Home গল্প খোকার বাড়ি ফেরা

খোকার বাড়ি ফেরা

সুলতান মাহ্মুদ

ছেলেটা শুধু হাসছে। হাসলে ওকে দারুণ লাগে। তাই বলে এত হাসি!
এত হাসিস নাতো- কপট রাগ দেখায় হাসিনা বানু। আয় খেতে  আয়। কত দিন পর বাড়ি এলি, কই দুটো ভালো মন্দ খাবি তা’না, শুধু হাসি আর হাসি।
মা কী রেঁধেছ?
রেঁধেছিরে রেধেছি, তোর সখের মুড়িঘণ্ট, রুই মাছ, কলই শাখ, খেসারির ডাল।
দাও মা দাও, খিদেয় পেট চোঁ চোঁ করছে।
ছেলেকে খেতে বসিয়ে রুই মাছের বড় মাথাটা এগিয়ে দেয় হাসিনা বানু। খুব মজা করে খাচ্ছে ছেলেটা। হাসিনা বানু তাকিয়ে থাকে কিন্তু হঠাৎ সবকিছু কেমন ঝাঁপসা হয়ে আসছে। হাসিনা বানু তার সামনে বসে থাকা ছেলেকে আর দেখতে পায় না। খোকা.. খোকা… হাসিনা বানু ভীষণ জোরে ডাকতে থাকে কিন্তু কোন সাড়া-শব্দ নেই। এক সময় হাসিনা বানুর গলা থেকে আর কোনো শব্দ বের হয় না। মনে হচ্ছে কেউ একজন তার গলাটাকে জাপটে ধরে আছে।
“আস্ ছলাতু খইরুম মিনান্ নাউম, আস্ ছলাতু…।”
আজানের শব্দে ঘুম ভেঙে যায় হাসিনা বানুর। প্রচণ্ড শীতেও সে ঘামছে। সে বুঝতে পারে এতক্ষণ স্বপ্ন দেখছিল। অনেক দিন ছেলেকে দেখে না হাসিনা বানু। কাল অনেক রাত পর্যন্ত ছেলের চিন্তা করতে করতে ঘুমিয়ে পড়েছিল। হয়ত সেই জন্যই ছেলে স্বপ্নে এসে ধরা দিয়েছে। হাসিনা বানু তাড়াতাড়ি ঘুম থেকে উঠে নামাজ পড়ে নেয়।
এ বছর তীব্র শীত পড়েছে। সূর্যটা প্রায় সারাদিনই কুয়াশার আড়ালে ঢাকা থাকে। প্রচণ্ড শীতে স্বাভাবিক কাজকর্ম করাই দায় কিন্তু হাসিনা বানু কাজ করছে। তার ছেলে রফিক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছে। ছেলেটা কতদিন বাড়ি আসে না!  একটা চিঠিও দেয় না। তবে প্রতিবছর শীত এলেই সে বাড়ি আসে। এখন যেহেতু শীত তাই যে কোনো দিন বাড়ি আসতে পারে। গত কয়েক মাস আগে রফিক বাড়ি এসেছিল। কী এক ব্যস্ততায় সে বেশি দিন বাড়ি থাকতে পারেনি। প্রায় সারাক্ষণই বলত, মা, ওরা আমাদের মুখের ভাষাকে কেড়ে নিতে চায়, কেড়ে নিতে চায় আমাদের বর্ণমালা, মুছে ফেলতে চায় আমাদের জাতিসত্তা। তোমার কোলে শুয়ে বাংলা ভাষায় ওরা গল্প শুনতে দিতে চায়না, তুমিই বল মা, তাকি আমরা মেনে নিতে পারি?  হাসিনা বানু হেসেছিল। পাগল ছেলে, কারো মুখের ভাষা কি কেউ কেড়ে নিতে পারে। তারপর ছেলেটা সেই  যে গেল, আর এলোনা। হাসিনা বানু ছেলের জন্য নানা রকম পিঠা বানায়। এ বছর খেজুর গাছে প্রচুর রস হয়েছে। বেশির ভাগ পিঠাই খেজুরের রস দিয়ে বানানো।  দিন নেই রাত নেই সে পিঠা বানাচ্ছে।  নানান রকমের পিঠা খাইয়ে এবার ছেলেকে চমকে দিতে চায় সে।
দেখেতে দেখতে অনেকদিনন চলে গেল। শীত কমে এসেছে।  সূর্যের তেজটাও আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে।  চারদিকে প্রকৃতি যেন নতুন সাজে সজ্জিত হয়েছে। কিন্তু হাসিনা বানুর মনে সে আমেজের ছোঁয়া লাগেনি। তার খোকা আজও বাড়ি ফিরেনি।  কতদিন হয় পিঠাগুলো শিকেয় তোলা।  পিঠাগুলো আর কতদিন ভালো থাকবে কে জানে।  