Home উপন্যাস ধ্রুবতারা

ধ্রুবতারা

হাসান মুহাম্মদ মিনহাজে আউয়াল

(গত সংখ্যার পর)
ক’টা দিন খারাপই কাটল। খেলাধুলা বন্ধ, পড়াশুনাও বন্ধ। অন্য সময় হলে ভালোই লাগত। স্কুলে যাওয়ার ঝামেলা থেকে বাঁচার জন্য। তবে এখন কেন যেন ভালো লাগল না। হয়ত মাথার উপর খড়গহস্ত ঝুলে আছে বলে।
এক দুপুরে কিচেনে বসে খাওয়া-দাওয়া করছিল হানীফ। ওর আম্মা রান্নাবান্না খাওয়া-দাওয়া শেষে বেডরুমে শুয়ে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। বিশ্রাম নিতে নিতে ঘুমিয়ে পড়বেন।
ভাতের প্লেট থেকে মুখ তুলে তাকালে চমকে উঠল হানীফ। মা বেডরুম থেকে উঠে আসছেন। ভাতের প্লেট রেখে যে টেবিলের নিচে কিংবা দরজার আড়ালে লুকাবে সে সুযোগ নেই। দরজার কাছাকাছি এসে দেখে ফেলেছেন। মাথা নিচু করে ফেলল সে।
ওর আম্মা রূঢ় কণ্ঠে বললেন, ‘এখানে কী করছিস?’
হানীফের মনে হল ওর আম্মা বোধ হয় ওকে চিনতে পারছেন না। এমন মমতাহীন স্বরে জিজ্ঞেস করছেন। হানীফ কথা বলছিল না।
ওর আম্মা আবার বললেন, ‘এখানে খেতে বসেছিস কেন? চুরি-চামারি করে খাবার মেলে না? যা চুরি কর গিয়ে।’
হানীফ অনুতাপ ভরা কণ্ঠে বলল, ‘আর এমন হবে না।’
কথা শুনে ওর আম্মা মোটেও ঠাণ্ডা হলেন না। ঝাঁঝালো স্বরে বললেন, ‘তা তো সব সময়ই বলিস। তারপর মনে থাকে না। ক’টা ডাব খেতে ইচ্ছে করে বললে তোর আব্বা বাজার থেকে এনে দেবে না? লোকে ডেকে নালিশ করে।’
হানীফ কথা বলছিল না। ওর মন গভীর অপরাধবোধে ভরে গেল। মনে হল সত্যিই সে ভুল করেছে। আর কখনো এমন করবে না, যাতে তার আব্বার অন্যের নালিশ শুনতে হয়। খুব পড়াশুনা করবে। কেউ যেন বলতে না পারে সে অভদ্র, খারাপ।
ওর আম্মা কিচেন থেকে পানির জগ নিয়ে চলে গেলেন। অন্য সময় হলে কানে ধরে শপথ করাতেন। কখনো হালকা মারধর করতেন। নতুন সাবান দিয়ে গোসল করিয়ে আনতেন। আজ সেসবের কিছুই করলেন না।
হানীফ পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে নিজে নিজে এসে পড়তে বসল। প্রথমে পড়তে ইচ্ছে হলেও বই খুলে আর পড়তে ইচ্ছে হল না। খানিক আগের আবেগ আর রইল না। কিছুক্ষণ খাতায় আঁকিবুঁকি করল, জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে রইল। বিছানায় শুয়ে আকাশ-পাতাল ভাবল। একসময় ঘুমিয়ে পড়ল।

বাবুর সাথে কয়েকদিন দেখা হয়নি। মাঠে আসেনি। স্কুলে গিয়েছে কি না জানা নেই। ওরা স্কুলে যেতে পারেনি। খেলা শুরু হওয়ার আগে হানীফ প্র্যাকটিস করছিল। বল মাটিতে না ফেলে দুই পা দিয়ে কিক করে কতক্ষণ বল শূন্যে রাখতে পারে সেই প্র্যাকটিস। হাবলু এসে বলল, ‘একটা খারাপ খবর আছে।’
‘কী খারাপ খবর?’ প্র্যাকটিস না থামিয়েই প্রশ্ন করল হানীফ।
‘বাবু আর আমাদের সাথে থাকবে না।’
‘কেন? কী হয়েছে?’
‘নতুন বন্ধু জুটেছে, মতিন। আমরা নাকি ওকে জোর করে বড়বাড়িতে নিয়ে গিয়েছিলাম। ওর আব্বা-আম্মার সাথে তাই বলেছে।’
‘মার থেকে বাঁচার ফন্দি।’
‘তাই বলে গাদ্দারি করে? ওকি কচি খোকা যে ওকে জোর করে বড়বাড়িতে নিয়ে গিয়েছিলাম? সব দোষ আমাদের ঘাড়ে চাপিয়ে ভালো ছেলের সাথে মিশে ভালো ছেলে হয়ে গেল। আর আমরা মার খেলাম, চোর ছ্যাচ্চর বদমায়েশ হয়ে রইলাম। কী দারুণ ব্যাপার তাই না?’
একে একে মাঠে ছেলেদের উপস্থিতি বাড়তে লাগল। দু’গ্র“পে ভাগ হয়ে খেলা শুরু হলো।
খেলা শেষে মাঠের দক্ষিণ পার্শ্বে গোলপোস্টের কাছে ঘাসের উপর বসে ছিল হানীফ। খেলাশেষ হলেই ওদের মেলা শেষ হয় না। গরমে ঘামে ভিজে যায় শরীর। একটু বিশ্রাম নেয়, গল্পসল্প চলে। মসজিদের ওজুখানায় গিয়ে হাতমুখ ধোয়। টুংকো  ভাইয়ের দোকান থেকে আইসক্রিম খেতে খেতে চলে আরও গল্প। সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত হলে বাসায় ফেরে।
হানীফ তাকিয়ে ছিল বাবুর দিকে। দেখল অন্যদের সাথে বাবু চলে যাচ্ছে রাস্তার দিকে। হানীফ ডাকল, ‘বাবু!’
ডাক শুনে গেঞ্জি কাঁধে ফেলে বাবু কাছে এলো।
হানীফ বলল, ‘বস।’
বাবু বসল না। খেলার পর সেও পরিশ্রান্ত। হাঁফাচ্ছিল। বলল, ‘কী বলবি বল, বাসায় যেতে হবে। সন্ধ্যার পর বাসার বাইরে থাকা যাবে না, আব্বার কড়া নির্দেশ।’
‘তা না হয় যাবি, একটু বস আলাপ করি। বড়বাড়ির রহস্যটা উদ্ঘাটনে কী করা যায়? আমরা অনেক চেষ্টা করেছি। আশা করি সফল হবই।’
‘রহস্য উদ্ঘাটনের মধ্যে থাকতে পারব না। এখন রাতে বেরুনো যাবে না।’
‘রাতে না হয় না গেলি, দিনের বেলায়ই তুই কাজ করবি। রাতে আমরা কাজ করব। পাহারার জন্য দিনেও কাজ করার প্রয়োজন পড়বে।’
‘দিনেও থাকতে পারব না।’
‘কেন? কী হয়েছে বলবি তো। আমাদের উপর রাগ করে থাকলে বল আমরা মীমাংসা করি।’
‘রাগের ব্যাপার না। পরীক্ষা এসে গেছে, পড়াশুনা করতে হবে। আব্বা কড়া নিষেধাজ্ঞা জারি করেছেন তোদের সাথে যেন না মিশি।’
‘না মিশলে কথাও বলা যাবে না? কথা বললেও পচে যাবি?’
রাস্তার দিকে তাকিয়ে অস্থিরভাবে বাবু বলল, ‘পরে বলব। এখন চলিরে।’ চলে গেল।
হানীফ নির্বাক তাকিয়ে রইল। হাবলুও কোনো কথা বলল না।
বাবু মাঠ ছেড়ে রাস্তায় গিয়ে উঠেছিল মতিনের সাথে। ওদিকে তাকিয়ে থেকে হাবলু বলল, ‘মতিনের সাথে দহরম মহরম চলছে।’
বিষণœতার মাঝেও হানীফ স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করল। সান্ত্বনার বাণী শোনানোর মত করে বলল, ‘যে বাঁশি ভেঙ্গে যেতে চায় তাকে ভেঙ্গে যেতে দেওয়া উচিত। যে আমাদের ছেড়ে থাকতে পারে তার জন্য আমরা কাঁদব কেন? তারচেয়ে চল বড়বাড়ি থেকে ঘুরে আসি। দিখে আসি পরিস্থিতি কী।’
‘ঘরে ঢোকা মোটেও সহজ হবে না। এনেসথেটিকস কিছু যোগাড় করতে পেরেছিস?’
‘আমি সব ব্যবস্থা করছি। তুই প্রস্তুতি নে।’
হানীফ থেমে গেল। হাবলুও কোনো কথা বলল না।
মুখে যাই বলুক বাবুর বিষয়টা তাকে খুব ব্যথিত করেছে। সেই ক্লাস থ্রি থেকে বন্ধুত্ব। কত ঘটনা জড়িয়ে আছে এক সাথে। নদীর তীরে ঘোরাঘুরি, চিকচিকে বালিতে খেলা করা। নদীর পাড়ে উঁচু একটা ঢিবি ছিল, সেই জায়গায় উঠে গড়িয়ে গড়িয়ে পড়ত। চারজন সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়ত, শহরের এমন কোন প্রান্ত নেই যেখানে ওরা ঘুরে বেড়ায়নি। ঘুড়ি উড়ানো, মাছ ধরা, লাটিম ঘুরানো সব দৃশ্য যেন চোখের সামনে ভাসছিল। ক্লাসে সব সময় এক সাথে বসত তা না। তবে কোনো বিষয় নিয়ে একজন কিছু বললে বাকিরাও তাই সমর্থন করত।খেলার মাঠে যে সব সময় চারজন একপক্ষে খেলত তা নয়।হয়ত চারজন দুই পক্ষে। এরপরও একটা হৃদ্যতা ছিল, গভীর সমঝোতা আর ঐক্য ছিল। অক্টোপাসকে দেখে যেমন তিমিও ভয় পায় তেমনি এ গ্র“পকে দেখে বড় গ্র“পগুলোও ভয় পেত, সহজে ঘাটাতে আসত না। সেই দলের একজন সদস্য আজ বিদায় নিল।
সূর্য তখন লাল রঙ ধারণ করেছে। সন্ধ্যার সেই লালাভ আভার দিকে তাকিয়ে হানীফের মনে হলো এই রকম কত সন্ধ্যা কাটিয়েছে চার জন!

