Home উপন্যাস হঠাৎ দুপুর কাঁপলো পুকুর

হঠাৎ দুপুর কাঁপলো পুকুর

মোশাররফ হোসেন খান

কামাল।
বেশ তাগড়া। মোটা-সোটা।
চেহারাটা একটু কালো হলেও দেখতে দারুণ!
পেশায়-সিএনজি ড্রাইভার।
সেদিন সকালেই শুরু হলো বৃষ্টি।
অফিসে আসার সময়।
মহা বিপত্তি!
জামাল সাহেব ছাতা নিয়ে বাসার উল্টো দিকে তালতলা মার্কেটে গেলেন। অনেক সিএনজি। কেউ আসতে চায় না। আবার কারো সাথে ভাড়ায় বনে না।
এসময় তাগড়া ধরনের একটি লোক পাশ থেকেই বললো, চলেন সার, আমি যাব।
ভাড়া ঠিক করে জামাল সাহেব সিএনজিতে উঠে বসলেন। তার মুখে পান। হাতে চুন।
ড্রাইভিং সিটে বসে গাড়ি স্টার্ট দিল কামাল।
বৃষ্টির মধ্যে চলছে।
রাস্তায় প্রচণ্ড জ্যাম। পনের মিনিটের পথ আসতে লেগে গেল দেড় ঘণ্টা! ঢাকা শহর বলে কথা!
কামালের সাথে টুকটাক কথা বলে জামাল সাহেব সময় কাটাচ্ছেন। যখনই জ্যামে পড়ছেন তখনই দু’একটা প্রশ্ন করে। সে প্রশ্নের উত্তরের সাথে ব্যাখ্যা টেনে লম্বা করে।
কামালকে জিজ্ঞেস করলেন, মোবাইল আছে কি না। জামাল সাহেবের উদ্দেশ্য, যদি তার মোবাইল থাকে, তার নম্বর নেয়া। যাতে করে প্রয়োজনে তাকে পেতে পারেন।
কামাল বললো, তার পকেটে মোবাইল আছে। কিন্তু নম্বর জানে না।
জামাল সাহেব একটু হোঁচট খেলেন। এখনকার ছেলেমেয়ে এমনকি ছোটরাও মোবাইল নম্বর ঠোঁটস্থ রাখে। যে লেখাপড়া জানে না, সেও। ব্যতিক্রমী পেলেন কেবল কামালকে।
সে পকেট থেকে একটি কাগজ বার করে জামাল সাহেবের হাতে দিল। বললো, এইটা আমার নম্বর।
জামাল সাহেব তার মোবাইল নম্বরটি সেটে সেফ করার সময় জিজ্ঞেস করলেন, এটা কে লিখে দিয়েছে?
কামাল হেসে জবাব দিল, আমার মাইয়া!
– সে স্কুলে যায়?
– হ।
– কোন্ ক্লাসে পড়ে?
-তা জানি না। তয় কলেজে যায়।
– ও!
-ওর লগে আমার পোলাই-ও যায়।
– কলেজে?
– হ!
-সংসার, লেখা-পড়ার খরচÑ সব মিলে তো!…
– হ, মেলা খরচ।
– চলে কিভাবে?
কামাল হাসলো। বললো, আল্লাহ চালাইয়া ন্যায়। এই যে গতরখান আছে, এইডা শুধু আমি কামে লাগাই। ওরা মানুষ হইলেই আমার শান্তি। অরা লেহা-পড়া করে, এইটা ভাবতেই আমার খুউব ভালা লাগে। অদের লগে দোয়া কইরেন সার! আমি তো মুখ্য মানুষ! বড় কষ্ট লাগে!…
জামাল সাহেবের বিস্ময়ের আর সীমা থাকে না। কামাল বলে কি- সে তার মোবাইল নম্বর জানে না, ছেলে-মেয়ে কোন্ ক্লাসে পড়ে, তা-ও বোঝে না- অথচ তার চোখে-মুখে স্বপ্ন আর তৃপ্তির হাসি!
জামাল সাহেব তার অফিসের সামনে নেমে তাকে নির্ধারিত ভাড়াটা প্রথমে দিলেন। পরে একটা একশো টাকার নোট তার হাতের দিকে বাড়িয়ে বললেন, এটা নাও।
– এইটা কী সার!
– তোমার ছেলে-মেয়েকে মিষ্টি কিংবা ফল কিনে দিও।
কামাল যেন আগুনের গোল্লা দেখলো। হাত গুটিয়ে নিয়ে আবেগভরা কণ্ঠে বললো, না! নেব না!
– কেন? আমি তো খুশি হয়ে দিচ্ছি।
– না, এই ট্যাহা আমি নেব না।
– আরে, ধরতো!
কামাল যেন ছিটকে পড়লো একশো হাত দূরে। বললো, সার! এইটা আমি নেব না। তা’লে স্বভাব খারাপ হয়ে যাইবো। পরে শুধু নিতেই ইচ্ছা করবো। চাইতেও ইচ্ছা করবো। আমার পোলাপানের লগে এরহমটা কত্তি পারুম না।
কামাল টাকাটা নিল না।
সত্যিই নিল না। কোনোভাবেই তাকে দেয়া গেল না।
জামাল সাহেব সিএনজি ছেড়ে অফিসে এলেন। চেয়ারে বসলেন। মাথার ওপর ফ্যান ঘুরছে। তবুও যেন মাথাটা কেমন চক্কর দিচ্ছে।
কে বলেছে কামাল অশিক্ষিত, মূর্খ। জামাল সাহেবের কাছে সে হাজারো মানুষের চেয়ে উত্তম। ঘুষখোর এবং অসৎ শিক্ষিত মানুষের চেয়েও মহৎ মানুষ আছে। এ রকম পিতা আছে। মানুষ আছে। আছে বটে, কিন্তু বড্ড কম। বলতে গেলে হাতেগোনা।
এ ধরনের কামাল সার্থক। কষ্ট করে ছেলে-মেয়েকে লেখা-পড়া শেখাচ্ছে। তাদের মানুষ হবার স্বপ্ন দেখছে।
চেয়ারে বসেই জামাল সাহেবের দৃষ্টি চলে গেল পাঁচতলার ছাদে।
মনে হচ্ছে, হ্যাঁ- ঐতো কামাল তার ছেলেমেয়ের হাতে তুলে দিচ্ছে স্বপ্নের নাটাই-ঘুড়ি। আর তারাও লুফে নিল সেটা। এরপর তো কেবল স্বপ্নের নাটাই-ঘুড়ি নিয়ে তাদের কেবল সামনে এগুনোর পালা।
পারবে। জামাল সাহেবের মনে হলো কামাল পারবে দৌড়ে বিজয়ী হতে।
পারবে তার সন্তানরাও।
যাদের এমন স্বপ্ন আছে, সাহস আছে- তারা কি কখনো পিছে পড়ে থাকে?
না, থাকতে পারে না। জামাল সাহেবের মনে পড়লো ‘আশার চর’ কবিতাটির কথা।
তিনি সেটি গুনগুন করে আবৃত্তি করতে থাকলেন-
ঐ জেগেছে স্বপ্নবুকে নতুন আশার চর
কে কে যাবি আয় ছুটে আয় গড়তে সবুজ ঘর।
চর জেগেছে স্বপ্নবুকে চর জেগেছে ঐ
চোখের তারায় ফুটছে কত সোনাধানের খই!
খই ফুটেছে মৌ ছুটেছে নতুন চরের বুকে
বনপাপিয়া যায় ডেকে যায় আলতো মাথা ঝুঁকে।
নতুন চরের খোঁজ পেয়েছে নাবিক-সেনা দল
সেই সে দলে শামিল হতে জলদি করে চল্।
ঐ জেগেছে স্বপ্নবুকে নতুন আশার চর
সেই চরেতে আমরা সবাই গড়বো সবুজ ঘর।

দুই.

