Home বিশেষ রচনা মাহে রমজানের শিক্ষা

মাহে রমজানের শিক্ষা

নাসির হেলাল
হিজরি সনের সর্বাধিক সম্মানিত, সর্বাধিক মর্যাদাপূর্ণ, সর্বোত্তম ও বরকতময় মাস হলো রমজান মাস। এ মাসের প্রতিটি মুহূর্তে আল্লাহর পক্ষ থেকে তাঁর সৃষ্টির জন্য আসমান থেকে অবিরল ধারায় রহমত-বরকত নামতে থাকে। রহমত, বরকত, মাগফেরাতের এ মাস। এ মাসটিতে রয়েছে মুমিনদের জন্য সিয়ামের মতো মহানিয়ামতপূর্ণ ইবাদত। এ মাসেই নাজিল হয়েছে মানবতার মুক্তি সনদ আল কুরআন। এ মাসে রয়েছে সেই মহিমান্বিত রজনীÑ যে রজনী কিনা হাজার মাসের থেকেও উত্তম। তা’ছাড়া সিয়ামের মধ্যে রয়েছে ইফতার, সেহরী, তারাবীহ ইত্যাদির মত বরকতপূর্ণ সব বিষয়। অন্যদিকে সিয়াম পালনের মাধ্যমে আত্মসংযম, আত্মশুদ্ধি, তাকওয়া, সহমর্মিতা, ভ্রাতৃত্ববোধ প্রভৃতি অনুশীলন বা সাধনায় আত্মনিয়োগ করার মহাসুযোগ।
রমজান মাস শুরুর আগ থেকেই অর্থাৎ মধ্য শাবান থেকে সমগ্র মুসলিম বিশ্বে সাজ সাজ রব পড়ে যায় রমজানকে স্বাগত জানানোর জন্য। মুসলিম দেশগুলির কর্ণধারগণ আগ থেকেই সতর্কতা অবলম্বন করে বাজার নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে, যেন রমজান মাসে দ্রব্যমূল্য অস্বাভাবিক না হয়ে যায়, খাদ্যদ্রব্যের সরবরাহ ঠিক থাকে ইত্যাদি বিষয়ে। আমরা দেখতে পাই সাধারণ মানুষজনের মধ্যে এক ধরনের নমনীয়তা-কমনীয়তা বিরাজ করে। সমাজে শান্তির একটা ফল্গুধারা বইতে থাকে।
‘রোজা’ শব্দটি আরবি ভাষার শব্দ নয়। এটি ফারসি শব্দ। এর শাব্দিক অর্থ উপবাস। এর আরবি প্রতিশব্দ হলো ‘সাওম’। যার অভিধানিক অর্থ বিরত রাখা, বারণ করা বা ফিরিয়ে রাখা। শরীয়তের পরিভাষায়, ‘সুবহে সাদিক থেকে শুরু করে সূর্যাস্ত পর্যন্ত নিয়তসহকারে কোনো প্রকার পানাহার এবং জৈবিক চাহিদা থেকে বিরত থাকার নাম সাওম বা রোজা।’
‘আরবি বছরের নবম মাস হলো পবিত্র রমজান মাস। ‘রমজান’ শব্দটি আরবি ‘রময’ ধাতু থেকে গৃহীত হয়েছে। রোজা উম্মতে মুহাম্মদীর ওপর ফরজ করা হয়েছে। অবশ্য পবিত্র কুরআন থেকে জানা যায় আমাদের পূর্ববর্তী নবীদের উম্মতের ওপরও রোজা ফরজ ছিল। এ বিষয়ে পবিত্র কুরআনের ঘোষণাÑ ‘হে ঈমানদারগণ! তোমাদের ওপর সাওম ফরজ করা হয়েছে, যেমন করে তোমাদের পূববর্তীদের ওপরও ফরজ করা হয়েছিল। সম্ভবত এর ফলে তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পারবে।’ (সূরা বাকারা : ১৮৩)
উক্ত আয়াতে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে সাওম পালনের মূল উদ্দেশ্য হলো ‘তাকওয়া’।