পাঁচ.
টিফিন পিরিয়ডে স্কুলের সামনে টুংকু মিয়ার দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে আইসক্রিম খাচ্ছিল হানীফ। রিকসা, সাইকেল দেখে রাস্তা পেরিয়ে এলো জনি, অলি।
জনি এসে বলল, ‘কেন ডেকেছেন হানীফ ভাই?’
হানীফ আরও কারও আসার অপেক্ষা করছিল। দোকানিকে বলল, ‘টুংকু ভাই, আরও দু’টো আইসক্রিম দিন তো।’
দোকানি দু’টো আইসক্রিম দিলে ওদের দিকে  ইশারা করে বলল, ‘নে, আইসক্রিম খা।’
আইসক্রিম হাতে নিয়ে জনি আবার জিজ্ঞেস করল, ‘কেন ডেকেছেন হানীফ ভাই?’
হানীফ বলল, ‘জুয়েল, মিশু ওরা কোথায়?’
জনি পেছন ফিরে রাস্তার দিকে তাকিয়ে দেখল স্কুল গেইট দিয়ে বের হচ্ছে দু’জন। বলল, ‘ওই তো ওরা আসছে।’
হানীফ বলল, ‘সবাই আসুক। একসাথে সবাইকে বলতে হবে।’
জুয়েল, মিশু এলো। জুয়েল হাঁফাচ্ছিল যেন খুব দৌড়ঝাপ দিয়ে এসেছে। ও এমনিতেই একটু মোটা, অল্পতেই হাঁপিয়ে ওঠে। বলল, ‘খুব তো আইসক্রিম খাওয়া হচ্ছে। আমাকে একটা আইসক্রিম দিন তো টুংকু ভাই।’
হানীফ উল্লসিত কণ্ঠে বলল, ‘এই তো ভালো ছেলে, কেমন নিঃসঙ্কোচে আইসক্রিম চেয়ে নিচ্ছে। টুংকু ভাই, আরো দু’টো আইসক্রিম।’
আইসক্রিম হাতে নেয়ার পর জুয়েল পকেট থেকে টাকা বের করছিল। হানীফ বলল, ‘রাখ টাকা আমি দেব।’
জুয়েল হাতঘড়ি দেখে বলল, ‘টিফিন পিরিয়ড শেষ হয়ে যাবে। বলুন কী জন্যে ডেকেছেন।’
দোকানে অন্যান্য ছেলেরা ভীড় করছিল। সরে এলো হানীফ। বাকিদের ইশারা করল সরে আসতে। দোকানের পাশে কড়ই গাছের ছায়ায় এসে দাঁড়াল সবাই।
হানীফ তার ঐতিহাসিক বক্তব্য শুরু করল। বলল, ‘যে জন্যে ডেকেছিÑ দেখ, পড়াশুনাই সবকিছু না, পড়াশুনার বাইরে খেলাধুলার যেমন প্রয়োজন আছে, বিনোদনের প্রয়োজন আছে, অন্যদের সাথে মেশার একটা ব্যাপার আছে। ঠিক কি না বল।’
মতামত জানার জন্য সবার দিকে তাকাল। জনি শুধু বলল, ‘জ্বী।’
বাকিরা তাকিয়ে রইল। কথা ঠিক বুঝতে পারেনি কিংবা এখনও মনোযোগ দিয়ে সারেনি। হানীফ সমর্থন আদায়ের জন্য আবার জুয়েল, মিশু, অলির দিকে তাকাল। বলল, ‘ঠিক কি না বল?’
জুয়েল আসল কথা শুনতে চাইছিল। সে অনিচ্ছুকভাবে বলল, ‘হু ঠিক।’
হানীফ আবার বলল, ‘মাঝে মাঝে পড়তে পড়তে একঘেয়েমি চলে আসে তখন পড়তে ভালো লাগে না, তাই না?’
আবার তাকাল সবার দিকে। ‘এজন্য মাঝে মাঝে একঘেয়েমি দূর করা চাই। একঘেয়েমি দূর করতে যে বিনোদনের ব্যবস্থা আছে তাতেও মাঝে মাঝে একঘেয়েমি চলে আসে। যেমন টিভি দেখা, কত সময় আর দেখা যায়? খেলা, কতক্ষণ খেলা যায়?’
অলি বলল, ‘কথা ঠিক। এখন আমার টিভি দেখতে খুব খারাপ লাগে। কার্টুন নেটওয়ার্কটাও ভালো লাগে না।’
‘এই তো তাহলে দেখ।’ হানীফ তার বক্তব্যের সমর্থন পেয়ে বলল, ‘এই জন্য বিনোদনেও বৈচিত্র্য আনা চাই। এই যেমন ধর আমরা কোথাও বেড়াতে গেলাম। মানে ভ্রমণ আরকি। শহর থেকে দূরে, শান্ত কোলাহলমুক্ত কোথাও। যেখানে সবুজের সমারোহ, গেলে হৃদয় প্রশান্ত হবে। সারাদিন ঘুরলাম, দেখলাম, ভালো লাগার কিছু অনুভূতি নিয়ে ফিরে এলাম। কেমন হয় বলতো?’
‘খুব ভালো হয়।’ জনি আবার বলল, ‘কোথায়  যাওয়া?’
‘একটা দর্শনীয় স্থান, প্রকৃতির কাছাকাছি কোথাও। যেখানে গেলে মনটা বিশাল আকাশ আর বিস্তৃত জলরাশি দেখে তৃপ্ত হবে। পানিহাটা বিলে গেলে কেমন হয়?’
অলি বলল, ‘ওটা তো অনেক দূর।’
‘দূর হলেই কি আমরা তো যাব বাসে। বাসে যেতে কতক্ষণ লাগবে? এক ছুটির দিন রওয়ানা হব, সন্ধ্যায় ফিরে আসব। সারাদিন বিলে থাকব। নৌকায় করে ঘুরব। দূরবীন দিয়ে পাখি দেখব। ওখানে নাকি প্রচুর পাখি পাওয়া যায়।’ হানীফ আবার সবার দিকে তাকাল।
মিশু এতক্ষণ কথা বলেনি। এবার বলল, ‘পরীক্ষা তো সামনে।’
হানীফ পরীক্ষার ব্যাপারে গুরুত্ব দিল না। ‘পরীক্ষা তো আমারও। সবারই পরীক্ষা। একদিন বেরিয়ে এসে পূর্ণোদ্যমে লেগে যাব পড়াশুনায়।’
জুয়েল মুখ গম্ভীর করে ছিল। এসব পরিকল্পনা যে মোটেও ভালো লাগছিল না তা বুঝা যাচ্ছিল। এবার মুখে  বলল, ‘আম্মা যেতে দিবে না।’
‘তোর আম্মাকে বলতে যাবি কেন?’
‘না বলে যাব?’
‘সমস্যা কোথায়? আব্বা-আম্মা সব সময় কড়া শাসনের মধ্যে রাখতে চায়। এটা করো না, ওটা করো নাÑ সব সময় নিষেধবাণী। ভালো কাজ করবি, না মন্দ কাজ করবি সেটা বিবেচ্য বিষয় না, তুই কিছু করতে পারবি না সেটাই বড় কথা। সব কাজে নিষেধ করে খবরদারি না করলে যেন তাদের গুরুজন ভাবটা থাকে না।’
অলি বলল, ‘ঠিক কথা। আমিও তাই দেখেছি। আমি খেলতে যাব তাতে মানা। আম্মু বলেন এখন বাসার বাইরে যাওয়া যাবে না, ঘুমাও। কিশোর ম্যাগাজিন পড়তে নিলে তাতে বাঁধা। বলেন, এসব কী পড়ছ? ক্লাসের পড়া পড়। আইসক্রিম খেতে নিলে বলেন, ঠাণ্ডা লাগবে। সব কাজে বাধা।’
হানীফ আবার বলল, ‘তাহলে আর দোদুল্যমানতা কেন? এমন কত হয় না যে, সকালবেলা খেলতে বের হোস, ফিরিস দুপুরে। ওইদিন না হয় তাই করলি একদিন। দুপুরের পরিবর্তে সন্ধ্যা হলো।’
জুয়েলের স্পষ্টত অনীহা। মিশু তাকাচ্ছিল জুয়েলের দিকে। জনি কিছুটা দ্বিধান্বিত। অলি শুধুমাত্র রাজি হলো। বলল, ‘আমি রাজী।’
হানীফ বাকিদের উদ্দেশ্যে বলল, ‘আরে থাকলি তো খাঁচায় বন্দি পাখি হয়ে। বাসা টু স্কুল, স্কুল টু বাসা এই দেখলি। মুক্ত আকাশটা একটু ঘুরে দেখ। কত কিছুই আছে দেখার।’
বাকিদের দ্বিধান্বিত ভাব তাতে মোটেও কাটল না।
হানীফ তার সাহস যোগানোর চেষ্টা চালিয়ে গেল। বলল, ‘বীরভোগ্য বসুন্ধরা। উপভোগের জন্য চাই সাহস, বীরত্ব। এতেই ভয় পাচ্ছিস? ভেবেছিলাম তোদের আরও কিছু অ্যাডভেঞ্চারের খবর দেব। সে সব অ্যাডভেঞ্চারে যেতে হলে তো আরও সাহস দরকার। নির্ভীক হতে হবে। তোদের খবর দেব কিভাবে?’
‘কী সেটা?’ অলি প্রশ্ন করল।
হানীফ উৎসাহ পেল। পুরনোরা ছেড়ে গেছে তো কী হয়েছে? এই তো সাগরেদ পেয়ে যাচ্ছে। সমস্যা হচ্ছে এরা ছোট, সবে মাত্র ক্লাস ফোরে-সিক্সে পড়ে। একেবারে সব না বলে কিছুটা ইঙ্গিত দিল। বলল, ‘একটা ডিটেকটিভ কেস হাতে পেয়েছি কিন্তু রহস্য উদ্ঘাটন করা দুরূহ ব্যাপার।’
ডিটেকটিভ কেস শুনে অলি উৎসাহী হয়ে উঠল। বলল, ‘আমার ইচ্ছা আমি বড় হয়ে ডিটেকটিভ হব। প্রফেশনাল না অকেশনাল। কেসটা কী?’
‘আছে। সমস্যা হচ্ছে তোরা পারবি কি না? ব্যাপারটা যত রোমাঞ্চকর মনে করছিস ততটা রোমাঞ্চকর না, ভীতিপ্রদ। ধরা পড়ে গেলে সব শেষ। গুম করে ফেলবে। জানিস তো, এসবে কত বুদ্ধি, কৌশল আর সাহসের ব্যাপার থাকে।’
অলি বলল, ‘ভয় আছে উত্তেজনা আছে এটাই তো চাই। কোথায় এটা?’
হানীফ বলল, ‘সব বলব। আগে ডিটেকটিভ ইন্সট্রুমেন্টগুলো যোগাড় করে নেই।’
অলি খুব উৎসাহ বোধ করছিল। চাইছিল হানীফ শীঘ্রই যেন অপারেশন শুরু করে দেয়। সে হানীফকে উৎসাহ দিয়ে বলল, ‘আমাদের বাসায় স্ক্রু ড্রাইভার, প্লায়ার্স, চুম্বক আছে।’
‘শুধু এগুলো থাকলেই হবে না, এনেসথেটিকস লাগবে, মেল্টিং কেমিক্যালস লাগবে।’
অলি একটু চিন্তায় পড়ে গেল। বলল, ‘তাহলে?’
‘চিন্তার কিছু নেই। আমি যোগাড় করার চেষ্টা করছি। আগে পানিহাটা বিলে ট্যুরটা সেরে আসি।’
জুয়েল স্পষ্টই না করে দিল। বলল, ‘আমি যাব না।’ এর মধ্যে টিফিন আওয়ার শেষের ঘণ্টা বাজল। বলল, ‘ঘণ্টা পড়ে গেছে, আমি যাই।’
জুয়েল চলে গেল। জুয়েলের দেখাদেখি মিশুও ওর পেছন পেছন চলল। বলল, ‘আমিও আসি।’
অলি বলল, ‘জুয়েল ভাইয়া ফাস্ট বয় তো, অনেক পড়াশুনা করে। সে আসবে না আমি আগেই জানতাম। ওকে বলাই ঠিক হয়নি।’
বাকিরা চলে গেলে হানীফও স্কুলের ভেতরে চলল।

