Home প্রচ্ছদ রচনা মধুমাসের মধু ফল

মধুমাসের মধু ফল

মধুমাসের মধু ফল
মাহমুদ হাসান

ফুল ও ফলের মাস গ্রীষ্মকাল। এই ঋতুতেই গাছে গাছে যেমন নানা রঙের সুন্দর ফুলের সমারোহ তেমনি ফলের ভারে নুয়ে থাকে বৃক্ষরাজি। তাই তো গ্রীষ্মকে বলা হয় মৌসুমী ফলের ঋতু। মধুর রসের সুমিষ্ট ফলের জন্য জ্যৈষ্ঠ মাসকে মধুমাস বলে ডাকা হয়। তাই তো ছড়াকার তার ছড়ায় মধুমাসের ফলের বর্ণনা দিয়েছেন এভাবেÑ “জাম জামরুল কতবেল/আতা কাঁঠাল নারকেল/তাল তরমুজ আমড়া/কামরাঙা বেল পেয়ারা/পেঁপে ডালিম জলপাই/বরই দিলাম আর কী চাই?” হ্যাঁ, আরও আছে আম আর লিচু। ছড়াকার সম্ভবত ঠিক মেলাতে পারেননি বলে মৌসুমী ফলের এই মজার ছড়াটিতে গ্রীষ্মের সবচেয়ে সুস্বাদু আর রসালো ফল আম-লিচুর নাম বাদ পড়ে গেছে।
এখন চলছে মধু মাস। রসাল ফলের মাস। গাছে গাছে ঝুলছে আম, আনারস, বরই, তরমুজ, কমলালেবু, বেল, পেয়ারা, মন ভোলানো লাল লাল লিচু, জাম, ফুটি, কচি তালশাঁস, জামরুল, আখ, পানি ফল, নাশপাতি আতা আর আমাদের জাতীয় ফল কাঁঠাল। আমাদের দেশী ফলগুলো যেমন সুস্বাদু তেমনি পুষ্টিকর।
স্বাস্থ্য রক্ষায় ফলের কোনো বিকল্প নেই। সুস্বাস্থ্যের জন্য ফল খাওয়া খুব জরুরি। শরীরের ভিটামিনের প্রয়োজন মেটাতে সাহায্য করে ফল। এনভায়রনমেন্টাল টক্সিনডিটক্সিফাই করার জন্য অতিরিক্ত পুষ্টির প্রয়োজন। আর ফল সেই প্রয়োজন মেটাতে সাহায্য করে।
বেশি করে সিজনাল ফল খাওয়া উচিত সবার। কারণ ফলে রয়েছে ফাইবার, যা খাবার হজমে সাহায্য করে। ফলের মধ্যে প্রচুর পানি রয়েছে। ফল অ্যান্টি-অ্যাসিডিক। এতে উপস্থিত অর্গানিক অ্যাসিড ও ন্যাচারাল হাই সুগার শরীর সুস্থ ও তাজা রাখে, সঙ্গে সঙ্গে এনার্জি দেয়। ফলে প্রোটিন ও ফ্যাটের পরিমাণ কম থাকে। ভিটামিন, মিনারেল ও এনজাইমে সমৃদ্ধ ফল আমাদের রোগ প্রতিরোধে সাহায্য করে। এক্সারসাইজ করার জন্যে বেশি এনার্জি পাওয়া যায়। ফল হাই ব্লাডপ্রেসার ও কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণ করে হার্টের সমস্যা প্রতিরোধ করে। নিয়মিত ফল খেলে টাইপ-টু ডায়বেটিস হওয়ার আশঙ্কা কমে। ফল বার্ধক্য প্রতিরোধ করে? অস্থুলতা ঠেকাতে টক জাতীয় ভিটামিন সি সমৃদ্ধ ফল খেলে উপকার পাওয়া যায়। এ জন্যে নিয়মিত ফল খাওয়ার অভ্যেস গড়ে তুলতে হবে। শিশু বিশেষজ্ঞরা বলেন, শিশুদের জন্য প্রতিদিন অন্তত একটি ফল খাওয়া অপরিহার্য।

মধুফল কেন খাবে
জ্যৈষ্ঠের গরমে প্রচুর ফল খাও এবং দেহে সঞ্চয় করে নাও ভিটামিন ও খাদ্যশক্তি।
