবো, বড় ভাই মিন মিন স্বরে বলল। বুঝতে পেরেছি মন পড়ে আছে ছাদে, তোদের স্যারকে পাঠিয়ে দে, খাবেÑ দুধ দিয়ে ভাত খাওয়া থেকে বেঁচে আমরা পড়িমরি ছাদে এসে হাঁপাতে হাঁপাতে এসে বললাম, ‘স্যার, আম্মা ভাত খেতে ডেকেছেনÑ’
আমি খাইয়া আইছি। স্যারের এক জবাব।
আমরাও আর কোন কথা বাড়ালাম না। জানি আম্মার হুকুম ছাড়া স্যার ‘অন্ন পাপ’ করেন না। মুসলমানের ঘরে ব্রাহ্মণ হয়ে ভাত খাওয়া নাকি হিন্দুশাস্ত্রে রীতিমত পাপ। দুলাল স্যার এই শাস্ত্র নির্দেশ মানেন না। কিন্তু কোনো এক অজানা লজ্জা থেকে তিনি চটকরে ভাত খেতে রাজিও হতেন না।
এসেই দেখলাম ঘুড্ডির কামানি তৈরি শেষ। বাঁশের কঞ্চি চিড়ে পাতলা পাতলা চারগাছা কামানি রেডি। দুটো একটু বড় এবং বাঁশের উপরি অংশ দিয়ে। আর দুটো একটু ছোট যা বাঁশের ভেতরের অংশ দিয়ে যা চ্যাপ্টা গোছের। ঘুড়ি কিনে উড়িয়েছি এর আগে। বুঝতে পারলাম চ্যপ্টা কামানি ঘুড্ডির মাঝের আর বড়টা একোণ ওকোণ বাঁকানো কামানি। কোনো অঞ্চলে একে কেনিও বলে।
স্যার এবার কী করবেন? বড় ভাইয়ের প্রশ্ন।
এইবার করুম আঠা তৈরি। ময়দা দিয়াও আঠা বানানো যায়। কিন্তু জিয়ল গাছের আঠা একবার বানাইয়া রাখলে বহুদিন যায়।
স্যার পুরিয়া বের করলেন শার্টের পকেট থেকে। এই আঠা আমাদের চেনা। পোস্ট অফিসে দেখেছি। খামে ইত্যাদি লাগাতে এই আঠা ব্যবহার করা হয়।
স্যার হাতুড়ি দিয়ে ঠুকে ঠুকে স্বচ্ছ কাচের মত বড় বড় আঠার দানাগুলো গুঁড়ো করে নিলেন। বেশ কয়েক মিনিট ধরে তিনি এ কাজটি করলেন। তারপর মাটির ছোট্ট পাতিলে ফেলে পানি দিয়ে নাড়তে থাকেন একটা কাঠি দিয়ে। এ কাজটাও বেশ কয়েক মিনিট করলেন।
খোকা! আইজ দুইটা ঘুড্ডি বানামু। লাল আর নীল রঙের।
স্যার, নাক বুরুঙ্গি বানান। বড় ভাইয়ের আবদার।
আইজ দুইরঙা মিশাল দিয়া বানামু না, সময় কম, আরেক দিন বানামু ।
আমরা চুপ। কথা বাড়িয়ে লাভ নেই। স্যার যা করার করবেন। লাল ও নীল রঙের ঘুড়ির কাগজ আনা ছিল আগেই। চৌকির তল থেকে বের করে আনলেন। দুটো কাগজ সমান সমান মাপে রেখে কোনাকুনি ভাঁজ করলেন। কোনাকুনি ভাঁজের পর বাড়তি অংশ দিয়ে আরেকটা ভাঁজ দিলেন।
খোকা, এই জায়গায় চেপে ধর। স্যার বললেন।
বড় ভাই কথা মত ভাঁজের দুই অংশে দু’হাত দিয়ে চেপে ধরলেন।
এরপর চৌকির নিচে রাখা নাটাই বের করে আনলেন স্যার। নাটাই থেকে হাত দুয়েক সুতা ছিঁড়ে নিলেন। সেই সুতো কাগজের ভাঁজের ভেতর ঢুকিয়ে দু’দিক থেকে করাতের মত টেনে কাগজ কাটলেন। চোখের পলকে ঘ্যাচাং করে কাগজ দ্বিখণ্ডিত হলো।
খোকা, ছুরি দিয়েও কাটা যাইতো এতে সহজে হইতো না, পাতলা কাগজ তো। স্যার আমাদের সবার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলেন।
ভাঁজ করা কাগজ মেলে ধরলেন। ঘুড্ডির আকৃতির হয়েছে। এরপর তিনি মাঝের কামানিতে আঠা লাগালেন ভালো করে। একটু বাতাস খাইয়ে শুকিয়ে নিয়ে দুটো কামানি কাগজের মাঝ বরাবর সেঁটে দিলেন। এরপর বড় কামানি ঘুড়ির একোণ ওকোণ বাঁকিয়ে এমনভাবে স্থাপন করলেন ধনুকের মত। দুই প্রান্তে, কাগজে আঠা লাগিয়ে কামানি মুড়ে দিলেন। অতিরিক্ত ছোট ছোট চার টুকরো কাগজ আঠা দিয়ে দুই প্রান্তের কামানিকে মুড়িয়ে লাগিয়ে দেন। যাতে কামানি ছুটে না যায়। এরপর তিন টুকরো কাগজ ঘুড়ির মাথায় মাঝে এবং লেজের অংশে লাগিয়ে দেন স্যার। আরো এক টুকরো পান পাতার আকৃতির কাগজ লেজে লাগিয়ে দিলেন। চোখের সামনে দুটো ঘুড্ডি বনে গেল। আমরা খুশিতে আত্মহারা। খোকা, আজকে উড়ানো যাবে না শুকাতে সময় লাগবেÑ চৌকির তলে চাপ দিয়ে রেখ দিলাম। এভাবে আজ থাকুক। স্যারের মুখে হাসি। দুলাল স্যারের মুখে সবসময় এমন হাসি লেগেই থাকে।
চলিরে, খোকা ছোটন রানু! বিকেল হইয়া গেল।
চিলেকোঠা থেকে বেরিয়ে সিঁড়ি দিয়ে দ্রুত নেমে গেলেন দুলাল স্যার। আকাশে তখনো ছেঁড়া ছেঁড়া মেঘ ভেসে যাচ্ছে।

তিন.

