Home স্বাস্থ্য কথা ঈদের দিনের খাওয়া-দাওয়া

ঈদের দিনের খাওয়া-দাওয়া

সোহেল আজিজ

একমাস সিয়াম পালনের পর ঈদ আসে আনন্দ ও খুশির বার্তা নিয়ে। ৩০ দিনের রোজার পর এদিন মানুষ খাবারের ব্যাপারে বেশ স্বাধীনতা অনুভব করে। কারণ, রোজার বিধিনিষেধ থেকে এদিন মুক্ত হয়। উৎসবের শুরুটাই হয় সুস্বাদু মিষ্টিজাতীয় খাবার দিয়ে। তারপর বিরতিহীনভাবে মধ্যরাত পর্যন্ত চলে অতি সুস্বাদু বিভিন্ন ধরনের উচ্চ ক্যালরি ও অতিরিক্ত মসলাযুক্ত গুরুপাক খাবার দিয়ে। রোজার সময় মানুষের খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাপন প্রণালিতে অনেকখানি পরিবর্তন আসে। মানুষ সেটাতেই অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। এর পরই হঠাৎ এক দিনে অতিভোজনের ফলে পাকস্থলীর ওপর বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। কারণ, অধিক চাপে পাকস্থলীর এনজাইম ঠিকমতো কাজ করতে পারে না। ফলে পেটে ব্যথা, গ্যাসট্রাইটিস, ডায়রিয়া, মাথাধরা, বমি ইত্যাদি হতে দেখা যায়। এ ছাড়া দীর্ঘস্থায়ীরূপে দেখা দেয় আইবিএস বা ইরিটেবল বা ওয়েল সিনড্রোম। এ জন্য খেতে হবে নিজ নিজ শরীরের অবস্থা বিবেচনা করে।
ঈদের দিন অনেকের কোনো কাজ থাকে না। সকাল বেলা গোসল সেরে, নতুন জামা-কাপড় পরে ঈদের নামাজ আদায় করে আসার পর কাজ হলো মজাদার সব খাবার খাওয়া, আত্মীয়-স্বজন পাড়া-প্রতিবেশীর বাড়িতে বেড়াতে যাওয়া এবং সম্ভব হলে পার্ক, শিশু পার্ক, চিড়িয়াখানা, উদ্যান ইত্যাদির মতো খোলা জায়গায় ঘুরে আসা। তবে ঈদের দিন একটি বিষয়ে সাবধান বা সতর্ক না হলে কিন্তু নিরানন্দের মতো কিছু ঘটে যেতে পারে। বিষয়টি হলো খাওয়া-দাওয়া। আমাদের পেট গাড়ির ইঞ্জিনের মতোই। এরও একটা ধারণ ক্ষমতা আছে। ধারণ ক্ষমতার চেয়ে বেশি খাবার খেলে বা উল্টা-পাল্টা খাবার খেলে সে বিগড়ে যাবে এবং আবার ঠিক হতে সময় নেবে। ততক্ষণে আমরা অস্বস্তিবোধ করবো, মন থেকে আনন্দভাবটা পালিয়ে যাবে এবং সেখানে জায়গা করে নেবে নানা দুঃখ-কষ্ট ও নিরানন্দ। সেক্ষেত্রে শুধু অসুস্থ ব্যক্তিই নয় গোটা পরিবার দুর্ভোগ পোহাবে।
ঈদের সময় শারীরিকভাবে সুস্থ না থাকলে সব আনন্দই মাটি হয়ে যাবে। কেননা কথায় আছে ‘সুস্থ দেহে সুস্থ মন’। খাবার গ্রহণের ব্যাপারে সংযমের মাস রমজানের পরেই আসে ঈদ। ঈদের দিনে আমরা নানা রকম খাবার খাই। অনেক সময় আমরা খেয়াল করি না কোন্ খাবারের পর কোন্ খাবার খাচ্ছি। অর্থাৎ আমরা নানা রকমের খাবার একই সময়ে খাই। আবার শুধু নিজেদের বাসায় নয়, আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধবের বাসায় বেড়াতে গিয়েও খাই। অনেক সময় এরকম অনিয়ন্ত্রিত খাওয়ার ফলে বদহজম বা পেটের সমস্যা দেখা দেয়। তাই এ ব্যাপারে সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
ঈদের আনন্দে সব খাবারই আমাদের খেতে ইচ্ছা করবে এটাই স্বাভাবিক। তবে পরিমাণে কম খেতে হবে। আর তেলচর্বিযুক্ত খাবারের ব্যাপারে সাবধান। ঈদের পরে ছুটি থাকার সুযোগে আমরা বেশ কয়েকদিন দাওয়াতে যাই। সেখানেও প্রচুর খাওয়া হয়। লক্ষ রাখতে হবে যে, তেল মশলাযুক্ত খাবার গ্রহণের সাথে সাথেই যেন দুধজাতীয় খাবার, মিষ্টি আমরা বেশি না খেয়ে ফেলি। আরেকটি কথা, ঈদের সময় মা-বাবারা খাদ্য তালিকায় প্রচুর তেল, চর্বি, মশলার সমন্বয়ে তৈরি খাবারের পাশাপাশি যেন কিছু হালকা ধরনের স্বাস্থ্যসম্মত খাবারও রাখেন। যেমন নানা রকম ফলের তৈরি ফ্রুট সালাদ, কাস্টার্ড, হাড়ছাড়া মুরগির গোশত ও নানা রকম সবজি রান্না। কেননা প্রচলিত রান্নার পাশাপাশি স্বাস্থ্যসম্মত সহজপাচ্য খাবার থাকলে এক দিকে যেমন রুচি বদলিয়ে খাওয়া যায়, অন্য দিকে তেমনি পরিবারের কেউ অসুস্থ থাকলে সেও স্বাচ্ছন্দ্যে খেয়ে সুস্থ থাকতে পারবে।
