Home সায়েন্স ফিকশন জৈব রোবট

জৈব রোবট

রেদোয়ান শাহ
আসরের নামাজ শেষে মসজিদে থেকে বেরিয়ে এলো শাওন, আহাত আর হাবিব। হাঁটতে শুরু করল এরা তিনজন। থানা-বাইপাস সড়ক ধরে কিছুক্ষণ হেঁটে ওরা এসে বসল রাস্তার পাশের ছোট একটা মাঠে। এরা তিনজনই রামগঞ্জ সরকারি কলেজের ছাত্র। বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র হওয়ার কারণে তিনজনের মধ্যে অনেক মিল। তারা থাকেও এই থানা শহরে। পাশাপাশি তিনটি ফ্ল্যাটে। বসে বসে গল্প করার ফাঁকে চারপাশে তাকাল আহাত। দক্ষিণ দিকে একটি বাড়ি, নাম নূর মঞ্জিল। উত্তরে আরও একটি বাড়ি। খুবই পুরনো। এ বাড়ি দেখে অবাক হলো আহাত। কতদিন ধরে রঙ করা হয় না কে জানে। বাড়ির প্লাস্টার প্রায় সবটাই খসে পড়ে গেছে, তাই রঙ করার প্রশ্নই আসে না। একটু দূরে পূর্ব-পশ্চিম দিকে বিস্তৃত একটি পুল। চিকন খালের ওপর দিয়ে তৈরি পুলটিতে ভদ্রমত এক ব্যক্তি হেলান দিয়ে দাঁড়ানো। এক দৃষ্টে লোকটি চেয়ে আছে পুরনো বাড়িটির দিকে। আবার আড়চোখে মাঝে মাঝে তাদের দিকে তাকাচ্ছে। লোকটার চেহারা ভালো করে দেখে নিলো সে। হঠাৎ করে খেয়াল হলো বাড়িটার ভেতর থেকে নানা ধরনের শব্দ বের হয়ে আসছে। মনে মনে ভাবল সে, বাড়িটিতে বুঝি মেরামতের কাজ চলছে। একসময় তার দৃষ্টি গেল রাস্তার দিকে। সেখানে একটি রিকশা দাঁড়ানো। রিকশা থেকে তাদের কলেজের জীববিজ্ঞান শিক্ষক মোহাম্মদ মোহসিনকে নামতে দেখে অবাক হয় আহাত। কিছুক্ষণ পর আবার চমকে ওঠে উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগের জনাব মোতাহার হোসেনকে পুরনো বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেতে দেখে। সে তার দুই বন্ধুকে কথাটা বলল। তারা পেছনে ফিরে দেখলো মোতাহার স্যার তাদের দিকেই এগিয়ে আসছেন। উঠে দাঁড়াল তারা। স্যারকে সালাম দিলো হাবিব। সালামের উত্তর দিয়ে স্যার মুচকি হাসলেন। বললেন, এখানে কী করছ তোমরা? শাওন বলল, সময় পার করছি স্যার। এখানে আসা তোমাদের উচিত হয়নি। এখান থেকে চলে যাও, আর যেন এখানে না দেখি তোমাদের। স্যারের আদেশ বলে কথা। অনিচ্ছা সত্ত্বেও হাঁটা শুরু করল তিনজন। পথে আহাত চিন্তা করল কেনইবা স্যার ঐ পুরনো বাড়িতে গেলেন, আর কেনই বা তাদের সেখান থেকে চলে আসতে বললেন।
