Home ভ্রমণ সিংড়া ফরেস্ট

সিংড়া ফরেস্ট

মো: আসিফ হাসান
কুয়াশায় ঢাকা সকাল ৫টা ১৫ মিনিট। শীতের এমন সকাল তা-ও আবার উত্তরের শীত বলে কথা। উত্তরের মানে বাংলাদেশের উত্তরের জেলা ঠাকুরগাঁও থেকে শুরু। পাঁচটা পনের থেকে পাঁচটা তিরিশের মধ্যে আমরা তিন বন্ধু শুরু করলাম কুয়াশাভেদী যাত্রা। কুয়াশার আবরণে যখন অস্পষ্ট চারদিক, ঠা-া বাতাসে দম নিতেও বুক ঠা-া হয় না। এত ঠা-ায় সবকিছু যেখানে আগেই ঠা-ায় হিমশীতল তখন অনুভূতিটাও ভোঁতা হয়ে যায়। সাইকেলে করে আমরা তিনজন যাচ্ছি। গ্রামের পথ দিয়ে চলতে চলতে মাঝে মাঝেই থামতে হচ্ছিল, মোবাইলে মেমোরিতে কিছু কুয়াশামাখা স্মৃতি ধরে রাখতে। প্রায় ঘণ্টাখানেকের মধ্যে ঠাকুরগাঁও দিনাজপুর মহাসড়কে উঠলাম। সকালে সূর্য আলো ছড়াতে শুরু করেছে। আরো এক ঘণ্টা চলার পর সকালের নাস্তা। এরপর এক ঘণ্টা পরই দেখা পেলাম না-দেখা গন্তব্যের। আমাদের গন্তব্য ছিল দিনাজপুর জেলার বীরগঞ্জ উপজেলায় অবস্থিত সিংড়া জাতীয় উদ্যান। কুয়াশা ততক্ষণে সেদিনের মতো বিমূর্ত বিষয়। এই জাতীয় উদ্যানে প্রবেশ করতেই আলাদা অনুভূতি। এর আগে কখনও এমন বনে ঢুকিনি। বনের মধ্য দিয়েই সরু রাস্তা। রাস্তার ধারে কোথাও কোথাও পানি ছাড়া অল্প দৈর্ঘ্যরে ক্যানাল। বর্ষায় পানিতে ভরে গেলে মনে হবে এগুলো হয়তো নদী থেকে আসা কিছু শাখা। এই বনের আয়তন ৩০৫.৬৯ হেক্টর। আয়তনের কারণে এর বুকে প্রবেশ করলে বের হয়ে আসা কষ্টসাধ্য। উদ্যানটি প্রায় জনশূন্য। তবে কোথাও কোথাও সাঁওতালদের বসতিও চোখে পড়ে। এই বনে প্রাণীদের মধ্যে আছে খরগোশ, শেয়াল, সাপ, বেজি এবং বিভিন্ন প্রজাতির পাখি ও পতঙ্গ। তবে এক সময় নাকি হনুমান, বানর, বনমোরগ, বনগরু, হরিণ, শূকর, নীলগাই, মেছোবাঘ দেখতে পাওয়া যেতো। এই বন মূলত শালবন। তবে শালগাছের পাশাপাশি এখানে আছে জারুল, তরুল, শিলকড়ই, শিমুল, মিনজিরি, সেগুন, গামার, আকাশমণি, ঘোড়া নিম, সোনালু, গুটি জাম, বনবড়ই এবং বিভিন্ন প্রজাতির অজানা উদ্ভিদ ও লতাগুল্ম। বনের পথেই কয়েক স্থানে সাইবোর্ডগুলো পড়ে এ বন সম্পর্কিত তথ্য পেলাম। সরু রাস্তা, রাস্তার ওপরেও গাছের শাখার বিস্তার। শীতকাল বলে বনের পত্রঝরা উদ্ভিদগুলোতে তেমন পাতা নেই। সব ঝরে পড়া পাতা মাটিকে ঢেকে দিয়েছে। পাতা নেই তাই বনে আলোর কমতিও নেই। কিছু