Home গল্প ছোটনের আজান

ছোটনের আজান

ছোটনের আজান
সোলায়মান আহসান

গ্রামে বেড়াতে এলে একটা অলিখিত স্বাধীনতা পেয়ে যায় ছোটনরা। লোটন তার দুই বছরের ছোট। সেও সঙ্গী থাকে। এই স্বাধীনভাবে ছুটে বেড়ানোতে। গ্রামের অবাধ মুক্ত পরিবেশের একটা নিয়ম বুঝি এই স্বাধীনতা। সবাই স্বাধীন এখানে। বড়রা যেভাবে যে যার মতো চলছে, তেমনি ছোটরাও। সকাল কি বিকেলে ঝুপ করে পুকুরে লাফ দিয়ে পড়ছে। কেউ কিছু বলছে না। ছিপ নিয়ে পুকুরের পাশে কিংবা অনতিদূরে ছড়ায় বসে যাওয়া। মাছ মারার জন্য। খুব একটা বারণ কেউ করে না। ছড়া মানে পাহাড়ি ঝরনা। ছোটন লোটনরা প্রতি বছর একবার বাড়িতে আসে। ঢাকা শহরে আবদ্ধ থাকতে থাকতে ওদের হাড় লেগে আসতে থাকলে তখন মনে মনে ভাবে কবে গ্রামে বেড়াতে যাবে। ওদের আব্বুও এ কথাই বলেনÑ দম বন্ধ হয়ে এলো, চলো ক’টা দিন গ্রাম থেকে শ্বাস নিয়ে আসি।
বলাটা যতো সহজ বেড়াতে বের হওয়া ততোটা সহজ নয়। ঢাকা শহরে যারা বাস করে তাদের হাতে পায়ে নাকি বেড়ি পরিয়ে রাখে কারা। খুব ছোট্টটি থাকতে ছোটন বিশ্বাস করত শহরের এক দৈত্য নাকি মোটা মোটা শিকল পরিয়ে বেঁধে রাখে শহরবাসীকে। যাতে ছুটে পালাতে না পারে। এখন ছোটন ফাইভে পড়ে। বুঝতে শিখেছে অনেক কিছু। দৈত্যটা আর কেউ নাÑ দায়িত্ব কর্তব্য, চাকরি বাকরি, ব্যবসায় বাণিজ্যের বাঁধন। ঢাকা শহরের মানুষ শুধু ছুটে। নানা কাজ। টাকা রোজগারের জন্য। যেভাবে তার আব্বু-আম্মু। আব্বু ব্যবসা করলেও তার আম্মু করেন চাকরি। আব্বু আগে চাকরি করতেন বলে শুনেছে। একবার আব্বু ছুটি চেয়েছেন। দাদার অসুখের কথা জেনে বাড়ি যাবেন। কিন্তু ছুটি দেয়নি বড় কর্তা আব্বুকে। ব্যস চৌধুরী বংশের ছেলে রেগে চাকরিতে ইস্তফা দেন। নেমে পড়েন ব্যবসায়। দু’জন বন্ধু পার্টনার নিয়ে। স্বাধীনভাবে জীবন কাটাবেন বলে। এখন মাঝে মধ্যে হেসে বলেন, এখানেও স্বাধীনতা নেই।
আর আম্মু একটা নামীদামি স্কুলশিক্ষিকা। কড়া নিয়ম কানুনের মধ্যে প্রতিদিন কাটে। অবশ্য শীত-গ্রীষ্ম এটা সেটা ঈদ নামে স্কুলে ছুটি-ছাঁটা মেলে। কিন্তু ছুটির সঙ্গে বান্ডিল বান্ডিল খাতা বগলদাবা করে ঘরে ফিরতে হয়। বিশাল স্কুল। ছাত্রীও বেশি। খাতার সংখ্যাও তাই। এসব ছুটি পুরো হাফটুকু খেয়ে ফেলে। বেড়ানো হয় না ওদের। তা ছাড়া ব্যাটে বলে সংযোগ হতে হবে তো। মানে আব্বু আম্মু দু’জনেই বেড়াতে যেতে সম্মত হবেন, ছুটি মিলবে, তবে তো! তবু যেভাবে হোক বছরে একটি বার গ্রামে আসে ওরা।
