Home উপন্যাস কালো ব্রিফকেস

কালো ব্রিফকেস

জুবায়ের হুসাইন

ইদানীং কথায় কথায় গাল ফোলানো একটা স্বভাবে পরিণত হয়েছে মুনিয়ার। মিষ্টি সুরে কোনো জোরে কথা বললেও ঠোঁট দু’টো বিশেষ কায়দায় ফুঁলিয়ে গো ধরে বসে থাকবে। তারপর বেলুনে অতিরিক্ত গ্যাস ভরলে তা বড় হতে হতে এক সময় যেমন ‘ফটাস্’ করে ফেটে যায়, তেমনি ‘হু হু’ করে কেঁদে ফেলবে। এই কান্না থামানো আবার চাট্টিখানি কথা নয়। কতো কিছুই তখন অফার করা হয়, কিন্তু কিছুতেই যেন মান ভাঙে না ছোট মেয়েটার। একমাত্র মুরাদের কথা ও শোনে একটু-আধটু। ও-ই পারে ওর মান ভাঙাতে। হাসাতে। আর এবারের রাগটা কি না সেই ভাইয়ার কারণেই। কাজেই বোঝো ঠ্যালা, মুনিয়ার রাগ কি আর সহজে ভাঙবে?
মেয়ের রাগ ভাঙানোর জন্য আব্বু অনেক চেষ্টা করেছেন। শেষে রণে ভঙ্গ দিয়ে মায়ের উপর সব ছেড়ে দিয়ে অফিসে চলে গেছেন। মা তো সেই থেকে চেষ্টা চালিয়েই যাচ্ছেন। তাতে এতটুকু অভিমান কমেছে বলে মনে হচ্ছে না।
প্রতিদিন ভাইয়ার সাথে বাইসাইকেলে করে স্কুলে যায় ও। ভাইয়া ওকে ওর স্কুলে নামিয়ে দিয়ে নিজের স্কুলে যায়। আগে অবশ্য একই স্কুলে পড়তো ওরা। তখনও ভাইয়ার সাথেই স্কুলে যেত মুনিয়া। মুরাদ প্রাইমারি পাস করে অন্য স্কুলে ভর্তি হওয়ার পর থেকে মুনিয়াকে স্কুলে পৌঁছে দিয়ে তারপর নিজের স্কুলে যাওয়ার ডিউটি বর্তায় ওর ওপর।
আজ মুরাদের সাথে স্কুলে যায়নি মুনিয়া। নিজেই একটা রিকসা ডেকে তাতে উঠে বসেছে। এমনকি, আম্মুকেও রিকসা ঠিক করে দিতে দেয়নি। ফলে যা হবার তাই হয়েছে, রিকসা থেকে নেমে ভাড়া দেয়ার সময় দেখে তার কাছে কোনো টাকা নেই। আব্বু প্রতিদিন টিফিনের জন্য যে টাকা দিয়ে যান, সেটাই রয়েছে। তাতে তো আর রিকসা ভাড়া পঁচিশ টাকা হয় না। অগত্যা কী আর করা, স্কুলের দারোয়ান আঙ্কেলের কাছ থেকে টাকা ধার নিয়ে রিকসা ভাড়া মিটিয়েছে পিচ্ছি মেয়েটা।
স্কুলে গিয়েও কারোর সাথে একটিও কথা বলেনি মুনিয়া। টিচাররা যখন পড়া ধরেছে, তখন ও খাতায় লিখে দেখিয়েছে, আজ আমার কথা বলা নিষেধ। কারণ জানতে চাইলে আবারও লিখে দেখিয়েছে- আমি আজ প্রচণ্ড অভিমান করেছি। কার উপর এর উত্তরে লিখেছে- ভাইয়ার উপর।
মুরাদ যেহেতু আগে এই স্কুলেই পড়তো, তাই ওদের ভাইবোনের ব্যাপারগুলো টিচারদের জানা। টিচাররা জানেন ওরা ভাইবোন একে অন্যকে কতটা ভালোবাসে। তাই মুচকি হেসেছেন তারা। ভেবেছেন, এই অভিমান ঠিক হয়ে যাবে। আর মাঝে মাঝে এমন একটু আধটু মান-অভিমান ভালো।
স্কুল ছুটির পর কোথাও দেরি না করে সোজা মুনিয়াদের স্কুলে গেছে মুরাদ। দেখে, মুনিয়া গেট দিয়ে বের হয়ে যাচ্ছে। ওর পাশে গিয়ে সাইকেলে ব্রেক কষে। বোনকে উঠতে বলে সাইকেলে। কিন্তু না, সাইকেলে ওঠে না মুনিয়া। দারোয়ান আঙ্কেলকে আগেই বলে রেখেছিল, সে-ই একটা রিকসা ঠিক করে রেখেছে। তাতে চড়ে বসল মুনিয়া। সারা পথ রিকসার পাশে পাশে চলল মুরাদ। অনেকভাবে চেষ্টা করল রিকসা থেকে নামিয়ে বোনকে নিজের সাইকেলে উঠিয়ে নিতে। এই চেষ্টা অব্যাহত থাকল বাড়ির গেট পর্যন্ত পৌঁছানো অবধি।
দাদুভাই সারাদিনে তার রুম থেকে বের হন না একান্ত প্রয়োজন না পড়লে। সেই দাদুভাইও বাইরে বেরিয়ে এলেন এই সময়। পেছন থেকে ডাকলেন, ‘মুনি দাদুভাই, এদিকে একটু এসো তো!’ দাদুভাই মুনিয়াকে আদর করে ‘মুনি’ বলেই ডাকেন।
মুনিয়া থামল না। গটগট করে নিজের ঘরে ঢুকে গেল। পিঠের ব্যাগটা খুলে দড়াম করে টেবিলের উপর রাখল। তারপর ছাড়ল গায়ের জামা-কাপড়। অন্য দিন আম্মু এসে সহযোগিতা করেন। আজকে আম্মু আসার আগেই সব কাজ সেরে ফেলল। আম্মু যখন দরোজা পর্যন্ত এসে পৌঁছেছেন, ততক্ষণে স্কুল ড্রেস ছেড়ে অন্য ড্রেস পরা হয়ে গেছে ওর। আম্মু একটু মুচকি হাসলেন। যাক, মেয়েটা অন্তত নিজের কাজগুলো নিজেই করা শিখেছে অনেকটা।
মুরাদ এসে মায়ের পাশে দাঁড়াল। মা ওর দিকে তাকিয়ে মুখ টিপলেন। তারপর চলে গেলেন নিজের কাজে।
মুরাদ বোনের ঘরে ঢুকে পড়ল। আস্তে করে বলল, ‘হাতটা বাড়াও তো আপুমণি!’
ঘুরে দাঁড়াল মুনিয়া। মাথাটা নিচু করা এখনও। গো গো করে ফুঁসছে। মুরাদের হাতে ধরা চকবারটার দিকে একবার তাকিয়েই পেছন ফিরল আবার।
না, চকবার থেরাপিতেও কাজ হলো না। চকবারে দারুণ দুর্বলতা মুনিয়ার। অনেকবারই এই অস্ত্র দ্বারা কাবু করা গেছে ওকে। কিন্তু আজ সেটাও ফেল। তাহলে এখন উপায়?
মুরাদ চকবারটা আস্তে করে মুনিয়ার পড়ার টেবিলে বইয়ের ব্যাগের পাশে রাখল। তারপর বলল, ‘আ’য়্যাম সরি আপু। প্লিজ ফরগিভ মি দিস টাইম। আই নেভার উইল ডু লাইক দ্যাট। প্লিইইজ..!’
না, এ কথায় মুনিয়া ফিরেও তাকাল না।
বাইরে বেরিয়ে এলো মুরাদ। মনটা আরো খারাপ হয়ে গেল। বোনটা তো অন্য সময় এতোটা অভিমান করে থাকে না। সকাল থেকে ঠিক মতো খাওয়া-দাওয়াও করেনি।
চিন্তিত ভঙ্গিতে বাড়ির সামনের বাগানের দিকে চলে গেল ও। গিয়ে বসল বসার জন্য বানানো সিমেন্টের  বেঞ্চটার ওপর। সঙ্গেই একটা বকুল গাছ আছে। ওটায় হেলান দিল। কিছু সাদা বকুল ফুল বেঞ্চের উপরে ঝরে পড়েছে। মিষ্টি ঘ্রাণ ছড়াচ্ছে ফুলগুলো। কিন্তু ফুলের ঘ্রাণে বুক ভরার মতো অবস্থায় ও এখন নেই। আদরের বোনের মান ভাঙানোর উপায় খুঁজতে ব্যস্ত।
গতরাতে এক পশলা বৃষ্টি হয়ে গিয়েছিল। বাগানের ভেতরে কোথাও কোথাও অল্প পানি জমে আছে। কাদার একটা সোদা গন্ধও ওর নাকে আসছে। গ্রামে ছাড়া এই গন্ধ সাধারণত পাওয়া যায় না। গন্ধটা ওর ভালোই লাগে। ফুলের ঘ্রাণ ছাপিয়ে কাদার গন্ধটাই যেন প্রকট হয়ে ধরা দিল ওর নাকে। উঠে দাঁড়াল মুরাদ।
রাস্তা থেকে বাড়ির মূল বিল্ডিংটার ব্যবধান বেশ খানিকটা। মাঝের এই জায়গাটিতেই শখের ফুলের বাগান গড়ে তুলেছে বাড়ির সবাই মিলে। নানান জাতের ফুল আর ঔষধি গাছে ভরে উঠেছে বাগান। মৌসুমী ফল-পাকুড় বাজার থেকে প্রায় কিনতে হয় না বললেই চলে। সারাদেশটাই যেখানে বিশুদ্ধ অক্সিজেনের অভাবে ধুকছে, সেখানে মুরাদদের এই বাগানটা পুরো পরিবারের সদস্যদেরকে অকাতরে বিশুদ্ধ বায়ুতে নিঃশ্বাস ফেলার সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে।
বকুল ডালে একটা টুনটুনি লাফিয়ে চলেছে তার চপলতার প্রকাশ ঘটিয়ে। সেই সাথে ‘টুইট টুইট, চিপ চিপ, টুনটুন…’ অপূর্ব সুর সুষমাও ছড়িয়ে দিচ্ছে।
অন্য সময় হলে একাগ্রমনে ওর ওই চপলতা আর সুরের মূর্ছনা উপভোগ করতো মুরাদ। কিন্তু এক্ষণে ওসব কিছুই ভালো লাগছে না।
বাগানের শেষ প্রান্তের কাছে বাউন্ডারি ওয়ালের থেকে গজ পাঁচেক দূরে একটা বড় গোলাপের ঝাড়। ওটার সামনে গিয়ে দাঁড়াল ও। লাল টকটকে বেশ বড় কয়েকটা ফুল ফুটেছে তাতে। একটার পাপড়িতে আলতো করে হাত বুলিয়ে দিল মুরাদ। এতক্ষণে একটা ভালো লাগার ছোঁয়া ছড়িয়ে পড়ল সারা দেহে।
হঠাৎ নিচের দিকে চোখ পড়তেই একটু যেন চমকাল মুরাদ। প্রিয় গোলাপ গাছটার গোড়ায় একটা বড়সড় গর্ত তৈরি হয়েছে। গতরাতের বৃষ্টিতে এটা হয়েছে। গাছের গোড়ার মাটির নিচে বোধহয় আলগা ছিল। নিচে ইঁদুর বা অন্য কিছুতে বাসাও তৈরি করতে পারে।
মনটা একটু খারাপ হয়ে গেল ওর আবার। শিগগিরই মাটি দিয়ে এটা ভরাট করে দিতে হবে। নইলে গোলাপ গাছটার জীবনে সংশয় দেখা দিতে পারে।
ঘুরে চলে আসবে, ঠিক এই সময় কিছু একটাতে দৃষ্টি আটকে গেল ওর। গর্তটার মধ্যে সাদা এক টুকরো কাগজ দেখা যাচ্ছে। একটু দলা পাকানো, বৃষ্টিতে ভেজার পর শুকিয়ে যাওয়া।
নিচু হয়ে বসে কাগজটা উঠিয়ে নিল মুরাদ। বৃষ্টির পানিতে লেখা অনেকটা ঝাপসা হয়ে গেলেও পড়া যায় তাতে যা লেখা আছে। আর লেখাটা পড়ে খানিকটা অবাকই হলো ও। কতকগুলো অঙ্ক করা হয়েছে, অথচ ঠিক বুঝতে পারছে না কী লেখা।

