Home স্মরণ বাংলায় সংস্কার আন্দোলনের বীরসেনানী হাজী শরীয়তুল্লাহ

বাংলায় সংস্কার আন্দোলনের বীরসেনানী হাজী শরীয়তুল্লাহ

ড. মুহাম্মাদ নূরুল ইসলাম

আশা করি তোমরা হাজী শরীয়তুল্লাহর নাম শুনেছ। যার জীবন সংগ্রামের সাথে জড়িত আছে বাংলার মুসলমানদের ইতিহাস ঐতিহ্য। তিনি দাঁড়িয়েছিলেন নির্যাতিত মানুষের পাশে। পলাশীর আম্রকাননে নবাব সিরাজউদ্দৌলার পরাজয়ে বাংলাদেশবাসীর ওপর নেমে আসে পরাধীনতার গ্লানি ও অত্যাচারের স্টিম রোলার। অষ্টাদশ ও ঊনবিংশ শতাব্দী ছিল বাংলার মুসলমানদের জন্য অত্যাচার ও নির্যাতনের এক বিশেষ অধ্যায়। বিশেষ করে ঊনবিংশ শতকের প্রারম্ভে হিন্দু জমিদার, নীলকর ও মহাজনদের জুলুম-শোষণে এদেশের সাধারণ কৃষকদের অবস্থা অত্যন্ত দুর্বিষহ হয়ে ওঠে। এ ছাড়া বিভিন্ন প্রকারের কুসংস্কার ও কুপ্রথা তাদের সামাজিত ও ধর্মীয় জীবনকে বিষময় করে তোলে। বাংলার এ উপেক্ষিত, অত্যাচারিত ও নির্যাতিত গণমানুষকে মুক্ত করার জন্য হাজী শরীয়তুল্লাহ ১৮১৮ খ্রিষ্টাব্দে এক ব্যাপক আন্দোলন শুরু করেন। তাঁর এ আন্দোলনকে ‘ফারায়েজী আন্দোলন’ বলা হয়। ১ফরজ’ কথা থেকে ফারায়েজী শব্দের উৎপত্তি।
হাজী শরীয়তুল্লাহ ১৭৮০ খ্রিষ্টাব্দে তদানীন্তন বৃহত্তর ফরিদপুর জেলার শরীয়তপুর জেলার শামাইল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম আবদুল জলিল তালুকদার। শামাইল ও হাজীপুর মৌজায় ভূ-সম্পত্তির অধিকারী ছিলেন তিনি। শরীয়তুল্লাহর যখন নেহায়েত শিশুকাল, তখনই তাঁর মায়ের মৃত্যু হয়। পিতার আদরও তাঁর ভাগ্যে বেশিদিন জোটেনি। তাঁর বয়ষ যখন আট বছর তখন পিতা আবদুল জলিল তালুকদার চিরতরে দুনিয়া থেকে বিদায় নেন। অসহায় হয়ে পড়েন কিশোর বালক শরীয়তুল্লাহ। বালক শরীয়তুল্লাহর এই অসহায় অবস্থায় তাঁর পাশে এসে দাঁড়ান চাচা আজিমুদ্দিন। নিজ এলাকাতেই তিনি প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেন। বেনিয়া ইংরেজদের অত্যাচার কিশোর বয়স থেকেই তাঁকে ভাবিয়ে তোলে। ইংরেজদের এই অত্যাচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে। ১২ বছর বয়সে তিনি জ্ঞানার্জনের জন্য কোলকাতায় চলে যান। সেখানে তাঁর সাথে পরিচয় হয় প্রখ্যাত শিক্ষানুরাগী ও ইসলামী চিন্তাবিদ মাওলানা বাশারত আলীর সাথে। তিনি একটি মাদ্রাসাও পরিচালনা করতেন। বাশারত আলী শরীয়তুল্লাহকে সে মাদ্রাসাতেই ভর্তি করিয়ে নেন এবং জ্ঞানার্জনে বিশেষভাবে তত্ত্বাবধান করেন। কুরআন, হাদিস এবং আরবি-ফারসি-বাংলা ভাষায় তিনি অসাধারণ ব্যুৎপত্তি অর্জন করেন। জ্ঞানার্জনে তিনি হুগলির ফুরফুরা ও মুর্শিদাবাদেও কিছুকাল অতিবাহিত করেন।
