Home গল্প তাদের কি নাম

তাদের কি নাম


বুলবুল সরওয়ার

হঠাৎ করেই একটি বোয়াল ঢুকে পড়ল দিঘিতে। বোয়ালটার সাইজ খুব বড় নয়। কিন্তু বোয়াল তো! আতঙ্ক নেমে এলো সব মাছের মধ্যে। কিন্তু ভয়ে কেউ কথা বলে না। অথচ ঘুম নেই কারো চোখে।
প্রথম দু’একদিন বোয়াল এমন ভাব করল যেন সে সবার বন্ধু। কৈ মাছ সবাইকে সতর্ক করল : বিশ্বাস কর না ওর মিষ্টি কথায়। ও শুধু অপেক্ষায় আছে শিকারের।
কৈ মাছের সাহস এমনিতেই বেশি। তারপরও সে জানে, বোয়াল তাকে খেতে পারবে না। সে হল পানির সজারু। তার কাঁটাকে বোয়ালও সমঝে চলে।
পুঁটির দেমাগ বেশি। আরে কৈ, তোর না আছে রূপ, না আছে গুণ। চোয়াল উঁচিয়ে বলল পুঁটি : না-না, আমি তো বোয়ালের সাথে কথা বললাম। খুব মিষ্টি ব্যবহার তার। ও-তো আমাদেরই লোক! ওকে এত ভয় পাবার কী আছে?
না-না, পুঁটি। তুমি জানো না। আমরা তো বহুকাল থেকে দেখে আসছি। ও আমাদের বন্ধু হতে পারে না।
না, কৈ, না। এ তোমার হিংসের কথা। আমার তো তাকে খারাপ লাগল না।
তুমি-ই ঠিক বলেছ, পুঁটি। সুর মেলালো পাবদা, কৈ শুধু শুধু ভয় পাচ্ছে। আমার মনে হয় না, এই দিঘিতে কারো সাথে কারোর কখনো বিবাদ করা উচিত।
কৈ মাছ চুপ করে থাকল। শুধু কচ্ছপ তাকে ডেকে বলল, তোমার কথাই ঠিক কৈ। আমি দিঘির সবচেয়ে পুরনো মানুষ! আমি চিনি বোয়ালদের। ওদের চরিত্র বদলাতে দেখিনি কখনো। সাবধানে থাকাই ভালো।
বুড়ো-ভাম, তুমি মাছদের মধ্যে নাক গলাও কেন? পাবদা তার অহঙ্কারী লেজে দোলা দিয়ে বলল, আমরা যদি বোয়ালের সাথে ভাব করে চলি, তোমার কী? যাও, যাও এখান থেকে!
মুখটাকে খোলের মধ্যে ঢুকিয়ে কচ্ছপ ডাঙায় উঠে গেল।
মাত্র তিনি দিনের মাথায় হৈ-হৈ রব উঠল দিঘিতে। কি হয়েছে, কেউ জানে না। হঠাৎ করেই নেই-হয়ে-গেছে টাকি মাছ। কোথায় গেল সে?
অনেক দিন আগে একবার এই নেই-হয়ে-যাওয়া শুরু হয়েছিলÑ কচ্ছপ আস্তে বলল কৈ মাছকে। তখনও এমন চিৎকার চেঁচামেচি হয়েছিল। সেবার বোকা সরপুঁটি পক্ষ নিয়েছিল গজারের। খুব ভাব হয়েছিল তাদের। সেবারও শিং মাছ সাবধান করেছিল সরপুঁটিকে। কিন্তু সে শোনেনি।
তারপর?
তারপর ঘটতে শুরু করল আরো নেই-হয়ে-যাওয়া। সবাই ঘরে খিল দিয়ে থাকল। কিন্তু নেই-হয়ে-যাওয়া থামল না। শেষে দিঘির মালিক রাগ করে সব মাছ বেঁচে দিলেন। পানি সেঁচা হলো। মাছ চলে গেল জেলেদের জালে আর খাঁচায়। খুব কষ্ট করে শিঙ মাছ বেঁচে গিয়েছিল, কাদার গভীরে ঢুকে।
পরে কি হল?
