Home উপন্যাস ভয়াল রাত

ভয়াল রাত

আফরোজা পারভীন
(গত সংখ্যার পর)
তেরো.
রাজিব ধীরে ধীরে চোখ খোলে। আস্তে আস্তে দম নিতে থাকে। প্রচণ্ড ক্লান্তিতে ভেঙে আসছে তার শরীর। কিন্তু ক্লান্ত হলে চলবে না। এখন থেকে তাকে চলে যেতে হবে। একটু আগে মৃত্যুর মুখোমুখি হয়েছিল সে। অদ্ভুত এক শীতলতা গ্রাস করে ফেলছিল তাকে। এক অস্পষ্ট ফিসফিসে আওয়াজও শুনতে পাচ্ছিল সে। কিন্তু কাউকে দেখতে পায় না। কে ছিল কিংবা কারা ছিল জানে না রাজিব। জানে না কারা তাকে মৃত্যুর গহ্বরে টেনে নিয়ে যাচ্ছিল। মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছে রাজিব। এখন তার যতো দ্রুত সম্ভব গ্রামে ফিরেও যাওয়া দরকার। দরকার এই অদ্ভুত ভুতুড়ে বাড়ি ত্যাগ করা। রাজিবের নিঃশ্বাস ততক্ষণে স্বাভাবিক হয়ে এসেছে। ক্লান্তি আছে অপরিসীম। কিন্তু ক্লান্তিকে আমল দিলে চলবে না। বাড়িতে ফিরতে পারলে অনেক বিশ্রাম নিতে পারবে সে, অনেক ঘুমাতে পারবে। রাজিব উঠে দাঁড়াতে যায় আর তখনই ভেসে আসে একটা গম্ভীর কণ্ঠ। গম্ভীর কিন্তু অত্যন্ত মিষ্টি আর কিঞ্চিৎ ক্লান্ত সেই কণ্ঠে বলে, উঠো না, পালানোর চেষ্টা করো না।
কেঁপে ওঠে রাজিব। ঘরের প্রতিটি কোণ তন্ন তন্ন করে দেখে। কেউ নেই, কেউ না। কে তাহলে কথা বলছে? কোথা থেকে কথা বলছে। ভয়ার্ত রাজিব কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে বলে, কে আপনি। আমি তো আপনাকে দেখতে পাচ্ছি না। কোথায় আপনি?
এই ঘরে। তোমার আশপাশে। আমাকে দেখতে পাচ্ছো না কারণ আমার কোন শরীর নেই। আমার অস্তিত্ব আছে কিন্তু কোন শরীরে তার প্রকাশ নেই।
আপনার নামটা দয়া করে বলবেন?
আমার নাম আদিত্য। আর কিছু জানতে চাও?
কী চান আপনি আমার কাছে? কেন আমাকে যেতে বারণ করছেন?
একটু আগেই না তুমি কাকুতি মিনতি করে বলছিলে আমি যদি তোমাকে বাঁচিয়ে দিই তাহলে আমি যা চাইবো তাই করবে। বল এখন কি করবে তুমি আমার জন্য? এই বাড়িতে ঢোকার পর থেকে তুমি কি কি করেছ সবই আমার জানা। তুমি বড় লোভী। এখন সেই লাভের খেসারত তুমি কিভাবে দেবে?
বিশ্বাস করুন আমি কিছুই করিনি। আমি একটা বল খুঁজতে এ বাড়িতে ঢুকেছিলাম। কাঁপা এবং কিছুটা সতর্ক কাঁপা কণ্ঠে রাজিব বলে।
অদৃশ্য কণ্ঠস্বর হাসতে থাকে। সে হাসি শুনে হিম হয়ে আসতে থাকে রাজিবের পুরোটা শরীর।
তুমি কিছুই করোনি তাই তোমার পুরোটা পকেট ভর্তি সোনাদানা হীরে জহরত। আরো ধন সম্পদ পাবার লোভে ঢুকেছ এ ঘরে!