১৭৯৯ সালে মাওলানা বাশারত আলী তাঁর স্নেহভাজন শরীয়তুল্লাহকে নিয়ে হজপালনের জন্য মক্কায় গমন করেন। হজপালন শেষে হাজী শরীয়তুল্লাহ তদানীন্তন বিশ্বের দীনি ইলমের শ্রেষ্ঠ কেন্দ্র মক্কায় থেকে যান। মক্কায় তিনি বিশিষ্ট আলেমে দীন তাহের সম্বল মক্কীর কাছে দীনি বিষয়ে শিক্ষা লাভ করেন। দীর্ঘদিন মক্কা ও মদিনায় অবস্থান করে ইসলামের বিভিন্ন বিষয়ে বিশেষ জ্ঞান লাভ করেন। দীর্ঘ বিশ বছর মক্কায় অবস্থান করে ১৮১৮ খ্রিষ্টাব্দে স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করেন । মহানবী (সা) পরিচালিত ইসলামী আন্দোলনের কর্মপ্রেরণায় শরীয়তুল্লাহ চিন্তাচঞ্চল হয়ে ওঠেন।
দেশে ফিরে হাজী সাহেব দেখেন, তখনও মানুষ মহাবিপর্যয়ে আহাজারী করছে। তাদের এই মজলুম অবস্থা দেখে হাজী শরীয়তুল্লাহর বুকে জ্বলে ওঠে বিদ্রোহের দাবানল। ইতোমধ্যে তিনি নিয়ামত বিবি নামের এক গুণবতী নারীকে বিয়ে করেন।
হাজী শরীয়তুল্লাহ বাংলার গ্রামে গ্রামে ঘুরে নির্যাতিত মুসলমানদের কাছে ইসলামের সঠিক শিক্ষা ও আদর্শ প্রচার শুরু করেন। দেশে এসেই তিনি সাধারণ মানুষকে নিয়ে গড়ে তোলেন ফারায়েজী আন্দোলন। দীন ইসলামের আদি অবস্থানে ফিরে যাওয়া, কুসংস্কার দূর করা, বাংলার উপেক্ষিত ও নির্যাতিত মানুষের আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক ও আধ্যাত্মিক উন্নতি সাধনই ছিল তাঁর এ আন্দোলনের উদ্দেশ্য। অত্যাচারী জমিদার ও তাদের পাইক পেয়াদাদের অত্যাচার থেকে বাংলাদেশবাসীকে রক্ষার জন্য তিনি পরিকল্পিত আন্দোলন গড়ে তোলেন। দুর্দমনীয় সাহস সহকারে বাংলাদেশবাসীর আত্মপ্রত্যয় পুনঃপ্রতিষ্ঠাকল্পে সকল প্রকার শোষণ, উৎপীড়ন, সামাজিক কুসংস্কার ও কুপ্রথার বিরুদ্ধে তিনি সংগ্রাম পরিচালনা করেন। তিনি ইংরেজ বেনিয়া শাসিত অঞ্চলকে দারুল হরব ঘোষণা করেন। তৎকালীন মুসলিম সমাজে আশরাফ ও আতরাফের নামে শ্রেণীগত পার্থক্য, শিরক-বিদআত, পীরপূজা, কবর পূজা, মাজার পূজা এবং অন্যান্য অনাচার ও কুপ্রথার বিরুদ্ধে আপোসহীন সংগ্রাম শুরু করেন।