পরদিন কলেজে এসে খবরটা শুনল হাবিবÑ তাদের উদ্ভিদবিদ্যার প্রফেসর মোহসিনকে কে বা কারা খুন করেছে। একই সথে নিখোঁজ হয়েছেন প্রফেসর জিসান সরকার। খবরটা শুনার সাথে সাথে হাবিব দেখা করল আহাতের সাথে। আহাত আর শাওন বসে বসে কথা বলছে ক্লাস রুমের ভেতর। ওদের মুখের ভাব দেখেই হাবিব বুঝল কথাটি তারা আগেই শুনেছে। তার ঠিক দশ মিনিট পর ক্লাসে প্রবেশ করল চারজন পুলিশ। অফিসার মনির হোসেন জিজ্ঞাসা করলেন, হাবিব, আহাত আর শাওন কে? তিনজনই একে অপরের দিকে তাকিয়ে ঢোক গিলল। বলল আমরা। অফিসার বললেন, তোমরা বাইরে এসো। বাইরে আসার পর তাদেরকে নিয়ে গাড়িতে চড়ে বসল পুলিশেরা। চলল থানার দিকে। থানায় ঢুকে একটা রুমে নেওয়া হল তাদেরকে। সেখানে আগে থেকেই অপেক্ষা করছিলেন ইন্সপেক্টর। চেহারা দেখে বুঝা গেল রেগে টঙ হয়ে আছেন তিনি। সরাসরি হাবিবদের বললেন, দুই দিন আগে তোমরা নূর মঞ্জিলের পাশের বাড়ির কাছে বসে আড্ডা দিয়েছ, তাই না? ওরা মাথা নেড়ে সায় জানাল। ইন্সপেক্টর বললেন, তোমাদের স্যার মোহসিন হোসেন খুন হয়েছেন সেই পুরনো বাড়িতে।
রুমে ঢুকলেন মোতাহার স্যার। বললেন, যা অনুমান করেছি ক্ষতির পরিমাণ তার চেয়েও বেশি। খুনি আমাদের প্রজেক্টের ব্লু-প্রিন্ট চুরি করে নিয়ে গেছে। একটু থেমে আবার বললেন, পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে কি কোন আলামত উদ্ধার করতে পেরেছে? উপরে-নিচে মাথা নেড়ে অফিসার জানালেন, হ্যাঁ, চলুন আপনাদেরকে ক্লুগুলো দেখাই।
অফিসার আর ইন্সপেক্টরের পিছু পিছু থেকে তারা অন্য একটি রুমে প্রবেশ করলেন। অফিসার একে একে কয়েকটি ক্লু দেখালেন তাদেরকে। তার মধ্যে আছে ফিতা ছেঁড়া একটি হাতঘড়ি আর একটি কলম। কলমটা মার্কার পেনের মত হলেও সেটি মার্কার পেন নয়। তার নিবের জায়গায় একটা সরু সুঁই। অর্থাৎ সেটি একটি ড্রাগ নিডল। এর ভেতর রয়েছে কড়া মাত্রার সোডিয়াম সায়ানাইড, যা কি না তীব্র বিষ। এই ড্রাগ নিডল দিয়ে খোঁচা মেরেই  মোহসিন স্যারকে হত্যা করা হয় বলে পুলিশের ধারণা। অফিসারের দেখানো হাতঘড়িটার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে আহাত বলল, হত্যাকারীকে আমি চিনতে পেরেছি। সব ক’টা চোখ ওর দিকে ঘুরে গেল ঝট করে। খুলে বলল আহাত। যে বাড়িটাতে স্যার খুন হয়েছেন সে বাড়িটার ওপর নজর রেখেছিল কে বা কারা। পরে তারাই সে বাড়িতে হানা দিয়ে স্যারকে খুন করে এবং প্রজেক্টের ব্লু প্রিন্ট চুরি করে নিয়ে যায়।
মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়েন মোতাহার স্যার। বলেন যে তার প্রজেক্টটি ছিল জৈব রোবট তৈরির। শেষে তিনি যোগ করলেন, মনে হয় কোন বিদেশী গুপ্তচর চক্র তাদের পেছনে লেগেছে। কথাটা শুনে ভড়কে গেলেন পুলিশ অফিসার। সেদিনই তারা যোগাযোগ করলেন ইন্টেলিজেন্স ব্রাঞ্চের সাথে।