এবার রাজিব একেবারে ভেঙে পড়ে। অদৃশ্য এই শক্তির কিছুই অজানা নয়। তার প্রতিটি পদক্ষেপ তার নখদর্পণে। তার কাছে কিছু লুকোনোর চেষ্টা করা রীতিমতো বিপজ্জনক। তার চেয়ে সব কিছু খোলাখুলি বলে দিলে যদি রক্ষো পাওয়া যায়।
আমি ভুল করেছি, অন্যায় করেছি। আমাকে মাফ করে দেন। এই সোনাদানা সব আপনাকে দিয়ে দিচ্ছি। আপনি শুধু আমাকে ছেড়ে দেন।
হাসি আরও বিস্তৃত হয়। সে হাসি যেন আরও কাছে এগিয়ে আসে। ধূম্রজাল সৃষ্টি হয় যেন রাজিবের সামনে। সে ধোঁয়ার মধ্যে আবছা একটা অবয়ব যেন দেখা যায়।
কিন্তু কেন তোমাকে আমি ছাড়ব। এই অদৃশ্য অবস্থা থেকে শরীরে ফিরে আসতে তোমার রক্ত আমার খুবই প্রয়োজন। এই রক্তের তৃষ্ণা এখানে যারা আসে তাদের আমি ফিরতে দিই না। তাদের রক্ত আমি শুষে নিই। তোমারটাও নেবো। ভেঙে খান খান বিপর্যস্ত বিধ্বস্ত রাজিব কাঁদতে কাঁদতে হাত জোড় করে মিনতিমাখা কণ্ঠে বলে, আমাকে ছেড়ে দেন। আপনি যা বলবেন আমি তাই করব।
বেশ তাহলে সেই কথাই হোক। আমি তোমার জীবন ভিক্ষে দেবো। তার বিনিময়ে কমপক্ষে দশ জন মানুষকে তুমি এখানে নিয়ে আসবে। প্রতিদিন অন্তত একজন করে। তাদের রক্ত আমি শুষে নেব। শেষ মানুষটাকে যেদিন তুমি আনবে সেদিন তোমার মুক্তি। তারপর তোমাকে আমি অসীম ক্ষমতাধর করে দেবো।
কিন্তু অতো মানুষ আমি কোথায় পাব। আর ওরা আমার সাথে আসবে কেন?
আসবে কারণ এখান থেকে তুমি যখন ফিরে যাবে আমার ক্ষমতার কিছু অংশ তোমার সাথে যাবে।
আর একটা গ্রামে কি মানুষ কম। আমি তো মাত্র একশ জনের কথা বলেছি। তুমি ওদের কি টেকনিকে আনবে সেটা তোমার ব্যাপার।
রাজিব ক্ষণকাল ভাবে। এখান থেকে মুক্তি পাওয়াই এখন সবার আগে দরকার। একবার এখান থেকে বেরোতে পারলে আর যদি এখানে না আসে ওই অদৃশ্য শক্তি তার কী করতে পারবে। কিছুই না।
ভাবনা শেষ হয় না। তার আগেই ভেসে আসে সেই গুরু গম্ভীর কণ্ঠস্বর, আমার ক্ষমতা সম্পর্কে তোমার কোন ধারণা নেই তাই ভাবছ গ্রামে গেলেই তোমার বিপদ কেটে যাবে। শোন হে মানুষের বাচ্চা, তুমি যেখানেই যাবে আমার ছায়া তোমার পিছে পিছে থাকবে। সেখানেই প্রভাব বিস্তার করব আমি। কাজেই ফাঁকি দেয়ার চেষ্টা করো না।
আমি রাজি।
এইতো বুদ্ধিমানের মতো কথা। আমি খুব খুশি হয়েছি। শোন তোমার পকেটে যা আছে সব তুমি নিয়ে যাও। ওসবে আমার কোন আগ্রহ নেই। আমার একমাত্র আগ্রহ মানুষে। তরতাজা মানুষে। বিকৃত হাসি হাসে আদিত্য। কেঁপে ওঠে রাজিব। আদিত্যকে কথা দেয় পরদিনই সে মানুষ নিয়ে হাজির হবে এ বাড়িতে।
রাজিব দ্রুত বাড়িটি থেকে বেরিয়ে আসে। বেরিয়ে দেখে মূল ফটকের সামনে অনেক মানুষ। যে ছেলেটিকে সে ফিরিয়ে দিয়েছিল সে গিয়ে গ্রামে খবর দিয়েছে। গ্রামের লোক ছুটে এসেছে বাড়িটার সামনে। ধরেই নিয়েছে রাজিব কোনদিন ফিরবে না। কারণ এ বাড়িতে যে যায় সে আর কখনও ফেরে না। রাজিব ভিড়ের মাঝে মাকে দেখতে পায়। মা কাঁদতে কাঁদতে এসে জড়িয়ে ধরেন রাজিবকে।
ফিরেছিস বাবা। ভগবান তোকে ফিরিয়ে দিয়েছে। ভেবেছিলাম আর কোনদিন তোকে ফিরে পাবো না।
গ্রামের লোক তাকে মাথায় নিয়ে হইহই করে চলল গ্রামের দিকে।

চৌদ্দ.
