Home ভ্রমণ মমির মিসর

মমির মিসর

বুলবুল সরওয়ার

শ্রাবনীকে তার বাবা আহসান সাহেব বলেছিলেন, ‘যদি তুমি ক্লাস সিক্সে প্রথম হতে পারোÑ তোমাকে মস্ত সারপ্রাইজ দেবো।’
‘আমাকে দেবে না?’ অনিকের প্রশ্ন শুনে মা শিরিন বললেন, ‘না, তুমি বড়ো দুষ্ট হয়েছ। টেবল ভুল করো।’
‘টেবল জিজ্ঞাসা করে দেখ, পারি কি না।’ ক্লাস-থ্রিতে পড়া অনিকের অভিমানে গাল ফুলে যায়। ‘ঠিক আছে, আমার কিছু দরকার নেই। যা দিতে ইচ্ছে করে শ্রাবনী আপুকেই দাও।’
আহসান সাহেব হাসেন। ‘ও বাবা, ব্যাটা দেখি রাগও করে। আচ্ছা দু’জনকেই সমান সমান দেয়া হবে। তবে, শর্ত পূরণ করা চাই কিন্তু।’
পরীক্ষা শেষ।
শ্রাবনী ও অনিক শর্ত পূরণ করার পরও বাবা কিছু বলেন না দেখে দুই ভাই-বোন গলা জড়িয়ে ধরে বলে, ‘বাবা, তুমি কিন্তু কথা রাখছ না।’
‘কী কথা, মা?’
‘কেন, আমি ক্লাসে ফার্স্ট হলে আর অনিক টেবল ভুল না করলে আমাদেরকে সারপ্রাইজ গিফট দেবার কথা ছিল না?’
‘গিফট তো মার কাছে দিয়ে দিয়েছি।’
দু’জনেই ছুটল শিরিনের ঘরে।
মা কেবল জায়নামাজ ভাঁজ করছিলেন। অনিক আর শ্রাবনী লাফ দিয়ে মাকে জড়িয়ে ধরল। ‘আমাদের গিফট কোথায়, অ্যাঁ? বুড়ি মেয়ের কিচ্ছু মনে থাকে না, না?’
‘তা-তো থাকেই না। বুড়ো হলে তোদেরও থাকবে না।’
আলমারি খুলে শিরিন পাতলা দুটো খাম বের করলেন। ভেতর থেকে বেরোল একগাদা কাগজপত্র। দেখে দুই ভাই-বোনেরই নাক-মুখ কুঁচকে এল। ‘এ আবার কেমন গিফট!’
‘এগুলো আসলে কী, মা?’ অনিকের গলায় সন্দেহ।
‘টিকেট।’
‘কিসের টিকেট?’
‘আগামী সাত তারিখে তোমরা কোথাও যাবে।’
‘কোথায়?’
মা মুখ লুকিয়ে হেসে বলেন, ‘তোদের আসলে নেফারতিতির কথা মনেই নেই।’
‘মি…স…র !!’ অনিক লাফ দিতে গিয়ে প্রায় পড়েই যায়- ‘আপু, মিসর। ঠিক না, মা?’
‘হতেও পারে।’ শিরিন এমনভাবে বললেন যেন মিরপুর থেকে নিউমার্কেট যাবেন। ‘যাও এবার; বাবাকে থ্যাংকিউ বলে আসো।’
অনিক আর শ্রাবনী রকেটের বেগে ড্রইংরুমে ছুটল।

দুই.
জিয়া এয়ারপোর্টে পৌঁছানোর পর ভোরের আলো ফুটল। ঘুম থেকে জাগিয়ে শ্রাবনী আর অনিককে ব্যাগ ধরে দাঁড় করিয়ে দিলেন মা। বাবা গেছেন টিকেট কনফার্ম করতে।
ট্রলি নিয়ে এলেন আহসান সাহেব। দুটো সুটকেস, তিনটে হ্যাটব্যাগ আর দুটো র‌্যাকস্যাক উঠিয়ে গেট পেরোল সবাই। দরজার ভেতরেই স্ক্যানার-মেশিন। ব্যাগগুলো ঠেলেঠুলে বেল্টে তোলা হলো। পর্দা ঠেলে মেশিনে ঢুকে গেল সেগুলো। অনিক আর শ্রাবনী অবাক হয়ে দেখে- তাদের সুটকেসগুলো ফিতা দিয়ে বেঁধে ফেলেছে মেশিন। আরেকটু সামনে যাবার পর ব্যাগগুলো ওজন করে পেছনের বেল্টে তোলা হলো। মুহূর্তেই টা-টা করে চলে গেল সেগুলো।
কুয়েত এয়ারলাইন্সের বিমান ছাড়তে চল্লিশ মিনিট লেট। নটা পাঁচে আকাশে উড়ল ডিসি-টেন। অনিকের একটু ভয় ভয় লেগেছিল, কিন্তু শ্রাবনীর কিচ্ছু মনে হয়নি। সে বসে বসে বিমান-কোম্পানির নির্দেশিকা পড়ল।
কুয়েত সিটিতে বিমান বদল করে সন্ধ্যার একটু আগে কায়রো পৌঁছুল তারা। ইমিগ্রেশন-কাস্টম্স পার হয়ে বাইরে বেরিয়েই অনিক বলল, ‘মা, পিরামিড কই?’
শিরিন আর আহসান সাহেব একযোগে হেসে উঠলেন। ‘দেখবে, বাবা, দেখবে। অপেক্ষা করো। কেবল তো এলাম।’
ড্রাইভারের সাথে অনেক দরকষাকষির পর মালপত্তর তোলা হল। ট্যাক্সি ধাঁ করে উঠে গেল তিন তলা ফ্লাইওভারে। ‘আপু, দেখো- কী বিরাট ব্রিজ।’ অনিক মুগ্ধকণ্ঠে বলে। ‘মনে হচ্ছে আবারও বিমানে উঠছি।’
আহসান সাহেব শ্রাবনীকে দেখিয়ে বললেন, ‘উই যে সামনে মোয়াত্তাম হিল। কায়রোর সবচেয়ে মজার জায়গা। বিকেলে শত শত লোক মোয়াত্তামের কার্নিশে যায় আড্ডা মারতে আর কফি খেতে।’
টেক্সি সেমিরামিছ ইন্টারন্যাশনাল হোটেলের লবিতে পৌঁছার আগে পাশ কাটাল সিংহের মূর্তি বসানো বিশাল ব্রিজ। ‘এটা, বাবা?’ জানতে চায় শ্রাবনী।
‘হ্যাঁ। এটাই সেই তাহরির পুল, মা।’ আহসান সাহেব জবাব দিতে-দিতেই হোটেলের উর্দি-পরা বাটলার গাড়ির দরজা খুলে ধরল। মাথা দুলিয়ে নেমে এলেন আহসান সাহেব।
‘ফাদ্দাল-ফাদ্দাল।’ হেসে হাত বাড়িয়ে দিল বাটলার। মাথা নিচু করে অনিকের গালে চুমু খাবার চেষ্টা করতেই সে সদর্পে বলে উঠল, ‘আই ডোন্ট লাইক ইট।’
‘ইট্স্ আওয়ার কালচার, মাই লর্ড! নাথিং টু বি মাইট।’ বলে অনিককে কোলে তুলে নিল সে।
সাতাশ তলা হোটেলের সতেরো তলার পশ্চিম দিকে অনিকের রুম। ব্যালকনিতে দাঁড়াতেই যেন ঝলমল করে উঠল নীলের চারপাশ। অনেক দূরে, দক্ষিণ-পশ্চিম কোনায় কী একটা দেখে অনিক চিৎকার করে উঠল, ‘বাবা বাবা, বলো- ওটা কী? ঐ যে- আমি শিওর, ওটাই পিরামিড!’
শ্রাবনী তাকিয়ে ছিল নদীর উল্টোদিকের বিশাল সরু টাওয়ারের দিকে। টাওয়ারের মাথাটা পদ্মফুলের মতো জ্বলজ্বলে। মনে হয় ঘুরছে। পিরামিড-শব্দটা কানে যেতেই চমক ভাঙল তার। ‘কী বলছিস ভাইয়া, পিরামিড? কই, কোথায়?’
আহসান সাহেব আর শিরিনও কাছে এসে দাঁড়ালেন। যদিও অনেক বারই দেখেছেন তারা গিজার পিরামিড, তবু নিশ্চিত হতে না পেরে বললেন, ‘ঠিক বুঝতে পারছি না, বাবা। হতেও পারে। তবে এদ্দূর থেকে বলা খুবই কঠিন। আচ্ছা, এবার ঘরে চলো। ফ্রেশ হয়ে ডিনার করতে হবে।’