ছয়.
রাতে বাসায় কার যেন আসার শব্দ পেল হানীফ। পরে কথাবার্তা শুনে বুঝল নওশাদ। হয়ত কোনো নতুন খবর নিয়ে এসেছে। ওর আম্মা টেবিলক্লথে নকশা এঁকে দেয়ার জন্য কাপড় পাঠিয়েছে। কিংবা অন্য কিছু। কথা শেষে ডাইনিং রুমে বসে খাবার খাচ্ছে সেটাও টের পেল। নিশ্চয় বিকেলের নাস্তার জন্য বানানো চটপটি খাচ্ছে। এক বাটি খাওয়ার পর ওর আম্মা বলবেন, ‘আর একটু নিবি নওশাদ?’
নওশাদ বলবে, ‘দিন চাচী, চটপটিটা খুব মজা হয়েছে। রাস্তায় যেসব চটপটি বিক্রি করে সেগুলো তো যাচ্ছে তাই!’
ওর আম্মা খুশি হয়ে আরও খানিকটা চটপটি দেবেন। এ বাসায় এলে ওর ভারী আপ্যায়ন বরাবরই দেখে এসেছে। ওর আম্মা নওশাদের সাথে যতটুকু আদরের সাথে কথা বলেন ইদানিং তার সাথে ততটুকু আদরের সাথে কথা বলেন না।
নওশাদ কথা শেষ করে চলে গেল না। হানীফের রুমে এলো। হানীফ এতক্ষণ আনমনা হয়ে বসে ছিল। নওশাদ আসার শব্দ পেয়ে পড়ার ভান করে বসে রইল, যাতে করে ডিস্টার্ব না করে।
নওশাদ রুমে ঢুকে বলল, ‘হানীফ পড়ছিস? এবার কিন্তু সব প্রশ্ন ক্রিটিক্যাল হবে। বুঝে বুঝে পড়তে হবে।’ টেবিল থেকে বই নিয়ে খাটের উপর বসে বলল, ‘এই চ্যাপ্টারটা পড়েছিস?’
হানীফ চাচ্ছিল না সে এসে বসুক। কথা বলুক। তাই নিরুত্তাপ কণ্ঠে বলল, ‘তথ্য দেয়ার জন্য ধন্যবাদ।’ কথার স্বরে বিরক্তি স্পষ্ট। আসলেই সে বিরক্ত। কেননা ও এখন যা বলবে তা ভালো লাগবে না। ভালো ছেলেদের কথাবার্তা এখন বিরক্তিকর মনে হয়।
‘আলমাস মনে হচ্ছে এবারও ফার্স্ট হবে। পরপর তিনবার ফার্স্ট হলো। স্কলারশিপেও ফার্স্ট হলো। আসলেই সে একটা ডায়মন্ড। আলমাস মানে জানিস তো? ডায়মন্ড।’
এসব নিয়ে মাথাব্যথা নেই হানীফের। আলমাস মানে ডায়মন্ড হলেই কী আর গোল্ড হলেই কী? সে আছে তার চিন্তায়। সব প্ল্যান-প্রোগ্রাম মাঠে মারা যাচ্ছে। পানিহাটা বিলে যাওয়া হবে না হয়ত। রহস্য উদ্ঘাটন করা জরুরি।
‘কনক মানে জানিস? গোল্ড।’
হানীফ ধৈর্য ধরে মেজাজ ঠাণ্ডা রেখে বলল, ‘কনক মানে জেনে কী দরকার?’
‘নতুন শিখলাম তো তাই বলছি। খুবই ভালো লাগছে নতুন নতুন শব্দ শিখতে।’
‘তা আর কী কী শব্দ শিখেছিস?’
‘এই যেমন ধর রমনা। রমনা মানে কী জানিস? এটা একটা হিন্দি শব্দ। যার মানে হচ্ছে পার্ক। রমনা বললে আর পার্ক বলার দরকার নেই। খুব ইন্টেরেস্টিং না?’
‘খুব ইন্টেরেস্টিং। আরও নতুন নতুন শব্দ শিখগে।’
হানীফের কথায় ওর বিদায় হওয়ার আভাস স্পষ্ট। তবে নওশাদ উঠছিল না, বসেছিল। হানীফ চুপ করে রইল। নওশাদ যে কিছু বলবে এটা বেশ ভালভাবেই বুঝতে পারছিল। বলল, ‘খবর জানিস?’
‘কী খবর?’
‘এক নম্বর রোডের প্রথম বাসাটা যেটা এখন একটা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের অফিস, ওই অফিসের দারোয়ানকে কে যেন রুমে আটকে রেখেছিল। বেচারা ভেউ ভেউ করে কাঁদছে।’
‘রুমে আটকে রাখাতেই কাঁদছে?’
‘হু। এর আগে একদিন টয়লেটে তালা মেরে রেখেছিল। টয়লেট থেকে বেরুতে পারছিল না। অনেক ডাকাডাকিতে কে যেন শুনতে পেয়েছিল। গিয়ে তালা ভেঙে উদ্ধার করেছিল। তার ডাক অন্য কেউ শুনতে পেয়েছিল নইলে কী হতো ভাবতে পারিস?’
হানীফ অবাক হচ্ছিল। নওশাদ আবার বলল, ‘আর একদিন কে যেন তার রুমে ব্যাগভর্তি তেলাপোকা ছেড়ে দিয়েছিল। বেচারা মধ্যরাতে শব্দ শুনে ঘুম ভেঙে দেখে সারা ঘরভর্তি তেলাপোকা উড়াউড়ি করছে। ঘুমের ঘোরে চোখ মেলে দেখে কী ভাবতে কী ভেবেছিল ভয়ে এক চিৎকার দিয়ে সে রুমের বাইরে পড়েছিল বেহুঁশ হতে শুধু বাকি ছিল। এমন দুষ্টুমি কে করেছে?’
নওশাদকে সন্দেহের চোখে তাকিয়ে থাকতে দেখে হানীফ বলল, ‘আমি কী জানি?’
‘তুই করিসনি?’
‘না।’
‘ঠিক আছে। জানার জন্য জিজ্ঞেস করলাম। দারোয়ান এখন ভাবছে চাকরি ছেড়ে চলে যাবে। এমন উৎপাত করলে থাকবে কিভাবে? আরেকদিন যে তার জানের উপর হুমকি আসবে না তার কী নিশ্চয়তা আছে? এমন কাজ তুই করিস না।’
‘কেউ বলেছে আমি করেছি?’
‘না।’
‘তাহলে আমকে জিজ্ঞেস করছিস কেন?’
‘এমনি।’
এলাকায় চুরি-ডাকাতি হলে দাগী আসামীদেরকেই তো প্রথমে ধরা হয়। হানীফ বুঝল ব্যাপারটা। কোথায় কোন্ দারোয়ান টয়লেটে আটকে রইল, ভেউ ভেউ করে কাঁদল, তার কারণ সে জানবে নাকি? তার কী দায় ঠেকেছে এসব জানার? অথচ ডানে-বামে কোনােদিকে না তাকিয়ে চলে এসেছে জিজ্ঞেস করতে কেন সে করেছে? হঠাৎ করে মনে পড়ল রাফিদ তো একদিন ব্যাগভর্তি তেলাপোকা নিয়ে গিয়েছিল। বলেছিল যাচ্ছে দারোয়ানকে শায়েস্তা করতে। এ নিশ্চয় সেই দারোয়ান। সচকিত হয়ে উঠল সে। তবে প্রকাশ করল না। ওর আচরণের কারণেই এ তথ্য নওশাদকে জানানোর কোনো প্রয়োজন বোধ করল না, ইচ্ছেই করল না।
নওশাদ উঠে দাঁড়াল। বলল, ‘কিছু মনে করিস না। আমাদের কাজ যেন একটা দরিদ্র মানুষকে তার জীবিকা উপার্জনের পথে বাঁধা সৃষ্টি না করে। একটা পরিবারকে বিপদের সম্মুখীন না করে।’

সাত.
স্কুলে বসেও ভাবছিল কী করা যায়? ক্লাস শুরুর আগে সবাই যখন রুমের বাইরে গল্প-গুজব করছে তখন দেখল রাফিদ বেঞ্চে বসে আছে। ওকে কেমন অসুস্থ অসুস্থ মনে হলো। ঠিক ব্যথার কারণে নড়তে পারছে না এমন একটা ভাব।
হানীফ ওর সিট ছেড়ে রাফিদের কাছে গিয়ে বলল, ‘রাফিদ অসুস্থ নাকি?’
রাফিদ অনেকটা কাতর কণ্ঠে বলল, ‘না।’
হানীফের বিশ্বাস হল না। অসুস্থ না হলে কেউ এমন করে বসে থাকে? ওকে ভালো করে দেখে বলল, ‘দেখে তো মনে হচ্ছে খুব কষ্ট হচ্ছে।’
রাফিদ বেঞ্চে মুখ রেখে বলল, ‘হু, সারা শরীরে ব্যথা।’
হানীফ ওর সামনের বেঞ্চে বসল আলাপ জমানোর জন্য। বলল, ‘সারা শরীরে ব্যথা কেন? কী হয়েছে?’
‘পিতাজী ধোলাই দিয়েছে।’
‘কেন?’
‘ক্যাটক্যাট মহিলা কোমর ভেঙে ফেলেছে সেজন্য আমাকে মারল।’
‘ক্যাটক্যাট মহিলা কোমর ভেঙেছে তো তোর কী হয়েছে? তোকে মারবে কেন? কী করেছিলি?’
‘কিছুই না।’
‘কিছু না করা সত্ত্বেও তোকে মারল?’
‘হু, আমি শুধু ক্যাটক্যাট মহিলার রুমের সামনে সয়াবিন তেল ঢেলে রেখে এসেছিলাম আর কিছু করিনি ।’
হানীফ আঁতকে উঠল। বলল, ‘বলিস কী? তারপর?’
‘তারপর আর কী? সকালবেলা রুম থেকে বেরুনোর সময় পা পিছলে পড়ে কোমর ভেঙে ফেলেছে।’
‘এক মহিলার কোমর ভেঙে ফেলেছিস আর বলছিস কিছু করিসনি?’
‘কেউ দেখেছে আমি এ কাজ করেছি? সাক্ষী-প্রমাণ ছাড়া কাউকে শাস্তি দেয়া যায়? বাংলাদেশ দণ্ডবিধিতে আছে?’
হানীফ মাথা নেড়ে বলল, ‘নেই। তোর আব্বা বাংলাদেশ দণ্ডবিধি লঙ্ঘন করেছে। কিন্তু ঘটনা কী ছিল বলত।’
‘ঘটনা কিছুই না। আমাদের পাশের দোতলা বাসার ক্যাটক্যাট মহিলার বাগান থেকে কে যেন গন্ধরাজ ফুল চুরি করে নিয়ে গেছে। উনি ডানে বামে না তাকিয়ে এই নিয়ে আব্বার কাছে নালিশ নিয়ে এসেছিল। আমি বললাম যে আমি ছিড়িনি। তবু বিশ্বাস করে না। সেই কবে একদিন আমি তার গাছ থেকে একটা গোলাপ ফুল ছিড়েছিলাম সেই জের ধরে আমাকে গালাগালি করে। তার বাসায় কেউ কিছু একটা করলে তার নালিশ দেয় আমার নামে। আর কত সহ্য করা যায়? রাতে উনার রুমের সামনে সয়াবিন তেল ঢেলে রেখে এসেছিলাম। তারপর তো এই ঘটনা।’
‘মহিলার এখন কী অবস্থা?’
‘হাসপাতালে আছেন। তিন মাস বিছানায় শুয়ে থাকতে হবে।’
‘একটা বিরাট অন্যায় করেছিস ।’
‘অন্যায় না। এই মহিলার জন্য ক্রিকেট খেলা বন্ধ। তার বাসার বাউন্ডারি লাগোয়া ছোট্ট একটু জায়গায় আমরা ক্রিকেট খেলি। বল উনার বাসার ভেতর গেলে ক্যাট ক্যাট করে। বল দিতে চায় না। পরে বাদই দিলাম। ছেলেপেলেরা দৌড়াদৌড়ি করে খেলে। চিৎকার চেচামেচি করে তাও বন্ধ। তার ডিস্টার্ব হয়।’
‘আচ্ছা ওই দারোয়ানকে টয়লেটে তালা মেরে রেখেছিলি তুই?’
‘হ্যাঁ। ব্যাটা বহুত ফাজিল, বদমায়েশ। আমাকে একদিন অপমান করেছিল, তার শোধ নিয়েছি।’
‘কী অপমান করেছিল?’
‘একদিন বিকেল বেলা। মানাজির ভাই গেছেন পাশের বাসায় তার স্যারের কাছে। আমাকে বললেন সাইকেল নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে। আমি সাইকেল নিয়ে ওই অফিসের গেটের সামনে দাঁড়িয়ে আছি। দারোয়ান এসে বলে, ওই সইড়া খাড়াও। আমি গেট থেকে সরে এসে মানাজির ভাইয়ের স্যারের বাসার গেটের সামনে এসে সাইকেলের ক্যারিয়ারে বসে আছি। এর মাঝে দেখলাম কয়েকজন লোক ওই অফিসে ঢুকছে। লোকগুলো যাওয়ার পর দারোয়ান এসে বলে, এই ভদ্রতা শিখছ? দেখলা যে ভদ্রলোকগুলান আইল আর তুমি সাইকেলের উপরে ঠ্যাং তুইল্যা খাড়াইলা। আমি বললাম আমি তো গেট ছেড়ে এসেই দাঁড়িয়েছি। এবার দারোয়ান যা ইচ্ছা তাই বলল, জানস এরা কত বড় শিক্ষিত, কত মান্যিগণ্যি করে সবাই আর তুই কোনহানকার ছ্যাড়া বেয়াদবি করছ? আমি বললাম আপনার বস আপনি মান্যগণ্য করতে পারেন। আমার কী? আর আমি বেয়াদবির বা কী করলাম? দারোয়ান চড়া গলায় যা না তাই বলল। শেষে আমাকে মারতে এলো। আমার মেজাজ গেল খারাপ হয়ে। বদমায়েশ ব্যাটাকে শায়েস্তা করার পথ খুঁজতে লাগলাম। এখন নাকি ব্যাটা হাউমাউ করে কাঁদে। একদিন মুখে টেপ লাগিয়ে রুমে বেঁধে রেখে আসব। যাতে চিৎকার করতে না পারে।’
‘ওই দিন যে তেলাপোকা নিয়ে গেলি ওটা কি এই দারোয়ানের রুমে ছেড়ে দিয়ে এসেছিলি?’
‘হু।’
‘তোর তো মেলা বুদ্ধি। কিন্তু কথা হলো কি, এখন আমার পরিস্থিতি হলো কোথাও একটা ঝামেলা হলে সবাই আমাকে সন্দেহ করে। কী কপাল দেখেছিস? তুই দারোয়ানকে রুমে আটকে রেখেছিস আর অন্যরা সন্দেহ করছে আমি করেছি কি না।’
‘যারা সন্দেহ করে তাদের বল যে তুমি করনি।’
‘বললে কী হবে? এখন বিশ্বাসযোগ্যতাও হারিয়েছি।’ হানীফ চিন্তা করে বলল, ‘তোর তো ভালো বুদ্ধি। এক কাজ কর না, একটা কেস হাতে পেয়েছি। কিন্তু লোকবলের অভাবে এগুতে পারছি না। তুই চলে আয় না কেসটার সুরাহা করি। কিছু ইন্সট্রুমেন্টের অভাব।’
‘কিসের কেস?’
‘আছে, ধীরে ধীরে বলব। তার আগে বল, লিকুইড মরফিন কোথায় পাওয়া যায়?’
‘ফার্মেসিতে পেতে পারিস।’
‘কেনা যাবে?’
‘এসব ওষুধ রেজিস্টার্ড ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন ছাড়া বিক্রি করে না।’
‘এই তো আরেক সমস্যা হলো। তাহলে ক্লোরোফরম পাওয়া যাবে?’
‘এসব তোকে দেবে না মনে হয়। তোর কী দরকার?’
‘একটা ডিটেকটিভ কেস হাতে পেয়েছি কিন্তু খালি হাতে এগুনো সহজ হবে না।’
‘ডিটেকটিভ কেসে গিয়ে খুব একটা সুবিধা করতে পারবি না। বিষয়গুলো খুব সহজ না।’
‘সহজ না, কঠিনও তো না।’
এরপর দিন আর রাফিদকে স্কুলে দেখা গেল না। খুব নাকি জ্বর উঠেছে। স্কুলে যাওয়া বন্ধ।

