Home স্মরণ বাংলার বুলবুল গায়ক আব্বাস উদ্দীন আহমদ

বাংলার বুলবুল গায়ক আব্বাস উদ্দীন আহমদ

ড. মুহাম্মাদ নূরুল ইসলাম
বাংলার বুলবুল গায়ক অমর সঙ্গীতশিল্পী আব্বাস উদ্দীন আহমদের নাম শোনেনি এমন মানুষ খুব কমই আছে। এ নামটির সাথে তোমরাও পরিচিত এটি আমার দৃঢ় বিশ্বাস। আব্বাস উদ্দীন আহমদ (১৯০১-১৯৫৯) বাংলা সঙ্গীতের এক কালজয়ী পুরুষ। এক এক শতাব্দীতে এমন এক একটি প্রতিভা জন্মায়, যাদের নিকট সবাই নতি স্বীকার করে। আব্বাস উদ্দীন আহমদ ছিলেন সেই শতাব্দীর প্রতিভা। অদ্ভুত সুন্দর-সুমধুর কণ্ঠস্বর, একবার শুনেই যিনি গানকে নিজের আয়ত্বে নিয়ে আসতে পারতেন, কেবল নিজের সাধনা বলেই যিনি নিখুঁতভাবে গান গাওয়া শেখেন সেই মর্মস্পর্শী দিগি¦জয়ী শিল্পী আব্বাস উদ্দীন আহমদ। ত্রিভূবনের প্রিয় মুহাম্মদ, তোরা দেখে যা আমিনা মায়ের কোলে অথবা ওকি গাড়িয়াল ভাই, আমার গহিন গাঙের নাইয়া… ইত্যাদি গান গেয়ে যিনি সমগ্র বাংলা মাতোয়ারা করেছিলেন, তিনিই শিল্পী আব্বাস উদ্দীন আহমদ।
এখন পশ্চিম বাংলার ভেতর, আগে যেটা ছিল করদ মিত্র রাজ্য, সেই কুচবিহারের তুফানগঞ্জ মহকুমার বলরামপুর গ্রামে ১৯০১ সালের ২৭ অক্টোবর পাসকৃত শিল্পী আব্বাস উদ্দীন আহমদের জন্ম এবং ১৯৫৯ সালের ৩০ ডিসেম্বর ঢাকার পুরানা পল্টনে তার ইন্তেকাল। পিতার নাম জাফর আলী আহমদ এবং মায়ের না বেগম লুৎফন নেসা। পিতা পেশায় ছিলেন আইনজীবি।
আব্বাস উদ্দীনের শিক্ষাজীবন শুরু হয় গ্রামের এক প্রাইমারি স্কুলে। যেমন ছিল তার গানের গলা, তেমনি পড়াশোনাতেও গভীর মনোযোগ। খুব ভালো ছাত্র ছিলেন তিনি। তুফানগঞ্জ হাইস্কুল থেকে আব্বাস উদ্দীন ম্যাট্রিক পাস করেন। এরপর ভর্তি হন রাজশাহী কলেজে। কিন্তু এখানে বেশিদিন থাকা হয়নি। তার মন এবং স্বাস্থ্য কোনোটাই ভালো যাচ্ছিল না। তাই তিনি রাজশাহী কলেজ ছেড়ে এসে ভর্তি হলেন কাছের শহর কুচবিহার কলেজে। এরপর তিনি কোলকাতায় চলে আসেন। আব্বাস উদ্দীনই সর্বপ্রথম তার এই মুসলিম নামটি নিয়ে বিশ শতকের দ্বিতীয় দশকে আত্মপ্রকাশ করেন আধুনিক গানের শিল্পী হেসেবে। তার প্রথম রেকর্ডের গান ‘কোন বিরহীর নয়ন জলে বাদল মরে গো’ ও অপর পিঠে ‘স্মরণ পায়ের ওগো প্রিয়’ বাজারে বের হবার পর পরই সাড়া পড়ে যায়। কুচবিহারে বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গে আব্বাস উদ্দীনের প্রথম পরিচয় ঘটে। কোলকাতায় এসে সে পরিচয় আরো ঘনিষ্ঠ হয়। নজরুলও খুব স্নেহ করতেন আব্বাস উদ্দীনকে। কবি সকলের কাছে আব্বাস উদ্দীনকে পরিচয় দিতেন ‘আমার ছোট ভাই’ বলে। আব্বাস উদ্দীন নজরুলেরও অনেকগুলো গান এরই মধ্যে রেকর্ড করে ফেলেছেন। তাই তাদের সম্পর্ক আরো ঘনিষ্ঠ হয়েছে।
