Home বিজ্ঞান সহস্র বছরের ৫টি বৈপ্লবিক আবিষ্কার

সহস্র বছরের ৫টি বৈপ্লবিক আবিষ্কার

সহস্র বছরের
৫টি বৈপ্লবিক আবিষ্কার
সাকিব রায়হান

সকালে ঘুম থেকে উঠেই তোমাদের কেউ হয়তো প্রথমে চশমাটা পড়ে নাও, এরপর রেডিও বা টেলিভিশন চালু করো এবং নিউজপেপারটা হাতে নিয়েই পড়া শুরু করো। এর মাঝেই কিন্তু তুমি গত ১০০০ বছরের ইতিহাসের তিনটি যুগান্তরি আবিষ্কারকে ব্যবহার করে ফেলেছো : চশমার লেন্স, তারহীন যোগাযোগ এবং প্রিন্টিং প্রেস। আমার মনে হয় সবার ক্ষেত্রেই একই ঘটনা ঘটে, তবে ঘুম থেকে উঠেই যাদের চোখে সারাক্ষণ চশমা দিয়ে রাখতে হয় না তাদের অবশ্য লেন্সের ব্যবহারটার তেমন প্রয়োজন হয় না। যাই হোক, এরপরই তোমরা কেউ গাড়িতে করে স্কুল বা কলেজে যাও, কেউ কম্পিউটারে কাজ করো, ফোন ব্যবহার করোÑ যার সবই গত ১০০০ বছরে বিজ্ঞানীদের বিস্ময়কর সব আবিষ্কার। গত এক সহস্র বছরে বিজ্ঞান এমন হাজারেরও বেশি আবিষ্কার আমাদের উপহার দিয়েছে যা ছাড়া এখন আমাদের জীবন কল্পনাই করা যায় না। কিন্তু প্রশ্ন হলো কোন্ আবিষ্কারগুলো সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ এবং কেন? কোন্ আবিষ্কারগুলো বিজ্ঞানেন্তুন মাত্রা যোগ করেছে? কোন্গুলো প্রযুক্তির নতুন ধারার সূচনা করেছে? এমনই কিছু আবিষ্কার নিয়ে এবারের বিজ্ঞান জগৎ।

বিদ্যুৎ
শুধু গত সহস্র বছরেরই নয়, বিদ্যুৎ নিঃসন্দেহে ইতিহাসের সর্বকালের সেরা আবিষ্কার। বিদ্যুৎ না থাকলে আজ আমরা কোথায় থাকতাম একটু ভাবো তো? বিদ্যুৎ ছাড়া বর্তমান বিজ্ঞান কল্পনাও করা যায় না। শুধু বিদ্যুৎ কেন, বিদ্যুতের মাধ্যমে পরবর্তীতে যেসব যন্ত্র আবিষ্কৃত হয় তার সবকটিই ইতিহাসের অন্যতম সেরা আবিষ্কার। বিদ্যুৎ আবিষ্কারে সবচেয়ে বড় অবদান রাখেন থমাস আলভা এডিসন (Thomas Alva Edison)। তার বৈদ্যুতিক বাতির আবিষ্কারের মধ্য দিয়েই বিদ্যুতের আবিষ্কার। ১৮৮২ সালে এডিসনই প্রথম বিদ্যুৎ উৎপাদনের স্টেশন প্রতিষ্ঠা করেন।
তবে বিদ্যুতের উপর গবেষণা শুরু হয় ১৬ শতকের দিকে। ১৮ শতকের মধ্য দিকে আমেরিকান বিজ্ঞানী বেনজামিন ফ্রাঙ্কলিন (Benjamin Franklin) প্রথম বিদ্যুতের উপর ব্যবহারিক গবেষণা শুরু করেন। কিন্তু এসময় নিরবছিন্ন বিদ্যুৎ পাওয়া যেত না। শুধুমাত্র সাময়িক সময়ের জন্যই বিদ্যুৎ ব্যবহার করা যেত। ১৮৪০ সালে আবিষ্কৃত টেলিগ্রাফাও ব্যাটারির মাধ্যমে চালানো হতো। এরই মাঝে ফ্যারাডের একটি আবিষ্কারের সূত্র ধরেই ১৮৩১ সালে ডায়নামো আবিষ্কার করা হয়।