আট.
মস্কিটো ¯েপ্রর সাথে বোতলে বিষাক্ত ঝাঁঝালো কীটনাশক ভরেছে। এটা ছিটালে লিকুইড মরফিনের মতো নিঃশব্দে ঘুমে ঢলে পড়বে না বরং চিল্লাচিল্লি করে হৈ চৈ বাঁধিয়ে ফেলবে যে কেউ। সুবিধা এটুকু যে চোখে লাগলে চোখ এতো জ্বালাপোড়া করবে যে কিছুই দেখতে পারবে না। সেই সুযোগে হাত পা বেঁধে ফেলে রাখতে হবে। হাত পা বাঁধার জন্য দড়ি, চিল্লাচিল্লি যেন না করতে পারে সে জন্য মুখে গুজার কাপড়, স্কচ টেপ যোগাড় করেছে।
হাবলুদের বাসার কাছে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিল। হাবলুর আসার কথা ছিল রিপোর্ট করতে। কোনো পাত্তা নেই দেখে খোঁজ নিতে পাঠিয়েছে জহিরকে। হাবলুদের বাসায় গেল না নিরাপত্তার খাতিরে। বলাই বাহুল্য ওকে সহ্য করতে পারে না কেউ। ওদের বাসার কারও সাথে দেখা হলে তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠার সম্ভাবনা আছে।
জহির এসে খবর দিল হাবলু বাসায় নেই। কোথায় গেছে বলতে পারছে না। তবে এতটুকু খবর দিল যে আজ বাসায় কিছু প্রলয়ঙ্করী ঘটনা ঘটে গেছে। সেই যে বাসা থেকে বেরিয়ে গেছে এখনো ফেরেনি।
টুল কীটস সব রেডি করে রওয়ানা হবে আজ রাতে। যন্ত্রপাতি সব রেডি করে রেখেছে। এ সময় কোনো খবর না দিয়ে লা-পাত্তা হওয়া কি ঠিক হয়েছে? এদের কাণ্ডজ্ঞান কবে হবে?
জহিরকে বলল, ‘আমি খোঁজ নিয়ে দেখছি। তুই রেডি হয়ে থাকবি।’ তবে বুঝল জহির কিছুটা ভয় পাচ্ছে। ভয়ের বিষয়ে কিছু বলল না। সাথে নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে জহিরদের বাসার কাছে এলে জহিরের আম্মা ছাদ থেকে ডাক দিলেন জহিরকে। উনি ছাদে শুকাতে দেওয়া কাপড়-চোপড় ঘরে নিচ্ছিলেন।
জহির ওর আম্মার ডাকের সুর শুনেই ত্রস্ত-ব্যস্ত হয়ে বাসার ভেতরে দৌড়ে গেল।
সময় পার হওয়ার পরও জহিরের আসার লক্ষণ দেখা গেল না। মিনি গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকলে জহিরের আম্মার গলার আওয়াজ শুনল। জহিরকে বকাঝকা করছেন। জহির আত্মপক্ষ সমর্থন করে বাঁচার চেষ্টা করছিল। কথাগুলো শুনতে পাচ্ছিল হানীফ। একটা কথা কানে এলে মন খারাপ হয়ে গেল। জহিরের আম্মা বললেন, ‘ইতরটা এই বেলায় এখানে এসে জুটেছে।’
বুঝল জহিরের এখন আর বেরুবার সম্ভাবনা নেই। নিঃশব্দেই গেট পেরিয়ে বেরিয়ে এলো।
থানা মোড়, কলেজ ক্যান্টিন, হাইস্কুলের পেছনে খোঁজ নিতে হবে।
নবরূপ গলি দিয়ে শর্টকাটে থানা মোড়ে যাওয়ার পথে পাশের দোতলা বাসার ছাদ থেকে শব্দ শুনে উপরের দিকে তাকাল। দেখল ছাদে ইমতিনান, মিশু, জুয়েলসহ কয়েকটা ছেলে খেলছে। ছাদের কিনারে দাঁড়িয়ে ইমতিনান দাঁত বের করে হাসছে। টিটকিরি দিয়ে বলল, ‘প্রাইভেট ডিটেকটিভ। হানীফ হোমস।’
পেছন থেকে বাকিরাও সমস্বরে বলল, ‘প্রাইভেট ডিকেকটিভ! হানীফ ডিটেকটিভ! হানীফ হোমস!’
কাঁটা ঘায়ে নতুন করে নুনের ছিটার মতো আঘাতটাকে শুধু বাড়িয়ে দিল। হানীফ কিছু বলল না। এদের কিছু বলা মানে পরিস্থিতি আরও জটিল করে তোলা।
সম্ভাব্য সব জায়গা খুঁজেও হাবলুর কোনো খোঁজ পেল না হানীফ। রাফিদের খোঁজে ওদের বাসায় যেতে মন চাচ্ছিল না।
রাস্তার লোকজনের দৃষ্টি এড়িয়ে এলো বড়বাড়ির পেছনের বাউন্ডারি ওয়ালের পশ্চিম-উত্তর কোণে।
মাল্টি পকেটওয়ালা প্যান্ট-শার্ট যোগাড় করতে পারেনি। ব্যাগে করে জিনিসপত্র আনতে হয়েছে। ব্যাগ নিয়ে ওয়াল টপকাতে গিয়ে কয়েকবার পিছলে পড়লে বুঝল একা একা কাজ করা কতটা দুরূহ। তবে সহজে দমে যাওয়ার পাত্র নয় সে। একদিক দিয়ে ভাগ্য ভালোই বলতে হবে। সে একাই হবে গ্যাংস্টার ধরিয়ে দেওয়ার কৃতিত্বের দাবিদার। পত্রিকায় ছবি উঠবে তার একার। টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতে সাক্ষাৎকার প্রচার করা হবে তার একার। অন্য কেউ ভাগীদার নেই।
হঠাৎ মনে হল ওয়ালের উপর দিয়ে ব্যাগ ছুড়ে দিলেই তো হয়। নিজেকে তিরস্কার করল নিজেকে। লোকবল প্রয়োজন নেই শুধু বুদ্ধির প্রয়োজন।
ওয়াল টপকে ভেতরে নেমে ব্যাগ কোমরে বেঁধে নিল। হাতে ¯েপ্রর বোতল। সহজভাবে ঘরে ঢুকতে পারলে ভালো নইলে দু’একজন বিষাক্ত তরলের প্রভাবে লুটিয়ে পড়বে মাটিতে। এটুকু করতেই হবে। ঘাস লতাপাতা সরিয়ে এগুচ্ছিল। ভয় ছিল কোনদিক থেকে আবার জিল্লু মিয়ার লাঠি এসে পড়ে ওর মাথায়।
বাসার পূর্ব দিকে সার্চ লাইটের আলোতে খোলা ঘাসের চত্বরের অনেকটা জায়গায় আলো এসে পড়ছে। সেই আলোতে দেখল গেটের কাছে, বাসার সামনের খোলা জায়গা উত্তর পাশের পুকুর ঘাটে কেউ নেই। কোনো গাড়িও দাঁড় করানো নেই।
বাসার পশ্চিম পাশের দিকে অন্ধকারের মাঝ দিয়ে এসে দাঁড়াল একটা পিলারের আড়ালে। উঁকি দিয়ে দেখল বারান্দায় সিঁড়ির উপর বসে আছে দু’জন লোক। ব্যাগ থেকে কেমিক্যালসের বোতল ছুড়ে মারল খোলা চত্বরে ঘাসের মাঝে। ঘাসের মধ্যে পড়ে শব্দ হলে ফিরে তাকাল দু’জন। একজন অন্যজনকে কী বলল শুনতে পেল না হানীফ।
একজন উঠে গেল বোতলের দিকে। অন্য লোকটাকেও সরাতে পারলে সহজে উঠে যাবে বারান্দায়। বারান্দায় উঠে একটা দরজা ভেঙ্গে ঢুকে যাবে ভেতরে। ঘাসের মধ্য থেকে বোতল উঠিয়ে লোকটা সিঁড়ির পাশে বসে থাকা লোকটাকে দেখিয়ে বলল, ‘একটা বোতল। বোতলে কী যেন সবুজ সবুজ জিনিস।’
‘বোতল আইল কোইত্তে?’ বসে থাকা লোকটা প্রশ্ন করল।
‘রাস্তা থাইক্যা ছুইড়া মারছে বোধ হয় কেউ।’
‘কী কছ? রাস্তার থাইক্যা ছুইড়া মারলে এত দূর আইব ক্যামনে?’
‘তাইলে আইলো ক্যামনে?’
কথোপকথন আরও চলত। কিন্তু সেসব শোনার সময় ছিল না হানীফের। গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে গেল সিঁড়ির কাছে বসা লোকটির দিকে। বিষাক্ত ¯েপ্রর বোতলের নজল তাক করল লোকটির দিকে। আওতার মধ্যে এলে ট্রিগার চাপবে এমন সময় ধমকে উঠল কে যেন। দেখল করিডোরে বিস্ফোরিত চোখে চেয়ে আছে জিল্লু মিয়া। দেখেই পিলে চমকে গেল। ততক্ষণে সিঁড়িতে বসা লোকটিও ফিরে তাকিয়েছে। দেরি না করেই ট্রিগার চাপল হানীফ। বিষাক্ত তরল পদার্থ জিল্লু মিয়া পর্যন্ত পৌঁছল না তবে সিঁড়িতে বসা লোকটির গায়ে কিছুটা ছোয়া লাগল। ‘ওরে আল্লাহরে’ বলে দু’হাতে চোখ চেপে ধরল লোকটা। জিল্লু মিয়া মাঠের লোকটিকেই হয়ত বলল, ‘সালামত ধর, ধর।’
সালামত প্রথমটায় বুঝতে পারেনি। সে আওয়াজ দিল, ‘কী ধরব?’
জিল্লু মিয়া আরও কিছু বলার আগেই হানীফ ¯েপ্রর বোতল ছুড়ে মারল জিল্লু মিয়ার দিকে। জিল্লু মিয়া এক পাশে সরে যাওয়ায় গায়ে লাগল না। তবে মেঝেতে পড়ে বোতল ফেটে তরল পদার্থ ছড়িয়ে পড়লে তার ঝাঁঝে চোখ বন্ধ করে জোরে চিৎকার করে উঠল।
সালামত নামের লোকটা তখনও বুঝতে পারেনি কী হয়েছে। জিল্লু মিয়া আবার বলল, ‘শয়তানটাকে ধর, আজ হাড্ডি গুড়া করে ফেলব।’
সালামত সিঁড়ির কাছে আসার আগেই পিছিয়ে অন্ধকারের মধ্যে চলে এল হানীফ। অবস্থা বেগতিক দেখে ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটল বাসার পেছনের অন্ধকারের মধ্যে। ঝামেলা কমাতে কোমরের ব্যাগ ছুড়ে ফেলল একদিকে। ঘাস লতাপাতার মাঝে জড়িয়ে একবার উল্টে পড়ল। জিল্লু মিয়া টর্চ হাতে পেছন পেছন ছুটে আসছে। বাকি দু’জনের হাকডাকও শুনল। চোর ভেবেছে হয়ত। গ্যাংস্টারের লোকজন ওকে পেলে পুলিশে দেবে না নিশ্চয়, গুম করে ফেলবে। ধরিয়ে দিয়ে নিজেদের আস্তানা সর্বসমক্ষে প্রকাশ করবে না।
হাতে কোনো গাছের পাতা লেগে যেন চামড়া জ্বলে গেল। হাতের জ্বলা শেষ হতেই মুখের ডানপাশে ছ্যাৎ করে আরেক গাছের পাতা লাগল। জিল্লু মিয়া ধরার আগে কোনোরকমে ওয়াল টপকে বড়বাড়ির বাইরে এলো। রাতারাতি বিখ্যাত হওয়ার একটা সুযোগ হাতছাড়া হওয়ায় মুষড়ে পড়ল। বড়বাড়ির ত্রিসীমানায় থাকা ঠিক হবে না ভেবে একেবারে পোস্ট অফিসের সামনে এসে সুস্থির হল।
হাতের কয়েক জায়গা থেকে রক্ত বেরুচ্ছে। মুখের ডানপাশে জ্বলছে। হাত মুখে লাগিয়ে দেখল রক্ত বেরুচ্ছে কিনা। হাতে রক্ত লাগল না। বিষণœ, বিরক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে রইল অনেকক্ষণ।

