Home গল্প ট্রফি চুরি

ট্রফি চুরি

আহমেদ বায়েজীদ

সকালবেলার নাশতা শেষ করার সাথে সাথেই ছোট মামা এসে বললো, তাওসিফ, তাড়াতাড়ি আমার সাথে আয়তো।
পানি খেতে খেতে জানতে চাইলাম, কোথায় যাবে?
এখানে বলা যাবে না, আয় আমার সাথে বাইরে গিয়ে বলছি।
মুখটা মুছে বাইরে গেলাম। ঘর থেকে বের হয়ে মামা বললো, বাজারে যেতে হবে। একটা ঘটনা ঘটেছে।
কী ঘটনা?
ক্লাব থেকে কাল রাতে নতুন কাপটা চুরি হয়ে গেছে।
নতুন কাপ মানে পড়শু যেটা আমাদের ক্লাব পেয়েছে! হায় হায়, সেটা আবার কারা চুরি করলো?
জানি না, চল গিয়ে দেখি। বলেই মামা হাঁটার গতি বাড়িয়ে দিল। আমিও চললাম সাথে সাথে।
আমাদের বাড়ি থেকে কামারখালী বাজার কয়েক মিনিটের পথ। এই পথে বাজারে ঢোকার মুখেই রাস্তার পাশে ক্লাব ঘরটি। উপরে টিনের চালা আর চারপাশে টিনের বেড়া দিয়ে তৈরি। আমরা যাওয়ার আগেই অনেক লোকের ভিড় হয়েছে। আমাকে নিয়ে ভিড় ঠেলে ভিতরে গেল মামা। ক্লাবের খেলোয়াড়-কর্মকর্তা সবাই হাজির হয়েছে। সবাই চুরির ঘটনা নিয়ে মতামত দিচ্ছে। একেকজন একেক কথা বলছে। সব শুনে বোঝা গেল একদিন আগে আন্তঃইউনিয়ন গোল্ডকাপ ফুটবলে চ্যাম্পিয়ন হয়ে আমাদের ইউনিয়ন যে ট্রফিটি পেয়েছে সেটাই চুরি হয়েছে। প্রতিদিনের মত আজ সকালেও ক্লাবের পিয়ন শফিক এসে ক্লাব ঘর খুলে কাপটি না দেখতে পেয়ে সভাপতি আলম শিকদারকে খবর দেয়। খবর পেয়ে একে একে সবাই ছুটে আসে। কিন্তু কিভাবে চুরি হয়েছে সেটা কেউ বুঝতে পারছে না। কারণ ক্লাব ঘরে কোথাও চোর ঢোকার কোনো আলামত নেই। কোনো দরজা-জানালা কিংবা বেড়া ভাঙার কোনো লক্ষণ নেই। তালা একেবারে অক্ষত রয়েছে।
একজন বললো, দরজা-জানালা যেহেতেু ভাঙা নেই, তাহলে চোর নিশ্চয়ই চাবি দিয়ে খুলে ভিতরে ঢুকেছে। আর ক্লাবের তালার চাবি তো আছে সভাপতি এবং পিয়ন শফিকের কাছে।
আরেকজন বললো, শফিকরে ভালোভাবে জিজ্ঞেস করো, ও নিশ্চয়ই এর সাথে জড়িত।
অন্য কে একজন বললো, আচ্ছামত ধোলাই দাও, সব বের হবে।
শফিককে এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলো সভাপতি। ও বললো, কাল রাতে দরোজায় তালা মেরে বাড়ি গেছে। এরপর আর কিছু জানে না। অনেকভাবে বুঝিয়ে কথা বের করার চেষ্টা করা হলো, মারধরের হুমকিও দেয়া হলো। কিন্তু ওর সেই একই কথা।
অনেকের ধারণা শফিক নিজে না করলেও ওর সহায়তা নিয়ে অন্য কেউ কাজটা করেছে। সেক্ষেত্রে সন্দেহ ক্লাবেরই খেলোয়াড় আশিকের ওপর। কারণ, ফাইনাল ম্যাচের আগে দল নির্বাচন নিয়ে অধিনায়কের সাথে দ্বন্দ্বের কারণে খেলেনি আশিক। এরপর আর ক্লাবেও আসেনি সে। তাই অনেকের বিশ্বাস আশিকই কাজটা করেছে। তবে আশিক পুরোপুরিই শান্ত আর ভদ্র স্বভাবের হওয়ায় কেউ তার নাম জোর দিয়ে বলতেও পারছে না। এসময় ছোট মামা আমাকে ইঙ্গিতে বললো বের হয়ে যেতে। দু’জনে ক্লাব থেকে বের হয়ে এলাম।
বাইরে এসে মামা আমাকে বললো, কিছু বুঝতে পারলি?
আমি মাথা নেড়ে বললাম, না।
মামা বললো, আয় একটু খুঁজে দেখি, চুরির কোনো সূত্র পাওয়া যায় কি না।
