Home সাহসী মানুষের গল্প সোনার মখমল

সোনার মখমল

 সোনার মখমল
কায়েস মাহমুদ

চারপাশ কী ভয়ঙ্কর অন্ধকার! ঘুটঘুটে নিকষ কালো অন্ধকার! এতো অন্ধকার যে কাছের মানুষটিকেও দেখা যায় না।
কিন্তু অন্ধকারের তো শেষ আছে। আছে তার পরিসমাপ্তি। অন্ধকারের পরেই তো আসে সোনালি সুরুযের সুমিষ্ট হাসি। যে হাসিতে হেসে ওঠে সমগ্র পৃথিবী।
রাসূলের (সা) যুগে ইসলামের আগমনটাও ছিলো ঠিক তেমনি। যেন আঁধার ভেদ করে সহসায় আলোর দ্যুতি। মুহূর্তেই সেই আলো ছড়িয়ে পড়লো চতুর্দিক।
সেই আলোতে আলোকিত এক দুঃসাহসী সাহাবীর নাম আবু লুবাবা। রাসূলের (সা) সাথে অধিকাংশ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন আবু লুবাবা। বদর যুদ্ধের সময় তিনি বিশেষভাবে সম্মানও লাভ করেন।
বদর যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত মুসলিম বাহিনী।
যুদ্ধের মহান সেনাপতি স্বয়ং রাসূলে করীম (সা)। সৈনিকের চেয়ে বাহনের সংখ্যা কম। সুতরাং একেকটি উটের পিঠে তিনজন করে মুজাহিদ। সেই নিয়মের রাসূলের (সা) ক্ষেত্রেও ব্যতিক্রম হলো না। রাসূল (সা) এখানেও দেখালেন সমতা ও মানবতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
রাসূলের (সা) উটের ওপরও তিনজন সওয়ারী। রাসূল (সা) ছাড়াও তাঁর উটে সওয়ার হলেন আবু লুবাবা ও আলী (রা)। তাঁরা পালা করে উটের পিঠে ওঠা নামা করছিলেন। রাসূল (সা) ও আলী যখন উটের পিঠে, তখন উটের রশি হাতে হেঁটে চলছেন আবু লুবাবা।
এইভাবেই চলছে। পথ অতিক্রম করছেন সত্যের মুজাহিদ। এক সময় পালা এলো রাসূলের (সা)। উটের পিঠে বসবেন আবু লুবাবা এবং আলী (রা)। আর রশি হাতে হেঁটে চলবেন স্বয়ং সেনাপতি রাসূল (সা)! এতে রাসূল (সা) খুশি হলেও কেঁদে উঠলো আবু লুবাবার কোমল হৃদয়। কেঁদে উঠলো তার বিবেক। তিনি আরজ করে বিনয়ের সাথে বললেন, হে রাসূল (সা)! দয়ার নবীজী আমার! দয়া করে আপনি উটের পিঠে বসুন। আমি রশি হাতে হেঁটে চলি।
রাসূল (সা) শুনলেন আবু লুবাবার কথা। একটু হাসলেন। তারপর বললেন, তোমরা আমার চেয়ে বেশি শক্তিশালী নও। আর এমনও নয় যে, তোমাদের চেয়ে আমার বেশি সওয়াবের প্রয়োজন নেই। অতএব তোমরা দু’জন উটের পিঠে বসো। আর আমি রশি হাতে হেঁটে চলি।
এই হলো দয়ার নবীজীর (সা) সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের নমুনা। এই হলো রাসূলের (সা) মানবতাবোধ। পৃথিবীর এমন কোনো শাসক, সেনাপতি কিংবা নেতা নেই, যিনি রাসূলের (সা) চেয়ে বেশি মানবতা প্রদর্শনে সক্ষম হয়েছেন।
আবু লুবাবা নিজের জীবনের চেয়েও অধিক ভালোবাসতেন রাসূলকে (সা)। তাঁকে ভালবাসতেন পৃথিবীর সকল কিছুর বিনিময়ে। রাসূলও (সা) ঠিক তেমনি মহব্বত করতেন আবু লুবাবাÑ এই সত্যের সৈনিককে। এ জন্য হিজরি দ্বিতীয় সনের শাওয়াল মাসে মদিনার ইহুদি গোত্র বনু কায়নুকার সাথে সংঘটিত যুদ্ধে এবং একই সনের জিলহজ মাসে সংঘটিত সাবিক যুদ্ধে আবু লুবাবা যোগদান করতে পারেননি। কারণ এই সময় রাসূল (সা) তাকে মদিনায় স্থলাভিষিক্ত করেন। রাসূল (সা) পনের দিন যাবৎ বনু কায়নোকা অবরোধ করে রাখেন। এই সময় আবু লুবাবা মদিনায় ইমরাত বা প্রশাসকের দায়িত্ব পালন করেন। রাসূলের (সা) পক্ষ থেকে এই বিরল সম্মানের অধিকারী হলেন আবু লুবাবা।