কামালের স্বপ্নের নাটাই তুলে দিয়েছে তার সন্তানের হাতে।
জামাল সাহেবও তার স্বপ্নের নাটাইটি তুলে দিতে চান একমাত্র ছেলে তমালের হাতে।
কিন্তু তমাল যেন তার জন্য তেমন প্রস্তুত নয়।
ধীরে ধীরে বড় হচ্ছে ছেলেটি। অথচ বিশ্বাসই হয় না জামাল সাহেবের। ভাবেন, এই তো তমাল। ছোট্ট ছেলেটি। গুটিসুটি হয়ে শুয়ে আছে ওর মায়ের কোল ঘেঁষে। কথা বলা তো দূরে থাক, ভালো করে কাঁদতেও পারে না। স্বাস্থ্যটাও খারাপ। শরীরে গুটিকয়েক হাড় ছাড়া আর কিছু নেই। সামান্য শ্বাস-প্রশ্বাসেই ওর পাঁজরটা কামারশালার হাপরের মত কেবলই ওঠা-নামা করে। মাথার তালুটাও। দেখলে যে কেউ মনে করতে পারে, বাংলাদেশের সকল অভাবের সাক্ষী এইটুকু ছেলে তমাল।
ছেলেকে ঘিরে জামাল সাহেবের প্রতি জাহানারা বেগমের অভিযোগের কোনো শেষ নেই। ভালো ডাক্তার দেখানো, ফলমূল এটা-সেটা কেনা-তো সে সকল দাবিই মিটছে একে একে। শেষ দিকে তার বায়না হলো, বাসাটা বদল করো। একে তো নিচতলা, তার ওপর আলো-বাতাস নেই। আছে রাজ্যির তেলাপোকা, ইঁদুর আর পোকা-মাকড়।
বাসা বদল! বলাটা যত সহজ, পালন করা ততো সহজ নয়। বাসা বদল মানেই প্রতি মাসে আরও দেড় দুই হাজার টাকার বাড়তি চাপ। বাসা খোঁজা, মালপত্র টানা-হেঁচড়া করা কম ঝক্কির কাজ নয়। বাসা পছন্দ হলে ভাড়ায় কুলায় না। ভাড়ায় পারার মত বাসা আবার থাকার উপযোগী মনে হয় না। এক মাস হারানো গরু খোঁজার মতো বাসা খোঁজা হলো। অফিস ছুটির বড় আরেক চাকরি হলো জামাল সাহেবের বাসা খোঁজা। প্রতিদিনই ক্লান্ত-শ্রান্ত হয়ে বাসায় ফেরেন। ফিরেও শান্তি নেই। জাহানারা বেগমের সেই একই অভিযোগের ভাঙা ঢোল। শুনতে শুনতে মাঝে মাঝে বিরক্ত হয়ে যান জামাল সাহেব।
অনেক চেষ্টার পর পাওয়া গেল একটি বাসা। তবে তার জন্য মাসে বেড়ে গেল এক হাজার টাকা। যে বেতন, তাতে করে এই বাড়তি এক হাজার টাকা গুনতে কষ্টের মধ্যে পড়বেন জেনেও জামাল সাহেব রাজি হয়ে গেলেন। ভাবলেন, কষ্ট হবে ঠিক, কিন্তু তার বিনিময়ে যদি জাহানারা ও তমাল ভালো থাকে তবে মন্দ কী? তমালের স্বাস্থ্য, তার বেড়ে ওঠা- সব কিছুর জন্যই একটি ভালো পরিবেশের প্রয়োজন।
নতুন বাসাটি দোতলায়। বাড়িটা চার তলা। প্রতি ফ্ল্যাটে চারটি করে পরিবার থাকেন। ভাড়া একটু বেশি হলেও বাসাটি খারাপ নয়। উত্তর পাশে বিশাল একটি বারান্দা, দু’টি রুম। ফ্লোর মোজাইক করা। ঢুকতেই একটা বেশ বড় স্পেস আছে। এখানে ডাইনিং টেবিল, চেয়ার, সেলফ্, জাহানারার শখের দেয়াল শোকেসসহ টুকটাক আসবাসপত্রের জায়গা হয়ে গেছে।
নতুন বাসায় ওঠার পর জাহানারা বেগম দারুণ খুশি। এই খুশির অন্যতম কারণ, তিনিই বাসাটি পছন্দ করেছিলেন। বাসার ভেতরটা যে এত সুন্দর, তা আগে বুঝতে পারেননি জামাল সাহেব। স্ত্রীর পছন্দের তারিফ না করে পারলেন না।
প্রথম দিকে জাহানারা খেয়াল করেননি। খেয়াল করেছেন তার ভালো বাসা পাওয়ার আবেগটা থিতু হওয়ার পর। রাতে জামাল সাহেব বাসায় ফিরলে জাহানারা যখন বললেন, বাসাটা সবদিকেই ভালো, কিন্তু রান্না ঘরটা।…
জামাল সাহেব জিজ্ঞেস করলেন, কেন, রান্নাঘরের আবার কী হলো?
– কী আর হবে। ওপাশের রান্নাঘর থেকে ধোঁয়া, শব্দ সবকিছুই এপাশে আসে।
– তার মানে? জামাল সাহেব অবাক হন।
– মানে আর কী! সবই আমার কপাল।
– ভনিতা না করে বিষয়টি খুলেই বলো না।
জাহানারার মুখটা শ্রাবণের মেঘের মত কালো এবং ভারী। বললেন, রান্নাঘরের দেয়াল অর্ধেক। বাকিটা গ্রিল দেয়া। ওপাশের রান্না ঘরের সমস্ত শব্দ ও ধোঁয়া এপাশে আসে। এর মধ্যেই আবার নতুন উৎপাত।
– সেটা আবার কী?
-ওপাশের চিৎকার, কান্নাকাটি, গালি, দরোজার শব্দ, টিভি, ক্যাসেটের কনকনে আওয়াজ- নাহ! মাথা ধরে যাচ্ছে!
জামাল সাহেব বুঝতে পারলেন, জাহানারার ভালো লাগার খুঁটিতে ঘুনপোকা বাসা বেঁধেছে। তা ক্রমাগত কাটতে শুরু করেছে ভেতরে বাইরে।
শুক্রবার। অফিস ছুটি।
জুমার নামাজ আদায় করে দুপুরে খাওয়া শেষে একটু শুয়েছেন জামাল সাহেব। কেবল তন্দ্রা এসেছে, এমন সময় তিনি মুরগির ‘কট্কট্ কট্টাস…’ শব্দ শুনে ধড়ফড় করে উঠে বসলেন। কী ব্যাপার, মুরগি এলো কোত্থেকে?
ততক্ষণে রান্নাঘর থেকে থালাবাসন আর বোয়াম ভাঙার শব্দ ভেসে আসা শুরু করেছে। সেকি হুটোপুটি আর ডানা ঝাপটানো! জামাল সাহেব অপ্রস্তুত হলেন। এতক্ষণে জাহানারা বেগমের গলা শোনা গেল, কী শখে যে এখানে এসেছিলাম! জীবনটা ঝালাপালা হয়ে গেল। এর চেয়ে আগের বাসাটাই তো ভালো ছিল। আলো-বাতাস না পেলেও অন্তত নিজের মত করে থাকতে পারতাম।
জামাল সাহেব হাসলেন মনে মনে। নিজেকে শুনিয়ে বললেন, এমনটিই হয়। দাঁত পড়ার পর দাঁতের কদর বুঝা যায়। মানুষ যত সুখেই থাকুক না কেন, ভাবে এরচেয়েও সুখ চাই। কিংবা সুখে থাকলেও সেটাকে মনে হয় নিরামিষ। জাহানারার আর দোষ কী, মানুষ নিরন্তরই পরিবর্তন চায়। এটা মানুষের স্বভাবজাত অভ্যাস।
বিছানা থেকে ওঠেন না জামাল সাহেব। কেননা তিনি জানেন, এখনই জাহানারা ছুটে আসবেন এ ঘরে। তমালকে আগলে ধরে বর্ণনা দেবেন তার অসুবিধা ও অশান্তির। হলোও তাই। জাহানারার কণ্ঠে বিরক্তির কম্পন। রাগে ক্ষোভে চেহারাটি আরও লাল হয়ে উঠেছে। বললেন, অন্য জায়গায় বাসা দেখ। এখানে হাঁপিয়ে উঠেছি।
হাসলেন জামাল। বললেন, এইটুকুতেই হাঁপিয়ে উঠলে?
জাহানারা বললেন, ‘এইটুকু’ বলছো! তুমি জানো ওপাশের রান্নাঘর থেকে মাঝে মধ্যেই আমাদের ব্যঙ্গ-বিদ্রƒপ করে কথা বলে! জানো না। কারণ আমি কিছু মনে করিনে। ওরা দুই ফ্যামিলি মিলে থাকে। ভাড়া দেয় অর্ধেক করে। দুই ফ্যামিলির অনেক ছেলেমেয়ে। কেউ স্কুলে যায় না। ওপাশের সারাদিন গালিগালাজ আর হট্টগোলে মাথা ধরে যায়। এখন আমার মাথা যন্ত্রণার রোগে ধরেছে। এখানে থাকলে আরও কত শত রোগ-ব্যাধিতে যে আক্রান্ত হবো- তার ইয়ত্তা নেই। এক দমে জাহানারা অনেক ক্ষোভের কথা বললেন। শুনলেন জামাল সাহেব। বললেন, বাসা বদল বললেই তো আর হয় না। তুমি তো জানই, কী ধরনের সমস্যায় পড়তে হয়। একটু মানিয়ে নাও না!
জাহানারা মুখ ভেংচিয়ে বললেন, ‘মানিয়ে নাও না!’ কিভাবে মানাবো? ওপাশে যারা থাকে তাদের না আছে শিক্ষা-দীক্ষা, আর নাছে ভদ্রতা জ্ঞান। উহ্, আমার দম বন্ধ হয়ে আসছে। এখানে থাকলে আমি নির্ঘাত মারা যাবো।