দিনের বেলা গেল বাস স্ট্যান্ডে। পানিহাটা বিল দেখতে যাবে। কেউ যাবে না বলে সে বসে থাকবে না।
বাস ছাড়ল নির্ধারিত সময়ের অনেক পরে। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অবলোকন করতে যাচ্ছে কত আনন্দ হওয়ার কথা। কিন্তু তার কিছুই হচ্ছিল না। কেমন যেন অস্বস্তি লাগছিল, শঙ্কা জাগছিল মনে। তা কি কেউ তার সঙ্গী হয়নি সে জন্য না কি আগামী কাল হাফ ইয়ার্লি পরীক্ষা সে জন্য? অর্ধেক পথে গিয়ে বাস থেকে নেমে গেল। অন্য বাসে করে আবার বাসায় ফিরে এলো। এভাবে কোনো দর্শনীয় স্থান দেখতে যাওয়া যায় না।

নয়.
পরীক্ষার হলে যেতেই ভয় করছিল হানীফের। সকালবেলা নাস্তা খেয়ে স্কুলড্রেস পরে পরীক্ষার হলে যাওয়ার জন্য যখন কলম পকেটে ঢোকাচ্ছিল তখন মনে হলো কী পরীক্ষা দেবে? কোনো প্রশ্নই তো ভালোভাবে মুখস্থ করেনি। বইয়ের চ্যাপ্টারগুলোর নামও বলতে পারবে না ঠিকমত। বুক ধুকধুক করছিল।
বছরের শুরু থেকে তো পড়া হয়ইনি। পরীক্ষার আগেও না। অন্যান্যবার অন্তত যেমনটি করে থাকে।
পরীক্ষার হলে প্রশ্নপত্র হাতে নিয়ে সব অন্ধকার দেখতে লাগল। অন্যদের দিকে তাকিয়ে দেখল সবাই মনোযোগ দিয়ে লিখছে। পেছনে বা সামনে অন্য ছাত্রকে যে কিছু জিজ্ঞেস করবে সে সুযোগও নেই। জিজ্ঞেস করলেই কি উত্তর লিখতে পারবে?
অন্যপাশে সিট পড়েছে হাবলুর। দেখল হাবলু কী যেন লিখছে। দেখে মনে হচ্ছে না কোনো টেনশন কাজ করছে। পরীক্ষার খাতায় নিশ্চয় হিসাব নিকাশ করছে। ও এ কাজটা করে। পরীক্ষার খাতায় প্রশ্নের উত্তর জানা না থাকলে জানা অন্য উত্তর লিখে দিয়ে আসে।
এবার নিশ্চয় অন্য উত্তরও লিখছে না। অন্য উত্তরও জানা নেই। এখন হিসাব নিকাশ ছাড়া উপায় নেই। আরেকটা কাজ করতে পারে এক প্রশ্নের উত্তর লিখতে সারা সময় কাটিয়ে দেবে। হয়ত একটা প্রশ্নের উত্তরই জানা আছে। তাড়াতাড়ি লিখে শেষ করে বসে থাকলে স্যার এসে জিজ্ঞেস করবেন, কি লিখছিস না? তখন কী করবে? পরীক্ষা শেষের সময় যত ঘনিয়ে আসতে লাগল ওর অস্থিরতা তত বাড়তে লাগল। হিসাব করে দেখল পাস করার মতো উত্তর সে লিখেনি, লিখতে পারেনি।
জীবনে প্রথম ফেল করতে যাচ্ছে সে। বিগত বছরগুলোতে ক্রমাবনতি, পরীক্ষায় খারাপ করে, ফার্স্ট-সেকেন্ড হয় না। রোল থাকে পেছনের দিকে। কিন্তু ফেল তো আর করে না। এই প্রথম ফেল করল। দুনিয়াটা অন্ধকার হয়ে এলো। চেপে আসছে পৃথিবী। শ্বাসপ্রশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল। যেমনটি আর কখনো লাগেনি। ফাইনাল পরীক্ষায় পাস করবে কিভাবে? আর বোধহয় পাস করা হবে না।
হাবলু প্রশ্ন গুটিয়ে হল থেকে বেরিয়ে যাচ্ছিল। হানীফ ডাকল, ‘হাবলু?’
হাবলু কাছে এলো।
‘পাস হবে?’
‘না।’
অন্য ছাত্রদের দেখল কে কোন প্রশ্নের উত্তর লিখল, কোনটা ভুল লিখল, কোনটা শুদ্ধ লিখল এসব আলোচনা করছিল। কারও কথা হয়ত বা সময় ছিল না তাই শেষের প্রশ্নটা শর্ট করে লিখতে হয়েছে। কারও বা একটা শর্ট কোশ্চেন ভুল হয়ে গেছে। আপসোস করছে।
হানীফের মনে হল একটা প্রশ্ন ভুল হয়েছে তো কী হয়েছে? সে পাস করার মতো উত্তর লিখতে পারলেই খুশি হতো। কিন্তু পাস করার মতো উত্তর লিখতে পারেনি।
রুম থেকে সবাই বেরিয়ে যাচ্ছে। রাফিদের দিকে দেখল অন্য এক ছাত্র তাকে প্রশ্ন দেখিয়ে কী যেন বলছে। রাফিদ জবাব দিচ্ছে। রাফিদের নিশ্চয় ফুল এনসার হয়েছে। অন্য ছাত্রদের সাথে এমনভাবে হেঁটে যাচ্ছে যে কথা বলাই যাবে না।
ইসহাককে দেখল অন্য একটা ছেলের সাথে বেরিয়ে যাচ্ছে। ওর পরীক্ষাও নিশ্চয় ভালো হয়েছে। আর কারও সাথে কথা বলতে ইচ্ছে করছে না। হাবলুর সাথেও না। অবশ্য হাবলু অন্যদিকে চলে গেল।
অন্যদের আনন্দ উৎসব ভালো লাগছিল না। আগামীকালও পরীক্ষা আছে। বুঝতেই পারছিল কী পরীক্ষা দেবে। তারচেয়ে পরীক্ষা না দেয়া ভালো। কিন্তু বাসায় বলতেই পারবে না যে পরীক্ষা দেবে না।