দুই.
কাগজটা হাতে নিয়ে দেয়ালের কাছে সরে গেল মুরাদ। কাগজটা তখনও চোখের সামনে মেলে ধরা। চেষ্টা করছে লেখার পাঠোদ্ধারের।
একেবারেই মগ্ন হয়ে গিয়েছিল ও কাগজটা নিয়ে। এটাকে একটা মেসেজ বলে মনে হচ্ছে।
ঠিক এই সময় কয়েকটা উত্তপ্ত বাক্য ওর কানে প্রবেশ করল। কান খাড়া করে ফেলল ও।
দেয়ালের ওপাশে বাজারে যাওয়ার সড়ক। সড়কের ওদিক থেকেই কথা বিনিময় করছে দু’জন লোক। একটা কণ্ঠ বেশ পুরু এবং অন্যটা ততটাই চিকন।
‘ওটা এখানেই কোথাও পড়েছে, আমি শিওর।’ বলল চিকন গলা।
‘তুমি অত শিওর হচ্ছো কী করে?’ মোটা গলার জিজ্ঞাসা। ‘অন্য কোথায়ও তো পড়তে পারে।’
‘তা পারে। কিন্তু আমি শিওর ওটা এখানেই পড়েছে।’ আবারও জোর দিয়ে বলল চিকন গলা। ‘কারণ বৃষ্টি শুরু হওয়ার সময় আমি ঠিক এখানটাতেই ছিলাম এবং ওটা আমার হাতেই ছিল। হঠাৎ প্রচণ্ড বাতাস বয়ে যাওয়ার কারণেই তো দৌড়ে চলে গেলাম। একটু পর বৃষ্টির সাথে পাল্লা দিয়ে বইল ঝড়।’
‘তারমানে তুমি বলছ ওটা ঝড়ে তোমার হাত থেকে উড়ে গিয়ে এখানেই কোথাও পড়েছে?’
‘একদম তাই।’
‘হু, তাহলে তো চিন্তারই কথা। কোথায় গেল জিনিসটা?’
‘আসলে আমিই একটা গাধা।’ নিজেকে নিজেই গালি দিল চিকন গলা। ‘চিরকুটটা পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমি আগে ওটা কাজে লাগাব না? তা না করে রেখে দিলাম পকেটে। আর ঠিক বৃষ্টির আগ মুহূর্তেই ওটা খোলার প্রয়োজন হয়ে পড়ল!’
‘এখন দেখছি লোকে ভুল বলে,’ মোটা গলার কণ্ঠ। ‘চিকন মানুষ হলেই বুদ্ধিও চিকন হয় না।’
‘এখন ওসব নীতি কথা বলার বা শোনার সময় না। আগে ওটা খুঁজে বের করো। তারপর মোবাইলের লক খুলে ইনবক্সের মেসেজটা পড়ে সে অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ নিতে হবে। সময় মতো সব করতে না পারলে বস কাউকেই আস্ত রাখবেন না।’
আরও কী সব বলতে লাগল ওরা। কিন্তু মুরাদের তখন আর ওদিকে খেয়াল নেই। হাতের কাগজটা জোরে বুকের সাথে চেপে ধরল। ও এখন শিওর যে, এই কাগজটাই ওরা খুঁজছে। তারমানে একটা রহস্য, ওর হাতে এসে ধরা দিয়েছে। কী করা যায় এখন? কী করা যায়?
ভাবতে লাগল ও বার কয়েক পায়চারি করে। হঠাৎ মুখটা উজ্জ্বল হয়ে উঠল। বিশেষ কায়দায় হাত দু’টো নাচিয়ে আস্তে করে বলল, ‘ইয়েস!’ তারপর ছুটল ঘরে। আম্মুর মোবাইল থেকে তানভীরকে ফোন করল। তানভীর ওর ক্লাসমেট। ওর চেয়ে একটু বেশিই রহস্যপ্রিয়। ওকে জানান দরকার সব। ও নিশ্চয়ই কোনো একটা উপায় বের করতে পারবে।
একটু পরেই চলে এলো তানভীর। তবে সদর দরোজা দিয়ে না ঢুকে পেছনের দিক দিয়ে ঢুকল। এ বুদ্ধিটা অবশ্য তানভীরেরই। ওর যুক্তি, সামনে দিয়ে ঢুকলে লোক দু’টো ওকে দেখে ফেলতে পারে। আর তাতে তারা সতর্ক হয়ে যাবে। ফলে ওদের প্লান মার খাবে।
গোলাপ গাছের নিচে পাওয়া কাগজটা অর্থাৎ ‘চিরকুট’টা নিয়ে বসল ওরা। মুরাদ আগেই কিছুটা আন্দাজ করতে পেরেছিল। এটা নিশ্চয়ই ওই মোবাইলের লক খোলার পাসওযার্ড। এক্ষণে তানভীরের সহায়তায় পাসওয়ার্ডটা বের করতে সক্ষম হলো।
কাগজে লেখা ছিল- ২´২ ২+২ ৬-২ ৮গু২, ৩´১ ২+১
৪-১ ৩গু১, ১´১ ১+০ ২-১ ১গু১, ২´১ ১+১ ৯-৭ ৮গু৪।
মোটামুটি বোঝায় যাচ্ছে একটা অঙ্ক কষা হয়েছে। সম্ভবত গুণ যোগ বিয়োগ ভাগগুলোর উত্তরগুলোই হবে মোবাইল সিমের লক খোলার পাসওয়ার্ড। চার সেট অঙ্ক আছে এখানে। উত্তরগুলো মনে মনে মুখস্থ করে নিল ওরা। তারপর ওরা যে সংখ্যাগুলো দাঁড় করাল তা হলোÑ ৪৪৪৪, ৩৩৩৩, ১১১১, ২২২২। হ্যাঁ, এটাই হবে ওই মেসেজের অর্থ। অনেকটাই শিওর হলো ওরা। উত্তরগুলো একটু ছোট করে নিলে দাঁড়ায় ৪৩১২। তবে মোবাইল সেটটা হাতে না পাওয়া পর্যন্ত নিশ্চিত হতে পারছে না। তাই যত দ্রুত সম্ভব ওটা ওদের হাত থেকে নিজেদের হাতে নিয়ে আসতে হবে।
সংক্ষেপে ছোট একটা মিটিং সেরে নিল ওরা। মানে কী কী করতে হবে তা সাজিয়ে নিল।
তানভীর সঙ্গে করে ওর সব সময়ের সঙ্গী টেপ রেকর্ডারটা নিয়ে এসেছে। অদ্ভুত বা আশ্চর্য কিছু শুনলেই ও তা রেকর্ড করে রাখে। এ রকম অনেক কিছুই ওর এই ক্ষুদ্র যন্ত্রটিতে রেকর্ডে ধরে রাখা আছে। সেই রেকর্ড করে রাখা কিছু বিষয়ই ওরা কাজে লাগাবে।
প্লান অনুযায়ী দেয়ালের কাছে গোলাপ গাছটার ওখানে এলো দু’জনে। তবে সাবধান রইল, কিছুতেই শব্দ করা যাবে না এবং এমন কিছু করতে হবে যাতে লোক দু’টো কোনো রকম সন্দেহ না করে।
দেয়ালের এখানটায় ছোট্ট একটা ফুটো আছে। এই ফুটো দিয়ে লোক দু’টোকে দেখা যাচ্ছে। অচেনা লোক দু’জনই। আগে কখনো এ এলাকায় দেখা যায়নি ওদের।
এই জায়গাটা থেকে গেটটা বেশি দূরে না। পনেরো বিশ ফুট মতো দূরত্ব হবে। মুরাদকে গেটের কাছে চলে যেতে বলল তানভীর। মুরাদ গেটে পৌঁছলে তানভীর ইশারায় এক দুই তিন গুনল। তারপর আগেই নির্ধারিত করে রাখা টেপ রেকর্ডারের রেকর্ডটা ছেড়ে দিল। মুহূর্তেই প্রচণ্ড জোরে পুলিশের হুঁইসেল বেজে উঠল। সাথে সাথে গাড়ির শব্দ। গাড়ির ব্রেক কষে থামার শব্দ। পরক্ষণেই দুদ্দাড় ছুটে আসার শব্দ।
হ্যাঁ, কাজ হয়েছে।
‘পালাও, পুলিশ, পালাও!’ বলে উঠল মোটা গলা। চিকন গলা আর কিছু বলার সুযোগ পেল না। দিল দৌড়। মনে মনে হাসলেও একটু শব্দ করল না ছেলেরা।
ইশারায় দুই কিশোর হাতের বুড়ো আঙুল দিয়ে ‘কাজ হয়েছে’ প্রকাশ করল। তারপর তানভীর ইশারায় বলতেই মুরাদ দৌড় দিল বাইরে।
তানভীর দেয়ালের ফুটো দিয়ে দেখছিল চিকন লোকটা হাতে একটা মোবাইল সেট নিয়ে নাড়াচাড়া করছে আর মোটা লোকটার সাথে কথা বলছে। যখনই বুঝল মোবাইল সেটটা হাতের মাঝে একটু আলগা হয়ে গেছে, তখনই টেপ রেকর্ডার ছেড়ে দিয়েছে।
ওখান থেকেই মুরাদ মোবাইল সেটটা তানভীরের দিকে বাড়িয়ে ধরল দেয়ালের ওপর দিয়ে। এতে বেশ কসরত করতে হলো ওকে। তানভীর দ্রুত কাগজে লেখা সংখ্যাগুলো টাইপ করল। তারপর ‘বিসমিল্লাহ’ বলে ইয়েস বাটন প্রেস করল। হ্যাঁ, সিমের লক খুলে গেল। তারপর ততটাই দ্রুত মেসেজ অপসনে গিয়ে ইনবক্স চেক করল। মাত্র দু’টো মেসেজ আছে ইনবক্সে। দু’টো মেসেজই মুরাদের আম্মুর মোবাইলে ফরওয়ার্ড করে নিল। তারপর আবারও লক করে দিল সিম। এরপর সেটটা ফেরত দিল মুরাদকে। মুরাদ তৎক্ষণাৎ ওটা আগের জায়গায় রেখে দিল। তারপর দৌড়ে গেট দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করল।
ঠিক তক্ষুনি লোক দু’টোকে আবার ফিরে আসতে দেখা গেল। সাবধান হয়ে গেল ছেলেরা।
আবার আগের জায়গায় এসে দাঁড়াল চিকন ও মোটা কণ্ঠের অধিকারী লোক দু’টো।
দেয়ালের ফুটো দিয়ে চোখ রেখেছে মুরাদ ও তানভীর।
‘আশ্চর্য ব্যাপার!’ বলল মোটা গলা। ‘কোথায় পুলিশ? পুলিশের গাড়িও বা গেল কোথায়?’
‘এ নিশ্চয়ই কেউ আমাদের সাথে শয়তানি করেছে।’ মোটা লোকটার গলা।
‘তারমানে আমাদের উপর কেউ চোখ রাখছিল। সন্দেহ করেছে কেউ।’
‘কিন্তু পুলিশের গাড়ি এবং বাঁশির শব্দের ব্যাখ্যা কী? আর দুদ্দাড় করে দৌড়ে আসা?’
‘আমি আগেই বলেছিলাম আমাদেরকে খুব সাবধানে কাজ সারতে হবে। বস যদি এসব কিছু জানতে পারে তাহলে খবর করে দেবে।’
‘মোবাইলটা তো পাওয়া গেল। এখন কী করব আমরা?’
‘আপাতত কিছুই করার নেই। সন্ধ্যা হয়ে এসেছে। চলো ফিরে যাই। রাতে একবার এসে ঘুরে যাব। সন্দেহ যেহেতু এই জায়গাটা, তখন একবার ভেতরে ঢুকে দেখা যাবেক্ষণ।’
‘হুঁ, সেটাই ভালো হবে। চলো।’
মুরাদ ও তানভীর লোক দু’টোর কথা ভালো করে শুনতে গিয়ে দেয়ালের সাথে প্রায় সেঁটে গিয়েছিল। নাকের ভেতরে কী যেন ঢুকে গিয়েছিল তানভীরের। অনেকক্ষণ থেকেই নাকটা সুড়সুড় করছিল। আর ধরে রাখা সম্ভব হলো না। প্রচণ্ড শব্দে একটা হাঁচি বেরিয়ে এলো।
মুরাদ ভীষণভাবে চমকালো। লোক দু’টো অবশ্যই ওর হাঁচির শব্দ শুনতে পেয়েছে। তাহলে?
হ্যাঁ, মুরাদের ভাবনাই ঠিক। লোক দু’টো ফিরে যেতে গিয়েও ঘুরে দাঁড়িয়েছে।
‘কেউ একজন হাঁচি দিল মনে হয়!’ মোটা গলা তার গলাটা আরো যেন মোটা করে বলে উঠল।
চিকন গলা বলল, ‘হ্যাঁ, আমিও শুনলাম। তারমানে যে আমাদেরকে একটু আগে বোকা বানিয়েছে সে কাছেই কোথাও আছে।’
‘আমার তো মনে হলো হাঁচিটা দেয়ালের ভেতর থেকে আসল।’
‘আমারও তাই মনে হচ্ছে।’
‘চলো, দেখি ব্যাপারটা কী।’
‘হ্যাঁ, চলো।’
প্রমাদ গুনলো ছেলেরা। একটুখানি ভুলের কারণে ধরা বুঝি পড়েই গেল!

তিন.
গোলাপ ফুলগাছটা থেকে পাঁচ হাত মতো দূরে কাঁটা মেহেদীর ছোট্ট একটা ঝোপ আছে। ওটার আড়ালে গিয়ে লুকালো ছেলেরা। চোখ রাখল দেয়ালের দিকে।
হাতের উপর ভর দিয়ে দেয়ালে উঁচু হয়ে আছে একটা লোক, রোগা টিংটিঙে। এরই গলার স্বর চিকন, ভাবল ওরা। বলল, ‘সাবু, ভেতরে তো কাউকে দেখা যায় না।’
পাশ থেকে মোটা বলল, ‘না বুলেট, আমি শিওর, দেয়ালের ভেতর থেকেই কেউ হাঁচি দিয়েছে। ভালো করে দেখ।’
এই দুরবস্থার মধ্যেও প্রচণ্ড হাসি পাচ্ছে ছেলেদের। রোগা পটকা মানুষটার নাম বুলেট। অনুমান করলো, মোটা গলার অধিকারী নিশ্চয়ই বেশ মোটা হবে। কিন্তু এখন হাসলে তো আর চলবে না। হাসলে ধরা পড়ে যাবে। তাই প্রায় দম বন্ধ করে ওভাবেই পড়ে রইল।
ওরা যখন নিজেদেরকে আড়াল করতে প্রাণপণ চেষ্টা করছে, সেই সময় আরো বিপদ হয়ে দেখা দিল অন্য একটি ঘটনা।
সন্ধ্যা তো হয় হয়। অনেকক্ষণ ধরে ছেলেকে দেখতে না পেয়ে মা বাইরে বেরিয়ে এসেছেন। সেই যে ছেলেটা বাগানের দিকে গেছে, এখনও ঘরে ফেরেনি। বারান্দায় দাঁড়িয়ে মা গলা চড়িয়ে ডাকলেন, ‘মুরাদ, এই মুরাদ? কোথায় তুই? সন্ধ্যা হয়ে যাচ্ছে, ঘরে আয় বাবা।’
বুকের মধ্যে হৃৎপিণ্ডটা দড়াম করে উঠল। তারপর দুরুদুরু করতেই থাকল। লোক দু’টো শুনতে পায়নি তো মায়ের ডাক? না শুনেই বা যায় কেমন করে? তারা তো ওদের একেবারে কাছেই রয়েছে। ওরা যেহেতু শুনতে পেয়েছে, লোক দু’টোও অবশ্যই শুনেছে। তারমানে…
আর ভাবতে পারল না ছেলেরা। মনে মনে আল্লাহর কাছে কামনা করতে লাগল মা যেন আর কিছু না বলে ভেতরে চলে যান।
কিন্তু তা আর হলো না। মুরাদের কোনো সাড়া না পেয়ে আবার ডাকলেন মা, আগের চেয়ে আরো জোরে, ‘এক্ষুনি মাগরিবের আজান দেবে। কতবার না বলেছি আজানের আগেই ঘরে উঠবি! কোথায় তুই?’
‘কোঁৎ’ করে ঢোক গিলল মুরাদ। পাশ থেকে বেশ জোরেই সে শব্দ শুনল তানভীর। মুরাদকে চুপ থাকতে বলবে, এই সময় বুলেট বলে উঠল, ‘এই রে, বাড়িওয়ালি বেরিয়ে এসেছে।’ পরক্ষণই কিছু পতনের শব্দ। বোঝা গেল বুলেট ওপাশে লাফিয়ে পড়েছে।
একটু যেন স্বস্তি পেল ছেলেরা।
‘আমি একটা ছেলেকে গেটের সামনে দেখেছিলাম তখন।’ বলল এবার সাবু।
হৃৎপিণ্ডটা এবার গলার কাছে গিয়ে যেন আটকে গেল মুরাদের। তারমানে ওকে দেখে ফেলেছে তারা। এখন কী হবে?
কিন্তু না, তেমন কিছু আর ঘটল না। সাবু বলল, ‘ওসব পরে দেখা যাবে। এখন চলো, এখান থেকে যাওয়া যাক।’
‘হ্যাঁ তাই চলো সাবু। আমার খুব ক্ষিধে পেয়েছে। পেটে আগে কিছু দেয়া দরকার।’ বলল বুলেট।
এরপর দুই জোড়া পদশব্দ ক্রমে দূরে সরে যেতে শুনল ওরা। যখন আর শোনা গেল না পায়ের শব্দ, তখনই আড়াল থেকে বের হয়ে এলো। আর তখনই মসজিদের মিনার থেকে মাগরিবের আজানের সুমধুর ধ্বনি ভেসে এলো।
‘আসছি আম্মু,’ আস্তে করে বলল মুরাদ। যেন জোরে বললে লোক দু’টো শুনে ফেলবে, এখনও ভয় কাটেনি।
‘ও, তানভীরও আছে দেখি।’ মুরাদের পাশে পাশে তানভীরকেও আসতে দেখে বললেন মা। ‘আয় তোরা ভেতরে।’ বলে চলে গেলেন।
‘চলো আগে নামাজ সেরে নিই।’ বলল তানভীর। ‘তারপর বিষয়টা নিয়ে বসা যাবে।’
মুরাদ বলল, ‘তার আগে আমার আরেকটা কাজ বাকি আছে। মুনিয়া সেই যে কাল রাতে আমার উপর রাগ করেছে, এখনও ওর অভিমান ভাঙেনি।’
‘কেন, চকবার থেরাপি প্রয়োগ করোনি?’
‘করেছি তো। কিন্তু আজ ওতেও কাজ হয়নি।’
‘কেন, কী এমন হয়েছিল রাতে?’
‘আরে তেমন কিছু না। আমার অঙ্কের খাতায় ও একটা হাতির ছবি এঁকেছিল। কিন্তু ওটা হয়েছিল ঠিক গরুর মতো। আমি সে কথা বলতেই ও তেড়ে এলো আমার কাছে, খাতাটা কেড়ে নিতে। আমি খাতাটা ওকে দিয়ে দিলাম। ও এবার খাতাটা নিয়ে আম্মুর কাছে গেল। নালিশ করল আমার বিরুদ্ধে। আম্মু তখন বললেন, ‘উঁহু, এটা তো গরু না, রামছাগলের মতো হয়েছে।’ ব্যস, আর যায় কোথায়! আপুমণি সেই যে গাল ফুলিয়ে বসলেন, সেই গাল ফোলানো এখনও রয়ে গেছে। জানো তানভীর, বোনটা আমার সারাদিন ভালো মতো কিছু খায়ওনি।’ শেষের দিকে গলাটা ধরে এলো মুরাদের।
‘তাহলে তো কেস খারাপ।’ তানভীরকেও বেশ চিন্তিত দেখা গেল। ও-ও ভাবতে লাগল কী ভাবে মেয়েটার রাগ ভাঙানো যায়। ও জানে, মুনিয়ার রাগ একমাত্র মুরাদই ভাঙাতে পারে। সেই মুরাদই যখন ফেল, তখন বিষয়টা অত সহজে মেটার নয়।
দরোজার কাছে চলে এসেছিল ওরা। এই সময় হঠাৎ বলে উঠল মুরাদ, ‘পেয়েছি!’
থমকে দাঁড়াল তানভীর ওর হঠাৎ জোরে কথা বলে ওঠায়। বলল, ‘কী পেয়েছ?’
‘মুনিয়ার রাগ ভাঙানোর জিনিস আমি পেয়ে গেছি।’ বেশ উচ্ছল দেখাল মুরাদকে।
এরপর মুরাদ টেপরেকর্ডারটা নিজের হাতে নিয়ে নিল। এটা দিয়েই আজ বোনকে কাবু করবে ও।
সারাদিন পর শান্তি মতো একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল মুরাদ।