আম বাড়ায় শরীরের উজ্জ্বলতা : আম পাকা কি কাঁচা দু’টোতেই এর স্বাদ জিভে পানি এনে দেয়। তবে একটা কথা মনে রাখবে, খালি পেটে কাঁচা আম কখনোই খাবে না। আবার অতিরিক্ত পাকা আমও খাবে না। তা খেলে কোষ্ঠকাঠিন্য হতে পারে। এতে গ্যাসের সমস্যাও তৈরি হতে পারে। মনে রাখবে, কাঁচা আম খাওয়ার পর পরই পানি একেবারে খাবে না। আম শরীরে শক্তি বাড়ায়। এনার্জি বাড়ায়। অন্যদিকে ত্বকের উজ্জ্বলতা বাড়াতেও সাহায্য করে। টক-মিষ্টি-ঝাল যাদের পছন্দ তাদের জন্য কাঁচা আমের কদর একটু বেশি। লবণ-মরিচ মাখিয়ে ঝিনুক কিংবা ছুরি দিয়ে পাতলা করে কেটে বাসাবাড়িতে কাঁচা আমের মাখা খাওয়ার ধুম লাগে। মায়েরা সারাবছর খাওয়ার জন্য আম দিয়ে আচার, মোরব্বা, চাটনি তৈরি করে বলে এর চাহিদা বেশি।
কাঁঠাল কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে : কাঁঠাল পুষ্টিকর ফল। বাজারে কাঁচা ও পাকা কাঁঠাল পাওয়া যায়। কাঁচা কাঁঠাল তরকারি হিসেবে উত্তম সবজি। পাকা কাঁঠালে রয়েছে প্রচুর শর্করা, আমিষ, ভিটামিন ও খনিজ লবণ। গ্রীষ্মকালীন সময়ে গ্রামবাংলার মানুষ ভাতের পরিপূরক হিসেবে পাকা কাঁঠাল খেয়ে থাকে। কাঁঠালের বীচিও খুব পুষ্টিকর। ফাইবার বা আঁশ কাঁঠালে বেশি থাকার জন্য কাঁঠাল খেলে কোষ্ঠকাঠিন্য দূর হয়।
জাম রক্ত পরিষ্কার করে : আমাদের অতি চেনা কালো জাম। কবি জসিম উদ্দীনের সময়ের মতো এখন আর মামার দেশেও খুব একটা দেখা যায় না জাম, মুখ রঙিন করা তো অনেক দূর। দাদা বাড়ি  নানা বাড়ি গিয়ে চাচা- মামাদের সাথে মধুমাসের ফলের স্বাদ গ্রহণকালের স্রোতের গহিনে হারাতে বসেছে যেন। জাম একটি অত্যন্ত পুষ্টিকর ফল। বিশেষ করে ক্যালসিয়াম ও ভিটামিনে ভরপুর। জামে আছে নানা গুণ। জাম আমাদের রক্ত পরিষ্কার করে, দেহের প্রতিটি প্রান্তে অক্সিজেন পৌঁছে দেয়। ফলে শরীরের প্রতিটি অঙ্গ সঠিকভাবে কাজ করে। চোখের ইনফেকশনজনিত সমস্যা ও সংক্রামক (ছোঁয়াচে) রোগের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে। রাতকানা রোগ ও চোখের ছানি অপারেশন হয়েছে এমন রোগীর জন্য জাম ভীষণ উপকারী। জামে গার্লিক এসিড, ট্যানিস নামে এক ধরনের উপকরণ রয়েছে, যা ডায়রিয়া ভালো করতে সাহায্য করে।
ডায়াবেটিস রোগ ও হরমোনজনিত রোগীদের জন্য এই ফল যথেষ্ট উপযোগী। কারণ, জাম রক্ত পরিষ্কার করে, শরীরের দূষিত কার্বন ডাই-অক্সাইডের মাত্রা কমিয়ে দেয়। আমাদের নাক, কান, মুখের ছিদ্র, চোখের কোনা দিয়ে বাতাসে ভাসমান রোগ-জীবাণু দেহের ভেতর প্রবেশ করে। জামের রস এই জীবাণুকে মেরে ফেলে।


ওজন নিয়ন্ত্রণে তরমুজ : গরমে তরমুজ যেন প্রাণে নতুন প্রেরণা দেয়। প্রতিদিন এক টুকরো তরমুজ খেলে শরীরে ক্ষতিকারক কোলেস্টেরল বা চর্বি গঠনে বাধাগ্রস্ত হয়। ফলে হৃদরোগের ঝুঁকি কমে। এছাড়া ওজন নিয়ন্ত্রণেও তরমুজ বিশেষভাবে সাহায্য করে। তরমুজের রসের মধ্যে যে রাসায়নিক উপাদান রয়েছে তার সাহায্যে এটি সম্ভব হয়। তবে তরমুজ কেটে কখনও খুলে রাখবে না। খাওয়ার পর কমপক্ষে এক ঘণ্টা পানি খাবে না। মৃগী, পিত্ত, জন্ডিস, মস্তিষ্কের কোনো সমস্যা হলে তরমুজ খাওয়া বেশ উপকারী।