যেভাবে এসেছে এবার চৈত্রের শেষে। অবশ্য কালটা নির্দিষ্ট নয়। শীতের দিনেও ওরা আসে। শীতকালে এলে ওদের মজাটা হয় অন্য রকম। বিশাল হাওরে আব্বুর সঙ্গে পাখি শিকারে সঙ্গী হয়ে থাকে। কতো শতো পাখি ওরা দেখার সুযোগ পায়। এসব পাখি নাকি দূর দেশ থেকে উড়ে আসে। শীতের দেশ থেকে। সেখানে শীতের দিনে বরফ পড়ে। আকাশ থেকে টুপটাপ। বরফে বরফে ঢেকে যায় সবকিছু। তখন এসব পাখি খাদ্যসঙ্কটে পড়ে। ছুটে আসে শ শ মাইল অতিক্রম করে অপেক্ষাকৃত কম শীতের দেশে। আমাদের দেশের উন্মুক্ত জলাশয়, বিল ঝিল, হাওর-বাঁওড়ে এরা মহা আনন্দে কাটায় কিছু দিন। এসব কথা ভেবে ছোটনের মনে চোট লাগে। এসব পাখি তো অতিথি, ওদের মারা কি ঠিক? আব্বুর কাছে একদিন এ প্রশ্নটি করেছিল সে।
আব্বু বললেন, ‘আল্লাহ তায়ালা যা মানুষের খাদ্য হিসেবে হালাল করেছেন তা আমরা হারাম বানাতে যাবো কেন? তা ছাড়া পাখি খেলে প্রকৃতি থেকে পাখি বিরল হয়ে যাবে এটা ঠিক না। আমরা খেয়ে কয়টা পাখি কমাতে পারি। আসলে পাখি নিধন করছি আমরা পাখির বাস- উপযোগী পরিবেশকে বিনষ্ট করে, বুঝলে?’
‘কী ভাবে আব্বু?’ ছোটন জানতে চেয়েছিল।
‘যেমন পাখিদের জন্য চাই বন বাদাড়, জলাশয়। আমরা কী করছি গাছপালা ধ্বংস করছি। বিল্ডিং বানাতে ইট পোড়াচ্ছি গাছ দিয়ে। আর বড় বড় নদীতে বাঁধ দিয়ে পানিশূন্য করে ফেলছি নদী, বিল, ঝিল সবকিছু। আর বেশি বেশি কীটনাশক ব্যবহার করে কীটপতঙ্গ নির্বংশ করছি। পাখির খাদ্য তো কীটপতঙ্গ।’
ছোটন বুঝতে পারে পাখি শিকার করে দু’চারটে খেলে পাখির বংশ নিধন করা হয় না। বরং প্রকৃতির ভারসাম্য রাখতে এটা তেমন কোন উপায়ও নয়।
পুকুর পাড়ে পাথর বাঁধানো ঘাটে বসে এসব ভাবছিল ছোটন। ওদের পুকুরের সিঁড়িগুলো পাথর দিয়ে বাঁধানো। এসব পাথরকে বলা হয় প্রবাল পাথর। কালো রঙের মৌচাকের মতো অমসৃণ পাথরগুলো নাকি শত বছর ধরে শোভা পাচ্ছে। আব্বু বলেছেন সাগরে প্রবাল কীট নামক এক ধরনের সামুদ্রিক জীব আমাদের বঙ্গোপসাগরে এসে মরে জমাট বেঁধে এসব পাথরের সৃষ্টি। একবার ওরা সেন্টমার্টিন দ্বীপে বেড়াতে গিয়েছিল। সেখানে সমুদ্রতীরে এমন কালো অমসৃণ পাথরের সমাহার ওরা দেখেছে। ঐ পাথরের সঙ্গে এগুলোর মিল আছে।
‘ভাইয়াÑ’
লোটনের গলার আওয়াজ। কিন্তু লোটনকে দেখা যাচ্ছে না। দেখা না যাওয়ার কারণ ওদের দাদাবাড়ি তিন স্তরের টিলার ওপর। সে সবচেয়ে নিচে পুকুরপাড়ে বসে। লোটন যদি ওপর থেকে ডাকে দেখা যাবে কিভাবে!