তিন.
সকাল সাড়ে নটায় ট্যাক্সি এসে দাঁড়াল গিজায়। শ্রাবনী আর অনিক একসাথে বলে উঠল, ‘ইয়াল্লাহ! পিরামিড এত্ত বড়ো?
বাবা টিকেট কাটতে যাবার আগে বললেন, ‘তোমরা লাইনে দাঁড়াও। নইলে পেছনে পড়ে যাবে।’
একদল জাপানি আর ফরাসিদের মাঝে ঠাঁই হলো অনিকদের। শ্রাবনীর যেন কিছুতেই বিশ্বাস হচ্ছে না যে সে দাঁড়িয়ে আছে বিশ্বের সবচেয়ে প্রাচীন বিল্ডিং-পিরামিডের সামনে। সাড়ে চার হাজার বছর আগে পাথরের ওপর পাথর সাজিয়ে গড়া হয়েছে এই বিস্ময়কর কবর। বাবা সকালে বলেছেন, পিরামিড নির্মাণের আসল কৌশল এখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত হয়নি। ‘তার মানে কি আগের যুগের মানুষরা আমাদের চেয়ে জ্ঞানী ছিল?’
‘হতেও পারে, মা। মানুষের জ্ঞান হচ্ছে আপেক্ষিক ব্যাপার। স্কেল দিয়ে তো পরিমাপ করা যায় না।’
‘বাবা, আপেক্ষিক কী?’ জানতে চায় অনিক।
আহসান সাহেব বিব্রত হয়ে যান ছেলের প্রশ্নে। কিন্তু তার দুশ্চিন্তার আগেই লাইন পৌঁছে যায় পিরামিডের গোড়ায়। অভ্যাসমতো পিরামিডের পাথরে হাত দিতেই আহসান-শিরিনের গা শিহরিত হয়ে ওঠে।
‘বাবা, তুমি অমন কেঁপে উঠলে কেন?’ আবার কঠিন প্রশ্ন করে বসে অনিক।
‘কারণ,’ পিরামিডের গেটের দিকে উঠতে উঠতে জবাব দেন তিনি- ‘এখানে এলেই আমার ইতিহাস মনে পড়ে যায়, অনিক।’
‘কী ইতিহাস, বাবা?’
‘মনে হয়, আমি যেখানে পা রাখছি- সেখানেই একদিন পা রেখেছিলেন হজরত ইবরাহিম ও মূসা আলাইহিস সালাম। এখানেই মন্ত্রিত্ব করেছেন নবী ইউসুফ- পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর পুরুষ। শিশু ঈসাকে এখানে নিয়ে এসেছিলেন তার মা- হজরত মরিয়ম। পৃথিবীর আর কোনো স্থান এত বড়ো বড়ো মানুষের পদস্পর্শ পায়নি।’
‘তাহলে তো আমরাও ভাগ্যবান, বাবা। তাই না?’ জানতে চায় শ্রাবনী।
‘হ্যাঁ তা ঠিক। তবে তোমাকে সেটা নিশ্চিত করতে হবে তাদের মতো মহৎ জীবন অনুসরণ করে।’
‘আচ্ছা বাবা, তিনটা পিরামিডের মধ্যে বড়ো কোন্টা?’ জানতে চায় অনিক।
‘এইটা। মানে খুপু। এটার উচ্চতা চারশো ঊনপঞ্চাশ ফিট। পরেরটাও প্রায় সমান। নাম খাপড়ে। খাপড়ে খুপুর থেকে মাত্র তিন ফিট ছোটো।’
‘কিন্তু দেখে যে খাপড়েকেই বড়ো মনে হচ্ছে, বাবা।’ বলে শ্রাবনী
‘খাপড়ে একটু উঁচুতে অবস্থিত বলে ওরকম মনে হয়, মা।’
‘মেনকাউড়ে কি আরো উচুঁতে?’
‘না-না, শ্রাবনী। মেনকাউড়ে আবার নিচুতে। তিনটে পিরামিডের মধ্যে ওটাই সবেচেয়ে ছোটো।’
‘বাবা, কোনো কোনো বইতে দেখেছি পিরামিডগুলোর নাম অন্যরকম?’ কৌতূহল সীমা মানে না শ্রাবনীর।
‘হ্যাঁ মা, ঠিকই ধরেছ। রাজা খুপুর গ্রিক নাম চিওপস। একইভাবে খাপড়ের গ্রিক নাম শেফরন আর মেনকাউড়ের মাইসেরিনাস। খুপুর এই পিরামিডে কত পাথর আছে, জানো মা?’
শ্রাবনী আর অনিক দু’জনেই ঘাড় নাড়ে। আহসান সাহেব হেসে বলেন, ‘লজ্জার কিছু নেই এতে। খুপুর পিরামিডে আনুমানিক তেইশ লক্ষ চৌকা পাথর ব্যবহৃত হয়েছে। সবচেয়ে ছোটোটির ওজন আড়াই টন, আর বড়োটির ষাট।’

তিনশো ফিট গভীর খাদে নামতে শ্রাবনী ও অনিকের কষ্টই হলো। শেষ প্রান্তে পৌঁছে দেখা গেল শুধু পাথরের কফিন। আধখোলা পড়ে আছে। দু’জনেই হতাশ গলায় বলল, ‘বাবা, মমি কই?’
‘আরে বোকা, মমি তো এখানে থাকে না। মমি রাখা আছে কায়রো জাদুঘরে। তাও সম্রাট খুপুর নয়। খুপুর মমির খোঁজ মানুষ কখনো জানতেই পারেনি।’
‘কেন, বাবা?’ শ্রাবনীর প্রশ্ন চলতেই থাকে।
‘প্রাচীন মিসরীয়রা বিশ্বাস করত, প্রতিটি রাজা মৃত্যুর পর পরলোকে রাজা হয়ে বিচরণ করবেন। সেখানে যেন তাদের অর্থ কষ্ট না হয়- তাই তারা মমির সাথে রাজার জন্য অনেক সোনা-রতœ দিয়ে দিত। মমি চোরেরা এসবের লোভে হানা দিত কফিনে। তাদের পাল্লায় পড়েই এসব লাশ হাওয়া হয়ে গেছে।’
সিঁড়ি বেয়ে উঠতে উঠতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন শিরিন ইসলাম। বললেন, ‘এসব ইতিহাস পরে শুনব, জনাব। আগে কিছু দানাপানি খাওয়াও।’
খাপড়ে যাবার পথে আইসক্রিম আর চকোলেট খেয়ে ধাতস্ত হলেন মা। কিন্তু শ্রাবনী আর অনিকের কোনো ক্লান্তি নেই। তীব্র রোদ আর সাহারার লু-হাওয়াও তাদের আগ্রহকে দমাতে পারছে না। খাপড়ে ও মেনকাউড়েতে ঢোকা যায় না। তবে খাপড়ের পাশে যে মিউজিয়াম আছে- তার ভেতরে তিন হাজার বছরের পুরানো নৌকা দেখে সবার চোখ বিস্ফারিত। আহসান সাহেব কায়রোতে যখন আগে এসেছিলেন- তখন এসব সংস্কারাধীন ছিল বলে দেখতে পারেননি। তিনিও বাচ্চাদের সাথে গলা মিলিয়ে বললেন, ‘ওয়াও! হাউ মিরাকুলাস্!’

চার.
কায়রো শহরের আয়তন বিশাল। ফজরের পরপরই ট্যাক্সি রওনা হল সুয়েজের দিকে। কিন্তু সুয়েজ পৌঁছুতে দশটা বেজে গেল। সুয়েজ শহরে যেন বিল্ডিংয়ের চেয়ে জাহাজ বেশি। অনিক-শ্রাবনী দু’জনেই মুগ্ধ কণ্ঠে বলল, ‘বাবা, এ দেখি জাহাজের নগরী।’
শিরিন বললেন, ‘এখান থেকেই বড়ো বড়ো জাহাজগুলো সুয়েজ ক্যানেলে ঢোকে তো, তাই ঐ কিউ। আমাদের আরিচা ঘাটের মতো।’
‘ভারি অবাক ব্যাপার, মা। সৈয়দ মুজতবা আলী তো এখানে নেমেই পিরামিড-কায়রো দেখে পোর্ট সৈয়দে গিয়ে আবার জাহাজ ধরেছিলেন! এখানেই তো সেই রসগোল্লার কাহিনী ঘটেছিল, না মা?’
শিরিন হেসে বললেন, ‘হ্যাঁ হ্যাঁ, ঠিকই ধরেছ।’
কফি খেয়ে শহরটা একবার চক্কর দিয়ে আনল ড্রাইভার। অনিক আর শ্রাবনীর অবশ্য শহরের চেয়ে পোর্টই বেশি ভালো লাগল। এক একটি জাহাজ যেন ফুটবল খেলার মাঠ। অনিক হ্যাপার্ড-লয়েডের একটা জাহাজের ওপরটা গুনে দেখল- প্রায় সাতশো কনটেইনার-ঠাসা।
ইসমাইলিয়ায় যাবার পথে আহমেদ হামদি টানেলের মুখ দেখিয়ে আনল ড্রাইভার। এই টানেল সুয়েজের নিচ দিয়ে সিনাই গিয়ে পৌঁছেছে। আলী জানাল, ঐ টানেল দিয়ে সিনাইয়ে পাওয়ার সাপ্লাই এবং পানীয় জলের সাপ্লাইও গেছে। শ্রাবনী আর অনিকের চোখে পড়ল শুধু সারি সারি সোডিয়াম বাতির আলো।
সুয়েজের পাশ দিয়ে প্রশস্ত হাইওয়ে, রেললাইন এবং ইলেকট্রিসিটি গেছে সেই পোর্ট সৈয়দ পর্যন্ত। মাঝের শহরের নাম ইসমাইলিয়া। সুয়েজ ক্যানেল লোহিত সাগর আর ভূমধ্যসাগরকে যুক্ত করায় লন্ডন থেকে মুম্বাইয়ের দূরত্ব কমে গেছে চার হাজার কিলোমিটার।
লাঞ্চ সেরে মেরিটাইম ইনস্টিটিউটে সবাইকে নিয়ে গেলেন আহসান সাহেব। এখান থেকেই নিয়ন্ত্রণ করা হয় সুয়েজ ক্যানেলের নৌ-চলাচল। একজন পরিচালক বুঝিয়ে দিলেন কী করে ১৭১ কিলোমিটার লম্বা এই ক্যানেল দিয়ে জাহাজগুলো আসে-যায়। একবারে, শুধু একদিকে চলাচল করে বলে ৮ ঘণ্টা জাহাজ একদিকে চলে। পরের ৮ ঘণ্টা গ্যাপ। তখন জাহাজ যায় উল্টাদিকে।
বাবার কানের কাছে মুখ নিয়ে জানতে চায় শ্রাবনী, ‘তার মানে, জাহাজগুলো শুধু যাওয়া আসাই করে, বাবা?’
ডিরেক্টর সাহেব যেন তার কথার জবাবেই বললেন, ‘মাই ডিয়ার ইয়াং লেডি, দিস ইসমাইলিয়া ইজ দ্য মিড পয়েন্ট অব সুয়েজ। অল ভেসেলস টেক রেস্ট হিয়ার ইন লেক তিসমাহ। এখানে ৮ ঘণ্টা বিশ্রাম নেয় জাহাজ। তারপর আবার গন্তব্যের দিকে চলতে থাকে। সুয়েজের গড় গভীরতা ১৩ মিটার, গড় প্রশস্ততা ১২২ মিটার এবং পানামা ক্যানেলের মতো কোনো ‘লক’ নেই বলেই এ ক্যানেল আধুনিক সভ্যতার বিস্ময়!’