চার.
মুনিয়া সেই যে ঘরে ঢুকেছে আর বের হয়নি। ও ঘরের সামনে গিয়ে দাঁড়াল ওরা। তারপর বিভিন্ন বিষয়ে আলাপ করতে লাগল।
মুনিয়া ঘরের ভেতরে থেকে সবই শুনছিল। ভাইয়া ও তানভীরের কথাবার্তা শুনে ভালোও লাগছে। মাঝে মাঝে ওদের সাথে নিজেও হেসে দিচ্ছিল। কিন্তু পাছে ওরা দেখে ফেলে, তাই শব্দ করে হাসতে পারে না।
ভীষণ ক্ষিধে পেয়েছে ওর। সারাদিনে প্রায় কিছুই খায়নি। স্কুলে মাত্র একপ্লেট চটপটি খেয়েছে।
দরোজা খুলে বাইরে বেরিয়ে আসবে ও? বলবে ওর প্রচণ্ড ক্ষিধে পেয়েছে? ভাইয়ার দিয়ে যাওয়া চকবারটা টেবিলের উপরেই কাগজের মধ্যে গলে গেছে।
না, আর পারছে না। ক্ষিধেটা খুব জ্বালাচ্ছে। যেন কয়েকশ ছুঁচো ওর পেটের মধ্যে ডন শুরু করে দিয়েছে। না, এবার বাইরে বেরিয়ে ভাইয়াকে বলবে, ওর খুব ক্ষিধে পেয়েছে। শিগগির ওকে কিছু খেতে দিতে। হ্যাঁ, এটাই করবে ও।
দরোজা খুলতে যাবে, ঠিক তখনি বেজে উঠল জিনিসটাÑ কিছুদিন ধরে অধিকাংশ মোবাইলে এই রিংটোনটা বাজতে শোনা যায়। এক পিচ্চি ছেলে হাসছে আর বলছে, ‘মেরেছে, আম্মু আমাকে মেরেছে…’ ইত্যাদি।
এবার আর না হেসে পারল না মুনিয়া। খিলখিল করে হেসে দিল। দরোজাটা ততক্ষণে খুলেও গিয়েছিল।
বিষয়টা দেখল মুরাদ ও তানভীরও। ওরারও হাসল।
বিষয়টা ভালো ঠেকল না মুনিয়ার কাছে। ওর হাসি দেখে ভাইয়ারা হাসছে। তারমানে ওর প্রেস্টিজ চলে যাবে না! হাসি থামিয়ে ফেলল ও।
মুরাদরাও একটু ঘাবড়ে গেল এতে। ফল তো হয়েইছিল, আবারও কি ভেস্তে গেল নাকি?
তানভীরকে আবারও টেপরেকর্ডারটা বাজাতে বলল। বাজাল তানভীর। আবারও পিচ্চিটা হেসে উঠল। না, ওরা যা ভেবেছিল তা না, মুনিয়া আবারও হাসছে। হি হি করে হেসেই চলেছে রিংটোনের পিচ্চি ছেলেটার সাথে। যেন ওর সাথে পাল্লা দিচ্ছে।
একটু থেমে থেকে মুরাদরাও সেই হাসিতে যোগ দিল।
‘চকবারটা খেয়েছ আপুমণি?’ এক ফাঁকে জিজ্ঞেস করল মুরাদ। তবে খুবই সাবধান রইল। বোনকে আর ঘাটানো যাবে না এই মুহূর্তে।
মুনিয়া বলল, ‘ওটা তো গলে গেছে। আমাকে আরেকটা চকবার কিনে দাও। আমার খুব ক্ষিধে পেয়েছে যে!’ মুনিয়া প্রায় কেঁদেই ফেলবে।
কান্না পেল মুরাদেরও। ইশ্, বোনটার না জানি কত কষ্ট হচ্ছে! এতোটুকুন একটা মেয়ে, কতক্ষণ আর না খেয়ে থাকতে পারে?
‘এক্ষুনি এনে দিচ্ছি আপু,’ তাড়াহুড়ো করে বলল মুরাদ। তারপর ছুটল।
পেছন থেকে ডাকল তানভীর। বলল, ‘আমি তাহলে আজ চললাম। কাল সকালে এসে দেখা যাবে মেসেজে কী লেখা আছে।’
মুরাদ পুরোপুরি শুনতে পেল না ওর কথা। তার আগেই দরোজা দিয়ে বেরিয়ে গেছে।
তানভীর মুচকি একটু হেসে বিশেষ ভঙ্গিতে ঘাড় নেড়ে মুনিয়ার দিকে তাকাল। বলল, ‘এই যে মুনিয়া, এটা আরেক বার শুনবে নাকি?’
মুনিয়া হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়ল।
বাজাল তানভীর। আর যথারীতি খিলখিল করে হাসি।
তানভীর হাসি থামিয়ে বলল, ‘আমি তাহলে এখন চলি বোন।’ বলে আর থামল না, খোলা দরোজা দিয়ে চলে গেল।
আম্মু শোয়ার ঘরের দরোজা অল্প খুলে রেখে সেখান থেকে এ সবই দেখছিলেন। খুশিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠল তার সমস্ত চেহারা। যাক, অবশেষে কালো মেঘটা সরে গেছে। এখন সেখানে হেসে উঠেছে এক টুকরো ঝলমলে রোদ। তবে রোদটা ততটা ফুটতে পারছে না। কেন পারছে না তাও জানেন তিনিÑ মেয়েটার পেটে যে দারুণ ক্ষিধে! ক্ষিধে পেটে কারই বা মুখে ভালো হাসি ফোটে? দ্রুত মেয়ের প্রিয় লাচ্ছাসেমাই রান্না করতে চলে গেলেন।
কিছুক্ষণের মধ্যেই ফিরল মুরাদ। দু’টো চকবার কিনে এনেছে ও। একটা ছোটবোনকে দিয়ে অন্যটার খোসা ছিড়ল।
‘আপুমণি,’ বলল মুরাদ। ‘লাচ্ছা চলবে তো?’
‘হ্যাঁ চলবে।’ মাথাটা এক পাশে অনেকখানি নামিয়ে জবাব দিল মুনিয়া।
‘তুমি তাহলে চকবারটা খেতে লাগো, আমি আম্মুর সাথে লাচ্ছা সেমাই রান্না করে এক্ষুনি নিয়ে আসছি। তারপর দু’জন বসে সারারাত গল্প করব। আজ কী হয়েছে তা তো তুমি জানোই না।’ বলে ঘুরে দাঁড়াল মুরাদ।
ওকে থামাল মুনিয়া। বলল, ‘কী হয়েছে ভাইয়া?’
‘উঁহু, এখন বলা যাবে না। আগে তুমি খেয়ে নাও, তারপর সব বলব।’ বলে আর থামল না মুরাদ। চলে গেল রান্না ঘরের দিকে।
মুনিয়াও সেখানে আর দাঁড়িয়ে রইল না। ভাইয়ার পথই ধরল।

মুরাদ এই মাত্র মায়ের মোবাইল সেটটা নিয়ে নিজের রুমে এলো। মায়ের চোখ এড়িয়ে নিয়ে এসেছে সেটটা। কাজ সেরে আবার দ্রুতই রেখে আসতে হবে ওটা, মা টের পাওয়ার আগেই।
দ্রুত মেসেজ অপশনে গিয়ে ইনবক্স অন করল মুরাদ। তখন যে দু’টো মেসেজ ফরওয়ার্ড করেছিল, তা ওপেন করল। ইংরেজি অক্ষরে বাংলাতেই কিছু লেখা হয়েছে। প্রথম মেসেজটা মোবাইল সিম কোম্পানির। বিভিন্ন অফার দেয়া হয়েছে। ডিলিট করে দিল মেসেজটা। দ্বিতীয়টা, হ্যাঁ, এটাই বোধহয় সেই কাক্সিক্ষত মেসেজ। দ্রুত একটা খাতায় তা লিখে নিল। তারপর মোবাইল সেটটা রেখে এলো মায়ের ঘরে, মা কিছুই টের পেলেন না।
খাতার পৃষ্ঠাটা সামনে টেবিলে মেলে ধরে চেয়ারে বসে পড়ল মুরাদ। মেসেজটাতে যা লেখা আছে তা হলোÑ ৎধঃ ৯ ঃধ ঢ়ধশঁৎ ঢ়ঁশঁৎ মধঃ শধষড় নৎরভশবং ংযড়হশবঃ শধষড় নবৎধষ.
নিচে বাংলা অক্ষরে লিখলÑ রাত ৯টা পাকুর পুকুর ঘাট কালো ব্রিফকেস সঙ্কেত কালো বিড়াল। হাবিজাবি কিছু লেখা বলে মনে হলো ওর কাছে। দূর! এটা কোনো মেসেজ হলো? কী বোঝানো হয়েছে এই অদ্ভুত কিছু শব্দ দিয়ে? ভেতরে কোথাও কোনো দাড়ি-কমা কিছুই নেই। সে কারণেই বোধহয় পড়তে একটু খটমটে লাগছে। মুরাদ দাড়ি-কমা লাগিয়ে পড়ার চেষ্টা করল। ও দাড়ি-কমা বসিয়ে যা দাঁড় করালো তা এরকমÑ রাত ৯টা, পাকুর পুকুর ঘাট। কালো ব্রিফকেস। সঙ্কেত : কালো বিড়াল। হ্যাঁ, এবার কিছুটা পরিষ্কার হয়। পাকুর পুকুর ঘাটে রাত নয়টায় কিছু ঘটবে বা করতে হবে যেন সেটাই বোঝানো হয়েছে। কালো ব্রিফকেস দিয়ে কী বোঝানো হয়েছে? আচ্ছা, রাত নয়টায় কি কারো সাথে নির্দেশিত পুকুর ঘাটে দেখা করতে বলা হয়েছে, যার হাতে থাকবে কালো ব্রিফকেস? নাকি কালো ব্রিফকেস নিয়ে যেতে বলা হয়েছে? সাধারণত গোয়েন্দা কাহিনীগুলোতে এমনটি দেখা যায়। ভিলেন বা শত্রু পক্ষের নিজেদের মধ্যে বা দুই পক্ষের মধ্যে ব্রিফকেস অদল-বদল করা হয় এই পদ্ধতিতে। তাহলে কি এখানেও কোনো অদল-বদলের ব্যাপার-স্যাপার আছে? তার মানে রহস্য? ইশ্! একটা কোনো রহস্যের যদি ও সমাধান করতে পারতো! ওর খুব ইচ্ছে গোয়েন্দাগিরি করার। তাহলে কি ও তেমনই কোনো গোয়েন্দাগিরিতে জড়িয়ে যাচ্ছে? যদি তাই হয়, তাহলে তো বলতে হয়, রহস্য নিজে এসেই ওর কাছে হাজির হয়েছে। যেন যেচে পড়ে এসে বলছে- আমি খুব বিপদে পড়েছি, আমাকে উদ্ধার করো!
ভাবতেই উত্তেজনায় শরীরের শিরা-উপশিরাগুলো টানটান হয়ে গেল মুরাদের। সাথে সাথে মৃদু ঘামও দেখা দিল কপালে।
আবারও মেসেজটার দিকে মনোযোগ দিল ও। মেসেজের পরবর্তী অংশে লেখা আছেÑ সঙ্কেত : কালো বিড়াল। এই জায়গাটা একটু জটিল। আগেরটুকু মোটামুটি (ধারণা অনুযায়ী) বুঝতে পারলেও এটুকু একটুও বুঝতে পারল না। তাই আবারও পড়ল পুরো মেসেজটা। আবার। এভাবে প্রায় দশ-বারোবার পড়ে ফেলল। কিন্তু না, কিছুই আর মাথায় ঢুকছে না। বরং আগে যে একটু আশার আলো দেখছিল, সেটি এবার মিলিয়ে যেতে শুরু করল। একটু পর মাথাটা ঝিম ঝিম করতে লাগল। সারা শরীর ঘেমে নেয়ে উঠল। চেয়ারে হেলান দিল ও। চোখ দু’টো বন্ধ করে ফেলল। তখনও চোখের সামনে যেন ভেসে আছে লেখাটা। জ্বলজ্বল করছে ইংরেজি অক্ষরে লেখা বাংলা মেসেজের প্রতিটা অক্ষর, প্রতিটা শব্দ। এভাবে থাকতে থাকতেই কখন যেন ঘুমে চোখজোড়া বুজে এলো। কখন যেন সেখান থেকে উঠে বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়ল।
ঘুমের রাজ্যে হারিয়ে গিয়েছিল মুরাদ। অদ্ভুত অদ্ভুত সব স্বপ্ন দেখতে লাগল। দেখলÑ লোক দু’টো আবার এসেছে। মুরাদ তখন বাগানে বেঞ্চটার উপরে বসে ছিল। দূর থেকে ওকে ডাকল বুলেট। এগিয়ে গেল ও। হঠাৎ সাবু ওকে জাপটে ধরল। কী সব যেন বলছে তারা অনর্গল। একটি বর্ণও বুঝতে পারছে না মুরাদ। তবে এটুকু বুঝল, ওর কাছে কিছু একটা চাইছে তারা। ও তা দিতে অস্বীকার করছে। অস্বীকার করছে বলতে তারা কী চাইছে তা বুঝতে পারছে না। বার বার বলছে সে কথা। কিন্তু তারা নাছোড়বান্দা। একসময় ওর শার্ট-প্যান্টের পকেটে খুঁজতে লাগল।
প্রচণ্ড রাগ হলো মুরাদের। ওর পকেট কেউ হাতড়াবে, এটা ও কিছুতেই সহ্য করতে পারে না। আর তাছাড়া লোক দু’টোর প্রতি ওর তো এক রকম রাগ আছেই। ঘৃণাও। কোনো গোপন কাজের সাথে জড়িত ওরা, ওর ধারণা। আর সেটা যে ভালো কোনো কাজ না, তা তাদের কথাবার্তা থেকেই বোঝা যায়। এ কারণে ভীষণ জোরে একটা ঘুষি চালাল ও সাবুর থলথলে মুখটাতে। আটার বস্তায় ঘুষি মারার মতো ‘থ্যপ্’ করে একটা শব্দ হলো। সাথে সাথে নিজের চোয়ালে প্রচণ্ড ব্যথা অনুভব করল ও। ‘আঁউ!’ করে ব্যথায় কঁকিয়ে উঠল।