আমি বললাম, এত মানুষ খুঁজেও কিছু পেল না, তুমি কী করে পাবে?
সবাই তো আর গোয়েন্দা নয়, দেখি আমরা কিছু বের করতে পারি কি না। নিশ্চয়ই চোর মিয়া কোনো না কোনো সূত্র রেখে গেছে। সেটাই আমাদের খুঁজে বের করতে হবে। বলে মামা ক্লাবের পিছন দিকে চলে গেল।
ছোটমামার গোয়েন্দা স্বভাবটা আমার জানা। গোয়েন্দা উপন্যাস পড়তে পড়তে তার এই অবস্থা হয়েছে। কোনো অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটলেই সে তদন্ত করার ধান্দায় থাকে। তাই কথা না বাড়িয়ে তার সাথে চললাম। ক্লাবের পিছনে এসে মামা টিনের বেড়া, মাটি সব কিছু খুঁটিয়ে দেখতে লাগলো। আমাকে বললো, দেখ্, কোনো কিছু পাওয়া যায় কি না। খুঁজতে খুঁজতে মাটিতে কয়েকটি পায়ের ছাপ দেখে থেমে গেল মামা। ক্লাবের ভিতর যেখানে কাপটি রাখা ছিলো তার সোজাসুজি বাইরেই পায়ের ছাপগুলো। বসে ভালোভাবে দেখতে লাগলো মামা। এক জায়গায় এক ফুটের মত দূরত্বে দুটো ছোট গর্ত। মাটিতে সাদামত কিছু একটা পেয়ে হাতে তুলে নিল। আমিও ঝুঁকলাম মামার হাতের দিকে। গোল পয়সার মত জিনিসটির মাঝখানে একটি বড় ছিদ্র। মামা জিজ্ঞেস করলো, চিনতে পারছিস?
আমি ডানে বামে মাথা নাড়লাম।
মামা বললো, টিনের চালে স্ক্রু আটকানোর জন্য এটা ব্যবহার করা হয়। মিস্ত্রিদের ভাষায় এটাকে পয়সা বলা হয়। কিছুক্ষণ সেটির দিকে চেয়ে থেকে ঝানু গোয়েন্দাদের মত কিছু ভাবলো মামা। তারপর পকেটে রেখে পাশের পেয়ারা গাছে উঠে গেল এক লাফে। পেয়ারা গাছের ডাল টিনের চালে ঝুলে পড়েছে। সেই ডাল ধরে অনেক্ষণ চালার দিকে তাকিয়ে থেকে নেমে এলো। আমি কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই বললো, চল্, আর কিছু দেখার নেই। চলে এলাম মামার পিছু পিছু। ক্লাবের ভিতর তখনও লোকজন চুরির ঘটনা নিয়ে আলোচনা করছে।
ক্লাব থেকে কিছুটা দূরে এসে দাঁড়ালো মামা। আমার দিকে চেয়ে থেকে বললো, যা ভেবেছি তাই, চালার টিন খুলে উপর দিয়ে চুরিটা হয়েছে। পুরো একটি টিনও খোলেনি, মাত্র চারটি স্ক্রু খুলে টিন ফাঁকা করে কাপটা বের করে নিয়েছে। যার কারণে এটা কারও চোখে পড়েনি। আরেকটা জিনিস হলো চোর চালে ওঠার জন্য মই ব্যবহার করেছে। বেড়ার সাথে যেখানে মই লাগিয়েছে সে জায়গায় টিনের ঢেউগুলো নষ্ট হয়ে গেছে। এবং আমার অনুমান যদি সত্যি হয় তাহলে মইটার গোড়ায় কাদা-মাটি লেগে থাকার কথা। কারণ মাটিতে মই রাখার গর্ত রয়েছে।
তাহলে তো বলতে হবে অনেক চালাক চোর। বললাম আমি।
চালাক কিন্তু পেশাদার চোর নয়। কারণ কোনো সাধারণ চোরের দ্বারা এ কাজ সম্ভব নয়। যেভাবে চুরি হয়েছে তাতে মনে হয় চোর ঘর তৈরির কাজ জানে, মানে কাঠমিস্ত্রি হতে পারে। আর এটাই হবে আমার প্রধান সূত্র। এটা ধরেই এগোতে হবে।
আমি বললাম, কেউ কেউ যে আবার আশিককে সন্দেহ করছে?
মামা বললো, আশিক জড়িত থাকতে পারে আবার নাও থাকতে পারে। তদন্ত করার আগে কিছুই বলা যাচ্ছে না। জড়িত থাকলে সে কারও সাহায্য নিয়ে কাজটা করেছে।