পোর্ট সৈয়দে পৌঁছুতে বিকেল হয়ে গেল। ভূমধ্যসাগরের নীল জলের কিনারায় স্থাপিত লেসেপস টাওয়ার ঘুরে আসতেই চোখে পড়ল সারি সারি তাঁবু। ‘ওরই একটা ক্যাম্পে আজ রাতে আমরা থাকব- কী, মজা হবে না?’
অনিক আর শ্রাবনী পরস্পরের গলা জড়িয়ে ধরল খুশিতে। ভাই-বোনের কাণ্ড দেখে হেসে মুখ ঘুরিয়ে নিলেন শিরিন আর আহসান সাহেব।
আলী বলল, ‘ইয়া সাইয়েদ! সূর্য ডোবার আগেই একবার চোর মার্কেট ঘুরে আসি?’
‘চোর মার্কেট মানে?’
‘মানে ঐ ডাউনটাউন। ওখানে তো সবকিছুই অর্ধেক দামে মেলে! শিপ থেকে হাওয়া করা মাল আরকি!’
‘চলো, তাহলে চোর মার্কেটেই যাওয়া যাক।’

সত্যিই আজব মার্কেট এই ডাউনটাউন। ইতালি থেকে জাপান পর্যন্ত সব দেশে তৈরি জিনিস পাওয়া যায় এখানে। তবে দামদস্তুর করা কাকে বলে তা গাউসিয়ার পাকা বিবিকেও এখানে এসে শিখতে হবে। একটা গাউন পছন্দ হলো শ্রাবনীর। দোকানি পবিত্র হাসিমাখা মুখে জানাল, ‘সাড়ে তিনশো পাউন্ডের নিচে এক পয়সাও কমাব না, ম্যাডাম। আল্লাহ্ মালিক।’
ড্রাইভারের সহায়তায় শেষ পর্যন্ত সেটা কেনা হলো আটচল্লিশ পাউন্ডে। আহসান সাহেব মনে মনে আঁৎকে উঠলেও সবার জন্য কিছু কিছু উপহার কিনলেন। আলী বলল, ’সাড়ে নয়শো পাউন্ডের এসব জিনিস কায়রো থেকে কিনলে কম পক্ষে আড়াই হাজার পাউন্ড লাগত।’
‘মানে- পাঁচশো ডলার?’
‘আইওয়া, হাবিব। জি-হ্যাঁ, বন্ধু!’
সন্ধ্যার আগেই একটা তাঁবু ভাড়া করা হলো মেইন বিচে। রাতের খানার এন্তেজাম হলো দুই পাশের দুই টেন্টের সাথে- ভেড়ার কাবাব আর ভুট্টার রুটি। মরোক্কান তাঁবুতে দু’টি বাচ্চা : হিবা আর জাহিন; পাকিস্তানি টেন্টেও দু’টি : মুম আর ব্রোহি। আধা ঘণ্টা যেতে না যেতেই ছয় বাচ্চার গ্রুপ আলাদা হয়ে গেল। ভূমধ্যসাগরের পানি ভুলিয়ে দিল তাদের ভাষা, জাতি আর দূরত্বের বিভেদ। মশালের আলোতে বসে বড়োরাও ভুলে গেল কষ্ট আর বেদনার পৃথিবীকে!

পাঁচ.
ফজরের আগেই বাচ্চাদের ডেকে তুললেন আহসান সাহেব। তখনো চারদিকের কুয়াশা কাটেনি। এরই মধ্যে শত শত দম্পতি নাইতে নেমেছে। আরবি মহিলারা বোরকা নিয়েই সমুদ্রে নেমেছেন সারি বেঁধে।
‘দেখ- পূর্ব দিকে চেয়ে দেখ। কী দেখা যায়?’
চোখ ডলতে ডলতে শ্রাবনী বলল, ‘কই বাবা, সূর্য তো দেখছি না। শুধু তো বিল্ডিং!’
‘বিল্ডিং নয়, মা। ওগুলো মেগা ভ্যাসেল। ইন্টারকন্টিনেন্টাল শিপ। ভালো করে দেখ- সবগুলো ধীরে ধীরে সুয়েজ ক্যানেলে ঢুকছে।’
‘তাই?’ শ্রাবনীর চোখ থেকে ঘুম উধাও হয়ে গেল। ‘সবগুলোর সামনে একটা করে বোট কেন, বাবা? ওগুলো কি পথ দেখিয়ে দিচ্ছে?’
‘ঠিক ধরেছ, মা। ওদেরকে বলে পাইলট। প্রতিটি মেগা ভ্যাসেলকে পুরো ক্যানেলে পথ দেখায় ওগুলো। নইলে দক্ষ ক্যাপ্টেনও বিপদে পড়তে পারে।’
‘মনে হচ্ছে, মরুভূমির ভেতর দিয়ে এক একটা শহর এগিয়ে যাচ্ছে, না বাবা? এমন অদ্ভুত দৃশ্য জীবনে ভুলব না।’

আলেক্সান্ড্রিয়া মিসরের প্রাচীন রাজধানী। রানি ক্লিওপেট্রার শহর। মহাবীর আলেক্সান্ডারের হাতে গড়া এই নগরী পৃথিবীর প্রাচীনতম জনপদের একটা।
ঢোকার মুখে আবার পুলিশ আটকাল। মিসরের সর্বত্রই সিক্যুরিটির এই কড়াকড়ি। দুটো লেক পার হয়ে মূল শহরের মুখে আবার চেক পোস্ট। কায়রো, পোর্ট সৈয়দ আর লিবিয়া সীমান্তের সড়কগুলো এসে মিশেছে বলে এখানে। লম্বা লাইন।
হঠাৎ পাশের গাড়ি দেখে চেঁচিয়ে উঠল অনিক- ‘বাবা-মা, জাহিনরাও এসেছে।’
‘সত্যি?’ শ্রাবনীর কণ্ঠে উচ্ছ্বাস, ‘তাহলে নিশ্চয়ই ব্রোহিরাও এসেছে? খুব মজা হবে!’
হিবাই দেখে ফেলল শ্রাবনীকে। এসি গাড়ির ভেতর থেকে তার কী হাত নাড়া আর লাফালাফি! শেষ পর্যন্ত পুলিশ বক্সে নেমে কথা বলতেই হলো আহসান সাহেবকে।
‘হ্যালো মি. ইমরান। নাইস টু মিট ইউ এগেন। আপনারা কোথায় উঠছেন?’
‘মন্তাজা শেরাটনে।’
‘ওকে, আমরাও তাহলে ওখানে আসছি।’
‘খুবই ভালো হবে। বাচ্চাদের খুশিই তো আসল খুশি।’
‘আচ্ছা, জানেন কি, মিস্টার ওয়াহাব বে কোথায় উঠছেন?’
‘উনিও মন্তাজাতেই উঠবেন।’
‘তাহলে তো খুবই মজা হবে, বাবা।’ কখন যে অনিক এসে পাশে দাঁড়িয়েছে টেরই পাননি আহসান সাহেব। ছেলেকে বললেন, ‘ঠিক তাই।’