‘লোটন আমি পুকুর পাড়েÑ’ গলা ছেড়ে জবাব দেয়।
বিশাল টিলার ভেতর কে কোথায় থাকে বোঝাও যায় না। তবে লোটনকে যে দ্বিতীয় স্তরের বৈঠক ঘর থেকে বের হয়ে ডাকাডাকি করছে তা আন্দাজ করে ছোটন।
‘একটা সিঁড়ি দুইটা সিঁড়ি
এই সিঁড়িতে রাজার বাড়ি
রাজার বাড়ি রাজা নাই
সিঁড়ি ভাঙার দরকার নাই।
একটা সিঁড়ি …’
ছড়া কাটতে কাটতে লোটন নিচে নেমে আসছিল। লোটন আবার ইদানীং কবিখ্যাতি পেয়ে গেছে। স্কুলের ম্যাগাজিনে তার স্বরচিত একটা ছড়া ছাপা হওয়ায়। তা ছাড়া সে মামার দেয়া একটা রেক্সিন বাঁধাই ডায়েরিতে অনেক ছড়া কবিতা লিখে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।
লোটন পুকুরঘাট থেকে দেখতে পায় ছোটনকে। ধীরে ধীরে সিঁড়ি ভেঙে নেমে আসছে। মুখ তার নড়ছে। ছোটন অপেক্ষা করতে থাকে ছোট ভাইটার জন্য।
পুকুরঘাটে এসেই একটা চিৎকার ছুড়েÑ ‘ভাইয়া!’
‘কিরে, সিঁড়ি ভাঙার সময় ঠোঁট নড়ছিল কেন।’ ছোটন ছোট ভাইটার কাঁধে হাত রেখে জানতে চায়।
লোটন লাজুক হাসি দিয়ে নিরুত্তর থাকে।
‘বুঝেছি। কবিতা আবৃত্তি করছিলি, না?’ হাসতে হাসতে বলে ছোটন।
‘ভাইয়া, আজ না বিয়ানীবাজার থেকে পাখি কেনার কথাÑ ভুলে গেছো?’
‘না, ভুলিনি। সেই জন্যই তো এখানে বসে। মীরাজ চাচ্চুর অপেক্ষায়।’
এবার বাড়িতে এসেই মীরাজ চাচ্চুকে পটিয়ে রাজি করিয়েছে তিতির কিনে দেয়ার জন্য। মীরাজ চাচ্চু ওদের দূর সম্পর্কের চাচা।
দাদার সঙ্গেই সর্বক্ষণ বিচরণ। দাদার সকল প্রয়োজন সে মেটায়। ক্ষেতমজুুরদের তদারকি করা প্রধান কাজ। তাই ব্যস্ততা তার শেষ নেই। কালো কুচকুচে গায়ের রঙ, বোঁচা নাক আর কুলোর মত কান হলে কী হবে দিলটা তার ভালো। তরমুজের মতো রসালো। এটা দাদার মত।
‘কী ভাতিজারা! কিতা কড্ডায়?’
