Home তোমাদের গল্প আয়েশা

আয়েশা

তাসমিয়া মেহেজাবিন (জিমি)
ঝলমলে সুন্দর আকাশ। মৃদু বাতাস বইছে। খাওয়া শেষ করে আম্মুর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে স্কুলের পথে রওয়ানা হলাম। বুকটা দুরুদুরু করে কাঁপছে। মনে হচ্ছে এই বুঝি পড়ে গেলাম। তারপরও অনেক আশা নিয়ে স্কুলে পেঁৗঁছলাম। শ্রেণীকক্ষে ঢুকে সবাইকে দেখতে পেলাম। বান্ধবীরা বললো, ‘সুবর্না আপা এসে বলে গেছে- রেজাল্ট দিতে একটু দেরি হবে’। পাশ থেকে মিমি, ফারিহা, সুমি, রোজিনা, তানিয়া এসে বললো, প্রথম হলে আমাদের কথা ভুলে যাবি নাতো?
আমি যে বেঞ্চে বসি সেখানে গিয়ে বসতেই পাশের জায়গাটার দিকে নজর পড়লো। বুকটা কেমন কেঁপে উঠলো। আজ ক্লাসরুমে সবাই আছে। শুধু ও ছাড়া। মাত্র দুই মাস আগের কথা। সব যেন চোখের সামনে ভেসে উঠতে লাগলো।
ওর নাম আয়েশা। আমার সাথে ষষ্ঠ শ্রেণীতে পড়তো। বাবা মার একমাত্র মেয়ে ছিল ও। লেখাপড়ায় ও আমার থেকে অনেক ভালো ছিল। সেই দ্বিতীয় শ্রেণী থেকেই ও প্রথম হয়ে আসছে। আমাদের সবার সাথে ওর ছিল খুব ভাব। আমরা একসাথে ঘুরতাম, খেলতাম, পড়তাম। ও যেমন হাসতে পারতো তেমনি সবাইকে হাসাতেও পারতো। এভাবেই দিন যাচ্ছিল বেশ। এর মধ্যে একদিন বার্ষিক পরীক্ষার রুটিন দিয়ে দিল। স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দিলাম। বাড়িতে পড়তে লাগলাম মনোযোগ দিয়ে। স্কুলে যেতাম না বলে আম্মু রাগ করতেন। কিন্তু আমি সঙ্কল্প করলাম যেভাবেই হোক এবার আয়েশাকে হারিয়ে প্রথম হবো। পরশু বাংলা প্রথম পত্র পরীক্ষা। খুব ভালো লাগছিল, অনেকদিন পর সবাইকে দেখতে পাবো। আবার ভয়ও করছিল কী হয় এই চিন্তা  করে। আচ্ছা, আয়েশা কি এখনও পড়ছে? ওকে হারিয়ে আমি প্রথম হতে পারবো তো? এসব আজেবাজে চিন্তায় আমার মাথা খারাপ হবার উপক্রম হলো। রাতে ঘুমাতে পারলাম না। অনেক কষ্টে রাত পার করলাম। সকালে উঠে বইতে আর একবার চোখ বুলিয়ে নিলাম।
আম্মুর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে  স্কুলের পথে রওয়ানা দিলাম। অনেক দিন পর সবাইকে দেখতে পেয়ে খুব ভালো লাগলো। ভাবলাম আয়েশার কাছে জিজ্ঞাসা করে দেখি, ও কেমন প্রস্তুতি নিয়েছে। সোনিয়ার কাছে জিজ্ঞাসা করলাম, আয়েশাকে দেখেছিস?
আয়েশা এখনো আসেনি, ছোট্ট করে জবাব দিয়ে আবার বইতে চোখ বুলায় সোনিয়া।