যান্ত্রিক ঘড়ি
আজ আমরা যে সুশৃঙ্খল জীবনযাপন করছি এর অনেকটা অবদানই হলো ঘড়ির অর্থাৎ সময় গণনাকারী যন্ত্রের। কিন্তু যেই ঘড়ি ছাড়া আমাদের একটা দিনও চলে না কখনো কী ভেবে দেখেছি এই ঘড়ি কে আবিষ্কার করেছে?
না, ইতিহাসেও এই মূল্যবান আবিষ্কারটির আবিষ্কারক হিসেবে কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির নাম পাওয়া যায় না। তবে সূর্য ঘড়ির ব্যবহার শুরু অনেক কাল আগে থেকেই। ধারণা করা হয় মিশরীয়রাই প্রথম প্রকৃতিনির্ভর অর্থাৎ সূর্য-ঘড়ি নির্মাণ করেছিলেন আর ১৪ শতাব্দীতে এসে ইউরোপিয়ানরাই এই তত্ত্বের উপর ভিত্তি করে প্রথম যান্ত্রিক ঘড়ি আবিষ্কার করেন।
কিন্তু ১৪ শতকের দিকে নির্মিত ঘড়িগুলোতে শুধুমাত্র ঘণ্টা নির্দেশ করতে সক্ষম হতো, মিনিট বা সেকেন্ড নির্ণয় করতে পারতো না। তাছাড়া বর্তমান ঘড়ির দুই ঘণ্টা ছিল সেই ঘড়ির হিসেবে এক দিন, যার মানে একদিনে ঘড়িটি মাত্র দু’বার ৩৬০ ডিগ্রী কোণে ঘুরতে পারতো। অর্থাৎ এই ঘড়ি দিয়ে সম্পূর্ণ নির্ভুল ও সূক্ষ্ম সময় গণনা করা যেত না। অবশেষে ডাচ জ্যোতির্বিদ ক্রিশ্চিয়ান হাইজেন্স (Christian Huygens) ১৬৫৭ সালে এসে সম্পূর্ণ নির্ভুলভাবে মিনিট, সেকেন্ড ও ঘণ্টা নির্দেশকারী উন্নতমানের যান্ত্রিক ঘড়ির নকশা করেন।

কম্পাস
কম্পাস অর্থাৎ দিক নির্দেশক যন্ত্র সম্পর্কে সবারই কম-বেশি জানা আছে। সূচালো শলার উপর সরু চুম্বকের পাত বসিয়ে কম্পাস তৈরি করা হয় যেখানে চুম্বকপাতের প্রান্ত দুটি সর্বদা উত্তর-দক্ষিণ দিক নির্দেশ করে থাকে। বর্তমানে কম্পাস আর একটি প্রকারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, তৈরি হচ্ছে নানা রকম কম্পাস। যেমন সাধারণ ব্যবহারের জন্য ব্যবহৃত হয় পকেট কম্পাস, আকাশপথে ব্যবহৃত হয় জাইরো কম্পাস আবার নৌপথে ব্যবহৃত হয় নৌকম্পাস। আর এই কম্পাস আবিষ্কারের পেছনেও রয়েছে বিশাল ইতিহাস।
ইউরোপিয়ানরা যখন প্রথম আমেরিকায় যাবার পরিকল্পনা শুরু করে তখনই তারা একটা দিক নির্দেশক যন্ত্রের অভাব অনুভব করে। তারা পরিষ্কার দিনের আকাশের সূর্য কিংবা রাতের আকাশের নক্ষত্র বিশেষ করে নর্থ স্টার বা উত্তর নক্ষত্রের অবস্থান দেখে দিক নির্ণয় করতেন। কিন্তু সেক্ষেত্রে আকাশ পরিষ্কার না থাকলে কিংবা ঝড় বা কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় দিক নির্ণয় করা শুধু কষ্টসাধ্যই নয়, অনেকটা অসম্ভব ছিল যা তাদেরকে কম্পাস আবিষ্কারে আরও উদ্বুদ্ধ করে। তার আগেই প্রাচীনকালের মানুষেরা ম্যাগনেট বা চুম্বকের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে ধারণা লাভ করেছিল যে ম্যাগনেটকে ঝুলিয়ে রাখলে এর এক প্রান্ত সর্বদা নর্থ স্টারের দিকে মুখ করে থাকে অর্থাৎ নর্থ স্টারকে নির্দেশ করে।
ধারণা করা হয় ১৩ শতকের দিকে ইউরোপিয়ানরা এই তত্ত্বের উপর ভিত্তি করেই কম্পাস বা দিক নির্দেশক যন্ত্র আবিষ্কার করেন। তবে তারও আগে আরবরাই কম্পাস আবিষ্কার করেন। ১৪ শতকের দিকে কম্পাসের ব্যবহার বৃদ্ধি পেয়ে তা একটা সাধারণ বিষয়েই পরিণত হয়।