আব্বাস উদ্দীন যে সময় গান শুরু করেন সময়টা ছিল বাংলার মুসলমান সমাজের নবজাগরণের কাল। তাকে রেনেসাঁ বলা হয়ে থাকে। বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম এবং অন্যান্য মুসলমান কবি-সাহিত্যিকরা তাদের রচনা দিয়ে মুসলিম চেতনাকে জাগিয়ে তুলেছিলেন। আব্বাস উদ্দীন নবজাগরণের শিল্পী। প্রায় বিশ বছর তিনি বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের সাহচর্যে ছিলেন। আগে বাংলায় ইসলামী গানের তেমন প্রচলন ছিল না। আব্বাস উদ্দীনই একদিন নজরুলকে ইসলামী গান লেখার জন্য প্রথম প্রস্তাব দিয়ে বললেন, উর্দুতে ইসলামী গজল ও কাওয়ালী বাজারে খুবই জনপ্রিয়। আব্বাস উদ্দীনের মনে হলো এ ধরনের গান যদি বাংলায় লেখা হয়, তাহলে তাও বাংলাভাষীদের কাছে অবশ্যই প্রিয় হবে। অমন ভালো ইসলামী গান লেখার ক্ষমতা কবি নজরুলের অবশ্যই আছে। আর সে গানে গণ্ঠ দিবেন তিনি। প্রস্তাবটি নজরুল গ্রহণ করলেন। নজরুল লিখে ফেললেন দ’ুটো ইসলামী গান, যেগুলো আজও ইসলামী গানের মধ্যে শীর্ষস্থান দখল করে আছে। গান দু’টো হচ্ছেÑ ‘ও মন রমজানের ওই রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ’ এবং ‘ইসলামের ওই সওদা নিয়ে এলো নবীন সওদাগর’। লেখার চারদিন পরই আব্বাস উদ্দীনের কণ্ঠে গান দু’টো রেকর্ড করা হয়। গান দু’টো রেকর্ড হয়ে বাজারে বের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে চারদিকে প্রায় আলোড়ন সৃষ্টি করে। পথে ঘাটে যেখানে সেখানে ঈদের দিনে বাজতে শোনা গেল আব্বাস উদ্দীনের কণ্ঠে নজরুলের এই গান। বলতে গেলে এর পর থেকে কবি নজরুলের হামদ, না’ত ও ইসলামী গান রচনার পালা শুরু হয়। এর অন্তরালে আব্বাস উদ্দীনের অবদানই বেশি। নজরুল রচিত বহু ইসলামী গান রেকর্ড করেছেন আব্বাস উদ্দীন।
গানের ভুবনে আব্বাস উদ্দীন বাংলার বুলবুল। বাংলাদেশের প্রকৃতি এবং এ প্রকৃতির অনাড়ম্বর সরলতার মধ্যে গড়ে ওঠা মানুষের হৃদয়ে যে সুরের জগৎ আছে, তাকে আন্তরিকভাবে যিনি ভালোবেসে ছিলেন তিনিই সর্বজনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী আব্বাস উদ্দীন। স্বদেশের গানের রাজ্যে তিনিই রাজা তিনিই রাখালিয়া।
বাংলাদেশের মুসলমানদের জীবনে যখন ঘোর অমানিশা, জাতি যখন অসাড় নিষ্পন্দপ্রায় তখন কণ্ঠে এক প্রাণ মাতানো সুর লহরী নিয়ে আগমন ঘটে আব্বাস উদ্দীনের। এ সুরের মুর্ছনায় বাংলাদেশের আনাচে-কানাচে মানুষের প্রাণে লাগে কাঁপন, জাগে উদ্দীপনা। আশা-নিরাশার মাঝে এ দেশের মুসলমানদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ যখন দোল খাচ্ছিল, সেই অনিশ্চিত মহিূর্তেও তিনি কোনো শঙ্কা মানেনি। দেশের জন্য তিনি তার সুরেলা কণ্ঠ দান করেছেন। বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী ছিলেন আব্বাস উদ্দীন। তিনি কবিতাও লিখতেন। তার মতো উচ্চমানের বাংলা আবৃত্তিকার কমই ছিল। গল্প লেখাতেও তিনি ছিলেন সিদ্ধহস্ত। তিনি অত্যন্ত সুরুচিসম্পন্ন মহান ব্যক্তি ছিলেন।