পরদিন মুষল ধারায় বৃষ্টি নামল। দুলাল স্যার এলেন না।
সারাদিন আকাশের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে কাটিয়ে দিলাম।
এমন নচ্ছার বৃষ্টিতে ঘুড্ডি উড়ানো যায়? তাই ছাদে উঠাই হলো না। তবে, আমাদের দুই ভাইয়ের খেলা থেমে থাকেনি। বৃষ্টির দিনে ঘরে বসে বসে নানা খেলায় মেতে থাকি আমরা। বোনেরা লুডু খেলে। ক্যারমও কখনো সখনো। খেলাকে আরো জমজমাট করে তুলতে শিমের বিচি, বুট, কিংবা বাদামভাজা খাওয়া চলতো। কুট মুট কুট মুট করে।
আমার এবং বড় ভাইয়ের নিজস্ব কিছু খেলা ছিল। যেমন চিকন গুনা বা তার দিয়ে দু’ধারে দুটো দিয়াশলাইয়ের বাক্স লাগিয়ে পরস্পর একটু দূর থেকে কথা বলা। এটাকে আমরা টেলিফোন খেলা বলতাম। আবার বারান্দায় কাপড় শুকানোর জন্য মোটা তারের ওপর সুতোর আগায় একটা ভাঙা চাড়া বা ভারী বস্তু বেঁধে ঝুলিয়ে রুটির বেলনকে নাটাই বানিয়ে ঘুড়ির বিকল্প হিসেবে খেলতাম। সেই সঙ্গে লুডু ক্যারমও চলতো। আমাদের সে সময়টা ছিল খুবই সাদামাট। তবে হাসি-খুশিতে ভরপুর। অল্পতে আমরা ছিলাম তুষ্ট।
এভাবে উসখুস করতে করতে দিন গড়িয়ে রাত এলো। বিছানায় শুয়ে শুয়ে দুই ভাই মিলে অনেক পরিকল্পনা আঁটলাম। ঘুড্ডি উড়ানো নিয়ে। ঘুড্ডি উড়ানো তখন রপ্ত। তবে প্যাঁচ খেলার মতো সুতো বা ঘুড্ডি ছিল না বলে সেটা আর হয়নি। কিন্তু যেহেতু ঘুড্ডি বানানো শিখে ফেলেছি দুলাল স্যার সঙ্গে আছেন এবার ভাকাট্টা খেলা আটকায় কে! সামনে সাকরান মানে ঘুড্ডি উড়ানো উৎসব। আমরাও প্যাঁচ খেলবো।
কিন্তু সমস্যা দেখা দিলো দুটো। এক. আমাদের নাটাই খুবই ছোট এবং হালকা। দুই. আমাদের সুতোয় মানজা নেই। সুতোয় মানজা দিলেই শুধুমাত্র অন্য ঘুড়ির সঙ্গে প্যাঁচ খেলা সম্ভব। মানজা দিলে মজবুত এবং ধারোলো হয়।
ভাইজান! মানজা দেবো কিভাবে সুতোয় মানজা না দিলে প্যাঁচ খেলায় হেরে যাবো তো। আমি বললাম। আমি বড় ভাইকে ভাইজান বলি।
মানজা দেয়া আমি শিখেছি, দিতে পারবো। ঐ যে বিহারি কলোনির আসলাম আছে না, ওই দিন ওরা মানজা দিলো। সারা দুপুর ছিলাম। বড় ভাই বলল।
কিভাবে দিতে হয় আবার জানতে চাইলাম।
মানজা দিতে হলে কাচগুঁড়া লাগে, সাগুদানা, জিয়ল গাছের আঠা, ডিম আর রঙ বুঝেছিস? বড় ভাই মাথা দুলিয়ে দুলিয়ে বিজ্ঞের মত বলল।
এতোসব! পাবো কিভাবে? অনেক পয়সাও লাগবে।
আমার কাছে পয়সা। আছে স্কুল যাওয়ার সময় আম্মা টিফিন খাওয়ার জন্য দুআনা দিতো, তা থেকে এক আনা এক আনা করে জমিয়েছি। বলেই বড় ভাই দেখাতে বিছানা ছেড়ে উঠে ছুটে যায়। কোথা থেকে, একটা পুরনো মোজার ভেতর অনেক খুচরো পয়সা ঝনাৎ ঝনাৎ শব্দ তুলে নিয়ে এলো।
ওমা এতো পয়সা! আমি ভরসা পেলাম।
বললাম তো আমি সব ব্যবস্থা করব, কোনো চিন্তা করিস না।
কাচগুঁড়া পাবো কোথায় আমরা? আবার আমার প্রশ্ন।
এইটা একটা সমস্যা বটে। কাচের টুকরো পাওয়া যাবে হামান দিস্তায় গুঁড়া করতে হবে। হামান দিস্তা জোগাড় করতে হবে, বিহারি কলোনির আসলাম ভাইকে বললে হয়তো দিবে। চিন্তাযুক্তভাবে বড় ভাই কথাগুলো বললো। গালে হাত দিয়ে ভাবছে।
আজ আকাশ বেশ পরিষ্কার। বৃষ্টির সম্ভাবনা নেই। দুলাল স্যারের বানানো ঘুড্ডি আজ আকাশে উড়বে। স্যার না এলেও আমরা উড়াবো।
আমাদের তর সইছিলো না। গ্রীষ্মের ছুটি চলছিল। বোনেরা কেউ কলেজ স্কুলে যায়নি। বড় ভাইও না। সকালের পড়াটা বোনদের কাছে সেরে ছাদে উঠেছি। বেশ সুন্দর সকাল। মিষ্টি মিষ্টি রোদ। ঝিকমিক করছে চারদিক। গতকালের বৃষ্টিতে গাছপালাও বেশ সজীব।
ছাদে এসেই দেখা গেল বিহারি কলোনির মাঠ থেকে দু’একজন বিহারি বালক আকাশে ঘুড্ডি উড়িয়েছে। আমরা যেহেতু ছাদ থেকে ঘুড্ডি উড়াই আমাদের সুবিধাটা বেশি। ঘুড্ডিতে হাওয়া লাগে জলদি।
এসেই লাল রঙের ঘুড্ডিটা বের করে আনলো বড় ভাই। তারপর নাটাই থেকে লম্বা সুতো নিয়ে চার ভাঁজ দিয়ে পাক দিয়ে মোটা করল। ঘুড্ডির মাথার দিকে কাঠি দিয়ে ছিদ্র করল। পরে সেই সুতো দিয়ে বাঁধলো। ঘুড্ডির মাঝামাঝি এসে আরো দুটো ছিদ্র করল। সেই সুতোর অপর প্রান্ত দিয়ে শক্ত করে বাঁধলো এরপর বাধা অংশ সুতো দিয়ে মাপ নিয়ে একটা গিট্টু দিলো।
যেখানে গিট্টু দিলো তার থেকে চার-পাঁচ আঙুল সুতোয় নাটাইয়ের সুতোর সঙ্গে বাঁধল।
এসব কাজ বড় ভাই খুব যতেœর সঙ্গে করল। এ ব্যাপারে আমি নীরব দর্শক। অবশ্য আমিও ঘুড্ডি উড়াতে পারি। ছোট সাইজের।
ছোটন, ঘুড্ডি নিয়ে ছাদের ও প্রান্তে যা। বড় ভাই বললো। ঘুড্ডি উড়িয়ে দেবার জন্য। আমি সেভাবে উড়িয়ে দিলাম।
বাহ! একবারেই ঘুড্ডি উড়ে গেল। আমার তখন মনে অনেক আনন্দ। লাফালাফি করতে থাকলাম। তার সঙ্গে চিৎকার।
আমাদের ঘুড্ডি তখনো আকাশে হেলে দুলে উড়ছে। গোত্তা খাচ্ছে। উলট পালট হচ্ছে। সুতো ছাড়লে চড়কির মতো ঘুরছে। কী মজা! কী মজা!