পিপাসা রোধে লিচু : উপকারী ফল হিসেবে লিচু সবার কাছে পরিচিত। লিচু সুগন্ধযুক্ত রসালো, স্বাদে মিষ্টি, বলকারক, মস্তিষ্কের শক্তিবর্ধন এবং সর্বোপরি পুষ্টিগুণসমৃদ্ধ। একটি লিচুতে রয়েছে প্রোটিন, ক্যালসিয়াম, ফ্যাট কার্বোহাইড্রেট, থায়ামিন, রিবোফ্লাবিন, আয়রন, এসকরবিক এডিসসহ আরও অনেক ধরনের উপকারী ক্যালসিয়াম, যা শরীরের জন্য বেশ কার্যকর। এছাড়া পিপাসা রোধে লিচু উপকারী।
সাইট্রাস ফল : এই শ্রেণীর মধ্যে পড়ে লেবু, মোসাম্বি, কমলালেবু। এর মধ্যে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন ‘সি’ রয়েছে। এ সময় যাদের জ্বর আসে তাদের জন্য এ ফলগুলো ওষুধের কাজ করে। তবে অতিরিক্ত সর্দি ও কাশি হলে লেবু সরাসরি খাবে না। অন্যদিকে মূত্র রোগ বা বমি হলে মোসাম্বি কখনও খাবে না। মোসাম্বি বেশি পরিমাণে চুষে খেলে দাঁত খারাপ হয়ে যায়। কমলালেবু শক্তি বাড়ায়। তবে সকালে ঘুম থেকে উঠে বা রাতে শোয়ার সময় কমলালেবু খাবে না। মনে রাখবে- পিত্ত, ফোড়া, শ্বাসকষ্ট, বমি, কলেরা, জন্ডিস, মৃগী, কোষ্ঠকাঠিন- এ রোগের ক্ষেত্রে এই ফলগুলো খেলে উপকার পাওয়া যায়।
আঙ্গুর খেলেই শক্তি বাড়ে : আঙ্গুর খেতে যেমন সুস্বাদু, এর গুণও প্রচুর। এতে প্রচুর পরিমাণে গ্লুকোজ থাকে। তাই আঙ্গুর খেলেই এনার্জি বেড়ে যায়। তবে খালি পেটে কখনও আঙ্গুর খাবে না। একদিনে ৫০ থেকে ৭৫ গ্রামের বেশি আঙ্গুর খাওয়া ঠিক নয়। আঙ্গুর বহু রোগের জন্য উপকারী। এলার্জি, জন্ডিস, এনিমিয়া, ক্যান্সার, হৃদরোগ, কাশি, সর্দি, কোষ্ঠকাঠিন্য ও জ্বর হলে আঙ্গুর খেলে উপকার পাওয়া যায়।
পেঁপে কমায় হৃদরোগের ঝুঁকি : সুস্বাদু গ্রীষ্মকালীন অর্থাৎ মধুফল পেঁপে হৃদরোগের ঝুঁকি কমায় ও ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখে। বিষয়টি নিয়ে গবেষণার পর করাচি বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল শিক্ষার্থী এমনটাই দাবি করেছেন। অকার্যকর কিডনিকে সচল করতে পেঁপে বীজের রস একটি অপরিহার্য উপাদান। পেঁপের বীজে ফ্লাভোনোইডস ও ফিনোটিক নামক যে উপাদান রয়েছে তা কিডনি রোগের জীবাণুর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। এই পেঁপের বীজ দেহকে যেকোনো ধরনের জীবাণুর সংক্রমণ থেকে রক্ষা করে ও পাকস্থলীকে সংক্রামক মুক্ত রাখে। মজার বিষয় হলো, জাপানের জনগণ বিশ্বাস করে, প্রতিদিন এক চা চামচ পেঁপে বীজের রস খেলে যকৃতের রোগ থেকে রক্ষা পাওয়া যায় ও কাঁচা পেঁপে কাটার পর যে সাদা রস বের হয় শরীরের ক্ষতস্থানে তা লাগালে প্রাকৃতিকভাবে ক্ষত সেরে যায়।
