Home ফিচার কতো রকম ঠোঁট ওদের!

কতো রকম ঠোঁট ওদের!

মাসুম কবীর
পৃথিবীজুড়ে আমাদের চারপাশে রয়েছে নানা রকম পাখি। এসব পাখির যেমন রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন নাম, তেমনি রয়েছে আচার-আচরণগত বৈচিত্র্য। বিভিন্ন ধরনের পাখির ঠোঁটেও দেখা যায় চোখে পড়ার মতো বৈচিত্র্য। একটি পাখির স্বভাব কেমন হবে বা সে পোকা খাবে না ফল খাবে, নাকি অন্য কোনো পাখিকেই ধরে খাবে সেটা নির্ভর করে তার ঠোঁটের ওপর।
বাংলাদেশে প্রায় সাড়ে ছয়শো প্রজাতির পাখি দেখা যায়। কাজেই চারিদিকের পাখিদের ভালোভাবে দেখলে আমরা অনেক রকমের ঠোঁট দেখতে পাবো। কয়েক ধরনের পাখির ঠোঁট ও তাদের ব্যবহার নিয়েই আমাদের আজকের আয়োজন।
প্রথমে কাকের কথায় আসা যাক। খাবার নিয়ে কাকের তেমন কোনো বাছ-বিচার নেই। এদের ঠোঁট সব রকম খাবার খাওয়ার উপযুক্ত। কাকের ঠোঁটকে তাই বলা হয় সর্বভুক ঠোঁট। শালিকের ঠোঁটও সর্বভুক ঠোঁট। তবে তা গঠনে খানিকটা আলাদা। হাঁড়িচাচার ঠোঁটকেও বলা হয় জেনারেলিস্ট বা সর্বভুক ধরনের ঠোঁট।
কী অদ্ভুত ব্যাপার দেখো তোÑ চড়–ই তার ঠোঁট দিয়ে মাছ শিকার করতে পারবে না, তাকে খেতে হবে শস্যদানা। আবার বক শস্যদানা খেতে পারবে না, তাকে ঠোঁট দিয়ে মাছ ধরতেই হবে। এমনভাবেই বিকশিত ওদের ঠোঁট।
এর পর আসা যাক দোয়েলের ঠোঁটে। ছোট পোকামাকড় শিকারের জন্য এ ঠোঁট খুবই উপযুক্ত। পোকা ধরা এমন ধরনের ঠোঁটের মালিক আমাদের চারপাশের টুনটুনি, চাকদোয়েল, শ্যামাসহ আরও অনেক পাখি। কসাই (ঝযৎরশব) পাখির ঠোঁটও এ ধরনের। তবে ওপরের ঠোঁটটি খানিক সুঁচালো ও বাঁকা হওয়াতে পাখিটি ছোট ছোট গিরগিটি, সাপ পর্যন্ত শিকার করে থাকে।
কেবল খাদ্যশস্য খেয়ে বেঁচে থাকে এমন পাখির ঠোঁট কেমন তা জানতে চাইলে চড়–ই পাখির দিকে তাকাতে হবে। চড়–ই, বাবুই আর মুনিয়াদের ঠোঁট এ রকম। তবে চড়–ই কেবল খাদ্যশস্য খায় না; বিভিন্ন ফল, পোকামাকড় আর রান্নাঘরের উচ্ছিষ্ট পর্যন্ত খেয়ে থাকে।
ফুলের মধু খেয়ে জীবনধারণ করে মৌটুসি আর নীলটুনি (ঝঁহনরৎফং)। এদের ঠোঁট আবার লম্বা ও বাঁকানো। হামিংবার্ডের ঠোঁটের মতো অনেকটা। ফুলের মধু চুষে নিতে পারে এসব পাখি।
ধনেশের চারটি প্রজাতি আগে বাংলাদেশে দেখা যেতো। এখন তাদের দেখা যায় না। তবু চট্টগ্রাম ও সিলেটের পার্বত্য বনে একটি প্রজাতির দেখা পাওয়া যেতে পারে। শুধু ফল খাওয়ার জন্য বিকশিত হয়েছে ধনেশের ঠোঁট। বসন্তবৌরির ঠোঁটও ফলাহারী। তবে আকারে-প্রকারে বসন্তবৌরি আর ধনেশের ঠোঁটে পার্থক্য আছে।
কাঠঠোকরার ঠোঁট আবার বিশেষ ধরনের। তাদের ঠোঁট বিবর্তিত কাঠ ঠুকরে দেওয়ার জন্যই। গাছের গায়ে আর বাকলের ভেতরের পোকামাকড়, পিঁপড়া এদের খাদ্য। ঠোঁটের সাহায্যে গাছের গায়ে গর্ত করে বাসা বানায় এরা।
পেলিক্যান-এর বাংলা নাম গগনবেড়। এ পাখিরা সারা বিশ্বে বিখ্যাত মূলত তাদের ঠোঁটের নিচের থলের জন্য। এদের একটি প্রজাতিকে বাংলাদেশে দেখা যায়। এরা জলাশয়ে শিকার করার সময় ঠোঁট খোলা রাখে। তখন এদের ঠোঁটের নিচের থলেটা জালের মতো মাছ আটকে দেয়।