পরদিন দুপুর। বাড়িতে শুয়ে আছে রাজিব। বড্ড ক্লান্ত সে। বিশ্রামের খুবই প্রয়োজন। কিন্তু শুয়ে থাকলেও তার মনের কোন বিশ্রাম নেই। মনে মনে ভীষণ উত্তেজিত সে। এক একটা মুহূর্ত পার হচ্ছে আর তার উত্তেজনা বাড়ছে। সময় যে দ্রুত গড়িয়ে যাচ্ছে। আজ দিনের মধ্যে একটা মানুষ নিয়ে তাকে যেতে হবে ওই বাড়িতে। বিকেলেই যাওয়া ভাল। কারণ মানুষটাকে রেখে তাকে ফিরতে হবে। সন্ধ্যের আগেই সে ওই ভূতের বাড়ি থেকে ফিরতে চায়। কিন্তু মানুষ সে কোথায় পাবে? কিভাবে পাবে? পারত পক্ষে কেউ ওই ভূতের বাড়িতে যেতে রাজি হবে না। তাহলে! রাজিব ঘামতে থাকে। মা ঘরে ঢোকেন। বড় শখ করে রাজিবের জন্য পায়েস রেঁধেছেন তিনি। তার ছেলেটা ওই ভূতের বাড়ি থেকে সুস্থ অবস্থায় ফিরে এসেছে। যে বাড়ি থেকে কেউ কখনও ফেরে না সে বাড়ি থেকে তার ছেলেটা ফিরেছে। তাহলে নিশ্চয়ই অন্যদের চেয়ে তার ছেলের গুণ অনেক বেশি আছে। হয় সে বুদ্ধিমান না হয় সাহসী। একটা কিছু তো অবশ্যই। তা না হলে তার ছেলেটা ফিরল কী করে। মার চোখে মুখে ছেলের জন্য গর্ব। যেন তার ছেলে দিগি¦জয় করে ফিরেছে। এই গর্বের পেছনে একটু শঙ্কাও আছে। যদি তার ছেলে না ফিরতো তাহলে কি হতো! ভয়ে বুক কেঁপে ওঠে রাজিবের মায়ের। বালাই বালাই। মায়ের মনে কি এমন দুশ্চিন্তা আসতে আছে। ছি। নিজেকে ধিক্কার দিয়ে ছেলের পাশে বসেন মা। এই নে বাবা পায়েসটা খেয়ে নে। বেশি করে গুড় আর দুধ দিয়ে রেঁধেছি।
আমার এখন খেতে ইচ্ছে হচ্ছে না মা। তুমি রেখে দাও, পরে খাবো।
সে কিরে পায়েসে তো কখনও তোর অরুচি দেখিনি। বাটির পর বাটি শেষ করে ফেলিস। আমি আজ বেশি করে রেঁধেছি। নে খেয়ে নে। মুখে দিয়ে দেখ ভাল লাগবে।
না মা আমার ইচ্ছে হচ্ছে না।
কিরে তোর শরীর খারাপ নাকি। জ্বর জারি নাতো? দেখি দেখি।
মা রাজিবের কপালে হাত দেন। কপাল ঠাণ্ডা।
জ্বর তো নেই। পেটে ব্যথা নাকি অন্য সমস্যা?
আহ মা আমি তো তোমাকে বললাম আমার কোন সমস্যা নেই। এখন খেতে ইচ্ছে হচ্ছে না। পরে খাব। তুমি পায়েসের বাটিটা রেখে এসে আমার পাশে বস।
মা পায়েসের বাটি রেখে এসে রাজিবের পাশে বসেন। রাজিব পকেট থেকে সোনা দানাদগুলো বের করে দেয়। শুধু একটা আংটি পকেটে রেখে বাকিগুলো মার হাতে তুলে দেয়। মা অবাক হন। সোনা দানা হাতে নিতে ভয় পান।
এ যে অনেক সোনা। অনেক টাকার জিনিস। পেলি কোথায়? মায়ের কণ্ঠে ভয় আর সন্দেহ।
ভয় পাবার কিছু নেই আমি চুরি করিনি মা। ওই পোড়োবাড়িতে একটা বস্তার মধ্যে পেয়েছি। ওখানে আরও অনেক সোনাদানা আছে।
কিন্তু না বলে কিছু আনা তো অন্যায়। শেষে যদি কোন অসুবিধায় পড়িস। দেখ বাবা আমরা গরিব মানুষ। তবে গরিব হলেও মা আর ছেলেতে ভালোই আছি। লোভ করতে গিয়ে শেষে আবার কোন বিপদে পড়ি। থানা পুলিশের কোন বিপদে জড়াবো না তো?