পেঁপে বীজের রস প্রতিদিন খেলে চোখের জ্যোতি বৃদ্ধি পায়, ওজন কমে, উচ্চরক্তচাপ থেকে রক্ষা পাওয়া যায়, শরীরের অভ্যন্তরীণ অবস্থাকে স্বাভাবিক রাখে ও কোষ্ঠকাঠিন্য দূর হয়।
আনারস : আনারস সম্ভবত আমাদের দেশের ফল নয়। অথচ এখন বিপুল পরিমাণ আনারস উৎপন্ন হচ্ছে বাংলাদেশে। আর মধুমাসের ফল হিসেবে এর রয়েছে আলাদা গুরুত্ব। জ্বরজ্বারি হলে আনারস খেলে দেহে বল বৃদ্ধি পায়। মুখের রুচিও বাড়ে।
খুবই উপাদেয় ডাবের পানি : ডাব যদিও কেবলমাত্র গ্রীষ্মকালের ফল নয়, তারপরও জ্যৈষ্ঠের গরমে ডাবের পানি শরীর ঠাণ্ডা রাখতে বেশ কার্যকরী। ডাবের পানি খুবই উপাদেয়। আক্ষরিক অর্থেই ডাবের পানি খেলে পিপাসাই শুধু মেটে না, প্রতিরোধ করে কিডনি রোগও। গবেষকরা বলছেন, কিডনিতে শুধু পাথর হওয়াই নয়, ডায়রিয়া, আলসার, অ্যাসিডিটি, ইউরিন ইনফেকশনসহ বিভিন্ন রোগ সারাতে এর জুড়ি নেই। তবে প্রতিদিন খেতে হবে দুই-তিন গ্লাস। নারকেলের দুধের চেয়ে ডাবের পানি অনেক বেশি স্বাস্থ্যকর। কেননা এতে কোনো কোলেস্টেরল নেই, বলতে গেলে নেই সুগারও। অথচ প্রচুর পরিমাণে রয়েছে পটাশিয়াম, ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম, ভিটামিন সি, রিবোফ্লাভিন ও কার্বহাইড্রেট। ডাবের পানির সবচেয়ে ভালো দিক হলো এটি ৯৯ শতাংশ চর্বিমুক্ত।
প্রাণ জুড়াতে বেলের শরবত : বেল একটি পুষ্টিকর ফল। এতে থাকে প্রচুর শর্করা, প্রোটিন, ভিটামিন ও খনিজ লবণ। গ্রীষ্মের কাঠফাটা দুপুরে এক গ্লাস বেলের শরবত খেলে কার না প্রাণ জুড়ায়! কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে বেলের জুড়ি নেই।
লোভনীয় ফল তালশাঁস : প্রচণ্ড তাপদাহে দুর্বিসহ হয়ে ওঠে যখন সাধারণ মানুষের জনজীবন, তখন তীব্র তাপদাহের মাঝে একটু স্বস্তি পেতে শৌখিন ক্রেতা থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের কাছেও মধু মাসের ফল তালশাঁসের কদর বেড়ে যায় বহুগুন। প্রত্যান্ত গ্রামাঞ্চলের প্রধান প্রধান সড়কের মোড়ে মোড়ে বিক্রেতারা হরদমে বিক্রি করেন তালশাঁস। কোনো কোনো বিক্রেতা ভ্যানযোগে পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে তালশাঁস বিক্রি করে থাকেন। এখন এই ফলটি শহরে বিক্রি করে অনেকে জীবিকা নির্বাহ করেন। ছেলে-বুড়ো থেকে শুরু করে স্কুল কলেজগামী শিক্ষার্থীরা প্রচণ্ড গরমে একটু স্বস্তি পেতে ভীড় করেন তালশাঁস বিক্রেতাদের কাছে। অনেকে পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের জন্য কিনে নিয়ে যান তালশাঁস সকল শ্রেণী বা পেশার লোকজনই মধু মাসের ফল তালশাঁস কিনতে ভীড় করেন বিক্রেতাদের কাছে। কচি তাল বা তালের শাঁসে আর্দ্রতার অংশ বেশি। এ ছাড়াও কচি তালে আছে প্রচুর পরিমাণে খনিজ লবণ।
