Home ফিচার সাগরতলের জাহাজ

সাগরতলের জাহাজ

মাসুম কবীর

সৃষ্টির শুরু থেকেই মানুষ ডাঙায় বাস করে। তারপর একসময় তারা চাকা আবিষ্কার করলো। ফলে খুব সহজেই ডাঙার এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় চলাচল করতে পারতো। কিন্তু চাকা দিয়ে তো আর পানির উপরে চলাচল করা যায় না! তাই পানির কাছে মানুষ ছিলো একদম অসহায়। তবে একসময় তো পানি দিয়েও চলাচল করার প্রয়োজন দেখা দিলো। তখন মানুষ তৈরি করলো নৌকা। আর সময়ের পরিক্রমায় এক সময় তৈরি হতে লাগলো বিশাল বিশাল আর আধুনিক সুবিধা সম্পন্ন সব জাহাজ। তখন মানুষের মনে চিন্তা এলো, শুধু সাগরের উপরে চললেই হবে? সাগরের নিচেও চলতে হবে। আর সেই চিন্তা থেকেই একসময় মানুষ আবিষ্কার করলো সাবমেরিন বা ডুবোজাহাজ।

সাবমেরিন তো তোমরা নিশ্চয়ই চেনো। অনেকেই হয়তো দেখেছোও, সামনাসামনি না হলেও টেলিভিশনে। সেই যে ধাতুর তৈরি বিশাল এক দানবাকৃতির মাছ, যে কিনা মানুষকে পেটে নিয়ে সাগরের নিচেও মহানন্দে ঘুরে বেড়াতে পারে। আজ তোমাদের জানাবো এই সাবমেরিন বা ডুবোজাহাজের কথা, আর পরিচয় করিয়ে দেবো কয়েকটা মজার মজার সাবমেরিনের সাথে।

সাবমেরিনের পরিচয়
সাবমেরিন আসলে এক ধরনের জাহাজ। তবে এগুলো কিন্তু যে সে জাহাজ নয়। সাধারণ জাহাজগুলো তো সারাক্ষণ পানির উপর দিয়েই ভেসে বেড়ায় আর সবসময় ভয়ে ভয়ে থাকে যে কখন না জানি জাহাজটা ঢুস করে ফুটো হয়ে টুপ করে ডুবে যায়। কিন্তু সাবমেরিনের মজাই হচ্ছে এগুলো পানির নিচে দিয়ে চলে। অবশ্য, ফুটো হয়ে গেলে এগুলোও টুপ করে ডুবে যাবে।
এখন জানা যাক ‘সাবমেরিন’ শব্দটির অর্থ। এই শব্দটার অর্থই হচ্ছে ‘সাগরের তলদেশ’। সাবমেরিন সম্পর্কিত আরও কিছু শব্দ বোধহয় তোমরা শুনে থাকবে। এই যেমন ধরো, সাবমেরিন ইঞ্জিনিয়ারিং, সাবমেরিন ক্যাবল ইত্যাদি। এখন নিশ্চয়ই এই শব্দগুলোর মানেও ঠিক ঠিক আন্দাজ করতে পারছো?

