Home খেলার চমক ক্রিকেটের কলঙ্ক পাতানো খেলা

ক্রিকেটের কলঙ্ক পাতানো খেলা

রাফিউল ইসলাম
ক্রিকেট খেলাটিকে বেশ প্রাচীন খেলা বলা চলে। তবে কখন বা কোথায় খেলাটি প্রথম প্রচলন হয়েছিল তার সঠিক ইতিহাস জানা না গেলেও এটার জন্ম ইংল্যান্ডেই। এজন্য ইংল্যান্ডকে ক্রিকেটের জনক বলা হয়। এ খেলাটি শুরু হয় সম্ভবত ১২৫০ থেকে ১৩৫০ সালের যে কোনো সময়ে। সে সময়ে ক্রিকেট খেলাটি ছিল সাধারণ পর্যায়ে। ইংল্যান্ডের উঁচু  শ্রেণীর লোকদের কাছেই এ খেলাটি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে এবং তারা নতুন রূপ দেয়ার জন্য চিন্তা-ভাবনা করে সপ্তদশ শতাব্দীর দিকে। এ সময় বিভিন্ন ক্লাব প্রতিষ্ঠিত হয় ও বিভিন্ন টুর্নামেন্টের আয়োজন করা হয়। ধীরে ধীরে খেলার অগ্রযাত্রা এগিয়ে যেতে থাকে এবং জনপ্রিয় হয়ে ওঠে বিভিন্ন দেশে।
এখন তো ভদ্রলোকের খেলা বলতে এককথায় সবাই ক্রিকেটের কথা বলে। বলবেই বা না কেন? ক্রিকেটের অতীত ইতিহাস তো সেটাই প্রমাণ করে। বিশেষ করে ভিক্টোরিয়ান যুগে প্রধান বিনোদন হিসেবে গণ্য হতো ক্রিকেটই। তবুও এই ক্রিকেটে ম্যাচ ফিক্সিংয়ের কলঙ্কময় অধ্যায়ের সূচনা হয়েছিল অনেক আগেই। তবে গত ৩০-৪০ বছরে ক্রিকেটের ব্যাপক উন্নতির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে ম্যাচ ফিক্সিংয়ের মতো কেলেঙ্কারির ঘটনাও। ক্রিকেটের ইতিহাসে প্রথম ম্যাচ ফিক্সিংয়ের ঘটনা ঘটে আজ থেকে ১৯৬ বছর আগে, ১৮১৭ সালে। সে ঘটনায় ইতিহাসে প্রথমবারের মতো এক তারকা ক্রিকেটারকে আজীবন নিষিদ্ধ ঘোষণাও করা হয়। মজার কিষয় হচ্ছে, সেই ম্যাচটি হয়েছিল ‘হোম অব ক্রিকেট’ খ্যাত বিখ্যাত লর্ডসের মাঠে। ধারণা করা হয়, উপমহাদেশেও পাতানো খেলার সূচনা ইংরেজদের হাত ধরে। কারো কারো মতে, ১৮৯৩ সালে গুজরাটে চাম্পানের অনুষ্ঠিত এক ক্রিকেট খেলায় অনৈতিকতার আশ্রয় নেয়া হয়েছিল।