আব্বাস উদ্দীন আর কবি কাজী নজরুল ইসলামের মধ্যে মণি-কাঞ্চন সংযোগ ঘটেছিল। বাংলা হামদ, না’ত, গজল, ইসলামী গান ছিল নজরুলের অপূর্ব সৃষ্টি। সুরের দুলাল আব্বাস উদ্দীনের কণ্ঠে তা হয়ে উঠেছিল পূর্ণরূপে স্বার্থক ও সুন্দর। বাংলার মুসলিম মানসে এ দু’প্রতিভার সংযোগ অতি সহজে বিপ্লব সাধনে সক্ষম হয়েছিল। মুসলিম বাংলার নবজাগরণের ইতিহাসে তাই আব্বাস উদ্দীনের নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।
গানে গানে দেশাত্মবোধে উদ্দীপ্ত করেই আব্বাস উদ্দীন ক্ষান্ত হতেন না, সাথে সাথে চালাতের বক্তৃতা। সে বক্তৃতা কখনো গানের প্রারম্ভে কখনো গানের মাঝে কখনো বা গানের শেষে ঝংকৃত হয়ে উঠত। গভীরভারে আহ্বান জানাতেন তিনি দেশের তরুণদের-নব নবীনদের সমাজের গলদকে চুরমার করে দেয়ার জন্য, অশিক্ষার, কুশিক্ষার জগদ্দল পাথর সরিয়ে দেবার জন্য। স্বাধীনতার জন্য। আবার যখন গেয়ে উঠতেনÑ ‘তাওফিকা দাও খোদা আসলামে মুসলিম জাহা পুনঃ হোক আবাদ/ দাও সেই হারানো সালতানাত দাও সেই বাহু সেই দিল আজাদ…’। তৎকালীন মুসলিম সমাজের যুবা থেকে বৃদ্ধ পর্যন্ত সকলকে তার বক্তৃতা ও গান যে কী পরিমাণ নবজাগরণের ডাকে উদ্বুদ্ধ করেছিল শিল্পীর নিজের জবানীতেই একটি দৃষ্টান্ত উদ্ধৃত করা যাকÑ ‘প্রতিটি গানের সভায় প্রতিটি শ্রোতা আমার সাথে হাত মেলোতো। কণ্ঠে তাদের আল্লাহর বাণী চোখে তাদের ভবিষ্যতের আলো। …. বাংলার মুসলমানদের ডাক যেখান থেকে আসতো উপেক্ষা না করে শারীরিক শত কষ্টকে উপেক্ষা করেও ছুটতাম, সাড়া দিতাম তাদের আহ্বানে।’ শুধু কি ইসলামী গান? ভাওয়াইয়া, চটকা, জারী, সারী প্রভৃতি কত রকমের গান যে তার সুরেলা কণ্ঠে ধ্বনিত হয়ে উঠেছিল তার ইয়ত্তা নেই।
১৯৫৫ সালে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গীত সম্মেলনে ফিলিপাইন এবং ১৯৫৬ সালে ইন্দোনেশিয়া ও জার্মানিতে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক লোকসঙ্গীত সম্মেলনে তিনি নিজ দেশের প্রতিনিধিত্ব করেন। আব্বাস উদ্দীনের রেকর্ড করা গানের সংখ্যা প্রায় সাতশত। তার লেখা ‘আমার শিল্পী জীবনের কথা’ একটি মূল্যবান তথ্যসমৃদ্ধ আত্মচরিত গ্রন্থ। শিল্পী আব্বাস উদ্দীন পিতা হিসেবেও সফল। তার বড় ছেলে ড. মোস্তফা কামাল বার এট ল’ বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্টের একজন বিচারপতি ছিলেন। মেজো ছেলে মোস্তফা জামান আব্বাসী একজন প্রথিতযথা কণ্ঠশিল্পী ও লেখক। একমাত্র মেয়ে ফেরদৌসী রহমানের নাম কারোরই অজানা নয়। আধুনিক, খেয়াল, গজল, ভাইয়াইয়া, ঠুংরী প্রভৃতি গানে স্বনামখ্যাত কণ্ঠশিল্পী ফেরদৌসী রহমানের সমান দখল রয়েছে।
মাত্র ৫৮ বছরের হায়াতে জিন্দেগীতে শিল্পী আব্বাস উদ্দীন সঙ্গীত জগতে যে অবদান রেখে গেছেন, তা এ জাতি যুগ যুগ ধরে স্মরণ করবে।

SHARE

Leave a Reply