Home সায়েন্স ফিকশন সুপার ওয়ার্ড

সুপার ওয়ার্ড

আবদুর রহিম

আকাশের দক্ষিণ-পূর্ব কোণ অন্ধকার হয়ে অঝোর দ্বারায় বৃষ্টি নেমে আসে। এদিক-সেদিক অনেক ছুটাছুটি করেও বৃষ্টি থেকে বাঁচার কোন অবলম্বন না পেয়ে অবশেষে রাস্তার পাশেই একটি গর্তে ঢুকে পড়ে রাফসান। গর্তে ঢুকেই বিষ্ময়ে হতবাক হয়ে যায় সে। কারণ গর্তটা এতটাই পরিপাটি যে, দেখেই মনেহয় কোন রুচিশীল মানুষ পূর্বেথেকেই এখানে বসবাস করে আসছে। সারাদিনের ক্লান্তি নিয়ে গর্তের ভিতর হেলানদিয়ে বসে পড়ে রাফসান। ক্লান্ত শরিরে কখন যে ঘুমে তলিয়ে যায় বুঝতেই পারেনি সে।
ঘুম ভাঙ্গতেই তড়িগড়ি করে বেরিয়ে এসে রাস্তার পাশে দাঁড়ায় রাফসান। রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে একেবারেই বোকা বনেযায় সে। কারণ কিছুক্ষণ আগের সাথে কোনকিছুরই মিল খুঁজে পাচ্ছেনা সে। রাস্তার মধ্যে কোন গাড়ীই চোখে পড়েনা। চারদিক কেমন যেন খালি খালি মনেহচ্ছে। গাছপালা নেই বললেই চলে। রাফসান মনে মনে ভাবে, রাস্তায় কোন গাড়ী নেই কেন, আর গাড়ী ছাড়া মানুষ যাতায়াত করে কিভাবে ? গাছপালার যা কমতি দেখাযাচ্ছে তাতে অক্সিজেন আসে কোথা থেকে ? ভাবতেই রাস্তার পাশে একটি অদৃশ্য স্ক্রীন দৃশ্যমান হয়, আর স্ক্রীনেই ভেসে উঠে তার সব উত্তর। “বর্তমান ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার কারণে বেড়ে চলছে যানবাহন এবং কল-কারখানা। সে সব যানবাহন এবং কল-কারখানার কালো ধোঁয়ার কারণে বেড়ে যাচ্ছে কার্বন-ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ, অন্যদিকে দিন দিন কমতে থাকে উদ্ভিদের সংখ্যা। ফলে বিজ্ঞানীরা আশঙ্কা প্রকাশ করেন আগামী ৫০ বছরের মধ্যে পৃথিবীর দুুই-তৃতীয়াংশ মরুভূমীতে পরিণত হবে এবং এসব এলাকায় প্রাণী জগতের প্রায় ৮৫ ভাগ অক্সিজেনের অভাবে মারা যাবে। আর বাংলাদেশ সেই আশঙ্কাজনক এলাকা গুলোর মধ্যে একটি। এই সমস্যা থেকে উত্তরণের জন্য বাংলাদেশের তরুণ তিনজন বিজ্ঞানী যানবাহনের বিকল্প হিসাবে আবিষ্কার করেণ ‘লিপ্ট রোড’ প্রযুক্তি। এই প্রযুক্তির মূল বিষয় হচ্ছে, এতে কোন যানবাহন থাকবেনা রাস্তাগুলোই হবে লিপ্টের মত। রাস্তাই মানুষকে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে নিয়ে যাবে, ফলে কার্বন-ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ হ্রাস পাবে। এছাড়াও রাস্তার মাঝখানে থাকবে একহাত প্রশস্ত এবং দুই হাত উচ্চতা বিশিষ্ট কাঁচের ঘর যাতে থাকবে ছোট ছোট গাছ, এতে করে অক্সিজেনের ঘাটতিও কিছুটা পুরণ হবে। এই প্রযুক্তি অত্যন্ত ব্যয়বহুল হওয়ায় গত ৫ বছরে এই প্রযুক্তির আওতায় আনা হয়েছে এই জেলাসহ মোট ৩২টি জেলা।” পড়া শেষ হতেই স্ক্রীনটি অদৃশ্য হয়ে যায়। রাফসান লক্ষকরে দেখল সে যে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে রাস্তাটি চলমান অথচ এতক্ষন সে খেয়ালই করেনি। কিন্তু