Home গল্প এক টুকরো আলো

এক টুকরো আলো

মাহফুজুর রহমান আখন্দ

শরতের শেষ বিকেল। রোদের খিটমিটে মেজাজটা লুকিয়ে ফেলেছে সাদা মেঘের আড়ালে। কাশফুলের মতো পরিবেশটা নরম করে দিয়ে গেল এক পশলা ব্যস্ত বৃষ্টি। শিউলি ডালে ঝুলে থাকা কুঁড়িগুলো ফোটার প্রস্তুতি নিচ্ছে। ওরা রাতের আলিঙ্গনেই লাল পেড়ে সাদা শাড়ি পরে পরীর মতো মেলে দেবে কোমল ডানা। সবুজ কুঁড়ির মধ্যে ফুলের আগাম বার্তা ঝলসে উঠলেও রোহানের জীবনের রঙটা ক্রমশ বিবর্ণই হয়ে যাচ্ছে।
মনটা আজ ভীষণ খারাপ রোহানের। কালবোশেখির কালো হাতির মতো মেঘগুলো থুবড়ে পড়েছে ওর কোমল মনে। পাঁচ দিনের কাজ শেষ হলেও টাকাটা এখনও হাতে পায়নি সে। সাত দিন না হলে নাকি টাকা দেওনের নিয়ম নাই। ‘শালার আইনরে; গরিব মারা আইন। পেটে ভাত নাই, ওষুধ কেনার পয়সা নাই, আর শালার আইন বানাইছে।’ একা একা বিড় বিড় করে কথাগুলো আওড়াচ্ছিল সে। কিন্তু কে শোনে কার কথা। সূর্যের সাথে সাথে ওর কথাগুলোও হারিয়ে যাচ্ছে অজানা কোন দূরে-বহুদূরে। গোধূলির লাল সড়কের দিকে অপলক তাকিয়ে বারবার মনে করছে কথাগুলো-
স্যার, মায়ের অসুখ…
তোর মায়ের অসুখ তো হামি কি করমু?
অষুধ না লিয়া বাড়িত যাওয়া যাবাল্লয় স্যার
কিন্তু হামি কি করমু রে!
কয়টা ট্যাকা দ্যান না স্যার
এ্যাঁ, মামার বাড়ির আবদার, ট্যাকা দ্যান; ঐ- সপ্তাহ পুরিছে?
না স্যার, পাঁচ দিন হছে, আর দুই দিন হলেই পুরবি…
হ, পুরলেই ট্যাকা লেস, যা ভাগ;
স্যার আপনের পাও দুখ্যান ধরি স্যার, মায়ের অসুখ; অষুধ না লিয়া বাড়িত যাবারই পারমু না
না পারলে ঘাটাতই নিন পার, যা বিরক্ত করিস না, কালক্যা সাহেব আসপি তখন দ্যাখমু নি; যা ভাগ…
ভীষণ রাগ হয় রোহানের। ‘হামি তো ভিক্ষা কিংবা সাহায্য চাচ্ছি না। পাঁচ দিন ধর‌্যা কাম করছি, একদিনের ট্যাকাটা পালেই অষুধের দাম হয়া যাতো। চার দিন ধর‌্যা মা-ও কামত যাবার পারে নাই।’ ঘরে আর কোনো টাকাও নাই যা দিয়ে সে ঔষধ কিনবে। ম্যানেজার হয়তো দয়া করবে তাকে। ঔষধ নিলেই মা আবার সুস্থ হয়ে কাজে আসবে। তাহলে আর কষ্ট হবে না ওর। তাছাড়া পরীক্ষাও এসে গেছে সামনে; মা অসুস্থ থাকলে ওর কী হবে! পেটের ভাত জোটাবে না স্কুলে যাবে, পরীক্ষার পড়া পড়বে! নিজের হাতে ভাঙা খোয়ার মতোই পৃথিবীর সমস্ত কল্পনা ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে ঝরে পড়ছে ওর।
সপ্তম শ্রেণীর ছাত্র রোহান। আট বছর আগে রোড অ্যাক্সিডেন্টে মারা গেছে ওর বাবা। আহত রমজানকে তিন মাস ধরে চিকিৎসা করেও বাঁচানো যায়নি। অবশেষে শেষ ভিটেমাটিটুকু বিক্রি করেও চিকিৎসার টাকা শোধ হয়নি। অবশেষে যমুনা বেড়ি বাঁধের ওপর মাথা গোঁজানোর ঠাঁইটাও ভেঙে গেছে গত দু’বছর আগে।
মফস্বল শহর। চেলোপাড়া রেল লাইনের ধারে একটি টিনের শেডে সাতশো টাকায় ভাড়া থাকে ওরা। পাশের পদ্মপাড়া হাইস্কুলে লেখাপড়া করে সে। ইট ভেঙে দুই’জনের সংসারটা কোনো রকমে টেনে নিয়ে যায় ওর মা। মাঝে মাঝে সেও সাহায্য করে মাকে।
আট নয় দিন থেকে মায়ের ভীষণ জ্বর। হাড়ে হাড়ে ব্যথা। মাথাই তুলতে পারছে না। মাঝে মাঝে দু-একদিন মায়ের সাথে কাজে এলেও এবার উপায় না দেখে পাঁচ দিন থেকে একটানা কাজ করছে সে।
জেলার শহরতলি হলেও ওর জন্য অনেকটা অপরিচিত। সাহায্যের হাত বাড়ানোর মতো কেউ নেই এখানে। সাত দিন পরে টাকা দেয়ার নিয়ম হলেও ম্যানেজার একটু দয়া করবেন, এটা ওর খুব প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু সে আশায় গুড়েবালি।
