Home বিশেষ রচনা শৈশব বিক্রি করা শিশুশ্রমিক

শৈশব বিক্রি করা শিশুশ্রমিক

শৈশব বিক্রি করা শিশুশ্রমিক
দিতে হবে ন্যায্য অধিকার
হারুন ইবনে শাহাদাত

সুন্দর ফুটফুটে ১২ বছরের ছেলে আবুল। ছোট ছোট নরম হাতে ইট ভাঙছে। মাথার ওপর ছাতা আছে তারপরও ঘামছে। রিকশার টিউব কেটে হাতের আঙুলগুলো বেঁধে রেখেছে। সে স্কুলে না গিয়ে ইট ভাঙার মতো কঠিন কাজ করছে কেন জানতে চাইলে বলল, ‘পেডের ভাত জোডে না আবার লেহাপড়া।’ তারপর সে তার জীবনযুদ্ধের যে কাহিনী শোনালো তা বড় করুণ। বাবা থেকেও নেই। মা অসুস্থ। তার বাবা দুই সন্তানসহ ওর মাকে ফেলে আরেকটি বিয়ে করেছে। ওদের খোঁজখবর নেয় না। নতুন বউ নিয়ে আলাদা বস্তিতে থাকে। আবুল আগে শহরের সরকারি প্রাইমারি স্কুলে যেত। মা অন্যের বাসায় কাজ করতো। কিন্তু তিনি এখন অসুুস্থ। আবুলের আয়ে এখন চলছে ওদের তিনজনের সংসার। মায়ের চিকিসার টাকাও তাকেই সংগ্রহ করতে হয়। এই অল্প বয়সে সংসার হাল ধরতেই আবুল এ ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করছে। সে এখন শিশুশ্রমিক। তার মনে দুঃখ সে বড়দের চেয়ে কম কাজ করে না, তারপরও তার মজুরি বড়দের অর্ধেক।
শুধু আবুল নয়, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০০৯ সালের এক জরিপে জানা যায়, দেশের ৩৫ লাখ শিশুশ্রমিকের মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ শ্রমে নিয়োজিত রয়েছে ১৩ লাখ শিশু, যা মোট শিশুশ্রমিকের ৪১ শতাংশ। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা আইএলওর (ইন্টারন্যাশনাল লেবার অর্গানাইজেশন) তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশের শিশুশ্রমিকরা প্রায় ৩৪৭ ধরনের অর্থনৈতিক কর্মকা-ের সাথে জড়িত। এর মধ্যে ৪৭ ধরনের কাজকে ঝুঁকিপূর্ণ ও ১৩ ধরনের কাজকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। শুধুমাত্র একবেলা খাবার জোগাড় করতে এই দরিদ্র পরিবারের শিশুরা দৈনিক ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে। চরম দারিদ্র্যের কারণে তাদের বাবা-মা তাদেরকে এ ধরনের কাজে ঠেলে দিতে বাধ্য হয়। শিশুরা ধাতব কারখানা, ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কশপ, প্লাস্টিক কারখানা, অটোমোবাইল ওয়ার্কশপ, গাড়ির গ্যারেজ, ঝালাই কারখানা, রিকশা মেরামত, মোটরসাইকেল ওয়ার্কশপ, গাড়ির-টেম্পোর হেল্পারি, লেদ কারখানা, হাঁড়ি-পাতিল বানানো, ইট ভাঙা, বিড়ির কারখানা এবং ছোট ছোট কুুটির শিল্পে কাজ করে।
অন্য একটি পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, বাংলাদেশে ৬ থেকে ১৬ বছরের মোট ৪ লাখ ২০ হাজার শিশু বাসাবাড়িতে কাজ করে। এদের শ্রমঘণ্টা ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা। এই পরিসংখ্যানের বাইরে যে কত শত শিশুশ্রমিক আছে, সেই হিসাব কোন খাতায় নেই।
জাতীয় শিশুনীতি ২০১১-তে শিশু-কিশোরদের যে সংজ্ঞা দেয়া হয়েছে তা হলো, শিশু বলতে আঠারো বছরের কম বয়সী বাংলাদেশের সকল ব্যক্তিকে বুঝাবে। দেশের প্রচলিত কোন আইনে এর ভিন্নতা থাকলে এই নীতির আলোকে প্রয়োজনীয় সংশোধনের মাধ্যমে সামঞ্জস্য বিধানের উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে।