জামাল সাহেব বললেন, তবুও একটু সময় তো দেবে। বছরটা এখানে পার করে না হয়…
কথাটা শেষ করতে দিলেন না জাহানারা। বললেন, অন্য বাসায় না গেলে আমাকে গ্রামে রেখে আসো।
জামাল সাহেব একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন, যত সমস্যা সবই শুরু হয় রান্নাঘর থেকে। আপন পরিবার-পরিজনের মধ্যে যেখানে বিভেদের সৃষ্টি করে রান্নাঘর, সেখানে এমন সমস্যা তো হতেই পারে। ঠিক আছে, দেখা যাক কী করা যায়।
জামাল সাহেব মনে করলেন, এই পরিস্থিতি বেশিক্ষণ থাকবে না। ক্ষোভ এবং আবেগ কেটে গেলে স্বাভাবিক হয়ে আসবে পরিস্থিতি।
যাবো যাবো করেও কয়েক বছর কেটে গেল একই বাসায়। ভাঙনের শব্দ যে এর মধ্যে আদৌ শুনা যায়নি, তা নয়। তবুও তেতো গিলার মতো কষ্ট করে পার করতে হয়েছে প্রহরগুলো।
এর মধ্যে তমাল যে কখন হাঁটি হাঁটি পা পা করে বড় হয়ে উঠেছে, কখন যে তার মুখে কথা ফুটেছে, তা খেয়াল করেননি জামাল। প্রতিদিনই কাছে পিঠে রাখার জন্য তমালের বেড়ে ওঠাটা ঠিক সেইভাবে চোখে পড়েনি জামাল সাহেবের। প্রতিটি সন্তানের জন্যই অবশ্য ঐ একই কথা খাটে। কোনো পিতা-মাতাই তাদের সন্তানের বেড়ে ওঠাটা খেয়াল করতে পারেন না। এজন্যই তো পঞ্চাশ বছরের প্রায় বৃদ্ধকেও পিতা-মাতা ‘খোকা’ বলেই ডাকতে পারেন। প্রকৃত অর্থে তাদের কাছে সন্তানরা কখনো বড় হয় না।
তমালের বিষয়টিও এতদিন সেইভাবে গুরুত্বের সাথে খেয়াল করেননি জামাল। খেয়াল করলেন সেই দিন দুপুরে, যখন হঠাৎ করে তার মুখ ফসকে বেরিয়ে এলো একটি অশ্লীল গালি।
তমাল কেজি স্কুলে পড়ে। ধাপে ধাপে উঠে গেছে তৃতীয় শ্রেণীতে। এখন তার নিজস্ব বায়না আছে, চাহিদা আছে, পছন্দ-অপছন্দের বিষয় আছে, আছে ঘৃণা এবং ভালোবাসাও। কিন্তু তার মুখে গালি কেন?
দারুণ মুষড়ে পড়লেন জামাল সাহেব। জাহানারাকে কাছে ডেকে জিজ্ঞেস করলেন, তমাল গালি শিখলো কোথা থেকে?
জাহানারা বললেন, শুনতে শুনতেই শিখেছে। ও আজকাল মিথ্যা বলাও শিখে গেছে।
– তাই নাকি!
-‘নাকি’ আবার কী? এটাও বাস্তব।
– বলো কি? তুমি খেয়াল করোনি?
– খেয়াল করবো কতক্ষণ? ও-তো তাদের সাথেই সময় কাটায়।
– তুমি মিশতে দাও কেন?
– আমি কি ছেলের পায়ে বেড়ি দিয়ে রাখবো?
– দরকার হলে তাই করবে!
– বলাটা যত সহজ, আসলে ততো সহজ নয়। ছেলে তো আর পশু-পাখি নয় যে বন্দী করে রাখবো। সে তো তার পরিবেশ থেকেই শিখবে।
পরিবেশ থেকে শিখবে! -জামাল সাহেবের বুকের ভেতর থেকে একটা বেদনা চিন চিন করে ওপরে উঠে এলো। তমাল। তার সামনেই বড় হচ্ছে। গালি শিখেছে, মিথ্যা বলা শিখেছে। পকেট থেকে টাকা চুরি করা শিখেছে। এরপর তো স্কুল ফাঁকি দিতেও শিখবে। তারপর?
তারপর? একদিন হয়তো দেখা যাবে ছেলেটি বখে যাচ্ছে। রাস্তায় বাজে ছেলেদের সাথে আড্ডা দিচ্ছে। সিগারেট ফুঁকছে। অন্যের জামার কলার ধরে ঘুষি মারছে। চাঁদা উঠাচ্ছে। মাস্তানি করছে। আর!-
ভাবতে পারেন না জামাল সাহেব। তিনি চোখ বন্ধ করলেন। পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছেন, তমাল তার মুখের ওপর অশ্লীল ভাষায় কথা বলছে। সেই ছোট্ট তুলতুলে মুখটি এখন কত শক্ত। নরোম চোখের বদলে এখন টকটকে লাল চোখ। সেই চোখ থেকে ক্রমাগত ঝরে পড়ছে বারুদসম ঘৃণা জিঘাংসা। জামাল সাহেব দেখছেন। দেখছেন আর আতঙ্কিত হচ্ছেন। দেখছেন আর ভাবছেন, কিভাবে তার একটি স্বপ্নের বৃক্ষ বিষবৃক্ষে রূপ নিল।
শুধু যে তমালের পরিবর্তন চোখে পড়ছে তাই নয়। জাহানারাও বেশ এগিয়ে গেছেন। এখন প্রায়ই রান্নাঘরে বসে ওপাশের মহিলাদের সাথে কথা কাটাকাটি করেন। ঝগড়াও শিখে গেছেন। এখন তিনিও ঝগড়াঝাটিতে জয়ী হতে চেষ্টা করেন। জাহানারার পরিবর্তনটিও এখন ভাবতে হচ্ছে জামালের। তাকে ভাবিয়ে তুলছে পরিবেশ।
তমাল স্কুল থেকে আজ সময়মতো বাসায় ফেরেনি। দুপুরে খাবার সময় জাহানারার কাছে ছেলের খোঁজ নিলে তিনি এড়িয়ে গেছেন, কিংবা মিথ্যা বলেছেন জামালের কাছে। কারণ তিনি জানলে হয়তো ছেলেকে বকাঝকা কিংবা মারপিট করবেন।
ছেলেকে শাসনের ভয়ে জাহানারা তার চেয়ে বড় ধরনের আর একটি সর্বনাশের বীজ রোপণ করলেন। সেটি কি জামালের অর্থনৈতিক অক্ষমতার নীরব প্রতিবাদ, নাকি অন্য কিছু?
জাহানারা আজকাল প্রায়ই জামালের কাছে মিথ্যার আশ্রয় নেন। কখনো নিজের অপরাধ ঢাকার জন্য, কখনোবা শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের জন্য।
জামাল সাহেব ইদানীং বেশ চিন্তিত তার পরিবার নিয়ে। পরিবেশগত দিকটিই তার কাছে বড় হয়ে দেখা দিচ্ছে। কিন্তু এই সামান্য উপার্জনে তিনি এর চেয়ে আর কোন্ ভালো পরিবেশে যেতে পারেন?
ছেলেটি যত বড় হচ্ছে, ততোই তার থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। তমালের দূরত্বটা আজকাল প্রায়ই অনুভব করেন জামাল। জাহানারার পরিবর্তনটাও তার পীড়ার কারণ। কখনো মনে হয় এসবের জন্য তিনি নিজেই দায়ী। তিনি সচ্ছল হলে নিশ্চয়ই তাদেরকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারতেন। কেবল অর্থ, অর্থই তাকে বসিয়ে দিয়েছে সর্বনাশের মধ্য দুপুরে। এখনও কি তাদের ফেরানোর সময় অবশিষ্ট আছে, নাকি এখন সন্ধ্যা এবং সন্ধ্যার পরবর্তী ঘুটঘুটে আঁধার রাতের জন্য প্রতীক্ষার প্রহর গোনা!
জানেন না জামাল। কী এক অসহায় ঘূর্ণিপাকে দুলতে দুলতে ক্রমশ পড়ে যাচ্ছেন তিনি। সম্পূর্ণ পড়ার আগেই তিনি অবলম্বন হিসাবে ধরতে চান একটা কিছু। সেই অবলম্বনটির খোঁজে চারপাশে হাতড়ে ফিরছেন জামাল সাহেব। তার বুকের ভেতর একটি নীল যন্ত্রণার পাখি কেবলই ডানা ঝাঁপটাচ্ছে।
শেষ পর্যন্ত তিনি ছেলের জন্য চেষ্টা করতে থাকেন।
তমালকে শোনান সিএনজি ড্রাইভার কামালের কথা। তার সন্তানের সাফল্যের কথা। বলেন, দেখ বাবা একবার না পারলে তাতে মন খারাপের কিছু নেই। আবার চেষ্টা করো। আবার। এভাবে বারবার চেষ্টার মাধ্যমেই একদিন সফল হতে পারবে। স্বপ্ন ও চেষ্টার কোনো বিকল্প নেই। আর চাইতে হবে সকল সময় আল্লাহর সাহায্য।
জামাল সাহেব তমালকে বুকে জড়িয়ে ধরে আবৃত্তি করতে থাকেন-
নূরু করেছে শুরু দীর্ঘ পথ হাঁটা
জ্যোতি জানেও যদি পথে আছে কাঁটা।-
তবু পথ পাড়ি দেয় সাহসে বাঁধে বুক
বুবু বলেন হেসে- পারলেই পেয়ে যাবে সুখ।