বেলা ১১টায় পৌঁছানো গেল হোটেলে। লাগেজপত্র নিয়ে সবাই লবিতে বসলেন।
‘বাবা, রুমে চলো।’ তাগাদা দিল শ্রাবনী।
‘একটু পরে, মা।’
‘কেন, বাবা?’
‘১২টা থেকে হোটেলের দিন গোনা হয়। এখন উঠলে আমাদেরকে আগের দিনের ভাড়া দিতে হবে। একটু পরে নাম-ঠিকানা লিখে উপরে যাব সবাই। ততক্ষণে ১২টা বেজে যাবে।’
‘ওÑআচ্ছা!’ ক্লান্ত ভঙ্গিতে সিটে আবার বসে পড়ল দুই ভাই-বোন।
হোটেলের ম্যানেজার বোধহয় ব্যাপারটা লক্ষ করেছিল। বলল, ‘মিস্টার আহসান, প্লিজ, প্রোসিড টু রুম সেভেন-ও-থ্রি। উই উইল নট কাউন্ট দিস আওয়ার টু ইয়োর ক্রেডিট। দিস ইস আওয়ার কমপ্লিমেন্টস টু ইয়োর কিডস।’
বেল বয় লাগেজ নিয়ে রওনা দেবার পর আহসান সাহেব ড্রাইভার আলীকে বললেন, ‘ফ্রেশ হয়ে নাও। একটু পরেই আমরা বেরোব।’

ছয়.
মন্তাজা হোটেলের নিজস্ব বিচ আছে। ঈষদুষ্ণ পানিতে গা ভাসাতেই শরীর মন জুড়িয়ে গেল। গতকাল পোর্ট সৈয়দ থেকে কেনা ‘হাঙ্গর বয়া’ আর ‘তিমি বয়া’য় বসে সাঁতার কাটার ব্যর্থ চেষ্টা করছে শ্রাবনী আর অনিক। দু’জনের কেউই সাঁতার জানে না বলে মাকে দু’হাত দিয়ে ধরে রেখেছে।
সহসা হৈ হৈ করে নেমে এল ব্রোহি-মুমি; হিবা-জাহিন। এদের মধ্যে হিবা সামান্য সাঁতার জানে। কিন্তু বাকিদেরও ভয়-ডর আছে বলে মনে হলো না। শ্রাবনী একবার কী যেন বলার চেষ্টা করছিল। তীব্র ঢেউ সে কথা ডুবিয়ে দিয়ে গেল। শিরিন আঁৎকে উঠে বললেন, ‘ধরো ওকে; তলিয়ে যাবে যে!’
‘যাবে না।’ আহসান সাহেব অভয় দিয়ে বললেন, ‘জোয়ারের স্রোতে কেউ সরে যায় না। ভয় পেয়ো না।’

সন্ধ্যার একটু আগেই ট্যাক্সি নিয়ে বেরিয়ে পড়ল সবাই। সন্ধ্যার আলেক্স অপূর্ব সুন্দর- বিশেষত বিচগুলো। মন্তাজা থেকে যতই পশ্চিমে যাচ্ছে, অনিক-শ্রাবনীর চোখে ততই বিস্ময় বাড়ছে। মানুষ চাইলে তার পরিবেশকে কত না চমৎকার করে গড়তে পারে। বিচঘেঁষা হাইওয়ে কোথাও কোথাও সমুদ্রের পানির ওপর দিয়ে পার হয়ে গেছেÑ যেন ব্রিজ। কোথাও অর্ধবৃত্তাকার লেকের পাড়ে আছড়ে পড়ছে সগর্জন ঢেউ। লক্ষ লক্ষ মানুষ জলক্রীড়ায় মত্ত। নয়-দশটা বিচ কাটাতেই চোখ ঝলসে দিল দশতলা বিল্ডিংয়ের সমান উঁচু বৃত্তাকার আয়না!
‘ওটা কী, বাবা?’ চেঁচিয়ে উঠলে শ্রাবনী।
আহসান সাহেব হেসে বললেন, ‘মাকে জিজ্ঞাসা কর।’
‘মা মা, বলো না?’
‘দ্য ম্যাগনিফিসেন্ট লাইব্রেরি অব আলেক্সান্ড্রিয়া।’
‘সেটা না পুড়ে গেছে, মা?’
‘হ্যাঁ, অনেকবারই পুড়েছে এই লাইব্রেরি। আবার গড়াও হয়েছে অনেকবার। এবার তৈরি হয়েছে বিশ বছর ধরে। ইউনেস্কো একে ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ ঘোষণা করেছে। আমাদের সুন্দরবনের মতো।’
‘কিন্তু আয়না কেন, মা?’
‘আলেক্সান্ড্রিয়া বাতিঘরের মতো এই লাইব্রেরিও পৃথিবীর মানুষকে পথ দেখাবে। তাই ডিজাইনটা করা হয়েছে ওভাবে।’

মার্টিয়ার্স মেমোরিয়াল রোমের ফোরামের আদলে গড়া। গাড়ি থামিয়ে কফি আর সিম-বিচি খাওয়া হলো। পুরো মিসরে এই বিচি-চিবানো প্রায় রোগের মতো। চা-কফি-বিচি আছে সর্বত্র।
ঘণ্টা দুয়েক শহরের নানা স্থান চক্কর মেরে ফিরে আসা হলো সেন্ট্রালে। মহামতি আলেক্সান্ডারের ঘোড়ায় আসীন আবক্ষ মূর্তি দাঁড়িয়ে আছে তলোয়ার উঁচিয়ে। যেন এখুনি ছুটবেন দিগি¦জয়ে। সে মুখে কী তেজ, কী পরাক্রম!
‘জানো, অনিক-শ্রাবনী! এই যে আলেক্সান্ডার দ্য গ্রেট- যিনি এ শহরের প্রতিষ্ঠাতা, তিনি কিন্তু এ শহর দেখে যেতে পারেননি। কিন্তু তার মরদেহ এখানেই শেষ শয্যা পেতেছিল। রানি ক্লিওপেট্রার আত্মহত্যার পর থেকেই এ শহরের অবনতি শুরু হয়। রোম আলেক্সান্ড্রিয়াকে সেভাবে বঞ্চিত করতে শুরু করে- যেভাবে ঢাকাকে ঠকিয়েছিল রাওয়ালপিন্ডি। পরিণতিতে ঢাকা যেমন স্বাধীন হয়ে যায়- আলেক্সান্ড্রিয়াও শেষে রোমানদের হাতছাড়া হয়।’
‘অত্যাচার সব সময়ই খারাপ তাই না, বাবা?’
‘নিশ্চয়ই। অত্যাচার হচ্ছে দুর্বলের হাতিয়ার। সবলরা মানুষের হৃদয় জয় করে প্রেম দিয়ে, ভালোবাসা দিয়ে-।’
‘তোদের বাবা আলেক্সে এসে কবি হয়ে গেছেন।’ বললেন মা, ‘যাক, আর কবিতার দরকার নেই। আমরা কলোসিয়ামে এসে গেছি।’
‘কলোসিয়াম কেন, মা? আমাদের না এম্ফিথিয়েটারে যাবার কথা?’
‘বোথ আর সেম। রোমানরা বলে এম্ফিথিয়েটার, গ্রিকরা বলে কলোসিয়াম। চলো, নামি।’
শ্রাবনী অনিককে জড়িয়ে ধরে বলল, ‘ভাইয়া দেখ- আড়াই হাজার বছর আগের স্টেডিয়ামটা এখনো কী সুন্দর! বাবা, এর পুরোটাই কি মার্বেলে তৈরি?’
‘মনে হয়। মাঝের কলামগুলো দেখ, কী অদ্ভুত কারুকাজ! সামনের যে ছোটো কালো বেদিটা দেখছ- ওটাই সেই ‘ম্যাজিক সেন্টার’- যেখানে দাঁড়িয়ে আস্তে কথা বললেও সবাই শুনতে পায়।’
‘কুয়ো ভাদিস আর বারাব্বাসেও এম্ফিথিয়েটার আছে, তাই না, বাবা?’
‘ঠিক ধরেছ।’

সাত.
পরদিন ঘুম থেকে উঠতে সবারই দেরি হয়ে গেল। নাস্তার পর আধা-মগ করে চা দিতে বাধ্য হলেন শিরিন। আহসান সাহেব বললেন, ‘চলো, আজ আগে আগে বিচে যাই। লবণ-পানি আর সিসা সবার ক্লান্তি ভুলিয়ে দেবে।’
আলীর সাথে ইতোমধ্যেই বাচ্চাদের খুব জমে গেছে। শ্রাবনী বলল, ‘আচ্ছা, আংকেল, হিবা আর মুমরাও কি যাবে?’
‘নিশ্চয়ই। ওরা ইতোমধ্যেই রওনা হয়ে গেছে, প্রিন্সেস! আপনারা জলদি গাড়িতে উঠুন।’
কাইত-বে দুর্গ অসাধারণ কিছু নয়। শ্রাবনী বলল, ‘এর থেকে ইন্ডিয়ার অনেক দুর্গই সুন্দর। লাল কেল্লা বা আগ্রা ফোর্টের তুলনায় এ তো একটা কামরা মাত্র!’
আলীকে ট্রান্সলেট করে শোনানো হল শ্রাবনীর মন্তব্য। জবাব দেবার জন্য সে সবাইকে টেনে নিয়ে গেল দুর্গের ছাদে। সেখানে পৌঁছে তিনটি পরিবারই সমস্বরে বলে উঠল- ‘ওয়াহ্!’
পুরো আলেক্স শহর যেন চোখের সামনে স্বপ্নের মতো উঠে দাঁড়িয়েছে। সমুদ্রের বুক চিরে জ্বলজ্বল করছে লাইব্রেরির গোল আয়না, অজানা শহীদদের স্মৃতি অঙ্গন, মানসিয়া স্কয়ার এবং বিচগুলো। ফারো লাইট হাউসের অবশিষ্টাংশ এবং স্থপতি ডাইনোক্রোটিসের গড়া রাস্তার ভগ্নাবশেষ দেখে সবাই শিহরিত। ‘সত্যি, এখানে না এলে বোঝাই যেত না- কেন পৃথিবীর আরো সাতান্নটি আলেক্সান্ড্রিয়ার তুলনায় আলেক্সান্ড্রিয়া অব ইজিপ্টই শ্রেষ্ঠ!