ব্যবহার
সাবমেরিন সর্বপ্রথম তৈরি করা হয় ১৭৭৫ সালে। তবে সেটা ছিল খুবই নিম্নমানের। প্রকৃতপক্ষে সাবমেরিন তৈরি করা হয় ঊনবিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে। আর সাবমেরিন জিনিসটা অদ্ভুত ও মজাদার মনে হলেও শুরুতে এর কাজকর্ম কিন্তু মোটেও মজাদার ছিলো না। কেননা, সাবমেরিন তৈরি করাই হয়েছিলো যুদ্ধ করার জন্য। পানির নিচে ডুবে থেকে সাবমেরিন বোমা মেরে উড়িয়ে দিতো শত্রুপক্ষের জাহাজ। কী খারাপ কথা! এসব অবশ্য বহুকাল আগের কথা। সেই ১ম আর ২য় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার কথা। ১ম বিশ্বযুদ্ধে সাবমেরিন ব্যবহারের ব্যাপকতা বিস্তৃতভাবে লক্ষ্য করা যায়। বর্তমানে অনেক বৃহৎ আকারের নৌবাহিনীতে এর অনেক সংগ্রহ রয়েছে। শত্রুবাহিনীর জাহাজ কিংবা সাবমেরিন আক্রমণ মোকাবেলায় এর ভূমিকা ব্যাপক। এছাড়াও, বিমানবাহী জাহাজ বহরকে রক্ষা করা, অবরোধ দূরীকরণ, প্রচলিত স্থল আক্রমণ ও বিশেষ বাহিনীকে গুপ্তভাবে রক্ষণাবেক্ষণে সাবমেরিনের কার্যকারিতা অপরিসীম।
সাধারণভাবেও সাবমেরিন ব্যবহার করা হয়ে থাকে। তন্মধ্যেÑ সমুদ্র বিজ্ঞান, উদ্ধার তৎপরতা, পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে অনুসন্ধান কার্যক্রম, পরিদর্শন এবং রক্ষণাবেক্ষণ সুবিধার জন্যও সাবমেরিন ব্যবহৃত হয়। এছাড়াও, সাবমেরিনকে ব্যবহারের লক্ষ্যে বিশেষায়িত কার্যক্রম হিসেবে অনুসন্ধান ও উদ্ধার তৎপরতাসহ সাগরতলে অবস্থিত ক্যাবল মেরামতেও সম্পৃক্ত করা হয়। পর্যটকদের আকৃষ্ট করার লক্ষ্যে সাগরতলে নিমজ্জিত প্রতœতত্ত্ব পরিদর্শনেও সাবমেরিন ব্যবহৃত হয়।

অবকাঠামো
অধিকাংশ বৃহদাকৃতির সাবমেরিনগুলো নল আকৃতির অবকাঠামো নিয়ে গঠিত। এর অভ্যন্তরভাগে কেন্দ্রস্থলে যোগাযোগ ব্যবস্থা থাকে এবং পেরিস্কোপকে নিয়ন্ত্রণ করা হয়। আধুনিক সাবমেরিনে ব্যবহৃত এ অবকাঠামোকে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রে সেইল বা পাল এবং ইউরোপে ফিন নামে অভিহিত করে থাকে। প্রথমদিকের সাবমেরিনে কনিং টাওয়ার বা জাহাজ চালানো ও পর্যবেক্ষণ স্থান ছিল, যেখান থেকে ক্ষুদ্রাকৃতি পেরিস্কোপকে চাপ প্রয়োগপূর্বক প্রধান কাঠামো উন্মুক্ত করে ব্যবহারের উপযোগী করা হতো। প্রোপেলার বা পাম্প জেট পশ্চাৎবর্তী দিকে থাকে এবং অনেক ধরনের তরল পদার্থের গতিবিজ্ঞান ব্যবস্থায় নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে ভারসাম্য রক্ষা করা হয়। তবে ক্ষুদ্রাকৃতি, গভীর পানিতে ভাসমান এবং বিশেষ ধরনের সাবমেরিনের ক্ষেত্রে এ ধারার অবকাঠামো থেকে ভিন্নতর হতে পারে।