দুখু দেখে না চোখে, লোকে বলে অন্ধ
লেমু ল্যাংড়া বলে ল্যাদা করে সন্দÑ
তবু কি তাদের কাজ রয়ে গেছে বন্ধ!
যদু যাই বলুক না পেরে ওঠা নয় কোনো মন্দ।

টাকু যদি টাক হয় টাক কি আর টাকা?
হাটুরে হাঁটে কি পথ দেখে আঁকা বাঁকা?
তপু পারেনি বলে তামাশা করেছে তপন
বাবু তাই বেঁধেছে বুকে বিশাল স্বপন।

মনুতো মনের জোরে হারালো অভীরে
দেহে নয়- শক্তি থাকে মনের গভীরে।
হারু হেরেছে বলে তুমি কেন হারবে?
পারু পেরেছে জানি- তুমিও পারবে ॥

তিন.

জামাল সাহেব তার বন্ধু সেলিমের সংগ্রামমুখর জীবনের কথা তমালকে শোনায়। রাতে শোবার সময়। ঘুমানোর আগে।
তমাল মুগ্ধ হয়ে শুনতে থাকে।
জামাল সাহেব বলে যান-
জানো বাবা, অন্ধকারটা চারদিক থেকে কেমন ধেই ধেই করে ছুটে আসছে! চারপাশে তেমন কোনো শব্দ নেই। গোরস্তানের মতো একটা থমথমে পরিবেশ।
দয়ালু জোছনা গত সপ্তাহে বিদায় নিয়েছে।
লোডশেডিং তো এ শহরের জন্য প্রতিদিনকার একমাত্র ভূষণ। ঠিক যেমন অনাহারক্লিষ্ট ভাসমান ভিক্ষুক এ শহরের অন্যতম অলঙ্কার।
সেদিনও হরতাল ছিল। রাস্তায় বার হয়নি কোনো যানবাহন।
তবুও পেট বলে কথা। ক্ষুধার আগুন সর্বগ্রাসী। সে মানে না বাধা। জানে না ভয়।
বিত্তবান লোকেরা হরতালের দিন অঢেল ক্লান্তির ঘাম মুছে একটু স্বস্তির হাই তুলে সুখনিন্দ্রায় অলস সময় কাটায়।
না, সেসব ভেবে কোনো কাজ নেই। ওসব বড় বড় মানুষের ব্যাপার স্যাপার। সেলিম কেবল বোঝে, ক্ষুধার আগুন বড় আগুন। এ আগুনের অর্থ বোঝে একমাত্র ভুক্তভোগীরাই।
সেলিমও চেয়েছিল, হরতালের দিন একটু আরাম করতে। অনেকদিন পর শরীরের একটু বিশ্রাম দিতে। কিন্তু তা আর হলো না। বিকাল না হতেই তার স্ত্রী-মাসুদা বললো, আজ কিন্তু ঘরে আর কিছুই নেই। কোনোরকমে গতকাল চলেছে, আর চলবে না। বাচ্চার দুধও শেষ।
মাসুদার কথার মধ্যেও কেমন যেন হরতালের মতো একটা ঝাঁঝালো গন্ধ আছে।
সেলিম কিছুক্ষণ তবুও নিশ্চুপ। সে জানে, অভাবের সংসারে সব কথার জবাব দিতে গেলে যে কোনো মুহূর্তে ঘটে যেতে পারে সড়ক দুর্ঘটনার মতো মারাত্মক কিছু।
সে কেবল, এমন সঙ্কটের সময় নীরবতাকেই বেছে নেয়। আর তখন চারপাশের হাজার রকমের গন্ধ শুঁকতে চেষ্টা করে। কোন কথার মধ্যে কোন গন্ধ, এতদিনে তা সে বেশ করে বুঝতে শিখেছে।
মাসুদার কণ্ঠে অবশ্য অসহায়ত্বের গন্ধটা আজ অনেক তীব্র। তার কণ্ঠে মরা নদীর স্রোতের মতো করুণ ধ্বনি।
ছোট সন্তানের খাবার নেই।
হাতে কোনো টাকা নেই।
অর্থশূন্যতাও একটা ব্যাধি। এ ব্যাধিতে যে আক্রান্ত, তার কোনো রাত দিন থাকে না। ভয় থাকে না। ঈদ কিংবা কোনো পার্বণ থাকে না। হৃদয়ের ভেতর যুদ্ধের অবিরাম ধ্বংসধ্বনিতে সে ভুলে যায় বাইরের যুদ্ধের কথা। ভেতরের রক্তক্ষরণে ভাসিয়ে নিয়ে যায় তাকে বহুদূর। সীমাহীন সীমানায়। তখন সে আর দেখতে পায় না বাইরের রক্তপ্রবাহ।
অভাব, দারিদ্র্য আর অশেষ দুঃখ কষ্ট ভুলিয়ে দেয় জীবনের সবুজ স্বপ্ন। ভুলিয়ে দেয় হলুদ প্রহর।
সেলিমও যেমন ভুলতে বসেছে, তারও একদিন স্বপ্ন ছিল। তারও একদিন কিছুটা অবসর ছিল, যেদিন সে স্বর্ণের মুদ্রার মতো স্বপ্ন নিয়ে খেলা করতো অষ্টপ্রহর। ছাত্রজীবনে তারও একদা মনে হয়েছিল, জীবনটা এমনই। চারদিক কেবল ধবধবে জোছনার মতো সোনালি স্বপ্ন।
সেলিম ইচ্ছে করলে পারতো এমনি একটা জীবন গড়ে নিতে। কিন্তু না, তা সে পারেনি। ফাঁকফোকর দিয়ে সে কিছু সুবিধা আদায় করতে চায়নি।
আর চায়নি বলেই সেলিম আজ ব্যর্থ। অন্তত তার বন্ধুদের চোখে। যারা এখনো ওপর তলায় যাবার সময় গাড়ির ফাঁক দিয়ে করুণার দৃষ্টিতে তাকায় সেলিমের দিকে আর আফসোস করে, হায় বোকা হাদারাম! তোকে দিয়ে কিচ্ছু হবে না।
তাকে দিয়ে যে কিছু হবে না, এ কথা সেলিমের চেয়ে আর কে বেশি জানে?
হবার হলে তো কবেই হয়ে যেত।
পিতার অসুখের চিকিৎসা হতো।
এই শহরে সে ভালভাবে থাকতে পারতো।
আসলেই বোকা সেলিম। তা না হলে এভাবে কেন তার পা-হারাবে। কেন এই সামান্য বেতনে প্রাইভেট ফার্মে চাকরি করতে হবে। তা না হলে আজ কেন তাকে অর্থের জন্য কাটা কবুতরের মতো বুক তড়পাতে হবে?
মাসুদা এবার গলার স্বর আর একটু উঁচু করে বললো, এখনও বসে আছো যে, একটা কিছুতো করতে হবে। বেলা যাচ্ছে না!