তাকওয়া : ‘তাকওয়া’ শব্দটি আরবি। এর আভিধানিক অর্থ হলো সাবধানী বা সতর্ক হওয়া, ভয় করা, পরহেজ করা, বেঁচে চলা ইত্যাদি। শরীয়তের পরিভাষায় তাকওয়া শব্দের অর্থ হচ্ছে ‘আল্লাহ তা‘আলার প্রতি শ্রদ্ধা-মিশ্রিত ভয় এবং রাসূলুল্লাহ (সা)-এর সুন্নাহ বা পদ্ধতি অনুসারে কোনও নিষিদ্ধ ও গর্হিত কাজ থেকে বিরত থাকার উদ্দেশ্যে ‘মনের স্বতঃস্ফূর্ত প্রবল ইচ্ছা’। আর যার মধ্যে তাকওয়ার গুণ বর্তমান আছে তিনিই হলেন মুত্তাকী।
তাকওয়া’র বিষয়ে বলতে গিয়ে আবদুল্লাহ বিন মাসউদ (রা) বলেছেন, ‘তাকওয়ার অর্থ হচ্ছে আল্লাহর আদেশের আনুগত্য করা, তাঁর নাফরমানী না করা; আল্লাহকে স্মরণ করা, তাঁকে ভুলে না যাওয়া এবং আল্লাহর শুকরিয়াহ আদায় করা ও তাঁর কুফরী না করা।’ (সাপ্তাহিক আদ-দাওয়াহ, ১০-২-১৯৯৪, সৌদি আরব)
অন্যদিকে ওমর বিন আবদুল আজীজ (রহ) এ বিষয়ে বলেছেন, ‘দিনে রোজা রাখা কিংবা রাতে জাগরণ করা অথবা দু’টোর আংশিক আমলের নাম তাকওয়া নয়। বরং তাকওয়া হচ্ছে, আল্লাহ যা ফরজ করেছেন তা পালন করা এবং তিনি যা হারাম  করেছেন তা থেকে দূরে থাকা। এরপর আল্লাহ যাকে কল্যাণ দান করেন সেটা এক কল্যাণের সাথে অন্য কল্যাণের সম্মিলন।’ (প্রাগুক্ত)
আমাদের দেশে ‘তাকওয়ার ব্যাপারে অনেক ভুল বুঝাবুঝি আছে। কিছু লোক আছে যারা ইসলামের ফরজ, ওয়াজিব ও হারাম কাজ সম্পর্কে ভালোভাবে ওয়াকিফহাল নন, তারা বিশেষ কিছু সুন্নত ও নফল কাজ করে নিজেদেরকে মোত্তাকী এবং অন্যদেরকে মোত্তাকী নন বলে মনে করেন। তারা হাতে তসবীহ, মাথায় টুপি-পাগড়ী, মুখে লম্বা দাড়ি, গায়ে লম্বা জামা এবং পেশাব-পায়খানায় ঢিলা ব্যবহার করাকে তাকওয়ার মাপকাঠি মনে করেন। অথচ এগুলো সুন্নত ও মোস্তাহাবের বেশি কিছু নয়।
কিন্তু তাদের ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনে ইসলামের অগণিত ফরজ-ওয়াজিব রয়েছে যেগুলো তারা পালন করেন না এবং সেগুলোর খবরও রাখেন না। যেমন, পর্দাহীনতা, সুদ, ঘুষ, সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের প্রতিরোধ, দাওয়াতে দ্বীন, দ্বীন প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব ইত্যাদি পালনের ব্যাপারে তারা উদাসীন।
পক্ষান্তরে যারা এসব কাজ করেন এবং সেজন্য জান-মাল উৎসর্গ করেন তাদেরকে তারা মোত্তাকী বলতে নারাজ। অথচ তারাই সত্যিকার অর্থে মোত্তাকী।’ (রমজানের তিরিশ শিক্ষা, পৃ. ১৪-১৫)
সাওমের ফজিলত : বছরের যে কোনো দিন, যে কোনো সময় ভালো কাজ করা যেতে পারে, যার ফজিলত বা সওয়াবও রয়েছে। কিন্তু রমজান মাসে এসব ভালো কাজের সওয়াব আল্লাহ এতো বেশি দান করেন যে, তার কোনো প্রকৃত হিসাব নেই। এ মাসে একটি নফল ইবাদত একটি সুন্নতের সমান হয়ে যায়, একটি সুন্নত ইবাদত একটি ফরজের সমান হয়ে যায়। আর ফরজ ইবাদতের সওয়াব আল্লাহ এতো বেশি বাড়িয়ে দেন যে তা সাতশত গুণের ওপরে বাড়তে থাকে।