আবার দিঘিতে পানি দেয়া হল। তদ্দিনে শিঙের প্রাণ যায় যায়। আমি আর কতটুকু তাকে সাহায্য করতে পারি, বলো? দিনে দু’তিন বার দু’চার ফোঁটা পানি আর দুর্বার কয়েকটা কচি পাতাই শুধু দিয়ে আসতে পারতাম। ঐ দিয়ে কি প্রাণ বাঁচে?
মানে, শিংটা মরে গেল?
না, মরল না। তবে নতুন পানি তার সহ্য হলো না। বেশ কয়েক সপ্তাহ শ্বাসকষ্ট আর পেটের পীড়ায় ভুগে মারা গেল সে।
হায়, খোদা। আর গজার?
গজারটাও কাঁদায় ঢুকে বাঁচার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু জেলেদের কয়েকজন ছিল জাত শিকারি। পায়ে লেজের ছোঁয়া লাগতেই কোচ মেরে দিল। তাতেই গজার আটকা পড়ল।
কোঁচ কি?
কোঁচ হল চিকন-সরু বল্লমের আঁটি। খুবই ভয়ঙ্কর। পনেরো- বিশটা এক সাথে থাকে বলে বড় মাছেরা পালাতে পারে না; একটা না একটা শরীরে গাঁথেই।
সর্বনাশ!
না-না, কৈ, তোমার ওতে ভয় নেই। কোঁচ তোমাকে বিঁধতে পারবে না। তোমার বিপদ হবে পলো।
মানে, ঐ-যে বাঁশের খাঁচা!
ঠিক ধরেছ।
পলো থেকে পালাতে জানি আমি।
কিভাবে?
নেহাতই যদি আটকে পড়ি, কাঁদায় ডুব দেই। শিকারির হাত খুব লম্বা না হলে কাঁদার নিচ পর্যন্ত হাত যায় না। ধরতেও পারে না। তাই বেঁচে যাই।
ভালো বুদ্ধি তো!
কচ্ছপের প্রশংসায় খুশি হল কৈ। তারপর বলল, আচ্ছা, যাক এসব। ভাই কচ্ছপ, বলো তো তোমার কি মনে হচ্ছে? কী হচ্ছে এসব?
আশপাশে আরো মাছ ঘোরাফেরা করছে। বুদ্ধিমান কচ্ছপ সেদিকে চেয়ে মুখটা খোলের ভেতর ঢুকিয়ে নিলো। কৈ বুঝল, আর কথা বলবে না কচ্ছপ। তবে তার নীরবতায় কৈ টের পেল, তার সন্দেহের সাথে দ্বিমত নেই কচ্ছপের। এটুকুই তার জন্য যথেষ্ট।
মাছেরা গুজবে কান না দিলেও খানিকটা চিন্তিত হলো। কিন্তু পাবদার আশ্বাসে আবার সবাই ভুলে গেল টাকি মাছের নিখোঁজ হবার কথা। কিন্তু কৈ মাছ সাবধানই থাকল।
আরো দু’নি পর নেই হয়ে গেল রয়না।
আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল আবার।
কৈ মাছকে ডেকে বলল কচ্ছপ, চোখ-কান খোলা রাখো। কিন্তু দিন না পেরোতেই নিখোঁজ হলো বাঁশ-পাতা মাছ।
শুনেই পুঁটিকে সাবধান করার জন্য ছুটল কৈ। কিন্তু তার বাড়ি পৌঁছার আগে সে শুধু রূপালী একটা ঝিলিক দেখতে পেল। ঝড়ের মত এগিয়ে আসা পানির ¯্রােত সরে যেতেই দেখল পুঁটি নেই। শুধু চোখে পড়ল একজোড়া লাল-চোখ এদিক তাকিয়ে হাসছে। ও-চোখ বোয়াল ছাড়া কারুর নয়।
প্রাণপণে কৈ ছুটলো পাবদার বাড়ি।
যথারীতি পাবদা পাত্তা দিল না কৈ-কে। খালি খালি শত্রুতা করা তোমার স্বভাব, কৈ। আমিও তো বোয়ালের মতোই দেখতে, শুধু একটু ছোট। আমি কখনো তোমাদের শত্রুতা করি?