আজকের সমুদ্র যেন আরো উচ্ছল, আরো লবণাক্ত। নিমেষেই অনিক-শ্রাবনীর ক্লান্তি চলে গেল। কাইত বে’র পাশের বিচে মাছ ধরা হয় বলে ওখানে গোসল করা নিষেধ। আলী সবাইকে নিয়ে এসেছে আরো পশ্চিমে। এগুলো সব পে-বিচ।
সবাই ঝাঁপিয়ে পড়ল ভূমধ্যসাগরের সুনীল পানিতে।
লাঞ্চের পর গ্রেকো মিউজিয়ামে মমি দেখে অনিক আর শ্রাবনীর আনন্দ ধরে না। ‘কী অদ্ভুত! একেবারে জীবন্ত মানুষের চেহারা! বাবা, মমি মানে কী?’ জানতে চায় শ্রাবনী।
‘আলকাতরা।’
‘মানে? আমার সাথে ফাজলামো? ভালো হবে না বলছি, বাবা।’
‘সত্যি, শ্রাবনী। মামিয়া শব্দের মানে আলকাতরা। লাশকে প্রসেস করার পর যে কাপড় দিয়ে প্যাঁচানো হতো- সেই কাপড় আলকাতরা মাখা থাকত বলেই ওর নাম হয়েছে মমি।’
‘ভারি মজার তো!’
কিন্তু অনিক-শ্রাবনীর মন খারাপ হয়ে গেল হিবা-জাহিন আর ব্রোহি-মুমি থেকে বিদায় নিতে। ওরা আরো দুইদিন এখানে থাকবে। এরপর যাবে হুরগাদা রিসোর্টে। আর শ্রাবনীরা রাতের ট্রেনে লুক্সর।
সাড়ে সাতটায় ট্যাক্সি নিয়ে স্টেশনে এলেন আহসান সাহেব। বিদায় দিতে গিয়ে ড্রাইভার আলী অনিক-শ্রাবনীর গালে চুমু খেয়ে বলল, ‘ফি আমানিল্লাহ’।

আজকের রাস্তা একেবারেই অন্যরকম। নীল নদীকে একবার ডানে একবার বামে রেখে ছুটছে আলেক্স এক্সপ্রেস। বাইরের জোস্নায় ঘন সবুজ ভুট্টার ক্ষেত যেন সোনালি ডানায় দুলছে। অনিক আর শ্রাবনীর এত ভালো লাগছিল যে দুই ঘণ্টার জার্নি যেন ফুরিয়ে গেল আধা ঘণ্টায়।
কায়রো স্টেশনেই রাতের খাওয়া সেরে নিলেন সবাই। সোয়া দশটায় ট্রেন এসে দাঁড়াল প্লাটফর্মে। ট্রেনের চেহারা দেখে অনিক বলল, ‘এ মা! এ দেখি লক্কর-ঝক্কর মার্কা গাড়ি, বাবা! এই গাড়ি হাজার মাইল মরুভূমি পাড়ি দেবে?’
‘হাজার মাইল নয়, বাবা। পাঁচশো মাইলের মতো। সকালেই পৌঁছে যাবে। চলো উঠি। আমাদের বগি সামনে থেকে তৃতীয়টা।’
‘কোন ক্লাস, বাবা?’ জানতে চায় শ্রাবনী। ‘ফার্স্ট ক্লাস, না ইকোনমি?’
‘মিসরের লং রুটে কোনো ইকোনমি ক্লাস নেই রে, মা। সবই ফার্স্ট আর সেকেন্ড। এই যে সি বগিতে এসে গেছি। ওঠো সবাই। আমাদের সোফা নং সালাসা-আরবা-খামছা-সিত্তাহ।’
‘মানে তিন-চার-পাঁচ-ছয়?’
‘এই তো আমার বাবা আরবি সংখ্যা শিখে গেছে!’
ট্রেনের ভেতরে ঢুকে অনিক-শ্রাবনীর চোখ ছানাবড়া। ভেতরটা প্লেনের মতো চমৎকার। প্রতিটা সোফার ওপর দুটো কম্বল, দুটো বালিশ, একটি তোয়ালে এবং একটি ইউটিলিটি-বক্স। সিটগুলো হাফ-সার্কেল ঘুরিয়ে নেয়া যায়। ‘ইয়াহু!’ বলে লাফ দিয়ে বলল অনিক, ‘থ্যাংকয়ু বাবা, থ্যাংকিউ। মাই লাভলি মাম, ইউ আর রিয়েলি গ্রেট!’
আসলেই লুক্সর-আসোয়ান-আবু সিম্বেল ট্যুরের প্ল্যান শিরিন আহমেদের। আহসান সাহেব ভেবেছিলেন ওদের নিয়ে মেডিটেরিয়ান-ভয়েজ অথবা ডেজার্ট ট্যুরে যাবেন। কিন্তু শিরিন বলেছিলেন, বাচ্চারা বোর হবে। অনেক যুক্তিতর্কের পর আহসান সাহেব রাজি হয়েছিলেন দেখে এখন খুবই ভালো লাগছে। ছেলেমেয়েদের খুশি তাকেও সংক্রমিত করছে।
ঠিক সাড়ে দশটায় ট্রেন নড়ে উঠল। সব কিছুতেই দেরি করা মিসরীয়দের প্রায় অলিখিত সংবিধান হলেও গাড়ি ছাড়ল রাইট টাইমে। মিনিট পাঁচেক পরেই সেকেন্ড নাইল ব্রিজে উঠল গাড়ি। বাবা বললেন, ‘বাচ্চারা, দক্ষিণে তাকাও।’
পুরো কায়রো আলোয়-আলোয় ঝলমল করছে। নীলের পানিতে প্রতিবিম্বিত সেই আলোর ঝরনা। সিক্সথ্-অক্টোবর ব্রিজে যেন আলোর মিছিল।
সাড়ে ১১টার মধ্যে ঘুমে বুজে এল সবার চোখ। মরুভূমির ঠাণ্ডা বাতাসে তলিয়ে গেল দ্বাদশীর চাঁদ আর সাহারার বিচিত্র বালিয়ারি।

আট.
সকাল সাড়ে ছটায় লুক্সরে এসে থামল ট্রেন। আজ লুক্সর ভ্রমণ শেষে কাল দুপুরে নাইল-ক্রুজে আসওয়ান যাওয়ার প্ল্যান। হোটেল না নিয়ে শিপেই এক রাত কাটাবেন আহসান-শিরিনরা।
ঘোড়ার গাড়ি চেপে ইস্টমার শিপের দিকে রওয়ানা হলো সবাই। লুক্সরে এখনো সূর্য ওঠেনি। শীতও বেশ। মায়ের চাদরের নিচ থেকে চোখ বের করে জানতে চায় অনিক, ‘বাবা, এটাই কি ফেরাউনের সেই প্রাচীন রাজধানী?’
‘হ্যাঁ, অনিক। বল তো লুক্সরের সবচেয়ে খ্যাতিমান ফারাওয়ের নাম কী?’
‘এহ্-এটা কোনো পাজল হলো? রামসেস টু’র নাম দুনিয়ার সবাই জানে। শক্ত কিছু ধরো।’
আহসান হেসে বললেন, ‘ওকে। লেটস্ ট্রাই। বলো তো, একজন ফারাও ছিলেন মহিলা। তার নাম কী?’
‘কী যেন তোমার কাছে শুনেছিলাম-হাতসি, হাতেসি, না না, হাতসুসতু।
‘হ্যাঁ, প্রায় ঠিক বলেছ। উচ্চারণটা হবে হাতসেবসুত। তিনিই মিসরের একমাত্র মহিলা যিনি আঠারো বছর রাজত্ব করেছেন। তারই রাজধানী এই লুক্সর। বুঝেছ, বেটা?’
অনিক জবাব দেবার আগেই এক্কা গাড়ি এসে দাঁড়াল জেটির কাছে। শিপ দেখে ভাই-বোন হতভম্ব। এ যে সেই সুয়েজ ক্যানেলে দেখা সেই ফুটবল খেলার মাঠ। ‘চার তলা শিপ?’ শ্রাবনীর মুখের ভাষা বিস্ময়ে আটকে যায়।
‘না মা, ছয় তলা। পানির নিচে আরো দুই তলা আছে।’
‘সুবহানাল্লাহ !’
সেকেন্ড ফ্লোরে পাশাপাশি দুটো রুম নিলেন আহসান সাহেব। একটাতে শ্রাবনী আর শিরিন, অন্যটাতে অনিককে নিয়ে তিনি থাকবেন। ওয়েল কাম ড্রিংকস সার্ভ করার পর আহসান সাহেব বললেন, ‘সবাই ঝটপট রেডি হয়ে নাও। নাস্তা খেয়েই আমরা বেরোবো।’
কফি শেষ করেই ট্যাক্সি হায়ার করতে চলে গেলেন বাবা। ফিরলেন হাসতে হাসতে।
‘কী ব্যাপার, হাসির কী হলো?’ শিরিন জানতে চান।
‘আমার সেই পুরানো গাইড আবদুল্লাহকে পাওয়া গেছে। আসছে সে। ছেলেমেয়েদের নিয়ে এনেছি শুনে খুবই খুশি।’