এসব কী হচ্ছে? আব্বার গলার গর্জন। সময় কখন যে আব্বা ছাদে উঠে এসেছেন আমরা খেয়াল করিনি। হাতে একটা রুলার।
আমি ভোঁ দৌড় দিতে যাবো ধরা পড়লাম আব্বার হাতে। বড় ভাই জলদি ঘুড্ডি নামিয়ে আনতে গিয়ে প্যাঁচ খেয়ে ভাকাট্টা হয়ে গেল। নাটাইয়ে সুতো গুটিয়ে আনা শেষ না হতেই বড় ভাইয়ের কান আব্বার হাতের মুঠোয়। এরপর? যা হয়ে থাকে আর কী! রুলারের আঘাত আমাদের পিঠে দুটো। অবশ্য রুলার কাঠের ছিলো না কাগজের। রুল টানার জন্য আব্বার নিজের বানানো বিশেষ রুলার ছিলো। ব্যথা পেলাম যতোটা না পিঠে তার চেয়ে মনে। কারণ আব্বা আমাদের কদাচিৎ মারধর করতেন। বকাঝকা চোখ রাঙানিতেই আমরা ছিলাম কাবু। মারের চোটে কাতর।
বাসায় এসে দু’জনের কান্না চলছিল। পাল্লা দিয়ে কে কতক্ষণ শোক প্রকাশ করতে পারি। আম্মা অনেক আদর সোহাগ দিয়ে থামাতে চাইলেন। বড় বোনেরাও। নাহ কোন কিছুতেই আমাদের অশ্রুধারাকে রোধ করা যাচ্ছিল না। অবশেষে আব্বা এলেন এগিয়ে। বাজার থেকে রসগোল্লা আনিয়ে তা মুখে তুলে খাওয়ালেন। হাতে দিলেন চকচকে একটা পুরো এক টাকার কয়েন। দু’জনকে দুটো। আমাদের কান্না থেমে গেল। দুই টাকার কয়েন মানে অনেক সুতোর গুটি, ঘুড়ি বানানোর কাগজ, নাটাই, মানজা দেয়ার সরঞ্জাম কেনার উপায়। তাই কান্না থামবে না কেন।
দেখতে দেখতে সপ্তাহ ঘুরে এলো। ঘুড্ডি উড়াতে গিয়ে আব্বার রুলারের আঘাত খাওয়ার স্মৃতিটা চাপা পড়ে গেছে। তবে এ ক’দিন ঘুড্ডি উড়াইনি। ছাদে গেছি। আকাশের দিকে তাকিয়ে অন্যদের নানা রঙের ঘুড্ডি দেখে সময় পার করেছি। প্যাঁচ খেলা দেখেছি। ভাকাট্টা লুট বলে ছাদের ওপর থেকে চিৎকার ছুড়েছি।
সপ্তাহ ঘুরে আসার পর সেদিন হঠাৎ দুলাল স্যার এসে হাজির। এ ক’দিন না আসতে পারার কারণ জ্বর। দেখেই বোঝা গেল জ্বর স্যারকে কাবু করে গেছে। স্বাস্থ্য এমনিতে লিকলিকেই। আরো হাড় বের করা লিকলিকে হয়েছে। গায়ের রঙের কালোটা আরো অন্ধকার রূপ নিয়েছে।
কী বাবা দুলাল! একটা খবর তো দিতে পারতে। অসুখ করে কোথায় পড়ে ছিলে এতো দিন? আম্মা ¯েœহমাখা কণ্ঠে বললেন। জ্বরে তোমার স্বাস্থ্য ভেঙে দিয়ে গেছে। কয়েক দিন ভাল-মন্দ খেতে হবে। আজ রাতে আমার এখানে খাবা। না না বলবা না দুলাল! বলে আম্মা গেলেন রান্না ঘরের দিকে।
স্যার আজ আমরাও পড়বো না। আপনার শরীর ভাল হোক।
আমার শরীর ভালই আছে এখন। পড়া করবি তোরা, আমি বইসা থাকমু। চল পড়ার ঘরে।
দুলাল স্যার বারান্দার একটা মোড়ায় বসা ছিলেন। উঠলেন। আমাদের গল্প গুজব বিকেলের চা পর্ব চলতো বারান্দায়। এই বারান্দায় চারটে মোড়া, একটা জলচৌকি, একটা ইজি চেয়ার এবং ছোট্ট কাঠের রাউন্ড টেবিল ছিল। বেশি জনসমাগম ঘটলে শীতল পাটিও বিছানো হতো।
আমাদের পড়াশোনার জন্য ছিল একটা আলাদা ঘর। যেটা একটা পার্টিশন দিয়ে অর্ধেকটা বসবাসের জন্য দেয়া হয়েছিল পিওন বিহারি সলিমকে। মধ্য বয়সী সলিম হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গায় ভারতে পরিবার পরিজন সবাইকে হারিয়ে একা পূর্ব পাকিস্তানে এসে মাথা গুঁজেছে। লেখাপড়া খানিকটা জানতো। তাই পোস্ট অফিসের পিওনের চাকরি পায়।
আব্বা এই অসহায় লোকটির প্রতি সহানুভূতি দেখাতে পোস্ট অফিসের লাগোয়া পড়ে থাকা কামরাটির একাংশে থাকার অনুমতি দেন। নিজেই রান্না করে খেতো সলিম খান।
সেই কামরার অর্ধেকটাতে একটা কালো কুচকুচে বড় টেবিল। একটা বেঞ্চ। হাতাওয়ালা দু’খান চেয়ার। আমাদের রিডিং রুম হিসেবে ব্যবহৃত হতো।
স্যারের পেছন পেছন সেই বিল্ডিং রুমে এসে বসলাম। আমি, ভাইজান ও রানু আপা।
স্যার, সেদিন ঘুড্ডি উড়াতে গিয়েÑ
চুপ চুপ মুখে আঙুল চেপে আমাকে থামিয়ে দেয় ভাইজান।
কী হইছিল? দুলাল স্যার উৎসাহ নিয়ে মুখ এগিয়ে দিলো।
আমি বলছি স্যার! স্যারের উৎসাহ দেখে রানু আপা গড় গড় করে পুরো ঘটনা বর্ণনা করলো।
স্যার, আমরা সাকরানে ঘুড্ডি উড়াবো না? ভাইজান কাঁদো কাঁদো কণ্ঠে বলল।
অবশ্যই উড়াবো, আলবৎ উড়াবোÑ আমি একটা বড় নাটাই কিন্না রাখছি। সুতায় মানজা দিমু। ঘুড্ডি বানামু। আর মাত্র চার দিন বাকি। সব ব্যবস্থা আমি করুম। বাবার কাছ থেইকা অনুমতি আমি লমুনে। হইছে এইবার মনডা লাগাইয়া সবতে পড়তো!
আমরা পড়ায় মনোযোগ দিলাম।
ক লয় আকারে কলা, গয়ে কারে গা ছা গাছ কলাগাছ। মাথা দুলিয়ে দুলিয়ে পড়তে থাকে বড় ভাই।

চার.

দেখতে দেখতে সাকরান চলে এলো। ‘সাকরান’ মানে ঘুড্ডি উড়ানো উৎসব। সকাল থেকেই সাজে সাজ রবÑ কে কার আগে আকাশে ঘুড্ডি উড়াতে পারে। সেটার একটা পাল্লা চলে। তাই খুব সকালেই আকাশে ফর ফর শব্দ। মানে বেশ কয়েকটা ঘুড্ডি আকাশে উড়ছে।
দুলাল স্যার যথাসময় হাজির। সুতোয় মানজা দেয়া এবং ঘুড্ডি বানানোর কাজ গত পরশু শেষ। আমাদের মনে খুশি। আমরা ছাদ থেকে সাকরান দিনে ঘুড়ি উড়াবো। প্যাঁচ খেলবো। বড় নাটাই ভর্তি সুতো। মানজা দেয়া। এসব কাজ অবশ্য স্যার আব্বার আম্মার অনুমতি নিয়ে করেছেন। আমাদের তাই ভয় নেই। তবে ছাদে অন্য কোন ছেলের উপস্থিতি নিষিদ্ধ। আব্বার কড়া হুকুম।
দুলাল স্যার সকাল নয়টার দিকে এসে চা নাস্তা খেলেন। আম্মার সঙ্গে বসে গল্প করলেন। আমাদের তর সইছিল না। উসখুস করছিল মন। কখন ছাদে যাবো। ঘুড়ি উড়াবো। এর মধ্যে দু’বার বড় ভাই ছাদ থেকে ঘুরে এসে জানিয়েছে বিহারি কলোনি, পাল পাড়া থেকে ঘুড্ডি আকাশে উড়ছে।
ঘুড্ডি উড়ানো নিয়ে পাড়ায় পাড়ায় চলে পাল্লাপাল্লি। কোন পাড়ার ঘুড্ডি বেশি আকাশে উড়ে, কোন পাড়া প্যাঁচ খেলে বেশি ঘুড়ি কেটে দিতে পারে। এসব নিয়ে চলে কথা। মারামারিও ।
বেলা দশটার দিকে স্যার ছাদে এলেন হেলে-দুলে। রাজার চালে। সঙ্গে নিয়ে এসেছেন মুড়কি মুড়ি, মোয়া, বাতাসা, তিলের নাড়–। একটা কাপড়ের ব্যাগ থেকে বের করে দিলেন আমাদের হাতে হাতে।
খোকা, কোন রঙের ঘুড্ডি উড়াবি প্রথমে?
