Home বিজ্ঞান জগৎ সবুজ জ্বালানি বায়োফুয়েল

সবুজ জ্বালানি বায়োফুয়েল

সাকিব রায়হান

প্রতিনিয়ত বদলে যাচ্ছে আমাদের পৃথিবী। নিত্যনতুন আবিষ্কারের সুবাদে বদলে যাচ্ছে আগামী দিনের জ?ালানি। ধীরে ধীরে জ্বালানি হয়ে উঠছে সবুজ। পৃথিবীকে রক্ষার লক্ষ্যে বর্তমানে সবুজ জ্বালানি দিয়ে চলছে বিমানের মতো যান।
সবুজ জ্বালানি নিয়ে বিশ্বব্যাপী চলছে সমালোচনা। বিভিন্ন ধরনের উদ্ভিদ থেকেই বিশ্বব্যাপী তৈরি হচ্ছে বায়োফুয়েল। সাধারণত সূর্যমুখী, নারিকেল, সুগারবিট, আখ, পাম, সয়াবিন প্রভৃতি উদ্ভিদই বায়োফুয়েলের উৎস। এ জন্য বায়োফুয়েলকেই বলা হচ্ছে সবুজ জ্বালানি।
বায়োফুয়েল কী
বায়োফুয়েল হলো উদ্ভিদ থেকে তৈরি এক ধরনের বিকল্প জ্বালানি। রসায়নের ভাষায় বায়োফুয়েল হলো উদ্ভিদ থেকে প্রাপ্ত তেলের মিথাইল বা ইথাইল এস্টার। উদ্ভিদ সালোকসংশ্লেষণের সময় সৌরশক্তি রাসায়নিক শক্তিতে পরিণত হয়। এই সঞ্চিত রাসায়নিক শক্তিই হলো বায়োডিজেলের শক্তির উৎস। সম্প্রতি ইংল্যান্ডের ইউনিভার্সিটি অব এক্সেটার-এর একদল বিজ্ঞানী জানিয়েছেন, এক নতুন ধরনের সিনথেটিক বায়োফুয়েল তৈরি করা হয়েছে, যা বিভিন্ন অরগানিজম থেকে ডিএনএ বিট-এর সংমিশ্রণের মাধ্যমে উৎপত্তি। অচিরেই ডিজেল ও জেট ফুয়েলের বিকল্প হিসেবে কাজ করতে সক্ষম হবে।
বায়োফুয়েল হচ্ছে পুনরায় ব্যবহারযোগ্য শক্তির উৎস। জীবন্ত অরগানিজমগুলো যেমন প্লান্ট ব্যবহার করে এই বায়োফুয়েল তৈরি করা হয়। আজকাল বেশির ভাগ সাধারণ বায়োফুয়েল ব্যবহৃত হচ্ছে এক ধরনের গাড়িতে, যা ইথানল নামে পরিচিত। ইথানল এখনো আধুনিক ইঞ্জিনের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়ে ওঠেনি। সঙ্গত কারণে বিজ্ঞানীরা বায়োফুয়েলের পরিবর্তে সিনথেটিক বায়োলজি ব্যবহার করে বিকল্প উৎস খুঁজে বের করছেন।

বায়োফুয়েলের ইতিহাস
সত্তর দশকের শুরুতে তেল উৎপাদনকারী আরব দেশগুলো বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেল সরবরাহ বন্ধ করে দিলে বিষয়টি আবার সবার নজরে আসে। এখন ব্রাজিলের বেশির ভাগ যানবাহন চলছে বায়োইথানল দিয়ে। জৈবজ্বালানি পরিবেশবান্ধব, নবায়নযোগ্য হওয়ায় সারা বিশ্বেই এর ব্যাপক চাহিদা। আমাদের দেশে জৈবজ্বালানি ধারণাটি নতুন হলেও সারা বিশ্বে এটি এখন ব্যাপক প্রচলিত। বিশ্বজুড়ে প্রতি বছর প্রায় ছয় হাজার কোটি ডলার মূল্যের বায়োইথানল তৈরি হয়। বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকেই জৈবজ্বালানির ব্যবহার শুরু হলেও পরে খনিজ তেলের সহজলভ্যতার জন্য বিষয়টি ধামাচাপা পড়ে যায়।

