Home স্বাস্থ্য কথা সাবধান! পানিবাহিত রোগ

সাবধান! পানিবাহিত রোগ

সোহেল আজিজ
গ্রীষ্মের তাপদাহ ধুয়ে দিতে বর্ষা আসে একরাশ স্বস্তি নিয়ে। কিন্তু এই স্বস্তির মাঝেও লুকিয়ে থাকে নানা ধরনের রোগবালাইসহ অনেক শারীরিক সমস্যা। আর তাই এসব সমস্যা এড়ানোর জন্য আমাদের সবার প্রয়োজন কিছু বাড়তি সচেতনতা। বন্ধুরা, আমরা নিজেরা একটু সাবধানতা অবলম্বন করে এসব রোগব্যাধিকে পাশ কাটিয়ে সুস্থতার সাথে চলতে পারি।
বর্ষাকালে তীব্র গরম, হঠাৎ আবার বৃষ্টি। আবহাওয়ার এই তারতম্যের কারণে তোমাদের মতো শিশু-কিশোরদের মাঝে দেখা দেয় নানা সমস্যা। এ সময় সাধারণত তেমারাই বেশি অসুখ-বিসুখের শিকার হও তা আমরা জানি, এমনকি তোমার প্রিয় কিশোরকণ্ঠও। তাইতো সে বিষয়ে আজ তোমাদেরকে জানাবো।

কেন ছোটরা অসুখ-বিসুখের বেশি শিকার
কারণ বড়দের তুলনায় তোমাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম। সেজন্যই তো প্রয়োজন বাড়তি সতর্কতা। রোগবালাই সম্পর্কে ঢাকা মেডিকেল কলেজের শিশু বিভাগের অধ্যাপক লুৎফুল এহসান ফাতমী জানিয়েছেন, এ সময় সাধারণত সর্দি, কাশি, শ্বাসকষ্ট, জ্বর এবং পানিবাহিত রোগ যেমন ডায়রিয়া, আমাশয়, জন্ডিসসহ চর্মরোগ ও টাইফয়েড পর্যন্ত হতে পারে। এছাড়া বর্ষাকালে মশার প্রাদুর্ভাব বেড়ে যাওয়ায় ডেঙ্গু ও ম্যালেরিয়ার মতো মারাত্মক রোগে তোমরা আক্রান্ত হতে পারো।

বর্ষাকালে রোগের প্রাদুর্ভাব বেশি
পানিই জীবন। সভ্যতার সূচনালগ্ন থেকেই মানুষের স্বাস্থ্য, সম্পদ ও অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রা পানির সুব্যবস্থাপনার ওপর নির্ভরশীল। উন্নত সমাজ ও আর্থিক প্রবৃদ্ধি অর্জনে পানির সুব্যবহারের জন্য বিনিয়োগ সর্বাপেক্ষা কার্যকর বিনিয়োগ। এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, বিশ্বে প্রায় দুই কোটি ৫০ লাখের মতো জনসমষ্টির জন্য কোনো স্যানিটেশন-ব্যবস্থা নেই। দুই কোটিরও বেশি জনগোষ্ঠী প্রয়োজনমাফিক বিশুদ্ধ খাওয়ার পানি পানের সুবিধাবঞ্চিত এবং এখনো বিশ্বের প্রায় ৪০টি দেশে দুই কোটিরও বেশি মানুষ পানির অভাবের মধ্যে দিন যাপন করছে। এ কথা অনস্বীকার্য, এ পানি সমস্যার মূল শিকারে পরিণত হয় বিশ্বের শিশুরা, অর্থাৎ তোমাদের মতো শিশু-কিশোররা, অর্থাৎ ছোটরা। পানিবাহিত নানা রকম ছোঁয়াচে রোগের কবলে পড়ে প্রতিদিন ঘটে অনেক শিশুর অনাকাক্সিক্ষত মৃত্যু।

