Home স্মরণ স্মৃতির আয়নায় মল্লিক ভাই

স্মৃতির আয়নায় মল্লিক ভাই

গাজী এনামুল হক

মল্লিক ভাই আর আমাদের মাঝে নেই! এটা ভাবতেই পারিনে কোনোভাবেই। ১ রমজান ১২-৮-২০১০ তারিখে রাত ১২-৩০টার পরে দীর্ঘ রোগ ভোগের পর আশির দশকের একদল বিশ্বাসী কবিদের সিপাহসালার দরবেশ কবি মতিউর রহমান মল্লিক ইহলোকের মায়া ত্যাগ করে পরপারের অনন্ত জীবনের কোলে ঠাঁই নিয়েছেন। অনেকের মতোই আমিও কবিকে মল্লিক ভাই বলে ডাকতাম। মল্লিক ভাইয়ের ইন্তিকালের খবরটি পাই একই সাথে পর পরই বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব শেখ আবুল কাশেম মিঠুন ভাইয়ের পাঠানো মোবাইলের ম্যাসেজে, মালিক আবদুল লতিফ ভাইয়ের মুঠো ফোনে এবং যশোরের তরঙ্গ শিল্পী গোষ্ঠীর সাবেক পরিচালক আমিরুল ইসলামের কাছ থেকে।
মল্লিক ভাইয়ের সাথে আমার প্রথম দেখা হয় ১৯৮০ সালের প্রথম দিকে। যশোরের ঐতিহ্যবাহী গাজীর দরগাহ মাদরাসায় ইসলামী ছাত্র আন্দোলনের এক শিক্ষাশিবিরে। তখন আমি সবেমাত্র বাম রাজনীতির অন্ধকূপ থেকে বেরিয়ে এসে হেরার আলোকের পথের নতুন পথিক। আমার ভেতরে তখন নতুন উদ্দীপনা, নতুন স্বপ্ন- এমন মাহেন্দ্রক্ষণে মল্লিক ভাইয়ের কাছে নিয়ে আমাকে পরিচয় করিয়ে দিলেন আমার দ্বীনী জীবনের আর এক অভিভাবক মো: আবুল কাশেম ভাই। যিনি বর্তমানে অর্থনীতির অধ্যাপক। আমি লেখালেখি করি, গান লিখি, গান গাই শুনে মল্লিক ভাই বসা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে আমাকে তাঁর বুকের মাঝে জড়িয়ে ধরে ‘মারহাবা মারহাবা’ বলে উল্লাস করে বুকের মধ্যেই চেপে রাখলেন। আমার যেন মনে হচ্ছিল আমি সাহিত্য সংস্কৃতিতেও নতুন জীবন ফিরে পেয়েছি। আমি অনুপ্রাণিত হচ্ছিলাম, পুলকিতও। তারপর ৩১ বছর ধরে মল্লিক ভাইয়ের সাথে প্রদর্শনিহীন নিবিড় সম্পর্ক, আলাপ-আলোচনা, পরামর্শ, নির্দেশনা, কবির সুখ-দুঃখের কথাসহ জাতির জন্য তাঁর উৎকণ্ঠিত হৃদয়ের ব্যাকুল প্রত্যাশার নীরব সাক্ষী হয়ে আমি তাঁর দু’একটি স্মৃতি লিখবার জন্য তড়পাচ্ছি।
মল্লিক ভাই গান রচনা করতেন নিছক নিজের মনের খেয়াল খুশি বা নিজের সাহিত্য রসনা বিলাসের জন্য নয় বরং সময়ের দাবি মেটাতে, পথ হারাদের পথ দেখাতে, ঘুমন্ত মুসলিম বিবেককে ইসলামী বিপ্লবের সত্যিকার যথার্থ চেতনায় উজ্জীবিত করার জন্য। শুধু তিনি এ গান লিখতেন না বরং সারাদেশ সফর করে তাঁর হাতে গড়া সংস্কৃতিকেন্দ্রের সদস্যদের মাঝে এসব গান নিজে গেয়ে শোনাতেন।
আমি বাম রাজনীতির রাহুমুক্ত হয়ে ৮ বছর পর আবার লেখাপড়া শুরু করে ১৯৮২তে ইন্টারমিডিয়েট পাস করে তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন ১ম বর্ষ অনার্সে ভর্তির অপেক্ষায় ঢাকাতেই কলাবাগানের বশির উদ্দিন রোডের একটি মেসে থাকি, হক প্রিন্টার্সের মালিক সিরাজ ভাই আর আমি এক খাটে। আর এক রুমে থাকতেন সাংস্কৃতিক সংগঠক আমাদের সবার প্রিয় ওবায়েদ ভাই। মনে পড়ছে, মল্লিক ভাইয়ের একটি গান শুনে দেখতাম ঢাকা মহানগরীর বিভিন্ন প্রোগ্রামে তাঁর ভক্তরা হাউমাউ করে কান্নাকাটি করতো, আমিও কাঁদতাম। মল্লিক ভাইয়ের স্মৃতি লিখতে গিয়ে নিজের প্রসঙ্গ বেশি এসে যাচ্ছে। আসলে মল্লিক ভাইয়ের একটি অনুপ্রেরণাতেই হাজারো স্বপ্নের প্রত্যাশার ফুল ফুটতো গোলাপের বনে।