স্যার, লাল রঙের চাপরাশ।
ছোটন, কোনটা?
স্যার, সবুজ রঙের নাক বুরুঙ্গি।
রানু কোনটা?
হি… হি… হি … হি… জবাবে এক গাল হাসলো রানু আপা। মানে তার কোন মত নেই।
দুলাল স্যার একটা লাল নাক বুরুঙ্গি ঘুড়ি নিয়ে সুতো বাঁধতে শুরু করলেন। মুখে বললেন, ছোটনের নাক বুরুঙ্গি আর খোকার লাল রঙের মিলাইয়া নিলাম।
দুলাল স্যার সব সময় আমাদের মত নিতেন। প্রত্যেক বিষয় জানতে চাইতেন। আমরা কী বলি।
আমরা খুব মনোযোগ দিয়ে দেখছিলাম স্যারের ঘুড্ডি বান্ধা।  নিপুণভাবে সব কাজ করলেন স্যার।
নাটাইয়ের সুতোর সঙ্গে ঘুড্ডির বান্ধা সুতো বেঁধে বললেনÑ খোকা, যাতো উড়ানি দে তো।
ভাইজান খুশিতে আত্মহারা। হাসতে হাসতে ঘুড্ডি নিয়ে ছাদের উত্তর দিকে গেল। স্যার মুখে কী যেন বিড় বিড় করে পড়লেন। উড়িয়ে দিলো ঘুড্ডি।
আবহাওয়া বেশ ভালো। মৃদুমন্দ বাতাস বইছিলো। আকাশেও অনেক ঘুড্ডি। আমাদের চোখ তখন নানা রঙের ঘুড্ডি উড়াউড়ির পানে। আমাদের লাল রঙা নাক বুরুঙ্গি ঘুড্ডিও অনেক ঘুড্ডির মধ্যে শামিল হলো।
আমাদের ঘুড্ডিটা একটু উপরে উঠতেই একটা লাল পেটকাটা ঘুড্ডি প্যাঁচ খেয়ে গোত্তা দিতে দিতে এগিয়ে আসে। আমরা হাত তালি দিতে থাকি।
স্যার স্যার প্যাঁচ খেলেন। বড় ভাই বললো।
কোন পাড়ার ঘুড্ডিরে খোকা? ঘুড়ি উড়াতে উড়াতে জানতে চাইলেন স্যার।
বিহারি কলোনির স্যার, আসলামের।
তাইলে প্যাঁচ খেলান ঠিক হইবো না। ভাকাট্টা হইলে ঝামেলা করবো।
স্যার ঘুড্ডি সরিয়ে নেন আসলামের ঘুড্ডির কাছ থেকে।
বিহারি কলোনির মাঠ থেকে চিৎকার করতে থাকে বিহারি ছেলেমেয়েরা। ওরা বরাবরই চিল্লাচিল্লিটা বেশিই করে। ঘুড্ডি উড়ায় কম।
স্যার, প্যাঁচ খেলেন স্যার, ভাকাট্টা করেন, দেখছেন না কিভাবে চিৎকার করছে। এমন সময় পাল পাড়ার একটা সবুজ রঙের চাপরাশ ঘুড্ডি এগিয়ে আসে প্যাঁচ খেলার জন্য। আরো একটা নীল রঙের ঘুড্ডিকেও দেখা যাচ্ছে। গোত্তা দিয়ে এগিয়ে আসতে। বাগবাড়ি এলাকার।
খোকা, এই দুইটার সঙ্গে প্যাঁচ খেলুম। বলেই এক গোত্তায় পাল পাড়ার সবুজ চাপরাশের ওপর দিয়ে প্যাঁচ কষে দিলেন স্যার। তারপর আরো একটা গোত্তা নীল ঘুড্ডিতে প্যাঁচ এগিয়ে দিলেন স্যার। দিলেন সুতো ছেড়ে।
খোকা, আল্লাহ আল্লাহ কর, দুইটার সঙ্গে খেলতে গিয়ে না জানি নিজেরটা যায়। আল্লাহ আল্লাহ আল্লাহ আমরা জপতে থাকি।
নাটাই ধরে স্যার সুতো ছাড়ছেন। চেপে চেপে সুতো ছাড়ছেন। সুতো ছাড়ছেন। সুতো ছাড়ছেন। ঘুড্ডি চড়কির মতো ঘুরছে। সুতো ছাড়ছেন স্যার। চেপে চেপে। সবুজ চাপরাশ সুতো ছাড়ছে বেশি বেশি। নীলটাও ছাড়ছে সুতো বেশি। কিন্তু স্যার সুতো ছাড়ছেন কম। চেপে চেপে।
খোকা, সুতো বেশি ছাড়লে ভাকাট্টা হইলে নষ্ট হয় বেশি সুতো, আর কম কম ছাড়লে সুতোর ধারও লাগে বেশি। প্যাঁচ খেলনের এইডা একটা কৌশল, বুঝলি?
বলতে বলতেই চাপরাশটা ভাকাট্টা হয়ে গেল। আমরা চিৎকার করে উঠলামÑ ভাকাট্টা লুট,… ভাকাট্টা লুট…
স্যারের চোখে মুখে বিজয়ের হাসি। সকালের রোদ স্যারের মুখে এসে পড়েছে। সেই রোদের আলোয় স্যারের হাসিমাখা মুখ দেখে আমরাও খুশি। প্রথম বিজয় এলো। এরপর প্যাঁচ চলল নীল ঘুড্ডির সঙ্গে।
সুতো ছাড়ছে ছাড়ছে ছাড়ছে। ঘুড্ডি চড়কির মতো ঘুরছে। বেশি সুতো ছাড়ছে। ঘুড্ডিও বেশি ঘুরছে। স্যার চেপে চেপে সুতো ছাড়ছেন। ঘুড্ডিও ঘুরছে ধীরে ধীরে।
খোকা, বাগবাড়ির ঘুড্ডি তো মানজা দেয়া জানে ওরা, বাগবাড়ির সুনাম আছে ঘুড্ডি উড়ানোতে। বাগবাড়ির বেশ কিছু হিন্দু পরিবার আছে কায়স্থ। বণিক। ধুমধাম করে সাকরান পালন করে। ওদের সঙ্গে পারে না পালপাড়া, বিহারি কলোনি, ডাক্তার পাড়া।
আমাদের দৃষ্টিগুলো লালরঙা নাকবুরুঙ্গি আর নীল ঘুড্ডির দিকে। আকাশে ঘুড্ডির মেলা বসে গেছে। এর মধ্যে প্যাঁচ চলছে বেশ কয়েকটা। জমজমাট যুদ্ধ বুঝি চলছে আকাশে। ঘুড্ডির যুদ্ধ। আমরা মজা পাচ্ছি। ভীষণ। ছাদে এখন শুধু আমি বড় ভাই রানু আপা নয়। শামিল হয়েছে মীরা আপা, দিলু আপা এবং আম্মাও।
এমন সময় নীল ঘুড্ডি হলো ভাকাট্টা লুটÑ
দুলাল স্যারের চিৎকারের সঙ্গে আমরাও ভাকাট্টা লুটÑ চিৎকার ছুড়লাম। দ্বিতীয় বিজয় এলো।
সূর্য তখন মাথার ওপর। খাড়া দুপুর। পেটে বাজছে হারমোনিয়াম তবলা। ক্ষুধায় অস্থির সবাই।
খোকা, ঘুড্ডি নামাইয়া ফেলি। বিরতি। সবাই নামাইতেছে। সাকরানে দুপুরে একটা বিরতি হয়। বিরতিতে ঘরে ঘরে ভাল খাওয়া-দাওয়ারও আয়োজন করা হয়।
ঠিক আছে, স্যার নামিয়ে ফেলেন। পেটেও খিদা লাগছে। আবার বিকেলে উড়াবো। বড় ভাই মাথা চুলকাতে চুলকাতে বলল।