সেলিম এবারও কোনো কথা বললো না। মৃত মাছের মতো তার চোখের দৃষ্টি কেবল স্থির হয়ে যাচ্ছে। তার শরীর এবং মন কোনোটাই আর নড়তে চাইছে না।
কোনো কথা না বলে সে জামা কাপড় পরে ঘর থেকে বার হয়ে গেল।
রাস্তায় নেমে একবার ভাবলো, একে তো প্রায় অচল মানুষ। একটা পা নকল। সে পায়ে কোনো ভর রাখা যায় না। গাড়িও বন্ধ। দু-একটা রিকশা যদিওবা চলছে, তবু খুব ঝুঁকিপূর্ণ। অন্যদিকে ভাড়াও দ্বিগুণ। এ সময়ে কী করা যায়, কোথায় যাওয়া যায়!
কোথায় যাবে সে, তা একরকম ঠিক করাই ছিল।
ইচ্ছে করলে এখন সে তার সহপাঠী মন্ত্রীর কাছে যেতে পারে। ইচ্ছে করলে কালো টাকার পর্বত নামে খ্যাত তার বাল্যবন্ধু রহমতের কাছে যেতে পারে। সে জানে তারা কেউ না কেউ সেলিমের এই দুর্দশার পাথর সরিয়ে দিতে পারে।
কিন্তু না, সেলিম সেদিকে যাবে না। যায়নি কোনোদিন। অন্যায় পথে সে কখনও যাবেও না। সেলিম যাচ্ছে এখন অন্যখানে।
পকেটের ভাঁজ করা পেপার কাটিংটা সেলিম বার করলো। ঠিকানাটা আর একবার দেখে নিল। লোকেশনটা বুঝবার চেষ্টা করলো। ভাবলো, তবুও ভালো। এখান থেকে বেশি দূরে হবে না। একটু কষ্ট করে আধা ঘণ্টা হাঁটলেই সেখানে পৌঁছানো যাবে।
একটা সাহস আর আত্মবিশ্বাসের ওপর ভর করে সেলিম সামনে হাঁটা শুরু করলো।
শেষ বিকেল।
এক পায়ে ভর রেখে আর নকল পা-টা টানতে টানতে সেলিম হাঁটছে। তার খুব কষ্ট হচ্ছে হাঁটতে। তবুও অভাবের এক কালোদৈত্য তাকে টেনে হেঁচড়ে নিয়ে যাচ্ছে সামনের দিকে।
কিছু দূর যাবার পর সেলিম দেখলো একটা ধোঁয়ার কুণ্ডলী কেবলই ওপরে উঠে যাচ্ছে।
তার চারপাশ থেকে লোকজন দৌড়ে পালাচ্ছে। একটা আকাশবিদারি শব্দে চারপাশ তখনো কেঁপে কেঁপে উঠছে।
সেলিমের নাকের ভেতর প্রবেশ করলো অতি পরিচিত সেই পোড়ো গন্ধটি। এই গন্ধটির কথা সে সারা জীবনের জন্যে ভুলতে চেয়েছিল। কিন্তু ভুলতে চাইলেও সেলিম তা আর পারলো না। একসময় এই পোড়া গন্ধটির ভেতর সেলিম এক ধরনের মাদকতা অনুভব করতো। আজ, এখন তার সেই পরিচিত গন্ধে যেন বমি উথলে উঠছে।
সবাই পালাচ্ছে। সবাই দৌড়াচ্ছে।
কিন্তু সেলিম পালালো না। সে দৌড়াতে পারে না। সে আর কখনো দৌড়াবেও না। না স্বপ্নের জন্য। না জীবনের জন্য। সে কেমন অনায়াসে রাস্তার ফুটপাথ ধরে হাঁটছে। যেন এই মুহূর্তে কোথাও কিছু ঘটেনি।
হইচই থেমে গেলে সেলিম দেখলো, একটি রক্তাক্ত ঝলসানো বীভৎস লাশের চারপাশ ঘিরে ধরেছে অনেক মানুষ।
এটা যেহেতু একটি সাধারণ মানুষের লাশ, সুতরাং তার কোনো বিশেষ পরিচয় থাকবে না। সেলিম জানে। সেলিম জানে, আগামীকাল এই লাশকে কেন্দ্র করে আন্দোলন আরো দানা বেঁধে উঠবে।
সেলিম জানে, রাজনীতির এমনই ধারা। এদেশের জনগণকে রাজনীতিকরা টয়লেট পেপার মনে করে। প্রয়োজনে ব্যবহার করে। প্রয়োজন ফুরালে ছুঁড়ে ফেলে দেয়।
সে যাই হোক। সেলিমের ওদিকে এখন আর কোনো আগ্রহ নেই। সে যাচ্ছে এখন অন্য দিকে। তার চোখে এখন অনাহারক্লিষ্ট একটি পরিবারের বিধ্বস্ত ছবি।
জটলা পার হয়ে তার গন্তব্যে যেতে প্রায় সন্ধ্যা হয়ে গেল।
ঠিকানার সাথে মিলিয়ে সেলিম বাসাটির সামনে এসে কিছুক্ষণ দাঁড়ালো। হাঁফ ছেড়ে একটু বিশ্রাম নিলো। তারপর গেটের সামনে গিয়ে ভাবলো, কার কাছে জিজ্ঞেস করা যায়?
এমন সময় একজন গেট খুলে বাইরে যাবার জন্য বার হলো। সেলিম বললো, এটাইতো নঈম সাহেবের বাসা?
হ্যাঁ। কে? কোথা থেকে আসছেন?
তার কাছে আমার একটু প্রয়োজন ছিল। তিনি কি বাসায় আছেন?
আছেন। আপনি আমার সাথে আসুন। উনি আমার বাবা।
বাড়িটা পাঁচতলা। বেশ জায়গা নিয়ে বাড়িটা তৈরি করা হয়েছে। বাড়ির চারপাশে অনেক খালি জায়গা। অনেক গাছগাছালি এবং ছোট্ট একটি ফুলের বাগানও আছে।
নকল পা নিয়ে সিঁড়ি ভেঙে দোতলায় উঠতে সেলিমের খুব কষ্ট হচ্ছিল। তবুও সে নিরুপায়। তাকে প্রতিটি সিঁড়ির সাথে সংগ্রাম করে করে ওপরে উঠতে হচ্ছে।
দোতলায় বসার ঘর দেখিয়ে দিয়ে লোকটি ভেতরে চলে গেল।
সেলিম বসে আছে। তার সারা শরীরে ক্লান্তি ও দুশ্চিন্তার ছাপ। আষাঢ়ে মেঘের মতো তার দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসছে। সে ভাবছে, অনেক কিছুই ভাবছে।
