Home স্বাস্থ্য কথা টাইফয়েড জ্বর

টাইফয়েড জ্বর

ডা: শাহীদা হোসাইন
যেকোনো রোগজীবাণু দেহে প্রবেশ করলে স্বাভাবিক দেহরক্ষী শক্তি জীবাণু বাধা দেয়ার জন্য যুদ্ধ করে। ফলে দেহের তাপ বৃদ্ধি হয় এবং তা জ্বর আকারে প্রকাশ পায়। সব জ্বরের কারণ বা ধরন একরকম নয়। আমাদের পেটের মধ্যে স্বাভাবিক অবস্থায় জানা-অজানা অনেক জীবাণু বসবাস করে। এদের অনেকেই উপকার করে, অনেকের কোনো ভূমিকা নেই। কোনোটি অনুকূল পরিবেশে মারাত্মক ক্ষতিকারক। এর মধ্যে সালমোনেলা গ্রুপ যা টাইফয়েড রোগের কারণ।
টাইফয়েড জ্বরের ইতিহাস : টাইফয়েড-সংক্রমিত ব্যক্তি রোগজীবাণু বহন করে থাকে। টাইফয়েড রোগজীবাণু মুখ দিয়ে শরীরের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে। রোগজীবাণু মল, প্রস্রাব ও ফোমাইটের মাধ্যমে শরীর থেকে নির্গত হয়। তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই খাদ্য ও পানি জীবাণু দ্বারা দূষিত হলে টাইফয়েড-সংক্রমিত হয়ে থাকে। রান্নাঘরে, ডেইরি ফার্ম এবং বিস্কুট ফ্যাক্টরিতে যারা কাজ করে, তারা যদি বাহক হয়ে থাকে, রোগ বিস্তারের কারণ তারাই।
যেভাবে ছড়ায় : টাইফয়েড জীবাণুঘটিত একটি সংক্রামক রোগ। ন্যূনতম স্বাস্থ্যশিক্ষার অভাব, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, বিশুদ্ধ পানির অভাব, ব্যক্তিগত ও সামাজিক পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার অজ্ঞতা ইত্যাদি কারণে আমাদের দেশে এর প্রকোপ বেশি। সংক্রমিত ব্যক্তিই রোগী বা রোগজীবাণু বহনকারী হিসেবে কাজ করে। রোগীর মলমূত্র পানিতে মিশে রোগজীবাণু বৃদ্ধি পেয়ে পানির মাধ্যমে ছড়ায়। তা ছাড়া মাছি, পিঁপড়া, তেলাপোকা, বিভিন্ন কীটপতঙ্গ টাইফয়েড রোগের জীবাণু খাবারের মাধ্যমে সুস্থ ব্যক্তির শরীরে ছড়িয়ে দেয়।
লক্ষণ : শরীরে জীবাণু প্রবেশের ১০-১৫ দিনের মধ্যে লক্ষণ প্রকাশ পায়।
ষ    জ্বর হচ্ছে প্রথম ও প্রধান লক্ষণ। প্রথম সপ্তাহে চার-পাঁচ দিন পর্যন্ত জ্বর ধাপে ধাপে বাড়ে। জ্বরের সাথে সাথে অস্বস্তিবোধ, মাথাব্যথা, হাত-পা ব্যথা হয়ে থাকে। কখনো পাতলা পায়খানা ও বমি হতে পারে।
ষ    নাড়ির স্পন্দন তাপমাত্রা অনুপাতে কম থাকে।
ষ    প্রথম সপ্তাহের শেষের দিকে পেটের উপরিভাগে অথবা পিঠে লালগোলাপি দানা দেখা দিতে পারে, যা চাপ দিলে মিশে যায়। দুই-তিন দিন পর দানাগুলো আপনা আপনি মিশে যায়।
ষ    ৭ থেকে ১০ দিনে প্লীহা বড় হয়।
ষ    তলপেটের ডানপাশে ব্যথা হতে পারে।
ষ    ফুসফুসে প্রদাহ হতে পারে।
ষ    দ্বিতীয় সপ্তাহে জ্বর আরো বাড়ে।
