Home সাহসী মানুষের গল্প বিরল সৌভাগ্যবান

বিরল সৌভাগ্যবান

কায়েস মাহমুদ

সেই এক জীবন বটে!
কী ঝলমলে দিন!
কী সোনামাখা রোদ!
জীবন তো নয়, যেন জোছনার প্লাবন!
ছেলেটির বয়স মাত্র দশ বছর।
যেমন তার স্বাস্থ্য, তেমনি সুন্দরের আলোয় উজ্জ্বলতার চেহারা।
টগবগে এক বালক।
মদিনার ঘরে ঘরে চলছে এক অন্যরকম উৎসবের আয়োজন। রাস্তাঘাটেও তার ঢল নেমেছে।
ব্যাপার কী?
উৎসুক বালক। চেয়ে থাকে বড়দের হাসি খুশি ভরা মুখের দিকে। জানার চেষ্টা করে উৎসবের কারণ।
এক সময় জানতে পারে।Ñ
জানতে পারে আসছেন, আসছেন আলোকের সভাপতি, ধবল জোছনার সম্রাট মহানবী (সা)। তিনি আসছেন মক্কা থেকে হিজরত করে মদিনায়। তাঁরই জন্য উদগ্রীব মদিনাবাসী। তাঁরই জন্য পুলকিত মদিনার আকাশ-বাতাস। বৃক্ষতরু খেজুর বাগান। পাহাড়-পর্বত এবং মরুভূমির প্রতিটি ধূলিকণা।
গোটা পরিবেশ যখন উৎসবমুখর, তখন তাতে যোগ দিয়েছে ছোটরাও। দলে দলে ছোট্ট কচিপ্রাণ-সোনামুখ ছেলেমেয়েরা আনন্দে বিভোর। গান গাচ্ছে বুলবুলির মত পথে পথে জটলা পাকিয়ে। দল বেঁধে। ছোট্ট বালকও আর স্থির থাকতে পারলো না।
সেও এখন ছোট ছোট জোছনার কুঁচিদের মাঝে। সেও সামনে পুলকিত। শিহরিত।
ভাবছে বালক। কেবলই ভাবছেÑ আহ! কী সৌভাগ্য আমাদের। রাসূল আসছেন! তিনি আসছেন আমাদের মাঝে! এর চেয়ে আনন্দের খবর আর কী হতে পারে!
এক সময় আসলেন তিনি।Ñ
মদিনার রাস্তায় পা রাখলেন দয়ার নবীজী (সা)।
তখনকার দৃশ্যতো আর ভাষায় প্রকাশযোগ্য নয়!
কী যে আনন্দ ও আবেগঘন মদিনার প্রতিটি প্রান্তর! ছোট্ট ছেলেমেয়েরা গানের সুরে সুরে সাদর স্বাগত জানাচ্ছে নবীকে (সা)।
তাদের সাথে দিয়েছে দশ বছরের বালকটিও।
সবার কণ্ঠেই মিষ্টি মধুর সুর ভেসে যাচ্ছে। ভেসে যাচ্ছে ক্রমাগত বাতাসের পর্দা ফাঁক করে দূরে, বহু দূরেÑ
তালাআল বাদরু আলাই না…
মদিনার কে না জানে, রাসূল (সা) তাদের সাথে এসেছেন!
তবুও আবেগের বাতাসে দোল খেতে খেতে ছোটরা গানের সুরে সুরে মদিনার প্রতিটি গৃহে পৌঁছে দিচ্ছে রাসূলের আগমনের আনন্দবার্তা।
রাসূল (সা) মদিনায় পা রাখতেই মুহূর্তেই সজীব হয়ে উঠলো গোটা মদিনা। যেন প্রাণ ফিরে পেল মদিনা। এ যেন বহু প্রতীক্ষার পর স্বস্তির বৃষ্টি!
রাসূলের (সা) চারপাশে মানুষের ঢল। সে ঢল বন্যার চেয়েও প্রবল।
এক সময় ভিড় কমে এলো।
রাসূলও (সা) একটু সময় নিয়ে স্থির হলেন।
তিনি বিশ্রাম নিচ্ছেন। ঠিক এমনি এক চমৎকার সময়ে রাসূলের (সা) কাছে এলেন একজন মহিলা। এক হাতে ধরে রেখেছেন একটি বালককে।
বড় আদরে।
বড় মমতায়।
রাসূল (সা) বুঝলেন, ইনি বালকটির মা।
এবার মা ধীরে, খুব ধীরে রাসূলকে (সা) বললেন, হে দয়ার নবী (সা)! আপনি মদিনায় আসার সাথে সাথেই আনসারদের প্রত্যেক নারী-পুরুষ আপনাকে কিছু না কিছু উপহার দিয়েছে। আমি গরিব, অত্যন্ত গরিব মানুষ। আপনাকে কী আর দেবো! কিন্তু আপনাকে একটা কিছু উপহার দেবার জন্য মনটা বড় ব্যাকুল হয়ে আছে। মনের ভেতর উথাল-পাতাল ঢেউ বয়ে চলেছে। আপনাকে দেবার মতো কোনো বিষয়-সম্পত্তি নেই আমার। আছে কেবল আমার কলিজার টুকরো, নয়নের মণি ছেলেটি। নিন, নিন দয়ার নবী (সা)! তাকেই আপনার হাতে উপহার হিসেবে তুলে দিচ্ছি। ছেলেটি লিখতে পারে। আপনার কাজেও সাহায্য করতে পারবে। যদি খুশি হয়ে একে গ্রহণ করেন, তাহলে আমার তৃষিত বুকটাও শান্ত হবে।