কোত্থেকে মীরাজ চাচ্চু নাজিল হলো ওরা টের পায়নি। পেছনের জুুমআ ঘর থেকে বের হয়ে পুকুরঘাটে আসায় ওরা দেখতে পায়নি বুঝি।
‘মীরাজ চাচ্চু! পাখিÑ’ আবদারের ভঙ্গিতে বলল ছোটন।
‘অয় মনে আছে ভাতিজারা, তিতির পাখিÑ’
তেঁতুলের বিচির মতো দাঁত বের করে হাসে মীরাজ চাচ্চু। চাচ্চুর ঐ হাসিটা ছোটন একদম বরদাস্ত করতে পারে না। কিন্তু এখন সহ্য করতে পারছে পাখির কথা ভেবে।
‘চল, মাইঝির কান্দাতÑ’
‘কান্দাত’ মানে কাছে। মীরাজ ”াচ্চু গাঁয়ের সিলেটী ভাষা ছাড়া অন্য কোন ভাষা জানে না। বিশুদ্ধ বাংলাও খুব একটা বোঝে না। তাতে ছোটন লোটনের খুব একটা অসুবিধা হয় না। ওরা সিলেটী আঞ্চলিক ভাষা বুঝে এবং খানিকটা বলতেও পারে। তাই মীরাজ চাচ্চুর সঙ্গে সিলেটী ভাষায় মনের ভাব প্রকাশ করে ওরা।
‘মীরাজ চাচ্চু! চলউখা দাদীর কান্দাতÑ দেরি করলে হাইঞ্জা অইয়া যাইবো।’ ছোটন বলল। লোটন অবশ্য চুপচাপ ছিল। ভাইয়ার মতো সিলেটী ভাষা তার মুখে সহজে আসে না।
‘সিঁড়ি দিয়ে নামি উঠি
সিঁড়ি দিয়ে চলি
সকাল থেকে সন্ধ্যে অবধি
সত্য কথা বলিÑ’
শুরু হয়ে গেলো লোটনের ছড়া কাটা। সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে লোটন বক বক করতে থাকে।
‘ভাতিজা, কবিতা বানাইরানি!’ মীরাজ চাচ্চু অবাক হয়ে হাসতে হাসতে লোটনের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে।
‘মীরাজ চাচ্চু, লোটন তো কবি, জানেন না বুঝি?’ গর্ব করে হাসি মুখে বলল ছোটন। ছোট ভাইটিকে অনেক ভালোবাসে সে। পড়াশোনায় ও খুব ভালো। গেল টু থেকে থ্রিতে উঠেছে সাড়ে তিন শ ছাত্রছাত্রীর মধ্যে ফার্স্ট হয়ে। লোটনের গলা খুব মিষ্টি। বার্ষিক মিলাদুন্নবী অনুষ্ঠানে হামদ-নাত প্রতিযোগিতায় ‘তোরা দেখে যা আমিনা মায়ের কোলেÑ’ গেয়ে প্রথম হয়েছে। এসব আর মীরাজ চাচ্চুকে বলতে যায় না। বুঝবে কী না ভাবে ছোটন।
মীরাজ চাচ্চু ছোটন লোটন সোজা চলে আসে ‘মাইঝির ঘরে।’
ছোটনের দাদীকে সবাই ‘মাইঝি’ ডাকে। কালো কুচকুচে রঙের কারুকার্যখচিত বিশাল পালঙ্কে দাদী বসে তসবিহ জপছিলেন
‘মাইঝি বিয়ানী বাজারে পাঠাইতা নি?’ দরোজার চৌকাঠে পা রেখেই মীরাজ চাচ্চু বলল।
দাদী তসবিহ জপা বন্ধ করেন। ছোটন লোটন ঘরে ঢুকে দাদীকে জড়িয়ে ধরে। দাদী বুঝতে পারেন তিনজন একত্রে আসার কারণ। প্রতি শনিবার বিয়ানী বাজারে একটু বড় সড় হাট বসে। তাই মীরাজকে এবং কটাইকে পাঠানো হয়। কিন্তু আজ ছোটন লোটন যেতে চায় তিতির পাখি কিনতে। ওদের বাপ মাকে বিষয়টা বলা হয়নি। না বলে এতো দূর বাজারে ওদের সঙ্গে ছোটন লোটনকে পাঠানো ঠিক হবে না।