একদিন পর। কলেজের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে রাস্তায় নামলো শাওন। কিছুক্ষণ হাঁটার পর কালো রঙের একটি মাইক্রোবাস থামল তার বাম পাশে। ঝটপট করে চারজন লোক নামল তা থেকে। টেনে হিঁচড়ে মাইক্রোবাসে তোলা হলো শাওনকে। মুখে রুমাল চাপা দিলো একজন। একটা মিষ্টি গন্ধ ঢুকলো শাওনের নাকে। অজ্ঞান হয়ে গেল সে। মাইক্রোটি ছুটে চলল তার গন্তব্যের দিকে।
জ্ঞান ফিরে পাওয়ার পর উঠে বসতে চাইল শাওন। কিন্তু বিছানার সাথে শক্ত করে বাঁধা বলে উঠতে পারল না সে। কিছুক্ষণ পর খুলে গেল দরজা, রুমে ঢুকলো দু’জন লোক। কালো পোশাক পরা এমনকি মাথার হ্যাটও কালো। চেহারায় ভিনদেশী লোকের ভাব। পকেট থেকে ছুরি বের করে দড়ি কাটল তারা। তারপর তাকে উঠিয়ে ঠেলে নিয়ে চলল। বড় একটি রুমের সামনে থামল তারা। লোকগুলো দরজায় টোকা দিলো। ভেতর থেকে খুলে দেওয়া হলো দরজা। ভেতরে ঢুকেই চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল শাওনের। কারণ তার আরেক প্রিয় বন্ধু হাবিবকেও অপহরণ করেছে তারা। চেয়ারে বসানো হলো শাওনকে। ইংরেজিতে তাদের প্রশ্ন করে চলল লোকগুলো। শেষে জিজ্ঞাসা করল, তাদের সম্পর্কে কতটুকু জানে শাওনরা। প্রায় ঘণ্টা তিনেক পর তাদেরকে অন্য রুমে নিয়ে এল লোকগুলো। বাইরে থেকে তালা মারল লোকগুলো। তবে এবার আর তাদেরকে বাঁধা হলো না।
মনে মনে ভাবল শাওন, মোহসিন স্যারের খুনিরা এবার তাদের পেছনে লেগেছে।
দুইজন বন্ধু নিখোঁজ হওয়ার পর খুবই টেনশনে আছে আহাত। রাস্তায় হেঁটে হেঁটে আনমনে চিন্তা করছিল সে। এমন সময় ওই লোকটাকে দেখতে পেল। মনে মনে ভাবল তার বন্ধুদের হয়তো এ ব্যাটাই কিডন্যাপ করেছে। সিদ্ধান্ত নিলো সে লোকটাকে অনুসরণ করবে। নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রেখে লোকটার পেছনে লাগল সে। লোকটাকে প্রকাণ্ড একটা বাড়িতে ঢুকতে দেখল সে। ফিরে এসে পুলিশকে বলল যে স্যারের খুনির সন্ধান পেয়েছে সে। তাকে সাথে নিয়ে বাড়িটা ঘিরে ফেলল পুলিশ। ভেতরে পাওয়া গেল ৯ জন বিদেশী লোক। বাড়িটি থেকে উদ্ধার করা হয়েছে শাওন আর হাবিবকে। পুলিশ তল্লাশি চালিয়ে উদ্ধার করেছে জৈব রোবট প্রযুক্তির ব্লু-প্রিন্ট যা চুরি হয়ে গিয়েছিল। খবর শুনে খুবই খুশি হলেন মোতাহার স্যার। মিষ্টির প্যাকেট নিয়ে হাজির হলেন থানায়। মোতাহার স্যার ঘোষণা দিলেন, এখন থেকে হাবিবরা এই প্রজেক্টের সাথে জড়িত হয়ে স্যারদের সাথে কাজ করবে।

SHARE

3 COMMENTS

Leave a Reply