এ এক বিরল উপহার!
অসমান্য উপহার!
যে উপহারের কোনো তুলনা হয় না।
রাসূল (সা) খুশি হয়ে বালটিকে কাছে টেনে নিলেন। আদর করলেন।
তারপর।Ñ
তারপর থেকেই বালকটি রয়ে গেল রাসূলের (সা) কাছে। রাসূলের (সা) একান্ত সান্নিধ্যেই সময়, দিন ও কাল কাটে বালকটির। রাসূলের (সা) একান্ত কাছে পিঠে থাকতে পেরে সেও দারুণ খুশি। যেন আকাশের চাঁদ পেয়েছে। যেন মহাসাগর পেয়েছে। পেয়ে গেছে পৃথিবীর তাবৎ মহা মূল্যবান সম্পদ।
তার খুশির কোনো সীমা নেই।
দিন যায়। মাস যায়। বছরও যায়।
রাসূলের (সা) কাছেই আছে সে।
রাসূলের (সা) সকল প্রয়োজনেই আছে সে।
রাসূলের (সা) খেদমতেই নিয়োজিত রেখেছে নিজেকে।
এভাবেই তো কেটে গেল একে একে দশটি বছর।
বালক থেকে কিশোর। কিশোর থেকে এখন সে দুরন্ত এক যুবক। তার কণ্ঠেই একদিন শোনা গেল : ‘আমি দশ বছর যাবৎ একাধারে রাসূলকে (সা) খেদমত করেছি। এই দীর্ঘদিনের মধ্যে, কোনো দিন কিংবা কখনোই রাসূল (সা) আমাকে মারেননি। গালি দেননি। বকাঝকা করেননি। এমনকি মুখ কালোও করেননি! রাসূল (সা) আমাকে নিয়েই, সেই প্রথম দিন যে কথাটি বলেছিলেন, সেটি হলোÑ ‘তুমি আমার গোপন কথা গোপন রাখবে। তা হলেই তুমি ঈমানদার হবে।’ আমি রাসূলের (সা) এই নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছি। অন্য কারো কাছে তো দূরে থাক, আমার মাকে পর্যন্তও কখনো রাসূলের (সা) গোপন কথা বলিনি।’
রাসূলও (সা) তাঁর জন্য প্রাণ খুলে দোয়া করতেন। তাকে অনেক, অনেক বেশি আদর ও স্নেহ করতেন।
একবার রাসূল (সা) তার জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করলেনÑ ‘হে আল্লাহ! তার ধন-সম্পত্তি এবং সন্তান-সন্ততিতে সমৃদ্ধি দান করুন। এবং তাকে জান্নাতে প্রবেশ করুন।’
রাসূলের (সা) দোয়া বলে কথা!
রাসূলের (সা) প্রতিটি দোয়াই আল্লাহপাক কবুল করেছেন।
একদিনের সেই বালকটি বড় হয়ে রাসূলের (সা) সান্নিধ্যে থেকে নিজেকেও গড়ে, তুলেছিলেন একজন যোগ্য মুমিন হিসাবে। যার মধ্যে ছিল ঈমান, আল্লাহভীতি, রাসূলপ্রেম, সাহস, দক্ষতা, ক্ষিপ্রতা, নমনীয়তা, ভদ্রতা, কোমলতা এবং ধৈর্যের অসীম গুণ।
রাসূলের (সা) কাছ থেকে শিখেছিল সকল আদব-কায়দা, সুন্দর আচরণ। ‘উত্তম নৈতিকতা জান্নাতের কাজ’Ñ রাসূলের (সা) এই কথা তিনি সকল সময় মেনে চলতেন।
আর এ জন্যই তো তিনি পারিশেষে পরিণত হয়েছিলেন সোনার মানুষে। এই বিরল সৌভাগ্যবান জান্নাতি আবাবিলের নামÑ
আনাস, আনাস ইবন মালিক (রা)।
রাসূলের (সা) পরশে তার জেগেছিল প্রাণ। সফল এবং মহৎ হয়েছিল জীবন।
তার মত এমনি ভাগ্য, এমনি জীবনÑ সে যে বড় কামনার। বড়ই লোভনীয়!
এসো, আমরাও তার মতো জীবন গড়ার চেষ্টা করি।

SHARE

1 COMMENT

Leave a Reply