ফর ফর পর শব্দ ঘুড্ডির। নামিয়ে আনা হলো। আকাশে তখনো বেশ কিছু ঘুড্ডি। বেশির ভাগ বিরতিতে নামিয়ে ফেলেছে। এটাই স্বাভাবিক নিয়ম। তাছাড়া জমজমাট ঘুড্ডি উড়বে বিকেল বেলা।
বেলাই হয়ে থাকে। ব্যবসা বাণিজ্য বন্ধ করে অনেকে বিকেলে আসে সাকরান করতে। ঘুড্ডিও বেশি ওড়ে বিকেলে। চিলেকোঠায় নাটাই ঘুড্ডি ইত্যাদি রেখে নেমে এলাম সবাই নিচে।
দুলাল স্যার আজ আমাদের সঙ্গে খাবেন। সে জন্য আম্মা একটা রাতা মোরগ আর পোলাও রান্না করেছেন। সুগন্ধি চিকন চালের পোলাও। সুগন্ধে ভরে গেছে রান্নাঘর।
রান্নাঘরে না, তোমাদের খাবার দেয়া হয়েছে রিডিং রুমে। আম্মা বললেন।
হাত-মুখ ধুয়ে স্যারকে সঙ্গে নিয়ে আমরা সোজা চলে এলাম রিডিং রুমে। এসেই দেখলাম সলিম ভাই। আমাদের জন্য খাবার নিয়ে অপেক্ষা করছেন। আইয়ে স্যার, আইয়ে ম্যয় এন্তাজার করবা আপলোগোকো লিয়ে। সলিম ভাই বললেন। আম্মা বাসায় ভালো কিছু রান্না করলেই সলিম ভাইকে ভাগ না দিয়ে খান না। আম্মার মতÑ একা একা কান্না করে কী না কী খায় বেচারা। তবে সমস্যা হয় খাওয়া নিয়ে। সলিম ভাই ভাত খান না, পোলাও একটু আধটু খান। মিছলি অর্থাৎ মাছ মোটেই খান না। গোশতের মধ্যে মুরগি অল্প স্বল্প খান। গরু তার প্রিয়। আবার দুলাল স্যার গরু খান না। তাই দুলাল স্যার ও সলিম ভাইকে খেতে বলার আগে এসব ভাবতে হয়। তবে সলিম ভাই খুব গর্ব করে বলেনÑ হামি সব খায়, মিছলি ছাড়া। সলিম ভাই এক অদ্ভুত লোক। যতোবার আম্মা খেতে দাওয়াত দেন বিনয়ের সঙ্গে বলেন, আম্মা হামি তো আপনাকে খিলাইতে পারে না। আপনি আমাকে খিলান শুধু। আম্মা জবাবে বলতেন, তোমার বউ নাই, বাচ্চা কাচ্চা নাই। একা, তুমি কিভাবে খিলাইবে।
কিন্তু আমি ভাল পাকাইতে পারি আম্মা, হুঁ একদিন আমি পাকাইয়ে আপনাকে খিলাইব। সলিম ভাই বলতো।
একদিন সকালে ঘটলো এক অদ্ভুত ঘটনা। খুব সকালে এসে সলিম ভাই ডাকাডাকি শুরু করেছে, আম্মা আম্মাÑ
আম্মা তখন নাস্তা তৈরি করতে রান্নাঘরে এসেছেন। সলিম ভাইর ডাকাডাকিতে ছুটে আসেন। ভেবেছেন কোন দুঃসংবাদ আছে বুঝি। কী, সলিম বাবা, কী কোনো দুঃসংবাদ মুলুক থেকে? আম্মা হাত মুছতে মুছতে অফিসের লাগোয়া ঘরের পাশের বারান্দায় এসে হাজির। জিজ্ঞেস করলেন। সলিম ভাই সেখানে দাঁড়িয়ে।
না, আম্মা কোন দুঃসংবাদ না। মুলুকে আমার আর কে আছে। সব শেষ। সলিম খানের গলা ধরে এলো। আম্মা, আজকের সকালে নাস্তা আমি খিলাইব। কাচের বাটি বর্তন একটু দেন আম্মা!
আম্মা হতবাক। সলিম খান বলে কী। সারা রাত জেগে রান্না বান্না করেছে আমাদের জন্য! একজন মানুষ একা একা এতো মানুষের রান্না কিভাবে সম্ভব!
আম্মা দৌড় দিয়ে ঘরে এসে আব্বাকে ডেকে তুললেন। আব্বা সকালে কুরআন শরীফ তেলাওয়াত করে একটু জিরিয়ে নিচ্ছিলেন বিছানায়।
শুনেছ খোকার আব্বা, সলিম খান বলছে আমাদের জন্য রান্না করেছে। তুমি যাওতো দেখে আসো। পাগলটা কী করেছে।
আব্বা উঠে চলে এলেন। সলিম খানের কাছে। আব্বাকে দেখে খুব ঘাবড়ে গেলো সলিম। স্যার গলতি হ গিয়া, মুঝে মাফ কর নাÑ। হাতজোড় করে সলিম মাফ চাইলো।
কিন্তু সলিম তুমি একা একা কিভাবে রান্না করলে এতোগুলো মানুষের। আব্বা বললেন।
ইতোমধ্যে আম্মা কাচের বাসন কোসন নিয়ে হাজির। আব্বার সামনে থেকে বাঁচার জন্য আম্মার হাত থেকে সেগুলো নিয়ে নিজের ঘরে চলে গেলো। মাথা নিচু করে অপরাধীর মত।
সেদিন সত্যি এক অপূর্ব ভোজনপর্ব সেরেছিলাম আমরা।
ঘুম থেকে উঠেই গরম গরম পোলাও, কোর্মা, রেজালা খেতে পাওয়া চাট্টিখানি কথা না।
সেই সলিম খান আমাদের স্মৃতিতে আজো বেঁচে আছেন। মানুষ বেঁচে থাকে ব্যবহার আচরণ এবং মনুষ্যত্ব দিয়ে। বিত্ত বেসাত দিয়ে নয়। মাঝ বয়স পেরিয়ে মনে হয় এইসব মানুষই খাঁটি ছিল।
আজ যাদের কাছে পাই অধিকাংশ মেকি। রঙ চঙ মাখা শুধু।
আমাদের খুব যতœ করে খাওয়ালো সলিম ভাই। নিজ হাতে তুলে তুলে। দুলাল স্যারকে মেহমান হিসেবে বিশেষ যতœ নিলেন। সলিম খান হিন্দুদের দ্বারা নিপীড়িত নির্যাতিত হয়ে পূর্ব পাকিস্তানে এসেছেন। কিন্তু কোনোদিন দুলাল স্যারের প্রতি বিদ্বেষ প্রকাশ করতেন না। আমরা যেভাবে স্যারকে শ্রদ্ধা করতাম সলিম ভাইও তেমনটি করতেন।

পাঁচ.

অনেক দিন হয়ে গেল দুলাল স্যার আর বাসায় আসেন না। আমরা অপেক্ষা করে করে ধরে নিয়েছি তিনি বুঝিবা হারিয়ে গেছেন। আম্মা মাঝে মাঝে বলেন, ছেলেটা এলে বেশ ভাল লাগতো আমুদে ছিল। আব্বাকেও বলেন, তোমার পিওন-পেকারদের দিয়ে একটু খোঁজ নিতে পারো না? তুমি নিজেও একটু দেখতে পারো। বাজারের ধন বাবুর লাকড়ির দোকানে বসতো। সেখানে গিয়ে খোঁজ মিলতে পারে। দুলাল স্যার আসছেন না, এটা যেনো একটা অসহ্য অনিয়ম!