আমিও তো তাই বলি। এসব কি বলছে কৈ আমার বিরুদ্ধে? বলতে বলতে এগিয়ে এলো বোয়াল। তারচেয়ে দোস্ত, চলোÑ একটু বাগানে ঘুরে আসি। বোয়াল এ কথা বলেই পাবদার কাঁধে হাত রেখে ঘুরে দাঁড়াল। পাবদা তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে সবাইকে শুনিয়ে কৈ-কে বলল, হিংসুটে!
ততক্ষণে আরো অনেক মাছ জড় হয়েছে চারপাশে। পাবদার অহঙ্কার তাতে আরও বেড়ে গেল। উঁচু গলায় বলল, বন্ধুত্ব হয় রূপে-গুণে মিল থাকলে, বুঝলে? যেমন দেখ, আমি। বোয়াল আমার বন্ধু বলে কৈয়ের হিংসে হচ্ছে। দেখ সবাইÑ
তার মুখের কথা শেষ হবার আগেই বোয়াল হাঁ করল। পাবদা শুধু দেখল, বিরাট সেই গহবরের ভেতর শুধুই অন্ধকার। আর সেই অন্ধকারের ভেতরে লকলক করছে কাঁটাওয়ালা জিভ।
গপাৎ-গপ! গপ-গপাগপ!!
ছোট মাছেরা দিগি¦দিক ছুটল। কৈ তার সব কাঁটা খাড়া করল লড়াইয়ের জন্য। কিন্তু বোয়াল কিছুই বলল না থাকে। আরাম করে পাবদাকে খেয়ে হাই তুলে বলল, আগামী আট চল্লিশ ঘণ্টা সবাই নিরাপদ। আমি এখন ঘুমাব।
কচ্ছপ কৈ-কে বলল, এরপর আর রাখঢাক চলে না। সব মাছকে ডেকে এক করো।
ছোট আর মাঝারি মাছেরা মিটিংয়ে বসল। কিন্তু পাবদার মত বোকা অনেকেই আছে। তাদের বাদ-প্রতিবাদে কোন সিদ্ধান্তই নেয়া গেল না।
কেটে গেল তিন দিন।
এর মধ্যেই বোয়ালের পেটে গেছে পুঁটি, বাতাসি, ঘাটপোনা, চিৎপুঁটি, বুইচা, খলিশা, মলা-ঢেলা। এখন আর তার কোন রাখঢাক নেই। সে শোলকেও ডেকে বলেছে : যদি আমার সাথে লাগতে আসিস, তুই-ও থাকবি লিস্টিতে। বুঝলি?
আর মিটিং করার সাহস হল না ছোট আর মাঝারি মাছদের। কিন্তু কচ্ছপ বলল, এভাবে বসে থাকলে তো বাঁচতে পারবে না কেউ। শত্রু যত বড়ই হোক, রুখে দাঁড়াতে হবে।
তদ্দিনে বোয়াল আরো বড় হয়েছে। একমাত্র চিতল ছাড়া এখন কাউকেই সে তোয়াক্কা করে না।
শেষে সভা বসল রাত্রে। কেউ কিছু বলছে না দেখে কৈ-ই এগিয়ে এলো। এত বড় শত্রুকে সাধারণভাবে রোখা যাবে না। অনেক ত্যাগ স্বীকার করতে হবে এর জন্য। তোমরা সবাই যেহেতু ভয় পাচ্ছ- আমিই সিদ্ধান্ত নিচ্ছি। আমরা রিস্ক নেব। আমরা মানে কৈয়েরা। যদি তোমরা আমাদেরকে সাহায্য কর।
কী রিস্ক?
জীবন বাজি রাখার রিস্ক।
কিভাবে?