লেন্স

চশমা বা লেন্স-এর ব্যবহার আজ একটা সাধারণ বিষয়ে পরিণত হয়েছে। কিন্তু এই লেন্স না থাকলে যে চশমা ব্যবহারকারীদের কী অবস্থা হতো কখনো কী কেউ ভেবে দেখেছো? কিংবা যে ক্যামেরা দিয়ে আমরা হাজারো স্মৃতি সংরক্ষণ করি সেটাই বা কীভাবে আবিষ্কৃত হলো? লেন্স আবিষ্কার না হলে প্রিন্টিং প্রেস আবিষ্কারও বিলম্বিত হতো।
ইতিহাসের মতে প্রথম যে লেন্স আবিষ্কৃত হয় তা শুধুমাত্র মানুষের চোখের জন্যই ব্যবহার করা যেত। ১৩ শতাব্দীর দিকে ইতালিতেই প্রথম মানুষের চোখে ব্যবহারের জন্য উপযুক্ত লেন্সের ব্যবহার শুরু হয়।তবে এখানেও ধারণা করা হয় যে ইতালিতে ব্যবহার করা এই উন্নত সংস্করণের চশমার পূর্বে চীনারাই প্রথম চশমার ব্যবহার শুরু করে। কিন্তু মানের দিক থেকে ইতালিয়ানদের সংস্করণের তুলনায় চীনাদের সংস্করণটি নিম্নমানের হওয়ায় ইতালিই ইতিহাসে স্থান করে নেয়।
পরবর্তীতে দূরের বস্তুকে কাছে দেখার জন্য লেন্স আবিষ্কৃত হতে আরও ১০০ বছরেরও বেশি সময় লেগে যায়। এই আবিষ্কারে অবদান রাখেন ডাচ অপটিশিয়ান অর্থাৎ চশমা প্রস্তুতকারী হ্যানস লিপারশে (Hans Lippershey)। তিনি এটার নাম দেন “লুকার” (Looker) এবং ১৬০৮ সালে ডাচ সরকারকে তার এই লুকারের প্রমাণ দেখানোর কিছুদিনের মাঝেই বেশ জনপ্রিয়তা পায়। তবে প্রথম প্রথম এই লুকার শুধুমাত্র ডাচ মিলিটারিতেই ব্যবহৃত হতো।
এর এক বছর পরই অর্থাৎ ১৬০৯ সালে আকাশ নিয়ে গবেষণা করার জন্য গ্যালিলিও (Galileo) লুকারের একটি উন্নত সংস্করণ আবিষ্কার করেন। গ্যালিলিও এর নাম দেন টেলিস্কোপ যা দূরের কোনো বস্তুকে ২০ গুণ বড় বা কাছে দেখাতে সক্ষম হতো। ১৭ শতকের দিকে হল্যান্ড লেন্স নিয়ে গবেষণায় অনেক এগিয়ে যায়। তবে ধারণা করা হয় এরও আগে ১৬ শতকের শেষের দিকে মাইক্রোস্কোপ আবিষ্কৃত হয়।
১৬ শতকেই ডাচ প্রাণিবিজ্ঞানী অ্যান্টনি ফন লিউয়েনহুক (Antonivan Leeuwenhoek) তার নিজের তৈরি মাইক্রোস্কোপের মাধ্যমে ব্যাকটেরিয়া এবং প্রোটোজোয়ার অস্তিত্ব আবিষ্কার করেন। পরবর্তীতে এই মাইক্রেস্কোপের মাধ্যম্যেই বিভিন্ন রোগের ভাইরাস আবিষ্কৃত হয়।
তারহীন
যোগাযোগব্যবস্থা