খুবই বড় পরিসরে ধারণ ক্ষমতাসম্পন্ন নৌযানের মধ্যে সাবমেরিনও অন্যতম। এক থেকে দুই জন ব্যক্তি নিয়ে যেমন স্বল্প সময় পরিচালনা করা যায়; ঠিক তেমনি পানির নিচে ছয় মাস মেয়াদের জন্যেও অবস্থান করা যায়। রাশিয়ার টাইফুন ক্লাস সাবমেরিন পৃথিবীর সর্ববৃহৎ সাবমেরিন হিসেবে অদ্যাবধি বিবেচিত হয়ে আসছে।
বর্তমানের সাবমেরিনগুলো সাধারণত চুরুট আকৃতির হয়। প্রথম দিকে সাবমেরিনে যে ডিজাইন দেখা যেতো তা হলো “ঃবধৎফৎড়ঢ় যঁষষ” (হাল হলো জাহাজের সাধারণ কন্সট্রাকসন ডিজাইন)! এই ধরনের হালের জন্য পানির নিচে পানির টানটা অনেক কম অনুভূতো হয়! চালোনাশক্তির সীমাবদ্ধতার কারোণে প্রথম দিকের সাবমেরিনগুলো পানির নিচের চেয়ে উপরেই বেশি চলতো এবং এর স্পিড অনেক কম ছিলো।
বর্তমানে হাল ডিজাইন অনেক উন্নতমানের এবং সাবমেরিনের চারপাশে এক ধরনের লেয়ার থাকে যা শব্দ শোষণ করে নেয় ফলে এর অবস্থান অত সহজে নির্ণয় করা যায় না। কেননা পানির নিচে শব্দ তৈরি করেই কিন্তু পানির নিচের যেকোনো বস্তুর অবস্থা নির্ণয় করা যায়। শব্দটা যখন পানির নিচে কোনো বস্তু পেয়ে তাতে বাধা পেয়ে ফিরে আসে তখনি বোঝা যায় কোনো বস্তুর উপস্থিতি! কাজেই এই শব্দ যদি ফিরে না যায় তাহলে তো আর কেঊ বুঝবেই না যে সামনে কিছুর উপস্থিতি বিদ্যমান।
সাবমেরিনের প্রপেলার যতটা সম্ভব পাতলা করা হয় যাতে করে তা অনেক কম শব্দ উৎপন্ন করে এবং অনেক বেশি বেগ পেতে পারে। এ কারণে প্রপেলার তৈরিতে সাধারণত বেরিলিয়াম ব্রোঞ্জ ব্যবহার করা হয়। এর বৈশিষ্ট্য হলো- এর গলনাঙ্ক অনেক বেশি, অনেক বেশি তাপ আর ধাক্কা সহ্য করতে পারে।
সাবমেরিনের উপরে যে টাওয়ার থাকে ওটাই কিন্তু কন্ট্রোল রুম। তোমরা নিশ্চয়ই লঞ্চে দেখেছÑ লঞ্চের উপরে একটা দণ্ড অনেক উঁচু পর্যন্ত বিস্তৃত থাকে- একে বলে মাস্ট! সাবমেরিনে কন্ট্রোল টাওয়ারের উপরে এরকম মাস্ট আছে যাতে রেডিও, রাডার ও ইলেকট্রনিক ব্যবস্থা আছে। এরই মাধ্যমে সাবমেরিন বন্দর বা অন্য কোনো জাহাজের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করে। রাডারের মাধ্যমে সাবমেরিন বিমান বা জাহাজের অবস্থান সনাক্ত করতে পারে!
প্রম দিকে সাবমেরিনগুলো স্টিম ইঞ্জিন চালিত ছিল। পরে এতে ডিজেল ইঞ্জিন ব্যবহার করা হয়! বর্তমানে সাবমেরিনগুলো নিউক্লিয়ার শক্তিতে চলে। কিন্তু এটা অনেক বেশি ব্যয়বহুল! তাই ছোটো সাবমেরিনগুলো এখোনো ডিজেল-ইলেকিট্রক পাওয়ারে চলে!