আট কিলো দক্ষিণের ব্রিজ পেরিয়ে ট্যাক্সি ছুটল ‘ভ্যালি অভ দ্য ডেড’-এ। এখানেই তিনটি পাহাড়ের নিচে ফারাওদের বিশাল সমাধিক্ষেত্র। কলোসি অব মেমনোনের দু’টি বিশাল মূর্তি দেখে অনিক-শ্রাবনী হতবাক। কমপক্ষে ৬০ ফুট উঁচু মূর্তি দু’টি যেন এলাকার পাহারাদার। আহসান সাহেব বললেন, ‘মূর্তি দু’টি সাড়ে তিন হাজার বছর আগের। এক সময় মূর্তিগুলো থেকে বাঁশির মতো শব্দ হতো। ধারণা করা হতো এটি মেমনোনের মায়ের কান্না।’
কয়েকটি পাহাড় ডিঙিয়ে ট্যাক্সি একটি মালভূমিতে পৌঁছে দাঁড়িয়ে পড়ল। ট্যাক্সির দরজা খুলতেই পাগড়িপরা আবদুল্লাহ এসে আহসান সাহেবকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। ‘আহলান আহলান, ইয়া হাবিব, ইয়া রইস, ইয়া সাইয়েদ। ওয়েলকাম টু লুক্সর এগেন। মামইয়া মা-মা-মা; হাউ সুইট চিলড্রেন ইউ হ্যাভ। নাইস টু মিট ইউ এগেন, মাদাম।’
অনিক-শ্রাবনীকে দুই কোলে তুলে নিয়ে টয় ট্রেনের দিকে হাঁটা ধরল আবদুল্লাহ। ‘ইয়া রইস, বি কুইক। আজ একটু ভিড় আছে।’
ডেড ভ্যালির ট্রয় ট্রেন মানে রেলবিহীন বগির সারি। মাটির নিচে সুরক্ষিত প্রতœতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলো যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সে জন্যই এ ব্যবস্থা।
প্যাসেঞ্জার ক্যারেজ বা ট্রয় ট্রেন মাইল তিনেক এগিয়ে সবাইকে নামিয়ে দিল একটা বিশাল ওপেন রেস্টুরেন্টে। এই স্পট থেকে সামনে ক্যামেরা আর পানি ছাড়া কিছু নেয়া যাবে না। ইজিপ্ট ট্যুরিজমের সারি সারি লাগেজ বক্সের একটাতে জিনিসপত্র রেখে চাবি নিয়ে এল আবদুল্লাহ। দুই বোতল পানি নিয়ে সাহারার আগুনে পা বাড়াল সবাই।

নয়.
আসওয়ানে থেকে শার্ম-আল-শেখে এসে একদিন বিশ্রাম নিয়ে সকাল দশটায় তাবা পৌঁছে আহসান ট্যাক্সিওয়ালাকে বললেন, ‘কিছু ফ্রুট নিয়ে এসো, ভাই।’
‘কী খাবেন?’
‘কী পাওয়া যাবে?’
‘কী পাওয়া যাবে না- তাই বলুন, ইয়া হাবিব।’
ড্রাইভার কিছু স্ট্রবেরি, আপেল আর সুইট মেলনের ফালি নিয়ে আসতেই অনিক খুব খুশি। মিষ্টি তরমুজের প্রতি ছেলের অনুরাগ ইতোমধ্যে আহসান-শিরিন বুঝে গেছেন।
সৈকত ঘেঁষে একটা বিচে বসল সবাই। বাইনোকুলার ধরে ধরে অনিক-শ্রাবনী জিজ্ঞাসা করছে ‘এটা কীÑঐটা কী’ আর শিরিন জবাব দিচ্ছেন। ‘ওটা জর্ডান। ঐ যে ক্রেন দেখছ- ওটা আকাবা বন্দর। ওই যে একেবারে উত্তরে ওয়্যারলেস টাওয়ার- ওটা আইলাত; ইসরাইলের নৌ-ঘাঁটি। আর এদিকে, ঐ যে ডানে, না না আরেকটু দক্ষিণে- হ্যাঁ হ্যাঁ- জাহাজ ভিড়ে আছে, ওটা আল হুমাইদা পোর্ট; সৌদি আরবের।’
‘তার মানে, মা- মিসরে বসেই আমরা আরো তিনটি দেশ দেখতে পাচ্ছি?’ প্রশ্ন করে শ্রাবনী।
‘হ্যাঁ বেটি। এ জায়গাটার ইতিহাসও ওরকম। দক্ষিণে অ্যাডজাস্ট করো। কী দেখতে পাচ্ছ?’
‘একটা পোর্ট, না না, পুরানো দুর্গ মনে হচ্ছে, মা।’
‘সত্যিই তাই। ওটার নাম ক্রুসেডারস ক্যাসেল। সম্রাট সালাউদ্দিন আইউবের অজেয় দুর্গ ওটা।’
‘এই সালাউদ্দিন কি সালাদিন দ্যা গ্রেট, মাম্মি?’ জানতে চায় অনিক।
‘হ্যাঁ, বাবা। ইনিই সেই দুর্ধর্ষ সেনাপতি- যার হাতে তিনশো বছর ধরে চলা মুসলিম-খ্রিষ্টান যুদ্ধের পরিসমাপ্তি ঘটে।’
‘এটা কখনকার ঘটনা, মা?’
‘এগারোশো বিরানব্বইয়ের, বেটি।’
‘সালাদিন কি মিসরীয় ছিলেন?’
‘না। তবে তিনি প্রায় দশ বছর মিসরের গভর্নর ছিলেন। ফেরার দিন সময় পেলে কায়রোতে আমরা তার অমর কীর্তি ‘সিটাডেল’ দেখব, ইনশাআল্লাহ্।’

দুপুরের লাঞ্চ শেষ করেই ট্যাক্সি ছুটল ফিরতি পথে। সন্ধ্যার আগেই সিনাইয়ের প্রাণকেন্দ্র-সেন্ট ক্যাথরিন গির্জায় পৌঁছাতে হবে। রাতে ওঠা হবে সিনাই পর্বতে। ভাবতেই অনিক-শ্রাবনীর গা শিহরিত। আড়াই হাজার মিটার উচ্চতার সেই পাহাড়ে তারা উঠবে- যেখানে হজরত মূসা নবী আল্লাহর প্রত্যাদেশ লাভ করেছিলেন।
যত বার আহসান-শিরিন ছেলে মেয়েদের ঘুম পাড়াবার চেষ্টা করেন, ততবারই তারা পিটপিট করে চায়। রাগ করে শেষে ছেলের পিঠে চাপড় মেরে বললেন মা, ‘ওঠ তাহলে। উঠে দেখ, বালু আর পাহাড় কত সুন্দর হয়।’
সন্ধ্যার আগেই সেন্ট ক্যাথরিনে পৌঁছে গেল ট্যাক্সি। গির্জার লাগোয়া বিশ্রামখানায় একটা বড় রুম ভাড়া নিলেন আহসান সাহেব। তাড়াতাড়ি খেয়ে দেয়ে ঘুমিয়ে পড়ল সবাই।
রাত দুটোয় অনিক-শ্রাবনীকে ডেকে তুললেন মা।
‘পাহাড়ে এসে গেছি, মা?’ চোখ ডলতে ডলতে জানতে চায় শ্রাবনী।
‘কোন্ পাহাড়, আপু? মূসার পাহাড়?’ বোনের সাথে কণ্ঠ মেলায় অনিক।
মা-বাবা হেসে বলেন, ‘চলো-চলো, মুখ-হাত ধুয়ে নাও। জ্যাকেট আর মাফলার পর। এক্ষুণি উট এসে যাবে।’
‘উট কেন, বাবা?’
‘উটের পিঠেই উঠতে হবে আসল চড়াই। নইলে তোমরক্লান্ত হয়ে পড়বে।’
‘তোমার অনেক টাকা খরচ হবে; তাই না, বাবা?’ শ্রাবনীর কণ্ঠে কোমল জিজ্ঞাসা।
আহসান সাহেব মুখ ঘুরিয়ে নিলেন। তার মনে পড়ে গেল নিজের মায়ের কথা। মা-ও ছিলেন এমনি মমতাময়; এমনি হৃদয়বতী। মেয়েটা হয়েছে তার দাদির মতো।