খাদ্যশক্তি সমৃদ্ধ পানি ফল : গরমকালে পানি ফল আরেকটি পুষ্টিকর ফল। এতে শতকরা ৪.৭ গ্রাম প্রোটিন পাওয়া যায় যা আপেল, আঙুর, কলা ও পেয়ারা থেকে বেশি। এছাড়া রয়েছে শ্বেতসার, খনিজ লবণের মধ্যে ক্যালসিয়াম, ফসফরাস, আয়রন ইত্যাদি। খাদ্যশক্তি পাওয়া যায় ১১৫ কিলোক্যালরি।
রসালো ফল স্ট্রবেরি : লাল টুকটুকে সুস্বাদু রসালো ফল স্ট্রবেরি। ফলটি বেশ লোভনীয়ও বটে। ফলটি ক্রমেই বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। এই ফল সরাসরি খাওয়া হয় আবার প্রক্রিয়াজাত করে বিভিন্ন ধরনের খাদ্যসামগ্রীও প্রস্তুত করা হয়।

মধু মাসের আবহেলিত ফল
মধুমাসে হাজারো মিষ্টি মধুর ফলের ভীরে অবহেলিত একটা ফল হলো করমচা। এটি বাংলার আনাচে কানচে প্রায় সব এলাকায়ই হয়ে থাকে। কিন্তু বাজারে খুব একটা পাওয়া যায় না। তাই তোমরা যারা এই সময় গ্রামে বেড়াতে যাবে, তারা অবশ্যই করমচা খোঁজ করবে এবং খেয়ে এর মধুর স্বাদ নেবে।
গোলাপজাম আমাদের দেশের একটি অপ্রচলিত ফল। অনিন্দ্য সুন্দর অবয়ব, ফিকে হলুদ কিংবা হালকা গোলাপী রং, মিষ্টি স্বাদ, রসালো এবং গোলাপ ফুলের সুগন্ধযুক্ত ফলটি বাংলাদেশ থেকে প্রায় বিলুপ্তির পথে। এই ফলে প্রায় সব ধরনের পুষ্টি উপাদানই কমবেশি বিদ্যমান। এই ফল মূল্যবান ফল হিসেবে বিবেচিত।
এছাড়া মধু মাসের অবহেলিত ফলের মধ্যে আছে আতা, ফুটি ইত্যাদি। এগুলো শহরাঞ্চলে খুব একটা দেখা যায় না। অথচ এগুলোর পুষ্টিগুণ বেশ উচ্চমানের।
কয়েকটি ফলের পুষ্টিগুণ
আমে আছে প্রচুর ক্যারোটিন। আমের এই ক্যারোটিন মানুষের ত্বকের মসৃণতা বাড়ায়। সৌন্দর্য বাড়াতে আমের জুড়ি নেই। চুলের রুক্ষতা কমায় পাকা আম। সাধারণত অন্যান্য ফলের এই বিশেষ গুণটি কম থাকে। প্রতি ১০০ গ্রাম পাকা আমে আছে আন্তর্জাতিক এককে ২৫০০-৮০০০ ক্যারোটিন। জলীয় অংশ থাকে ৭৫ থেকে ৮৫ ভাগ। শর্করা ১৪ ভাগ, ফলিক এসিড চার ভাগ, অ্যালকোহল দুই ভাগ, ভিটামিন সি ১৭৫ মিলিগ্রাম। ১০০ গ্রাম কাঁচা আমে থাকে ৯০ ভাগ জলীয় অংশ। শর্করা ৮.৮ ভাগ, প্রোটিন ০.৭ ভাগ, চর্বি ০.১ ভাগ, ক্যালসিয়াম ০.০১ ভাগ, শর্করা ৮.৮ ভাগ। এ ছাড়া ভিটামিন সি তিন মিলিগ্রাম। আমের জলীয় অংশ মানুষের দেহের খাদ্য পরিপাকে সাহায্য করে এবং শরীরের দূষিত পদার্থ বের করে দিতেও সাহায্য করে। মানুষের শরীরের স্বাভাবিক রক্ত চলাচলে সাহায্য করে আম। আম ঔষধি গুণেও ভরপুর। যকৃৎ ভালো রাখতে আম হতে পারে উৎকৃষ্ট ফল। কখনো কখনো ডায়রিয়া রোগের ওষুধ এই আম। তাই মৌসুম শেষ হওয়ার আগেই যত খুশি আম খেয়ে নাওন।