বাংলার অত্যাচারিত ও উৎপীড়িত জনগণের মুক্তির জন্য যে আন্দোলন শুরু হয়, তা অচিরেই একটি রাজনৈতিক আন্দোলনের রূপ পরিগ্রহ করে। ঊনিশ শতকে বাংলার গণমানসে এই আন্দোলনের প্রভাব ছিল অপরিসীম। এ আন্দোলনের মাধ্যমে হাজী শরীয়তুল্লাহ সর্বপ্রথম বাংলার মুসলিম সমাজকে আত্মসচেতন করার বীজ বপন করেন। এ আন্দোলনের বাংলার কৃষকগণ দলে দলে যোগদান করতে থাকে। যে সকল অঞ্চলে হিন্দু জমিদার ক্ষমতাশালী, সেখানেই এই আন্দোলন জোরদার হয়ে ওঠে। হাজী শরীয়তুল্লাহ জমিদার ও নীল কুঠিয়ালদের মনে ত্রাস সৃষ্টি করেন। এ প্রসঙ্গে জেমস ওয়াইজ বলেন, ‘হিন্দু জমিদারগণ ফারায়েজী আন্দোলনের বিস্তৃতিতে ভয় পেয়ে যায়; কারণ ফারায়েজী আন্দোলন নির্যাতিত মুসলমানদের একতাবদ্ধ করেছিল।’ জেমস ওয়াইজ আরো বলেন, ‘দূর্গপূজা, কালীপূজা, স্বরস্বতী পূজা এমনকি দাড়ি রাখার জন্যেও মুসলিম প্রজাদের নিকট হতে কর আদায় করা হতো।’ হাজী শরীয়তুল্লাহ ছিলেন দরিদ্র জনসাধারণের প্রকৃত বন্ধু। তাঁর বিপ্লবী ভূমিকা জালেম, শোষকদের কাছে হয়ে উঠেছিল ভয়ের ব্যাপার। এ সম্পর্কেও জেমস ওয়াইজ মন্তব্য করেছেন, ‘দেবদেবী অধিষ্ঠিত হিন্দু ধর্মের সাথে বহুকালের সংযোগ হতে উ™ভূত অসংখ্য কুসংস্কার ও বিকৃতি থেকে মুসলিমদের মুক্ত করার জন্য তিনি যে প্রচার ও সংগঠিত আন্দোলন আরম্ভ করেন তা সত্যিই প্রশংসনীয়। তিনি যে নির্যাতিত নির্বিকার ও নিরুৎসাহী কৃষক জনসাধারণের মধ্যে অভূতপূর্ব উৎসাহ উদ্দীপনার সঞ্চার করেছিলেন তা নিঃসন্দেহে অসাধারণ ঘটনা। শরীয়তুল্লাহর নিষ্কলঙ্ক ও আদর্শ জীবন এ দেশের আপামর জনগণের প্রশংসা অর্জন করেছিল। মানুষ তাঁকে বিপদে পরামর্শদাতা, দুঃখ-দুর্দশায় সান্ত্বনাদানকারী পিতার মতো সম্মান করতো। শরীয়তুল্লাহ প্রচার করতেন শোষক জমিদারদের অধিকার নেই কৃষকের শ্রমে অর্থের পাহাড় গড়ে তোলা। সব মানুষ আল্লাহর কাছে সমান। কাজেই এখানো কারো অধিকার নেই মানুষকে শোষণ ও নির্যাতন করা।’
হাজী শরীয়তুল্লাহ সারাদেশে ফারায়েজী আন্দোলনের শাখা গড়ে তোলেন। তাঁর আন্দোলন মুসলমানদের মধ্যে নবজাগরণ সৃষ্টি করে। বাংলাদেশে ইসলামী রেনেসাঁ আন্দোলনকে বেগবান করে হাজী শরীয়তুল্লাহ ১৮৩৯ সালের ২২ জানুয়ারি শনিবার আসরের নামাজের সময় ৫৯ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন।

SHARE

1 COMMENT

Leave a Reply