বিকেলে ছোট মামা আমাকে নিয়ে আবার বাজারে গেল ফার্নিচারের দোকানে অনুসন্ধান চালাতে। আমাকে আগেই বলে দিল কিভাবে কাজ করতে হবে। আমার মনে হলো ফার্নিচারের দোকানে গিয়েও লাভ হবে না, কারণ দোকানের মিস্ত্রিরা যদি চুরির সাথে জড়িত থাকেও তবে তো আর কাপটি দোকানে সাজিয়ে রাখবে না। তাছাড়া মনে ভয়ও ছিলো। যদি দোকানের লোক বুঝতে পারে আমরা গোয়েন্দগিরি করতে এসেছি; কিন্তু মামার ভয়ে সে কথা বলতে পারলাম না।
কামারখালী বাজারে দুটো ফার্নিচারের দোকান। অর্ডার মতো ফার্নিচার তৈরি করে দেয় ওরা। দু’টোতেই খোঁজ নেবে মামা। প্রথমে একটিতে ঢুকলাম আমরা ডিজাইন দেখার অজুহাতে। ভিতরে অনেক কাঠ আর বিভিন্ন যন্ত্রপাতি। যুবক বয়সী দুজন মিস্ত্রি কাজ করছে। একজনের নাম রফিক, আরেকজনের হাবু। ছোটমামার সাথে তাদের আগে থেকেই পরিচয় আছে। তাদের সাথে একটু কথা বলে দোকানের মধ্যে ফার্নিচারের ডিজাইন দেখতে লাগলাম আমরা। ঘুরতে ঘুরতে দোকানের এক কোনায় কিছু একটা দেখে থেমে গেল ছোটমামা। কয়েকটা টিন লাগানোর স্ক্রু রাখা মাটিতে। মাথা নুইয়ে ভালোভাবে স্ক্রুগুলো দেখলো মামা। এবার দোকানের পিছন দিকে গেলাম আমরা। পিছনের দরজার কাছে একটা বাঁশের মই মাটিতে শুইয়ে রাখা। এক মুহূর্ত থেমে মইটাও ভালোভাবে দেখলো ছোটমামা। মিস্ত্রিদেরকে এসবের কিছুই বুঝতে দিল না। এরপর আমার দিকে ঘুরে বললো, চল্, দেখা শেষ।
দ্রুত বাইরে এলো মামা। ভীষণ উত্তেজিত দেখাচ্ছে তাকে। আমি কিছু জানতে চাওয়ার আগেই বললো, আল্লাহকে ধন্যবাদ যে প্রথম অনুসন্ধানেই সমাধান পেয়ে গেলাম। চোর ধরা এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র।
আমি জানতে চাইলাম, কিভাবে?
ছোট মামা বললো, সব বলছি। তার আগে চল ক্লাব সভাপতির বাড়িতে যাই। তাকে সব বলতে হবে।
বলতে গেলে দৌড়ে ক্লাব সভাপতি আলম শিকদারের বাড়ি এলাম আমরা। সভাপতিকে পেয়ে মামা খুলে বললো সব কথা। কিভাবে চোর ঢুুকেছে, কেন সেটা সবার চোখ এড়িয়ে গেছে এবং মামা কিভাবে খুঁজে পেয়েছে ইত্যাদি। মামার কথা শুনে ক্লাব সভাপতি তখনই ছুটলেন ক্লাবের চালা পরীক্ষা করতে। মামা তাকে ঘটনাস্থল দেখিয়ে আবার বুঝিয়ে বললো সব। শেষে স্ক্রুর সেই পয়সাটি দেখিয়ে বললো, ক্লাবের টিনে যে স্ক্রু ব্যবহার করা হয়েছে আর ফার্নিচারের দোকানের কোনায় যে স্ক্রু দেখতে পেয়েছে তা একই  ধরনের। এবং সেই চারটি স্ক্রুর একটিতে এই পয়সাটি নেই, যেটা চোরদের খোলার সময় মাটিতে পড়ে যায়। এখন দোকানে গিয়ে স্ক্রুগুলো পরীক্ষা করলেই বোঝা যাবে। কাদামাখা মইটির কথাও বললো মামা।