সাবমেরিনের সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ন অংশ হলোÑ আধুনিক সমরাস্ত্র টর্পেডো যা সয়ংক্রিয়ভাবে শত্রুসেনার জাহাজে আঘাত হানে! একটি সাবমেরিনে ২০-২৫টি টর্পেডো থাকে। এছাড়া বর্তমানের সাবমেরিনগুলোতে থাকে ক্রুজ-মিসাইল। আর মিসাইলের ক্ষমতা তো তোমরা জানোই! আগে এই মিসাইল উৎক্ষেপনের জন্য সাবমেরিনের পানির উপরে থাকতে হতো। কিন্তু বর্তমানের সাবমেরিন পানিতে নিমজ্জিতো অবস্থায় ই মিসাইল উতক্ষেপন করতে পারে! এছাড়া ব্যালাস্টিক মিসাইল ও সাবমেরিনে থাকে! বর্তমানে জার্মানি এক ধরনের সাবমেরিন তৈরি করছে যা মিসাইল দিয়ে অঝড যবষরপড়ঢ়ঃবৎং-কে আঘাত হানতে সক্ষম!
একটি বড় ধরনের সাবমেরিনে ৮০ জনের মত ক্রু থাকতে পারে! যদিও অধিকাংশ নেভী সাবমেরিনে মেয়ে ক্রু নিয়োগ দেয়া নিষিদ্ধ করেছে। তবে ১৯৮৫ সালে রয়াল নরোয়েন নেভী সাবমেরিনে নারী ক্রু নিয়োগ দেয়! এর পরে অনেক ক্রু ই নারী ছিলেন! তার মানে,নারীদের বিচরণ এখানেও!

ইতিহাস
১৬২০ সালে কর্নেলিয়াস জ্যাকবসজুন ড্রেবেল নামীয় একজন ডাচ কর্তৃক প্রথম নৌযানবাহন হিসেবে সাবমেরিন আবিষ্কার করেন বলে জানা যায়। তিনি ইংল্যান্ডের রাজা ১ম জেমসের অধীনে রাজকীয় নৌবাহিনীতে কর্মরত ছিলেন। ইংরেজ গণিতজ্ঞ উইলিয়াম বোর্ন কর্তৃক ১৫৭৮ সালে সূচিত ধারণা ও কাঠামোকে পুঁজি করে সাবমেরিন যন্ত্রটি আবিষ্কার করেন তিনি। তাঁর আবিষ্কৃত সাবমেরিনটি ড্রেবেলীয় সাবমেরিন নামে পরিচিত হয়ে আছে। যন্ত্রটিকে দাঁড় টেনে সামনের দিকে নিয়ে যেতে হতো। এজাতীয় সাবমেরিনের আবিস্কার নিয়ে কিছুটা বিতর্ক রয়েছে। কেউ কেউ দাবি করেন যে, অন্য কোনো নৌকা দ্বারা এটিকে টেনে নেয়া হয়েছিল। পরবর্তীতে ১৬২০ থেকে ১৬২৪ সালের মধ্যে টেমস নদীতে আরও দু’টো উন্নতমানের সংস্করণ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়েছিল। প্রত্যেকটিই পূর্বের তুলনায় বড় ছিল।
৩য় ও সর্বশেষ সংস্করণের সাবমেরিনটিতে ৬টি দাঁড় ছিল এবং ১৬জন যাত্রী বহনে সক্ষম ছিল। এ মডেলটি রাজা ১ম জেমসের নির্দেশনায় তৈরি করা হয়েছিল এবং কয়েক হাজার লন্ডনবাসী এটি পরিদর্শন করেছিলেন। সাবমেরিনটি তিন ঘণ্টাব্যাপী পানিতে নিমজ্জিত থাকতে সক্ষম হয়েছিল। ওয়েস্টমিনিস্টার থেকে গ্রীনিচ পর্যন্ত আসা-যাওয়ায় সক্ষমতাসহ ১২ থেকে ১৫ ফুট (৪ থেকে ৫ মিটার) পানির নিচে অবস্থান করতে সক্ষম ছিল সাবমেরিনটি। ড্রেবেল, রাজা জেমসকে এ সাবমেরিনে পরীক্ষামূলকভাবে চলাচলের জন্য অনুরোধ জানান। রাজা