ষ    সঠিক চিকিৎসা না করালে তৃতীয় সপ্তাহে রোগীর অবস্থা বেশি খারাপ হতে পারে। রক্ত পায়খানা হতে পারে। শেষ পর্যন্ত বিষক্রিয়া হয়ে রোগী মারা যেতে পারে।
জটিলতা : অস্ত্রে ঘা, রক্তক্ষরণ, অস্ত্র ছিদ্র হয়ে যেতে পারে। নিউমোনিয়া, হৃৎপি-ের প্রদাহ, পিত্তথলির প্রদাহ, অস্থিসন্ধির প্রদাহ, মস্তিষ্কের আবরণের প্রদাহ, রক্তশূন্যতা, রক্তে বিষক্রিয়া, মূত্রনালীর প্রদাহ ইত্যাদি হতে পারে।
রোগ নির্ণয় : রোগের ইতিহাস শারীরিক পরীক্ষা ও ল্যাবরেটরির কিছু পরীক্ষার মাধ্যমে এই জ্বর নির্ণয় করা যেতে পারে।
ষ    এক সপ্তাহ পরই রক্তের শ্বেতকণিকা কমে যায় লিম্ফোসাইড বেড়ে যায়।
ষ    প্রথম সপ্তাহে রক্তের কালচার ৯০-৯৫ শতাংশ পজিটিভ হয়।
ষ    মলমূত্রের কালচার প্রথম ও চতুর্থ সপ্তাহে পজিটিভ হয়।
ষ    বিডলি টেস্ট ৮ বা ৯ দিন পর পজিটিভ হয়।
চিকিৎসা : জ্বর ও ব্যথার জন্য বয়সানুযায়ী দিনে তিনবার খাবার পর প্যরাসিটামল ট্যাবলেট বা সিরাপ দেয়া হয়। বেশি তাপমাত্রায় শরীর কোল্ডস্পঞ্জিং করতে হবে।
অ্যান্টিবায়োটিকস যা দেয়া হয়-সিপ্রোফ্লোক্সাসিন, সেপ্ট্রিএক্সন, নেপিডিক্সিড অ্যাসিড ইত্যাদি বয়স এবং ওজন অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শে দিতে হবে।
রোগজীবাণুর বাহক : বাহক তিন ধরনের হতে পারেÑ
ষ    রোগ মুক্তির অব্যাহতি পরের বাহক : টাইফয়েড জ্বরের মুক্তির ছয় থেকে আট সপ্তাহ পর্যন্ত তারা রোগজীবাণু ছড়িয়ে থাকে।
ষ    পুরনো রোগজীবাণু বহনকারী : টাইফয়েড রোগীর ভালো হওয়ার এক বছর যাদের মধ্যে রোগজীবাণু পাওয়া যায় তাদের পুরনো বাহক বলা হয়। এসব বাহকের পিত্তথলি, অস্ত্র ও কিডনির পেলভিসে জীবাণু পাওয়া য়ায়।
ষ    রোগীর সংস্পর্শে গমনকারী বাহক : এরা টাইফয়েড জ্বরে ভোগেনি অথচ এদের মধ্যে এই রোগের জীবাণু পাওয়া যায়। এরাই বিপজ্জনক।
প্রতিরোধের উপায় : আর্থ-সামাজিক অবস্থার উন্নয়ন, স্বাস্থ্যকর ব্যবস্থার উৎকর্ষ সাধন, বিশুদ্ধ পানি নিশ্চিতকরণ, স্বাস্থ্য শিক্ষা, স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধি, ঠাণ্ডা, পচা-বাসি খাবার না খাওয়া, খাদ্যদ্রব্য ভালোভাবে ঢেকে রাখা, মাছি নির্মূল এবং যারা টাইফয়েড জীবাণু বহন করছে তাদের চিহ্নিত করে উপযুক্ত চিকিৎসা প্রদান করা হলে এ রোগ প্রতিরোধ সম্ভব। টাইফয়েড রোগীদের উপযুক্ত চিকিৎসার পাশাপাশি পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখার লক্ষ্যে মলমূত্র মাটিতে পুঁতে ফেলার ব্যবস্থা গ্রহণ, ব্যবহার্য, জিনিসপত্র সিদ্ধ করে জীবাণুমুক্ত করা এবং ব্যক্তিগত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখতে হবে।

SHARE

1 COMMENT

Leave a Reply