অপরদিকে এ মাসের সাওম পালনের ব্যাপারটি সম্পূর্ণ আলাদা। এর সওয়াব যে কতো তা আল্লাহই ভালো জানেন। হযরত আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, ‘যে ঈমান ও ইহতেসাবের সাথে সওয়াবের নিয়তে রমজানের সাওম পালন করবে আল্লাহ তার অতীতের সকল গুনাহ মাফ করে দেবেন।’ (সহীহ বুখারী ও মুসলিম)
অন্য হাদিসে এসেছেÑ ‘আদম সন্তানের প্রতিটি নেক কাজের জন্য ১০ থেকে সাতশত গুণ পর্যন্ত সওয়াব নির্ধারিত রয়েছে। কিন্তু আল্লাহ বলেন, সাওম এর ব্যতিক্রম। সে একমাত্র আমার জন্যই সাওম পালন করেছে এবং আমিই নিজ হাতে এর পুরস্কার দেবো। সাওম পালনকারীর রয়েছে দু’টো আনন্দ। একটা হচ্ছে ইফতারের সময় এবং অন্যটি হচ্ছে আল্লাহর সাথে সাক্ষাতের সময়। আল্লাহর কাছে সাওম পালনকারীর মুখের গন্ধ মেশক-আম্বরের সুঘ্রাণের চাইতেও উত্তম।’ (সহীহ বুখারী ও মুসলিম)
সাওম পালনকারীকে বেহেশতে প্রবেশের ক্ষেত্রেও বিশেষ মর্যাদা প্রদান করা হবে। সাহল বিন সাদ (রা) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, ‘বেহেশতে ‘রাইয়ান’ নামক একটি দরজা আছে। সাওম পালনকারী ছাড়া আর কেউ সেই দরজা দিয়ে বেহেশতে প্রবেশ করবে না। সাওম পালনকারীরা প্রবেশ করলে তা বন্ধ করে দেয়া হবে এবং ঐ দরজা দিয়ে আর কেউ প্রবেশ করবে না।’ (সহীহ বুখারী ও মুসলিম)
সাওম পালনের ফলে লোভ-লালসা দূর হয়, নফসের পরিশুদ্ধি ঘটে। প্রকৃতপক্ষে সাওম নৈতিক অধঃপতন থেকে রক্ষার জন্য ঢালের ভূমিকা পালন করে। আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, ‘সাওম হচ্ছে ঢাল স্বরূপ এবং দোজখের আগুন থেকে বাঁচার সুরক্ষিত দুর্গ বিশেষ।’ (মুসনাদে আহমদ)
যেদিন মহাবিচার অনুষ্ঠিত হবে, সেদিন সাওম, সাওম পালনকারীর জন্য মহান আল্লাহর দরবারে সুপারিশ করবে। হযরত আবদুল্লাহ বিন আমর (রা) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, ‘কেয়ামতের দিন সাওম ও কুরআন বান্দার জন্য সুপারিশ করবে। সাওম বলবে, হে আমার রব! আমি তাকে খাদ্য ও যৌন চাহিদা থেকে বিরত রেখেছি, আমাকে তার ব্যাপারে সুপারিশ করার অনুমতি দিন। কুরআন বলবে, হে আল্লাহ! আমি তাকে রাতে ঘুম থেকে বিরত রেখেছি। আমাকে তার ব্যাপারে সুপারিশ করার অনুমতি দিন। বর্ণনাকারী বলেন, তাদের উভয়কে সুপারিশ করার অনুমতি দেয়া হবে।’ (আহমদ, তাবারানী, হাকেম)