‘তোমরার মতলব বুঝঝিÑ’ দাদী বলে ওঠেন। ঘর থেকে বের হয়ে দু’ ঘর রেখে পূর্ব দিকে হাঁটতে থাকেন। ছোটন লোটন পেছন পেছন। বুঝতে পারে আব্বুর ঘরের দিকে দাদী যাচ্ছেন। ডান দিকে মোড় নিয়ে কোনার ঘরে এসে ঢুকেন তিনি। ‘শিহাব … ও শিহাব’ ডাকতে ডাকতে দাদী ঘরের ভেতর প্রবেশ করেন। ‘শিহাব’ মানে ছোটন লোটনদের আব্বু শিহাব উদ্দিন চৌধুরী দাদীর মেজো ছেলে। গ্রামের লোক বলে ইঞ্জিনিয়ার শিহাব।
এমন সময় ছোটন লোটনের আম্মু ট্রেতে চা নিয়ে হাজির। দাদীকে নিয়ে চা পর্ব শেষ হলে সিদ্ধান্ত হলো মীরাজের সঙ্গে শুধু ছোটন বিয়ানী বাজারে যাবে। লোটন ছোট, হাঁটতে পারবে না।
দাদীজান আব্বু আম্মু সবাই পই পই করে ছোটনকে সাবধানে রাখতে বলে দিলো মীরাজ চাচ্চুকে। গাঁয়ের পথে হাঁটতে অভ্যস্ত নয় ছোটন। তাকেও দেখে শুনে হাঁটার জন্য বলা হলো।
চৈত্রের শেষের দিকে। আর হয়তো কয়েকদিন বাকি বৈশাখের। বাড়ি থেকে বের হয়ে খানিকটা পথ পাড়ি দিতেই রোদেলা বিকেলের ঝলোমলো রূপ উবে গেলো। দুটো টিলার মাঝ দিয়ে যেতে হয় খানিকটা। বাঁশগাছের ঝাড় এসে আগলে রেখেছে আকাশ। তাই এমনিতেই কাঁকর বিছানো ভেজা পথটায় দিনের আলো প্রবেশ নিষিদ্ধ। সময়টা থেমে থাকে ওখানে। ঘুটঘুটে অন্ধকার নামে সন্ধ্যার দিকে। কিন্তু বিকেল বেলায়ও এতো গভীর অন্ধকারÑ তার মানে কী! মীরাজ চাচ্চুর হাতের দেড় হাত লম্বা টর্চটা পথকে আলোকিত করে। অবশ্য এ গিরিপথ খুব দীর্ঘ নয়। দু’তিন মিনিটের। সেই পথ পেরিয়ে দেখতে পেলো মেঘের তলে সূর্য নিজেকে লুকিয়েছে শুধু নয় মেঘের রাগত রূপটাও স্পষ্ট। কালো অন্ধকার ‘শিয়ালমুখো’ করে আছে মেঘ। ছোটন আকাশের এই রূপকে শিয়ালমুখোই বলে।
‘ছোটন ভাতিজা, আইজ মনে অয় ঝড় আইবোÑ’ মীরাজ চাচ্চুর কণ্ঠে উদ্বেগের আভাস।
‘তাহলে আমরা কি বিপদে পড়বো?’ ছোটনের প্রশ্ন।
‘না, ঝড় আইবার আগেই আমরা বাজারে পৌঁছি যাইমুÑ’ মনে মনে উদ্বেগটা বেশ জেগে ওঠে। গলার স্বরে ধরা পড়ে। কাঁপা কণ্ঠে। মীরাজ নিজেও তা বুঝতে পারে। ‘বাজারে আমরার নিজস্ব দোকান আছেÑ বেশি সমস্যা অইলে আমরা দোকানে কিছু সময় কাটাইতে পারমু-’