রাসায়নিক দূষণের নানা অসুখ
খাওয়ার পানি যখন বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দোষে দূষিত হয়, তখন নানা রকম রাসায়নিক বিষাক্ত পদার্থ মানুষের দেহে প্রবেশ করে। এতে মারাত্মক কিছু রোগের সৃষ্টি হয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলোÑ
আর্সেনিকদূষণ : আর্সেনিক অত্যন্ত বিষাক্ত দ্রব্য এবং স্বল্পমাত্রাতেই এটি মানবদেহের ক্ষতিসাধন করে। এর অন্য নাম ব্ল্যাকফুট ডিজিজ। ত্বক, ফুসফুস, কিডনি ছাড়াও এতে ক্যানসার হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
ফ্লুরাইডস : তোমাদের দাঁত, অস্থিকাঠামো গঠনে এটি এক প্রয়োজনীয় উপাদান। পানিতে এর অতিরিক্ত মাত্রা ফ্লুরোসিস নামের রোগ তৈরি করে। এতে তোমাদের ওজন হ্রাস পেতে থাকে, চামড়া ফ্যাকাসে হয়ে যায়। দাঁতের এনামেলে স্পট দেখা যায়। চুল যায় পড়ে ও ত্বকে প্রদাহ দেখা দেয়।
সিসা : পানির পাইপ ও ফিটিংস থেকে মূলত খাওয়ার পানিতে সিসার মিশ্রণ ঘটতে পারে। সিসা মারাত্মক বিষজাতীয় পদার্থ। দেহে রক্ত তৈরি ও স্নায়ুতন্ত্র কার্যকর রাখতে যেসব এনজাইমের দরকার, সিসা সেসব এনজাইম সিস্টেমে আঘাত হানে।
পেস্টিসাইডস : ডিডিটি জাতীয় বিষাক্ত দ্রব্য কৃষিকাজে ব্যবহারের কারণে তা পানিতে দূষণ ঘটায়।
নাইট্রেট, ব্রোমাইট, অ্যালুমিনিয়াম, ক্যাডমিয়াম প্রভৃতি বিষাক্ত পদার্থও পানিদূষণের কুফল হিসেবে তোমাদের দেহে প্রতিক্রিয়া তৈরি করে থাকে।

পানিবাহিত সংক্রামক রোগ
অধিকাংশ পানিবাহিত রোগ সংক্রামক। যেমনÑ কলেরা, টাইফয়েড, সিজেলোসিস (ডিসেনট্রি), হেপাটাইটিস-এ, এমইবিক ডিসেনট্রি।
কলেরা ও টাইফয়েডের ক্ষেত্রে অতি অল্পসংখ্যক জীবাণু মারাত্মক ডায়রিয়া তৈরি করতে সক্ষম। বাসনপত্র পরিষ্কার করা ও গোসলের জন্য প্রয়োজনমাফিক পানি না পাওয়া গেলে বেশ কিছু রোগ সংক্রমিত হয় যথাযথ পরিচ্ছন্নতা রক্ষিত না হওয়ার কারণে। চোখ, ত্বকের অসুখ ও ডায়রিয়া, ট্র্যাকোমা, স্ক্যাবিস প্রভৃতি রোগ পানিসঙ্কটের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে বিভিন্ন গবেষণাপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।
বন্ধুরা, তোমাদের শরীরে যেসব পানিবাহিত রোগজীবাণু প্রবেশ করে, তা নতুন নতুন জীবাণু যেমন সংক্রমণ ঘটায়, তেমনি পুরোনো জীবাণুগুলো নতুনভাবে মাথা চাড়া দিয়ে উঠতে পারে এবং শিশুর শরীরে সংক্রমণ ঘটাতে পারে।

প্রতিরোধ জরুরি
মিলেনিয়াম ডেভেলপমেন্ট গোল (এমডিজি) নিয়ে অধুনা বেশ কিছু পদক্ষেপ জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে গৃহীত হয়েছে। বিজ্ঞানী মহলে স্বীকৃত হয়েছে, প্রতি হাজার জনসংখ্যার বিচারে কোনো দেশে রোগীর শয্যাসংখ্যা বাড়ানোর চেয়ে প্রতি হাজারে পানির কলের সংখ্যা কীভাবে বাড়ানো যায়, তা বেশি গুরুত্ব পাওয়া উচিত; যাতে করে সবাই জীবাণুমুক্ত পানি পান, স্যানিটেশন ও হাত ধোয়ার মতো প্রাথমিক স্বাস্থ্যসম্মত জীবনযাপনের সুবিধা ভোগ করতে পারে।
স্কুলকে কেন্দ্র ধরে যদি প্রতিটি বিদ্যালয়ে সুপেয় পানি, স্যানিটেশন ও পরিচ্ছন্নতা রক্ষায় যথাযথ কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া যায়, তবে তা হবে শিশুস্বাস্থ্য রক্ষায় এক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এতে করে যেসব পানিবাহিত সংক্রামক রোগের কথা বলা হলো, তা থেকে দেশের শিশু-কিশোরদের এক বৃহৎ অংশ সুরক্ষা পাবে। ফলে স্বাস্থ্যবান ভবিষ্যৎ প্রজন্ম হিসেবে গড়ে ওঠার সুযোগ সৃষ্টি হবে। বন্ধুরা, তোমরা উদ্যোগী হয়ে তোমাদের স্কুল কর্তৃপক্ষকে এ ব্যাপারে পদক্ষেপ নেয়ার জন্য পরামর্শ প্রদান করতে পারো। তাহলে হয়তো তোমাদের দেখাদেখি অন্য স্কুলের বন্ধুরাও সচেতন হবে এবং নিজেদের স্বাস্থ্যরক্ষায় নিজেরাই এগিয়ে আসবে।