কুরআনের মাস রমজান : পবিত্র রমজানে কুরআনুল কারীম নাজিল হয়েছে। এমনকি অন্যান্য আসমানী কিতাব ও সহীফাও এই রমজান মাসেই নাজিল হয়েছে। এরশাদ হচ্ছেÑ ‘রমজান মাসে কুরআন নাজিল করা হয়েছে। এতে রয়েছে মানুষের জন্য হেদায়াত এবং পথ চলার নির্দেশিকা ও সত্য মিথ্যা পার্থক্য করার সুস্পষ্ট দলীল প্রমাণ।’ (সূরা বাকারা : ১৮৫)
সূরা কদরে রাব্বুল আলামীন বলেছেনÑ ‘আমি এই কুরআন কদরের রাতে নাজিল করেছি।’ কদরের রাত রয়েছে রমজান মাসে। ওবায়েদ বিন ওমাইর (রা) থেকে বর্ণিত, ‘হেরা গুহায় যেদিন প্রথম কুরআন নাজিল হয় সেদিন এবং মাসটিও ছিল রমজান।’
হযরত ফাতেমা (রা) বর্ণনা করেছেন, ‘হযরত জিবরাঈল (আ) প্রতি বছর রমজানে একবার রাসূলুল্লাহ (সা)-এর কাছে কুরআন অবতীর্ণ করতেন। কিন্তু তাঁর ইন্তেকালের বছর দুইবার রাসূলুল্লাহর (সা) কাছে কুরআন পেশ করেন।
‘জিবরাঈল (আ) রমজান মাসে প্রতি রাতে রাসূলুল্লাহ (সা)-কে কুরআন শিক্ষা দিতেন।’ (সহীহ বুখারী ও মুসলিম)
ইখলাসের মাস রমজান : শুধুমাত্র আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের সন্তুষ্টি ও পরকালের মুক্তির উদ্দেশ্যে নেক আমল করার নাম ইখলাস। আর এই ইখলাসই হলো সকল প্রকার ইবাদত, আনুগত্য ও নেক কাজ কবুলের পূর্ব শর্ত। এ জন্যেই রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি ঈমান ও কেবলমাত্র সওয়াব লাভের উদ্দেশ্যে রমজানের রোজা রাখে, আল্লাহ তার অতীতের সকল গুনাহ মাফ করে দেন।’ (সহীহ বুখারী ও মুসলিম)
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা‘আলা মোখলেস লোকদের সম্বন্ধে বলেন, ‘যারা তওবা করে, সংশোধন করে, আল্লাহকে মজবুতভাবে আকড়ে ধরে এবং নিজেদের দ্বীনকে ইখলাস ও নিষ্ঠাপূর্ণ করে, তারা মুমিনদের সাথে রয়েছে। আল্লাহ শ্রীঘ্রই মুমিনদেরকে মহান বিনিময় দান করবেন।’ (সূরা নিসা : ১৪৬)
ইখলাস ছাড়া আমল যেহেতু কবুল হবে না সেহেতু ইখলাস সহকারে আমল করাই বাঞ্ছনীয়। আর সে ক্ষেত্রে রমজান মাস হলো উপযুক্ত সময়।
প্রশিক্ষণের মাস রমজান : মাহে রমজান প্রকৃতপক্ষেই প্রশিক্ষণের মাস। রমজানের চাঁদ দেখার সাথে সাথে বিশ্ব মুসলিমের মধ্যে সাওম পালন করার জন্য বাস্তব ভূমিকা রাখা শুরু হয়ে যায়। মাগরিবের সালাত আদায় করার পরপরই তারাবী সালাতের প্রস্তুতি এবং দীর্ঘ সময় ধরে তারাবী সালাত আদায় করা, বিতরের সালাত পড়ে বাসায় ফিরে একটু বিশ্রাম- এরপর আবার সালাতুল তাহাজ্জুদের জন্য ঘুম থেকে ওঠা, সালাত আদায়, সেহরী খাওয়া, ফযরের সালাত আদায়, এরপর কুরআন তিলাওয়াত, ইসলামী সাহিত্য পড়া। সাথে সাথে অফিস-আদালত, ব্যবসা-বাণিজ্য তথা কাজ-কর্মে লেগে পড়া। এরপর জোহরের সালাত আদায়, আবার কাজ-কর্ম এবং আসরের সময় হলে আসরের সালাত আদায়। ইফতারীর প্রস্তুতি গ্রহণ, সময় মতো ইফতার গ্রহণ এবং মাগরিবের সালাত আদায়। মূলত রমজান মাসের প্রতিটি দিন প্রত্যেকজন সিয়াম পালনকারীর এভাবে ন্যূনতম সময় ব্যয় হয়। যারা আরও ব্যস্ত তাদের কথা তো আলাদা।