বর্তমানে বিজ্ঞান অনেকাংশই ওয়ারলেস কমিউনিকেশন বা তারহীন যোগাযোগব্যবস্থার উপর নির্ভরশীল। ইন্টারনেট, মোবাইল, জিপিএস, ওয়াইফাই, ব্লুটুথ, ওয়াইম্যাক্স এসবই তারহীন যোগাযোগব্যবস্থার একেকটি রূপ যা ছাড়া আধুনিক প্রযুক্তি কল্পনাও করা যায় না। আর এসবের শুরুটা হয়েছিল রেডিও ওয়েভের মাধ্যমে। রেডিও ওয়েভ হলো আলোক রশ্মি, ইলেকট্রোম্যাগনেটিক রশ্মি, অতিবেগুনি রশ্মি, ইনফ্রারেড রশ্মি এবং এক্সরে রশ্মিরই আরেকটি রূপ।
১৮৮৮ সালে জার্মান পদার্থবিজ্ঞানী হেনরিক হার্টজ (Heinrich Hertz) প্রথম রেডিও ওয়েভ আবিষ্কার করেন এবং প্রমাণ করেন যে এই ওয়েভ আলোর গতিতে চলে। পরবর্তীতে ইতালিয়ান ইঞ্জিনিয়ার মার্কোনি (Guglielmo Marconi) হার্টজের গবেষণাকে তারহীন যোগাযোগব্যবস্থায় রূপান্তরিত করেন। ১৮৯৪ সালে হার্টজের গবেষণা সম্পর্কে পূর্ণ ধারণা লাভ করে মার্কোনি এই প্রযুক্তির কার্যকারিতা ও সম্ভাবনা উপলব্ধি করেন। ১৮৯৫ সালের শেষদিকে মার্কোনি একটি ট্রান্সমিটার ও রিসিভার আবিষ্কার করেন যা ২.৫ কিলোমিটার বা ১.৫ মাইল পর্যন্ত রেডিও সিগনাল পাঠাতে সক্ষম হয়। এরপর ১৯০১ সালে তিনি এর একটি উন্নত সংস্করণ তৈরি করেন যা গোটা আটলান্টিক মহাসাগরেই সিগনাল পাঠাতে পারতো।
১৯ শতকেই রেডিও সিগনালের ব্যবহার বৃদ্ধি পায়। ১৯১২ সালে টাইটানিক বৃহৎ বরফ খণ্ডে দুর্ঘটনায় পড়লে এই রেডিও সিগনালের মাধ্যমেই সাহায্যের আবেদন করে। যদিও ২২২০ যাত্রীর মাঝে শুধুমাত্র ৭০০ জনকেই উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছিল। কিন্তু ধারণা করা হয় রেডিও সিগনাল ব্যবহার না করল এই সংখ্যা আরও অনেক কম হতো। এরপর রেডিও ওয়েভের ব্যবহার আরও বৃদ্ধি পায়। কানাডায় জন্ম নেয়া আমেরিকান পদার্থবিজ্ঞানী ফেসেনডার (জবমরহধষফ ঋবংংবহফবৎ) রেডিও ওয়েভের এক অভিনব ব্যবহার আবিষ্কার করেন যার ফলে শব্দের পাশাপাশি ছবিও পাঠানো যেত। এই রেডিও সিগনালের তত্ত্বের উপর ভিত্তি করেই ১৯২৮ সালে টেলিভিশন রিসিভার আবিষ্কার করা হয়। এর পরের ইতিহাস কেবলই রূপকথা। আমরা যে ইন্টারনেটে এখন লিখছি-পড়ছি তা এই রেডিও ওয়েভেরই উন্নত সংস্করণ।

SHARE

Leave a Reply