বিপদের কোন ভয় নেই মা। ওই বাড়িতে বলার মতো কেউ নেই।
বলে বটে কিন্তু সিঁটিয়ে ওঠে ভয়ে। সত্যিই কি কেউ নেই ও বাড়িতে। তাহলে যে অশরীরী মানুষের সাথে তার কথা হল সে কে? যার অদৃশ্য অঙ্গুলি হেলনে তার সারাটা শরীর শীতলতার স্পর্শে নির্জীব হয়ে যাচ্ছিল সে কেন? সে যে রাজিবের জীবনে মূর্তিমান আতঙ্ক। তবে এ কথা ভেবে আশ্বস্ত হতে চেষ্টা করে যে ওই অশরীরী যেই হোক সেইতো তাকে সোনা দানাগুলো নিয়ে আসতে বলেছে। সে বলেছে বলেই রাজিব এনেছে। নইলে যে পরিস্থিতি ছিল ওই পরিস্থিতিতে সোনা নিয়ে আসার চিনন্তা সে ভুলেও করতো না।
ছেলের কথা শুনে আশ্বস্ত হন মা। সোনাগুলো আঁচলে মুছতে মুছতে ঘরের এক কোণে চলে যান। তার স্বামী ছোটখাটো একটা চাকুরি করে। গরিব নয়, তবে ধনী বলতে যা বোঝায় তা-ও না। এতো সোনা তিনি জীবনেও দেখেননি। এ সোনা তিনি এখন লুকাবেন কোথায় এটাই তার সমস্যা। অবশ্য তার মনটা ফুরফুরে হয়ে যায়। এ সোনা একটু একটু বিক্রি করে এক সাথে টাকা জড়ো করবেন তিনি। তারপর সেই টাকা গুছিয়ে রাখবেন ছেলের ভবিষ্যতের জন্য। ছেলেকে একটার জায়গায় তিনটে টিউটর দেবেন। মার চেহারায় গভীর প্রশান্তি নেমে আসে। মা চলে যাবার পর আবারও ভাবনা চেপে ধরে রাজিবকে। দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে সময়। ওই বাড়িতে যেতে হলে এখনই তাকে উঠতে হবে। রাজিব মনে মনে ভাবে, না গেলে কী হয়। সে তো আর এখন ওই বাড়ির ত্রিসীমায় নেই। নিজের বাড়িতে মায়ের আঁচলের নিচে নিরাপদ আশ্রয়ে আছে সে। ওই বাড়ির ওই অশরীরী ছায়া আর কিছুতেই তাকে স্পর্শ করতে পারবে না। সে যাবে না, কিছুতেই না। এখন সে মায়ের হাতে বাটিভর্তি পায়েস খাবে তারপর লম্বা একটা ঘুম দেবে। সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করে মাকে সে ডাকতে যায়। এই দুই মিনিট আগে তার কোন ক্ষিধে ছিল না এখন তার পেটে চূড়ান্ত ক্ষিধে। সে মাকে ডাকার জন্য মুখ খুলেছে কি খোলেনি তখনই শুরু হয় সেই একই অনুভূতি। যে অনুভূতি তাকে গ্রাস করেছিল পোড়ো বাড়িতে। প্রথমে তার আঙুলগুলো কাঁপতে থাকে তারপর সারা শরীর। জিহ্বা আড়ষ্ট হয়ে আসে। তীব্র এক শীতলতা জেঁকে ধরে তাকে। সে জমে যেতে থাকে। তার শরীর থেকে যেন রক্ত সরে সরে যেতে থাকে। রাজিবের মনে হয় সে মরে যাচ্ছে। এখনই সে মরে যাবে। রাজিব বিড়বিড় করে।
আমাকে ক্ষমা কর। আমি আসছি, এখনই আসছি তোমার কাছে। তুমি যা বলবে আমি তাই করবো। আর কখনও অন্য চিন্তা করবো না। আমাকে মাফ করো।
দূর থেকে যেন রাজিবের কানের মাঝে ধ্বনিত হতে থাকে, তোকে শেষ সুযোগ দিলাম। আর কোন সুযোগ তুই পাবি না। তাড়াতাড়ি আয়। আমি তৃষ্ণার্ত।
রাজিব ধড়মড় করে উঠে বসে। এখনই তাকে মানুষ নিয়ে যেতে হবে ওই বাড়িতে। কিন্তু সে কোথায় মানুষ পাবে, কাকে পাবে? কিভাবে নিয়ে যাবে ওই পোড়োবাড়িতে? ওই বাড়িতে যে পারতপক্ষে কেউই যেতে চায় না।
ভাবতে ভাবতে খেলার মাঠে আসে রাজিব। বন্ধুরা সবাই ক্রিকেট খেলছে। দূর থেকে লিটন, বাবু ও সুমনকে দেখতে পায়। ঠিক তখনই বিদ্যুৎ চমকের মতো রাজিবের মনে হয় লিটনকে নিয়ে গেলে কেমন হয়। লিটন বড় দুষ্টু। তাকে অনেক জ্বালিয়েছে, অনেক কষ্ট দিয়েছে তাকে। আজ তার প্রতিশোধ নেয়ার সময় এসেছে।
রাজিব সামনে এগিয়ে যায়। ইশারায় লিটনকে ডাকে। একটু দ্বিধা করে লিটন এগিয়ে আসে।
পোড়োবাড়ি থেকে অক্ষত অবস্থায় ফেরার পর সে এলাকায় হিরো হয়ে গেছে। লিটন এসে গা ঘেঁষে দাঁড়ায় যেন কতকালের বন্ধু,
ওই বাড়িতে কি কি দেখলি?
আর বলিস কেন। সে কথা বলার জন্যই তো তোকে ডাকলাম। তবে এখানে নয়, একটু আড়ালে চল সব তোকে বলছি।
রাজিবের কথায় লিটন যেন রহস্যময়তার গন্ধ পায়। একটু এগিয়ে রাজিবের সাথে একটা আড়ালে দাঁড়ায়। রাজিব পকেট থেকে সোনার ঝকঝকে আংটিটা বের করে লিটনের হাতে দিয়ে বলে, নে এটা তোর জন্য।
কিন্তু এ যে অনেক দামি আংটি! এতো দামি আংটি তুই কোথায় পেলি?