অতএব এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায় যে, রমজান মাস মুমিনের জন্য বার্ষিক প্রশিক্ষণের মাস। এ প্রশিক্ষণের মাধ্যমে প্রতিটি মুমিন তার দেহের কলকব্জায় নতুন করে ঈমানী তেল-মবিল লাগিয়ে নেন বছরের বাকি এগারো মাস ঈমানী জিন্দেগী যাপনের জন্য।
দয়া ও দান-সদকার মাস রমজান : সারাদিন সাওম পালন করার পর একজন মুমিন, একজন মুসলমান বুঝতে পারে ক্ষুধার কী জ্বালা। যে সমস্ত বনী আদম অভাবের কারণে একবেলা, আধ বেলা বা কোনো কোনো দিন উপোস করে কাটায় তাদের ক্ষুধার যন্ত্রণা সাওম পালনকারীর বুঝতে কষ্ট হয় না। আল্লাহ তাঁর বান্দাদের মধ্যে সিয়াম পালনের মাধ্যমে দারিদ্র্যের যন্ত্রণা কী তা উপলব্ধি করতে শেখান।
রমজান দয়া ও দান-সদকার মাস, করুণার মাস। রমজানকে রহমত, ক্ষমা ও মুক্তির মাস বলে হাদিসে উল্লেখ করা হয়েছে। হাদিসে এসেছেÑ আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত, ‘রাসূলুল্লাহ (সা) এমনিতেই সর্বাধিক দানকারী ছিলেন। কিন্তু তিনি রমজানে জিবরাইলের (আ) সাথে সাক্ষাতের পর প্রবাহমান বাতাসের মতো উন্মুক্ত হস্ত ও অধিকতর দাতা হয়ে যেতেন।’ (সহীহ বুখারী)
হযরত আনাস (রা) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, ‘রমজানের দান-সদকাহ সর্বোত্তম।’ (তিরমিযী)
আর এ দান যদি আল্লাহর রাস্তায় হয় তা’হলে তা সাধারণ দান-সদকার চেয়ে অনেক বেশি পুণ্যের কাজ হয়। এমনিতে কোনো ইবাদত বা ভালো কাজের সওয়াব ১০ গুন থেকে ৭০০ গুন বা আরো অধিক হয়ে থাকে। কিন্তু আল্লাহর রাস্তায় দানের ক্ষেত্রে তা হয়ে থাকে ৭০০ গুন থেকে শুরু হয়ে উপরের দিকে। অর্থাৎ সে সওয়াব বেশুমার। এরশাদ হচ্ছেÑ ‘যারা আল্লাহর রাস্তায় নিজেদের অর্থ-সম্পদ দান করে তাদের দানের উদাহরণ হলো একটি বীজের মতো, যা থেকে ৭টি শীষ বা ছড়া জন্মায়। প্রত্যেকটি ছড়ায় একশ করে দানা থাকে। আল্লাহ যাকে ইচ্ছা আরো বেশি দান করেন। আল্লাহ অতি দয়াশীল ও সর্বজ্ঞ।’ (সূরা বাকারা : ২৬১)
ধৈর্য ও সংযমের মাস রমজান : মানুষের জীবনে ধৈর্য, সংযম, ত্যাগ-তিতিক্ষা বড় গুণ। চলার পথে নানা ক্ষেত্রে এসব গুণ যাদের আছে তারা জীবনে সফলকাম হন। আর সাওম পালনের মাধ্যমে একজন মুমিন এ গুণ অর্জন করতে পারেন বা করে থাকেন। সারা দিন অর্থাৎ সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত দীর্ঘ সময় ধরে সকল প্রকার পানাহার ও জৈবিক চাহিদা থেকে বিরত থেকে এ ধৈর্য ও সংযমের পরীক্ষা দেয় সাওম পালনকারীরা। দীর্ঘ একমাস ধরে এ কষ্টকর প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন সাওম পালনকারীগণ।