দূর এগিয়েই আমরা বনের আরো গভীরে ঢুকতে চেষ্টা করলাম। কিন্তু বনের বড় বড় গাছগুলো কোনো বাধা না দিলেও ছোট দৈর্ঘ্যরে ঘন গাছগুলোর মধ্য দিয়ে সাইকেল চালাতে বেশ অসুবিধা দেখা দিল। অবশেষে সে আশা ছেড়ে হলদে পাতা ঢাকা রাস্তা দিয়ে উপভোগ করা ছাড়া কোনো উপায় রইল না। পথের দুই ধারেই এখানে সেখানে উইয়ের ঢিবির মতো কিছু লক্ষ করলাম। ঢিবিগুলো আসলে বড় কোনো গাছের অবশিষ্টাংশ থেকেই তৈরি হয়েছে। নিঃসন্দেহে যেসব ঢিবিতে কীটপতঙ্গের পাশাপাশি সাপও থাকে। এসব ঢিবি কিংবা ধ্বংসপ্রাপ্ত গাছের অবশিষ্টাংশের মতোই এখানে উঁই পোকার ঢিবিও আছে। এই উদ্যানে ঢিবির আকৃতিপ্রাপ্ত গাছের সংখ্যা অনেক এবং সেগুলোর এক একটার আকার আকৃতিও অন্যটা থেকে আলাদা। বনের এমন পথে চলার অনুভূতিটা ঢাকার রাস্তায় চলার বিপরীত। যদি যান্ত্রিক ঢাকার যানজটে ভরা রাস্তাগুলোর বিপরীত শব্দ করতে হয়, তা হবে পাখির কলতানে মুখরিত এই বনের রাস্তা। এই বনের রাস্তাগুলো পিচের বদলে ঝরে পড়া হলদে পাতায় ঢাকা। এখানে যানবাহনের ভেঁপুর বদলে পাখির কলতানে ইচ্ছে হয় আরো একটু থাকি। ইচ্ছে হয় এখানেই একটা ঘরে বেঁচে থাকি সারাটা জীবন। এখানে বুক ভরে তাজা শ্বাস নেয়া যায়। প্রকৃতির সাজে সজ্জিত পথের তুলনা কোথায়। রাস্তাগুলোর দুই পাশ বেতের বনে ছেয়ে গেছে। বেত দেখেই আমার এক বন্ধু বেত নিতে এগিয়ে গেল। ধরালো কিছু ছাড়া খালি হাতে এমন কাঁটার ঝোপে ঢোকাটা বলার মতো সহজ নয়। তবুও অনেক কাঁটার আঁচড় সহ্য করেও একটা চিকন লতা এনে সে জয়ী হলো। আমরা বনের আরো গভীরে না ঢুকে শান্তি পাচ্ছিলাম না। একটা কম ঘন দিক দিয়ে ঢুকেই পড়লাম। কী অপরূপ চারপাশ! মোবাইলে মেমোরিতে ছবিসংখ্যা বাড়তেই আাছে। এখানে সেখানে সাইকেল থামাতে হচ্ছিল শুধু ছবি তুলতে। এভাবে চলতে চলতে অনেকক্ষণ পর একটা সরু নদীর সাক্ষাৎ হলো। নদীর পাড় ঘেঁষে বোরোর চাষ হয়েছে। একসময় নদীর ধার ঘেঁষেই বন ছিল। এখনও অনেক জায়গায় চোখে পড়ে। মানুষের হাতে দিনকে দিন এ বন কমে যাচ্ছে। প্রবেশের পথে টিকিটের কথা থাকলেও তার ব্যবস্থা নেই। কারণ এই বিশাল আয়তন বনে চারপাশ দিয়েই প্রবেশ করা যায়। বনে মাঝে মাঝেই পাতা কুড়ানি মহিলাদের দেখা যায়। চলার পথে হঠাৎ করে থমকে দাঁড়াই পাতা কুড়ানোর অচেনা শব্দ শুনে। একসাথে অনেকের একটা দল পাতা