জন্মভূমিতেই পাতানো ম্যাচের সূচনা
ক্রিকেট যারা নিয়ন্ত্রণ করেন খোদ তাদের দেশেই প্রথম ম্যাচ পাতানো হয়েছিল। আর তার মাসুল দিতে হয়েছিল সে সময়কার তারকা ক্রিকেটার উইলিয়াম ল্যাম্বার্টকে। ঊনিশ শতকের প্রথম দুই দশকের অন্যতম সেরা ফার্স্ট ক্লাস ক্রিকেটার ছিলেন ল্যাম্বার্ট। খেলেছেন ১৮০১ থেকে ১৮১৭ সাল পর্যন্ত। ইংলিশ এই ব্যাটসম্যানকে তখন সবচেয়ে সেরা ক্রিকেটার হিসেবে গণ্য করা হতো। মাঠে সব ক্ষেত্রেই তার সমান পারদর্শিতা ছিল। ব্যাটিং, আন্ডার আর্ম স্লো বোলিং, ফিল্ডিং, এমনকি উইকেটকিপার হিসেবেও সফল ছিলেন। ডানহাতি এই ব্যাটসম্যানের জন্ম ইংল্যান্ডের সারেতে, ১৭৭৯ সালে। ঘরোয়া লিগে সারের হয়ে বেশিরভাগ ম্যাচ খেলেছেন। এছাড়া সে সময়ের প্রধান ক্লাব এমসিসির (মেরিলিবোন ক্রিকটে ক্লাব) হয়ে বেশ কয়েকটি ম্যাচ খেলেছেন। ক্যারিয়ারে অনেক সাফল্য থাকলেও শেষটা হয়েছিল ম্যাচ ফিক্সিংয়ের মতো কলঙ্কজনক ঘটনায়। বিশ্ব ক্রিকেটে প্রথম আলোচনায় আসেন প্রথম ব্যাটসম্যান হিসেবে লর্ডসের মাঠে এক ম্যাচে দু’টি সেঞ্চুরি করে। ১৮০১ থেকে ১৮১৭ সাল পর্যন্ত খেলেছেন ৬৪ ম্যাচ। ১১৪ ইনিংসে ২৭ দশমিক ৬৫ গড়ে তার সংগ্রহ ছিল ৩০১৪ রান। পাঁচ ইনিংসে ছিলেন অপরাজিত। সিঙ্গেল উইকেট ম্যাচও খেলেছেন অনেক। কিন্তু জনপ্রিয়তাই তার কাল হয়ে দাঁড়ায়। তখনকার আরেক জনপ্রিয় ইংলিশ ক্রিকেটার ছিলেন লর্ড ফ্রেডরিক বিউক্লার্ক। ল্যাম্বার্টের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন তিনি। ১৮১০ সালের এক ম্যাচে ফ্রেডরিকের দল ল্যাম্বার্টের দলের কাছে পরাজিত হয়। ল্যাম্বার্টের দল কৌশল অবলম্বন করে সব বল পিচের বাইরে করতে থাকে। প্রতিশোধ হিসেবে ফ্রেডরিক তার প্রভাব খাটান মেরিলিবোন ক্রিকেট ক্লাবে। মূলত তার সুপারিশেই তখনকার আইন পরিবর্তন করে বেশি ওয়াইড বল নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। এটি ১৮১১ সালের ঘটনা। এ দুই প্রতিদ্বন্দ্বী আবার মুখোমুখি হন। অল-ইংল্যান্ড দলের অধিনায়ক হিসেবে মাঠে ছিলেন ফ্রেডরিক আর নটিংহামের নেতৃত্বে ছিলেন ল্যাম্বার্ট। ম্যাচটি ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম বিতর্কিত ম্যাচ। ১৮১৭ সালের ১৮ জুন অনুষ্ঠিত আরেকটি ম্যাচ ছিল লর্ড এফ বিউক্লার্ক একাদশ বনাব ডব্লিউ ওয়ার্ডস একাদশের মধ্যে। ম্যচাটিতে লর্ড ফ্রেডরিকের দল ৬ উইকেটের জয় পেলেও ম্যাচ শেষে দু’দলের বিপক্ষেই পাতানো শ্যাচের অভিযোগ ওঠে। এমসিসিতে লর্ড ফ্রেডরিকের প্রভাব থাকায় ল্যাম্বার্টের বিরুদ্ধে সাক্ষীও জোগাড় করে ফেলেন। ফলে এমসিসি ল্যাম্বার্টকে ক্রিকেট থেকে আজীবন নিষিদ্ধ ঘোষণা করে।