পাঁচ.
চোয়ালে ভীষণ ব্যথা পেয়ে জেগে গেল মুরাদ। ধড়ফড় করে উঠে বসতে চাইল। কিন্তু পারল না, বাধা পেল। দেখল, বুলেট ওকে চেপে ধরে আছে বিছানার ওপর। ডান হাতের কনুইটা ওর বাম চোয়ালের সাথে সেটে রয়েছে। এ কারণেই ব্যথা করছে।
সাবু কী যেন তন্ন তন্ন করে খুঁজছে ওর পকেটগুলো। হাঁফাচ্ছে লোকটা।
‘তোমরা এখানে কী করছ?’ অস্ফুটে বলে উঠল মুরাদ।
‘ওটা আমাদেরকে দিয়ে দাও।’ চিকন গলা অর্থাৎ বুলেট বলল।
‘কী দেব তোমাদেরকে? আমি তো তোমাদের কাছ থেকে কিছু নিইনি।’ অবাক হলো মুরাদ।
ওর কথার কোনো পাত্তা দিল না ওরা। সাবু বলল, ‘অ্যাই বুলেট, সব জায়গা তো খুঁজলাম। কোথাও পেলাম না তো ওটা। এখন কী করব?’
‘কী আর করবে, আমার মাথায় একটা চাটি মারো।’ ঝাঁঝিয়ে উঠল বুলেট।
বুলেট ওকে ছেড়ে দিয়ে উঠে দাঁড়িয়েছে। বলল, ‘দেখ খোকা, আমরা কিন্তু লোক ভালো নই। ভালোই ভালোই কাগজটা দিয়ে দাও। ওটা আমাদের খুব প্রয়োজন।’
সাবু তাকে সমর্থন জানিয়ে বলল, ‘হ্যাঁ ছেলে, কাগজটা আমাদের খুবই প্রয়োজন। তুমি কী করবে বলো ওই এক টুকরো কাগজ নিয়ে? আর ওতে যা লেখা আছে তুমি তার কিছুই বুঝবে না। দিয়ে দাও কাগজটা।’
মুরাদ মনে মনে একটু মুচকি হাসল। কোন্ কাগজটা তারা খুঁজছে তা আন্দাজ করতে পারছে। এটা নিশ্চয়ই ওই কাগজটা যেটা ও বিকেলে বাগানে গোলাপ গাছটার নিচে গর্তের মধ্যে পেয়েছিল। ভালোই লাগছে ওকে লোক দু’টোকে ওর কাছে অনুনয় বিনয় করে কাগজটা চাইছে দেখে। কেমন বোকা বোকা লাগছে তাদেরকে। দেখলে মনেই হয় না তারা দুর্ধর্ষ কেউ। কী জানি, হয়তো তারা ভালো। ও এবং তানভীর যা ভাবছে, সে রকম খারাপ কেউ না।
কিন্তু ওর ঘরে ঢুকল কী করে ওরা?
‘তোমরা আমার ঘরে ঢুকলে কী করে?’ লোক দু’টোর কথার কোনো জবাব না দিয়ে পাল্টা জিজ্ঞেস করল মুরাদ।
‘দেখ,’ বলল বুলেট। ‘আমরা সেই সন্ধ্যা থেকেই তোমাকে ফলো করছি। তোমার সাথে আরেকটা ছেলে ছিল তাও আমরা দেখেছি। পথে আমরা ওকে ধরেছিলাম। কিন্তু ওর বাবা চলে আসায় ওকে ছেড়ে দিতে হয়েছে। ওর বাড়ি ফিরতে দেরি হচ্ছে দেখে ওর বাবা এসেছিল খোঁজ নিতে।’
‘আমার কাছে কী চাও তোমরা?’
‘আগেই তো বলেছি, কাগজটা দিলেই আমরা চলে যাব। তোমার কোনো ক্ষতি আমরা করব না। আর কথা দিচ্ছি, কেউ তোমার কোনো ক্ষতি করতেও পারবে না।’
‘আমার কোনো ক্ষতি হওয়ার কথা আপনারা ভাবছেন কেন? আর কোন্ কাগজটার কথা বলছেন, আমি তো কিছুই বুঝতে পারছিনে।’ অবাক হওয়ার ভান করে বলল মুরাদ।
এই কথায় এ ওর মুখের দিকে তাকাল বুলেট ও সাবু।
সাবু বলল, অনেকটা ফিসফিস করে, ‘আমি আগেই বলেছিলাম, ছেলেগুলো এর কিছুই জানে না। খালি খালি সময় নষ্ট করলাম আমরা।’
কিছু একটা যেন ভাবল বুলেট। একটু পর বলল, ‘তুমি সত্যিই কোনো কাগজ কুড়িয়ে পাওনি?’
‘কই, না তো?’ এবার যেন সত্যিই অবাক হলো মুরাদ। আবার বেশ খুশি খুশি লাগছে ওকে। যাক, লোক দু’টোকে বোকা বানাতে পেরেছে ও। আসলে ওই মেসেজটা আগে ও পরীক্ষা করে দেখতে চায়। কোনো রহস্য তো থাকলেও থাকতে পারে। আর এখন তো স্পষ্ট যে, এর পেছনে অবশ্যই একটা রহস্য লুকিয়ে আছে। নইলে এরা কেন কাগজটা এভাবে চাইছে? ওটা হারিয়ে এরা কেন এতো ভেঙে পড়েছে?
কয়েক মুহূর্ত এক দৃষ্টিতে মুরাদের দিকে তাকিয়ে রইল বুলেট। অন্তর্ভেদী সে দৃষ্টির সামনে চোখ খোলা রেখে তাকিয়ে থাকতে বেশ কষ্ট হচ্ছিল মুরাদের। তারপরেও জোর করে তাকিয়ে রইল। একটুও ঘাবড়ানো চলবে না।
বুলেট যখন ওর দিক থেকে চোখ ফিরিয়ে নিল, তখন ঘন ঘন কয়েকবার চোখের পলক ফেলল মুরাদ। চোখে পানিও চলে এসেছে। অলক্ষে হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে মুছে নিল। বলল, ‘এতো রাতে অন্যের বাসায় এভাবে ঢুকে পড়া ঠিক না। এখন তো আমি পুলিশ ডেকে আপনাদেরকে ধরিয়ে দিতে পারি।’
সাবু বলল, ‘পুলিশকে আমি বড্ড ভয় পাই। ইয়ে মানে বাবু, আমরা মানে খুবই সরি, এভাবে রাতের আঁধারে তোমার ঘরে ঢোকার জন্য।’
বুলেট বলল, ‘তোমাকে ডিস্টার্ব করার জন্য ক্ষমা চাচ্ছি। শোনো, মানে…’
‘আমার নাম মুরাদ।’ নিজের নাম বলল মুরাদ।
‘হ্যাঁ, শোনো মুরাদ,’ অসমাপ্ত বাক্য শেষ করল বুলেট। ‘আমরা যে কাগজটা হারিয়ে ফেলেছি তাতে গুরুত্বপূর্ণ একটা সঙ্কেত লেখা আছে। ওই সঙ্কেতটা আমাদের খুউব দরকার। যদি ওটা খুঁজে পাও, তাহলে এই নম্বরে একটু জানাবে।’ হাতে মোবাইল নম্বর লেখা এক টুকরো কাগজ ওর দিকে এগিয়ে দিল বুলেট। ‘আমাদের খুব উপকার হবে।’
‘ঠিক আছে, ওটা যদি পাই, তাহলে জানাব।’ কাগজটা নিতে নিতে বলল মুরাদ।
বেশ অনুনয় করে বলল বুলেট, ‘আবারও সরি এতো রাতে তোমাকে ডিস্টার্ব করার জন্য।’ তারপর সাবুর দিকে তাকিয়ে বলল,  ‘চলো সাবু।’ ঘুরে দাঁড়াল। এগিয়ে গেল দরোজার দিকে। পেছনে সাবুও।
দরোজা পর্যন্ত গিয়ে আবার ঘুরে দাঁড়াল বুলেট। বলল, ‘তবে সাবধান! মিথ্যার আশ্রয় নিলে কিন্তু বিপদ হবে তোমার। আগেই বলেছি যে, আমরা লোক খুব সুবিধার না।’ স্পষ্ট হুমকি তার কথায়।
‘কোঁৎ’ করে একটা ঢোক গিলল মুরাদ। শিরদাড়া বেয়ে ভয়ের একটা ঠাণ্ডা স্রোত বয়ে গেল। মনে হলো কাগজটার  কথা বলে দেয়, আবার কী মনে হতে বলল না।
বেরিয়ে গেল লোক দু’টো।
বেশ কিছুক্ষণ ওভাবেই নিজের জায়গায় দাঁড়িয়ে রইল মুরাদ। কেমন যেন নিশ্চুপ হয়ে গেছে। তারপর যেন সম্বিৎ ফিরল, এমনভাবে দ্রুত এগিয়ে গেল খোলা দরোজার দিকে। বেরিয়ে গেল বাইরে। কিন্তু ততক্ষণে হারিয়ে গেছে লোক দু’টো। বাইরে বৈদ্যুতিক আলো জ্বলছে। সেই আলোয় গেটের কাছ পর্যন্ত দেখা যায়। না, কোথাও নেই তারা। এত দ্রুত গেল কী করে তারা, ভাবতেই গায়ের ভেতর কেমন গুলিয়ে উঠল।
ধপাস করে বিছানায় এসে বসে পড়ল মুরাদ। রাতে খাওয়া-দাওয়া সেরে মায়ের চোখের আড়ালে মায়ের মোবাইল সেটটা নিয়ে মেসেজটা খাতায় লিখে নেয় ও। তারপর ওটা নিয়ে গবেষণায় বসে। উদ্ধার করতে পারে না মেসেজের অর্থ। তবে এটুকু বুঝতে পারে যে, কেউ রাত নয়টার সময় কোনো একটা পুকুর পাড়ে যেতে বলছে কাউকে। সেখানে গিয়ে কী করতে হবে, তাও বলে দেয়া আছে মেসেজে। শুধু একটা জিনিস বুঝতে পারে নাÑ সঙ্কেত : কালো বিড়াল।
মাথাটা আবারও হ্যাং হয়ে যায় মুরাদের। লোক দু’টো ওর ঘর পর্যন্ত এসেছে। তারমানে তাদের দ্বারা সবকিছুই সম্ভব। এই প্রথমবারের মতো বেশ ভয় ভয় করতে লাগল ওর। বেশি রিস্ক নিয়ে ফেলেনি তো? কাগজটা দিয়ে দিলেই কিংবা কোথায় আছে বলে দিলেই কি হতো না? এখন যদি কোনো বিপদ হয়?
কী করবে মুরাদ? কারোর সাথে একটু আলোচনা করতে পারলে ভালো হতো। তানভীরটাও যেন কী! আরে বাবা, আজ রাতটা এখানে থাকলে কী এমন হতো? বাড়িতে আম্মুকে মোবাইল করে দিলেই তো হয়ে যেত। বাড়ির বাইরে বন্ধুর বাড়িতে কি কেউ রাত থাকে না?
না, যা করার একাই করতে হবে। তানভীরের আশায় বসে থাকলে হবে না। রহস্যের গন্ধ ও পেয়েছে। কাজেই সেই গন্ধ শুকে শুকে সেটা সমাধানও করবে, সিদ্ধান্ত নিয়ে নিল।
দরোজাটা বন্ধ করে দিয়ে আবারও টেবিলের সামনে চেয়ারটাতে বসল মুরাদ। এনার্জি সেভিংস বালবটা নিভিয়ে ডিম লাইটটা অন করে দিল তার আগে। অল্প আলোতে চিন্তা করলে নাকি বুদ্ধি খোলে। আজ তা পরীক্ষা করে দেখবে।
লোক দু’টো টেবিলের উপরের বই-খাতাও ঘেটেঘুটে দেখেছে। যে খাতায় ও মেসেজটা লিখেছিল, সেটা এক কোণায় পড়ে আছে। ওটা কেন যেন তাদের চোখে পড়েনি। নাকি চোখে পড়লেও বুঝতে পারেনি যে মেসেজটা তাতে লেখা আছে।
আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করল মুরাদ। তারপর খাতাটা আবারও টেনে নিল। পড়ল বার দুয়েক লেখাগুলো। এবং এক দৃষ্টে তাকিয়েই রইল সেদিকে। ক্রমে ঝাঁপসা হয়ে এলো লেখার কালিগুলো।
মেসেজটা ও এভাবে বিশ্লেষণ করল- রাত নয়টার সময় পাকুর পুকুরে যেতে হবে। সঙ্গে করে কালো ব্রিফকেস নিতে হবে অথবা যার সাথে দেখা করতে হবে তার কাছে কালো ব্রিফকেস থাকবে। কিংবা হয়তো উভয়ের কাছেই কালো ব্রিফকেস থাকবে। আর হ্যাঁ, সঙ্কেত কালো বিড়াল বলতে তাদের গোপন কোনো কোড বোঝানো হয়ে থাকতে পারে। হয়তো তারা যখন পরস্পরের সাথে মিলিত হবে, তখন এই কথাটা বলতে হবে। তাতে বোঝা যাবে যে তাদের কাক্সিক্ষত লোকের সাথে তারা মিলিত হয়েছে। তারপর হয়তো ব্রিফকেস হাত বদল করবে। কিংবা হতে পারে একপক্ষের ব্রিফকেস অন্য পক্ষ নেবে এবং অন্য পক্ষের ব্রিফকেস নেবে প্রথম পক্ষ। ব্রিফকেসের মধ্যে দুই ধরনের জিনিস থাকতে পারে। একপক্ষের ব্রিফকেসে থাকবে টাকা এবং অন্যপক্ষের ব্রিফকেসে মূল্যবান কোনো জিনিস বা পদার্থ। কোনো নেশার দ্রব্য, সোনার বার বা দামী কোনো পাথর কিংবা অন্য কিছুও থাকতে পারে।
এ পর্যন্ত মোটামুটি একটা সিদ্ধান্তে আসা যায়। কিন্তু পাকুর পুকুর বলতে কোন্ পুকুরকে বোঝানো হয়েছে, সেটাই এখন প্রশ্ন। ‘পাকুর পুকুর পাকুর পুকুর…’ শব্দ দু’টো বেশ কয়েকবার আস্তে আস্তে আওড়াতে থাকল মুরাদ। হঠাৎ ঝাঁ করে কী যেন মনে পড়ে গেল ওর। চোখজোড়া চকচক করে উঠল। পেয়ে গেছে!

ছয়.
বেশ কিছুদিন আগে মুনিয়াকে বলতে শুনেছিল মুরাদ।
মুরাদকে বেশ কয়েকবার ওখানে নিয়ে যেতেও বলেছে মুনিয়া। এই এলাকারই দক্ষিণ প্রান্তে একটা ভাঙা বাড়ি আছে। কেউ থাকে না ওখানে। লোকের ধারণা, ওখানে বসবাস যতসব অশরীরি আত্মা আর ভূতপ্রেতের। যদিও কেউ কখনো তেমন কিছু ওখানে দেখেনি কেউ। সবাই কেবল শোনা কথা বলে যায়। তাই রাতের আঁধারে তো দূরের কথা, বেলা একটু পড়ে গেলেও কেউ ওদিকটাতে মাড়াতে চায় না।
বাড়িটা নাকি এক সময় চিরুনি কল ছিল। প্লাস্টিকের চিরুনি তৈরি করা হতো ওখানে। মুরাদরা অবশ্য তা চোখে দেখেনি। এমনকি, ওখানে যায়ওনি কখনো। জায়গাটা তাই ওর কাছে একটা রহস্যই বলা চলে। একটা অজানা আকর্ষণও অবশ্য আছে। সেই রহস্যময় জায়গাটায় যেতে চেয়েছিল মুনিয়া। মুরাদ রাজিও হয়েছিল। কিন্তু পরীক্ষা চলে আসায় আর যাওয়া হয়নি।
ভাঙা বাড়িটার ওখানে একটা শিমুল গাছ আছে। স্থানীয় ভাষায় শিমুল ফুলকে পাকড়া ফুল বলে। শিমুল গাছটাও তাই পাকড়া গাছ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। সেই পাকড়া গাছ লাগোয়া একটা পুকুর আছে। এখনও অনেক পানি তাতে। যদিও এই এলাকার অন্য পুকুরগুলো এক প্রকার শুকিয়ে গেছে। এ কারণে ওই পুকুরটাতে কেন অত পানি থাকে সব সময়, সেটাও একটা রহস্য সবার কাছে। পুকুরটা যেহেতু পাকড়া গাছের নিচে অবস্থিত, তাই তাকে পাকড়া পুকুর ডাকতে ডাকতে এক সময় পাকুড় পুকুরে পরিণত হয়।
এই কথাগুলোই হঠাৎ করে মনে চলে এলো মুরাদের। মেসেজের পাকুর পুকুর আসলে পাকুড় পুকুর হবে। ও লিখতে গিয়ে ‘ড়’-এর পরিবর্তে ‘র’ লিখেছে।
ওই পুকুর পাড়েই ঘটবে কিছু। রাত নয়টার সময়। কিন্তু কবে, তা উল্লেখ নেই মেসেজে। আজই যদি হয়?
একজন সঙ্গী হলে ভালো হতো। তাহলে আজই যাওয়া যেত। দেখে আসতো আসল ঘটনা কী!
নাকি একা চলে যাবে ও? পরক্ষণই ভয়ে গায়ে কাঁটা দিল। ওই ভুতুড়ে জায়গায় একা যেতে পারবে না ও। তারমানে আজ আর হবে না। কাল রাতে তানভীরকে নিয়ে যাবে। অবশ্যই যাবে। ওকে জানতেই হবে পাকুড় পুকুর ঘাটে কী ঘটে।
রাত অনেক হয়ে গিয়েছিল। চোখের পাতা বুজে আসছে মুরাদের। আর জেগে থাকতে পারছে না। কাল ভোরে একটা কোচিং রয়েছে ওর। তারপর স্কুল। কোনো পড়াই তৈরি করতে পারেনি। অবশ্য পড়াগুলো ক্লাসে শুনে অনেকটা মুখস্থ হয়ে গেছে। কালা ক্লাসে বসে স্যার ঢোকার আগে এক-দুইবার দেখতে পারলে পড়া বলতে পারবে ও। ব্রেন মোটামুটি সার্ফ ওর। অবশ্য কোচিংয়ের পড়াটা নিয়ে একটু ঝামেলা হবে। পড়া না পারলে স্যার সবার সামনে কান ধরে দাঁড় করিয়ে রাখবেন। ছিহ্, এই লজ্জা ও সহ্য করবে কেমন করে? আচ্ছা, ও তো প্রতিদিনই পড়া পারে, একদিন না পারলে স্যার ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন না? স্যারকে বোঝাতে হবে। স্যার নিশ্চয়ই ওর সমস্যার কথা বুঝবেন।
বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়ল মুরাদ। শোয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ঘুমের অতলে তলিয়ে গেল। এবং আবারও স্বপ্নে বুলেট ও সাবুকে দেখল। এবার আরো ভয়ানকভাবে উদয় হলো লোক দু’টো। তাদের চেহারা একেবারেই কুৎসিত দেখাচ্ছে এখন। সমস্ত গায়ে যেন একগাদা শুঁয়োপোকা কিলবিল কিলবিল করছে। চোখগুলো থেকেও ঝুলে আছে লম্বা লম্বা শুঁড়ওয়ালা কালো কালো শুঁয়োপোকা। মাথার চুলগুলোকে আকড়ে ধরে আছে ইয়া লম্বা লম্বা বিদঘুটে চেহারার কালো শুঁয়োপোকা। তাদের শরীর থেকে ওগুলো খসে খসে পড়ছে। কয়েকটা এসে পড়ল ওর গায়ে। সমস্ত গা গুলিয়ে উঠল ওর।
সরে যেতে চাইছে মুরাদ। কিন্তু সরতে পারছে না। যেন পা দু’টো থেকে অসংখ্য শিকড় বেরিয়ে মাটির গভীরে চলে গেছে। একটুও নড়তে পারছে না। চিৎকার করতে ইচ্ছে করছে। অথচ গলা ফাটিয়ে চিল্লিয়ে উঠলেও কোনো শব্দ বের হচ্ছে না। ঢোক গিলতে গিয়েও গিলতে পারছে না। গলার ভেতরে যেন কেউ একগাটা নিউজপ্রিন্ট কাগজ দলা পাকিয়ে গুজে দিয়েছে। বুকের খাঁচায় হৃৎপিণ্ডটা একটু বাতাসের জন্য হাঁসফাঁস করছে।
কী হয়েছে ওর? এরকম হচ্ছে কেন? বুঝতে পারছে না মুরাদ।
লোক দু’টো এবার দাঁত বের করে হাসছে। আরে, ওদের চেহারাটা ওমন হয়ে গেল কিভাবে? মুখের উপরে নাকটা যেন লম্বা হয়ে শুঁড়ে পরিণত হয়েছে। আরো বড় হচ্ছে শুঁড় দু’টো। আস্তে আস্তে হাতির শুঁড়ের মতো হয়ে যাচ্ছে। ওকে পেচিয়ে ধরতে এগিয়ে আসছে শুঁড় দু’টো।
ভয়ে শরীরের সমস্ত পানি শুকিয়ে গেল মুরাদের। ভীষণ জোরে জোরে নিঃশ্বাস নিচ্ছে। কিন্তু একটুও শান্তি পাচ্ছে না। স্বস্তি তো দূরের কথা।
লোক দু’টো এবার একেকটা হায়েনার রূপ ধারণ করল। টিভিতে হায়েনা দেখেছে ও। সারাক্ষণ মুখ উঁচু করে কী যেন শোঁকে তারা। বোধহয় কাঁচা গোশতের গন্ধ নেয়। বুঝতে চেষ্টা করে কোথায় কত দূরে তাদের শিকার আছে। তারপর সুযোগ মতো তাদের ওপর ঝাপিয়ে পড়ে।
হায়েনা দু’টোর নাকের ফুটো খুব দ্রুত বড় হচ্ছে। এবং ততটাই দ্রুত উঠানামা করছে। মুখের দুই পাশ দিয়ে দু’টো শ্বদন্ত বেরিয়ে গেছে। লালা ঝরছে সে দু’টো থেকে টপ টপ করে। কেমন একটা বিটকেলে গন্ধ আসছে।
আর সহ্য করতে পারছে না মুরাদ। গায়ের সমস্ত শক্তি একত্র করে গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে উঠল।
মুহূর্তে মিলিয়ে গেল হায়েনা।
বিছানায় লাফিয়ে উঠে বসল মুরাদ। দরদর করে ঘামছে। মাথার উপরে ফুল স্পিডে সিলিং ফ্যান ঘুরছে। তাতেও কাজ হচ্ছে না।
ভীষণ পানি তৃষ্ণা পেয়েছে ওর। আজ রুমে পানি এনে রাখতে মনে নেই। বাইরে গিয়ে খেয়ে আসতেও ইচ্ছে করছে না।
জানালাটা লাগাতে ভুলে গেছে আজ মুরাদ। আসলে বিকাল থেকে যেসব অদ্ভুত সব ঘটনা ঘটতে শুরু করেছে, তাতে সব কিছু কেমন গুলিয়ে গিয়েছিল ওর।
ওর মনে হচ্ছে খোলা জানালা দিয়ে বুঝি কেউ উঁকি দিচ্ছে। ভয়ে গা শিরশির করে উঠল। কোনো রকমে উঠে গিয়ে খুব দ্রুততার সাথে শব্দ না করে লাগিয়ে দিল জানালা। ভয়টা এবার একটু কমল। কিন্তু গলা তো শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে।
এই সময় কে যেন ওর রুমের দরোজায় বাইরে থেকে টোকা দিল। দড়াম করে হৃৎপিণ্ডটা বুকের খাঁচায় আছড়ে পড়ল। পর পর দু’টো হার্টবিট মিস করল। হায়েনারা এবার ওর দরোজায় চলে এসেছে। এক্ষুনি দরোজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করবে। তারপর ছিড়েখুড়ে খাবে ওকে।
এবার দরোজায় টোকার সাথে একটা কণ্ঠ কথাও বলে উঠল। কণ্ঠটা কেমন পরিচিত লাগল ওর। কান খাড়া করে শুনল। কণ্ঠটা ডেকেই চলেছে, ‘মুরাদ, অ্যাই মুরাদ, কী হয়েছে বাবা? অমন চিৎকার করে উঠলি কেন? দরোজা খোল।’
ভয়টা কেটে গেল অনেকটা মুরাদের। এ তো আম্মুর কণ্ঠ। আবার একটু দ্বিধাও কাজ করল। হায়েনা দু’টোই গলা নকল করে ওকে ডাকছে নাতো ধোকা দেয়ার জন্য? ও বিশ্বাস করে দরোজা খুলে দেবে, আর অমনি ওর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বে ধারাল দাঁত ও নখ নিয়ে।
দরোজায় আবারও টোকা এবং কথা, ‘মুরাদ আমি পানি এনেছি। আজ তো পানি নিতেও ভুলে গেছিস। দরোজা খোল বাবা।’
পানির কথা শুনে তৃষ্ণাটা যেন বহুগুণে বেড়ে গেল। ভুলে গেল সমস্ত ভয় আর শঙ্কা। দ্রুততার সাথে খুলে দিল দরোজা।
মা ভেতরে প্রবেশ করলেন। হাতে জগভর্তি পানি। টেবিলে রাখতে রাখতে বললেন, ‘খারাপ কোনো স্বপ্ন দেখেছিস বুঝি?’
মুরাদ এপাশ ওপাশ মাথা নাড়ে। মা গেলাসে পানি ঢেলে এগিয়ে দিয়ে আবারও বলেন, ‘বাকি রাতটা মুনিয়ার পাশে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়ো, যাও।’
মুরাদ এক নিঃশ্বাসে পানিটুকু খেয়ে মাকে গেলাস ফেরত দিয়ে পাশের রুমে চলে গেল। মুনিয়া তখন গভীর ঘুমে তলিয়ে আছে। আস্তে করে তার পাশে গিয়ে শুয়ে পড়ল মুরাদ।
মা পেছনে পেছনে ঢুকলেন। ছেলেমেয়ের মাথায় আলতো করে আদরের হাত বুলিয়ে দরোজা ভেজিয়ে দিয়ে নিজের ঘরে চলে গেলেন।
বাকি রাতটা এক ঘুমেই কাটিয়ে দিল মুরাদ।