হযরত সালমান ফারসি (রা) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন, ‘রমজান হচ্ছে, ধৈর্য ও সংযমের মাস। আর সবরের পুরস্কার হচ্ছে, বেহেশত।’ (ইবনে খোযাইমাহ)
রাসূলুল্লাহ (সা) আরও বলেন, ‘ সাওম ধৈর্যের অর্ধেক।’ (তিরমিজী) সূরা যুমারে আল্লাহ ধৈর্য ধারণকারীদের উদ্দেশ্যে এরশাদ করেনÑ ধৈর্য ধারণকারীদেরকে বিনা হিসাবে তাদের পুরস্কার দেয়া হবে।’ (সূরা যুমার : ১০)
আল্লাহ পাক আরও এরশাদ করেন, ‘আল্লাহ ধৈর্য-ধারণকারীদের সাথে আছেন।’ (সূরা বাকারা, ১৫৩)
বিজয়ের মাস রমজান : ‘হিজরি প্রথম সালের প্রথম রমজানে মুসলমানেরা সর্বপ্রথম হামযাহ বিন আবদুল মোত্তালিবের নেতৃত্বে ছোট একটি মুজাহিদ বাহিনী পাঠায়। এরপর ওবায়দাহ বিন হারেস বিন আবদুল মোত্তালিবের নেতৃত্বে আরো একটি ছোট মুজাহিদ বাহিনীকে অভিযানে পাঠায়। প্রথম হিজরির রমজান মাসে পরপর দু’টো মুজাহিদ বাহিনী পাঠানোর পর মদীনার ইহুদিদের মনে ভয়ের সঞ্চার হয়, মুসলমানদের মানসিক শক্তি বৃদ্ধি পায় এবং জিহাদের প্রস্তুতির জন্য সবাই মানসিকভাবে তৈরি হতে থাকে।’ (রমজানের তিরিশ শিক্ষা, এএনএম সিরাজুল ইসলাম, পৃ. ১৮৯)
মুসলমানদের মহাবিজয় সংঘটিত হয় এই রমজান মাসেই। রাসূলুল্লাহ (সা)-এর নেতৃত্বে বদরের যুদ্ধ এবং পরবর্তীতে মক্কা বিজয় হয় এ মাসে। দ্বিতীয় হিজরির ১৭ রমজান সংঘটিত বদর প্রান্তরের যুদ্ধে মুসলমানেরা বিপুল বিজয় অর্জন করে। এ বিজয়ের ফলে মুসলমানদের তথা ইসলামের শিকড় মজবুতভাবে গ্রোথিত হয়। এরশাদ হচ্ছেÑ ‘আল্লাহ চাচ্ছিলেন যে, তিনি সত্যকে তাঁর বাণী দ্বারা প্রতিষ্ঠিত করেন এবং কাফিরদেরকে নির্মূল করেন।’ (সূরা আনফাল : ৭)
রমজান মাসে বিভিন্ন সময়ে সংঘটিত সকল যুদ্ধেই মুসলমানেরা বিজয় লাভ করেছেন। এ জন্য রমজানকে মুসলমানদের বিজয়ের মাস বলা হয়।
প্রকৃতপক্ষে রমজান মাস রহমতপূর্ণ একটি মাসÑ এ মাসের প্রতিটি মুহূর্ত রহমতে ভরা। তাই আমরা চেষ্টা করবো প্রতিটি রোজা রাখার, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ জামায়াতে পড়ার, ঠিক সময়ে ইফতার করার ও সেহরী খাওয়ার সাথে সাথে তারাবী নামাজ, নফল নামাজ, তাহজ্জুদ নামাজ, কুরআন তিলাওয়াত ও রমজানের শেষ দশকে ইতেকাফে বসার, আর ঈদুল ফিতরের নামাজ পড়তে যাওয়ার আগেই ফিতরা আদায় করার। মাহে রমজান হোক সবার জন্য কল্যাণকর।

SHARE

Leave a Reply