ওই বাড়িতে। ওই বাড়িতে এমন জিনিস বস্তা বস্তা আছে। যে কেউ গেলেই আনতে পারে। বাধা দেবার কেউ নেই।
লোভে লিটনের চোখ চকচক করে। সে রাজিবের হাত জড়িয়ে ধরে, তুই কি আবার যাবি ওই বাড়িতে?
যাবো আজই, এখুনি। সোনা দানাগুলো আনতে হবে না।
আমাকে নিবি ভাই তোর সাথে?
কিন্তু তুইতো মানুষ ভালো না। অনেক জ্বালিয়েছিস আমাকে।
অতীতের কথা কেন টেনে আনছিস। কেন লজ্জা দিচ্ছিস শুধু শুধু। আমি অন্যায় করেছি। মাফ করে দে ভাই। আমাকে নিয়ে চল তোর সাথে।
এতো করে যখন বলছিস চল তাহলে আমার সাথে।
রাজিব লিটনকে নিয়ে ওই বাড়ির দিকে হাঁটে। এক সময় ঢুকে পড়ে ওই পোড়োবাড়িতে।

পনেরো.
পরদিন। সোনাদানাগুলোর দিকে হিংস্র চোখে তাকিয়েছিলে রমেশ। ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেছিল স্ত্রীর ওপরও। কী স্পর্দ্ধা সৎ ছেলের সাথে তার তুলনা করেছে!
ডাকো তোমার গুণধর পুত্রকে। দখি সে কোথা থেকে এ সোনাদানা চুরি করে আনল। খুব আনন্দ হচ্ছে না? বাড়িতে যখন পুলিশ এসে হাতকড়া পরিয়ে ধরে নিয়ে যাবে তখন সব আনন্দ উবে যাবে। শুধু রাজিবকে নয়, সাথে তোমাকেও নিয়ে যাবে ওকে আশকারা দেয়ার জন্য। কই ডাকো তোমার ছেলেকে।
ওকে ডাকাডাকি করে কী লাভ। ও এ সোনাদানা চুরি করেনি। ওই পোড়োবাড়িতে পেয়েছে। আর যা পেয়েছে সবই আমাদের দিয়ে দিয়েছে। কোথায় তুমি খুশি হবে তা নয় ছেলেটাকে গালমন্দ করতে শুরু করেছ।
এখনও কথা বলছ, তর্কও করছ! তোমার সাহস তো কম নয়। নাকি সোনাদানা হাতে পেয়ে সাহস বেড়ে গেছে। থাক তোমাকে আর ডাকতে হবে না। আমি নিজেই ওকে ডাকছি।
বাবার ডাকে রাজিব আসে। এতক্ষণ সে বাবা মায়ের ঝগড়া শুনছিল আর ভাবছিল বাবা জিজ্ঞাসা করলে সে কী বলবে। এর মধ্যেই বাবার ডাক শোনে। কোন কথা শোনার আগেই বকতে থাকে রাজিবকে। রাজিব তাকে যতোই বোঝাতে চায় ও ততই উত্তেজিত হয়ে ওঠে। এক সময় হাল ছেড়ে দিয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বকা শুনতে থাকে রাজিব। ক্লান্ত হয়ে এক সময় থামে সৎ বাবা। রাজিব বহুক্ষণ ধরে নিজের ভেতরে কিসের যেন তাড়া অনুভব করছে। বেলা পড়ে আসছে। তাকে এখনই ওই বাড়িতে যেতে হবে। একা গেলেও চলবে না। সাথে মানুষ নিতে হবে। কাল পেরেছে আজ সে কাকে পাবে। রাজিব ধীরে ধীরে বাবার সামনে থেকে সরে আসে। পাশের ঘরে ঢোকে। ওর এখন একটাই চিন্তা বাবার চোখ বাঁচিয়ে বেরিয়ে পড়া। এক সময় উঁকি দিয়ে দেখে বাবা যেন মদের নেশায় ঘুমাচ্ছে। ঝুঁকি নেয় রাজিব। দ্রুত দরজা দিয়ে বেরোনোর চেষ্টা করে আর সাথে সাথে চেঁচিয়ে ওঠে রমেশ। এই কই যাস?
ধরা পড়ে আবারও ঘরে ফিরে আসে রাজিব। কেটে যায় আরও কিছু সময়। সন্ধ্যা হয়ে এসেছে প্রায়। ভেতরে ভেতরে ছটফট কছে রাজিব। বারবার উঁকি দিচ্ছে পাশের ঘরে। একসময় তার সৎ বাবা মদের নেশায় গুটি সুটি হয়ে শুয়ে পড়ে। ঘুমিয়েও পড়ে অচিরেই। কালবিলম্ব না করে দৌড় দেয় রাজিব। বেরিয়ে তো এলো কিন্তু মানুষ পাবে কোথায়! কাল লিটনকে পেয়েছিল আজ! লিটনের কথা মনে হতেই ভেসে ওঠে বাবু আর সুমনের মুখ। বাবু সুমন লিটনের সাগরেদ। বারবার রাজিবের পিছু লেগেছে। ওকে জ্বালিয়েছে। আজ তার প্রতিশোধ নেয়ার সময় এসেছে। লক্ষ্য আর কৌশল স্থির করে ফেলে রাজিব। মাঠের পাশে গিয়ে ওদের খুঁজতে থাকে। ভাগ্য ভালো, পেয়ে যায়। ওরা তখন খেলা শেষ করে বাড়ি ফিরছে। রাজিবকে দেখে ওরা এড়িয়ে যেতে চায়। কিন্তু রাজিব নিজেই এগিয়ে যায়।
আজ একটু অন্য দিকে গিয়েছিলাম। তাই খেলা হলো না। তোমাদের খেলা কেমন হলো?