দশ.
পরীক্ষার কারণে এ ক’দিন মাঠে ছেলেদের উপস্থিতি কম ছিল, খেলা জমেনি। পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর ছেলেদের ভীড় বাড়তে থাকায় আবার আগের মতো মাঠ সরগরম হয়ে উঠল।
সকাল থেকেই গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি পড়ছিল। দুপুরের পর বৃষ্টি থামলেও মাঠ ভেজা। মাঠের কোথাও কোথাও পানি জমেছে। খেলতে গেলে কাদা-পানিতে মাখামাখি হবে বলে পুরনো জামা-কাপড় পরে খেলতে এলো কেউ কেউ। কিন্তু খুরশীদের পোশাক দেখে সবাই অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল।
দিনার প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল, ‘এটা কী পরেছিস খুরশীদ?’
সবার প্রশ্নবোধক দৃষ্টি দেখে খুরশীদ অবাক হওয়ার ভান করল। যেন এই সহজ বিষয় বুঝতে না পারায় খুব অবাক হয়েছে। কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল, ‘কেন? টি পাঞ্জাবি আর স্লীভলেস পায়জামা।’
অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল বাকিরা।
একটু ভাব নিয়ে খুরশীদ বলল, ‘এটা আমার গ্রীষ্মকালীন ফ্যাশন।’
মাঠের মাঝে খানিকক্ষণ ক্যাটওয়াক করল। অঙ্গভঙ্গি দেখে হেসে গড়িয়ে পড়ল সবাই।
সারাদিন রুমে বসে ছিল হানীফ। খেলার মতো মানসিক অবস্থা ছিল না। জানতে চাইল না অলি, জনির পানিহাটা বিলে যাওয়ার প্রস্তুতির খবর। বড়বাড়ির চোরাকারবারীদের ধরিয়ে দেয়ার অদম্য আগ্রহটাও দেখা গেল না। ইসহাক কি আবার আসবে ওদের সাথে? এই উত্তরও জানতে চাইল না। মতিনকে কৌশলে শায়েস্তা করার বাসনাও রইল না। কোথাও বেরুতে ইচ্ছে করল না। মনে হলো কোথাও লুকিয়ে থাকতে পারলে ভালো হতো, যাতে কেউ খুঁজে না পায়। এই গরমেও খুব শীত শীত লাগছিল। কিন্তু কিছু সময় পার হতেই ছুটে এলো মাঠে।
দু’দল ভাগ হয়ে গিয়েছে। খেলা শুরু হবে। বল রাখা হয়েছে মাঝমাঠে। হানীফ মাঠে এসে বলল, ‘আমিও খেলব।’
ওর কথায় কেউ কান দিল না। বরং শুরু করার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিল। হানীফ আবার বলল, ‘আমি খেলব।’
সাইডে দাঁড়িয়ে ছিল উৎপল। বলল, ‘এখন খেলা শুরু হবে ঝামেলা করিস না। আগে আসতে পারলি না?’
হানীফ বলল, ‘তাতে কী হয়েছে, একপক্ষে নেমে গেলেই হলো।’
‘এখন কাকে উঠিয়ে দিব? কাল আগে আসিস।’
উৎপলকে ঠাট্টার মত করে বলল, ‘উৎপল ভাই আমাকে না নিলে আপনার পক্ষে স্ট্রাইকিং-এ খেলবে কে?’
এ প্রশ্নে উৎপল যে উত্তর দিল তা মোটেও আশা করেনি সে। উৎপল তার খেলোয়াড়দের সাজানো রেখে ঝাঁঝালো কণ্ঠে বলল, ‘তুই ছাড়া আর স্ট্রাইকিং-এ খেলার প্লেয়ার নাই নাকি? একাই খেলোয়াড়?’ ওর দিকে মুখ বাঁকিয়ে তাকিয়ে থেকে আবার খেলোয়াড় সাজানোয় মন  দিল।
মাঝমাঠে বল কিক করতে নিয়েছে জোবায়ের। হানীফ এসে বল ধরে ফেলল।
উভয় পক্ষই হই হই করে উঠলÑ ‘কী হলো বল রাখ খেলা শুরু হবে এখন।’
হানীফ বলল, ‘আমাকে না নিলে খেলা হবে না।’
সেন্টার করতে আসা খেলোয়াড়রা বুঝানোর চেষ্টা করছিল। এর মধ্যে জগলু দৌড়ে এসে বল কেড়ে নিতে চাইল। বলল, ‘বল রাখ।’
ওর উদ্ধত ভঙ্গি দেখে হানীফের রাগ চড়ে গেল। বলল, ‘বল রাখব না, তোর বল নাকি?’
জগলু আগের মতই তেড়ে বলল, ‘আমার বল না হোক তুই বল রাখ।’
‘তোর কথায় বল রাখতে হবে নাকি?’
‘আমার কথায়ই রাখতে হবে। রাখ।’
জগলুর ধমকে হানীফের মেজাজ ক্রমেই চড়ে যাচ্ছিল। বলল, ‘আমি বল রাখব না, যা তুই কী করতে পারিস কর।’
‘কী বল রাখবি না? দাঁড়া!’ বলে জগলু ঝাঁপিয়ে পড়তে যাচ্ছিল হানীফের উপর। পাশ থেকে এজাজ ধরে ফেলল।
হানীফ বিস্মিত হচ্ছিল। যে ছেলে চোখ তুলে তাকাতেই পারত না, সে আজ তার সাথে লাগতে আসে। ভাবতেই পারছিল না। হানীফের মনে হল হাবলুকে বলতে, ‘ধরতো হাবলু প্যাঁদানি লাগাই।’ ইসহাক আসবে মুঠি বাগিয়ে। টুটি চেপে ধরে শূন্যে তুলে ধরবে। বাবু এসে শেষ বেলায় চাপা ভেঙ্গে ফেলবে দু’ঘুষিতে।
একটু সজাগ হলে মনে হল আজ তার পাশে কেউ নেই। সে একা।ম াঠে বাবু থাকলেও এগিয়ে আসবে না।
ডাব্লু ওর ডান হাত ধরে টানতে টানতে মাঠের বাইরে নিয়ে এলো। বলল, ‘তুই ওর সাথে লাগতে গেলি কেন?’
‘ওর সাথে লাগতে যাব কেন? ওই তো আমার সাথে লাগতে এলো। কত বড় সাহস!’ জগলুর দিকে চেয়ে বলল, ‘দেখিস তোকে একদিন ঠিক দেখে নেব।’
‘এখন আর মাথা গরম করিস না। বাসায় যা।’
‘বাসায় যাব কেন? খেলতে আসিনি?’
‘হ্যাঁ খেলতে এসেছিস। কিন্তু আজ আর খেলিস না। দেখছিস না দু’দলে এগার জন করে হয়ে গেছে। এখন কোন্ পক্ষে নামবি?’
হানীফকে রেখে ডাব্লু আবার মাঠে চলে গেল।
হানীফ তাকিয়ে দেখল জগলু রাগী চোখে তাকিয়ে আছে ওর দিকে। পাশে ফাহিমকে কী যেন বলছে। মেজাজটা চড়ে যাচ্ছিল। কিছু করতে না পারায় ক্ষোভ আরও বাড়ছিল।
খেলা শুরু হল। কাদা-পানিতে মাঠ পিচ্ছিল ফলে বল নিয়ে দৌড়াতে গিয়ে ধুপধাপ করে একেকজন পড়তে লাগল। কাদা-পানির মাঝে বল লাত্থি দিলেও এগুচ্ছিল না। যেখানে বল সেখানে সব খেলোয়াড় জড়ো হয়ে যাচ্ছে। বল সহজে কোনোদিকে এগুচ্ছিল না। ভীড়াভীড়ি থেকে গোলপোস্টের সামনে ফাঁকায় বল পেয়ে গেল শরাফত। গোলকিপার দৌড়ে এলো বল ধরতে। শরাফত ডজ দিয়ে আরেকটু এগুল। গোলকিপার ঝাঁপিয়ে পড়েও বল ধরতে পারল না।
শরাফত বল নিয়ে একেবারে গোলপোস্টের সামনে। জোরে কিক করলেই গোল। কয়েক হাত সামনে বল কিক করতে গেল। দর্শকদের মাঝে দারুণ উত্তেজনা। সবাই চেঁচাচ্ছিল। শরাফত দৌড়ে গিয়ে কিক করল। সবাই ধারণা করল গোল। কিন্তু বল গোলপোস্টে ঢোকেনি। বল আগের জায়গায়ই আছে। কিক করার আগ মুহূর্তে পিছলে চিৎপটাং হয়ে পড়ে গেল সে। ওর পিছলে চিৎ হয়ে পড়ে যাওয়া দেখে হেসে গড়িয়ে পড়ল সবাই। গোলকিপার এসে বল ধরে ফেলল।
হাসির মাঝে যোগ দিল না হানীফ। খেলতেই যখন পারবে না তখন এদের খেলা দেখবে না। এরা এমন কোনো খেলোয়াড় হয়ে যায়নি যে না দেখলে চলবে না। উঠে গেল সে।
বাসায় যেতে ইচ্ছে করল না। কোনো নির্জন জায়গায় লুকিয়ে থাকতে পারলে ভালো হত। সে রকম কোনো জায়গাও নেই।
এলজিইডি ভবনের পাশের রাস্তা দিয়ে লাভলু ভাইয়ের টং ঘরের কাছে এলে দেখল নির্জীব ভাবে বসে আছে হাবলু। চোখে-মুখে ক্লান্তি, ঘুম জড়ানো ভাব। কাছে এসে দাঁড়াল হানীফ। হাবলু চোখ তুলে তাকাল না। ওর হাতে সিগারেট, ধোঁয়া উড়ছে ।
হানীফ ডাকল, ‘হাবলু?’
হাবলু অস্ফুট স্বরে বলল, ‘হু।’
হানীফ বিস্মিত হয়ে বলল, ‘তুই সিগারেট টানছিস?
কথা শুনে মুখ তুলে তাকাল হাবলু। ঢুলুঢুলু চোখে বলল, ‘হ্যাঁ। গাঁজাও টানি।’
এই অভ্যাসটা এখনো গড়ে ওঠেনি ওদের। আর যাই করুক এসবের ধারে কাছে যায়নি। আবার বলল, ‘কেন?’
‘কী করব? পড়াশুনা ভালো লাগে না। আম্মা-আব্বা, বড় ভাই গালিগালাজ করে। এক সময় গায়ে মাখতাম না। এখন গায়ে বড় লাগে। মনে হয় বাড়ি ছেড়ে পালাই। এই যন্ত্রণা থেকে মুক্তি চাই। গাঁজায় একটা টান দিলে কেমন যেন ঘোর এসে যায়। সব ভুলে যাই।’ হাবলুর চোখ বুজে এলো।
হানীফ চেয়ে দেখল একটু দূরে গলির মুখে বসে আছে শফি, জয়নাল। তার মানে এদের পাল্লায় পড়েছে। গাঁজাখোর সম্প্রদায়। বলল, ‘তাই বলে তুই গাঁজা টানবি? গাঁজা খেয়ে কি তুই সমস্যার সমাধান করতে পারবি?’
‘না খেয়ে কী করব বল। আর কী করতে পারি আমি?’
‘কবে থেকে এটা ধরেছিস?’
‘পরীক্ষার আগে থেকে।’
‘তাই তো বলি তুই এমন ঝিমাস কেন?’
হাবলুর হাতের উন্মুক্ত অংশে কালো দাগ দেখে হানীফ বলল, ‘এখানে ব্যথা পেলি কিভাবে?’
‘ব্যথা পাইনি, ব্যথা দিয়েছে। মেরেছে।’
ওদের কথাবার্তার মাঝে শফি উঠে এল। হাবলুকে বলল, ‘কি রে হাবলু, তোর দোস্ত বুঝি তোকে গাঞ্জা খাইতে  নিষেধ করতাছে?’
‘হ্যাঁ।’ হাবলু লুকানোর চেষ্টা করল না।
শফি হানীফের দিকে ফিরে বলল, ‘গাঞ্জা বড় কঠিন জিনিস। যারে ধরে তারে সহজে ছাড়ে না। আর মজা পাইলে মানুষই গাঞ্জা ছাড়ে না। চলে না, চলে না, গাঞ্জা ছাড়া দিন চলে না।’ শেষের কথাগুলো সুর করে বলল শফি। একটু হেলছিল দুলছিল।
কিছু বলতে চেয়েও বলল না হানীফ। এরা স্কুলের গন্ডিই পেরুতে পারেনি। তিনবার এসএসসি পরীক্ষা দিয়ে অবসর নিয়েছে। হাবলু এদের খপ্পড়ে পড়েছে।
শফি ওর দিকে চেয়ে বলল, ‘ওই ধূমপান ত্যাগ করার উপায় কী?’
হানীফ কথা বলতে চাইছিল না। ওর নেশা করা বদখত চেহারা দেখেই মেজাজ বিগড়ে আছে। যথাসম্ভব শান্ত মেজাজে বলল, ‘ধূমপান না করা।’
শফি অট্টহাস্যে ভেঙ্গে পড়ল। ‘হা হা হা কী কয় পোলা? ধূমপান না করা?’ হাসি থামিয়ে হানীফকে বলল, ‘একটা টান দিবি কেমন লাগে?’ সিগারেট বাড়িয়ে দিল সে।
রাগে হানীফের শরীর জ্বলে গেল। এ বদমায়েশটা তাকে তুই করে বলছে কেন? হানীফ রাগে ফুসতে ফুসতে বলল, ‘না।’
সুর করে গান ধরল শফি। নাচছিলও। গান থামিয়ে আঙ্গুল দিয়ে ইশারা করে বলল, ‘ওই পোলা হর, এইহানে গাঞ্জা না টানলে জায়গা নাই। তোর লাহান ভালা পোলা বাড়িত বয়া থাক গা।’
হানীফ চলে এলো। টানুক হাবলু গাঁজা টানুক। যারা তার সহচর ছিল সবাই কেমন দূরে সরে গেছে। একা হয়ে গেছে সে। ইসহাক এখন ধারে কাছে আসে না। খেলার মাঠেও আসে না। বাবু তো আগেই বিদায় নিয়েছে।