পানিবাহিত নাকের রোগ
স্ট্রবেরির মতো গোশতের দলা ঝুলে আছে নাক থেকে। ছত্রাকটির নাম রাইনোস্পোরিডিয়াম সিবেরি। বাসা বাঁধে নাকের ঝিল্লিতে। তৈরি হয় গ্রানুলোমা। গ্রানুলোমা বহিরাগত ক্ষতিকর উপাদানকে আটকে রাখার জন্য শরীরের প্রতিরোধ কোষ বাহিনী দিয়ে তৈরি হয়। তার মধ্যে থাকে এপিথেলয়েড সেল, লিম্ফোসাইট, এসব। রাইনোস্পোরিডিওসিস রোগটি হলো এই ছত্রাকজনিত গ্রানুলোমা।
কেমন করে হয় : দূষিত পানিবাহিত হয়ে স্পোরগুলো আসে মানবদেহে। যে পুকুরে গরু-বাছুর অথবা ঘোড়াকে গোসল করানো হয়, সেই পুকুরেই যদি গোসল করে মানুষ, তখন ছড়ায় রোগ। কোনো একটা জায়গায় আগে থেকে ক্ষতস্থান থাকলে সেখানে ঢুকে পড়ে স্পোর।
কোথায় কোথায় হতে পারে : নাক ও ন্যাসোফ্যারিংস, ঠোঁট, মুখের তালু, চোখের কনজাঙ্কটিভা, গ্লটিস, ল্যারিংস, ট্রাকিয়া, ত্বক ইত্যাদি।
উপসর্গ : মাংসল উপবৃদ্ধি, যার বর্ণ গোলাপি থেকে বেগুনি। লাগানো থাকে নাসারন্ধ্রের মাঝখানের পর্দায় বা পাশের দেয়ালে। পিণ্ডটিতে রক্তনালি থাকে বেশি সংখ্যায়। স্পর্শ করলে এ থেকে রক্তপাত হয়। এর পৃষ্ঠে যে সাদা ডট থাকে, সেগুলো ছত্রাকের স্পোরাঞ্জিয়া থেকে আসে। নাক বন্ধ থাকতে পারে ও নাক থেকে রক্তমিশ্রিত নিঃসরণ বা রক্তক্ষরণ হয়।
রোগ নির্ণয় : বায়োপসি ও হিস্টোপ্যাথলজি করলে স্পোরভর্তি কিছু স্পোরাঞ্জিয়া পাওয়া যায়। স্পোরগুলো হয়তো কাঁটাযুক্ত দেয়াল ভেদ করে ফুটে বের হচ্ছে।
চিকিৎসা : পুরো পিণ্ডটিকে কেটে বাদ দেয়া এবং এর ভিত্তিমূলের চারদিকের অনেকটা অংশ ডায়াথারমির মাধ্যমে পুড়িয়ে বা কটারি করে দেয়া। রোগটির রেকারেন্স বা পুনরাবির্ভাব হতে পারে। ড্যাপসোন ওষুধটি ব্যবহার করা যায়, যেটি আবার লেপ্রসি বা কুষ্ঠ রোগে ব্যবহূত হয়।

কিছু পরামর্শ

  •   পুরো বর্ষাকালটা অবশ্যই ফোটানো ও বিশুদ্ধ পানি পান করতে চেষ্টা করবে।
  •    যেখানে সেখানে মল ফেলা যাবে না, এতে জীবাণু সহজেই ছড়িয়ে যেতে পারে। তাই তোমার ছোট ভাই-বোনকে টয়লেটে গিয়ে মলত্যাগে অভ্যস্ত করে তুলতে সচেষ্ট হও। এতে তার সাথে তোমার পরিবারের অন্যরাও সুরক্ষিত থাকবে।
  •    সামান্য সর্দি-কাশি ও জ¦রকে অবহেলা করা ঠিক হবে না, কারণ এর থেকে নিউমোনিয়া হয়ে জীবন বিপন্ন হতে পারে।
  •   সর্দি-কাশি হলে লেবুর রস, তুলসী পাতার রস ও আদা খেতে পারো।
  •   এ সময় মেঝেতে শোয়া যাবে না।
  •   বাড়ির আশেপাশের মশার আবাসস্থল ধ্বংস করতে হবে।
  •   এই বর্ষাকালে গ্রামবাংলায় বন্যার প্রাদুর্ভাব হয়। এক্ষেত্রে যেটি সবচেয়ে বেশি আশক্সক্ষাজনক তা হলো পানিতে ডুবে যাওয়া ও সাপে কাটা। তাই কোনো অবস্থাতেই পানিতে নামা যাবে না।
  •   সর্বোপরি তোমাকে নিজের জন্য যেমন তেমনি তোমার আদরের ভাই বা বোনটির জন্য পুষ্টিকর খাবারের দিকে নজর দিতে হবে, এতে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়বে।
SHARE

Leave a Reply