ছোটমামার সব কথা শুনে সভাপতি কিছুক্ষণ চুপ করে কিছু ভাবলেন। মামার যুক্তি তার মনে ধরেছে বোঝা যায়। শেষে মামাকে বললেন, তোমার কথা যদি সত্যি হয় তাহলে বলতে হবে ঐ ফার্নিচারের দোকানের মিস্ত্রিরা চুরির সাথে জড়িত। কিন্তু দোকানটির মালিক হচ্ছেন সালাম শেখ। তিনি তো আবার আমাদের ক্লাবের পরিচালনা কমিটির সদস্য। তাকে না জানিয়ে কিছু করা ঠিক হবে না। চলো আগে তার সাথে কথা বলি।
সভাপতির সাথে তখনই আমি আর ছোটমামা গেলাম সালাম শেখের কাছে। আমাদেরকে একটু দূরে রেখে সভাপতি সালাম শেখের সাথে অনেকক্ষণ কথা বললেন। পরে সালাম শেখ, সভাপতিসহ আরও কয়েকজন মিলে গেল ফার্নিচারের দোকানে। মামা যেসব প্রমাণের কথা বলেছে তারা সেসব যাচাই করে দেখলো। সবকিছু নিশ্চিত হওয়ার পর সালাম শেখ তার কর্মচারীদেরকে জিজ্ঞেস করলেন কাপের কথা। প্রথমে তারা কিছুই জানে না এমন ভাব করলো। এরমধ্যে ঘটনা এককান দু’কান হয়ে আরও লোক জমা হয়েছে সেখানে। সালাম শেখ বললেন, আমি ক্লাবের পরিচালনা কমিটির সদস্য, তোরা আমার দোকানের কর্মচারী। যদি ভালোয় ভালোয় সব স্বীকার করিস বেঁচে যাবি। নইলে আমি কিন্তু তোদের পাবলিকের হাতে তুলে দেব।
সালাম শেখের কথা শেষ হবার পর মিস্ত্রি হাবু এসে তার পা জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেললো। কারও বুঝতে বাকি রইলো না ঘটনা। ওরা স্বীকার করলো গোল্ডকাপ বিক্রি করে অনেক টাকা পাবে এই লোভে কাপ চুরি করেছে। দোকানের গদির নিচ থেকে বস্তায় মোড়ানো কাপ বের করে দিল। ক্লাবের সামনে কান ধরে উঠবস করানো হলো দুই চোরকে।
ছোট মামা ক্লাব ভর্তি লোকের সামনে গর্বের সাথে বর্ণনা করলো তার তদন্ত অভিযান। সবাই বাহবা দিল এমন একটা ঘটনা তদন্ত করে বের করার জন্য।
একটি কেসে সাফল্য পেয়ে ছোট মামার গোয়েন্দা ভাব যেন বেড়ে গেল বহুগুণ।

SHARE

1 COMMENT

Leave a Reply to hassan sabit Cancel reply