ওরা কথা বলে না। এগিয়ে যেতে থাকে।
কী হল বললে না খেলা কেমন হলো। আমরা একই গায়ের ছেলে, একসাথে খেলাধুলা করি।
তারপরও তোমরা আমাকে এড়িয়ে চলতে চাও এ কেমন কথা। দেখ না আগে লিটন আমার সাথে মিশত না। এখন আমার ভালো বন্ধু। একটু আগেও আমার সাথে কথা হল। এই তো পাঠালো আমাকে তোমাদের কাছে।
ওরা পরস্পর মুখ চাওয়া চাউয়ি করে। রাজিবের সাথে লিটনের বন্ধুত্ব হয়েছেও এ খবর তাদের অজানা। কবে হলো, কবে?
লিটন তো আজ খেলতে আসেনি তুমি তাকে দেখলে কোথায়?
ওই তো ওই পোড়োবাড়ির সামনে অপেক্ষা করছে তোমাদের জন্য। তোমরা গেলে আমরা সবাই মিলে ঢুকব ওই পোড়োবাড়িতে। আসলে আমি ওই পোড়োবাড়ি থেকে সুস্থ অবস্থায় ফেরাতে ওর খুব কৌতূহল হয়েছে বাড়িটা সম্পর্কে। ভাল চল সবাই মিলে দেখে আসি।
সুমন আর বাবুর মাঝে চোখে চোখে কথা হয়।
না আমরা যাবো না। লিটনের সাথে আজ আমাদের দেখা হয়নি। আর ওই ভূতের বাড়িতে যাওয়ার কথাও আমাদের বলেওনি। যাকগে দেরি হয়ে যাচ্ছে। আমরা আসি।
ওরা হাঁটতে শুরু করে। রাজিব দ্রুত গিয়ে ওদের পথ আটকায়। ওনেকটাই মরিয়া। পকেট থেকে কয়েকটা স্বর্ণমুদ্রা বের করে। হাতের তালুতে মেলে ধরে বলে, এমন অনেক আছে বাড়িতে অজস্র। এরপরও কি আপত্তি করবে?
ওরা আর দ্বিরুক্তি করে না। পোড়োবাড়ির সামনে এসে একবার শুধু জিজ্ঞাসা করে, লিটন কোথায়?
রাজিব গতকাল নিজ চোখেই দেখেছিল লিটনের পরিণতি। দেখেছিল কিভাবে একটু একটু করে রক্তশূন্য হয়েছিল লিটনের শরীর। নিঃসাড়ে সব রক্ত টেনে নিয়ে রাজিব রক্তশূন্য ফ্যাকাসে মুখের দিকে তাকিয়ে সেই ভয়াল কণ্ঠ বলেছিল, যদি তুমি আমার সাথে কোন বেঈমানি করো তোমারও একই অবস্থা হবে। কাজেই সাবধান। আজ আর সে দৃশ্য দেখতে চায় না রাজিব। চলে যায় খানিকটা সময়। তারপর এক সময় ভেতর থেকে গুরুগম্ভীর ডাক ভেসে আসে, এই মানুষের ছেলে ভেতরে এসো।
রাজিব ভেতরে যায়। তোমার আজ এতো দেরি হল কেন? জান না একটা নির্দিষ্ট সময়ে আমার রক্ত পিপাসা পায়। আর কখনও এমন হলে তার সাজা তোমাকেই বহন করতে হবে।
এরপর রাজিব, সুমন আর বাবুর পা ধরে টানতে টানতে নিয়ে আসে নিচে। ধাক্ক দিয়ে শরীর দুটো ফেলে দেয় কুয়োয়। তারপর বাড়ির দিকে হাঁটতে থাকে। সন্ধ্যা পার করে বাড়িতে ফেরে রাজিব। দূর থেকে দেখতে পায় তাদের বাড়ির সামনে অনেক লোক। বাড়ির কাছাকাছি এসে মায়ের কান্না শুনতে পায়।
কী হয়েছে, হয়েছে কী?
দ্রুত বাড়িতে ঢোকে রাজিব। আর ঢুকেই দেখে মারা গেছে তার সৎ বাবা।
ষোলো.