জাম আমাদের অবহেলিত দেশী ফল হলেও পুষ্টি ও ভেষজগুণসমৃদ্ধ। জামে সব ধরনের পুষ্টি উপাদান আছে। ক্যালসিয়ামের পরিমাণ আম, কলা, আনারস, পেয়ারা, বরই ও তরমুজের চেয়ে বেশি। আয়রনের পরিমাণ আম, কাঁঠাল, কলা, পেঁপে, আনারস, পেয়ারা, লিচু, বরই, আঙুর, কমলা ও লেবুর চেয়ে অনেক বেশি। ভিটামিন এ-এর পরিমাণ কলা, পেয়ারা, লিচু ও তরমুজের চেয়ে বেশি। ভিটামিন সি-এর পরিমাণও আম, কাঁঠাল, কলা, পেঁপে, আনারস, লিচু, বরই, লেবু ও তরমুজের চেয়ে সামান্য বেশি। পুষ্টি বিজ্ঞানীদের তথ্য অনুযায়ী প্রতি ১০০ গ্রাম খাদ্যোপযোগী জামে রয়েছে জলীয় অংশ ৯৬.৬ গ্রাম, মোট খনিজ পদার্থ ০.১ গ্রাম, আমিষ ১ গ্রাম, শর্করা ১.৪ গ্রাম, ক্যালসিয়াম ২২ মিলিগ্রাম, আয়রন ৪.৩ মিলিগ্রাম, ক্যারোটিন ১২০ মাইক্রোগ্রাম, ভিটামিন বি১ ০.০৯ মিলিগ্রাম, ভিটামিন বি২ ০.০২৪ মিলিগ্রাম, ভিটামিন সি ৬০ মিলিগ্রাম ও খাদ্যশক্তি ১১ কিলোক্যালরি। তবে এই পুষ্টিমান জামের বিভিন্ন জাত ও মাটির ভিন্নতার জন্য কিছুটা পরিবর্তন হতে পারে।
কাঁঠালের পুষ্টি উপাদান বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, প্রায় সব ধরনের পুষ্টিই এ ফলে রয়েছে। খাদ্য উপাদানে পাকা কাঁঠালে জলীয় অংশ ৭৭.২%, শর্করা ১৮.৯% , প্রোটিন ১.৯%, আঁশ ১.১%, খনিজ ০.৮% এবং স্নেহ ০.১% পুষ্টি রয়েছে। এছাড়া খনিজের মধ্যে ক্যালসিয়াম রয়েছে ০.০২%, ফসফরাস ০.০৩%, এবং লৌহ ০.৫%। প্রতি ১০০ গ্রাম কাঁঠালে রয়েছে ৪৭০০ মাইক্রোগ্রাম ক্যারোটিন অর্থাৎ ৭৮৩ মাইক্রোগ্রাম রেটিনল বা ভিটামিন এ, ১০০ গ্রাম কাঁঠালে ৮৮ কিলোক্যালরি শক্তি রয়েছে। চর্বি ০.১%, আমিষ ১.৮% গ্রাম, ২১ মিলিগ্রাম ভিটামিন সি রয়েছে। এছাড়া ভিটামিন বি ৩০ মিলিগ্রাম ও ভিটামিন এ আইইউ ৫৪০ গ্রাম, ০.৪ মিলিগ্রাম নিকোটিক এসিড রয়েছে।
অন্যদিকে প্রতি ১০০ গ্রাম কাঁচা কাঁঠালে রয়েছে খাদ্যশক্তি ৫১ কিলো ক্যালরি, শর্করা ৯.৫ গ্রাম, আমিষ ২.৬ গ্রাম, চর্বি ০.৩ গ্রাম, ক্যালসিয়াম ৩০ মিলিগ্রাম, লৌহ ১.৭ মিলিগ্রাম, ভিটামিন সি ১৪ মিলিগ্রাম, ভিটামিন বি ১০.৫ মিলিগ্রাম ও ভিটামিন বি২ ০.০৪ মিলিগ্রাম। কাঁঠালের কোনো অংশই ফেলনা নয়। এর কোষ, বীচি ছাড়া ভেতরের মোথা, কাঁঠালের ছোলা গবাদিপশুর খাদ্য হিসেবে ব্যবহার হয়। কাঁঠালের বীচি অনেকের কাছেই অত্যন্ত প্রিয় খাদ্য। এ বীচি সিদ্ধ বা ভেজে ভর্তা করে অথবা শুধু ভেজেও খাওয়া হয়। তাছাড়া এটি তরকারি হিসেবে খুবই সুস্বাদু। এটি খুবই পুষ্টিকর ও মুখরোচক খাদ্য। প্রতি ১০০ গ্রাম কাঁঠালের বীচিতে ক্যালরি ১৩০ গ্রাম, আমিষ ৬.৬ গ্রাম, শর্করা ২৫.৮ গ্রাম, ক্যালসিয়াম ৫০ মিলিগ্রাম, লৌহ ১.৫ মিলিগ্রাম ও ভিটামিন বি-২ ০.২৫ মিলিগ্রাম পুষ্টি রয়েছে। মোটকথা, আমাদের জাতীয় ফল কাঁঠাল পুষ্টিগুণে ভরপুর।