সাত.
সকালে ঘুম থেকে উঠতে দেরি করল মুরাদ। গত রাতে যা যা ঘটেছে, তাতে এক প্রকার ঘোরের মধ্যেই ছিল ও। বার বার দুঃস্বপ্ন দেখে জেগে উঠেছে। শেষে পাশের রুমে মুনিয়ার পাশে গিয়ে ঘুমিয়েছে।
সকালে একটা কোচিং ছিল। সেটা মিস হয়ে গেল। স্কুলও কামাই যেত যদি আম্মু জোর করে ডেকে না ওঠাতেন। একপ্রকার ধমক দিয়েই ওকে জাগিয়ে দিলেন আম্মু। একবার ডেকে দিয়ে নাশতা বানাতে গেছেন তিনি। কেটে গেছে বেশ কিছুক্ষণ। কিন্তু তখনো মুরাদ নাশতার টেবিলে যায়নি দেখে আবারও ঢুকলেন ছেলের রুমে। অবাক হয়ে দেখলেন, বাছাধন তখনো বেঘোরে ঘুমাচ্ছে। তাই এবার আর শুধু ডেকে দিয়েই ক্ষান্ত হলেন না, ওকে বিছানা থেকে নামিয়ে টুথব্রাশে পেস্ট মাখিয়ে বাথরুমে ঢুকিয়ে দিয়েই তবে আবার রান্নাঘরে গেলেন।
এবার আর আলসেমী করে দেরি করতে পারল না মুরাদ। খানিক বাদেই নাশতার টেবিলে গিয়ে হাজির হলো। ঘুমের রেশ তখনো চোখে-মুখে।
মুনিয়ার নাশতা করা প্রায় শেষ পর্যায়ে। স্কুল ড্রেস আগেই পরে নিয়েছে প্রতিদিনকার মতো।
ঘুমের ঝোঁকে ঝোঁকে ভালো মতো নাশতা সারতে পারল না মুরাদ। কোনো রকমে একটা পরোটার অর্ধেকটা ছিড়ে আলুভাজি আর ডিম পোচের খানিকটা পেটে চালান করল। তারপর পিঠে স্কুল ব্যাগ ঝুলিয়ে বাইসাইকেলটা বের করে নিল। মুনিয়া আগেই বারান্দায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে।
‘সাবধানে যাস।’ বললেন আম্মু।
মুরাদ মাথা নেড়ে বলল, ‘আচ্ছা।’ তারপর গেট দিয়ে বেরিয়ে গেল মুনিয়াকে সাইকেলে চড়িয়ে নিয়ে।
মুরাদের ইচ্ছে ছিল স্কুলে যাওয়ার আগে একবার গোলাপ গাছটার নিচে দেখে যাবে কাগজটা এখনো আছে কি না। কিন্তু গতরাতের দুঃস্বপ্ন আর দেরি করে ঘুম থেকে ওঠা তা হতে দিল না। তাই মনে মনে ঠিক করল, স্কুল ছুটি হলেই আগে বাড়ি যাবে। সে কারণে মুনিয়াকে এখনই ফেরার রিকসা ভাড়া দিয়ে দেবে। ওকে বুঝিয়ে বলবে যে ওর বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ একটা কাজ আছে। তাই বিকেলে ওকে নিতে আসতে পারবে না।
মুরাদের ভাগ্যটা আজ ভালোই বলতে হবে। কেননা, কোনো স্যারই ওকে পড়া জিজ্ঞেস করলেন না। জিজ্ঞেস করলে ও ভালো করে বলতে পারত না। আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করল ও। তবে এও ঠিক করল যে, সামনের শুক্রবারেই বাদপড়া পড়াগুলো সেরে নেবে। কিছুতেই পিছিয়ে পড়া চলবে না। কখনো ক্লাসে থার্ড হয়নি ও। প্রথম অথবা দ্বিতীয় স্থান বরাবরই ওর দখলে।
স্কুল ছুটি হওয়ার পর এক মুহূর্তও নষ্ট করল না মুরাদ। গ্যারেজে মুখের কাছে রেখেছিল সাইকেল। দারোয়ান ভাইকে বলেও গিয়েছিল ছুটির ঘণ্টা পড়লেই যেন সাইকেলটা বাইরে বের করে রাখে। দারোয়ান কথা রেখেছে।
সাইকেল নিয়ে শাঁ শাঁ করে বেরিয়ে গেল ও মেইন রাস্তায়। যেন উড়ে যাচ্ছে। এই সময়টাতে রাস্তাঘাটে ব্যাপক ভীড় লেগে থাকে। অফিস আর স্কুল ফেরত মানুষ ও শিক্ষার্থীদের দখলে থাকে তখন রাজপথ। এই ভীড়ের মধ্য দিয়েই ও তীরের মতো সাইকেল চালাচ্ছে। কয়েকবার অ্যাক্সিডেন্ট করতে গিয়েও বেঁচে গেল ও।
মাত্র পনেরো মিনিটে আধাঘণ্টার পথ পাড়ি দিল মুরাদ আজ। সাইকেলটা গেটের ভেতরে ঢুকিয়ে ওখানেই স্ট্যান্ড দিয়ে রাখল। তারপর ওই অবস্থাতেই ছুটল গোলাপ গাছটার দিকে। হাঁটু মুড়ে বসে পড়ল। বুকটা ‘ধড়াস’ করে উঠল। না, নেই ওটা। আরো ভালো করে খুঁজল। গাছের চারপাশটা ঘুরে ঘুরে খুঁজল। আশেপাশে বেশ খানিকটা দূর পর্যন্তও দেখল। কিন্তু কোথাও নেই কাগজটা। কোথায় গেল?
নিশ্চয়ই বাতাসে কোথাও উড়ে গেছে। আছে হয়তো এই বাগানের মধ্যেই কোথাও। ক্ষীণ একটা আশা মনের কোণে চেপে রেখে সমস্ত বাগান খুঁজল। পাওয়া গেল না। এবার সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হলো ও, হয় পাসওয়ার্ড লেখা কাগজটা বাতাসে উড়ে বাউন্ডারি ওয়ালের বাইরে চলে গেছে, অথবা কেউ ওটা নিয়ে গেছে। যদি দ্বিতীয়টা হয়, তাহলে কে নিয়ে গেছে? লোক দু’টো কি? তাদের নিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। কারণ, ওটা তাদেরই বেশি প্রয়োজন।
একটু দমে গেল মুরাদ। তাহলে কি তারা সূত্র অনুযায়ী পাসওয়ার্ড আবিষ্কার করে মোবাইলের সিমের লক খুলে ইনবক্সের মেসেজটা পড়ে নিয়েছে? উদ্ধার করতে পেরেছে তার অর্থ? যদি পেরে থাকে, কখন করেছে? কাল রাতেই কি? তাহলে তো পাকুড় পুকুর ঘাটে গিয়ে যথারীতি কাজ সেরে ফেলার কথা। কিন্তু লোক দু’টো কাল রাতে যখন ওর ঘর থেকে বের হয়ে গেছে, তখন তো অনেক রাত। অত রাতে বাগানে কেউ কিছু খুঁজলে নিশ্চয়ই আব্বু বা আম্মুর নজরে পড়ত। ওর নজরেও তো পড়তে পারত। ওর নজরে তো কিছুই পড়েনি। অবশ্য তখন ও তো নানান দুঃস্বপ্ন দেখে চমকে চমকে উঠছিল।
আব্বু বা আম্মুর নজরে পড়েছে বলেও তো মনে হয় না। তাহলে? কী হতে পারে?
নাহ্, মনটা হঠাৎ মরে গেল ওর। একটা রহস্য পেয়েছিল ও। ভেবেছিল একটা গোয়েন্দাগিরি করবে। কিন্তু সেটা বোধহয় আর হচ্ছে না।
হঠাৎ কী মনে হতে বাগানে বেঞ্চটার ওপর বসে পড়ল ও। আচ্ছা, ভাবল, না মরতেই কেন ভূত হচ্ছে ও? কাগজটা তো লোক দু’টোর হাতে নাও পড়তে পারে। এমন তো হতে পারে বাতাসে ওটা দেয়ালের বাইরে কোথাও উড়ে গেছে? আজ রাতে ও পাকুড় পুকুর ঘাটে যেয়েই দেখুক না কিছু ঘটে কি না। এই কথাটা ভাবতেই ও উঠে দাঁড়াল। বইয়ের ব্যাগ রেখে ড্রেস চেঞ্জ করে তানভীরের কাছে যেতে হবে। আজ স্কুলে যায়নি ও। ওকে নিয়ে রাতের অভিযানের জন্য একটা প্লান রেডি করতে হবে।
জামাকাপড় ছেড়ে একটা আপেল হাতে নিয়ে তাতে কামড় বসাতে বসাতে সাইকেল নিয়ে আবারও বেরিয়ে পড়ল।
তানভীরকে বাড়ি পাওয়া গেল না। আম্মুর সাথে খালা বাড়ি গেছে। থাকবে কয়েকদিন।
অনেকটা দমে গেল মুরাদ। তানভীর থাকলে ভালো হতো। ওকে সহযোগিতা করতে পারত। একজন সঙ্গী ছাড়া রাতে ওই ভুতুড়ে ভাঙা বাড়ির ওখানে যাওয়া ঠিক হবে না। ও যদিও ভূত-প্রেত কিছু বিশ্বাস করে না, কিন্তু মুরব্বিদের কথা একেবারে ফেলেও দিতে পারে না। নিশ্চয়ই কিছু একটা আছে ওখানে। নইলে এমনি এমনি এমন গল্প প্রচলিত হওয়ার কথা না।
সাইকেলের প্যাডেলে পা যেন ঘুরছিল না। ধীরে ধীরে চালাচ্ছে ও উদ্দেশ্যহীনভাবে। নানান কথা ভেবে চলেছে ওর মস্তিষ্ক। সব কিছুই এলোমেলো ভাবনা।
নিজের মাঝে এতোটাই অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিল মুরাদ যে কখন ওর পথ আগলে দাঁড়িয়েছে লোক দু’টো তা ও খেয়াল করেনি। আরেকটু হলেই তাদের গায়ের ওপর উঠিয়ে দিত সাইকেল।
‘এই যে ছেলে, কেমন আছো?’ বলে উঠল একজন।
কণ্ঠটা পরিচিত লাগল মুরাদের কাছে। কিন্তু কোনো জবাব দিল না। ধাতস্থ হতে একটু সময় নিল।
‘কোথায় গিয়েছিলে ওদিকে?’ মুরাদকে কথা বলতে না দেখে এবার বলল দ্বিতীয় লোকটা, চিকন গলা।
এবার চিনতে পারল মুরাদÑ বুলেট ও সাবু। সঙ্গে সঙ্গে ভয় এসেও ওর মনে ভীড় করল। কী চায় ওরা? ভয়ঙ্কর লোক দু’টো ওর কোনো ক্ষতি করবে নাতো? কাল রাতে তো বলেই এসেছে ওরা মোটেও ভালো লোক না। এমনিতেই প্রচণ্ড গরমে তৃষ্ণা লেগেছিল, এক্ষণে গলা আরো শুকিয়ে এলো ওর। দ্বিতীয় প্রশ্নেরও কোনো উত্তর দিল না।
‘এই যে ছেলে,’ বলল সাবু। ‘আমরা কিছু একটা জিজ্ঞেস করেছি তোমার কাছে। আমি জিজ্ঞেস করেছি কেমন আছো। আর বুলেট জানতে চেয়েছে তুমি কোথায় গিয়েছিলে।’
কিছুটা স্বাভাবিক হয়ে এলো মুরাদ। এদের কাছে নিজের দুর্বলতা প্রকাশ করা যাবে না। তাতে এরা আরো পেয়ে বসবে। বরং বুকে সাহস রেখে কথা বলতে পারলে এরা কিছু করার সাহস করবে না। বলল, ‘আপনারা কী করছেন এদিকে? আগে তো কখনো এ এলাকায় দেখিনি আপনাদের।’ প্রশ্নের জবাব দেবে কি, নিজেই দু’টো প্রশ্ন করে বসল।
একে অন্যের দিকে তাকিয়ে ঠোঁট চিপে হাসল বুলেট ও সাবু। বুলেট বলল, ‘চালাক ছেলে। কিন্তু দেখ খোকা, কাল রাতেই তোমাকে বোধহয় বলেছি যে আমরা মোটেই ভালো মানুষ না। হ্যাঁ, আগে কখনো এ এলাকায় আমাদের দেখা যায়নি। কারণ আমরা এখানে নতুন। এসেছি একটা বিশেষ কাজে। কাজ শেষ হলেই আবার চলে যাব।’
মুরাদ তার কথা শেষ করতে না দিয়ে মাঝখানেই জিজ্ঞেস করে বসল, ‘কবে শেষ হবে আপনাদের কাজ? আর কাজটা কী?’
‘এই ছেলে, তোমাকে একটা বিষয়ে বলা হচ্ছে। তুমি কথার মাঝে কথা বলো কেন?’ সাবু বলল ঝাঁঝের সাথে।
মুরাদ বলল, ‘আপনারা আমাকে কেন এসব বলছেন বুঝতে পারছিনে তো, তাই কথার মাঝে কথা বলে ফেলছি। কিছু মনে করবেন না প্লিজ!’ চেহারাটা এখনও স্বাভাবিক রেখেছে মুরাদ। নিজেই অবাক হচ্ছে ও, এতো সাহস নিয়ে এই ভয়ঙ্কর টাইপের লোক দু’টোর সাথে এভাবে কথা বলছে কিভাবে?
হাসল বুলেট। সে হাসির মধ্যে কী যেন একটা লুকিয়ে আছে। মুরাদের কাছে মনে হলো যেন একটা হায়েনা নীরবে হাসছে তার শিকার কাছে পেয়ে। একটু পরেই ঝাঁপিয়ে পড়বে ওর ওপর। হঠাৎ আবার কাল রাতের স্বপ্নটার কথা মনে পড়ে গেল। একটু ভয় ভয় করতে লাগল।
বুলেট বলল, ‘আমরা আসলে তোমাকে সরি বলতে এসেছি। কাল রাতের ঘটনার জন্য আমরা সত্যিই দুঃখিত। আসলে ওভাবে রাতের অন্ধকারে তোমার ঘরে ঢুকে তোমার সাথে অমন আচরণ করা আমাদের ঠিক হয়নি।’
‘হ্যাঁ ছেলে,’ বলল সাবু। ‘আমরা আজই এ এলাকা ছেড়ে চলে যাব। কিন্তু তার আগে…’
সাবুকে কথা শেষ করতে দিল না বুলেট। মাঝখানে বলে উঠল, ‘আমরা জেনেছি যে তুমি বেশ বুদ্ধিমান এবং মেধাবিও। এলাকার সকলেই তোমাকে বেশ আদর-স্নেহ করে। আমরাও চাই তোমাকে সে রকম ভালোবাসতে। কিন্তু সে জন্য তোমাকে আমাদের কথা শুনতে হবে।’
বুলেটের শেষ কথাটা শুনে ভীষণভাবে চমকালো মুরাদ। ওদের কথা শুনতে হবে মানে? ওদের দলে নাম লেখাতে হবে নাকি? জিজ্ঞেস করল, ‘কী করতে হবে আমাকে?’
‘এই তো ভালো ছেলের মতো কথা।’ বলে উঠল সাবু। ‘দেখ ছেলে, কাগজটা আমাদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ওতে অত্যন্ত দরকারী একটা মেসেজ লেখা আছে। ওই মেসেজ অনুযায়ী কাজ শেষ করতে পারলে তবেই আমরা এ এলাকা ছেড়ে চলে যেতে পারব। যতক্ষণ না কাজটা সমাধা করতে পারছি, ততক্ষণ আমরা এ এলাকা চাড়তে পারব না। আর আমরা এ এলাকায় বেশিদিন থাকাটা এলাকার জন্য শুভ হবে না। তাই বলছিলাম কাগজটা আমাদেরকে দিয়ে দাও। বিনিময়ে যা তুমি চাইবে, আমরা তাই দেব।’
সাবুকে সমর্থন জানিয়ে মাথা ঝাঁকাল বুলেট।
মুরাদ ভাবল কী যেন কয়েক মুহূর্ত। বলেই দেবে কাগজটার কথা! কিন্তু ওটা তো আর এখন পাওয়া যাচ্ছে না। কাজেই কাগজের কথা বললেও কাগজটাতে কী লেখা আছে তা তো আর তারা জানতে পারছে না। তাই কিছুটা ভয় আর কিছুটা একগুয়েমি ভাব নিয়ে বলল মুরাদ, ‘ওটা আমি পেয়েছিলাম ঠিকই। কিন্তু…’
উৎসুক নিয়ে ওর দিকে তাকিয়ে আছে লোক দু’টো। মুরাদ থেমে যেতেই বুলেট বলে উঠল, ‘কিন্তু কী? কোথায় এখন কাগজটা? তোমার কাছে? শিগগির দাও ওটা আমাকে।’ হাত বাড়িয়ে দিল।
কিন্তু তাকে প্রচণ্ডভাবে হতাশ করে দিয়ে মুরাদ জানাল, ‘কিন্তু কাগজটা এখন আর আগের জায়গায় নেই। বোধহয় বাতাসে উড়ে অন্য কোথাও চলে গেছে।’
ফাটা বেলুনের মতো চুপসে গেল বুলেট আর সাবু।
মুরাদ মনে মনে বেশ মজা পাচ্ছে। বেশ উপভোগ করছে ও লোক দু’টোর চুপসে যাওয়াকে।
‘কোথায় পেয়েছিলে কাগজটা?’ কয়েক মুহূর্ত পর জানতে চাইল বুলেট। ‘কী লেখা ছিল তা কি পড়েছ?’
‘কতগুলো অঙ্ক কষা ছিল। এই গুণ ভাগ যোগ বিয়োগÑ এইসব।’ বলল মুরাদ।
‘ও।’ যেন আর কোনো কথা জোগালো না বুলেটের কণ্ঠে।
‘এই ছেলে,’ বলে উঠল সাবু। ‘সত্যিই তুমি কাগজের লেখা পড়ে কিছুই বুঝতে পারনি?’
‘কই নাতো। বললামই তো কতগুলো অঙ্ক কষা ছিল। আমি আরো ভাবলাম কারো হোমওয়ার্কের অঙ্ক খাতা থেকে ছিড়ে বাতাসে উড়ে এসে আমাদের বাগানে পড়েছে কাগজটা। আচ্ছা, আপনারা কি ওই কাগজটাই খুঁজছেন?’
‘হ্যাঁ,’ বলল বুলেট। ‘ওই অঙ্ক কষা কাগজটাই আমাদের দরকার। ওই অঙ্কের মধ্যেই লুকিয়ে আছে একটা সূত্র।’
‘ও। তাহলে তো বেশ সমস্যাই হয়ে গেল।’ সমবেদনা জানানোর ভঙ্গিতে বলল মুরাদ।
‘কিন্তু কাল রাতে যখন তোমার কাছে জানতে চাইলাম, তখন বললে না কেন ওটার কথা?’
‘আরে তখন কি জানতাম যে আপনারা ওই কাগজটাই খুঁজছেন? আপনারা চলে আসার পর না আমি অনেক ভাবলাম। ভেবে বুঝলাম ওটাই আপনারা খুঁজছেন। আর সে কারণেই তো আজ স্কুল থেকে ফিরেই বাগানে গিয়েছিলাম কাগজটা খুঁজতে। কিন্তু পেলাম না।’
‘ঠিক আছে, তুমি যাও। তবে কাগজটা আবার পেলে আমাদেরকে জানাবে। মোবাইল নম্বর তো কাল রাতেই দিয়েছি তোমাকে।’
মুরাদ মুখে কিছু না বলে একদিকে ঘাড়টা বেশ খানিক নিচে নামিয়ে ‘হ্যাঁ’ জানাল।
চলে গেল বুলেট ও সাবু। মুরাদ ওদের গমন পথের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল। ক্রমে হাসির একটা রেখা বিস্তৃত হতে লাগল ওর মুখে। মুখ থেকে কান পর্যন্ত গিয়ে ঠেকল সে হাসি।
আট.
তারেকের সাথে ভালোই বন্ধুত্ব মুরাদের। তানভীর ও তারেকই ওর সবচেয়ে কাছের বন্ধু। রাতের অভিযানে তারেককে সঙ্গে নেবে ঠিক করল মুরাদ।
প্রথমটাতে ‘পাকুড় পুকুর’ নাম শুনতেই রাজি হচ্ছিল না তারেক। তারপর যখন সব খুলে বলল, তখন রাজি হয়ে গেল। ঠিক হলো, রাতে আম্মুকে বলে আসবে আজ রাতটা ও মুরাদের ওখানেই থাকবে। বীজগণিতের একটা অনুশীলনীর অঙ্ক দেখে নেবে মুরাদের কাছ থেকে। আর মুরাদও ওর আম্মুকে একই কথা বলবে।
প্লান মতো বাজারের পাশের ছাউনিটার নিচে এসে হাজির হলো মুরাদ। রাত সোয়া আটটা বাজে। এখনও এসে পৌঁছেনি তারেক।
পল পল করে কেটে যাচ্ছে সময়। অস্থির হয়ে উঠছে মুরাদ। কী ঘটবে রাতে ওখানে? আদৌ কিছু কি ঘটবে? আজ রাতে তো নাও ঘটতে পারে। আর যদি ঘটেই, কী ঘটবে? ও যে প্লান তৈরি করেছে, তাতে কি কাজ হবে? ধরতে পারবে ওদেরকে? ও তো সন্দেহ করছে কোনো একটা গ্রুপ কোনো খারাপ কাজ করার জন্য এই পদ্ধতি বেছে নিয়েছে। যারাই এর পেছনে থাক, ও তাদেরকে ধরতে চায়। যদি খারাপ কোনো উদ্দেশ্য নিয়ে কোনো গ্রুপ কিছু করতে চায়, তাহলে তো তাদেরকে পুলিশের কাছেই ধরিয়ে দেয়া উচিত। সে কারণে তারেককে বলেছে মুরাদ ওর আব্বুকে বিষয়টা সম্পর্কে খানিকটা জানিয়ে রাখতে। ওর আব্বুর সাথে থানার ওসির ভালো খাতির আছে।
নয়টা প্রায় বেজে গেছে। পাকুড় পুকুর ঘাটে যেতে কমপক্ষে পনেরো মিনিট লাগবে। কিন্তু এখনো আসছে না তারেক। না, ও বোধহয় ভয় পেয়েছে। কিংবা ওর আম্মু ওকে আসতে দিচ্ছে না। আচ্ছা, এমনও তো হতে পারে, সব শুনে ওর আব্বু ওকে আসতে নিষেধ করেছেন। ভয় দেখিয়েছেন এই ধরনের লোকেরা মোটেও ভালো হয় না। নিজেদের জন্য সবকিছু করতে পারে তারা। আর তাতে ভয় পেয়ে পিছিয়ে গেছে ও।
মুরাদ ভেবেই নিল তারেক আর আসবে না। এবং সিদ্ধান্ত নিল, ও একাই যাবে রাতের এই অভিযানে।
মুরাদের হাতে একটা কালো ব্রিফকেস। আব্বুর একটা পুরনো ব্রিফকেস এটা। গত বছরই ফেলে দিয়ে নতুন একটা কিনেছেন আব্বু। মুরাদ ওটা সুন্দর করে উঠিয়ে রেখেছিল। এখন সেটাই কাজে লাগছে। আসলে কোনো জিনিসই ফেলনা নয়।
ছাউনিটা থেকে বেরিয়ে এলো ও। সামনে দু’কদম বাড়ালো। ঠিক এই সময় অন্ধকার ফুঁড়ে উদয় হলো একটা ছায়ামূর্তি। কাছে এগিয়ে আসতেই তারেককে চিনতে পারল।
‘এতো দেরি করলে?’ জিজ্ঞেস না করে পারল না মুরাদ।
‘কী করব বলো,’ কৈফিয়ত দেয়ার ভঙ্গিতে বলল তারেক। ‘সবাইকে ম্যানেজ করে তবেই তো আসব। তবে একটা সুখবর আছে। আব্বু সব শুনে পুলিশ আঙ্কেলকে তখনই ফোন করেছে।’
খুশি হলো মুরাদ। জিজ্ঞেস করল, ‘আঙ্কেল আর কিছু জিজ্ঞেস করেননি?’
মুচকি হাসল তারেক। বলল, ‘আরো একটা সুখবর আছে। আমরা ওখানে পৌঁছার অল্প পরই পুলিশ চলে আসবে।’
‘মানে?’
‘তুমি ভয় পেও না। পুলিশ এলেও আগেই সামনে আসবে না। আড়ালে লুকিয়ে থেকে সব কিছু দেখবে। তারপর ভাব খারাপ দেখলে এগিয়ে আসবে। আর সত্যিই যদি কোনো চক্র কোনো কুমতলবে কিছু করতে চায়, তাদেরকে পাকড়াও করবে পুলিশ।’
‘ভেরি গুড। যতটা চেয়েছিলাম, তারচেয়েও বেশি পাওয়া হয়ে গেছে। তুমি একটা কাজের কাজই করেছ।’ বেশ উচ্ছসিত মুরাদ।
‘এখন চলো, যাওয়া যাক। নয়টা বাজতে আর বেশি বাকি নেই।’ তাড়া লাগাল তারেক।
‘হ্যাঁ হ্যাঁ চলো।’
রাতের আঁধার ভেদ করে এগিয়ে চলল দু’টো ছায়ামূর্তিÑ মুরাদ ও তারেক। একান্ত প্রয়োজন ছাড়া টর্চের আলো জ্বালছে না। ওদের এই অভিযান নীরবেই বাস্তবায়ন করতে চায়। কাউকে আগেই সতর্ক করে দিতে চায় না।
প্লানটা আরো একবার মনে মনে ঝালিয়ে নিল মুরাদ। না, সবকিছুই যদি ঠিকঠাক চলে, তাহলে ওদেরকে ধরতে সক্ষম হবেই। পুলিশের হাতে ধরিয়ে দিতে পারবে গ্রুপটাকে। এক দুইজন পালিয়ে গেলেও অন্যদের মাধ্যমে ধরতে পারবে পুলিশ।
আর কয়েক গজ সামনে গেলেই পাকুড় পুকুর। জায়গাটা সত্যিই কেমন থমথমে। গা ছমছম করা একটা পরিবেশ চারপাশে। এমনিতেই শরীর ভারী হয়ে আসে। রক্ত চলাচল থেমে যেতে চায় যেন। প্রচণ্ড আতঙ্ক আর সেই সাথে অজানা একটা ভয় ও শঙ্কা একসাথে কাজ করে বলেই বোধহয় এমনটি হয়Ñ ভাবল মুরাদ। নিজেকে শান্ত রাখতে প্রাণপণ চেষ্টা করে যাচ্ছে।
ভাঙা বাড়িটা দেখা যাচ্ছে অন্ধকারের মাঝে অসংখ্য অশরীরি আত্মার ঝুলন্ত দেহের মতো। হা হা করে হাসছে যেন তারা। যেন এগিয়ে আসছে ওদেরকে ধরতে। একবার ধরতে পারলেই ব্যস, আস্ত গিলে খাবে। তারপরও তাদের ক্ষিধে মিটবে না। ফলে আশপাশে যা পাবে, তাই তখন গিলতে শুরু করবে।
তারেকের বেশ ভয় ভয় করছে। মুরাদের গায়ের সাথে একেবারে সেঁটে এলো। মুরাদের ভয় করছে না ঠিকই, তবে একটা আতঙ্ক ওর চোখে-মুখে ফুটে উঠেছে। হাঁটতে বেশ কষ্ট হচ্ছে তারেক ওর গায়ের উপর ঝুঁকে পড়ায়।
বাতাসে গোঁ গোঁ একটা আওয়াজ ভেসে আসছে। মুরাদের কাছে মনে হলো, অসংখ্য অশরীরি আত্মার মিলিত নাকি কান্নার সুর যেন সেটা। কাঁদছে আর খানিক পরপরই হি হি করে হেসে উঠছে। পরক্ষণই খিলখিল করে হাসিতে মাতিয়ে তুলছে চারপাশ। তখনই কেউ যেন তাদেরকে ধমকে উঠছে। গম গম করে উঠছে ভাঙা বাড়িটাসহ আশপাশের পরিবেশ। পাকুড় পুকুরটা ঠিক বাড়িঘেষেই অবস্থান করছে। পাড়ে যে পাকুড় গাছটা, সেটা বুড়িয়ে গেছে। ডালাপালা ভেঙে গিয়ে এখন একটা মাথা ভাঙা বুড়োর মতো একপায়ে দাঁড়িয়ে আছে যেন। দূর থেকে ওটার মাথায় কিছু পিশাচ বসে হাসাহাসি করছে বলে মনে হচ্ছে।
সামনে আর এগোতে এবার মুরাদও ভয় পাচ্ছে। পা আর নড়তে চাইছে না। একেতো তারেক ওর গায়ের উপর একপ্রকার হুমড়ি খেয়ে পড়ে আছে, তার ওপর হঠাৎ ভয়টা ওকে বেশ কাবু করে ফেলল। কিন্তু এভাবে ভয় পেলে তো মিশন সাকসেসফুল হবে না। জোর করে মনে সাহস সঞ্চার করল ও। বেশ সময় নিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল।
তারপর আবারও সামনে পা বাড়ালো। হাতে ধরা ব্রিফকেসটা আরেকবার দেখে নিল। রেডিয়ামের আলোয় হাতঘড়িতে দেখল, নয়টা বাজতে আর মাত্র দুই মিনিট বাকি।
ভাঙা বিল্ডিংটার পাশে পাকুড় গাছের নিচে এসে দাঁড়াল ছেলেরা। ঘুণাক্ষরেও এখন আর বিল্ডিংটার দিকে তাকাচ্ছে না। ওদিকে তাকলেই যেন একদল প্রেতাত্মা ওদের দিকে দৌড়ে আসবে। তারপর ওদেরকে ঘিরে ধরবে।
জোর করে মন থেকে প্রেতাত্মার বিষয়টা দূরে রাখার চেষ্টা করল মুরাদ। তারেককে অভয় দিল।
আবারও রেডিয়ামের আলোয় রিস্টওয়াচ দেখল মুরাদ। আর পাঁচ সেকেন্ড বাকি। ঘড়িতে যখন নয়টা বাজল, তখন সামনের দিকে তাকাল ও। অপেক্ষায় রইল কিছু ঘটার।
হ্যাঁ, পুকুরের ওপাড় থেকে একটা কণ্ঠ ভেসে এলো। হঠাৎ কণ্ঠটা ভেসে আসায় প্রচণ্ডভাবে চমকালো ছেলেরা। পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিল ওরা। কণ্ঠটা বলল, ‘কালো ব্রিফকেস, সঙ্কেত…’
মুরাদ একটা ঢোক গিলল। তারপর শরীরের সমস্ত জোর গলার কাছে জড়ো করে বলল, ‘কালো বিড়াল।’ গলাটা বোধহয় একটু কেঁপে উঠল। তবে বলতে পারল।
ঠিক তখনই পুকুরের ওপাশে একটা আলো জ্বলে উঠলো। বার তিনেক বিশেষ কায়দায় জ্বলল ও নিভল।
রুদ্ধশ্বাসে অপেক্ষা করছে ছেলেরা। কী ঘটবে এবার?
সব ভাবনা যেন এক জায়গায় স্থির হয়ে গেছে। নিজেকে খুবই অসহায় মনে হচ্ছে মুরাদের। এই যখন ওর মনের অবস্থা, ঠিক তখনই কেউ একজন ওর হাত থেকে ব্রিফকেসটা ছো-মেরে ছিনিয়ে নিল এবং সঙ্গে সঙ্গে কেউ ওর অন্য হাত ধরে টেনে নিয়ে চলল। কিছুই বুঝে ওঠার আগেই ওকে একপ্রকার টেনেহিচড়ে নিয়ে চলল অসম্ভব শক্তিধর একটি হাত। মুরাদ চিৎকার করতে চাইল। জবাবে ডান কানের পেছনটাতে শক্ত হাতের একটা কোপ খেল। চোখের সামনে অসংখ্য তারাফুল দেখতে দেখতে জ্ঞান হারাল ও।