কৈ আগেই কচ্ছপকে শুনিয়েছে তার পরিকল্পনার কথা। শুনে কচ্ছপ বলেছে, অনেক বেশি বিপদ ঘাড়ে নিচ্ছ তুমি, কৈ। কিন্তু এছাড়া তো কোন উপায়ও দেখছি না। শেষে কচ্ছপের সাথে বসে কৈ তার প্ল্যান সাজিয়েছে। বন্ধুদেরকেও রাজি করিয়েছে সে।
শোন, সবাই। দু’এক দিনেই বৃষ্টি নামবে। বৃষ্টির ফোঁটা পড়তে শুরু করলেই আমরা পাড়ে উঠে যাবো।
পালাবে তোমরা? ছোট মাছেরা আঁতকে উঠল। আর আমরা মরব এখানে থেকে?
আরে না-না, আগে শোন। কয়েকবার করে পাড়ে উঠব আর গড়িয়ে নেমে আসব। ব্যাপারটা অবশ্যই মালিকের চোখে পড়বে। তখনই তিনি জেলে ডাকবেন। জাল ফেলা হবে। ধরা পড়বে বোয়াল।
তাহলে তো সবারই মরণ? আমরা কি জালে জড়িয়ে মরব না?
সবাই না; কেউ কেউ মরব। কিন্তু এই মরণ মানতেই হবে। যদি এটা আমরা না করি, তাহলে সবংশে সবাই হয় বোয়ালের পেটে যাব, নাহয় জেলের খাঁচায়। বলো, তোমরা কি করবে?
না-না, অত ভয় পেও নাÑ বলল কচ্ছপ। তেমন কেউ মরবেও না; কারণ, আমি সাহায্য করব। আমি আগে-আগে জালে ধরা দেব। আমার পিঠ তো বড়। সেই পিঠের তলা দিয়ে ছোট আর মাঝারি মাছেরা পালিয়ে যাবে। ঠিক আছে?
সবাই খুশি মনে প্রস্তাব মেনে নিল।
পরদিন থেকেই বৃষ্টি নামল। পালা করে কৈয়েরা পাড়ে উঠতে লাগল। মালিকের বাচ্চা-কাচ্চারা কেউ ধরতে এলেই লাফিয়ে দিঘিতে ফেরে তারা। যেন মজার খেলা একটা।
বাচ্চাদের মাধ্যমেই খবর পেল মালিক। জেলে ডাকা হল পরদিন।
ধরা পড়ল বোয়াল। তার লাফালাফিতে জালে টান পড়ল খুব। তাতে বেঁধে গেল কচ্ছপের পা। সেই পা ছাড়াতে গেল কৈ। মুক্তি পেল কচ্ছপ। কিন্তু আটকা পড়ল কৈ।
দিঘির পানিতে আবার শান্তি ফিরল।
শ্রাবণের বৃষ্টির স্রোতে পাশের ডোবা উপচিয়ে এলো পাবদা-পুঁটি-ঘাটপোনাসহ আরো অনেকে। হাসি আনন্দে আবার ভরে গেল পুরনো দিঘি।
শুধু কচ্ছপই হাসে না। নীরবে বসে থাকে সে; কখনো আবার পাড়েও উঠে যায়। সেখানে সে পা দিয়ে মাটিতে আঁচড় কাটে। এখানেই কৈয়েরা উঠে এসেছিল বৃষ্টিতে। কী অদ্ভুত পরিকল্পনায় বাঁচিয়ে দিয়েছে সে দিঘির ছোট মাছদের।
এরপরও বোয়াল-গজারদের আক্রমণ হয়েছে। প্রতিবারই কচ্ছপ কৈয়ের আত্মত্যাগের গল্প শুনিয়েছে নতুনদেরকে। অনেকেই তারা নাক সিঁটকেছে কিংবা হতে চেয়েছে বোয়াল-গজারদের বন্ধু। তারপর আগের মতই যা ঘটার ঘটেছে।
কচ্ছপ গল্পটা বলে যায় এবং প্রতিবারই বিপদে ঝাঁপিয়ে পড়ে কেউ না-কেউ। কখনো কৈ, কখনো শিং, কখনো আর কেউ।
আমরা তাদের কী নামে ডাকতে পারি, জ্ঞানী কচ্ছপ? সাহস করে জানতে চায় মাগুরছানা।
এটা নির্ভর করে তোমার মানসিকতার ওপর, বাছা। এ ব্যাপারে আমি কিছু বলতে চাইনে। হ

SHARE

3 COMMENTS

Leave a Reply