লিচু পুষ্টির দিক দিয়েও বেশ সরস। লিচুর আর্দ্রতার পরিমাণ বেশি হলেও ক্যালরি মূল্যও বেশি। প্রতি ১০০ গ্রাম লিচুর ক্যালরি মূল্য ৭৯ কিলোক্যালরি। লিচুর ক্যালরি মূল্য বেশি বলে ডায়াবেটিক মানুষের পরিমিতভাবে লিচু খাওয়া ভালো।
গ্রীষ্মের শুরু থেকেই বাজারে এবং রাস্তার পাশে অনেক জায়গায় স্তূপ আকারে সাজানো থাকে তরমুজ। আয়ুর্বেদ শাস্ত্রে তরমুজকে বলে ফলের রাজা। তরমুজে রয়েছে ত্বকে আর্দ্রতা জোগানোর অসীম ক্ষমতা। তরমুজ ভিটামিন এ ও সি সমৃদ্ধ ফল। এতে রয়েছে ৯৭ ভাগ জলীয় অংশ, সেজন্য গরমে তরমুজ খাওয়া ভালো। কারণ ক্রমাগত ঘাম হওয়ার জন্য যে জলীয় অংশ শরীর থেকে বেরিয়ে যায় তা ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করে। এছাড়া তরমুজ কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে, হজমে সাহায্য করে ও কিডনির কাজকর্ম ঠিক রাখে।
এখন বুঝতেই পারছো এই ফল আমাদের জন্য কতটা উপকারী।

কতটা নিরাপদ মধুমাসের ফল
বাজারে মৌসুমী ফল আসার পাশাপাশি পত্রিকায় ছবি আসাও শুরু হয়েছে। বিভিন্ন বাহিনীর হাতে জব্দ হচ্ছে রাসায়নিক পদার্থযুক্ত ফল। সেই ফলগুলো নষ্ট করে ফেলা হচ্ছে। এখন লাখ টাকার প্রশ্ন হচ্ছে, রাসায়নিক পদার্থ মেশানো সব ফল কি প্রশাসন জব্দ করতে পারছে? বাজার থেকে দাম দিয়ে যে ফল আমরা কিনে খাচ্ছি, তা কতটা স্বাস্থ্যসম্মত?
মৌসুম শুরুর দিকে বাজারে কেবল কাঁচা আমই পাওয়া যায়। তখন পাকা আমের চাহিদা বেশি থাকে। কিছু অসাধু ব্যবসায়ী সেই সুযোগে কাঁচা আমগুলো কৃত্রিম উপায়ে পাকিয়ে বাজারজাত করে। কিন্তু সেগুলো খুচরা বিক্রেতাদের বোঝার উপায় থাকে না। আর যারা ক্রেতা তারাও বুঝতে পারেন না। ফলে স্বাভাবিকভাবে পাকা আম বাজারে আসার আগেই কাঁচা আম দিয়েই ব্যবসায়ীরা ফায়দা লুটতে চান। কিন্তু তারা একবারের জন্য ভাবেন না এসব কেমিক্যাল মিশ্রিত আম কতটা বিষাক্ত। প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে ব্যবসায়ীরা দিব্যি এ কাজ করেন। আর অল্প কিছু ব্যবসায়ী এসব অসৎ উপার্জনের সাথে জড়িত থেকে বাকি ব্যবসায়ীদেরকেও অনেক সময় বাধ্য করান। ফলে অধিক মুনাফার লোভে একশ্রেণীর ব্যবসায়ী জেনে-শুনে কেমিক্যাল দিয়ে আম পাকিয়ে মানুষ হত্যার মতো খারাপ কাজে রত থাকেন।