সে একটা শয়তান। তাকে দেখা যায় না, ছোঁয়া যায় না, তবে অনুভব করা যায়। অসীম ক্ষমতাধর সে।
সে ক্ষমতার বলে সে পারিপার্শ্বিক সব কিছুকে নিয়ন্ত্রণ করে। সে মানুষের মাথার মধ্যে ঢুকে যেতে পারে। পারে মানুষকে প্রলোভন দেখাতে, প্ররোচিত করতে। যে কোন মানুষকে যখন তখন মেরে ফেলা তার জন্য কিছুই না। যেমন মেরেছে রাজিবের বাবাকে। এ জন্য তাকে রাজিবের বাবার কাছে যেতে হয়নি। তার ইচ্ছেটাই ছিল যথেষ্ট। তার দেহটা চলে গেছে কিন্তু সর্বগ্রাসী অস্তিত্ব রয়েই গেছে।
অনেকবার রাজিবের চিন্তাকে এলোমেলো করে দিয়েছে সে। রাজিব যতবার তার কাছ থেকে ছুটতে চেয়েছে ততবারই তার মাঝে ভীতির জন্ম হয়েছে। এলোমেলো হয়ে গেছে সব চিন্তা। যেন রশি ধরে টান দিয়েছে শয়তানটা আর সে সুড়সুড় করে এসে হাজির হয়েছে আদিত্যের সামনে। দাসানুদাসের মতো তার ইচ্ছে পূরণ করেছে। ইচ্ছে পূরণের জন্য তাকে কোথাও যেতে হয় না। ঘরের মধ্যে একটা নির্দিষ্ট জায়গায় সে বসে থাকে। আর সব কিছু ঠিকঠাক মতো হাজির হয়ে যায় এ ঘরে। তার মনের মধ্যে কোন ইচ্ছের উদয় হওয়া মানে ইচ্ছেপূরণ। তবে কখনও কখন ওই ইচ্ছে পূরণের জন্য দ্বিতীয় কোন ব্যক্তির সাহায্য লাগে। যেমন সে ব্যবহার করছে রাজিবকে। এতদিন তার সম্পর্কে কেউ কিছু জানতো না। এলাকার লোক জানতো এটা একটা ভূতের বাড়ি। ভূতের বাড়িতে যারা এসেছে জীবন নিয়ে কেউ ফেরেনি। ফেরেনি চরম ক্ষমতাধর ডাকাত দল পর্যন্ত। কাজেই ওর কথা জানার কোনো সুযোগ কারও ছিলো না। প্রথম জানলো রাজিব। জানলো এক সময় সে দুর্দান্ত ক্ষমতা আর প্রভাবশালী একটা মানুষ ছিল। কিন্তু কোন একটা বিপর্যয়ে সে তার দেহ হারায়। দেহ ছাড়াই এখনও সে অসীম ক্ষমতাধর। তবে রক্ত পানের কোর্সটা পূরণ হলেই সে তার হারানো দেহটা ফিরে পাবে। তখন তার ক্ষমতা কতো হবে ভাবলেই শিউরে ওঠে রাজিব।
প্রথম দিকে আদিত্যকে দেখা যেত না। কেমন যেন একটা ধোঁয়াটে ধোঁয়া দেখতে পেত। কিন্তু এখন আদিত্যের চেহারা অনেকটাই স্পষ্ট। যত দিন যাচ্ছে যত বেশি রক্ত পান করছে, চেহারা ততই আরো স্পষ্ট হয়ে উঠছে। একজন শক্তিশালী ক্ষমতাধর লোকের সাথে থাকলে যা হয় রাজিবের মধ্যেও তা হয়েছে। সে এখন অনেক আত্মপ্রত্যয়ী, অনেক স্মার্ট। তবে স্মার্ট না বলে ওভার স্মার্ট বলাই ভালো। গ্রামের কোন মানুষকে এখন আর সে মানুষ বলে মনে করে না। আগে যে সব মুরব্বির সাথে সে মুখ তুলে কথা বলত না, দেখা হলে আগ বাড়িয়ে সালাম দিতো এখন তাদের দিকে ফিরেও তাকায় না রাজিব। গায়ে গায়ে ঠেস লাগলেও কথা বলে না। গায়ের লোকের সাথে সে বেশ উচ্চস্বরে কমান্ডিং ভয়েজে কথা বলে। এই নিয়ে গাঁয়ে বেশ ফিসফাস হয়। হঠাৎ ধনী হয়ে ধরাকে সরা জ্ঞান করছে, তবে আড়ালে এসব কথা বললেও রাজিবের সামনে কেউ কিছুই বলে না। যেচে পড়ে রাজিবের শত্রু হতে চায় না তারা। যে কোনভাবেই হোক তারা জেনে গেছে রাজিবের ক্ষমতা অনেক। যদিও ক্ষমতার উৎস তাদের অজানা।