‘বাবা, উট অন্ধকারে দেখছে কিভাবে? আমি তো কিছুই দেখতে পাচ্ছি না।’ মায়ের উট থেকে জানতে চায় অনিক।
‘উটের স্মৃতিশক্তি ক্যামেরার মতো।’
‘মানে ফোটোগ্রাফিক?’
‘ঠিক বলেছ, মা-মণি।’
‘তার মানে সে যে-পথ চেনে, সে পথ চোখ বুজেও চলতে পারে, তাই না, আপু?’
‘হ্যাঁ ভাইয়া। উপরে তাকিয়ে দেখ, অনিক- তারাগুলো কত কাছে নেমে এসেছে। মনে হচ্ছে হাত দিয়েই ধরা যাবে।’
‘কিন্তু ঘুরছে কেন ওগুলো?’
‘ওরা ঘুরছে না রে ভাই, আমরা ঘুরছি। মানে উটগুলো। তাই না, বাবা?’
‘ঠিক।’
প্রায় দুই ঘণ্টা পর উট থেকে নামল সবাই। অনিক বাবাকে জড়িয়ে ধরে বলল, ‘আমার খুব শীত করছে।’
‘এখুনি কমে যাবে, বাবা। চলো তোমাদের কফি খাওয়াই।’
কফি খাবার পর হাঁটা শুরু হলো।
আধা ঘণ্টা উঠে আহসান সাহেব দশ মিনিট বিশ্রাম নিতে বললেন সবাইকে।
আবার বিশ মিনিট পথ চলে দশ মিনিট বিশ্রাম।
সূর্য ওঠার আধ ঘণ্টা আগে চূড়ার প্রায় কাছাকাছি পৌঁছে শ্রাবনী বলল, ‘বাবা- আমার পা ব্যথা করছে।’
আহসান সাহেব আবারও থেমে সবাইকে পানি খেতে দিলেন।

‘এখানেই কি হজরত মূসা উঠে ধ্যানমগ্ন হতেন, বাবা?’ নামার পথে মূসার-গেটে দাঁড়িয়ে জানতে চায় শ্রাবনী।
‘সম্ভবত। প্রায় চার হাজার বছর আগের কাহিনী তো একশো ভাগ মিলিয়ে বলা সম্ভব নয়, মা। তবে- আরব এবং বেদুইনরা খুব স্মৃতিসচেতন জাতি। তারা যখন মেনে নিয়েছে এটাকে মূসার-গেট বলে, হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।’
ওপর দিয়ে তাকিয়ে শ্রাবনীর গা কাঁপতে শুরু করল। সময় মতো আহসান সাহেব ধরে না ফেললে হয়ত পড়েই যেত। ‘আস্তে আস্তে, মা। একটু বসো। পানি খাও। তারপর চলো।’
কয়েকটি পপলার তেঁতুল আর তারফা গাছের পাশে একটা কুয়া- লোহার গেট দিয়ে আটকানো। কূপের নাম মূসার কুয়া। কারো মতে, ইলিয়াসের কুয়া। ‘পাহাড় থেকে নেমে এসে হজরত মূসা এখানেই বিশ্রাম নিতেন।’ বাচ্চাদের উদ্দেশে বললেন শিরিন।
‘ঐ অদ্দূর থেকে?’ উপরে তাকিয়ে আবারো গা কেঁপে উঠল শ্রাবনীর। ‘এটা কি সম্ভব, বাবা?’
‘সম্ভব, শ্রাবনী। এ জন্যই তো এরা মানুষের মধ্যে শ্রেষ্ঠতম।’

দশ.
ইজিপশিয়ান মিউজিয়ামে দেখতে তেমন বিরাট কিছু নয়। তাহরির স্কয়ারের পাশে দুইতলা ছোট্ট একটি বিল্ডিং মাত্র। নিচ তলায় এক এক ঘরে এক-এক ডাইনাস্টির নিদর্শন। ওল্ড, মিডল আর নিউ কিংডম মিলে মোট ৩১টি ডাইনাস্টি। দোতলার একদিকে তুত চেম্বার; অন্য দিকে মমি চেম্বার। মমি চেম্বারে ঢুকতে আবার আলাদা চার্জ। তুত চেম্বারে আছে সম্রাট তুতেনখামুনের সব কিছু। এই একটি মাত্র রাজকীয় কফিনই অক্ষত উদ্ধার করেছিলেন ব্রিটিশ খননকারী হাওয়ার্ড কার্টার।
শিরিন বললেন, ‘চলো, আগে তোমাদের একটা চেয়ার দেখাই; সোনার চেয়ার। সেই চেয়ারে অন্তত ১০ জন ফেরাউন বসেছেন।’
‘কোথায় কোথায়? চলো, মাম্মি- আগে সোনার চেয়ারটা দেখি।’
শিরিন কায়দা করে ভাই-বোনের ঝগড়া থামালেন দেখে হেসে বললেন আহসান, ‘চলো, আমিও যাই।’
সোনার সিংহাসনের সামনেই তুত চেম্বার। সবচেয়ে বেশি লোকের ভিড় সেখানে। কখন যে অনিক-শ্রাবনী লাইনে ঢুকে গেছে- নিজেরাই টের পায়নি। লেজার রশ্মির নিচে যেতেই কম্পিউটার বলে উঠল- ‘ওয়েলকাম। ইউ আর সেভেন হান্ড্রেড থার্টি থ্রি। …ইউ আর থার্টি ফোর। …ইউ আর।’
অনিক অবাক হয়ে বলল, ‘ভেরি স্ট্রেঞ্জ, বাবা। চেম্বারটা কি কম্পিউটারাইজড?’
‘তাই তো মনে হচ্ছে, বেটা। আগে চলো।’
সোনার-মুখোশের সামনে এত ভিড় যে যাওয়াই যাচ্ছে না। গেলেও বাচ্চারা দেখতে পাবে না দেখে বাবা-মা দু’জনকেই কোলে তুলে নিলেন। প্রতি মুহূর্তেই শত শত ফ্ল্যাস জ্বলছে। এখানে ছবি তুলতে মানা নেই।

প্রায় এক ঘণ্টা পরে মূল মমি চেম্বারে ঢোকার জন্য লাইনে দাঁড়াতে হলো। লাগেজ কাউন্টারে ক্যামেরা, ব্যাগ, মেটালিকস সব জমা রেখে এক্স-রে গেট পার হতে হলো।
মমি চেম্বারটা আধো অন্ধকার। ঠাণ্ডা এবং নিঃশব্দ। দর্শকেরাও সিনেমা হলের মতো অপলকে তাকিয়ে দেখছেন তিন থেকে চার হাজার বছরের পুরনো মহা-প্রতাপশালী ফারাওদেরকে।
‘সবার বুক খোলা কেন? বাবা?’
‘বাক্সগুলো ভ্যাকুয়াম-বক্স। যেটুকু খোলা হয়েছে, তাতেই ভয় পাচ্ছেন মিসর সরকার- মমিগুলোর কোনো ক্ষতি হয় কিনা!’
‘কালো কাপড়গুলোই কি বিটুমিন মাখা? মানে মামিয়া?’
‘বেশির ভাগ গবেষকই তাই ধারণা করেন। তবে কেউ কেউ মনে করেন- ওই কালো কাপড় শুধু বিটুমিন মাখা নয়। বরং অজানা কোনো ওষুধ ওতে ছিল- যা মানুষের দেহকোষকে চিরজীবী করেছে। কিন্তু এর সঠিক পরিচয় আজো আবিষ্কৃত হয়নি, মা। তবুও বিটুমিনের নামেই মমি খ্যাতি পেয়েছে।’
‘নবী মুসার সাথে কার দ্বন্দ্ব হয়েছিল?’
‘ঠিক করে কেউ বলতে পারে না। টেন কমান্ডমেন্টস ছবির কথা মনে আছে না, শ্রাবনী?’
‘হ্যাঁ।’
‘সেখানে ফেরাউন কে ছিলেন?’
‘রামেসিস।’
‘তার নামই বেশি শোনো যায়। তবে অনেক গবেষকই এটা মানেন না। তারা বলেন, মূসা প্রতিপালিত হয়েছিলেন তার ঘরে। রামেসিসের ভাতিজা মারনেপতার সাথেই দ্বন্দ্ব হয়েছিল তার। কেউ কেউ বলেন- এদের কেউ নন, সংঘর্ষ হয়েছিল শেঠি-টু’র সাথে।’
‘ইজিপ্টোলজিস্টরা বিষয়টি মীমাংসা করতে পারেননি, তাই না?’
‘না।’
‘কিন্তু এদের কারো চেহারা বদলায়নি কেন, বাবা?’
‘এটাই রহস্য, মা। মমির টেকনিক আজো বিজ্ঞানীরা বের করতে পারেনি। এ জন্যই তো একে পৃথিবীর সবচেয়ে বড়ো আশ্চর্য ধরা হয়। পিরামিডের মতো।’
‘আমার কেমন ভয় ভয় লাগছে, ড্যাড।’ বলল অনিক, ‘মনে হচ্ছে মাম্মি-রিটার্নসের মতো এরাও জেগে উঠবে।’
‘আরে ছেলে- এটা তো সিনেমা নয়; বাস্তব। ভালো করে দেখে নাও। পৃথিবীর বেশির ভাগ মানুষই এ দৃষ্টান্ত দেখার সুযোগ পায় না।’
‘দৃষ্টান্ত কী, বাবা? এক্সাম্পল?’
‘হ্যাঁ, অনিক। মানুষের অহঙ্কার ও পতনের সবচেয়ে বড়ো এক্সাম্পল এই ফেরাউনের মমি। বিজ্ঞানেরও।’