তবে এসব বলাবলির মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিলো। দুলাল স্যার ছিলো বেনো জলে ভেসে আসা কচুরিপানার মত। কোন স্থান থেকে এসেছে তার কোন খোঁজ করার প্রয়োজন নেই। তাই, স্যারের ঠিকানা নিয়ে তেমন কেউ মাথা ঘামায়নি। এমনভাবে দুলাল স্যার আসা-যাওয়া করতেন, আমাদের পরিবারের সঙ্গে মিশতেন যে এসব নিয়ে কোনদিন ভাবনা জাগেনি। আমরাও ভাবতে শুরু করেছিলাম দুলাল স্যার বুঝিবা এভাবেই আসা-যাওয়া করবেন। আমাদের পড়াশোনার দিকে নজর রাখবেন। ভালমন্দ কিনে খাওয়াবেন। আমোদ ফুর্তিতে অংশীদার হবেন। কিন্তু না, আমাদের ধারণা ভুল।
মানুষের অভাব বুঝিবা দীর্ঘস্থায়ী হয় না। শূন্যতাও চিরকালীন থাকে না। ইতোমধ্যে ভাই-বোনদের পড়ার জন্য অন্য একজন শিক্ষক এলেন। আমি বড় বোনদের কাছেই পড়ি। ও, বলা হয়নি, স্কুলে না গিয়েও আমার প্রমোশন হয়েছে ইতোমধ্যে। আগের আদর্শলিপি, নামতা পড়া শেষ করে এখন ক্লাস ওয়ানের সবুজ সাথী বগলদাবা করেছি। পড়ানোটা বড় বোনেরাই দেখছেন।
সেদিন ছিল পৌষের বিকেল। আম্মা আমাদেরকে নিয়ে বেড়াতে বের হয়েছেন। এভাবে বিকেল বেলা উদ্দেশ্যহীন বেড়ানোর অভ্যাস আছে আম্মার। শহরতলি বলে একটা সবুজঘেরা গ্রাম্য পরিবেশ বিরাজমান। রাস্তাও কোথাও শুধু মাটি কোথাও ব্রিক সয়লিং। হাঁটতে হাঁটতে অনেকটা পথ অতিক্রম করে গেছি আমরা।
খানিকটা এগোতেই পাল পাড়ায় প্রবেশ। কিন্তু কোন মানুষজন নেই ঘরে। পালরা মাটির বাসন কোসন বানায়। সেসব ভেঙে চুরে একাকার করেছে কারা। আমরা একটু অবাক হলাম।
পালরা গেল কোথায়? আম্মা বললেন। আমাদের সঙ্গে পাশের বাসার এক খালাম্মা ছিলেন। তিনিও অবাক দৃষ্টি এদিক ওদিক করলেন।
আপা, কোন খারাপ ঘটনা মনে হচ্ছে। খালাম্মা বললেন। সন্দেহ মিশ্রিত মনে আরেকটু এগোতেই একটা বিশাল মাঠ পেয়ে যাই আমরা। ছেলেরা ফুটবল, হাডুডু, দাড়িয়াবান্ধা খেলে থাকে। এমন বিকেল বেলায় মাঠে প্রচুর ছেলের সমাগম ঘটে। কিন্তু নেই। বরং চোখে পড়ল মাঠের পশ্চিম দিকের শেষ প্রান্তে অনেক শকুন আর কাকের ভিড়। গোধূলির লাল আলোয় চিক চিক করছে ওদের ক্ষুধার্ত চোখ। দূর থেকেই বোঝা যায় একটা লাশ। শকুন আর কাকের ভিড় সে কারণেই। মিলিত ভোজের এক আয়োজন চলছে।
আপা, মনে হয় এ পাড়ায় খুনাখুনির ঘটনা ঘটেছেÑ চলেন ফিরে যাই। দিনকাল ভালো নাÑ খালাম্মা বললেন।
এমন সময় মাঝ বয়ষী দু’জন পথিক কোত্থেকে আমাদের সামনে এসে দাঁড়াল। পথ আগলে।
আপনারা কোন পাড়ার, কোন বাড়ি যাবেন? বললেন একজন।
প্রশ্নের কী জবাব দেবেন ভেবে পান না আম্মা। চুপ থাকেন।
আপনারা জানেন না দেশে রায়ট লাগছে? ইন্ডিয়ায় সব মুসলমানদের মাইরা ফালাইতেছে? গত রাইত থাইক্যা রায়ট। আপনারা জলদি বসায় ফিরা যান। সইন্ধা হওনের আগে আগে। জলদি যান। বলে যেভাবে হন হন করে এসেছিল যেভাবে প্রস্থান করল।
আম্মার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল মুহূর্তে। আমিসহ সঙ্গে তিন বোন। পাশের বাসার খালাম্মা। সবার মুখের দিকে একবার তাকিয়ে বললেন, চল মীরা, দিলু জলদিÑ চলেন আপা পা চালিয়ে! এখানে এক মুহূর্ত থাকা নিরাপদ নয়।
কিন্তু ভয় যেখানে বাসা বাঁধে, সেটা তো মন। আর মনে যখন ভয় ঢোকে শক্তি সাহস পালিয়ে যায়। গায়ের জোরও পালায়। তাই, আমার পা এগোচ্ছিল ঠিক আগের মতই। এগোচ্ছিল না অন্যদের। ঘটনার গুরুত্ব বোঝার বয়স আমার হয়নি তখন। আমি ছিলাম আগের মতই উচ্ছল এবং স্বাভাবিক।
সন্ধ্যে লাগে লাগে, এমন সময় বসায় ফিরে এলাম আমরা। ঘরে ঢুকেই আম্মা আবার মুখোমুখি হলেন আব্বার। খোকার মা, কোথায় গিয়েছিলে, জান না দেশে রায়ট লেগেছে? আব্বা গলা চেপে ভীতু কণ্ঠে বললেন।
না, জানতাম না। রাস্তায় একজন লোক বলল। চলে এলাম।
আমিও জানতাম না। আশরাফ পিওনটা কানে কানে বলে গেলÑ আজ রাতে ভয়াবহ রায়ট লাগবে স্যার। ঘর-দোর বন্ধ করে চুপ থাকবেন। হিন্দুরা এসে আশ্রয় চাইলে দেবেন না। দরোজা খুলবেন না। একদম না।
তাহলে কী হবে গো আমাদের! আম্মা ফ্যাঁস ফ্যাঁস কণ্ঠে বললেন।
আম্মা এমনিতেই ভীতু। শিয়ালের ডাক, পেঁচার ডাক, পাখির ডাক রাতের বেলায় শুনে ভয় পান। আমরাও পাই।
আমাদের কোন ভয় নেই। সামনেই বিহারি কলোনি। কোন হিন্দু এখানে আক্রমণ চালাতে সাহস পাবে না। তাছাড়া রেডিও বলল, ১৪৪ ধারা জারি করা হয়েছে। দাঙ্গাবাজদের দেখা মাত্রই গুলির নির্দেশ সরকারের।
আব্বা আশ্বস্ত করলেন আম্মাকে। কিন্তু মুখ দেখে বোঝা গেল না খুব ভরসা পেলেন।

অন্যান্য দিনের মত ওই দিনের রাতটি আসেনি। বড় ভাই বোনরা পড়ার টেবিলে বসেনি। আমিও পড়াশোনা রেখে বিছানায় বসে। বড় বোনদের সঙ্গে গা ঘেঁষাঘেঁষি করে। খাওয়া দাওয়াও সন্ধ্যার পর পর সেরে নেয়া হয়েছে। তেল খরচ কমাতে ঘরে ঘরে হারিকেনের পরিবর্তে মাত্র দুটো জ্বালানো। তা-ও সলতে কমিয়ে ঢিম আলো করা। একটা গা ছম ছম করা ভয় ঘরময়।