এগারো.
ক্লাসে আনমনে বসেছিল। ক্লাসরুম অচেনা মনে হলো। সবাই মনে হলো আনন্দে ভাসছে। পরীক্ষা নিয়ে আলাপ করছিল মতিন। পাশে দাঁড়িয়ে ছিল জগলু। এদের উপস্থিতি যেন তার খারাপ লাগার মাত্রা বাড়িয়ে দিল। খেলার মাঠ ছেড়েছে এখন স্কুলও ছাড়বে নাকি? তাই মনে হল। ঘণ্টা পড়লে নেয়ামত স্যার এলেন। ক্লাস টিচার উনি। এসে রোল কল করছিলেন। ছেলেরা রেসপন্স করছিল। সিটে বসে ছিল হানীফ। প্রথমদিকে খেয়াল ছিল যে রোল কল চলছে, ওর রোল কল করলে উঠে ‘ইয়েস স্যার’ বলবে। জানালা দিয়ে বাইরে চোখ গেলে স্কুলের বাউন্ডারি ওয়াল পেরিয়ে দূরে রাস্তায় এক লোক মাথায় ঝাঁকা নিয়ে যাচ্ছিলÑ সেদিকে দেখতে দেখতে কখন যে আনমনা হয়ে গিয়েছিল খেয়াল ছিল না। পাশ থেকে একজনের খোঁচায় সম্বিৎ ফিরে পেল। দেখল স্যার তীক্ষè দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন। ক্লাসের সবাই যেন ওর দিকে তাকিয়ে আছে। বুঝল যে ওর রোল কল করেছে। বলল, ‘ইয়েস স্যার।’
স্যার বজ্রবাণ হেনে বললেন, ‘কোথায় থাকিস? রোল কল করছি আর অন্যদিকে তাকিয়ে আছিস? ক্লাসে মনোযোগ থাকে না?’
সে কোনো কথা বলতে পারছিল না।
স্যার বললেন, ‘দাঁড়িয়ে থাক। কান ধরে দাঁড়িয়ে থাক। সারা ক্লাস কান ধরে দাঁড়িয়ে থাকবি, যাতে আর কোনোদিন রোল কলের সময় মন অন্যদিকে না যায়।’
রোল কল শেষে স্যার পড়ানো শুরু করলেন। সবাই মনোযোগ দিয়ে ক্লাস করছিল। কান ধরে দাঁড়িয়ে থাকাতে লজ্জায় মাথা দিয়ে ধোঁয়া উঠতে শুরু করেছিল হানীফের। চারপাশ ভালোভাবে দেখতে পাচ্ছিল না। কথাগুলো ঠিকভাবে শুনতে পাচ্ছিল না। এখানে দাঁড়িয়ে থাকলেও কথাগুলো দূর থেকে ভেসে আসছে।
এখন তো আর ক্লাস থ্রি-ফোরের ছাত্র না। পড়া পারুক আর না পারুক কান ধরে সারা ক্লাস দাঁড়িয়ে থাকা মোটেও সম্মানজনক শাস্তি মনে হলো না। রাগে দুঃখে চোখে পানি আসার উপক্রম। কিন্তু চোখে পানি এলে আরেক ঝামেলা। সে নিশ্চয় এখন আর কচি খোকাটি নেই। চোখে পানি আসবে কেন?
থার্ড পিরিয়ডে সোলায়মান স্যার ঢুকলেন। ক্লাসে ঢোকার স্পিড দেখেই বুঝা গেল উনি খুব রেগে আছেন। তার মেজাজ সব সময়ই চড়া থাকে। এসেই পড়া জিজ্ঞেস করতে লাগলেন। পরীক্ষার আগে কী পড়া দিয়েছিলেন সেই পড়া জিজ্ঞেস করছিলেন। যা কিনা পরীক্ষাতেও এসেছিল। স্যার একে একে পড়া জিজ্ঞেস করছিলেন। হানীফ দেখল সবাই কী যেন বলে দিচ্ছে স্যারও মেনে নিচ্ছেন। তাকিয়ে দেখল তার মতো কেউ আছে কি না? হাবলু ক্লাসে নেই। বাকি থাকে কে? কেউ বাকি থাকে না।
স্যার পড়া জিজ্ঞেস করে যখন ওর কাছে এলেন, দাঁড়াল সে। স্যার কী যেন সূত্র জিজ্ঞেস করলেন। বলতে পারল না। স্যার কানে এক থাপ্পড় দিলেন। প্রস্তুত ছিল না সে, মাথা ঘুরে গেল। তাল সামলাতে না পেরে পড়ে গেল। খানিক বাদে স্থির হলো। দেখল, সবাই তার দিকে চেয়ে আছে।
স্যার চেয়ারে বসলেন। বই খুলে কী সব বললেন। বোর্ডে গেলেন। ‘আজ আমরা যে সম্পাদ্যটা করব…’ অর্ধেক বলে থেমে গেলেন। বললেন, ‘সবাই জ্যামিতি বক্স এনেছিস তো?’
ছাত্ররা বলল, ‘এনেছি স্যার।’
‘কে কে আনিসনি দাঁড়া।’
হানীফের মনে হলো সে জ্যামিতি বক্স আনেনি। আশা করছিল তার সাথে অন্য কেউ দাঁড়াবে। কেউ দাঁড়াল না। তাকে দেখে স্যারের মেজাজ আবার খারাপ হয়ে গেল। হাতের বই টেবিলে রেখে এসে আরও কয়েকটা থাপ্পড় লাগিয়ে দিলেন। রাগে গজগজ করতে করতে বললেন, ‘জ্যামিতি বক্স আনিসনি কেন? পড়াশুনা করবি না, জ্যামিতি বক্স আনবি না তাহলে স্কুলে আসিস কেন? চেহারা দেখাতে আসিস? চলে যা স্কুল থেকে। আর আসিস না।’
স্যার আরও অনেক কথা বললেন। এবার আর চোখের পানি ধরে রাখতে পারল না। কেঁদেই ফেলল। পাশ থেকে কেউ কেউ তাকিয়ে রইল। এখন তার আর এতো খারাপ লাগছে না। সব তো শেষইÑ মান-ইজ্জত যা ছিল। খানিক কান্নার পর বিষয়টা আরও হালকা হয়ে এলো। যে গোমর এতক্ষণ ছিল তা ফাঁস হয়ে যাওয়ায় শান্তি পেল।
স্যার কী কী পড়ালেন বুঝল না সে। অন্যরা ‘জ্বী স্যার, হ্যাঁ স্যার’ বলে সায় দিল। স্যার বুঝানো শেষে বললেন, ‘কারো কোনো প্রশ্ন থাকলে করতে পারিস ।’
এক ছাত্র উঠে প্রশ্ন করল। স্যার হাত নেড়ে দীর্ঘ সময় নিয়ে কী যেন বুঝালেন। টেবিল থেকে ডাস্টার, খাতা নেয়ার সময় ওর দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘ওই পড়াশুনা করবি? না করলে স্কুলে আসিস না। আর ক্লাসে জ্যামিতি বক্স নিয়ে আসবি।’
এটাই যেন বাকি ছিল। চরম পূর্ণতা প্রাপ্তির জন্য আর কী অপমান অপেক্ষা করছিল শেষ ক্লাসগুলোতে সে প্রতীক্ষা করল।

বারো.
স্কুল ব্যাগ কাঁধে বাসার বাইরে এসে দাঁড়াল হানীফ। রিকসাওয়ালাকে বলল ট্রেজারি মোড়ে যেতে। সেন্টুর দোকানে বসে থাকবে। স্কুল ছুটির সময় হলে বাসায় চলে আসবে। প্রতিদিন স্কুলে গিয়ে মার খাওয়ার কোনো মানে হয় না। সব টিচার যেন ওর প্রতি ক্ষেপে আছে। প্রতিটা মানুষ ক্ষেপে আছে।
ট্রেজারি মোড়ে এলে রিকসা থেকে নেমে ঢুকে গেল দোকানের পেছনে। সামনের অংশে চায়ের দোকান। পেছনে ফাঁকা জায়গা। সেখানে কয়েকটা ক্যারাম বোর্ড বসানো আছে। যত আজে বাজে ছেলেপেলে ক্যারাম খেলছে।
এক কোণায় দেখল আমির বসে সিগারেট টানছে। ছেলেটা একসময় ওদের সাথে খেলত। বয়সে ওর চেয়ে বড় তবু সে তুই করেই সম্বোধন করত। গোয়ার টাইপের ছেলে। বুদ্ধিশুদ্ধির ধার ধারে না। গায়ের জোরেই চলত। হানীফের সাথে খেলা নিয়ে বেশ কয়েকবার মারামারি বাঁধার উপক্রম হয়েছিল। ওর আব্বা রিকসা চালাতেন। টানাটানির সংসারে কাউকে বসিয়ে বসিয়ে খাওয়ানোর অবস্থা ছিল না। আর ও ছাত্র হিসাবেও ভালো ছিল না।
আমিরকে দেখে ওসব স্মৃতি মনে পড়ে গেল। এতদিন অবশ্য সেসব ক্ষোভ ধরে রাখার কথা নয়। এরপরও এখন বিনা উস্কানিতে খুঁচাখুচি শুরু করলে বিপদ হবে। ওর আগের চেয়ে পেশীবহুল শরীর হয়েছে। তার উপর মোটর গ্যারেজে কাজ করায় চেহারায় কালি তেল মেখে বিদঘুটে হয়েছে। আগেভাগেই পরিবেশ অনুকূল করার জন্য হানীফ বলল, ‘আমির! ভালো আছিস? এখানে কী করছিস?’
আমির পুরো প্রশ্নের উত্তর দিল না। যেমন ভাবে সিগারেট টানছিল তেমনিভাবে সিগারেটে টান দিয়ে ধোঁয়া ছেড়ে বলল, ‘ভালো।’
আমিরের পাশে মাটিতে ব্যাগ রেখে বসে বলল, ‘কী করছিস এখন?’
আমিরের নির্লিপ্ত উত্তর, ‘আগে যা করতাম।’
‘আজ ডিউটি নাই বুঝি?’
‘আছে।’
‘তাহলে এখানে বসে আছিস যে?’
‘আছি আর কি ।’
আমির অনেকক্ষণ পর প্রশ্ন করল, ‘এখানে কেন?’
হানীফ কোনো তথ্য ফাঁস করল না। এড়িয়ে গিয়ে বলল, ‘না এমনি। স্কুলে তো প্রতিদিনই যাই। আজ এখানে একটু এলাম। তোদের দেখতে।’ হানীফ আর কথা খুঁজে পাচ্ছিল না। বেফাস ভাবে বলে ফেলল, ‘দে তো একটা সিগারেট, একটা টান দেই।’ কথাটা বলেই বুঝল অনর্থক একটা কথা মুখ ফসকে বলে ফেলেছে।
আমির  সিগারেট এগিয়ে দিল না। বলল, ‘সিগারেট খাওয়া ভালো না।’
হানীফ হাফ ছেড়ে বাঁচল। মুখে বলল, ‘তুই খাচ্ছিস কেন?’
‘আমরা না হয় গোল্লায় গেছি, তোদের যেতে হবে না।’
খাতার পাতা ছিড়ে এককোণে দেয়ালের সাথে হেলান দিয়ে চোখ বুজল হানীফ। কেমন ঘুম ঘুম লাগতে শুরু করেছে এমন সময় এক দঙ্গল ছেলে হাউকাউ করতে করতে দোকানের ভেতরে এলো। এটাই হয়ত ওদের আনন্দ প্রকাশের ভাষা এবং ভঙ্গি। বিশ্রী ঠেকল হানীফের কাছে। এদের যে সে কখনো দেখেনি তা নয় তখন এড়িয়ে যেত। গায়ে মাখত না এসব। কিন্তু আজ এড়িয়ে যেতে পারল না। মনে হচ্ছিল গায়ের উপরই বোধ হয় এসে পড়বে। সে যেখানে সেখানে এরা আসবে কেন? এটাই মেনে নিতে পারছিল না। তবে এখন বলে তো লাভ নেই। সে শুনতে পেল একজন প্রশ্ন করছে, ‘এটা কে?’
কেউ  উত্তর দেয়ার আগে অন্যজন ধমক দিল, ‘উঠ ঘুমাস ক্যা?’
হানীফ চোখ বন্ধ করে ছিল। ভয় ঢুকে গেল যদি এসে বলে, ‘এখানে ঘুমিয়েছিস কেন?’ ছেলেটা হয়ত টেনে উঠিয়ে দিতে এসেছিল অন্য কেউ বাধা দিয়ে বলল, ‘থাক ঘুমাইতাছে, ঘুমাক।’
যখন ঘুম ভাঙল তখন দুপুর গড়িয়ে গেছে। আড়মোড়া ভেঙে দেখল এক ক্যারাম বোর্ডে আমির খেলছে। লোকজন কম।