আবু লুবাবার ঈমান ছিল পর্বতের মত অটুট। শক্ত। সামান্য ভুলের কারণেও তিনি মহান বারি তায়ালার কাছে এমনভাবে মাগফিরাত কামনা করতেন, যা ছিলো সত্যই বিরল।
একবার এমনি একটি ভুলের কারণে নিজে অনুতপ্ত হয়ে ছুটে গেলেন মসজিদে নববীতে। এরপর একটি মোটা ও ভারী বেড়ি দিয়ে নিজেই নিজেকে মসজিদের একটি খুঁটির সাথে বেঁধে ফেললেন। তারপর নিজেই ঘোষণা দিলেন : যতক্ষণ আল্লাহপাক আমার তওবা কবুল না করেন, ততক্ষণই এভাবে বাঁধা অবস্থায় থাকবো।
এভাবে কতদিন বাঁধা ছিলেন আবু লুবাবা?
কারো মতে দশ, আবার কারো মতে বিশ দিন-রাত। এসময় জরুরি প্রয়োজনে যেমন নামাজ ও অন্যান্য প্রয়োজনে তার স্ত্রী তাকে বেড়ি খুলে দিতেন। আবার প্রয়োজন মিটে গেলেই বেড়ি বেঁধে নিতেন। এই অবস্থায় আবু লুবাবা আহার-পানাহার প্রায় ছেড়েই দিলেন। এতে করে তার শ্রবণশক্তি কমে যায়, দৃষ্টিশক্তি ক্ষীণ হয়ে পড়ে। আর দুর্বলতায় শরীর ভেঙে যায়। দুর্বলতার কারণে একদিন তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। তবুও নিজেকে মুক্ত করলেন না আবু লুবাবা।
রাসূল (সা) জানেন সব কিছু। তিনিও অপেক্ষায় আছেন মহান রাব্বুল আলামিনের নির্দেশের। রাসূলে কারীম (সা) আছেন উম্মুল মুমিনীন হজরত উম্মু সালামার (রা) ঘরে। তখন শেষ রাত। প্রভাতের আগেই নাজিল হলো আয়াত। রাসূল (সা) হেসে উঠলেন।
রাসূলের (সা) হাসি দেখে উম্মু সালামা জিজ্ঞেস করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আল্লাহ আপনাকে সকল সময় খুশি রাখুন। বলবেন কি আপনার হাসির কারণটা?
রাসূল (সা) বললেন, আবু লুবাবার তওবা কবুল হয়েছে!
উম্মু সালামা জানতে চাইলেন, আমি কি এই সুসংবাদটি মানুষকে জানাতে পারি?
তখনো হেজাব বা পর্দার আয়াত নাজিল হয়নি। রাসূল (সা) বললেন, হ্যাঁ উম্মু সালামা, তুমি এই সুসংবাদটি সবাইকে জানাতে পারো।
রাসূলের (সা) সম্মতি পেয়ে তিনি হুজরার দরোজায় দাঁড়িয়ে সকলকে বিষয়টি জানালেন।
উপস্থিত সবাই ছুটে গেলেন আবু লুবাবাকে মুক্ত করার জন্য। আবু লুবাবা তার সিদ্ধান্তে অটল। বললেন, না কক্ষনো নয়। রাসূল (সা) নিজে এসে যতক্ষণ আমার বেড়ি খুলে না দেবেন, ততক্ষণই এভাবে থাকবো। রাসূল (সা) ফজরের নামাজ আদায়ের জন্য এলেন মসজিদে। আর তখনই তিনি নিজ হাতে বেড়ি খুলে দিলেন আবু লুবাবার বেড়ি।
তওবা কবুল হওয়ায় দারুণ খুশি হলেন আবু লুবাবা।
হিজরি অষ্টম সনে মক্কা বিজয় অভিযানে বনু আমর ইবন আওফের ঝাণ্ডা ছিল হজরত আবু লুবাবার হাতে। কম কথা নয়, আবু লুবাবার তওবা কবুল হওয়ার ঘোষণা সংবলিত আয়াত নাজিল করেছেন মহান রাব্বুল আলামিন। এমন সৌভাগ্য কয়জনের হয়? যাদের হয় তারা সবাই জ্যোতির অধিক।
হজরত আবু লুবাবা (রা)। সারাটি জীবন যিনি মিথ্যার শেকল গলিয়েছেন সত্যের শিখায়।
আর শেষ পর্যন্ত যিনি হয়ে উঠছেন খাঁটি সোনা। সোনার মখমল। যে মখমলের কোনো তুলনাই হয় না। হ

SHARE

Leave a Reply