পরীক্ষা শুরু হতে ১৫ মিনিট বাকি। সবার কাছে আয়েশার কথা জিজ্ঞাসা করলাম। কেউ আয়েশার  কথা বলতে পারলো না। প্রতিদ্বন্দ্বী আসেনি এটা ভেবে কোথায় আমার খুশি হবার কথা, সেখানে আমার মন খুব খারাপ হয়ে গেল। পরীক্ষা শুরু হলো। কিন্তু আয়েশা আসলো না। যে মেয়ে প্রবল ঝড়-বৃষ্টি উপেক্ষা করে ক্লাস করতে আসে সে বার্ষিক পরীক্ষা দিতে আসবে না! অজানা আশঙ্কায় বুকটা কেমন কেঁপে উঠলো। পরীক্ষা শুরুর ঘণ্টা দিল। তিন ঘণ্টা কিভাবে যে পার করলাম তা বলতে পারবো না।
পরীক্ষা শেষ করেই ছুটলাম ওর বাড়ির দিকে। গিয়ে দেখি ওদের বারান্দায় শুয়ে আছে আয়েশা। আয়েশার  মা পাশে বসে ওর মাথায় জলপট্টি দিচ্ছেন। ওর আম্মার কাছে জানতে চাইলাম, আয়েশার কী হয়েছে?
ওর মা কিছু বলতে পারলো না। কিন্তু চোখ কোনো বাঁধা মানলো না। আামি আয়েশার পাশে গিয়ে বসলাম। ওর মাথায় হাত রাখলাম। দেখলাম জ্বরে ওর গা পুড়ে যাচ্ছে। আস্তে আস্তে ওর উত্তপ্ত হাত আমার হাতের উপর রাখলো। তারপর ক্ষীণকণ্ঠে বললো, মারিয়া একদিন প্রথম হবার জন্য কত চেষ্টা করতিস। তুই এবার প্রথম হতে পারবি। আজ আমি সবার কাছে হেরে গেলাম রে। লোকে তোকে কত ভালো বলবে! আমি গেলাম রে, তোরা ভালো থাকিস। ওর হাত আমার হাতের উপর থেকে খসে পড়লো। চোখ দুটো আস্তে করে বুজে গেল।
পরের পরীক্ষাগুলো দেখতে দেখতে শেষ হয়ে গেল। কিভাবে যে শেষ করলাম তা আমি নিজেও জানি না। আজ ২৫ দিনের মাথায় ফলাফল দিচ্ছে।
স্কুলের কেরানী শাহাজাহান চাচা কক্ষে প্রবেশ করতেই আমার চিন্তার জাল ছিন্ন হলো। চাচা বললো, এখনই রেজাল্ট ঘোষণা করা হবে। সবাই শহীদ মিনারের সামনে গিয়ে লাইনে দাঁড়াও। প্রথমে দশম শ্রেণী তারপর নবম শ্রেণী এভাবে একেবারে শেষে আমাদের পালা এলো। আমার বুকের মধ্যে তখন  অজানা আশঙ্কা। প্রধান শিক্ষক আবুল হোসেনের হাতে রেজাল্ট শিট। আমার চোখ বারবার সেদিকে চলে যাচ্ছে। একসময় স্যার বলে উঠলেন, এবার ষষ্ঠ শ্রেণী থেকে যারা সপ্তম শ্রেণীতে উঠেছো তাদের ফল ঘোষণা করছি। আমি মাথা তুলে উপরের দিকে তাকাবো সে সাহস হারিয়ে ফেলেছি। স্যারের কথা তখন আমার কানে অস্পষ্টভাবে প্রবেশ করছেÑ সর্বোচ্চ নাম্বার পেয়ে শুধু ষষ্ঠ শ্রেণীর নয় স্কুলের মধ্যে প্রথম হয়েছে মারিয়া মেহজাবিন। আমি আমার কানকে বিশ্বাস করতে পারছি না। রেজাল্ট ভালো হবে জানতাম  কিন্তু এত ভালো তা কল্পনাও করতে পারিনি।
রেজাল্ট নিয়ে প্রথম গিয়ে আয়েশার কবরের পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম। শুকনো পাতাগুলো কেমন পায়ের তলায় পড়ে শব্দ করছিল। আমার চোখ থেকে দু’ফোটা অশ্র“ গাল বেয়ে নিচে পড়লো। আমি যেন শুনতে পাচ্ছি, আয়েশা আমাকে বলছে, মারিয়া, তোমাকে অভিনন্দন।

SHARE

1 COMMENT

Leave a Reply