স্কুলে অনিয়মিত হয়ে পড়ল হানীফ। যেদিন সুযোগ পায় স্কুলেই যায় না। গেলেও টিফিন পিরিয়ডে চলে আসে। দিনগুলো এভাবেই কেটে যাচ্ছিল। এখন ক্যারাম খেলার সুযোগ হয়েছে। তবে এদের সে কিছুতেই মেনে নিতে পারছিল না।

তেরো.
যে খারাপ পরিস্থিতির আশঙ্কা করছিল হানীফ, একদিন তাই ঘটল। ষান্মাসিক পরীক্ষার রেজাল্ট দিলে রেজাল্টশীট বাসায় দেখানোর ইচ্ছা ছিল না। কারণ সে চার সাবজেক্টে ফেল করেছে। কিন্তু সেটা গোপন রইল না।
সন্ধ্যার পর বিছানায় শুয়ে শুয়ে উপন্যাস পড়ছিল। ওর আম্মার এদিকে আসার পায়ের আওয়াজ পেয়ে এক লাফে বিছানা থেকে উঠে চেয়ারে বসল। উপন্যাস টেবিলে অন্যান্য বইয়ের মাঝে লুকিয়ে রেখে পাঠ্যবই খুলে পড়ার ভান ধরল। তার আগেই দরজায় এসে দাঁড়ালেন ওর আম্মা। হানীফ ফিরে তাকাল না। পড়ায় খুব মগ্ন থাকায় যেন বুঝতেই পারেনি রুমে কেউ এসেছে। ওর আম্মা থমথমে গলায় বললেন, ‘রেজাল্ট দিয়েছে?’
হানীফ ঘাড় ফিরে তাকাল। ওর আম্মাকে দেখে এমন ভাব করল যে, সে টেরই পায়নি যে তিনি রুমে এসে দাঁড়িয়ে আছেন। আবার ঘাড় ফিরিয়ে পড়ায় মনোযোগ দেয়ার ভান করে বলল, ‘না।’ প্রথম প্রথম মিথ্যা বলতে মুখে বাঁধত এখন আর বাঁধেনা। প্রায়ই মিথ্যা বলতে হয়।
ওর আম্মা আবার জিজ্ঞেস করলেন, ‘কবে দিবে?’
কিছু সময় চিন্তা করে হানীফ বলল, ‘আর কয়েকদিন পরে।’
আর কয়েকটা দিন যেন ব্যাপারটা না জানে এবং সে নিশ্চিন্তে থাকতে পারে। ভেবেছিল এরপর হয়ত তিনি এ বিষয়ে কিছু বলবেন না। অন্য কোনো কথা থাকলে বলবেন। কিংবা চলে যাবেন। কিন্তু হানীফের ধারণা ভেঙ্গে দিয়ে বললেন, ‘নওশাদের রেজাল্ট দিল, তোরটা দিল না কেন?’
হানীফের বুক ধক করে উঠল, মুখ শুকিয়ে গেল। নওশাদের রেজাল্ট দিয়েছে ওর আম্মা জানলেন কিভাবে? নওশাদ কি তাহলে এসে বলে গেছে? তাহলে তো ওর রেজাল্টের খবরও জানিয়ে দিয়ে গেছে মনে হচ্ছে। ওর রেজাল্টের খবর বাসায় জানিয়ে দেয়ার দায়িত্ব নিশ্চয় নওশাদরে নয়। নওশাদের প্রতি রাগে ফুসে উঠল।
ক্ষোভ চাপা রেখে না জানার ভান করে বলল, ‘নওশাদের রেজাল্ট দিয়েছে?’
ওর আম্মা ওর দিকে মুখ শক্ত করে তাকিয়ে ছিলেন। বললেন, ‘হুঁ,তোর রেজাল্ট দিল না কেন?’
হানীফ কথা বলছিল না।
ওর আম্মা কঠিনস্বরে বললেন, ‘রেজাল্টশীটটা দেখি।’
ও মাথা নীচু করে বসে ছিল। তিনি আবার বললেন, ‘কী হলো?’
ও ভয়ে ভয়ে বলল, ‘রেজাল্ট খারাপ হয়েছে।’
‘কী ফার্স্ট হতে পারিসনি?’ কথায় স্পষ্ট ব্যঙ্গ। বিগত বছরগুলোতে ফার্স্ট তো দূরে থাক পাস করেছে টানাটানি করে। তা তার অজানা নয়। তাই এমন প্রশ্ন করার কারণ নেই, রাগ ছাড়া।
হানীফ শুধু বলল, ‘না খারাপ হয়েছে।’
‘কী, প্লেসে নাই?’ এ প্রশ্নও যে বিদ্রুপের কারণে করছেন তাও বুঝল। তবু হানীফ বলল, ‘না আরও খারাপ।’
‘দেখি রেজাল্টশীট।’ কয়েকবার বলায়ও হানীফ চেয়ার থেকে না নড়লে তিনি রুম থেকে বেরিয়ে গেলেন। ফিরলেন লাঠি হাতে। তিনি যে কত রেগে আছেন তা কল্পনাও করতে পারেনি হানীফ। বুঝল কিছুক্ষণ পর। এসে বললেন, ‘কথায় যখন কাজ হবে নাÑ’ কথা শেষ না করে লাঠি দিয়ে কাঁধে কষে একটা বাড়ি মারলেন। কঁকিয়ে উঠল হানীফ। দ্বিতীয় বাড়ি দেয়ার আগে কাঁধে হাত বুলাতে বুলাতে টেবিলে বইয়ের মাঝখান থেকে রেজাল্টশীট বের করে দিল।
রেজাল্টশীট দেখে যেন নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পাচ্ছিলেন না ওর আম্মা। বললেন, ‘ফেল? চার  সাবজেক্টে ফেল!’ রাগে দিগি¦বিগি¦ক জ্ঞান শূন্য হয়ে গেলেন। রেজাল্টশীট হাত থেকে ফেলে দিয়ে লাঠি দিয়ে সজোরে বাড়ি দিলেন পিঠে। আঘাতটা এমন লাগল যে হানীফ চেয়ার ছেড়ে রীতিমত লাফিয়ে উঠল। ব্যথায় কাঁতরাতে কাঁতরাতে প্রতিশ্র“তির সুরে বলল, ‘আর এমন হবে না। বার্ষিক পরীক্ষায় রেজাল্ট ভালো হবে।’
ওর আম্মা দাঁতে দাঁত চিবিয়ে বললেন, ‘রেজাল্ট ভালো হবে তারই তো নমুনা এসব?’
একটা বাড়ি ফেরাতে গিয়ে হাতে লাগল। এবার ব্যথায় কেঁদে ফেলল। হাত ঝাঁকাতে লাগল। করুণভাবে  বলল, ‘বললাম তো এখন থেকে পড়ব।’
ওর আম্মা সে কথা কানে তুললেন না। মুখের কঠিনভাব তখনও কমেনি। বললেন, ‘আর পড়তে হবে না। অনেক পড়েছিস।’
শত অনুনয় বিনয় কোনো কিছুতেই কাজ হল না। লাঠির আঘাত পড়তে লাগল সারা শরীরে। আঘাত অসহ্য হলে চিল্লাচিল্লিতে সারাঘর মাথায় তুলে ফেলল। দু’বার পায়ে পড়ে ক্ষমা চাওয়ার চেষ্টা করল। পারল না। হাঁটুতে বাড়ি লাগলে মেঝেতে শুয়ে পড়ল। ব্যথায় নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছিল। জোরে চিল্লাচিল্লিরও শক্তি ছিল না।
ওর আম্মার হাতও হয়ত ব্যথা হয়ে গিয়েছিল। গালিগালাজ তখনো থামেনি। যাওয়ার সময় বলে গেলেন, ‘বাইরে গিয়ে শয়তানি বদমায়েশি করবি সে সুযোগ পাবি না। হাত-পা ভেঙ্গে ঘরে ফেলে রাখব।’ তিনি রুম থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় দরজার হ্যাসকল লাগিয়ে দিলেন। যাতে বের হতে না পারে। এটাই ছিল হানীফের জীবনের সর্বোচ্চ মার খাওয়া।
ওর আব্বা এখনও বাসায় ফেরেননি। তিনি এসব শুনলে রাতে ছোটখাট কেয়ামত হয়ে যাবে তা সহজেই অনুমেয়। মেঝেতেই পড়ে রইল হানীফ। যেসব জায়গায় বাড়ি লেগেছে যন্ত্রণা হচ্ছে। চোখের পানি যেন কিছুতেই বাঁধ মানছে না। গাল বেয়ে পড়ে মেঝেতেও পড়ছে। এভাবে শুয়ে থাকতে থাকতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছিল তা বলতে পারবে না।
যখন ঘুম ভাঙল ওয়াল ঘড়িতে তাকিয়ে দেখল রাত সাড়ে দশটা বাজে। বাসায় পিনপতন নীরবতা, থমথমে আবহ। যেন যে কোনো মুহূর্তে বড় ধরনের কোনো অঘটন ঘটে যাবে। ওর আব্বা এখন নিশ্চয় এসেছেন এবং পুরো ঘটনা শুনে অগ্নিমূর্তি হয়ে আছেন। প্রতিটা মূহূর্ত কাটতে লাগল অনাকাক্সিক্ষত ঘটনার আশঙ্কায়Ñ কখন ওর আব্বা হুঙ্কার ছেড়ে মারধর শুরু করবেন। অপেক্ষায় থাকতে থাকতে রাত বাড়তে লাগল। ওর আব্বা হুঙ্কার ছেড়ে এলেন না। রাতে আর কিছু ঘটল না।

চৌদ্দ.
সকাল বেলা ঘুম থেকে জেগে উঠে বসতে পারছিল না হানীফ। শরীর ভীষণ দুর্বল হয়ে আছে। একে তো প্রচণ্ড মার তার উপর রাতে খাওয়া হয়নি। সারা শরীর ব্যথা করছে। শীত শীত লাগছিল, মনে হচ্ছে জ্বর এসে গেছে।
কষ্টে উঠে বসল। বাথরুম থেকে হাত মুখ ধুয়ে এসে দাঁড়াল দরজার কাছে। খোলার চেষ্টা করে দেখল বাইরে থেকে লাগানো নয়। বেরিয়ে এলো বাসা থেকে। গেট খুলে এসে দাঁড়াল রাস্তায়। সকাল বলে মানুষজন নেই। দু’একজন ডায়াবেটিসের রোগী বাধ্যতামূলক হাঁটা হাঁটছে।

SHARE

Leave a Reply