ভাবনার মধ্যেই সে চলে গেল বহুদূর। এতদূর যে, সেখান থেকে সেলিম আর ফিরে আসার ইচ্ছেও হারিয়ে ফেলছে ক্রমান্বয়ে। একটা ধূসর অন্ধকারের দেয়ালে ঠেস দিয়ে সে এখন কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিতে চায়।
কিন্তু তা আর হলো না। তার সামনে ধবধবে পাঞ্জাবি আর পাজামা পরা ক্লিনসেভের এক ভদ্রলোক এসে দাঁড়ালেন। সেলিম তাকে সালাম জানালো।
তিনি উত্তর দিলেন এমনভাবে, যাতে করে সেলিম আর একটি পরিচিত গন্ধের সন্ধান পেল।
তিনিই নঈম সাহেব। জিজ্ঞেস করলেন, কী প্রয়োজনে?
সেলিম বললো, গতকাল পেপারে একটি বিজ্ঞাপন দেখেছিলাম। আপনার একটি কিডনির প্রয়োজন। আমার রক্তের গ্রুপের সাথে আপনার প্রার্থিত রক্তের গ্রুপও ঠিক আছে। যদি চান তাহলে আমি আপনাকে একটি কিডনি দিতে পারি।
নঈম সাহেব খুব খুশি হলেন। বোঝা গেল, তার বুক থেকে একটি ভারী পাথর যেন নেমে যাচ্ছে। তিনি কৌতূহল নিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, সত্যিই একটি কিডনির প্রয়োজন। তবে আমার নয়। আমার মেয়ের জন্য। তা আপনাকে এর জন্য কত দিতে হবে?
টাকার খুব প্রয়োজন সেলিমের। তবুও কিডনির মত বিষয় নিয়ে দরদাম করতে তার বিবেক এবং রুচিতে বাধলো। বললো, সেটা আপনিই বিবেচনা করবেন। আমার পক্ষে দাম চাওয়া সম্ভব নয়।
নঈম সাহেব একটু থেমে বললেন, কিডনি না পেলে আমার মেয়েটি নিশ্চিত মৃত্যুর দিকে যাবে। আর ওটা পেলে সে হয়তোবা বেঁচে যাবে। জীবন-মরণের ব্যাপারে তো কোনো দরদাম চলে না। তবুও, আপনি আমার মেয়ের জীবন বাঁচাতে সাহায্য করেছেন, তার জন্য আমার তো একটা কিছু করতে হবে।
সেলিম বললো, সেটা আপনার বিবেচনা। তবে এই মুহূর্তে আমার টাকার খুব প্রয়োজন। আপনারা কবে, কখন, কিভাবে কিডনিটা নেবেন আমাকে জানালে ভালো হয়।
নঈম সাহেব বললেন, আপনি একটু বসুন। আমি ভেতর থেকে আসছি।
সেলিম বসে আছে।
একটু পরেই বেরিয়ে এলেন নঈম সাহেব। তার হাতে একটি খাম। খামটি সেলিমের হাতে দিয়ে বললেন, এটা নিন। এতে সামান্য কিছু টাকা আছে। পরে আরও দেখা যাবে। খামটি হাতে নিয়ে সেলিম বুঝলো, বেশ ভারী। তার শরীরে ঘাম বয়ে যাচ্ছে।
এমন সময় প্রবেশ করলো একটি মেয়ে। বয়স পঁচিশের মধ্যে হবে।
মেয়েটি প্রবেশ করতেই নঈম সাহেব বললেন, এই আমার মেয়ে, রুবিনা। এর জন্যই কিডনির প্রয়োজন।
রুবিনা!
কেমন ফ্যাকাসে হয়ে গেছে রুবিনার শরীর। তার সারা শরীরে মৃত্যুর কালো ছায়া।
সেলিম চমকে উঠলো। একপলকে দেখে নিল মেয়েটিকে।
রুবিনার সাথে দিনারও যেন কোথায় একটা মিল আছে।
দিনা! সেই দিনা, কিডনিতে ভুগে এক সময় মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ে পরাজিত হয়েছিল।
রুবিনা ক্লান্ত-অবসন্ন হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
সেলিম রুবিনার দিকে তাকিয়ে আছে।
সেলিম রুবিনার দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললো, আমি এখন তাহলে আসি। আমার ঠিকানা দিচ্ছি। আপনার প্রয়োজন হলেই জানাবেন, আমি আসবো এবং কিডনি দেব। বলতে বলতে উঠে দাঁড়ালো সেলিম।
নঈম সাহেব বললেন, আরে, খামটি তো ভুলে রেখে যাচ্ছেন!
সেলিম বললো, ভুলে নয়। আমি জেনে বুঝেই রেখে যাচ্ছি। ওটার আমার আর প্রয়োজন নেই। কথা দিচ্ছি, আমি রুবিনার জন্য কিডনি দেব। তার জন্য কোনো বদলা আমি নেব না।
সেলিম কষ্টের অনন্তসমুদ্র থেকে এইমাত্র তীরে উঠে যেন প্রাণভরে মুঠো মুঠো মুক্ত শীতল বাতাস টেনে নিল।
বহুদিন পর আজ, এই ঘনকালো অন্ধকারে, নির্জন রাজপথে দাঁড়িয়ে তার প্রাণখুলে হাসতে ইচ্ছে করছে।
সেলিম একটি লাইটপোস্ট ধরে দাঁড়িয়ে পড়লো।
আর তখন, ঠিক তখনি বিদ্যুতের আলোতে আলোকিত হয়ে উঠলো প্রবীণ শহর। এবং তার চারপাশ ভরে উঠলো এক স্বর্গীয় গন্ধে।
জামাল সাহেব তমালের মুখে আদর করতে করতে বললেন-
সকল সময় আসেনাতো জয়
তাই বলে কি পাবে তুমি ভয়?
জয়-পরাজয় সকল কাজেই থাকে
ধন্য তারা সামনে চলার সাহস যারা রাখে।
জয়-পরাজয় আপন হাতের মুঠোয়
চাকতির মতো বুকের ভেতর লুটোয়।
রাত পেরিয়ে তার পরেইতো ভোর
তুমি এখন সাহস করে দাও না খুলে দোর।
চলার পথে জয়-পরাজয় থাকবে
তবু তুমি সামনে চলার সাহসটুকু রাখবে।