ঈদের দিন সকাল বেলা সব বাড়িতেই মিষ্টি খাওয়ার রেওয়াজ রয়েছে। অতিথি এলে প্রথমেই মিষ্টি দেয়া হয়। আমরা নিজেরাও বিভিন্ন ধরনের মিষ্টি খাবার মুখে দিয়ে ঈদের দিনটি শুরু করি। সত্যিকার অর্থে ঈদের দিনে মিষ্টি খাওয়ার এই রেওয়াজ যতদূর সম্ভব সীমিত রাখাই ভালো। যাদের ডায়াবেটিস আছে, ওজন বেশি কিংবা ওজন বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে তাদের মিষ্টি না খাওয়াই ভালো। ঈদের দিনে অনেক খাবারে বাড়তি চিনি মিশানো হয়। এটা উচিত নয়। বাড়তি চিনি ক্যালরি বাড়ায়। স্বাস্থ্যের জন্যে এটা মঙ্গলজনক নয়। তবে মিষ্টির বিকল্প হিসেবে দই খাওয়া যেতে পারে। দইয়ে থাকে উপকারী ব্যাকটেরিয়া, কম চিনি ও কম ক্যালরি।
প্রত্যেক মানুষের রক্তে নির্দিষ্ট মাত্রায় চর্বি থাকে। এই চর্বির পরিমাণ বেড়ে গেলে তা স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। রক্তে অতিরিক্ত মাত্রার চর্বি করোনারি হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। রক্তে বা শরীরের চর্বি কমানোর সহজ উপায় হলো গরু ও খাসির গোশত কম খাওয়া। যাদের গরু বা খাসির গোশত খাওয়া নিষেধ তারা ঈদের দিনে মুরগির গোশত খেতে পারো। তবে মুরগির গোশত চামড়া ছাড়া রান্না হতে হবে। কারণ একটা মুরগিতে যে পরিমাণ চর্বি থাকে তার অর্ধেকটাই থাকে চামড়ায়। ঈদের দিনে সালাদ খাওয়ায় কার্পণ্য করবে না। বরং অন্য খাবার কমিয়ে দিয়ে সালাদ খেয়ে পেটটা ভরে তোলার চেষ্টা করবে। সালাদ হিসেবে গাজর, টমেটো, শসা ও লেটুস অনন্য। গাজর ও লেটুসে রয়েছে প্রচুর বিটা ক্যারোটিন যা থেকে ভিটামিন-এ তৈরি হয়। টমেটোতে রয়েছে লাইকোপেন নামক এন্টিঅক্সিডেন্ট অর্থাৎ ক্যান্সার নিরোধক। আর সালাদ খাবে সব সময় টাটকা অবস্থায়।
ঈদে পোলাও বা বিরিয়ানির পরিবর্তে খিচুড়ি খাওয়া ভালো। কেননা খিচুড়ি অনেক বেশি স্বাস্থ্যসম্মত। তাছাড়া খিচুড়ি একটি আদর্শ খাবার এবং যে কোনো অনুষ্ঠানে পরিবেশনযোগ্য। দীর্ঘ একমাস রোজা পালনের পর ঈদের দিনে হঠাৎ করে উল্টাপাল্টা খাবার খেলে পেট ফাঁপতে পারে। তাই সৌজন্য রক্ষার খাতিরে এক সাথে অনেক বাড়িতে দাওয়াত খাওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। খাদ্যে ঝাল যাতে বেশি না হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। গোশত খাওয়ার পর দুধ জাতীয় খাবার না খাওয়া ভালো। যাদের দুধ সহ্য হয় না, তারা দুধ জাতীয় খাবার পরিহার করবে। পোলাও বা বিরিয়ানি না খেয়ে পোলাও চালের সাদা ভাত খেতে পারো।
কখনো পুরোপুরি পেট ভরে খাবে না কিংবা অতিরিক্ত খাবে না। কেননা আমাদের প্রিয়নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,  “তোমরা তোমাদের পেটকে তিন ভাগে ভাগ করে নাও। এক ভাগ খাবার দিয়ে এবং এক ভাগ পানি দিয়ে পূর্ণ কর। আরেক ভাগ সর্বশক্তিমান আল্লাহর ইবাদতের জন্য রেখে দাও।”
আরেকটি প্রয়োজনীয় কথা হলো, খাবারের পরিমাণের উপর নিয়ন্ত্রণ রাখাটা সবার জন্যই জরুরি। পেট পুরে খাওয়া মানসিক তৃপ্তি দিতে পারে বটে কিন্তু শরীরের জন্য ভয়ানক ক্ষতিকর। একবারে না খেয়ে বারে বারে কম পরিমাণে খাওয়া ভালো। সকালের নাশতা একটু বেশি হলেও দুপুরের খাবার হবে হালকা। রাতের খাবার মশলাদার না হওয়াই ভালো। আর রাতের খাবার খাওয়া উচিত তাড়াতাড়ি। সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা থেকে রাত আটটার মধ্যে খেতে পারলে খুব ভালো হয়। রাতে খাওয়ার অন্তত দু’ঘণ্টা পর শুতে যাওয়া উচিত, তাতে হজম ভালো হয়।

SHARE

Leave a Reply