তার অনুরোধে সম্মতি জানান। টেমসের পানির তলে সাবমেরিনে আরোহণের ফলে প্রথম ভ্রমণকারী রাজা হিসেবে ইতিহাসের পর্দায় নিজেকে সম্পৃক্ত করেন। পরবর্তীতে সাবমেরিনটিকে টেমস নদীতে অনেকবার পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানো হয়। কিন্তু নৌবাহিনীর কোনো ব্যক্তির পক্ষ থেকেই পর্যাপ্ত মনোযোগ আকর্ষণে সক্ষম হয়নি এটি। বলাবাহুল্য, যুদ্ধক্ষেত্রেও কখনো এর প্রচলন ঘটানো হয়নি।
২০০২ সালে উইলিয়াম বোর্নের সূচিত ধারণা ও নকশাকে উপজীব্য করে দুইজন আরোহীর উপযোগী সাবমেরিন তৈরি করা হয়। প্রথম আবিষ্কৃত পানির অভ্যন্তরে চলাচলযোগ্য যানবাহন হিসেবে সাবমেরিন আবিষ্কৃত হবার অল্প কিছুদিন পরেই বিশেষজ্ঞরা এর সামরিক উপযোগিতা সম্বন্ধে অবগত হন। সাবমেরিনের কৌশলগত সুবিধাদি সম্পর্কে ইংল্যান্ডের চেস্টার এলাকার বিশপ জন উইলিকন্স ১৬৪৮ সালে ম্যাথমেটিক্যাল ম্যাজিক গন্থে তুলে ধরেনÑ
১.    ব্যক্তিগতভাবে একজন ব্যক্তি বিশ্বের যে-কোনো এলাকার উপকূলে অদৃশ্যমান অবস্থায় গমন করতে সক্ষম। সেজন্য সাবমেরিনে ভ্রমণকালে তাকে নৌপথ আবিষ্কার কিংবা প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার প্রয়োজন পড়বে না।
২.    নিরাপদ যানবাহন হিসেবে আকস্মিক ও অনিশ্চিত স্রোত এবং প্রবল ঝড়ের মোকাবেলা করতে হবে না। কেননা, সমুদ্র অভ্যন্তরের পাঁচ কিংবা ছয় পেস বা তের কিংবা পনের ফুট নীচ থেকে সাবমেরিনকে উপরে উঠানো অসম্ভব ব্যাপার। এছাড়াও, জলদস্যু এবং ডাকাতদের কবল থেকে; বরফ এবং জমাট হিমকণা থেকেও আত্মরক্ষার্থে এর ভূমিকা অসাধারণ।
৩.    পানির অভ্যন্তরে থাকায় ও আকস্মিকভাবে আক্রমণ করার মাধ্যমে নৌ-শত্রুদের বিরুদ্ধে এটি ব্যাপক সুবিধাদি বহন করে।
৪.    নৌ-অবরোধের প্রেক্ষাপটে ত্রাণকার্য পরিচালনায় অদৃশ্যভাবে খাদ্য কিংবা রসদ সরবরাহের মাধ্যমরূপে এটি বিশেষভাবে ব্যবহৃত হতে পারে।
৫.    সামবেরিনের পরীক্ষা-নিরীক্ষান্তে এর সুবিধাদি অবর্ণনীয় ও ব্যাপক।

বর্তমানে সাবমেরিন নামটির সাথে যুক্ত হয়েছে আরো কিছু বিষয়। তন্মধ্যে কয়েকটির বর্ণনা নিচে তুলে ধরা হলোÑ
নিউক্লিয়ার সাবমেরিন