বায়োফুয়েলের ব্যবহার
বর্তমানে বিভিন্ন ধরনের কলকারখানার ইঞ্জিন, বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্প, পেট্রল ইঞ্জিন এমনকি রকেটের জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে বায়োইথানল। প্রচলিত খনিজ তেলের তুলনায় এর গ্রিনহাউজ গ্যাস নিঃসরণ কম। জৈবজ্বালানি হিসেবে মিথানল, প্রোপানল ইত্যাদির ব্যবহার থাকলেও ইথানল সবচেয়ে সুবিধাজনক এবং জনপ্রিয়। প্রথম দিকে বায়োইথানল তৈরিতে ব্যবহৃত হতো বিভিন্ন ধরনের সুগার, স্টার্চ ভেজিটেবল অয়েল, বিভিন্ন ফল ইত্যাদি। দ্বিতীয় প্রজন্মের বায়োইথানল তৈরিতে ব্যবহৃত হতো অপেক্ষাকৃত কম দামের সহজলভ্য বিভিন্ন শিল্পের উপজাত ধান, গম ও অন্যান্য ফসলের খড়, আখের ছোবড়া, কাঠ ইত্যাদি। তৃতীয় প্রজন্মের জৈবজ্বালানি পাওয়া যায় বিভিন্ন প্রকার শৈবাল থেকে। বাংলাদেশের জন্য দ্বিতীয় প্রজন্মের বায়োইথানল বেশি উপযোগী।