কুড়ালে যে শব্দ সৃষ্টি হয়, সেটাই এখানকার প্রকৃতির থেকে কৃত্রিম বলে মনে হয়। কোথাও কোথাও কেটে রাখা গাছের স্তূপ চোখে পড়ে। যাই হোক এক সময় অব্যবস্থাপনার জন্যই হয়তো এ বন গল্প হয়ে থাকবে। আর কোনো এক সময় সেসব গল্পও হারিয়ে যাবে অপসংস্কৃতির রোবটিক থাবায়। এই বন হাইকিং করার জন্য খুব ভালো স্থান হতে পারে। প্রয়োজন নিরাপত্তার। বনে অপরাধীদের আনাগোনা বন্ধ করা প্রয়োজন। কারণ কারণ আমার মনে হয় হিংস্র প্রাণীদের চাইতে অপরাধী মানুষই বেশি বিপজ্জনক। বনের কিছু স্থানে মাদক সেবনের চিহ্ন মেলে। তবে এ বনকেই একটু আলাদাভাবে সাজিয়ে নিরাপত্তা জোরদার করা গেলেই ধ্বংসের দিকে অগ্রসরমান এই বনই হবে দেশের আকর্ষণীয় পর্যটন স্থানগুলোর মধ্যে অন্যতম একটি।
সিংড়া ফরেস্ট স্থান পাবে দেশের অন্যতম পর্যটন কেন্দ্রগুলোর নামের পাশে। আমরা নদীটা পেরিয়েই বাড়ির পথ ধরলাম। রাস্তার একটা জায়গায় থামলাম। তখনও আমরা বনের ভেতরেই ছিলাম। একটা খড়ের তৈরি ছাদওয়ালা গোল ঘরে বাঁশের মাচা দেখে বসে পড়লাম। বাতাসে খুব ভাল লাগছিল। অদূরেই একটা স্থানে বড় বড় দুটো শিমুল গাছ লাল লাল ফুলে ছেয়ে গেছে। একটা সময় মাচাতেই পিঠ ঠেকালাম। কিছুক্ষণ প্রকৃতিকে আলাদাভাবে উপভোগ করলাম। তখন মনে হচ্ছিল, এখানেই যদি আমার ঘর হতো। দেরি না করে মহাসড়ক ধরে বাড়ির দিকে চললাম। পেটের সঙ্কেত ইতোমধ্যেই পেয়েছিলাম। ফেরার পথেই খাদ্যবিরতি নিলাম। আল্লাহর অশেষ রহমতে আমরা ভালোভাবেই বাড়ি ফিরলাম। বন্ধুদেরকে অদ্ভুত এক গল্প শোনালাম। বললাম আমরা এক সেকেন্ডে ঠাকুরগাঁও থেকে দিনাজপুর এবং আরেক সেকেন্ডে দিনাজপুর থেকে ঠাকুরগাঁও এসেছিলাম। কেউই বিশ্বাস করল না। এরপর সব ভেঙে বললাম। আসলে ঠাকুরগাঁও থেকে দিনাজপুর যাওয়ার পথে একটা জায়গায় লেখা ছিল স্বাগতম দিনাজপুর। আসার পথে একই লেখার উল্টো পাশে লেখা ছিল স্বাগতম ঠাকুরগাঁও। আমরা সেখানেই নেমেছিলাম। আর এক সেকেন্ডে ঠাকুরগাঁও থেকে দিনাজপুর এবং দিনাজপুর থেকে ঠাকুরগাঁও গিয়েছিলাম। সাইকেল থেকে নেমে যখন এপাশ থেকে ওপাশে আর ওপাশ থেকে এপাশে আসা যাওয়া করছিলাম তখন পাশের দোকানি কী যেন ভাবছিল। যাই মনে করুক না কেন, কথাটা সত্য করতে আমরা সেটাই করেছিলাম। যেন অবিশ্বাস্য হলেও আমাদের গল্পটা মিথ্যা না হয়।

SHARE

Leave a Reply