উপমহাদেশে যেভাবে এলো
১৯ শতকের শুরুতে ব্রিটিশরা তাদের ঊপনিবেশ ভারতে ক্রিকেট নিয়ে আসে। আর ভারতীয় উপমহাদেশে ক্রিকেটের শুরুটা ছিল বিতর্কিত। কেননা প্রথম ম্যাচেই তারা জয় পাওয়ার জন্য ম্যাচ ফিক্সিং করার চেষ্টা করে। ১৮৯৩ সালে গুজরাটের চাম্পানের ইংরেজ ও ভারতীয়দের মধ্যে অনুষ্ঠিত সেই ম্যাচে ব্রিটিশ ক্রিকেটার এবং কর্তাব্যক্তিরা এক স্থানীয় ক্রিকেটারকে হাত করে নেয় ম্যাচ জেতার জন্য। অবশ্য ম্যাচটিও যেনতেন ছিল না! সে বছর ওই অঞ্চলে ভীষণ খরা দেখা দেয়। সেখানকার কৃষকরা ব্রিটিশদের সে বছর খাজনা আদায় না করার অনুরোধ করে। কিন্তু সে এলাকার নিযুক্ত ব্রিটিশ অফিসার ক্যাপ্টেন অ্যান্ড্রু রাসেল তাদের সে অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করেন এবং তাদের অদ্ভুত এক প্রস্তাব দেন। গ্রামের মানুষরা যদি তাদেরকে ক্রিকেট ম্যাচে হারাতে পারে তাহলে শুধু সে বছরই নয়, পরপর তিন বছর তাদের খাজনা মওকুফ করে দেয়া হবে। তাদের খাজনার টাকা বহন করবে সেই ব্রিটিশ অফিসার। প্রস্তাবটা অদ্ভুত এই কারণে যে, সে গ্রামের মানুষদের কাছে ক্রিকেট ছিল একদমই অপরিচিত। কিন্তু দেয়ালে পিঠ থেকে গেছে বিধায় তারা সে প্রস্তাবে রাজি হয়ে যায়। ভুবান নামে স্থানীয় একজন সেই গ্রামের দলের নেতৃত্বে থাকে। ব্রিটিশদের এমন প্রস্তাবের জন্য ক্যাপ্টেন রাসেলের বোন লেডি এলিজাবেথের খারাপ লাগে। তিনি গ্রামের মানুষদের সাহায্যে এগিয়ে আসেন। তিনি ম্যাচের নিয়ম-কানুন তাদের শিখিয়ে দেন। এদিকে ক্যাপ্টেন রাসেলও পিছিয়ে ছিলেন না। তিনি কোনো রিস্ক নিতে রাজি ছিলেন না। তাই সেই গ্রামের লাখা নামের একজনকে হাত করেন ম্যাচ পাতানোর জন্য এবং তাকে বলেন, সে যদি তাদের কথামতো খেলে তাহলে তাকে বিশেষ পুরস্কার দেয়া হবে। লাখা ব্রিটিশদের কথা রেখেছিল। ম্যাচের প্রথম দিনই সে বেশ কয়েকটা ক্যাচ এবং ফিল্ডিং মিস করে। কিন্তু আল্লাহ ছিলেন গ্রামের পক্ষেই। শেষ পর্যন্ত জয় পায় ভুবানের দলই।