সূর্যটা ডুবে যাচ্ছে ওর সম্ভাবনার দুয়ারকে বন্ধ করে দিয়ে। নির্মাণাধীন বাড়িটার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা শিউলি গাছটার দিকে অপলক আনমনা হয়ে তাকিয়ে আছে সে। আস্তে আস্তে পাতাগুলোর ওপর চোখের টলটলে পানির ঝাপসা ছায়াটা অন্ধকারে কালচে হয়ে উঠছে স্পষ্টভাবে।
হঠাৎ গাড়ির আওয়াজে সম্বিৎ ফিরে আসে ওর। গাড়িটা এসে থামলো ওর পাশেই, নির্মাণাধীন বাড়িটার উঠোনে। গাড়িটা খুব সুন্দর। নেভিব্লু রঙটা ডুবন্ত সূর্যের আলতো লালিমায় বেশ চিকচিক করছে। গাড়িটার দিকে চোখ ফিরালেও মায়ের অসুস্থ মুখটা গাড়ির সৌন্দর্য ভুলিয়ে দিয়েছে তাকে। বাড়িটার ভেতর থেকে দৌড়ে ছুটে আসে ম্যানেজার। দরোজা খুলতেই একটা ভালোবাসার আহবানÑ
আরে রোহান না! তুই, তুই এখানে?
না মানে, মানে…
আরে মানে মানে করছিস ক্যান? তুই এখানে কী করছিস? তোর চেহারার এ অবস্থা ক্যান? কোনো সমস্যা?
ছোট সাহেব, ওকে চেনেন নাকি? আপনার বাবা কোন্ঠে? জিজ্ঞেস করে ম্যানেজার।
হ্যাঁ, ও তো আমার সাথেই পড়ে, ভালো ছাত্র। বাবা মার্কেটের দিকে আছেন। এখনি চলে আসবেন।
কোনো উপায় খুঁজে পায় না রোহান। সারাদিনের বৃষ্টি-ঘামে ভেজা পরিশ্রমের মলিন শরীরে বেশ খানিকটা অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে সে। হাজার হলেও ক্লাসমেট তো। তার সামনে এ অবস্থায় লজ্জা পাবারই কথা। কিন্তু সোহেল এখানে ক্যান? তাহলে এ বিশাল বাড়িটা কি ওদেরই? শুনেছি ওর বাবা খুব বড় লোক। ঢাকায় থাকে। ব্যবসা আছে ঢাকায়। মায়ের সরকারি চাকরির সুবাদে ওরা বগুড়াতেই আছে দেড় বছর থেকে। টাকাওয়ালা হলেও সোহেলটা বেশ ভালো। রোহানকে পছন্দও করে খুব। তাছাড়া রোহানের গান আর কবিতা আবৃত্তি ওর খুব ভালো লাগে। গত ফেব্রুয়ারিতে ভাষা দিবসের অনুষ্ঠানে গান গেয়ে আর কবিতা আবৃত্তি করে সবাইকে মাত করে দিয়েছিল রোহান। সেই থেকে সোহেল ওকে খুব পছন্দ করে। প্রায় প্রতিদিনই ওকে টিফিন খাওয়ায়। মাঝে মাঝে লজ্জায় গা ঢাকা দেয় রোহান। কিন্তু তাতে কী? টাকা না থাকলে ওসব প্রতিভা আর ভালোবাসার দামই বা কতটুকু। গরিবের ঘরে জন্ম। ইট ভাঙা ছাড়া কি আর উপায় আছে? চিন্তার স্রোতে ঘুরপাক খায় রোহান।
কী রে, কথা বলিস না ক্যান। কোনো সমস্যা?
না কিছু না; মাথা নিচু করে থাকে রোহান।
এ চ্যাংরা তো হামাকেরে এটিই ইট ভাঙে।
ইট ভাঙে! ম্যানেজারের কথায় অবাক হয় সোহেল। বুকটা হঠাৎ করেই খুব ভারী হয়ে ওঠে ওর। ও তাহলে এতো গরিব! কিন্তু কোনো দিন তো সে রকম কিছু মনে হয়নি। দেড় বছর থেকে একসাথে পড়ছি। খুব হাসিখুশি আর চটপটে ছেলে। এতো কষ্টে থাকে তাতো কোনোদিন বুঝিনি। নিজের কাছেই খুব অপরাধী মনে হচ্ছে সোহেলের।
ভালোবাসার মমতা মেখে রোহানের কাঁধে হাত রাখে সোহেল। আবেগ সামলাতে পারে না রোহানও; সাগরের জোয়ারের মতো উথলে ওঠে চোখের পানি। মুখ ফিরে তাকাতেই ময়লা মাখা জামাসহ সোহেল জড়িয়ে ধরে ওকে। আঁধারের বুক চিরে ঝলছে ওঠে এক টুকরো আলো। ড্রাইভার আর ম্যানেজার ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে ওদের দিকে। এর মধ্যেই দু’ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ে ম্যানেজারের চোখ থেকে।

SHARE

Leave a Reply