আব্বা এশার নামাজ শেষে রেডিও শুনছিলেন। আমাদের বাসার বেডিও ছিল বেশ বড় সাইজের। মারফি। যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি। বড় সাইজের ব্যাটারি দ্বারা চালিত। সাউন্ড ছিল মাইকের মত। এ রেডিওতে হাত দেয়ার ক্ষমতা কারো ছিল না। আব্বা চালাতেন। খবর শোনার জন্য। গান বাজনা শোনা ছিল নিষেধ। তবে রবিবার ছোটদের জন্য সকালে প্রচারিত ‘কলকাকলি’ আর রাতে সপ্তাহের নাটক শোনার অনুমতি ছিল।
আব্বা সব সময় রেডিওর ভল্যুম কমিয়ে শোনেন। আরও কমিয়ে শুনছেন আজ। কী শুনছেন কী খবর তা আমাদের কিছু বলছেন না।
খোকার আব্বা, রেডিওতে কোন খবর আছে? ঘরে ঢুকেই আম্মার প্রশ্ন।
খুব খারাপ খবর মীরার মা, ইন্ডিয়ার ভুপাল, বিহার, গুজরাট, কলকাতা দিল্লিÑ সব জায়গায় দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়েছে। দলে দলে শরণার্থী পূর্ব পাকিস্তানে ঢুকে পড়ছে। আমাদের দেশেও কোথাও কোথাও দাঙ্গা লেগে গেছে।
হায় আল্লাহ! তুমি এই মুসিবত থেকে রক্ষা কর আমাদের। মানুষ এমন নিষ্ঠুর হয় কিভাবে! আম্মার অস্থিরতা আরো বেড়ে যায়। সারা ঘর পায়চারি করে সময় কাটাতে থাকেন।
পুঁউ… পুঁউ… পুঁউ… দূর থেকে পেঁচার ডাক শোনা যায়। পেঁচার ডাক শুনলেই আমাদের মনে ভয় জেগে ওঠে। পেঁচাকে আমরা পাখি না ভেবে ভূত-প্রেত জাতীয় কিছু ভাবতাম। পেঁচা ডাকলেই হারিকেনের চিমনির ওপর দিকের ছোট ছোট ফাঁকে লোহা পোড়া দিতাম। আমাদের বিশ্বাস ছিল লোহা পোড়া দিলে নাকি পেঁচার গায়ে আগুন লাগে। পেঁচা স্থান ছেড়ে চলে যায়। ডাকাডাকি বন্ধ করে। লোহা পোড়া দিয়ে পেঁচার ডাক থামানোর ঘটনা দেখেছি অনেক। জানি না এর ভেতর অন্তর্নিহিত সত্যাসত্য।
আম্মার নির্দেশমত একটু আগেভাগেই ছোটদের শুইয়ে দেয়া হয়েছে। যথারীতি ঘুমের রাজ্যে আমরা ভাইবোন।
মাঝ রাতে ডাকাডাকিতে আমাদের ঘুম ছুটে যায়। কী ঘটনা সদ্য ঘুমভাঙা কিছু বুঝে উঠতে পারছিলাম না।
ঘুমাও, ঘুমাও! বড় বোন মৃদু স্বরে ধমক দিয়ে বললেন। বুঝতে পারছিলাম কিছু একটা ঘটেছে। পাশের ঘরে অনেক লোকের নড়াচড়া টের পাচ্ছিলাম। কিন্তু মুখ বন্ধ। ঘুমটাও ছুটে গেছে। কিছুক্ষণ পর সব চুপচাপ।
পুঁউ… পুঁউ… পুঁউ…। দূর থেকে পেঁচার ডাক কানে আসে শুধু। ভয়ে বুক হিম হয়ে আসে। তবু চুপ।

পরদিন সকালে শুনতে পেলাম রাতের ঘটনা। রানু আপার কাছে। আমাদের পাড়ায় এক ডাক্তার পরিবার বাস করতো। ডাক্তার নন্দী নামেই পরিচিত। আমাদের পারিবারিক চিকিৎসকও। কোন অসুখ বিসুখ হলেই আব্বা পিওন দিয়ে নন্দীর ডিসপেনসারিতে পাঠিয়ে দিতেন। একটা কাচের শিশিতে গোলাপি রঙের মিকচার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলতেনÑ নে দাগ দেখে দেখে খাবি। খাওয়ার আগে শিশি ঝাঁকিয়ে নিবি। ঐ মিকচার শেষ হবার আগেই রোগ হাওয়া। সেই ডাক্তার নন্দী, তার স্ত্রী বিমলা, মা রাধারানী, বোন আরতি আর দুই ছেলেমেয়ে ফটিক-চন্দনা নিয়ে মাঝ রাতে এসে দরোজায় ধাক্কাধাক্কি করে। আম্মা প্রথমে দরোজা খুলতে ভয় পেলেও আব্বা বলেন জীবন বাঁচানো অনেক বড় সওয়াবের কাজ, তাই খুলে দেন দরোজা। হুড়মুড় করে প্রবেশ করে নন্দী পরিবার।
দাঙ্গাবাজরা রাতে কিভাবে খবর পেয়ে যায়, পোস্ট মাস্টারের বাসায় হিন্দু আশ্রয় নিয়েছে। ছুটে আসে বিহারিরা মারাত্মক অস্ত্র হাতে। এসেই চিৎকার করতে থাকে, পোস্ট মাস্টার সাব দরোজা খুলিয়ে, দরোজা খুলিয়ে, আন্দার মে মলউন হ্যায়…
নেহি কই মলউন, নেহি হ্যায় খান সাবÑ আব্বা বুঝিয়ে সুঝিয়ে বলেন। কিন্তু তারা বিশ্বাস করতে চায় না। সার্চ করবে।
এমন সময় সলিম ভাই নিজ ঘর থেকে ঠাস ঠাস শব্দে দরোজা খুলে বের হন। Ñ ক্যায়া ভাই, কিউ হাঙ্গামা কারতাÑ হাম সারে রাত জাগরি হ্যায়Ñ কই আদমি ভি নেই দেখাÑ কাহে জুলুম করতাÑ
জী সাব জী সাব মাফ ফিজিয়ে গলতি হো গেয়াÑ বলতে বলতে চলে যায় তারা।
পরদিন খুব ভোরে ডাক্তার পরিবার নিরুদ্দিষ্ট হয়। হয়তো তারা কোনোভাবে ইন্ডিয়া পাড়ি জমিয়েছে। আমাদের পক্ষে আর খোঁজ জানা সম্ভব হয়নি।
যে ঘটনার আংশিক বর্ণনা দিলাম এটা হচ্ছে, উনিশ শ’ সাতচল্লিশে ইন্ডিয়া-পাকিস্তান স্বাধীন দু’টি দেশ হওয়ার পর উনিশ শ’ চৌষট্টির দাঙ্গার ঘটনা। এ বছর এ দু’টি দেশ ভয়াবহ দাঙ্গায় আক্রান্ত হয়। এ দাঙ্গার প্রকট চিত্র ইন্ডিয়ায় ছিল সর্বাধিক। ইন্ডিয়ায় বিভিন্ন স্থানে সংঘটিত দাঙ্গায় (১০৭০টি) ১৯১৯ জন নিহত আর ২০৫৩ জন আহত হয়। এটা ইন্ডিয়ার তৎকালীন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিজস্ব পরিসংখ্যান মোতাবেক। এ দাঙ্গায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে সহায় সম্পদ হারিয়ে হাজার হাজার অসহায় মুসলমান বর্ডার পার হয়ে পূর্ব পাকিস্তানে আশ্রয় নেয়। এরাই বিহারি নামে পরিচিত।
চৌষট্টি দাঙ্গায় আমাদের চারপাশ আক্রান্ত হওয়ায় পূর্বে হিন্দু-মুসলমান সম্প্রদায়ের যে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান ছিল তা আর বজায় থাকল না। অনেক হিন্দু পরিবার নিরাপত্তার অভাবে দেশ ত্যাগ করতে বাধ্য হলো। যদিও দাঙ্গায় বাঙালি মুসলমানেরা জড়িত ছিল না। তা ছাড়া আমাদের জানা মতে তেমন হতাহতের ঘটনা আশপাশে ঘটেনি। তবে কিছু হিন্দুর সব বাড়ি লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে।