ইতোমধ্যে ঠাণ্ডা এবং ঝড়ো বাতাস ছেড়ে দিয়েছে। সঙ্গে অপর সঙ্গী কটাই জোর পায়ে হাঁটতে গিয়েও থেমে যাচ্ছে। ছোটনকে নিয়ে মীরাজ ধীরে ধীরে হাঁটতে বাধ্য হচ্ছে বলে।
‘ছোটন ভাতিজা, চালাইয়া হাঁটোÑ আমরার মতো।’ মীরাজ বলল। দু’পা জোরে হেঁটে দেখিয়ে দিলো। কিন্তু খানিকটা দৌড়ে হাঁফিয়ে ওঠে। দাঁড়িয়ে যায় ছোটন।
তার চেয়ে ধীরে ধীরে চলাই ভালো। কটাইর কাঁধে বাঁশের বাঙ। মালপত্র বহনের জন্য।
মীরাজের কথাই শেষ পর্যন্ত ফলল। বাজার পর্যন্ত পৌঁছার পর পর ঝড়ো বাতাস এবং বৃষ্টি বেগ পায়।
বাজারে ঢুকেই কিছু কেনা কাটা সারতেই কড় কড় শব্দে বাজ।
তুমুল ঝড়ো বাতাস হামলে পড়লো বাজারের ওপর।
অবস্থা বেগতিক দেখে হাটুরেরা যে যেখানে পারলো আশ্রয় নিলো। মীরাজ ছোটনকে নিয়ে তাদের গ্রামের এক দোকানে আশ্রয় নেয়।
দোকানের বুড়ো মালিক ছোটনকে দাদা দাদা বলে কোলে তুলে নেন। বসিয়ে দেন তার আসনে। মীরাজ আর কটাই বসে চৌকির এক পাশে। মুখে জপতে থাকে আল্লাহ আল্লাহ।
শ …শ … শ…শ …শ …। ঝড়ো বাতাসের শব্দ।
কড় …কড়… কড়… কড়… কড়াৎ। বাজ পড়ার শব্দ।
ঠাস… ঠাস… ঠাস… ঠাস…। টিনের চালে এসে গাছের ডালের সংঘর্ষের শব্দ।
সবার মুখে আল্লাহ আল্লাহ রব। কেউ কেউ কালেমা পড়ছে।
জোরে জোরে।
ছোটন শুনেছে ঝড়ের সময় আজান দিতে হয়। আব্বু বলেছেন ঝড়ের সঙ্গে নাকি অশুভ শক্তি চলে। ধ্বংস সাধন করতে। আজানের ধ্বনিতে তারা দূরে সরে যেতে বাধ্য হয়।
‘দাদাজান, আমি আজান দিতে পারি, দেবো? আব্বু বলেছেন ঝড়ের সময় আজান দিতে।’ ছোটন বলেই সটান দাঁড়িয়ে পড়ে। কানে আঙুল ঢুকিয়ে আজান দিতে লাগেÑ ‘আল্লাহু আকবার… আল্লাহু আকবার…’ ছোটনের কচিকণ্ঠের সুরেলা আজান শেষ হবার আগেই ঝড়ের গতি প্রশমিত হয়ে আসে। সবাই মুগ্ধ হয়ে তাকায় ছোটনের পানে। সত্যিই তো এই ছোট্ট বাচ্চার আজান ঝড়কে থামিয়ে দিয়েছে। সাবাস! বাবাজি সাবাস! উপস্থিত সবাই বলে ওঠেন।
ঝড় থেমে গেলে দেখা যায় তখনো দিনের আলো নিভে যায়নি।
লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে হাট। ঝড়ের ছোবল থেকে বাঁচতে কে কোথায় আশ্রয় নিয়েছে ঠিক নেই। ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে সব। ছোটনের তিতির পাখি কিনতে না পারার দুঃখ নয় আজানের তৃপ্তি নিয়ে বাড়ি ফিরতে পা বাড়িয়ে দেয় ওরা।
আকাশের দিকে মীরাজের চোখ যায়। নাহ আর ঝড় আসার লক্ষণ নেই। মনে মনে ভাতিজার জন্য গর্ব হতে থাকে মীরাজের।

SHARE

Leave a Reply