পারমাণবিক চুল্লিতে উৎপাদিত শক্তি দিয়ে পরিচালিত ডুবোজাহাজকে নিউক্লিয়ার সাবমেরিন বা পরমাণুশক্তিচালিত ডুবোজাহাজ বলা হয়। প্রথাগত যেসব ডুবোজাহাজ ডিজেল-তড়িৎ ইঞ্জিনে চালিত হয়, তাদের তুলনায় পারমাণবিক ডুবোজাহাজের অনেক সুবিধা রয়েছে। যেমন, পারমাণবিক ডুবোজাহাজ চালাতে বায়ুর দরকার নেই। ফলে ঘন ঘন সমুদ্র পৃষ্ঠে ফিরে আসতে হয় না। পারমাণবিক চুল্লিতে উৎপাদিত বিপুল পরিমাণ শক্তি দিয়ে এসব ডুবোজাহাজ দীর্ঘ সময় দ্রুত গতিতে চলাচল করতে পারে। এছাড়া এসব ডুবোজাহাজে ঘন ঘন জ্বালানী সরবরাহেরও দরকার নেই। কাজেই কর্মীদের খাদ্য সরবরাহ ছাড়া আর কোনো কারণে এসব ডুবোজাহাজকে নিয়মিতভাবে বন্দরে ভিড়তে বা সমুদ্র পৃষ্ঠে ফিরে আসতে হয় না। বর্তমানে প্রচলিত পারমাণবিক ডুবোজাহাজগুলো জ্বালানী পুনঃসরবরাহ না করেও তাদের ২৫ বছরের জীবদ্দশা কাটিয়ে দিতে পারে। তবে পরমাণুশক্তিচালিত ডুবোজাহাজের উচ্চমূল্যের কারণে অল্প কয়েকটি দেশের নৌবাহিনীতেই এমন ডুবোজাহাজ রয়েছে।
সাবমেরিন ক্যাবল
সাবমেরিন যোগাযোগ ক্যাবল, এমন ধরনের ক্যাবল যা সমুদ্রের নিচ দিয়ে যায় এবং বিভিন্ন দেশের মধ্যে টেলিযোগ ব্যবস্থা স্থাপন করে।
১৮৫০ সালে প্রথম বাণিজ্যিকভাবে সাবমেরিন ক্যাবল স্থাপন হয় এংলো ফ্রেন্স টেলিগ্রাফ কোম্পানির তদারকিতে। সেটিই প্রথম ব্রিটিশ চ্যানেল পাড়ি দেয়া যান্ত্রিক যোগাযোগ মাধ্যম। ভারতীয় উপমহাদেশে ১৮৬৩ সালে সাবমেরিন ক্যাবলের সাহায্যে সৌদি আরবের সাথে বোম্বের প্রথম যোগাযোগ স্থাপন হয়। এর ৭ বছর পর, লন্ডনের সাথে বোম্বের সরাসরি সংযোগ দেয়া হয়।
সাবমেরিন ক্যাবলের বিভিন্ন স্তরÑ ১. পলি ইথিলীন বা বাংলাদেশের পরিচিত পলিথিন, অবশ্যই বেশ আলাদা রকমের ২. মাইলার টেইপ ৩. স্টীলের তার ৪. অ্যালুমিনিয়ামের পানি নিরোধী স্তর ৫. পলিকার্বোনেট ৬. তামার বা আ্যালুমিনিয়ামের টিউব ৭. পেট্রোলিয়াম জেলি ৮. অপটিকাল ফাইবার।
বাংলাদেশ এসই-এমই-ডব্লিও-৪ সাবমেরিন ক্যাবল কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে যুক্ত। বাংলাদেশের বরাদ্দ ব্যান্ডইউডথ এর পরিমাণ ২৪ গিগাবিট।

একইরকম সাবমেরিন দেখতে আর কতো-ই বা ভালো লাগে বলো? তাই বিজ্ঞানীরা তৈরি করেছেন নানান আকৃতির সুন্দর সুন্দর হরেকরকম সব সাবমেরিন। চলো তাহলে, একটু চিনে আসি সেই সব সাবমেরিনগুলো।
হাইপার-সাব
সবার আগে তোমাদের যে সাবমেরিনটির কথা বলবো, সেটির নাম হচ্ছে হাইপার-সাব। সুন্দর তো বটেই, তবে এই সাবমেরিনের দামটা শুনলে তোমার যাকে বলে পিলে চমকে যাবেÑ ৩৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার! বাংলাদেশী টাকায় যা কিনা প্রায় ২৫ কোটি টাকারও বেশি! যদিও টাকার পরিমাণটা একটু বেশিই বেশি, তারপরও তুমি কত্তো সুন্দর একটা যান পাচ্ছো, তাও সেটি কিনা আবার পানির নিচেও চলে, তাহলে টাকাটা খরচ করা যায়-ই, কি বলো?