চার.
অফিস থেকে কয়েক দিনের ছুটি নিলেন জামাল সাহেব।
উদ্দেশ্য তমালকে নিয়ে গ্রামের বাড়িতে যাওয়া।
গ্রামের পরিবেশ, বাড়ির চারপাশ, খোলা প্রান্তরের সাথে তমালকে পরিচিত করে তোলা।
শেকড়ের গন্ধ না পেলে বৃক্ষ বড় হতে পারে না। মূলত সেই শেকড়ের গন্ধ অনুভব করানোর জন্যই তমালকে নিয়ে বাড়ি যাওয়া।
অবশ্য বহুদিন পরে।
তমাল ছোট থাকতে আব্বার মৃত্যুর খবর পেয়ে সেই যে বাড়ি গিয়েছিলেন জামাল সাহেব, তারপর থেকে আর বাড়ি যাওয়া হয়নি। নানা কাজের চাপে।
বাড়ি যাাওয়ার জন্য নাড়ির টানটা জামাল সাহেবও অনুভব করছেন কয়েকদিন থেকে।
জামাল সাহেব তমালকে নিয়ে বাড়ির উদ্দেশে রওনা হলেন।
সময়মতো পৌঁছেও গেলেন।
শরীরের ওপরে খুব ধকল যাওয়ার কারণে সেদিন আর তমালকে নিয়ে বেরুতে পারলেন না জামাল সাহেব। পরদিন সকালে নাস্তা খেয়ে ছেলেকে নিয়ে বের হলেন। সাথে ছিল জামাল সাহেবের ছোট ভাই।
পুবের মাঠ, উত্তরের মাঠ, দক্ষিণের মাঠ ঘুরে নচুরকুড় বিলের মাঝে এসে থামলেন তারা।
মাথার ওপর দিয়ে উড়ে যাচ্ছে ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি।
পশ্চিমের বাঁশ বাগান, ইটের পাঁজা, পুকুরÑ সবই এখান থেকে দেখা যাচ্ছে। বিলে পানি না থাকায় চারপাশ শুকনো।
তারা হাঁটছেন আর গল্প করছেন। কত গল্প!
তমালকে জানানোর জন্যই সেসব গল্প বলা।
জামাল সাহেব হেসে বললেন, জানো এই বিলে আমি এবং মিয়াভাই আজি টেনে, বর্শা ফেলে, কুয়ো সেঁচে, ছিপ দিয়ে কত যে মাছ ধরেছি! আর বর্ষাকালে তো মাছের ছড়াছড়ি। সেইসব দিন এখন আর নেই। কোথায় যে হারিয়ে গেল! একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন জামাল সাহেব।
ছোটভাইকে লক্ষ্য করে তিনি বললেন, মিয়াভাই আর ওসমান চাচা মিলে কিভাবে ঘুড়ি ওড়াতাম! পাখির বাসায় ডিম খুঁজতাম। কাঠবিড়ালি মারতাম ওসমান চাচার বেড়েকে দিয়ে? বেড়ে ছিলো ওসমান চাচার সবচেয়ে প্রিয় সঙ্গীÑকুকুর। তাকে সে খুব যতœ করতো। আমরা খেলার সাথী ছিলাম তিনজন। ছোটকালে, সেই শৈশবে আমরা তিনজন একসাথেই সময় কাটাতাম। খেলাধুলা, স্কুলে যাওয়া-আসা, আম-জাম পাড়া, মাছ ধরাÑ আরও কত কী! সেইসব দিনের কথা আজও মনে পড়লে কেমন শিউরে উঠি আনন্দে।
আনুও ফ্যাল ফ্যাল করে মেজভাইয়ের দিকে তাকিয়ে থাকে। তমালও। কারণ আনু তখন তো জন্মাইনি, সে কী করে সেসব কথা জানবে?
আনু আকাশের দিকে তাকিয়ে বেলা দেখলো। মেজভাইকে বললো, দুপুর হয়ে এলো। চলুন বাড়ি যাই। বিকেলে আমবাগান, বাঁশবাগান, খেজুরবাগানÑ ঐসব দিকে যাওয়া যাবে।
জামাল সাহেব বললেন, চলো ফেরা যাক।
বাড়ি এসে সবাই গোসল করে নিলেন।
জোহরের আজান হয়ে গেছে।
জামাল সাহেব তমালকে কাছে ডাকলেন।
তমালের দাদুভাই যে খাটে থাকতেন সেটা এখনও সেইভাবে আছে। খাটটি তমালকে দেখালেন। বললেন, এই খাটে তোমার দাদুভাই থাকতেন। এই দেখ তাঁর পানের বাটা, হাতের ছড়ি, পাঞ্জাবি, টুপি, জায়নামাজ, তসবিহ, জুতা, চশমা, খেলাল, পড়ার বইয়ের স্তূপ, কলম, লেখার খাতা ইত্যাদি। তিনি সব সময়ই মসজিদে নামাজ পড়তেন। মাথায় টুপি রাখতেন। কখনও মিথ্যা বলতেন না। কারোর মনে কষ্ট দিতেন না। কটু কথা বলতেন না। আচরণে ছিলেন অত্যন্ত ভদ্র ও নম্র। আমাদের বড় এবং প্রকৃত মানুষ হবার জন্য তিনি সব সময় তাগিদ দিতেন।
তিনি কখনও খালি গায়ে থাকতেন না। থাকতেন না খালি পায়ে। গোটা গ্রামের তিনি মাতব্বর ছিলেন। সালিস-বিচার করতেন। তিনি ছিলেন শিক্ষাবিদ ও পণ্ডিত। তাঁকে গ্রামের সবাই শ্রদ্ধা করতো। ভালোবাসতো। এক নামে সবাই তাঁকে চিনতো। তাঁর কত যে নাম-ডাক এবং খ্যাতি ছিলো, দশ গ্রামের মানুষ তা জানতো। তুমি কিন্তু তাঁরই উত্তরসূরি। প্রাণপ্রিয় পৌত্র। তোমার কি ইচ্ছে হয় না দাদুভাইয়ের মত একজন বড় মাপের আদর্শবান মানুষ হতে!
তোমার হাতে যে স্বপ্নের নাটাইটি তুলে দিয়েছি সেটি আমি পেয়েছিলাম আব্বাজানের কাছে। আব্বাজান পেয়েছিলেন তাঁর পিতা রহিম বক্সের কাছে। রহিম বক্স পেয়েছিলেন তাঁর পিতা আব্দুল্লাহর কাছে। তিনি সেটা পেয়েছিলেন তাঁর পিতা ইদু কবিরাজের কাছে। এবার চিন্তা করে দেখোতো এই স্বপ্নের নাটাইটি কত পুরুষের হাত বদল হয়ে তোমার হাতে এলো! একবার ভাব বাবা!
কথা বলতে বলতে জামাল সাহেব তমালকে নিয়ে মসজিদে গেলেন। জোহরের নামাজ আদায় করার জন্য।
মসজিদের পাশেই আব্বাজানের কবর।
নামাজ শেষে আব্বাজানের কবরের পাশে দাঁড়ালেন জামাল সাহেব। তাঁর চোখ দুটো ভিজে গেল। দুই পাশে আছে তমাল ও ছোট ভাই আনু। সবাই মিলে কবর জিয়ারত করলেন।
তারপর পুকুরের পাশে এসে দাঁড়ালেন জামাল সাহেব। তমাল ও আনু রয়েছে তাঁর সাথে।
তমাল যেন একটু আনমনা হয়ে উঠলো। তার ভেতর কিসের যেন একটা ঢেউ খেলে যাচ্ছে।
সেটা কিসের! তমাল জানে না।-
হঠাৎ আব্বুর হাত ধরে কেমন যেন ধরা গলায় তমাল বললো, আব্বু দেখেন, পুকুরের পানি যেন কেঁপে কেঁপে ওপরে উঠছে!
জামাল সাহেব তমালের হাতটি শক্ত করে ধরে বললেন, হয়তো তুমি ঠিকই দেখেছো। তবে ওটা পুকুরের পানির কম্পন নয়, হয়তো তোমার ভেতরের কম্পন। ঐ কম্পন সাহসের কম্পন। ঐ কম্পন বিশাল স্বপ্নের কম্পন। ঐ কম্পন একজন বড় মানুষ হবার কম্পন।…
তমাল মনের জোর দিয়ে বললো, হ্যাঁ আব্বু, ঠিক তাই। ওটা আমার হয়তো স্বপ্ন ও সাহসের কম্পন। দাদুভাইয়ের মত আমি অতো বড় না হতে পারি তবে আজ থেকে চেষ্টা করবো তাঁর আদর্শ বুকে চেপে একজন প্রকৃত মানুষ হবার জন্য। আমার জন্য আপনি দোয়া করুন।
জামাল সাহেবের মনটা খুশিতে ভরে উঠলো। তিনি ছেলের স্বপ্ন ও আশা পূরণের জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করলেন।
তমালকে বুকে জড়িয়ে ধরে জামাল সাহেব বললেন-
হারতে চায় না কেউ বিশ্বভুবনে
জয়ের নিশান ওড়াও শয়ন-স্বপনে।