তবে এমন অভিযোগও পাওয়া যায়, কিছু আড়ত মালিক আমের বাগান ক্রয় করে থাকেন। সেখানে তারা কাঁচা আম বাগান থেকে সংগ্রহ করে ক্যালসিয়াম কার্বাইড জাতীয় এক ধরনের কেমিক্যাল দিয়ে পাকান। পরবর্তীতে সেগুলো ট্রাক ভর্তি করে শহরের আড়তদারদের কাছে পাঠিয়ে দেন। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে, এখন আঙুর ফলেও বিষাক্ত কেমিক্যাল মেশানো হচ্ছে। ফলে রোগীর জন্য কেনা এসব ফলমূলেও যদি বিষাক্ত উপাদান থাকে তাহলে রোগীর কী অবস্থা দাঁড়াবে ভাবতেই গা শিউরে ওঠে। আর শিশুরাই মূলত আঙুর জাতীয় ফল বেশি পরিমাণে খায়। ফলে তাদের উপরই এর প্রভাব বেশি পড়ে। এই বিষাক্ত ফল খেলে তাৎক্ষণিক পেটের পীড়া ও ডায়রিয়াসহ নানা ধরনের রোগ দেখা দেয়। পরবর্তীতে রক্তে মিশে গিয়ে ক্যান্সার, কিডনী, লিভার সিরোসিস হয়ে ধীরে ধীরে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়বে রোগী। গর্ভবতী মা এ আম খেলে মা ও পেটের সন্তান এই সকল মরণ ব্যাধিতে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা বেশি। সবচেয়ে ক্ষতিকর দিক হলো, পেটের সন্তানটি হাবাগোবা ও বিকলাঙ্গ হওয়ার ঝুঁকি থাকে।

কেমিক্যালযুক্ত ফল চিনবে যেভাবে
প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ায় যে ফল পাকে তাতে মাছি বসবে; কিন্তু কেমিক্যাল দিয়ে পাকানো হলে সে ফলে মাছি বসবে না। আম কাটার পর চামড়ার ঠিক নিচে ফলের অংশে কাঁচা পাওয়া যাবে। যদিও চামড়াটি পাকা রংয়ের বর্ণ ধারণ করেছিল। যদি ঝুড়িতে বা দোকানে সবগুলো ফল একই সময়ে একই রকম পাকা দেখা যায় এবং দুই থেকে তিনদিনের মধ্যে ফলের চামড়ায় আঁচিল বা তিলের মতো রং দেখা যায়, তাহলে বুঝতে হবে এগুলো কেমিক্যালযুক্ত ফল। প্রাকৃতিকভাবে পাকা ফলের চামড়া উঠানোর পর এক ফোঁটা আয়োডিন দিলে তা গাঢ় নীল অথবা কালো বর্ণ ধারণ করে। কিন্তু কেমিক্যাল দিয়ে পাকানো ফলে এই আয়োডিনের রং অপরিবর্তিত থাকে।

কার্বাইড পরীক্ষার নিয়ম : এক কেজি আম নিয়ে ভালোভাবে পানিতে ধুয়ে নিতে হবে। এরপর পানির সঙ্গে শূন্য দশমিক ১ মিটার সোডিয়াম হাইড্রো-অক্সাইড মেশাতে হবে। ক্যালসিয়াম ইন্ডিকেটর যোগ করে ইডিটিএ দ্রবণ দিয়ে ট্রাইটেশন করলে যদি গোলাপি রং ধারণ করে তাহলে বুঝতে হবে আমের মধ্যে কার্বাইড আছে। এজন্য ১০ গ্রাম লবণের পানিতে আমগুলো কিছুক্ষণ ডুবিয়ে রাখতে হবে। এরপর ভালোভাবে ধুয়ে আমের ভেতরের অংশ খেলে কিছুটা রক্ষা পাওয়া যাবে।
আমাদের দেশে ফলের উৎপাদন বাড়ানো প্রয়োজন। একটু চেষ্টা করলে প্রচুর ফল এখানে ফলানো সম্ভব। ফলে বিদেশ থেকে ফল আমদানি অনেক কমে যাবে। দেশের মাটিতে উৎপাদিত ফল দেশের মানুষ খেতে পারবে। এ জন্যই পাহাড়ী এলাকা এবং সমতল এলাকা সর্বত্র সব ধরনের ফল চাষের সম্ভাবনা পরীক্ষা করে দেখে ফল চাষে ব্যাপক উৎসাহ সৃষ্টি করা দরকার। উৎসাহী ব্যক্তিদের প্রয়োজনীয় সহায়তার ব্যবস্থা করতে পারলে এ দেশের মাটিতেই বিপুল পরিমাণ ফল উৎপন্ন করা সম্ভব। দেশের চাহিদা মিটিয়ে সেসব ফল বিদেশেও রফতানি করা সম্ভব।

SHARE

1 COMMENT

Leave a Reply