দেশি গাঙচোষা, পানিকাটা বা জলখোর (ওহফরধহ ঝশরসসবৎ) একটি বিপন্নপ্রায় পাখি। এদের নামকরণ থেকেই বোঝা যায় এদের স্বভাব। এরা ঠোঁট দিয়ে পানি কেটে বা স্কিম করে ছোট ছোট মাছ শিকার করে। তখন ঠোঁটের নিচের ম্যান্ডিবলটা পানির নিচে থাকে। মাছ বা অন্য ছোট চিংড়ি তখন ঠোঁটে আটকা পড়ে।
কাদাতে খাবার অনুসন্ধানকারী অধিকাংশ পাখিদের ঠোঁট বেশ লম্বা ও বাঁকানো। এদের আদর্শ উদাহরণ গুলিন্দা (ঈঁৎষব)ি নামের পাখি। এরা কাদার নিচে ক্রমাগত ঠোঁট দিয়ে অনুসন্ধান করে কেঁচো, ছোট ছোট কাঁকড়া শিকার করে। চ্যাগা (ঝহরঢ়ব), বাটান বা চাপাখি (ঝধহফঢ়রঢ়বৎ) ও  এ ধরনের কিছু পাখিও একইভাবে শিকার করে। সবার ঠোঁটই কম বেশি লম্বা।
পাকড়া উল্টোঠুঁটি বা চেঙ্গা (চরবফ আড়পবঃ) বাংলাদেশের শীতের পাখি। খুব কমই দেখা যায় এদের। এদের ঠোঁট গুলিন্দার মতোই লম্বা ও বাঁকা, তবে একদম উল্টোদিকে বাঁকানো। এদের অগভীর জলাশয়ের কাদাতে ঠোঁট ডুবিয়ে পাশাপাশি নাড়িয়ে ছোট পোকামাকড় খুঁজতে দেখা যায়।
মাছরাঙাদের ঠোঁট আবার অন্যদের থেকে আলাদা ধরনের। এ ধরনের ঠোঁট থাকার ফলে মাছ শিকার করায় দক্ষ ওরা। একই রকম ঠোঁট পানচিলদের (ঃবৎহং)।
পানির নিচে ডুব দিয়ে যেসব পাখি মাছ শিকার করে, তাদের ঠোঁট আবার মাছরাঙার মতো নয়। ডুবুরি হাঁস (এৎবনবং), পানকৌড়ি ও গয়ার (উধৎঃবৎ) এমন ঠোঁটের অধিকারী। এদের ঠোঁট লম্বা ও সামনের দিকে কিছুটা বাঁকানো। ডুবুরি হাঁসের ক্ষেত্রে আবার অনেক সময় দেখা যায়, বাচ্চা তার মা-বাবার বুক ও পেটের পালক ঠুকরে ঠুকরে খাচ্ছে।
ফ্লেমিঙ্গো আমাদের দেশে দেখা যায় না। তবে পাখিটি টিভি চ্যানেল আর চিড়িয়াখানার সুবাদে অনেকেরই পরিচিত। এরা যেভাবে খাবার খায় তার নাম ফিল্টার করে খাওয়া (ঋরষঃবৎ ঋববফরহম)। ঠোঁট দিয়ে কয়েক ধরনের হাঁসও খাবার ছাঁকতে পারে।
চিল, বাজ, ঈগল এসব পাখিরা দেখতে অনেকটা আগ্রাসী গোছের। ঠোঁট হলো এদের ধারালো অস্ত্র। সে ঠোঁট দিয়ে এরা শিকার করে অন্যান্য পাখি, ইঁদুর, খরগোশ আর ছোট ছোট প্রাণী। এমন ঠোঁট আছে পেঁচারও।
আবার কিছু পাখি সত্যিই আগ্রাসী। এসব পাখি অন্য পাখির শিকার ছিনতাই করে নিয়ে যায়, অন্য পাখির বাচ্চা অপহরণ করে নিয়ে খেয়ে ফেলে। এমনকি অন্য পাখির খাবার ডাকাতি করেও নিয়ে থাকে। গাঙচিল এমন একটি পাখি। ফ্রিগেট বার্ড নামের একটি সাগরের পাখি এমন কাজে সবচেয়ে পটু।
কোনো পশু মারা গেলে তার গোশত খেতে শকুনের জুড়ি নেই। মরা পশু থেকে গোশত ছাড়াতে সাহায্য করে শকুনের ধারালো ঠোঁট। এ ধরনের ঠোঁট দেখতে প্রায় ঈগলদের মতোই।
পাখির রাজ্যে রয়েছে আরও অনেক রকমের ঠোঁট। যেমন : চামচঠুঁটি বা খুন্তেবকের (ঝঢ়ড়ড়হনরষষ) ঠোঁট অনেকটা বড়ো আকারের চামচের মতো। হাড়গিলা, শামুকখোল, মানিকজোড় (ঝঃড়ৎশং) এদের ঠোঁট অনেক লম্বা ও মোটা। এই ঠোঁট কখনো কাঁকড়া, ব্যাঙ বা কচ্ছপ শিকারের জন্য, কখোনো ঠোঁট দিয়ে তালি বাজিয়ে অন্য পাখিকে ভয় দেবার জন্য।
সর্বোপরি, বিচিত্র রকমের পাখি, তাদের বিভিন্ন রকমের ঠোঁট ও সেই সাথে হরেক রকম খাবার সম্পর্কে আরও জানা যেতে পারে পাখি সম্পর্কিত বিভিন্ন বই, ওয়েবসাইট থেকে; চারিদিকের বিভিন্ন পাখিকে ভালোভাবে দেখে। এখানে সামান্য কিছু বর্ণনা তুলে ধরা হলো মাত্র।

SHARE

Leave a Reply