নয়.
মাথাটা প্রচণ্ড ভারী হয়ে আছে মুরাদের। এই অবস্থাতেই জ্ঞান ফিরল।
প্রথমে কিছুই বুঝতে পারল না মুরাদ। তারপর যখন নিজেকে আবিষ্কার করল বদ্ধ একটা ঘরে, তখন এক এক করে সব মনে পড়ল।
উঠে বসল মুরাদ। আপনাতেই ডান হাতটা চলে গেল ঘাড়ের পেছনে যেখানে শক্ত হাতের রদ্দা খেয়েছিল। ফুলে উঠেছে ওখানটায়। একটু বরফ দিতে পারলে ভালো হতো।
কিছু সময় চোখ বুজে থেকে মাথার ঝিম ঝিম ভাবটা কাটিয়ে নিল। তারপর যখন স্বাভাবিক হয়ে এলো, তখন নিজের চারপাশটা দেখার জন্য তাকাল। খুবই ছোট একটা মাটির ঘর। একপাশে একটা কুপি জ্বলছে। নতুন সলতে লাগানো হয়েছে বোধহয়। ঘরটা অত্যধিক ছোট হওয়ায় সেই আলোর তেজ বেশ গরম ছড়াচ্ছে। কোনো জানালা নেই ঘরে। একটাই মাত্র দরোজা। ওটা ধরে নাড়াল। বাইরে থেকে তালা দেয়া বোঝা গেল। তারমানে ও এখানে বন্দী।
ভীষণ গরম লাগছে। ঘেমে রীতিমতো গোসল হয়ে গেছে। একটু বিশুদ্ধ বাতাসে দম নেয়ার জন্য ফুসফুসটা হাঁসফাঁস করছে।
পানি তেষ্টা পেয়েছে মুরাদের। গলাটা শুকিয়ে আছে। যেন কেউ সিরিষ কাগজ দিয়ে গলার কাছটা ঘষে দিয়েছে। জিবটা টাকরার সাথে লাগিয়ে একটু তারল্যতা আনতে চাইল মুখের ভেতরটায়। কিন্তু ওখানটাও যে শুকিয়ে আছে!
শরীরেও কোনো বল পাচ্ছে না ও। সমস্ত দেহ অবশ হয়ে আসছে। ধপাস করে বসে পড়ল আবার।
ঠিক তক্ষুনি দরোজাটা খুলে গেল। ভেতরে প্রবেশ করল বুলেট ও সাবু। বেশ অবাকই হলো মুরাদ। এরা এখানে কী করছে? তারমানে এরাই ওকে ধরে এনে এখানে আটকে রেখেছে?
‘এই যে ছেলে, তোমার তো জ্ঞান ফিরেছে দেখছি।’ ওর পাশে এসে দাঁড়িয়ে বলল সাবু।
‘তোমরাই আমাকে ধরে এনেছো?’ অবাক হয়ে জানতে চাইল মুরাদ।
জবাবে মুচকি হাসল বুলেট, রোগা টিঙটিঙে লোকটা।
খিকখিক করে হাসল সাবু, থলথলে দেহের অধিকারী বপু লোকটা।
পিত্তি জ্বলে গেল মুরাদের। রাগ ও ঘৃণা একসাথে দানা বাঁধছে যেন।
‘আমরা দুঃখিত মুরাদ, তোমাকে এভাবে ধরে আনতে হয়েছে বলে নিজেদেরই বেশ খারাপ লাগছে।’ বলল বুলেট। ‘কিন্তু কী করব বলো, লোক যে আমরা একদমই ভালো না। তোমাকে বারবার বলার পরও কানে নাওনি। তাই বিষয়টা তোমাকে বুঝিয়ে দিতেই এটা করতে হয়েছে। সরি ইয়ংম্যান।’
‘আমাকে কেন ধরে এনেছেন আপনারা? আপনারা আসলে কে?’ নিজের ভেতরে শক্তি ফিরিয়ে আনতে চাইল মুরাদ। এভাবে ভেঙে পড়লে চলবে না। বিপদে ধৈর্যহারা হলে বিপদ আরো এটেসেটে বসে। তারচেয়ে মনে সাহস রেখে ঠাণ্ডা মাথায় থাকলে উদ্ধারের একটা পথ পেয়েও যেতে পারে।
‘ওই যে, তুমি যে ম্যাসেজটা আমাদের মোবাইল থেকে চুরি করে নিয়েছ, কালো ব্রিফকেস, সঙ্কেত কালো বিড়াল! ওটার কারণেই তোমাকে আমরা তুলে এনেছি। কেন এনেছি জানো? তোমাকে এই দুনিয়ার আলো আর দেখতে দেয়া হবে না বলে।’
‘মানে?’ ভেতরে ভেতরে বেশ ভয় পেলেও বাইরে সেটা প্রকাশ করতে চাইল না মুরাদ।
‘অত মানে-টানে তো আর আমরা বলতে পারব না, কী বলো সাবু?’ বলে সাবুর দিকে তাকাল বুলেট।
সাবু ঘাড় নেড়ে সায় দিয়ে বলল, ‘হ্যাঁ ছেলে, বুলেট ঠিক কথাই বলেছে। আমরা তো ভাড়াটে। যখন যে ডাকে, ভাড়ায় ডেকে আনে, তার হয়ে কাজ করি। কাজ শেষে ভাড়া পেয়ে গেলে সে এলাকা থেকে কেটে পড়ি।’
‘তারমানে তোমরা এখানে ভাড়ায় এসেছ?’ আপনি থেকে তুমিতে চলে এলো মুরাদ। ওদেরকে আর আপনি আপনি করে বলতে ইচ্ছে করছে না। ‘কে ভাড়া করেছে তোমাদেরকে?’
‘খুব শিগগিরই তা জানতে পারবে।’ বলল বুলেট। ‘তার আগে জেনে নাও কেন তোমাকে তুলে আনা হলো। তবে ঘুণাক্ষরেও ভেব না যেন তোমাকে আমরা ছেড়ে দেব। সেরকম হুকুম নাই। কাজ শেষ হলেই তোমাকে অন্ধকারের দেশে পাঠিয়ে দেয়া হবে।’
মুখটা শুকিয়ে পাংশু হয়ে গেল মুরাদের। ওরা কী বলতে চাইছে তা বুঝতে কষ্ট হচ্ছে না।
সেদিকে খেয়াল করে আবার বলল বুলেট, ‘আহা খোকা, আগেই অমন আধমরা হয়ে গেলে চলবে কেন? মরা জিনিস মারতে আমার একদম ভালো লাগে না।’ বলে পকেট থেকে একটা ভাঁজ করা ছুরি বের করল। সেটা মুরাদের চোখের সামনে নাড়তে লাগল। কুপির আলোতে ছুরিটার ধারাল ফলা ঝিক ঝিক করে উঠছে।
ওটার দিক থেকে চোখ সরিয়ে সরাসরি বুলেটের চোখের দিকে তাকাল মুরাদ। মানুষকে কাবু করার সবচেয়ে মোক্ষম অস্ত্র হচ্ছে তার চোখের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে কথা বলা। সেই চেষ্টাই করবে ও। তারেক তো বাইরে আছেই। ওর আব্বুও বিষয়টা জানেন। পুলিশ নিয়ে ওখানে থাকার কথা ছিল। হয়তো ছিলও। কিন্তু ওদের চোখকে ফাঁকি দিয়ে তুলে এনেছে এরা। তারেক এবং ওর আব্বু নিশ্চয়ই এতক্ষণে পুলিশ নিয়ে ওকে উদ্ধারের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। কাজেই কথা বলে এবং বলিয়ে যতক্ষণ বেঁচে থাকা যায় আর কি!
‘এই ছেলে,’ বলল সাবু। ‘তোমার কি পিপাসা লেগেছে? দেখ ছেলে, বুলেট তো বলেইছে, মরা জিনিস দ্বিতীয়বার মারতে আমরা ভালোবাসিনে। তাই তোমাকে জীবিত থাকতে হবে। কি ছেলে, পানি খাবে?
মুরাদ উপর-নিচ মাথা নাড়িয়ে ‘হ্যাঁ’ বলল।
সাবু বাইরে বেরিয়ে গেল। একটু পর একটা স্টিলের গেলাসে পানি নিয়ে এলো। সেটা মুরাদের দিকে এগিয়ে ধরতেই ছো-মেরে একপ্রকার কেড়ে নিল মুরাদ। তারপর ঢকঢক করে প্রায় এক নিঃশ্বাসে সবটা পানি পান করল। পিপাসা কিছুটা মিটল। তবে আরেকটু পানি হলে ভালো হতো। তাই বুকের মধ্যে একটা অস্বস্তি ভাব রয়েই গেল।
‘কি খোকা, এবার একটু ভালো লাগছে?’ কাটা ঘায়ে নূনের ছিটা দেয়ার মতো ভঙ্গি করে বলল বুলেট। ‘নিজেকে অবশ্যই জীবিত জীবিত মনে হচ্ছে, কী বলো? যাকগে ওসব। যা বলছিলাম, কালো ব্রিফকেসের রহস্য ভালোই বের করেছ তুমি। তোমার ঘটে সত্যিই বুদ্ধি আছে বলতে হয়। বেশ বুদ্ধিমত্তার সাথে পাসওয়ার্ড বের করে মোবাইলটা হাত করে তা থেকে মেসেজ চুরি করে সব জানতে পারলে। আমরা রাতে গেলাম তোমার কাছে পাসওয়ার্ড লেখা কাগজটার ব্যাপারে জানতে। তুমি একেবারেই অস্বীকার করলে। কিন্তু আমি শিওর ছিলাম কাগজটা তোমাদের বাগানেই কোথাও পড়েছে। পুলিশের বাঁশির শব্দ, গাড়ির সাইরেন আর দুদ্দাড় দৌড়ে আসার শব্দে আমরা যখন ছুটে পালায়, তখনই তোমাকে গেটের বাইরে বের হতে দেখি। তখন সন্দেহ না হলেও পরে শিওর হই যে এর পেছনে তোমার হাত আছে। সে অনুযায়ী তোমাদের বাড়ি আর তোমার ওপর নজর রাখি আমরা। পরদিন সকালে তোমরা যখন ঘুমিয়ে, বলতে গেলে সমস্ত এলাকা যখন ঘুমিয়ে, তখন আমরা ঢুকি তোমাদের বাগানে। একটা বড় গোলাপ গাছের নিচে বৃষ্টির পানিতে সৃষ্টি হওয়া একটা গর্তের মধ্যে খুঁজে পাই কাগজটা। তবে এক্ষেত্রে আমরা তোমার মতো বুদ্ধি খাটাতে ব্যর্থ হই।’
দম নেয়ার জন্য একটু থামল বুলেট। তারপর আবার বলতে লাগল, ‘আমরা ওই কাগজ থেকে মোবাইল সিমের পাসওয়ার্ড বের করতে পারিনি। কী করব ভাবছি, ঠিক তখনই মাথায় আসে বিষয়টা। আমরা তো আবারও বসের কাছে ফোন করে মেসেজের বিষয়টা জেনে নিতে পারি। যে বসের আন্ডারে আমরা চলি, সেই বসই তো আমাদেরকে বিভিন্ন এলাকায় পাঠায়। বসের কাছে ফোন করে সব খুলে বলি। বস তখন সাবুর মোবাইলে মেসেজটা ফরওয়ার্ড করে পাঠায়। সেখান থেকেই সব জানতে পারি। তবে প্রথমটাই পাকুড় পুকুরটা খুঁজে পেতে বেশ বেগ পেতে হয়েছে আমাদের। পরে এলাকায় বিভিন্ন জনের সাথে কথা বলে জায়গাটা চিনতে পারি। এবং বসকে মেসেজে জানাই যে রাত নয়টার আগেই বিষয়টা মিটমাট হয়ে গেলে ভালো হয়। বস কারণ জানতে চাইলে আবোল তাবোল দিয়ে বোঝায়। তোমার কথা তো আর বলা যায় না। তাতে তো আমরা বসের কাছে ছোট হয়ে যাব, তাই না! বস রাজি হলেন। সাড়ে আটটার মধ্যেই আমরা ব্রিফকেস বদল করলাম। আর প্লান করলাম তোমাকে পাকড়াও করার। তোমাকে আটকাতে হবে, কারণ তুমি মেসেজটা সম্পর্কে জেনে গেছ। আর তো বাড়তে দেয়া যায় না। সেটা আমাদের নেচারে নেইও। আর তাছাড়া…’ মাঝপথে থেমে গেল বুলেট।
মুরাদ এতক্ষণ একমনে শুনছিল বুলেটের কথা। সবই বুঝতে পারছে ও, কিন্তু একটা কথা মাথায় ঢুকছে না। সব যদি ওরা জেনেই যেয়ে থাকে, তাহলে আজ বিকালে কেন ওর কাছে আবারও কাগজটা চাইতে গেল লোক দু’টো? সে কথা জানতে চাইল ও।
জবাবে সাবু বলল, ‘এই যে ছেলে, এতো কিছু বুঝলে, আর এই সামান্য বিষয়টা বুঝলে না? আসলে তুমি কাগজটা সম্পর্কে কতটা জানো সেটা জানতেই আমরা তোমার কাছে আবারও গিয়েছিলাম। আমরা নিশ্চিত হতে পারছিলাম যে তুমি সত্যিই কাগজটা দেখেছ। আর তাছাড়া আমাদের ওপর থেকে তোমার দৃষ্টি সরিয়ে নেয়ার জন্যও এটা দরকার ছিল। এবার বুঝেছ ছেলে?’
‘বুঝেছি।’ বলল মুরাদ। ‘আর একটা কথা,..’
কিন্তু ওকে কথা শেষ করতে দিল না বুলেট। বলল, ‘অনেক বকবক করলাম তোমার সাথে। এত কিছু বলতাম না তোমাকে। কিন্তু কেন জানি মনে হলো, তুমি তো আর বেশিক্ষণ বেঁচে থাকছ না, কাজেই সবকিছু জেনেই মরা উচিত। সে জন্যই সব তোমাকে বলা। তো অনেক হয়েছে, এবার আমরা একটু বের হবো। সামান্য কিছু কাজ বাকি আছে। সেটা সেরেই চলে আসব। আর তোমাকে তখন…’
বুলেটের কথা কেড়ে নিয়ে সাবু বলল, ‘সামান্য কাজটা কী সেটাও ওকে জানিয়ে দিই না কেন।’ তারপর মুরাদের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আসলে আমরা যাব পেমেন্টটা আনতে। এখানকার কাজ তো আমাদের শেষ। ভোর হবার আগেই স্থান ত্যাগ করতে হবে কি না!’
‘হ্যাঁ, এবার চলো সাবু।’ ঘুরে দাঁড়াল ওরা চলে যাওয়ার জন্য। দরোজার কাছে গিয়ে আবারও ঘুরে দাঁড়াল বুলেট। সাবুকে বলল, ‘শুকনো যে বিস্কুট আনা আছে, তার থেকে কিছু ওকে দিও। মরার আগে পেটটা অন্তত ভর্তি থাকা ভালো।’ বলে আবারও দরোজার দিকে ঘুরল।
একপা চৌকাঠে দিয়েছে, পেছন থেকে ডাকল মুরাদ, ‘এই যে শোনো?’
ওখানেই থমকে দাঁড়াল বুলেট। সাবুও দাঁড়িয়ে পড়ল। ঘুরল মুরাদের দিকে।
‘ভোর হয়ে যাচ্ছে, যা বলার দ্রুত বলো।’ বলল বুলেট।
‘না মানে, মরেই তো যাব একটু পরে, কিন্তু মরার আগে যদি জানতে পারতাম যে কার কাজ করতে তোমরা এখানে এসেছিলে!’ মনে মনে হাসছে মুরাদ। লোক দু’টো কেমন অকপটে সবই বলে দিচ্ছে। শেষে নিজেরাই পস্তাবে এতে। কেননা, এতক্ষণে নিশ্চয়ই পুলিশ ওর অবস্থানের বিষয়ে নিশ্চিত হয়ে গেছে। শীঘ্রই চারপাশ ঘিরে ফেলবে। ওকে উদ্ধার করে নিয়ে যাবে। আর পুলিশ আসা পর্যন্ত গুণ্ডা দু’টোকে এখানে আটকে রাখতে হবে।
‘সত্যিই জানতে চাও তুমি আমরা কার ভাড়া খাটতে এসেছি?’ জিজ্ঞেস করল বুলেট।
‘জানতে চাই বলেই তো জিজ্ঞেস করেছি।’ তেমনি নির্লিপ্ত শোনাল মুরাদের কণ্ঠ।
‘তার নাম শুনলে কিন্তু তোমার মাথায় বাজ পড়ার মতো মনে হবে।’
‘বাজ পড়লে কী, আর না পড়লেই বা কী! আছি তো আর কিছু সময় মাত্র বেঁচে!’
বুলেট যে নামটা উচ্চারণ করল, তা শুনে সত্যি সত্যিই মুরাদের মাথায় শুধু বাজ না, যেন আকাশ ভেঙে পড়ল।