এখন কোনদিকে যাবে তাই নিয়ে পড়েছে বেকায়দায়, কারণ চারদিকের যা পরির্তন তাতে দিক ঠিক করাটাই মুশকিল হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমন সময় মনেপড়ল স্ক্রীনটির কথা। তাই স্ক্রীনকে লক্ষকরে জানতে চাইল তার গন্তব্যের স্থানটি কোনদিকে। সাথে সাথে স্ক্রীনটি আবার দৃশ্যমান হয়। “আপনি যে স্থানের নাম বলেছেন এ নামে এই শহরে কোন স্থান নেই, ছিল ১০০ বছর আগে এখন এর বর্তমান নাম ‘ভাষা শহীদ সালাম রোড’ সংক্ষেপে ইঝঝ রোড। আর সেটি আপনার হাতের ডানদিকে। আপনার অবগতির জন্য এই শহরের সকল স্থানের ১০০ বছর আগের এবং বর্তমান নাম উল্লেখ করা হল। তারপর একে একে সকল স্থানের নাম স্ক্রীনে ভেসে উঠতে লাগল আর রাফসানও সেগুলো একে একে গলাদঃকরন করে নিল।” ব্যস স্ক্রীনটি আবার উধাও। ডানপাশের রাস্তায় দাঁড়াতেই মুহূর্তের মধ্যে পৌঁছে গেল গন্তব্যে। এখানে কোন কিছুই চিনতে পারছেনা সে অথচ এটি তার নিত্যদিনের আড্ডা খানাই বলা চলে। যে হারে ক্ষুদা পেয়ে বসেছে তাতেকরে কিছু খাওয়াটা জরুরী হয়ে দাঁড়িয়েছে। পাশেই একটি জমকালো হোটেল চোখে পড়ল। হোটেলের সামনে দাঁড়াতেই দরজার উপর দুটি লাল এবং সবুজ বাতি পালাক্রমে জ্বলে উঠল। তারপর হোটেলের সুদৃশ্য কাঁচের দরজাটি খুলে যায়। হোটেলে প্রবেশ করে একটি চেয়ারে বসে টেবিলে হাত রাখতেই টেবিলের উপর ভেসে উঠে খাবারের মেনু এবং নির্দেশনা। নির্দেশনা অনুযায়ী রাফসান খাবারের নির্দেশ দিতেই, টেবিলের উপর থেকে নির্দেশনাটি অদৃশ্য হয়ে যায়। একটি রোবট একে একে খাবারগুলো পরিবেশন করে। রাফসান হোটেলে প্রবেশ করার সময় লাল এবং সবুজ বাতি জ্বলায় যে কৌতুহল সৃষ্টি হয়েছে তা জানতে চাইল রোবোটটির কাছে। রোবট জানায় যে, এখানে দরজার উপর একটি শক্তিশালী সুপার অপটিক যন্ত্র বসানো আছে। কোন ব্যাক্তি এই দরজার সামনে দাড়ালেই যন্ত্রটি বলতে পারবে তার মনে কি আছে। ব্যাক্তি যদি প্রকৃতপক্ষে ক্রেতা হয় তাহলে সবুজ বাতি জ্বলে উঠবে। ব্যাক্তির মনে যদি কোন দূরবীসন্ধি থাকে তাহলে জ্বলে উঠবে সবুজ বাতি। আর যদি ক্রেতাও হয় আবার দূরবীসন্ধিও থাকে তাহলে জ্বলবে উভয় বাতি। কথা শেষ করে  উদাও হয়ে যায় রোবটটি। রাফসান এবার নড়েচড়ে বসে, কারণ সে নিজেই জানেনা তার দূরবীসন্ধি কি! অথচ সুপার অপটিক যন্ত্রটি তা নির্ণয় করে বসে আছে। খাবার শেষ করে উঠতে যাবে এমন সময় টেবিলের উপর স্ক্রীনে ভেসে উঠে “আপনার খাবারের মোট বিল দুই টাকা আশি পয়সা।” রাফসান একেকটা জিনিস দেখছে আর অভাক হচ্ছে। এতগুলো খাবারের দাম মাত্র এই কয় টাকা! নিজেকে সামলে নিয়ে ক্যাশ কাউন্টারের দিকে এগিয়ে যায়। সেখানে গিয়ে পড়ল আরেক সমস্যায়, কারণ ক্যাশ কাউন্টারে কোন লোক নেই। খোঁজাখুজি করে অবশেষে দেখতেপেল ক্যাশ কাউন্টারের উপরে একটি স্ক্রীনে লেখা ‘আপনার বিল এখানে রাখুন।’ রাফসান পকেট থেকে দশ টাকার একটি নোট স্ক্রীনের উপর রাখতেই একটি মাইক্রোফোনের আওয়াজ ভেসে আসে,“আপনার এই টাকা গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ এই টাকাটি এখনকার সময় অচল, এর প্রচলন ছিল শত বছর পূর্বে।” এবার যেন অবাক নাহয়ে পারলনা রাফসান। সে স্থির হয়ে ভাবতে লাগল, রাস্তায় স্ক্রীনটি জানাল আমার জানা এই শহরের প্রত্যেকটি স্থানের নাম নাকি একশত বছর আগে ছিল এখন আর নেই। চারিদিকে কেমন একটা অস্বাবাভিক পরিবর্তন। তারপর এখানে আসার পর ঘটল এমনকিছু ঘটনা যা বাস্তবে অসম্ভব। এখন আবার বলছে টাকাটা অচল, অথচ সকালে বাবার কাছথেকে টাকাটা নিয়ে বেরিয়েছি আর বিকাল নাগাদ টাকাটা অচল হয়ে গেল! সে অনেক চেষ্টা করেও কর্তৃপক্ষের মাইক্রোফোনটিকে বোঝাতে পারল না। অবশেষে কর্তৃপক্ষ বিষয়টি সম্পর্কে শহরের মেয়র আহাম্মেদ নাফিসকে অবহিত করেন। তিনি সব শুনে রাফসানকে তার কাছে পাঠিয়ে দিতে বলেন। হোটেল কর্তৃপক্ষ একটি রোবটের সহযোগিতায় তাকে পাঠিয়ে দেয় মেয়রের বাসভবনে। আহাম্মেদ নাফিস একজন ন¤্র এবং সদালাপি মানুষ। তিনি এতটাই বিনয়ের সাথে কথা বোলছিলেন যে, মনেই হয়না তিনি একজন মেয়র। রাফসান সব ঘটনা তার কাছে খুলে বলল। তিনি সব ঘটনা শুনে জাতীয় পরিচয় পত্র আছেকিনা জানতে চাইলে রাফসান পকেট থেকে জাতীয় পরিচয় পত্রটি বের করে দেয়। পরিচয় পত্র দেখে আহাম্মেদ নাফিস রাফসাকে বলেন, তোমার কাছে মনে হয়েছে ঐ গর্তে তুমি অল্প কিছুক্ষণ ঘুমিয়েছ মাত্র, কিন্তু তোমার সে ঘুম ছিল ১০০ বছর দীর্ঘ। জন্মতারিখ অনুযায়ী এখন তোমার বয়স ১২২ বছর। আমাদের রাষ্ট্রিয় আইন অনুযায়ী ১৮ বছরের নিচে এবং ৬৪ বছরের উপরে যাদের বয়স তাদেরকে কোন আয়-উপার্জন করতে হয়না। তাদের থাকা-খাওয়ার খরচ সরকার বহন করে। আমি প্রধানমন্ত্রীর সাথে কথা বলে তোমার সব ব্যবস্থা করে দিচ্ছি বলেই ভেতরে চলে গেলেন। কিছুক্ষণ পর আহাম্মেদ নাফিস ফিরে এলেন আগের চেয়ে অধিক হাসে¦াজ্জল মুখ নিয়ে। তিনি রাফসানকে বলেন, এখানকার সময় একজন মানুষ তার নিত্যপ্রয়োজনীয় সবগুলো প্রয়োজন মিটিয়ে ভালোভাবে চলতে গেলে খরচ হয় ৫০০-৫৫০ টাকা। আমি প্রধানমন্ত্রীর সাথে কথা বলে তোমার জন্য ৬০০ টাকার একটি মাসিক ভাতা ঠিক করেছি। আর তোমার থাকার জন্য এই শহরের শহীদ সেলিনা পারভিন রোড অর্থাৎ ঝঝচ রোডে একটা দোতলা বাড়ী তোমার নামে লিখে দেয়া হয়েছে,এখন থেকে তুমি সেখানেই থাকবে। তোমার জন্য সবচেয়ে খুশির খবর হচ্ছে প্রধানমন্ত্রী খুব শীঘ্রই এই শহরে সফর করতে আসবেন। সফরকালীন তিনি একটি সমাবেশ করবেন। তিনি চাইছেন সে সমাবেসেই তোমাকে একটি সংবর্ধনা দিতে, কারণ আমাদের জানা অনুযায়ী বর্তমানে পৃথিবীতে সবচেয়ে বয়স্ক মানুষ তুমি। কথাশেষ করে একটি রোবটকে দিয়ে বাসায় পৌঁছে দেয় রাফসানকে। রাফসান বাসায় ঢুকতেই অন্য একটি রোবট এসে স্বাগতম জানায় তাকে। “আমাকে আপনার সেক্রেটারী হিসাবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। আপনার