সুন্দর এ সাবমেরিনটির ডিজাইন করেছেন যিনি, তার নাম মেরিওন এইচএসপিডি। লম্বায় এটি ৩১ ফুট। এতে রয়েছে বায়ু আর পানি নিরোধক কেবিন। এটি সর্বোচ্চ ৪০ নট গতিতে চলতে পারে আর পানির গভীরে যেতে পারে সর্বোচ্চ ২৫০ ফিট পর্যন্ত।
সীব্রিচার-এক্স
হাঙর তো তোমরা সবাই চেনো। কী ভয়ঙ্কর আর হিংস্র প্রাণী এরা, তাই না! আচ্ছা, যদি এরকম একটা সাবমেরিন বানানো যায় যেটা কিনা দেখতে একদম হাঙরেরই মতোন, তাহলে কেমন হয়? নিশ্চয়ই হাঙরদেরই একেবারে পিলে চমকে দেয়া যাবে, তাই না? সত্যি সত্যিই কিন্তু এরকম একটা সাবমেরিন তৈরি করা হয়েছে। আর সেটির নাম দেয়া হয়েছে ‘সীব্রিচার-এক্স’। এটি দেখতে পুরোপুরি সত্যিকার হাঙরের মতোই। তবে ভয় পেয়ো না। এটি শুধুমাত্র দেখতেই হাঙরের মতো। এরা হাঙরের মতো সত্যি সত্যি মানুষ খায় না। বরং এই হাঙরের পেটের ভেতর বসে থেকে তুমি সাগরের অসীম সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারবে। হাঙররূপী এই সাবমেরিনের রয়েছে শক্তিশালী একটি ইঞ্জিন যা দিয়ে এটি পানির উপরে প্রায় ৫০ মাইল বেগে আর পানির নিচে প্রায় ২৪ মাইল বেগে চলতে পারে।
হলদে সাবমেরিন
এই সাবমেরিনটিকে বলা হয় ব্যক্তিগত সাবমেরিন। যারা শখের বশে সাগরতলে ঘুরতে যান, তাদের কথা মাথা রেখে এই হলদে রঙের সাবমেরিনটি বানানো হয়েছে, তাই এটির এমন নাম দেয়া হয়েছে। যদিও হাইপার-সাব থেকে এর দাম কিছুটা কম, তবে তা-ও নেহায়েত কম নয়। ২০ লক্ষ মার্কিন ডলার। অর্থাৎ প্রায় ১৫ কোটি টাকা!