দশ.
লোকটা মুরাদকে বেশ স্নেহ করেন। এই এলাকায় বেশ ভালো মানুষ বলেই পরিচিত তিনি। অসময়ে অনেকের অনেক উপকার তিনি করেন। অবশ্য তার হঠাৎ আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়ে যাওয়া মানে অতিদ্রুত ধনী হওয়া নিয়ে সবার মাঝেই কৌতূহল আছে। তার আয়ের উৎস নিয়েও আছে নানান জল্পনা-কল্পনা।
মুরাদ নিজে লোকটাকে বেশ পছন্দ করে। সম্মান করে। আর সেই লোকটাই কি না এতবড় একটা অন্যায় কাজের সাথে যুক্ত? ভাবতেই মনটা তেঁতো হয়ে যায় ওর। অস্বস্তিতে গায়ের মধ্যে ঘিন ঘিন করতে থাকে। বিশ্বাস করতে বেশ কষ্ট হয়।
আহমেদ তারেক ওর ঘনিষ্ঠ বন্ধুর একজন। একই এলাকায় বাড়ি ওদের। খেলার মাছে বল এবং ব্যাট তো তারেকই সরবরাহ করে। যখন যা বায়না করে, ওর আব্বা তা কিনে দেয়। আর সেই তারেকের আব্বাই কি না…
‘তোমরা ভুল বলছ। এ হতেই পারে না।’ দ্রুত এপাশ ওপাশ মাথা নাড়তে নাড়তে বলে মুরাদ।
‘এ জন্যেই বলেছিলাম যে লোকটার নাম শুনলে তোমার মাথায় বাজ পড়বে।’ বলল বুলেট। ‘এখানে কাজে আসার আগে লোকটা সম্পর্কে আমরা খোঁজখবর নিয়েছিলাম। আমাদের বস ভালোভাবে খোঁজখবর না নিয়ে কোথাও লোক পাঠান না। বস আহমেদ তুষার সম্পর্কে বেশ বিস্ময়কর কিছু তথ্য জানতে পারেন। সব বলেছেন আমাদেরকে। লোকটা এলাকায় সবার কাছে যে অত্যন্ত শ্রদ্ধেয় ও মান্যবর তা জেনেই তিনি আরো উৎসাহ বোধ করেছেন কাজটা করতে। এ রকম মানুষের সঙ্গে কাজ করে বেশ আরাম পাওয়া যায়। ধরা খাওয়ার সুযোগ এসব ক্ষেত্রে মাইনাস টেন পার্সেন্ট।’
‘কিন্তু আহমেদ তুষারের সাথে তোমাদের কাজটা কী ছিল?’ মুরাদ এবার কিছুটা শঙ্কিত হয়। আহমেদ তুষার মানে তারেকের আব্বা যদি এই কাজের পেছনে থেকে থাকেন, তাহলে তো তিনি পুলিশ নিয়ে ওকে উদ্ধার করতে আসবেন না। আর তারেক? তারেক কি আসবে? নাকি ওর আব্বার মতোই ও-ও ওকে উদ্ধার করা থেকে বিরত থাকবে? আচ্ছা, তারেক কি জানে ওর আব্বার বিষয়টা? কী এমন গোপন কাজ করেন আহমেদ তুষার?
‘সরি খোকা,’ বলল বুলেট। ‘এই একটি বিষয়ে আমরা তোমাকে কিছুই জানাতে পারব না। এটা আমাদের ব্যবসায়ের পলিসি। আশা করি তোমার সকল প্রশ্নের জবাব পেয়ে গেছ। এবার আমাদেরকে যেতে হবে।’
‘আর একটি প্রশ্ন।’ আবারও পিছু ডাকল মুরাদ। ‘মরেই তো যাব। তবে কৌতূহল নিয়ে মরা কি ভালো? তোমরা কি পারবে কোনো কৌতূহল মনের মধ্যে চেপে রেখে মৃত্যুর পথে পাড়ি জমাতে?’
সাবু বলল, ‘এই ছেলেটা তো বেশ কথাও বলতে জানে। না বাবা, আমি কোনো কৌতূহল মনের মধ্যে চেপে রেখে মরতে পারব না। এমন কিছু হলে আমি আযরাইল ফেরেশতাকে বলব, তুমি একটু সবুর করো। আমাকে আগে বিষয়টা জানতে দাও।’
‘তাহলে বোঝো, আমি কী করে কৌতূহল নিয়ে মৃত্যুর দিকে ধাবিত হবো?’ সাবুর কথারই যেন প্রতিধ্বনি করল মুরাদ।
‘উচিত কথা। তাহলে বলেই ফেলি বিষয়টা। আসলে তিনি…’
কিন্তু সাবুর কথা আর শেষ হলো না। বাইরে দুদ্দাড় বুট জুতো পায়ে দিয়ে কয়েক জোড়া পা এগিয়ে আসার শব্দ পাওয়া গেল। মাটির ঘরটার চারপাশেও শোনা গেল সেই শব্দ।
সাবু বাইরে বেরিয়েই আবারও ভেতরে প্রবেশ করল। ভয় মিশ্রিত কণ্ঠে বলল, ‘পুলিশ চারদিক থেকে আমাদেরকে ঘিরে ধরেছে!’
মুহূর্তেই চঞ্চলতা কাজ করল লোক দু’টোর মধ্যে। এদিক ওদিক ছুটোছুটি করতে লাগল। কী করবে যেন বুঝে উঠতে পারছে না।
মুরাদও একেবারে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে গেছে। ওর এখন কী করণীয় তা বুঝে উঠতে পারছে না। হঠাৎ ওর গলায় কিছু একটার স্পর্শ অনুভব করল। মুহূর্তে বাস্তবে ফিরে এলো। দেখলো, পেছন থেকে ওকে জাপটে ধরেছে বুলেট। আর বাম হাত দিয়ে ওর গলা পেচিয়ে ধরে ধারাল ছুরিটা ডান হাতে চেপে ধরেছে গলায়। সেটারই চাপ লাগছে। আরেকটু জোরে চাপ লাগলেই কেটে যাবে যেন। ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরিয়ে আসবে। ভাবতেই গায়ের মধ্যে গুলিয়ে উঠল মুরাদের।
ভেতরে তখন কয়েকজন পুলিশ ঢুকে পড়েছে। সাবুকে পাকড়াও করে ফেলা হয়েছে। আর বুলেটকে ওভাবে মুরাদের গলায় ছুরি ধরে রাখতে দেখে একটু থমকালো পুলিশরা।
বুলেট বলল, ‘খবরদার! কেউ সামনে এগোবে না। তাহলে কিন্তু আমি…’
মুরাদের হাত দু’টোই খালি ছিল। আস্তে করে ডান হাতটা উঠিয়ে নিয়েছিল বুলেটের ছুরি ধরা হাতের কবজির কাছটায়। বাম হাতটা তার বাম পাশের তলপেটের ওখানে নিয়ে গেল। তারপর একসাথে দু’হাত দিয়েই কাণ্ডটা ঘটিয়ে ফেলল। পরে ভেবে অবাকই হয়েছে যে ওই পরিস্থিতিতে কাজটা ও কিভাবে করতে পেরেছে।
মুরাদ ডান হাত দিয়ে বুলেটের ছুরি ধরা ডান হাতের কবজিতে জোরো ঠেলা দিয়েছে আর একইসাথে বাম হাত দিয়ে তলপেটের বামপাশে ইয়া জোরে এক ঘুষি বসিয়ে দিয়েছে। ডান হাত থেকে ছুরিটা ছিটকে পড়েছে বুলেটের। সেই সঙ্গে তলপেটে প্রটণ্ড ঘুষি খেয়ে ‘ওফ্!’ করে গুঙিয়ে উঠে তলপেট চেপে ধরে বসে পড়েছে।
আর তখন তাকে অ্যারেস্ট করতে পুলিশের একদম বেগ পেতে হয়নি।
বুলেট ও সাবুকে নিয়ে গেল পুলিশ। কিছুটা দূরে মেইন রাস্তার ওপর পুলিশ ভ্যান রাখা ছিল। ভোরের আলো তখন ফুটবো ফুটবো করছে। এই আবছা আলো-আঁধারের মধ্যে মোটামুটি দেখা যাচ্ছে সবকিছু। তবে খুব দূরের জিনিস অনুমান করে নিতে হচ্ছে।
রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা পুলিশ ভ্যানে ওঠানো হলো গুণ্ডা দু’জনকে। পাশে একটা পুলিশের জিপ আছে। ওসি সাহেবের জিপ ওটা, ভাবল মুরাদ।
স্থানীয় থানার ওসি নাদের শাহ, আহমেদ তুষার, আরও একজন পুলিশ কনস্টেবল, মুরাদ ও তারেক হেঁটে পুলিশ ভ্যানের দিকে যাচ্ছে।
‘আপনি এই ডিসিশন নিয়েছেন দেখে আমার খুব ভালো লাগছে।’ বললেন ওসি নাদের শাহ।
‘আসলে আমার ছেলেটাই আমার চোখ খুলে দিয়েছে।’ তারেককে দেখালেন আহমেদ তুষার। ‘ও না থাকলে আজ এখানে আরেকটা লাশ পড়তো।’
চমকে উঠল মুরাদ। তারমানে ওকে যে মেরে ফেলা হবে তা তিনি জানতেন। তিনিই ওকে মেরে ফেলতে বলেননি তো?
আহমেদ তুষার আবারও বললেন, এবার মুরাদকে উদ্দেশ্য করে, ‘আমি তোমার কাছে ক্ষমা চাইবো না মুরাদ। ক্ষমা চাওয়া আমার সাজে না। আমি আসলে এতটাই নিচে নেমে গিয়েছিলাম যে, স্নেহ-ভালোবাসা সব ভুলে যেতে বসেছিলাম। অর্থের লালসা আমাকে অন্ধ করে দিয়েছিল। আমাকে আলো থেকে অন্ধকারের দিকে নিয়ে যাচ্ছিল ক্রমাগত। আজ তুষার আমার চোখ খুলে দিয়েছে। আর একটা জিনিস আমাকে বলতেই হবেÑ তোমার শ্রদ্ধা, হ্যাঁ মুরাদ, আমার প্রতি তোমার শ্রদ্ধা ও ভক্তি আমাকে ভাবিয়েছে। তোমাকে সরিয়ে দেয়ার হুকুম দেয়ার পর থেকেই আমার মধ্যে একটা অস্থিরতা কাজ করতে থাকে। আমি এখন স্বীকার করছি যে, অত্র অঞ্চলের অনেক যুবকের সমূহ সর্বনাশ আমি করেছি। মরণনেশা হেরোইনসহ অন্যান্য নেশার সামগ্রী আমি ছড়িয়ে দিয়েছি তাদের মাঝে। জানি এর কোনো ক্ষমা হয় না, কিন্তু আমি এখন তাদের জন্য কিছু করতে চাই। যে যুবকদের আমি সর্বনাশ করেছি, তাদেরকে সুপথে আনতে পারব কিনা জানি না, তবে চেষ্টা করব আর যেন কেউ এই পথে পা না বাড়ায়। তাতে যদি আমার পাপের কিছুটা প্রায়শ্চিত্ত হয়!’
তারেক মুরাদকে ধরে নিয়ে এগোচ্ছে। এক্ষণে মুখ খুলল, ‘আমি আমার সেই আগেকার আব্বুকে ফিরে পেতে চাই। যে আব্বু আমাকে বুকে টেনে নিয়ে প্রচুর আদর করবে। সেই হাত দিয়ে আদর করবে, যে হাতে কোনো কালি লেগে থাকবে না। সেই অন্তর দিয়ে দোয়া করবে, যেই অন্তরে অন্য কারোর জন্য বদচিন্তা স্থান পাবে না।’
আহমেদ তুষার ছেলের মাথায় গায়ে হাত বুলান। বলেন, ‘কালো কালো ব্রিফকেসে করে আমি শুধু নেশাদ্রব্যই সরবরাহ করিনি, ওর মধ্যে করে আমি কালো টাকাও ছড়িয়েছি। মিস্টার নাদের শাহ, আমি কি জেল হতে কখনো বের হতে পারব না?’
নাদের শাহ বললেন, ‘অবশ্যই পারবেন। আমি আপনার পক্ষে সুপারিশ করব আদালতের কাছে। আদালত নিশ্চয়ই আপনার মনের পরিবর্তনকে গুরুত্ব দেবেন।’
‘বাবা মুরাদ,’ মুরাদের মাথায় হাত বুলালেন আহমেদ তুষার। ‘তুমি কি আমাকে ক্ষমা করতে পারবে? ক্ষমা না করলেও ক্ষতি নেই, কেননা, তোমার কাছে আমি অনেক ঋণী হয়ে রইলাম। তুমি বিষয়টা ওভাবে ধরতে না পারলে তো আমার অন্ধকারের পথে যাত্রা থামত না। তুমি অনেক বড় হবে বাবা, অনেক বড় হবে।’ তারপর ওসিকে বললেন, ‘ওসি, এবার আমাকে নিয়ে চলেন।’
ওসি সাহেব সঙ্গের কনস্টেবলকে ইশারা করতেই তিনি আহমেদ তুষারের হাতে হাতকড়া পরালেন।
একটু পর আহমেদ তুষার, বুলেট ও সাবুকে নিয়ে পুলিশ ভ্যানটি চলে গেল। আর জিপে উঠে ওসি নাদের শাহও।
তারেকের চোখে পানি টলমল করছে। দু’গণ্ড বেয়ে গড়িয়ে চলেছে অশ্রুধারা। আব্বুর জন্য খুব কষ্ট হচ্ছে।
মুরাদ ও তারেক পাশাপাশি হেঁটে বাড়ি ফিরছে। মুরাদ এখন বেশ সুস্থ। বাইরের খোলা বাতাসে নিঃশ্বাস নেয়ার ফলে ফুসফুসটা স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে।
মুরাদ বলল, ‘আমি কল্পনাও করিনি যে সামান্য একটা কাগজ কুড়িয়ে পাওয়ার ভেতর দিয়ে এত বড় একটা ঘটনা ঘটে যাবে। আমার খুব খারাপ লাগছে তারেক। এখন মনে হচ্ছে, কাগজটা আমার নজরে না পড়লেই ভালো হতো।’
তারেক বলল, ‘না মুরাদ, এটা বরং ভালোই হয়েছে। আব্বু নিজেকে সংশোধনের তো একটা সুযোগ পেল। যদি আরো পরে আমরা বিষয়টা জানতে পারতাম, তখন হয়তো তা মেনে নেয়া আরো কঠিন হতো। তার চেয়ে এই বরং ভালো হয়েছে।’
চারদিকটা তখন অনেকটাই ফরসা হয়ে গেছে। যতটুকু ক্লান্তি ওদেরকে গ্রাস করেছিল, তা মুহূর্তেই যেন ভোরের ঝিরি ঝিরি বাতাসে কোথায় মিলিয়ে গেল।
মুরাদ তখন অন্য বিষয় ভেবে চলেছে। কালো ব্রিফকেসটাকে ওর কাছে অন্যায়ের একটা হাতিয়ার হিসেবে মনে হচ্ছে। এই কালো ব্রিফকেসের মধ্যে করে কত কিছুই না আসছে-যাচ্ছে। ওর কাছে সকল অপকর্মের মূলই যেন ওই কালো ব্রিফকেস। এই কালো ব্রিফকেসের প্রতি হঠাৎ তার এই ঘৃণা কেন জন্ম নিল তা বুঝতে পারছে না। ও তো আবার ঠিক করে ফেলল যে, আব্বুকে বলবে আব্বু যেন আর কালো ব্রিফকেস ব্যবহার না করেন।
পাশের বুনো ফুলে উড়ে বেড়াচ্ছিল মৌমাছি আর প্রজাপতির দল। সেখান থেকে একটা প্রজাপতি এসে মুরাদের বাম কাঁধে বসল। অসম্ভব ভালো লাগায় মনটা ভরে উঠল ওর। সেখান থেকে একটা প্রজাপতি এসে মুরাদের বাম কাঁধে বসল। অসম্ভব ভালো লাগায় মনটা ভরে উঠল ওর। তাকিয়ে রইল প্রজাপতির কারুকার্যময় ডানা দু’টোর দিকে।
অজান্তেই মহান আল্লাহর উদ্দেশ্যে শুকরিয়া ধ্বনি বেরিয়ে এলো মুখ থেকে।