দেশী বায়োফুয়েল
আখের ছোবড়া থেকে অণুজীবের সাহায্যে দেশীয় প্রযুক্তিতে বায়োফুয়েল তৈরি করলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অণুজীব বিজ্ঞানের শিক্ষক প্রফেসর ড. ডোনাল্ড জেমস গমেজ এবং তার ছাত্র ফিরোজ আহমেদ। ট্রাইকোডার্মা ভিরিডি এবং স্যাকারোমাইসিস সেরিভিসিই নামে দু’টি ছত্রাকের সাহায্যে ছোবড়া থেকে বায়োইথানল তৈরি করেছেন তারা। উন্নত দেশের মতো শর্করা উৎপাদনকারী বিভিন্ন শস্যচাষের জন্য আমাদের দেশে অফুরন্ত জমি নেই আর এ বায়োইথানল পাওয়া যাবে চিনির উপজাত আখের ছোবড়া থেকেই। বাংলাদেশের প্রায় চার লাখ ২৫ হাজার একর জমিতে ৭৫ লাখ টন আখ উৎপাদিত হয়। দেড় লাখ টন চিনির পাশাপাশি ৪০ লাখ টন আখের ছোবড়া উপজাত হিসেবে পাওয়া যায়। এই ছোবড়ার বেশির ভাগই পুড়িয়ে ফেলা হয়। এই বিপুল পরিমাণ ছোবড়াকে অণুজীবের সাহায্যে ফার্মেন্টেশন বা গাজনপ্রক্রিয়ায় ইথানলে রূপান্তর করতে পারলে লাভের অঙ্কটা বড় হবে।
আখের ছোবড়ার প্রধান উপাদান হচ্ছে সেলুলোজ। এই ছোবড়া প্রথমে যান্ত্রিক ও রাসায়নিক পদ্ধতিতে কাঁচামাল হিসেবে প্রস্তুত করা হয়। কাঁচামালে ট্রাইকোভার্মা ভিরিডি নামে একটি ছত্রাক যোগ করলে এগুলো বিভিন্ন ধরনের সেলুলাইটিক এনজাইম (এক ধরনের জারক রস) তৈরি করে। ওই জারক রস ছোবড়াকে ভেঙে গ্লুুকোজ, জাইলোজসহ অন্যান্য সরল শর্করায় পরিণত করে। এই সরল শর্করার দ্রবণে উপযুক্ত পরিবেশে স্যাকারোমাইসেস সেরিভিসি নামে আরেকটি ছত্রাক যোগ করলে অপরিশোধিত ইথানল তৈরি হয়। একে প্রক্রিয়াকরণের মাধ্যমে শতভাগ বিশুদ্ধ ইথানলে রূপান্তর করা হয়।
প্রাথমিকভাবে পরীক্ষাগারে এ গবেষণা সফল হয়েছে। শিল্পপর্যায়ে এর সম্ভাবনা অনেক। তবে এ পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট অণুজীব, পদ্ধতি, প্রক্রিয়া, পরিবেশ, ব্যয় ইত্যাদি নিয়ে আরো গবেষণার প্রয়োজন। বিশেষ করে দেশীয় পরিবেশ থেকে আরো উন্নতমানের অণুজীব সংগ্রহ করাটা গুরুত্বপূর্ণ। অণুজীবগুলোকে জিনপ্রযুক্তির মাধ্যমে আরো বেশি শক্তিশালী ও উৎপাদনক্ষম করা যেতে পারে। এমনকি কচুরিপানা, খড় ইত্যাদিকেও কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করা সম্ভব। সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা পেলে এ গবেষণা এগিয়ে যাবে আরো অনেক দূর। তখন বায়োইথানল হতে পারে আমাদের জ্বালানির অন্যতম উৎস।
প্রফেসর ড. ডোনাল্ড জেমস গমেজ বর্তমানে নর্থসাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে লাইফ সায়েন্স অনুষদ এবং ফিরোজ আহমেদ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছেন।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব থেকে বাঁচতে বায়োফুয়েল বা সবুজ জ্বালানি ব্যবহারের কথা বলেন বিজ্ঞানীরা। কিন্তু এই সবুজ জ্বালানির ব্যবহার যত বাড়বে বন জঙ্গলের ওপর তার প্রভাব পড়বে। কারণ উদ্ভিদ থেকেই তো তৈরি হয় এই বায়োফুয়েল। আর বন জঙ্গল না থাকলে তো সমস্যা হবে পশুপাখিদেরও। ফলে দেখা যাচ্ছে, এক দিক রক্ষা করতে গিয়ে আরেক দিকে সমস্যা হয়ে যাচ্ছে। তবে স্কটল্যান্ডের বিজ্ঞানীরা এবার এমন এক জিনিস ব্যবহার করে বায়োফুয়েল তৈরিতে সমর্থ হয়েছেন, যা অন্য কাজে ব্যবহৃত হয়েছে আগেই। অর্থাৎ এই বায়োফুয়েল তৈরির জন্য নতুন করে কোনো কিছু ধ্বংস করা হয়নি। কারণ জিনিসগুলো হচ্ছে ‘হুইস্কি’ তৈরির সময় পাওয়া দু’টি উপজাত ‘পট আলে’ ও ‘ড্রাফ’-এর সমন্বয়ে বিউটানল তৈরি করেছেন বিজ্ঞানীরা। আর এই বিউটানলই গাড়ি চালাতে ব্যবহার করা যাবে বায়োফুয়েল হিসেবে।
পেট্রল বা ডিজেলের সাথে পাঁচ বা ১০ শতাংশ বায়োফুয়েল ব্যবহার করে গাড়ি চালানো যাবে। পরিবেশ রক্ষা বিষয়ে কাজ করেন স্কটল্যান্ডের এমন এক বিশেষজ্ঞ রিচার্ড বিজ্ঞানীদের এই আবিষ্কারের প্রশংসা করেছেন। তিনি বলেন, এর ফলে দেশের বন ও জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের হাত থেকে রেহাই পাবে। উদ্ভিদকে কিভাবে বায়োফুয়েল তথা জৈব জ্বালানিতে রূপান্তর করা যায় সে সম্পর্কে বিজ্ঞানীরা উন্নততর ধারণা লাভ করেছেন জিনিয়া ফুলগাছের পাতার কোষপ্রাচীরের ন্যানোমিটার পর্যায়ে ছবি তুলে।
জিনিয়া হলো বাগানের অতি প্রচলিত ফুলগাছ। সারা বছরই জন্মে। শিরীষ কাগজের মতো ঝালর আকৃতির পাতাময় লম্বা কাণ্ডের উপরিভাগে ডেইজির মতো একটাই ফুল ফোটে। চারাগাছের পাতাগুলো এককোষের সমৃদ্ধ উৎস। এ কোষগুলো ক্লোরোপ্লাস্টযুক্ত গাঢ় সবুজ। একবারে বেশ কিছু দিন এগুলোকে তরল অবস্থায় রেখে কালচার করা যায়। কালচার করার প্রক্রিয়া চলাকালে কোষগুলোর আকার বদলে টিউনের আকৃতি ধারণ করে, যা শিকড় থেকে পাতা পর্যন্ত পানি বয়ে নিয়ে যায়। জাইলেম নামে পরিচিত এই কোষগুলো উদ্ভিদদেহের সেলুলোজ ও লিগনিনের বেশির ভাগ ধারণ করে থাকে।

সফলতা
বর্তমানে আমেরিকান নেভির বায়ুযান গ্রিন হরনেট চালানো হচ্ছে ক্যামেলিনা নামে একটি বিশেষ গাছের ফল থেকে উৎপাদিত জ্বালানি দিয়ে। মার্কিন যুদ্ধবিমান হরনেট। এর আগে অন্য যেকোনো বিমানের মতো এই যুদ্ধবিমান ব্যবহার হতো জেট ফুয়েল। বর্তমানে সেই দ্রুতগামী শক্তিশালী এই বিমানের ধমনিতে বয়ে যাচ্ছে বায়োফুয়েল। বিমানের তেলের চেম্বারের অর্ধেকটা বায়োফুয়েল এবং অর্ধেকটা সনাতন জেট ফুয়েলে ভরে সফলভাবে চালনা করা হচ্ছে বিমান। হ

SHARE

1 COMMENT

Leave a Reply