বাংলা সাহিত্যে আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামসহ আরও অনেকে ইসলামী গান রচনা করেছেন, গেয়েছেন এবং সে সব গানও উত্তীর্ণ মানের হলেও কিছু সঙ্গীত প্রিয় মানুষের মনে ছাড়া তা আপামর জনগণের মাঝে স্থায়ীভাবে প্রভাব ফেলতে পারেনি। কারণ তাঁরা সর্বোত্তীর্ণ মানের ইসলামী গান সঙ্গীত রচনা করলেও ঐসব ইসলামী গান সঙ্গীত প্রচারের আন্দোলন বা কোনো সংগঠন সৃষ্টি করে যেতে পারেননি। কিন্তু মল্লিক ভাই ইসলামী গান রচনা, সুর করা ও গাওয়াটাকেও দ্বীনের অংশ মনে করে ইবাদত বিবেচনায় জাহেলি সংস্কৃতির মরণ ছোবল থেকে নতুন প্রজন্মকে বাঁচাবার জন্য একটি ইসলামী সাংস্কৃতিক বলয় সৃষ্টির লক্ষ্যে নিজের হাতেই ‘সাইমুম শিল্পী গোষ্ঠী’ প্রতিষ্ঠা করেন ও সারাদেশে জেলায় জেলায়, থানায় থানায়ও বিভিন্ন নামে শিল্পীগোষ্ঠী প্রতিষ্ঠা করেন এবং প্রতিষ্ঠায় উদ্বুদ্ধ করেন ও প্রত্যক্ষভাবে সহযোগিতা করেন। বাংলা সাহিত্য সংস্কৃতিতে ইসলামী সাংস্কৃতিক সংগঠক ও আন্দোলনের এক বাক্যে এই মহানায়কের নাম কবি মতিউর রহমান মল্লিক।
মল্লিক ভাই আমাকে কখনও এনাম ভাই কখনও গাজী ভাই সম্বোধন করতেন আবার কখনও যশোরের এক শ্রেষ্ঠ সন্তান সংস্কারক আল্লাহর এক প্রিয়ভাজন অলির নামকরণে আমাকে ডাকলে লজ্জায় বিনম্রতায় ও আমার ক্ষুদ্রতা ও দীনতায় আমি মাথানত করে নিজেকে ভেতরে ভেতরে শুধরাতাম। মল্লিক ভাই দেখা হলেই আমার সাথেই সব বলতেন এনাম ভাই, সাহিত্য সাংস্কৃতির চর্চা, লেখা ইবাদত মনে করেই করতে হবে। এবং প্রতিদিনই কিছু না কিছু লিখতেই হবে। লিখতে চেষ্টা করতে হবে। নইলে আল্লাহর কাছে জবাব দিতে পারবেন না কিন্তু। আমার আইন পেশাসহ রাজনৈতিক ও কর্ম জীবনের অন্যান্য শত ব্যস্ততার মাঝে যেটুকু লেখালেখি চালু আছে তা মল্লিক ভাইয়ের অনুপ্রেরণা, নজরদারি ও চাপাচাপির ফল বই আর কিছুই নয় তা অকপটে স্বীকার করতেই হবে। মল্লিক ভাইয়ের সাথে কখনও দেখা সাক্ষাৎ আলোচনা হলে প্রায়ই আল কুরআনের দু’টি আয়াতাংশ “ওয়াকউদু লাহু কুল্লা মারছদ” এবং “ফাসতাবিকুল ভাইরাত” উল্লেখ করে জাহেলি অপসংস্কৃতির ঘাঁটিতে ইসলামী সাংস্কৃতিক আন্দোলন দিয়ে আঘাত করার জন্য ও প্রতিযোগিতামূলকভাবে ইসলামী সংস্কৃতিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য দরদভরা কণ্ঠে অনুরোধ করতেন সবাইকে ও বারবার তাগিদ দিতেন।
অধিকাংশ কবিরা একটু স্বপ্রচার প্রত্যাশী হয়। কিন্তু মল্লিক ভাই এ ব্যাপারে ছিলেন একেবারেই ব্যতিক্রম। এ কারণেই তাঁকে অন্তরালবর্তী কবি হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন অনেকে। পৃথিবীর প্রতি চরম নির্মোহতা, সংসারের ব্যাপারে উদাসীনতা ও পার্থিব লোভ লালসামুক্ত মানুষটি হচ্ছেন কবি মতিউর রহমান মল্লিক ভাই। ইচ্ছা করলেই নিজের লেখা গান দিয়ে অনেক ব্যবসা-বাণিজ্য তিনি করতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা করেননি। বরং তাঁর গান প্রকাশিত হওয়ার সাথে সাথে তিনি সেটাকে আর নিজের ব্যক্তিগত বিষয় বিবেচনা করেননি। মল্লিক ভাইয়ের গানের গলাটা আমার কাছে সুর যেমন তাঁর মোহনীয় তার থেকেও বেশি মোহনীয় তাঁর কণ্ঠের অকৃত্রিম দরদ। মল্লিক ভাইয়ের কুরআন তেলাওয়াতের স্টাইলটা আমার কাছে একেবারেই নতুন লাগতো। এমনভাবে বা সুরে আমি আর কাউকে কুরআন তেলাওয়াত করতে দেখিনি বা শুনিনিÑ যেন কোনো মিষ্টি পাখির গলা।
মল্লিক ভাইয়ের দুটি কিডনিই নষ্ট হয়ে গেছে এমন খবর যখন যশোরে বাসায় বসে শুনলাম তখন আমি নিজেও অসুস্থ। গলায় অপারেশন হয়েছে, কথা বলতে কষ্ট হয় তাই অনেকদিন ঢাকায় যাওয়া হয়নি। সুস্থ হওয়ার পর ঢাকায় গিয়ে মল্লিক ভাইকে ইবনেসিনায় প্রথম যেদিন দেখতে গেলাম, কেবিনে ঢুকেই দেখতে পেলাম অসুস্থ কবি কাত হয়ে শুয়ে আছেন যেন শীর্ণ এক দেহ আর কাতর তাঁর চোখের চাহনি। কিন্তু আমাকে দেখেই তাঁর চির স্বভাবের মতন নিজের হাজার কষ্ট বেদনা রোগ যন্ত্রণা গোপন করে শায়িত অবস্থায় দুহাত বাড়িয়ে আর্ত কণ্ঠে চেঁচিয়ে উঠলেন, ওরে আমার পীর সাহেব এসেছে রে! আমি বেডের কাছে গিয়ে পাশে বসে শায়িত মল্লিক ভাইয়ের মাঝে মুখ গুঁজে কেঁদে দিয়ে বললাম, হায় আল্লাহ! আমার মুরব্বি, আমার অভিভাবক তাঁর শাগরেদকে কয় পীর! আল্লাহ তুমি মল্লিক ভাইকে মাফ করে দাও। মল্লিক ভাইয়ের কাছে বেশ কিছু সময় থেকে কিছু পরামর্শ নিয়ে দোয়া চেয়ে ও দোয়া করে ছলছল চোখে সেদিন ফিরে এসেছিলাম। তার কয়েকদিন পর আমার যেদিন ৫২ বছর বয়স পূর্ণ হলো সেদিন ‘বায়ান্ন’ শিরোনামে কবিতা লিখে মল্লিক ভাইকে নিবেদন করেছিলাম। কবিতায় লিখেছিলামÑ ‘আজ বায়ান্ন পার হয়ে যায়/সংগোপনে/আড়াল করে/পাশ কাটিয়ে/কষ্টগুলো/স্বপ্ন বোঝাই জীবন ডিঙি/কাঁপছে দেখ উথাল পাথাল নদীর স্রোতে,/এই মনে হয় ডুবলো/আবার ভাসছে কেমন আশার ছলে।/জীবনটাতো/জোয়ার-ভাটা/খেলছে নিয়ে/বাঁক ফেরানো ভাগ্যলিপি/হায় আল্লাহ!/কেউ কি জানো?/‘আবর্তিত তৃণলতার’ কবি এখন/করুণ চোখে রয় তাকিয়ে/ইবনে সিনায় কাল অসুখে!/তাঁর গোনাহ সব/মাফ করে দাও,/ওগো প্রভু!/মাফ করে দাও অসুখ যত/হৃদয় ভরা/কষ্ট যত/দূর করে দাও/দীনের নকিব-তমুদ্দুনের।/আবার গেয়ে উঠুক-/‘পাখির কলতানে’- ‘নেই কেহ নেই আল্লাহ ছাড়া/লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু।/এইটুকু চাই জন্মদিনে।’
কিন্তু মল্লিক ভাই আমাদের মাঝে আরও অনেকদিন বেঁচে থাকুক সেই স্বপ্ন আমার পূরণ হয়নি। স্রষ্টার অমোঘ নিয়মে তাঁকে চলে যেতে হয়েছে পরপারের অনন্ত জীবনে। তাই আজ মল্লিক ভাইয়ের জন্য একটাই দোয়াÑ হে আল্লাহ! তুমি মল্লিক ভাইকে কবুল কর। তাঁকে মাফ করে দাও। তাঁকে জান্নাতুল ফেরদাউসের অতিথি হিসেবে বরণ করে নাও। আর আমরা যেন তাঁর রেখে যাওয়া কাজগুলি এগিয়ে নিয়ে যেতে পারি জাতির জন্য, দেশের জন্য, সর্বোপরি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য।

SHARE

1 COMMENT

Leave a Reply