SHARE

3 COMMENTS

  1. জুবায়ের ভাইয়ার অন্যান্য উপন্যানের মতো এটিও একটি চমৎকার উপন্যাস। কেন জানি না, জুবায়ের ভাইয়া যে উপন্যাসই লেখে সেটিই হিট হয়। হয়তো তার লেখা প্রথম থেকেই ভালো লাগে সেজন্য এমনটি হতে পারে।
    ধন্যবাদ জুবায়ের ভাইয়াকে এবং কিশোরকণ্ঠকেও। তবে প্রতি ঈদ সংখ্যায় জুবায়ের ভাইয়ার উপন্যাস চাই। আর আশা করছি খুব শিগগিরই তার একটি ধারাবাহিক উপন্যাস কিশোরকণ্ঠে ছাপা হবে।
    মোশাররফ হোসেন খান আমার একজন প্রিয় কবি। কিন্তু তিনি কিশোর উপন্যাস নামে আমাদেরকে যা উপহার দেন তা মোটেও কিশোর উপযোগী তো নয়ই, বরং মনে হয় যেন তার আগেই লিখে রাখা কয়েকটি গল্প একত্রে জুড়ে দিয়ে একটা উপন্যাস বানাতে চান যার এক পর্বের সাথে অন্য পর্বের মিল থাকে না। যেমনটি করেছিলেন গত ঈদ সংখ্যায়। তার বিখ্যাত একটি গল্পের নাম দৌড়, সেটি তিনি ওই উপন্যাসে হুবহু তুলে দিয়েছিলেন। আশা করবো তিনি সম্পাদক হিসেবে এটা খেয়াল রাখবেন, কেননা, তিনি আমাদের মতো কিশোরদেরেক ভালো লেখার জন্য প্রতিনিয়ত উপদেশ দান করেন। আশা করি বিষয়টা কর্তৃপক্ষও গুরুত্বের সাথে দেখবেন।

  2. ওউ! ইটস এ নাইস স্টোরি। পুরো ঈদ সংখ্যার মধ‌্যে এটাই আমার কাছে শ্রেষ্ঠ লেখা। জুবায়ের হুসাইন ভাইয়ার গত ঈদ সংখ্যার উপন্যাসটাও ফাটাফাটি হয়েছিল। তবে নিশান ভাইয়ের সাথে আমিও একমত। মোশাররফ হোসেন খান আমারও প্রিয় কবিদের মধ্যে একজন। কিন্ত তিনি গতবারের মতো এবরাও আমাদেরকে হতাশ করলেন। আশা করি ভবিষ্যতে এমনটি আর হবে না। তারপরও এত সুন্দর একটি ঈদ সংখ্যা উপহার দেয়ার জন্য কিশোরকণ্ঠ পরিবারকে অনেক অনেক শুভেচ্ছা ও ধন্যবাদ।

  3. মুরাদ তখন অন্য বিষয় ভেবে চলেছে। কালো ব্রিফকেসটাকে ওর কাছে অন্যায়ের একটা হাতিয়ার হিসেবে মনে হচ্ছে। এই কালো ব্রিফকেসের মধ্যে করে কত কিছুই না আসছে-যাচ্ছে। ওর কাছে সকল অপকর্মের মূলই যেন ওই কালো ব্রিফকেস। এই কালো ব্রিফকেসের প্রতি হঠাৎ তার এই ঘৃণা কেন জন্ম নিল তা বুঝতে পারছে না। ও তো আবার ঠিক করে ফেলল যে, আব্বুকে বলবে আব্বু যেন আর কালো ব্রিফকেস ব্যবহার না করেন।
    পাশের বুনো ফুলে উড়ে বেড়াচ্ছিল মৌমাছি আর প্রজাপতির দল। সেখান থেকে একটা প্রজাপতি এসে মুরাদের বাম কাঁধে বসল। অসম্ভব ভালো লাগায় মনটা ভরে উঠল ওর। সেখান থেকে একটা প্রজাপতি এসে মুরাদের বাম কাঁধে বসল। অসম্ভব ভালো লাগায় মনটা ভরে উঠল ওর। তাকিয়ে রইল প্রজাপতির কারুকার্যময় ডানা দু’টোর দিকে।
    অজান্তেই মহান আল্লাহর উদ্দেশ্যে শুকরিয়া ধ্বনি বেরিয়ে এলো মুখ থেকে।
    অসাধারণ! সত‌্যিই তো, এই কালো ব্রিফকেসকে তো আমরা এর আগে এভাবে তেউ দেখিনি।
    ধন্যবাদ জুবায়ের হুসাইন, ধন্যবাদ কিশোরকণ্ঠ।

Leave a Reply