কিশোর-কিশোরী বলতে ১৪ বছর থেকে ১৮ বছরের কম বয়সী শিশুদেরকে বোঝাবে।
শিশু ও মহিলা অধিদফতরের তথ্যানুসারে বাংলাদেশের ১৮ বছরের কম বয়সের জনসংখ্যা ৬ কোটি ৩০ লক্ষ যা মোট জনসংখ্যার ৪৫ শতাংশ। এই শিশুনীতির ভূমিকায় বলা হয়েছে, ‘শিশু জাতি গঠনের মূল ভিত্তি। স্বাধীনতার পর সুখী, সমৃদ্ধ, সোনার বাংলা গড়ার প্রত্যয়ে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সর্বক্ষেত্রে সকল শিশুকে পূর্ণ মর্যাদাবান মানুষরূপে গড়ে তোলার লক্ষ্যে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেন। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানে শিশুসহ সকল নাগরিকের মৌলিক অধিকার সন্নিবেশিত রয়েছে। সংবিধানের তৃতীয় অধ্যায়ে অনুচ্ছেদ ২৭, ২৮, ২৯, ৩১, ৩৪, ৩৭,৩৮, ৩৯, ৪০, ৪১ এ সকল নাগরিকের মৌলিক মানবাধিকারের নিশ্চয়তা প্রদান করা হয়েছে। বিশেষ করে অনুচ্ছেদ ২৮(৪) এ শিশুদের অগ্রগতির জন্য রাষ্ট্র কর্তৃক বিশেষ বিধান প্রণয়ন করার বিষয় সন্নিবেশিত রয়েছে। সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১১, ১৪, ১৫, ১৬, ১৭, ১৮, ১৯, ২০ এ রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতিতে শিশুদের জন্য অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষাসহ মৌলিক প্রয়োজনের ব্যবস্থা, সুযোগের সমতা, অধিকার ও কর্তব্য এবং জনস্বাস্থ্য ও নৈতিকতা বিষয়ের ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। শিশুদের সার্বিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা ও অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে প্রণীত হয় শিশু আইন ১৯৭৪ যা যুগোপযোগীকরণের মাধ্যমে শিশু আইন ২০১১ রূপে প্রণয়ন করার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। ১৯৯০ সালে জাতিসঙ্ঘ শিশু অধিকার সনদ (Convention on the Rights of the Child, CRC) ১৯৮৯ এ স্বাক্ষর ও অনুসমর্থনকারী প্রথম রাষ্ট্রসমূহের মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। ১৯৯৪ সালে জাতীয় শিশু নীতি প্রণয়ন করা হয়। পরিবার এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে প্রাসঙ্গিক সকল ক্ষেত্রে শিশুর অধিকার ও মর্যাদা রক্ষা করা একান্ত আবশ্যক। শিশুর সার্বিক উন্নয়ন নিশ্চিত করা ও অধিকার সংরক্ষণের মাধ্যমে একটি সৎ, দেশপ্রেমিক ও কর্মক্ষম ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গড়ে তোলার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সরকার যতœশীল ও সক্রিয়।’
শিশুনীতির ভূমিকার এসব চমৎকার বাক্যগুলো বাস্তবায়ন হলে হয় তা আবুলের মতো শিশুদেরকে এক বেলার খাবার জোগাড়ের জন্য আনন্দের শৈশবকে বিক্রি করতে হবে না। বই-খাতার বদলে হাতুড়ি শাবল হাতে নিয়ে শিশুশ্রমিকের অভিশপ্ত জীবন বয়ে বেড়াতে হবে না।

SHARE

Leave a Reply