টিকেট কেটে লাইনে দাঁড়াতে হলো সবাইকে। দীর্ঘ লাইন। প্রায় পঁচিশ মিনিট পর লিফটে পা রাখা গেল। ছ’শো চৌদ্দ ফুট উঁচু এই টাওয়ার পিরামিডের থেকেও অনেকখানি উঁচু। লিফট যত উপরে উঠছে, ততই ক্ষুদ্র দেখাচ্ছে দালান-কোঠা; আর বড়ো হচ্ছে কায়রো। শেষ পর্যন্ত দক্ষিণ দিকে জেগে উঠল পিরামিডের তিনটি চূড়া। এতবার দেখার পরও শিরিন চমকিত না হয়ে পারলেন না।
লিফটের দরজা খুলে গেল। সিঁড়ি ভেঙে ভিউ গ্যালারিতে ঢুকল সবাই। ওয়েট্রেস হাতে ধরিয়ে দিল একটা করে ড্রিংকস আর চকোলেট। খাওয়া শেষ হলেই নেমে যেতে হবে।
শ্রাবনীর মনে হলো, জায়গাটা বেহেশতের খুব কাছাকাছি। দুনিয়ার খুদে খুদে মানুষ কী করছে না করছেÑ সব দেখার জায়গা এটি। বাবা বললেন, ‘ঐ যে দূরের বিল্ডিংগুলো দেখছ- পিরামিড সোজা পূর্ব পাড়ে- ওটা হলো হেলওয়ান। ওখান থেকেই কায়রোর শুরু। মাঝে যে বিশাল গির্জা দেখছ- ওটা আল-ফুসতাত। বলা হয়, ওখান থেকেই শিশু মূসাকে নদীতে ভাসিয়েছিলেন তার মা। আর উল্টোদিকে, উত্তরে, যে তিনটি চিমনি দেখছ- ওটা হলো শুব্রা। কায়রোর শেষ।’
‘আচ্ছা বাবা, তুমি একটা কবিতা প্রায়ই আবৃত্তি করো না, হজরত মূসা (আ)কে নিয়ে? শোনাও না এখন।’ দাবি জানায় শ্রাবনী।
‘আমিও শুনতে চাই।’ গলা মেলাল অনিক।
‘আমিও।’ বলল শিরিন।
আহসান লজ্জায় পড়ে যান। তারপরও আস্তে উচ্চারণ করেনÑ
শুনিয়াছি- ছিল মমির মিসরে, সম্রাট ফেরাউন
জননীর কোলে, সদ্যপ্রসূত বাচ্চার নিত খুন।
শুনেছিল বাণী, তাহারি রাজ্যে তার-ই রাজপথ দিয়া
অনাগত শিশু আসিছে তাহারি মৃত্যু-বারতা নিয়া;
জন্মিল মূসা, রাজভয়ে মাতা, মূসারে ভাসায় জলে-
ভাসিয়া ভাসিয়া সোনার শিশুগো রাজারই ঘাটেতে চলে!
রসিক খোদার খেলাÑ
তারি বেদনায় প্রকাশে রুদ্র যারে করে অবহেলা।
কবিতা শেষ হবার আগেই ভিউ রেস্তোরাঁ ঘুরে ঘুরে লিফটের সিঁড়ির কাছে পৌঁছে গেল। সবাইকে নিয়ে নিচে নামলেন আহসান-শিরিন।
‘কবিতাটি নিশ্চয়ই নজরুলের, তাই না, বাবা? তোমার তো মাস্টার উনি।’
‘শুধু আমার নয়, মা- প্রতিটি বাংলাভাষীর শিক্ষক তিনি।’
‘কবিতাটির নাম কী, বাবা?’
‘চিরঞ্জীব জগলুল।’

আল আজহার, সিক্সথ অক্টোবর ব্রিজ, বাংলাদেশ অ্যাম্বাসি, আমর-ইবনুল আস মসজিদ এবং নাসের সিটি ঘুরে ট্যাক্সি পৌঁছল আল-মাতারিয়ায়। এখানে একটি জয়তুন গাছ আছে দু’হাজার বছরের পুরনো। জীবিত। হজরত মরিয়ম যখন শিশু ঈসাকে বাঁচাবার জন্য কায়রো পালিয়ে এসেছিলেন, তখন তিনি এখানেই ছিলেন। যে গাছের ওপর শিশু-নবী খেলা করতেন- গাছটির সামনে যেয়ে সবাই অবাক। মসলিনের মতো কাপড় দিয়ে রোদের উত্তাপ থেকে বাঁচাবার চেষ্টা করা হচ্ছে গাছটিকে। কী আশ্চর্য!
আহসান আর শিরিন দাঁড়িয়েই মুনাজাত করলেন- ‘হে খোদা! তোমার সৃষ্টির বিপুল সার্থকতা ও উত্তীর্ণতা দেখার তৌফিক দেয়ায় কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি তোমাকে। ইবরাহিম, মূসা, ঈসা, সালেহ্, ইয়াকুব ও ইউসুফের স্মৃতি বিজড়িত এ দেশ থেকে তুমি আমাদেরকে সহনশীল হতে শিক্ষা দাও। ধৈর্য ধরার শিক্ষা দাও। আমরা বাংলাদেশের হিন্দু-খ্রিষ্টান-বৌদ্ধ-উপজাতি আর মুসলমানরা যেন ভাই-ভাইয়ের মতো বেঁচে থাকি। খোদা, আমাদের অন্তর থেকে দূর করে দাও ঘৃণা, বিদ্বেষ, পরশ্রীকাতরতা আর লোভ। মানুষের প্রেমে আমাদের অন্তরকে তুমি আলোকিত করো; উজ্জ্বল করো…।’
‘আমিন, ছুম্মা আমিন’- বলে অনিক আর শ্রাবনীও বাবা-মার সাথে মুনাজাত শেষ করল।

সকাল পাঁচটায় অদ্ভুত শব্দে ঘুম ভেঙে গেল শ্রাবনীর। ‘মা-মা, বৃষ্টি। কী মজা, কায়রোতে বৃষ্টি!’
‘হ্যাঁ, বারান্দায় এসে দেখ। আরো ভালো লাগবে।’
শ্রাবনী-অনিক দু’জনেই ছুটে গেল বারান্দায়। মসজিদ থেকে ফিরে আসা মুসল্লিরা হাসতে হাসতে ভিজছে।
ফুল-তামিয়া আর কফি খেয়ে ট্যাক্সিতে উঠে আহসান সাহেব ড্রাইভারকে বললেন, ‘মোয়াত্তাম যান, সাইয়েদ।’
‘শুকরান, ইয়া হাবিব। খুুশি হলাম শুনে।’
‘মোয়াত্তাম কেন?’ জানতে চেয়েই শিরিন হেসে উঠলেন, ‘ও-বুঝেছি। ওকে, চলো- নো প্রোব্লেম। প্লেন তো সেই সাড়ে নটায়।’
মিসরের সবচেয়ে উঁচু পাহাড় এই মোয়াত্তাম। মিসর বিজয়ী সাহাবী আমর-ইবনুল আসের কবর আছে এই পাহাড়ের কোনো এক গোপন জায়গায়। উল্টোদিকে, সুলতান সালাদিন আইউবের অপরাজেয় দুর্গ- ‘সিটাডেল’। মিসরীয় বিমান বাহিনীর সদর দফতর, কায়রো ডেমোগ্রাফিক সেন্টার, ক্রিস্টিয়ান নেক্রোপালিস… সব এই মোয়াত্তামে।
পাহাড়ি সর্পিল পথ ঘুরে নাইনথ স্ট্রিটে পড়েই ট্যাক্সি বাঁক নিল। একটি মসজিদ, দুটো ডিস্কো ক্লাব আর একটি গির্জা পার হয়ে আসতেই পুরো কায়রো যেন লাফ দিয়ে উঠল চোখের সামনে।
‘ইয়াল্লাহ! মারহাব-মারহাব। ইয়া সাইয়েদ নেমে আসুন।’ ড্রাইভার এমনভাবে অনিক-শ্রাবনীকে কোলে তুলে নামিয়ে দিলো। শ্রাবনী জিজ্ঞাসু চোখে মা’র দিকে তাকাতেই শিরিন বললেন, ‘দেখ, উনি কি দেখান।’
‘আহরাম- আল আহরাম। লুক চিল্ড্রেন- লুক।’
অনিক-শ্রাবনীর মুখে আর কথা জোগাল না। বৃষ্টি হওয়ায় কায়রোর আকাশ আয়নার মতো স্বচ্ছ হয়ে গেছে। ত্রিভুজের মতো তিনটে পিরামিড এত স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, মনে হচ্ছে হাত বাড়ালেই ছোঁয়া যাবে। যদিও গিজা এখান থেকে চল্লিশ কিলোমিটার দূরে !
শ্রাবনী ছুটে আহসান সাহেবের কাছে গেল। দু’হাতে বাপের মাথা নামিয়ে কপালে চুমু খেয়ে বলল, ‘আই অ্যাম রিয়েলি রিয়েলি হ্যাপি, ড্যাড। তোমার এই জাদু-প্রদর্শনী চিরকাল মনে রাখব, মাই সুইট পাপা।’
‘থ্যাংকিউ, শ্রাবনী। নাউ লেটস মুভ। নো টাইম।’
ট্যাক্সি ঘুরে যাবার শেষ মুহূর্তে দুই ভাই-বোন হাত নেড়ে বলল, ‘বাই-বাই পিরামিডস।’
হেসে ছেলে-মেয়ের মাথার চুল এলোমেলো করে দিলেন শিরিন।

SHARE

Leave a Reply