Home তোমাদের গল্প স্বপ্ন যখন একটি ঘুড়ি

স্বপ্ন যখন একটি ঘুড়ি

স্বপ্ন যখন
একটি ঘুড়ি
মো: আব্দুল কাদের

সিয়ামের মনে আনন্দের ঢেউ বয়ে যায়। প্রথম সেমিস্টার পরীক্ষার পর তার স্কুল অর্ধ মাস বন্ধ দিয়েছে। এরই মাঝে কেটে গিয়েছে কয়েকটা দিন।
স্কুল বন্ধ হলেও তার আর বেশি আনন্দ করার সুযোগ নেই। সিয়ামের নিয়মিত তার বাবার কাজে সাহায্য করতে হয়।
এখন ঘুড়ি উড়ানোর মৌসুম, তাই গ্রামের আকাশে যেখানেই চোখ যায় সেখানেই দেখা যায় অনেক রঙের ঘুড়ি। প্রতিদিন বিকালে আকাশটাকে দেখে মনে হয় যেন রূপকথার কোনো এক রাজ্য। সিয়ামের বাড়িটি নড়াইল জেলায়। এখানে আছে তালগাছ-গাছরার সমারোহ। রাস্তার ধারে, বিলে খালে যেখানেই চোখ যায়, সেখানেই গাছিদের কাজে ব্যস্ত থাকতে দেখা যায়। সিয়ামের বাবাও একজন গাছি। তাদের পরিবারটা খুব দরিদ্র হওয়ায় তাকেও তার বাবার কাজে নিয়মিত হাত লাগাতে হয়। কিন্তু কাজ করতে ওর ভালো লাগে না। সিয়ামের দু’চোখজুড়ে কেবল খেলাধুলা আর ঘুরে বেড়ানোর স্বপ্ন। এখন আবার নতুন করে ঘুড়ি ওড়ানোর স্বপ্ন ওর দুই চোখজুড়ে বাসা বাঁধছে। তাই সুযোগ পেলেই ও ঘুড়ি বানাতে শুরু করে। সিয়াম মাত্র আট বছর বয়সের একটি বালক। ঘুড়ি তৈরির তেমন কোনো অভিজ্ঞতা না থাকলেও সে খুব চমৎকার ঘুড়ি তৈরি করতে পারে। এরই মাঝে সিয়াম পয়সা জোগাড় করে সুতো কিনেছে। ওর মনে অনেক স্বপ্ন, ও ঘুড়িগুলো গ্রামের আকাশে উড়াবে। ওর বন্ধুরা সবাই দেখবে, তখন কত মজা হবে! কিন্তু সিয়ামের ঘুড়ি তৈরির কাজ আর শেষ হয় না। সিয়াম যখন ঘুড়ি তৈরি করতে বসে, ঠিক তখনই কোনো না কোনো কাজের আদেশ আসে।
আজ শুক্রবার। সিয়ামের ঘুড়ি তৈরির কাজ প্রায় সমাপ্ত, আর সামান্য কাজ করলে হয়তোবা তার ঘুড়িগুলো আকাশে উড়বে আর সিয়ামকে এনে দেবে এক মুঠো আনন্দ। এমনই আশা তার বুকে সারাদিন বাতাসের মতো বয়ে চলেছে। দুপুরবেলা সিয়াম যখন তার মায়ের সাথে পল শুকানোর কাজে ব্যস্ত ছিল, তখন তার বাবা তাকে বললেন, একটু পরে পাত্র নিয়ে গাছতলাতে যাস বাপ, আজ অনেক রস হবে। সিয়াম কোনো কথা না বলে ওর বাবার মুখের দিকে তাকাল, আর কী যেন ভাবতে লাগল। মায়ের কাজ শেষ করে ও বাবার কাজে হাত লাগাতে গেল। তখন তার মন খুব খারাপ ছিল। গাছতলাতে বসে সিয়াম অনেক কিছু চিন্তাভাবনা করছিল। হয়তোবা সে চিন্তা করছিল যে এত কাজ করার পরও কেন সে বাবা-মার আদর পায় না?
আসলে পাবে কী করে, তার বাবা-মা তো সারাদিন কাজে ব্যস্ত থাকেন। ওর বাবার আদর না পেলে আর কী হবে? ওর মা ওকে মাঝে মাঝে অনেক আদর করেন। এসব কথা ভাবতে ভাবতে তার কানে হঠাৎ একটি আওয়াজ এলো। সিয়াম তাকিয়ে দেখলো কারো ঘুড়ি আস্তে আস্তে আকাশের দিকে উঠে যাচ্ছে। সিয়াম তখন ভাবল কাল আমার ঘুড়িটাও এভাবে আকাশের পানে উড়ে বেড়াবে। আজকের মত সিয়াম বাবার সাথে কাজ শেষ করে। সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে এসেছে। রাতে সবার সাথে খাবার খেয়ে বিছানায় গেল। কিন্তু ওর আর ঘুমাতে ইচ্ছা করছে না। সিয়াম ভাবছে ঘুম থেকে উঠে গিয়ে ঘুড়ি বানাতে শুরু করি, কিন্তু এখনতো রাত, এই ভেবে ও ঘুুমিয়ে