তবে হাসিনা বানুর কাজ কমেনি। ছেলেতো যেকোন দিন  এসে পড়তে পারে। ও ঢাকায় থাকে, কি খায় না খায়, তার কোন ঠিক আছে? বাড়িতে সে নানান রকমের সব্জি চাষ করছে। লাল শাক, পুঁই শাক, সীম, লাউ, কুমড়া,ঢেঁড়শ আরো কত কি! বাড়ির পুকুরটিতে বর্ষা আসার সাথে সাথে ঝাকা দিয়ে দিয়েছিল। পুকুরে এখন অনেক মাছ। সারাদিন  কৈ, শিং, মাগুর, শৈল মাছের লাফালাফি।।  তা দেখে আনন্দে নেচে উঠে হাসিনা বানুর মন।  বাড়িতে আছে কিছু হাঁস-মুরগী সব মিলিয়ে ছেলের জন্য বিরাট আয়োজন করে রেখেছে সে।  কিন্তু  যার  জন্য এত আয়োজন সেতো আজও  এলোনা। বিকেলে হাসিনা বানু করিম মাষ্টারের বাড়ি যাবে। তাকে দিয়ে একটি চিঠি  লিখে কালই  পোষ্ট করে দিবে সে।
সকাল থেকেই সূর্যটা টকটকে লাল আকার ধারন করেছে। মনে হচ্ছে রক্ত দিয়ে সূর্যটা গোসল করেছে আজ। শিমুল, পলাশ আর কৃষ্ণচূড়া গাছে অনেক ফুল ফুটেছে।  গাছ গুলোর মাথার উপর দিয়ে যেন  রক্তের নদী বয়ে গেছে। এই ফুল গুলো যেন সূর্যের সাথে প্রতিযোগীতা করছে।  শিমুল গাছের মগডালে কোকিলেরা বাসা বেধেঁছে। তারা একতানে গান গাইছে। বাড়ির আঙিনায় বসে আছে একটা হলুদ পাখি। সেও সাথে সাথে ঠোট মিলাচ্ছে।  এ পাখিটিকে কলা হয় কুটুম পাখি। সে অনবরত গেয়ে চলছে। একটা কুটুম..একটা কুটুম…। এই ভর দুপুরে তার গান যেন এক নতুন আমেজের সুষ্টি করেছে।  মনে হয় বাড়িতে আজ কোন নতুন মেহমান আসবে। মনে মনে সে কথাই ভাবে হাসিনা বানু। তবে কি তার ছেলে আসবে। তাই হয়ত, নইলে পাখি, ফুল  আর সূর্যটা কেন আজ নতুন সাজে সেজেছে। টিং টিং শব্দ হয় হাসিনা বানুর উঠানে। পোষ্ট মাষ্টার এসেছে। তার চোখে মুখে বিষন্ন একটা ভাব। আপনার ছেলের চিঠি। হাসিনা বানু চিঠিটা হাতে নেয়।  পোষ্ট মাষ্টার  আর দেরী করেনা, চোখ মুছতে মুছতে চলে যায় সে। হাসিনা বানু অবাক হয়। খাম থেকে চিঠিটা  খুলে হাসিনা বানু। চিঠিটা ছেড়া আর  রক্তে ভেজা। হাসিনা বানু সূর্য,শিমুল  গাছ আর চিঠিটার দিকে তাকায় কিন্তু কিছুই বুঝতে পারেনা সে।
বিকেলে করিম মাষ্টার চিঠিটা পড়ে শোনায়। অবশ্য আগে সে নিজে পুরো চিঠিটা পড়ে নেয় তাপর হাসিনা বানুকে শোনায়। চিঠিটা পড়ার সময় করিম মাষ্টারের চোখে পানি জমে উঠে। বিষয়টা হাসিনা বানুর নজর এড়ায়না।কোন খারাপ খবর নয়তো? ব্যাপারটা জানতে চায় সে। করিম মাষ্টারের চোখে তখন হাসি আর কান্নার একটা মাঝামাঝি অবস্থার সৃষ্টি হয়। নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করে সে। না- মানে তোমার ছেলে শীঘ্রই  বাড়ি ফিরবে। সে কথাই সে চিঠিতে লিখেছে। সত্যি! আনন্দে হাসিনা বানুর বুক ভরে উঠে। বাড়ি ফিরে তাড়াতাড়ি দু রাকাত শোকরানা নামায আদায় করে সে।
সময় বয়ে যায় কিন্তু প্রতীক্ষার প্রহর শেষ হয়না। শিমুলের ফুল গুলো মরে গেছে সেই কবে। সব্জি গাছ গুলো বাগানেই শুকিয়ে গেছে। পুকুরের মাছ গুলো বর্ষার পানিতে চলে গেছে। দিন, মাস পেরিয়ে বছর ঘুরে আবার শীত আসে। হাসিনা বানুর চোখে এতদিনে কালি পড়ছে। বড় ক্লান্ত সে। বড় বিষন্ন তার মন। প্রতিদিন তার মনে হয় খোকা আসবে কিন্তু খোকা আসেনা। কিন্তু তাই বলে কি সে বসে থাকবে। হয়ত খোকা খুব তাড়াতাড়িই আসবে। আবার পিঠা বানায় সে। বাড়ির আঙিনা আবার ভরে উঠে সবুজ ফসলে। শিমুল, পলাশ, কৃষ্ণচূড়া আবার ফিরে এসেছে। বাড়ির আঙিনায় হলুদ পাখিটাকেও দেখা যায়।

SHARE

Leave a Reply