ওড়াও জয়ের নিশান, ওড়াও যুবক
ঘুমিয়ে কাটায় কি কাল সিংহশাবক!
নদীর জোয়ার বলো রুখতে কে পারে,
সমুদ্র তরঙ্গ কি কখনো হারে!

বৈশাখ আনে ঝড় মানে কি পরাজয়
সত্য-সৈনিক কখনো পায়নাতো ভয়।
তুমিও দাঁড়াও দেখি বুক টান করে
সাহসের নিঃশ্বাস নাও ফুসফুস ভরে।

ভয়কে পেছনে ফেলে সুদৃঢ় মনে
জয়ের নিশান ওড়াও শয়ন-স্বপনে।

SHARE

2 COMMENTS

  1. এটা আসলে কোনো উপন্যাস না, আবোল তাবোল বকবক। নাম কিশোর উপন্যাস হলেও বড়দের কাহিনী ফাদা হয়েছে। ছোট বাচ্চাদের প্রেম শেখানো হয়েছে। নইলে কিডনি বিক্রি করতে গিয়ে মেয়েটিকে দেখে তার কলেজ জীবনের কথা কেন মনে পড়বে এবং তার ওই সময়ের বান্ধবীর কথা মনে পড়াতে অর্থ ছাড়া কিডনি দিতে রাজী হবে? আমার মনে হয় লেখকের দু’টো গল্প একত্রে জুড়ে দিয়ে একটা উপন্যাস দাঁড় করানোর চেষ্টা করা হয়েছে। কিশোরকণ্ঠের মতো পত্রিকায় এই ধরনের লেখা না ছাপানোর অনুরোধ করছি।

Leave a Reply