Home তোমাদের গল্প স্বপ্ন

স্বপ্ন

নাহিদ জিবরান

কাসেম প্রতিদিনই খেলাধুলায় ব্যস্ত থাকে। সেদিনও সকালবেলায় না খেয়ে খেলতে বেড়িয়ে পড়লো। যাওয়ার আগে আম্মুকে ডেকে বিশ টাকা চাইলো। তারপর গেট লাগাতে বললো। হাতে ব্যাট নিয়ে বেড়িয়ে পড়লো কাসেম। ভোরের বাতাসটা খুব ভালোই লাগছিলো। তখন বাজে সাড়ে ছয়টা। মাঠে উপস্থিত হয়ে কাসেম দেখলো বিপরীত টিম তখনও এসে হাজির হয়নি। তারপর চিন্তা করলো সকালের নাস্তাটা করে ধির-স্থিরভাবে খেললে ভালো লাগবে।
খেলা শুরু হলো সাতটায়। একটু পড়েই সূর্যিমামা একপ্রকার হুমড়ি খেয়ে পড়ল। রীতিমতো টানা রোদের মধ্যে খেলতে হলো। খুব কষ্ট করে ম্যাচটা জিতে কাসেমের দল জিতে গেলো।
সবাই বাড়ি থেকে কিছু টাকা নিয়ে এসেছিল। কথা ছিল খেলা শেষে কোথাও বেড়াতে যাবে। ব্যস, আর তো দেরি করা যায় না। সবাই বসে ঠিক করলো আমরা এই টাকা দিয়ে ঘুরতে যাবো। কোথায় যেতে পারি তার একটা পরিকল্পনা হচ্ছিল। সবাই একসাথে ঠিক করলো আমরা বই মেলায় যাবো। সবাই খুবই আনন্দিত।
কাসেম বললো, কোনো সময়তো বই মেলায় যাওয়া হয়নি বা পেরে উঠিনি। এবার যাওয়া যাক। খেলার পর বাসায় এসে হাত মুখ ধুয়ে খাওয়াটা সেরে নিলো। তারপর একটু শুয়ে পড়লো। এদিকে আম্মু এসে বললেন, কি আপনার চাকরি শেষ?
সে কিছুই বললো না। শুধু হেসেই গেলো।
হৃদয় কাসেমকে ফোন দেয় ঠিক তিনটার সময়। বললো, চারটার দিকে আমার বাসার সামনে থাকবি।
কাসেম বললো, ঠিক আছে থাকবো, সবাই আসবে তো?
হ্যাঁ সবাই আসবে।
কাসেম যখন জামা-কাপড় পড়া শেষ করলো তখন আবার আম্মু এসে বললেন, আপনি কি চাকরিতে যাচ্ছেন?
কাসেম বললো, না, ঘুরতে যাচ্ছি।
আম্মু জিজ্ঞেস করলেন, কোথায়?
কাসেম বললো, বই মেলায় যাচ্ছি।
সবাই আসতে আসতে সাড়ে চারটা বেজে গেল। তারপর রওনা দিলো বই মেলার উদ্দেশ্যে। ক্যামেরা সাথে নিলো সৌরভ। খুব ভালোই লাগছিলো। কিন্তু আবার ভয়ও হচ্ছে, কারণ আব্বুকে বলে আশা হয়নি।
বই মেলায় অনেক ধরনের বই আছে। কাসেমের এতো ভালো লাগছিল যে, সে কথা বলে বোঝানো যাবে না।
সন্ধ্যে নেমে এলো। এবার ঘরে ফেরা দরকার। কাসেমের বন্ধুরা বললো, আর একটু ঘুরে যাওয়া যাক। তারপর সেখানে কিছু খাওয়া-দাওয়া করা হলো। এবার বাসায় ফেরার পালা। এদিকে আব্বুজান ফোন দিচ্ছেন, তুমি কোথায় আছো।
কাসেম বললো, বই মেলায় এসেছি সবাই মিলে।
আব্বুজান বললেন, আমাকে জানিয়ে গেলে না কেন? তাড়াতাড়ি বাসায় এসে পড়ো।
কাসেম বললো, ঠিক আছে। তারপর তাড়াতাড়ি রিক্সা নিলো। এক রিক্সায় কাসেমসহ চারজন উঠলো। রিক্সাটা খুবই ছোট, মোটেও বসার জায়গা হচ্ছিল না। তখন কাসেম বললো, মামা রিক্সাটা একটু বড় হলে ভালো হতো। সে তখন বললো আমি খুবই গরিব। কুমিল্লার বক্স বানাতে অনেক টাকা লাগবে।
কাসেম জানতে চাইলো, কত টাকা লাগতে পারে?
রিক্সাচালক বললো, তা প্রায় ১৩-১৫ হাজার টাকা লাগবে।
উৎসুক হয়ে জুয়েল জিজ্ঞেস করলো, আপনার আর কে কে আছে?
তখন রিক্সাচালক বললে, বাবা মাসহ স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে থাকি। খুব টেনেটুনে সংসার চলে।
এবার আবার কাসেম বললো, আপনি কোথায় থাকেন?
রিক্সাচালক জানালো সে মাদারটেকে থাকে।
কাসেম বললো, আপনার কয়টি সন্তান?
আমার দুই ছেলে, স্কুুলে পড়ে। বড় ছেলে ঞড়ি-তে আর ছোট ছেলে ঙহব-এ। দুজনরই রোল নম্বর এক। তারা লেখা-পড়ায় খুব ভালো।
কাসেমরা অবাক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে থাকলো। আর মুখে বললো, মাশাআল্লাহ!
কাসেম বললো, ছেলেদের খরচ কিভাবে চালান?
সে বলে উঠলো, আমি রাত-দিন পরিশ্রম করে কোনো মতে সংসার চালাই। পনের বছর ধরে রিক্সা চালাই। বনশ্রীতে পাঁচ কাঠা জমি আছে। এখনও সেখানে বাড়ি করিনি।
সাধারণত যেটা বাস্তবে দেখা যায় রিক্সাওয়ালারা তাদের সন্তানদের লালন-পালন করে কাজে পাঠায়। আর এখানে দেখা যাচ্ছে তার সন্তানদেরকে লেখাপড়ার আগ্রহ দেখিয়েছে। এ থেকে অনেক কিছু শিক্ষা নেওয়ার আছে। ঐদিন অনেক কিছুই শিখলো।
বাসায় গিয়ে কোনোমতে খাওয়া-দাওয়া করে শুয়ে পড়লো কাসেম। কিন্তু ঘুম আসছিল না। শুধুই সেই রিক্সাওয়ালা মামার কথা মনে আসছিল। ভেসে আসছিল তার স্বপ্ন ও আশার চিত্রগুলি।
আসলে এই দুনিয়ায় অনেক কিছুই জানার আছে। যা আমরা এখনো জানি না। আবার জানার চেষ্টাও করি না। আল্লাহর এই দুনিয়ায় কতো রকমের মানুষ সৃষ্টি হয়েছে তা বোঝার ক্ষমতাই আমাদের নেই।
সেই রিক্সাওয়ালার পরিশ্রম, সন্তানদের নিয়ে স্বপ্ন এবং আল্লাহর ওপরে অবিচল আস্থা সকল সময়ই আমাদেরকে প্রেরণা যোগাতে পারে।

SHARE

Leave a Reply