খেলা পাতানোর দায়ে অভিযুক্ত ক্রিকেটার
অতিরিক্ত টাকার লোভে অনেক বিখ্যাত টেস্ট ও ওয়ানডে ক্রিকেটার পাতানো খেলায় জড়িয়ে পড়েন। অবশ্য এর খেসারতও দিতে হয়েছে তাদের। বেশিরভাগ ক্রিকেটারই এর জন্য আজীবন নিষিদ্ধ হয়েছেন। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এ পর্যন্ত ১৪ ক্রিকেটার আজীবন নিষিদ্ধসহ বিভিন্ন মেয়াদে নিষিদ্ধ হয়েছেন। ব্রিটিশরা ক্রিকেটের কলঙ্ক ম্যাচ পাতানোর যে বীজ উপমহাদেশে বুনে গেছেন তার কলঙ্ক এখনো আমাদের স্তম্ভিত করে চলেছে। তাই তো কিছুদিন পরপরই উপমহাদেশের ক্রিকেটারের নামের পেছনে জুড়ে যাচ্ছে পাতানো ম্যাচ খেলার কলঙ্ক। কিছুদিন আগেই শেষ হওয়া কোটি টাকার টুর্নামেন্ট ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগের (আইপিএল) শেষ দিকে বেশ কয়েকজন ভারতীয় ক্রিকেটার ম্যাচ ফিক্সিংয়ে বা পাতানো খেলায় জড়িয়ে পড়েন। তাদের বিরুদ্ধে আদালতে এখন শুনানি চলছে। এ ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই বাংলাদেশের এক সাবেক অধিনায়কের (মোহাম্মদ আশরাফুল) বিরুদ্ধে এমন কথা শোনা যাচ্ছে। এবং তিনি তা স্বীকারও করেছেন। আর লঘু শাস্তির দাবি করেছেন।
ম্যাচ পাতানোর জন্য অভিযুক্ত ১৪ ক্রিকেটারের মধ্যে ৯ জনই উপমহাদেশের। এর মধ্যে ৫ জন পাকিস্তানের ৩ জন ভারতীয় এবং একজন বাংলাদেশের। পাকিস্তানি ক্রিকেটারদের মধ্যে প্রথমেই আছেন সেলিম মালিক। ২০০০ সালে খেলা পাতানোর অভিযোগে সাবেক এই পাকিস্তানি অধিনায়ক আজীবন নিষিদ্ধ হন (নিষেধাজ্ঞা শেষ হয় ২০০৮ সালে)। শুধু তা-ই নয়, প্রথম ক্রিকেটার হিসেবে তিনি জেলও খাটেন। এরপরই আরেক পাকিস্তানি ক্রিকেটার আতা-উর রহমানকেও একই বছর বুকিদের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা থাকার অভিযোগে আজীবন নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয় (নিষেধাজ্ঞা শেষ হয় ২০০৬ সালে)। ১৯৯৪ সালে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ক্রাইস্টচার্চে এক ম্যাচে বাজে বোলিংয়ের জন্য তাকে ১ লাখ পাকিস্তানি রুপি দেয়ার কথা হয়। সে অভিযোগ প্রমাণিত হলে ২০০০ সালে তাকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। সর্বশেষ নিষিদ্ধ ঘোষিত তিন পাকিস্তানি ক্রিকেটার হলেন মোহাম্মদ আমির, সালমান বাট ও মোহাম্মদ আসিফ। তাদের তিনজনের বিরুদ্ধেই ২০১০ সালের আগস্টে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে এ ম্যাচে স্পট ফিক্সিংয়ের জন্য অভিযুক্ত করা হয়। সাজা হিসেবে মোহাম্মদ আমিরের ৫ বছর, মোহাম্মদ আসিফের ৭ বছর এবং সালমান বাটকে ১০ বছরের জন্য নিষিদ্ধ করা হয়।
ভারতীয় ক্রিকেটারের মধ্যে অন্যতম সফল অধিনায়ক ব্যাটসম্যান মোহাম্মদ আজহারউদ্দিনের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে। দক্ষিণ আফ্রিকান অধিনায়ক হ্যান্সি ক্রোনিয়ে তার জবানবান্দিতে মোহাম্মদ আজহারউদ্দিনের জড়িত থাকার কথা বলেন। যিনি কিনা নিজেও ম্যাচ ফিক্সিংয়ের অভিযোগে অভিযুক্ত ছিলেন। তার জবানবন্দির ভিত্তিতে তদন্ত করে আজহারউদ্দিনকে আজীবন নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয় (শেষ হয়েছে ২০১২ সালে)। ভারতীয় অন্য দুই ক্রিকেটার হলেন অজয় জাদেজা এবং মনোজ প্রভাকর। দু’জনকেই পাঁচ বছরের জন্য নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়।
উপমহাদেশের বাইরে এক ক্রিকেটারের বিরুদ্ধে ম্যাচ ফিক্সিংয়ের অভিযোগ উঠলে ক্রিকেট বিশ্বে হইচই পড়ে যায়। তিনি ছিলেন দক্ষিণ আফ্রিকান অন্যতম সেরা অধিনায়ক হ্যান্সি ক্রোনিয়ে। ২০০০ সালে দিল্লি পুলিশ তার সঙ্গে বুকিদের সংশ্লিষ্টতা খুঁজে পায়। পরে অবশ্য ক্রোনিয়ে নিজেও দোষ স্বীকার করেন। ২০০১ সালে তাকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। এই তালিকায় আরো দুই দক্ষিণ আফ্রিকান ক্রিকেটারও আছেন। অবশ্য তাদের সাজা কম হয়েছে। এদের মধ্যে একজন হার্ডহিটার ওপেনার হার্শেল গিবস, আরেকজন পেসার হেনরি উইলয়ামস। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল ২০০০ সালে নাগপুরে ভারতের বিপক্ষে এক ম্যাচে ফিক্সিংয়ের জন্য টাকা নেয়ার। দু’জনকেই ছয় মাসের জন্য নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। এছাড়া কেনিয়ার ব্যাটসম্যান মরিস ওদুম্বের বিপক্ষে ২০০৪ সালে বুকিদের কাছ থেকে টাকা নেয়ার জন্য পাঁচ বছরের জন্য এবং ওয়েস্ট ইন্ডিজের অলরাউন্ডার মারলন স্যামুয়েলসকে দুই বছরের জন্য নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। ২০০৭ সালে ভারতের বিপক্ষে এক ম্যাচের আগে বুকিদের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য স্যামুয়েলসকে এই সাজা দেয়া হয়। এছাড়া ফার্স্ট ক্লাস ক্রিকেটে এখন পর্যন্ত বিভিন্ন মেয়াদে ৮ জন ক্রিকেটার নিষিদ্ধ হয়েছেন।

SHARE

Leave a Reply