অসম্ভব সুন্দর এই সাবমেরিনটির কমতি কোথায় জানো? এটি আকারে একদমই ছোট। অন্যান্য সাবমেরিনের মতো এর ভেতরে ঘোরাঘুরি করা তো দূরের কথা, একটু হাত-পা ছড়িয়ে আরাম করে শোয়ার ব্যবস্থাও নেই। দু’টি মাত্র সিটে দু’জনকে বসে সমুদ্র ভ্রমণে যেতে হয়। পুরো ভ্রমণের সময়ই দু’জনকে হাত-পা গুটিয়েই বসে থাকতে হয়। তবে খুশির কথা হচ্ছে, হলদে সাবমেরিন পানির প্রায় ১০০০ ফুট নিচে পর্যন্ত যেতে পারে! অর্থাৎ এটিতে চড়ে তুমি অনেক অ-নে-ক গভীর সমুদ্রের সৌন্দর্যও উপভোগ করতে পারবে।
ইজিও কমপ্যাক্ট সেমি-সাবমেরিন
নামটা একটু খটমটে মনে হলেও সাবমেরিনটা দেখতে কিন্তু অ-নে-ক সুন্দর। অবশ্য এটিকে পুরোপুরি সাবমেরিনও বলা যায় না। আসলে এটি সেমি-সাবমেরিন। অর্থাৎ সাবমেরিনের বৈশিষ্ট্যের সবগুলো না থাকলেও অনেকগুলোই এর আছে।
সাবমেরিনের উপরের দিকের যে অংশটুকু থাকে সেটি ভেলার মত পানির উপর ভেসে থাকে। আর এর শরীরের বাকি অংশটুকু অর্থাৎ গোলাকার অংশটুকু পানির নিচে ডুবে থাকে। সুতরাং বুঝতেই পারছো, তুমি সাবমেরিনটি নিয়ে পানির খুব একটা গভীরে যেতে পারবে না। শুধুমাত্র পানির উপরের দিককার অংশের সৌন্দর্যই উপভোগ করতে পারবে। তাতে কি? পানির উপরিভাগের সৌন্দর্য উপভোগ করার জন্য এর চেয়ে ভালো সাবমেরিন আর হয়-ই না। একটু চিন্তা করেই দেখো না, সাগরের সৌন্দর্য আর মাছদের ছোটাছুটি তুমি কতো কাছ থেকে দেখছো, অথচ তোমার গা একটুও ভিজছে না। ভাবতেই কেমন মজা লাগে, তাই না?
নটিলাস ভিএএস লাক্সারি সাবমার্সিবল
অন্তত একবার হলেও তুমি যদি সাগরের নিচ থেকে ঘুরে আসার ইচ্ছে করো, (অন্তত এই লেখাটি পড়ে তেমনটি মনে হবারই কথা) তবে এ কাজের জন্য তোমাকে কি করতে হবে? প্রথমেই সুন্দর দেখে একটা সাবমেরিন কিনতে হবে। সাগরতলে ভ্রমণের জন্য “নটিলাস ভিএএস লাক্সারি সাবমার্সিবল” নামের এ সাবমেরিনটির চেয়ে ভালো আর কিছু হতেই পারে না। দেখতে কিছুটা সিলিন্ডার আকৃতির এ সাবমেরিনটির ভেতরে রয়েছে আরাম আয়েশের দারুণ সব সুব্যবস্থা। ভেতরে বসে তুমি এমন কি গানও শুনতে পারবে! তবে সাবমেরিনের দামটা বোধহয় একটু বেশি-ই। প্রায় ২০ কোটি টাকা।

বর্তমানে যেসব দেশে সাবমেরিন আছে
যুক্তরাজ্য, চীন, জার্মানি, রাশিয়া, ভারত, সোভিয়েত ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্র।

সাবমেরিন নিয়ে তো অনেক কথা হলোÑ এবার একটা বিস্ময়কর তথ্য দিই : বাংলাদেশে বাসের মতো সাবমেরিনে কিন্তু মুখোমুখি সংঘর্ষও হয়। ২০০৯ সালে আটলান্টিক মহাসাগরে দুটি সাবমেরিন-ঐগঝ ঠধহমঁধৎফ এবং খব ঞৎরড়সঢ়যধহঃ এর মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছিলো পানিতে নিমজ্জিত অবস্থায়। দুটো সাবমেরিনই ছিলো হঁপষবধৎ-ঢ়ড়বিৎবফ নধষষরংঃরপ সরংংরষব ংঁনসধৎরহবং! এ দুটো ছিলো স্কটল্যান্ড ও ফ্রান্সের। অবশ্য তেমন কোনো ক্ষয়-ক্ষতি হয়নি!

SHARE

Leave a Reply