রাজিব সর্বক্ষণ উপলব্ধি করে আদিত্যের ছায়া যেন তাকে ঘিরে থাকে। আর সে ছায়া তাকে বার বার বাঁচিয়েও দেয়। রাজিব এটাও বোঝে আদিত্যের নিজের শরীর ফিরে পাবার প্রয়োজনে রাজিবের বেঁচে থাকা খুবই প্রয়োজন। তাই বিপদ আপদ নিয়ে আজকাল মোটেও ভয় পায় না রাজিব। একবার শহরেও গিয়েছিল রাজিব ব্যবসার কাজে। বিকেল বেলা ট্যাক্সির খোঁজে ও ফুটপাথ ধরে হাঁটছিল। হঠাৎ কয়েকজন লোক তাকে ঘিরে ধরে। একজন বুকে ছুরি ঠেকিয়ে বলল,
: যা আছে ঝটপট দিয়ে দে। দেরি করলে ফুটা কইরা দিমু।
ঘাবড়ে গেলো রাজিব। তার পকেটে অনেক টাকা। ভাবলো টাকা গেলে টাকা পাওয়া যাবে বিশেষ করে আদিত্য যখন রয়েছে। কিন্তু জীবন গেলে আর জীবন ফিরে পাওয়া যাবে না। রাজিব টাকা বের করার জন্য পকেটে হাত দেয়। কিন্তু তখনই সামনের লোকের বিস্মিত আর্তস্বর শুনে তাকিয়ে দেখে ছিনতাইকারীর হাতের ছুরিটা গলে গলে পড়ছে। লোকগুলো ভয়ে বিস্ময়ে দৌড় দিয়ে চলে যায়। হো হো করে হেসে ওঠে রাজিব। সে বুঝতে পারে আদিত্যই এ ঘটনা ঘটালো। আর একবার একটা অ্যাক্সিডেন্ট হতে যাচ্ছিল তার জেবরা ক্রসিং ছেড়ে খালি রাস্তা দিয়ে পার হচ্ছিল রাজিব। হঠাৎ কোথা থেকে ধেয়ে এলো একটা বাস। রাজিবের গা ছুঁয়ে গেল। রাজিব বুঝল এখনই সে বাসের নিচে পড়বে। বাসের একেবারে সামনে। সে মুহূর্তে অনেক কিছু ভেবে নিল। সে এখানে এই শহরে মারা গেলে কেউ তাকে চিনবে না। তার লাশ দাফনের জন্য গ্রামেও নেবে না কেউ। ঠিকানাই জানবে না, নেবে কী করে। বেওয়ারিশ লাশ হিসেবে আঞ্জুমানে মফিদুল ইসলাম তার লাশ দাফন করবে। এই যা সে তো হিন্দু। তাহলে কী করবে। আর কি সৎকার হবে না। হিন্দুর বেওয়ারিশ লাশের কী হয় তা জানা নেই রাজিবের। তাকে কি ফেলে দেবে কোথাও। কে জানে। মা দিনের পর দিন পথ চেয়ে থাকবে। বুক চাপড়ে কাঁদবে। কাঁদতে কাঁদতে একদিন মারাই যাবে। পড়ে থাকবে তার বিত্তবৈভব সহায় সম্বল। ভাবনা শেষ হবার সাথে সাথেই চোখ বন্ধ করে গাড়ির মাথাটা যেন তার পিঠ স্পর্শ করে। কিন্তু কই সে যে চাপা পড়ছে না। হলো কি! দু’চার মিনিট চোখ বন্ধ রেখে চোখ খোলে রাজিব। কোথায় বাস আর কোথায় কী।
রাস্তাঘাটে বাসের কোনো চিহ্নই নেই। বাসটা যেন বেমালুম গায়েব হয়ে গেছে। রাজিব বুঝতে পারে এবারও তাকে বাঁচিয়ে দিল আদিত্য।

সতেরো.
বাবা মারা যাওয়ার পর বেশ কয়েকদিন খুব কান্নাকাটি করে মা। অসুখ না বিসুখ না একবারেই ভালো মানুষ কি করে হঠাৎ মারা গেল। এ প্রশ্নের মীমাংসা তার কাছে নেই। তবে শেষ পর্যন্ত নিজেকে সান্ত¦না দিয়েছে এই বলে যে ভগবান বোধ হয় এই চেয়েছিলেন। এই পর্যন্তই তার পরমায়ু লেখা ছিল। তার বাইরে যাবে কী করে। ধীরে ধীরে স্থির হয়ে আসেন মা। রাজিবের দিকে মনোযোগ দেন। দ্বিতীয় স্বামীর কারণে এতদিন রাজিবের দিকে কোনই মনোযোগ দিতে পারেননি। আদর করে কাছেও ডাকতে পারেননি। এখন সব আদর সব স্নেহ ঢেলে দেন অকাতরে। কিন্তু নিজের ছেলেকে যেন ঠিকমতো চিনতে পারেন না। দিন দিন অন্যরকম হয়ে যাচ্ছে। তাদের দারিদ্র্য অবস্থা কাটিয়ে এখন তারা অনেক ধনী। এত অল্প দিনের মধ্যে কী করে তারা এত ধনী হলো এটাও বোঝেনা মা। বুঝতেও চান না। সারা জীবন দুঃখ দারিদ্র্যে অনেক কষ্ট করেছেন। এখন একটু আরাম আয়েশ একটু বিলাসিতা করতে পারছেন ছেলের কারণে, এতেই তিনি মহা খুশি।
(সমাপ্ত)

SHARE

4 COMMENTS

Leave a Reply