সকল কাজ আমি করে দেব। আপনাকে কিছুই করতে হবেনা, আপনি শুধু নির্দেশ দিবেন” কথাগুলো একনাগাড়ে বলল রোবটটি। বাসায় ঢুকে সোফায় বসে পুরো ড্রয়িং রুমের উপর একনজর চোখ বুলিয়ে নিল। ড্রয়িং রুমটা যেন একটা ছোটখাট খেলার মাঠ, একসেট সোফা আর একটি টিটেবিল ছাড়া আর কিছুই নেই। এমন সময় রোবটটি পাশ থেকে একটি রিমোর্ট কন্ট্রোল নিয়ে বোতামে চাপ দিতেই সামনের দেয়াল জুড়ে বিশাল টিভি স্ক্রীন ভেসে উঠল। রাফসান কিছুক্ষণ টিভি দেখে, খাবার খেয়ে ঘুমাতে যায়। কিন্তু কোনভাবেই ঘুম আসছেনা। এমন সময় চায়ের কাপ হাতে হাজির হল রোবট। রোবটের কাছথেকে চায়ের কাপ নিতে নিতে জানতে চাইল রাফসান, আচ্ছা আজ থেকে একশত বছর আগে আমেরিকা ছিল বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর রাষ্ট্র, আর বাংলাদেশ ছিল একটি উন্নয়নশীল রাষ্ট্র মাত্র। একশত বছরের ব্যবদানে বাংলাদেশ যদি এত উন্নত রাষ্ট্র হয়, তাহলে আমেরিকা কত বেশী উন্নত ? রাফসানের কথা শেষ হতেই বলতে শুরু করল রোবট, আজ থেকে একশত বছর পূর্বের সেই ক্ষমতাধর রাষ্ট্র আমেরিকা এখন বিশ্বের সবচেয়ে দরিদ্র রাষ্ট্রগুলোর একটি। বাংলাদেশ এখন বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর তিনটি রাষ্ট্রের একটি। আর এটি সম্ভব হয়েছে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী আহাম্মেদ জাফরের সুশাষণ এবং কর্মস্পৃহার কারণে। আর ক্ষমতাধর অপর রাষ্ট্র দুটি হল চীন এবং ইরান। কথা শেষ করে রাফসানের হাত থেকে খালি চায়ের কাপ নিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে যায় রোবটটি। সারাদিনের ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো মাথা থেকে ঝেড়ে পেলে ঘুমানোর চেষ্টা করে, কিন্তু ঘুম যেন কোন ভাবেই ধরা দিতে চায় না। একদিকে অনেক কিছু জানার কৌতুহল তার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে, অপরদিকে বাংলাদেশকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে যিনি সবচেয়ে বেশী অবদান রেখেছেন সেই মহান ব্যাক্তির থেকে সংবর্ধনা নিতে যাওয়ার এক অজানা আনন্দ তার মনকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে। রাফসান মনে মনে ভাবতে থাকে, সল্প সময়ে পৃথিবীর এমন পালাবদল কেউ কি কখনো আশা করেছিল। কি নাম দেয়া যায় বর্তমান এই পৃথিবীর ? অনেক ভেবে চিন্তে রাফসান এই অবাক বিশ্বের নাম দেয় “সুপার ওয়ার্ড”। সারাদিনের ঘটনাগুলো ভাবতে ভাবতে ঘুমের মধ্যে তলিয়ে যায় সে।
“রাফসান, চা ঠান্ডা হয়ে পানি হয়ে গেল তাড়াতাড়ি ঘুম থেকে উঠে চা খেতে এসো।” মায়ের ডাক কানে আসতেই লাফিয়ে উঠে বিছানার উপর বসে পড়ে রাফসান। চারিদিকে তাকিয়ে কোনভাবেই মিলাতে পারছেনা সে। যেন মনের স্ক্রীন থেকে উদাও হয়ে যায় তার স্বপ্নের “সুপার ওয়ার্ড”।

SHARE

1 COMMENT

Leave a Reply