এতে আমাদের চিরকালীন সুন্দর সামাজিক পরিবেশ যা ছিল তা বিনষ্ট হলো। মিলে মিশে বসবাসের যে ঐতিহ্য ছিল তাতে সন্দেহ ও ভীতি ঢুকে গেল।
আব্বা চেষ্টা তদবির করে বদলি নিলেন। চলে এলাম আমরা ভৈরব বাজার।
এখানে এসে আমরা উঠলাম ভৈরবের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তির বাসায়। ভাড়াতে। কারণ নতুনভাবে পোস্ট অফিসের নির্মাণ চলছিল।
অত্যন্ত জাঁকজমকভাবে বিশাল বিল্ডিং নির্মাণের কাজ শেষ পর্যায়ে ছিল। চুনকাম এবং ডেকোরেশনের কাজ চলছিল। তাই পোস্ট অফিসও চলছিল ভাড়া বাসাতে। সাধারণত পোস্ট অফিসের সঙ্গে পোস্ট মাস্টারের বাসভবন লাগোয়া হয়।
যা হোক ভৈরব আসার পর আমাদের স্কুল-কলেজে ভর্তির প্রশ্ন এলো। মহিলা কলেজ না থাকায় বড় বোনেরা কলেজে ভর্তি হলেন না। বড় ভাইকে ভর্তি করা হলো কে বি হাই স্কুলে। রানু আপাকে বালিকা বিদ্যালয়ে। কিন্তু আমাকে ভর্তি করা হলো মন্দির কালিবাড়ী অবৈতনিক পাঠশালায়। কারণ বাসার সামনেই। দূরের স্কুলে কে নিয়ে যাবে, আনবে এ সমস্যার কথা ভেবে। টিকিধারী ধুতি পরিহিত পণ্ডিতের দর্শন জীবনে এই প্রথম। ভর্তির দিনই আমি খুব কেঁদেছিলাম। যে পিওন আমাকে পণ্ডিতের হাতে সোপর্দ করে দিলো তাকে আমার মনে হয়েছে আস্ত শয়তানের মামা।
পাটি বিছিয়ে ছাত্রছাত্রীরা বসে মাথা দুলিয়ে দুলিয়ে নামতা পড়ছেÑ একেক কে এক, দুই দু গুনা চার, চার দু-গুনা আট… টিকিধারী পণ্ডিত মাস্টার মশায় আদর করে তার জন্য সংরক্ষিত একমাত্র চেয়ারটিতে আমাকে বসালেন। মুখে বললেন, ভয় নাই বাবাধন, আমি তোমারে মারবাম না।
কিন্তু সেই আশ্বাসে এবং স্নেহ ভালোবাসায় আমাকে কালিবাড়ী পাঠশালায় যাওয়া হলো না। পণ্ডিতের রক্তচক্ষু হুঙ্কার আর লিকলিকে বেতের সপাং সপাং আঘাতের দৃশ্য আমাকে ভীত করে তুলল। আম্মাকে বললাম, পাঠশালায় যাবো না।
আম্মাও পাঠশালায় যাওয়া বন্ধ করে দিলেন। ঘরে বোনদের কাছেই চললো আমার পড়াশোনা।
এভাবে ভৈরবে কিছুদিন কেটে যাওয়ার পর এক বর্ষণমুখর দুপুরে ঘটল এক অদ্ভুত ঘটনা। দুলাল স্যার হাজির। আমরা হতবাক। আম্মা মনে মনে ভাবছেন দুলালের প্রেতাত্মা নাকি?
না, মা প্রেতাত্মা না, আমি সত্যিকার দুলাল মা। ঘুড্ডি যখন ভাকাট্টা হয় কোথায় গিয়ে পড়ে তার কোন ঠিক নাই। কখনো গাছের মগডালে, কখনো বিলে। কখনো এমন জায়গায় যা মানুষ গিয়া আনতে পারে না। মানুষও যখন মূল ছাড়া হয়, আত্মীয়স্বজন হারা হয়, ছিটকে পড়ে মা। হা … হা… হা…
এতো দিন কোথায় ছিলে বাবা দুলাল? আমাদের ঠিকানা পেলে কিভাবে? আম্মা হাসিমাখা মুখে জিজ্ঞেস করলেন।
আমরা সবাই মিলে স্যারকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছি। মুখের দিকে তাকিয়ে কথা শুনছি। খোঁচা খোঁচা দাড়ি। আরো হ্যাংলা। আরো কালো। আমাদের মনে অনেক প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। বলতে পারছি না। আম্মার কথা শেষ হলে আমরা জিজ্ঞেস করব।
স্যার তা বুঝতে পেরেছেন। হাসি মুখে তা বুঝাতে চাইলেন।
মা, ইন্ডিয়া গেছলাম। মায়ের মুখাগ্নি কইরা চইলা আইলাম। অসুখের খবর পাইয়াই ছুটছিলাম। কইয়া যাইতে পারি নাই। সুযোগ হাত ছাড়া হয় ভাইব্বা চুপি চুপি বর্ডার পাড়ি দিলাম। গিয়া শুনছি পূর্ব পাকিস্তানে রায়ট চলতেছে। বাবায় কইল দুলাল, তোর আর যাওন নাই। হুনস না, পূর্ব পাকিস্তানে সব হিন্দুগো কাইট্যা ফালাইতাছে। লাইন ধইরা সবে ইন্ডিয়া আইয়া পড়তাছে।
আমি বাবারে কইলাম মুসলমানেরাও ইন্ডিয়া ছাড়তাছে ক্যান? আমি আমার দ্যাশেই মরুম। দ্যাশের মানুষ আমার আপন। ইন্ডিয়ার হিন্দুরা আমাগো আপন মানে না। দ্যাশে হিন্দু-মুসলমানে কোন ফারাক নাই। আমার মনডা দ্যাশের লাইগ্যা কান্দে। ইন্ডিয়ায় মন টিকে না। বুঝলেন মা, মাটির মায়া বড় মায়া।
এরপর দু’চার দিন ছিলেন দুলাল স্যার। আমরা ভাবতে শুরু করেছি বুঝিবা শূন্যতা পূরণ হলো। বেশ আনন্দে কাটছিল দিন। কিন্তু না, দুলাল স্যার ফিরে যাবেন। নিজের দ্যাশে। আব্বা আম্মা জোরাজুরি করেও রাখতে পারলেন না। আব্বা দুলাল স্যারকে ভৈরবে একটা কাজের ব্যবস্থা করে দিতে চাইলেন। দুলাল স্যার সিদ্ধান্তে অটল। নিজ এলাকায় থাকতে চান। নিজ এলাকার মানুষের সেবা করতে চান।
তাই চলে গেলেন।
যাবার আগে সবাইকে ডেকে বললেন, আবার খুব শিগগির দেখা হইব। দুগ্গা পূজার পর চইলা আসুম।
দুলাল স্যারের আসা হয়নি। ইন্ডিয়া-পাকিস্তানের সঙ্গে যুদ্ধ বেধে গেল। সেই ১৯৬৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে তুমুল যুদ্ধ। আবার ভয়ে আড়ষ্ট আমরা। স্কুল-কলেজ বন্ধ। রাতে ব্ল্যাকআউট দিনে সাইরেন বাজার শব্দে মাটির গর্তে আত্মগোপন।
সে সময় পাড়ি জমানো হিন্দু সম্প্রদায়ের মিছিলে হয়তো দুলাল স্যারও মিশে গেছেন। সকল অভিমান আর দুঃখ ভুলে নিজ দ্যাশে থাকার বাসনার মৃত্যু ঘটিয়ে।
সে কাহিনী আমার জানা নাই। ভাকাট্টা ঘুড্ডির মতোই তার জীবন। অনেক ঘুড্ডির গতিপথ গন্তব্য যেভাবে জানা হয় না।

SHARE

Leave a Reply