পড়ল। সকালবেলা সিয়াম হাত-মুখ ধুয়ে রাস্তার দিকে যেতেই তার বন্ধু অপুর সাথে দেখা হলো। সিয়াম অনেক আনন্দের সাথে অপুকে তার ঘুড়ি তৈরির সব কথা খুলে বলল। অপু বলল, তাহলে আজ বিকেলে আমাদের মাঠে নিয়ে আসিস। আমরা এক সাথে তোর ঘুড়ি উড়াবো। সিয়াম অপুর সাথে কথা শেষ করে বাড়ি এসে ভাবল, এখন ঘুড়ির বাকি কাজগুলো সমাপ্ত করে ফেলব। কিন্তু তা আর হলো না। সিয়ামের মা ওকে একটি কাজের কথা বললেন। সিয়াম আর কী করবে মায়ের আদেশ বলে কথা। ও তাই কাজে মন দিলো। দুপুরে ও কাজ শেষ করে। গোসল করে, খাবার খেয়ে আবার ঘুড়ি বানাতে শুরু করল। সিয়াম তার সকল মনোযোগ পিয়ালা ভরে তার ঘুড়ি বানানোর কাজে ঢেলে দিল। সিয়াম যখন ঘুড়ি বানাতে মশগুল, ওর বাবা তখন ওকে আজকেও রস আনতে যাওয়ার কথা বললেন। কিন্তু বেচারা কিছুই শুনলো না। সিয়ামের ঘুড়ি তৈরির কাজ সমাপ্ত। বাহ্ ওর ঘুড়িটা খুব চমৎকার হয়েছে। সে কাউকে না বলে ঘুড়ি আর নাটাই হাতে মাঠের দিকে রওনা দিল। ও অপুকে সাথে নিয়ে ঘুড়ি উড়াবে। তারা দু’জন যখন ঘুড়ি নিয়ে মাঠে এল তখন আরো অনেক ঘুড়ি আকাশে উড়ছিল। সিয়াম প্রথমে নাটাই হাতে অপুকে ঘুড়িটা উড়িয়ে দিতে বলল। অপু উড়িয়ে দিতেই ঘুড়িটা আকাশে উঠে গেল। বাহ! খুব সুন্দর দেখা যাচ্ছে। আজ বোধ হয় সিয়ামের মত আর আনন্দিত কেউ নেই। ওদের ঘুড়িটা যখন ডাকছিল আর হেলে দুলে নাচছিল, তখন ওরা দু’জনও নাচানাচি করছিল। আকাশে প্রায় সূর্য অস্ত যায় যায়, তখনো ওদের ঘুড়িটা আকাশে। অপু বলল, এখন তাহলে নামিয়ে ফেলি, প্রায় রাত হয়ে আসছে। সিয়াম ঘুড়িটা নামিয়ে আনন্দের সাথে বাড়ির কাছে এসে হাজির হলো। কিন্তু সে থমকে দাঁড়াল, কারণ তার বাবা কার সাথে ঝগড়া করছে। সিয়াম ভাবল বাবা বোধ হয় আমাকে কোনো কাজের কথা বলেছিলেন কিন্তু আমি খেয়াল করিনি তাই মায়ের সাথে ঝগড়া করছেন।
ঠিক তাই, ও বাড়ি ঢুকতেই ওর বাবা ওকে ডাক দিলেন আর বললেন, দুপুরে রস আনতে যাসনি কেন? সিয়াম কোনো উত্তর দিল না। ওর বাবা আবার জিজ্ঞাসা করেন, কোনো উত্তর না পেয়ে ওর গালে ঠাস করে একটা চড় মেরে দিলেন। ও তখন কাঁদতে কাঁদতে ঘুড়িটা ঐখানে রেখে ওর মায়ের কাছে গেলে সিয়ামের মা ওকে কোলে নিয়ে ওর বাবাকে বেশ দু’ কথা বলতেই ওর বাবা বললেন, সবকিছুর মূলে এই ঘুড়িটা। এটা থাকলে ও কাজ না করে সারাদিন ঘুড়ি উড়াবে। এই বলে ওর বাবা ঘুড়িটাকে ভেঙে ফেললেন। সিয়ামের মাথার ভেতর তখন বিদ্যুৎ চমকিয়ে উঠল। আর সাথে সাথে মায়ের কোলে অজ্ঞান হয়ে পড়ল। ওর মা ওকে বারান্দায় শুইয়ে মাথায় পানি ঢালতে ঢালতে বলতে লাগলেন, তুই কেন গেলি বাবা ঐসব উড়াতে? জানিস না গরিবের জীবন অনেক কষ্টের জীবন। এই জীবনে কাজ ছাড়া কোনো আনন্দ নেই। সিয়ামের জ্ঞান ফিরে এলো। মাকে জড়িয়ে ভাঙা ঘুড়িটার দিকে তাকিয়ে ও কাঁদতে লাগল। সিয়াম ওর মাকে বলল, আমি আর কোনো দিন ঘুড়ি বানাবো না। মা, আমি সারাদিন বাবার সাথে কাজ করব। আসলে গরিবের ঘুড়ি উড়াতে নেই, উড়ালে বাবার হাতে মার খেতে হয়। সিয়ামের মা তখন ওকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেললেন। হ

SHARE

Leave a Reply