Home প্রচ্ছদ রচনা ভাষাতেই জীবনের প্রকাশ

ভাষাতেই জীবনের প্রকাশ

জয়নুল আবেদীন আজাদ

ভাষা আমাদের প্রিয় বিষয়, প্রয়োজনীয় বিষয়। ভাষা না হলে মানুষের, সমাজের বিকাশ ঘটতো না। পৃথিবীও পারতো না এতদূর এগুতে। তাই বলতে হয়, প্রগতির সাথে ভাষার রয়েছে গভীর সম্পর্ক। প্রতিদিন ভোরে আমরা যখন চোখ খুলি তখন আমাদের দৃষ্টির সীমানায় মানুষ ছাড়াও ধরা দেয় পশু-পাখি এবং বৈচিত্র্যময় প্রকৃতিজগত। একটু সচেতন হলেই আমরা শুনতে পাব মানুষ, পশু-পাখি ও প্রকৃতিজগতের বিচিত্র ভাষা। তাইতো কবি বলেনÑ
ভাষাহীন নয় পশু-পাখি, তুচ্ছ তৃণলতাও
ভাষাইতো জীবনের প্রাণময় প্রকাশ,
কত যে মর্মকথা ছড়িয়ে আছে
ভাষার এ বিচিত্র সংসারে।
নদীও ছলছল কলকল করে কত কথা বলে যায়। আসলে ভাষা মানুষের অস্তিত্বে বিরাজমান, বিরাজমান প্রকৃতির অস্তিত্বেও। সবাই নিজের মত করে কথা বলছে বিচিত্র ভঙ্গিমায়। ভাষা আছে বলেই পৃথিবী এত প্রাণচঞ্চল ও আনন্দময়। পৃথিবীতে অনেক ধনী দেশ আছে, গরিব দেশও আছে; সমাজেরও ধনী মানুষ আছে, গরিব মানুষ আছে। লক্ষণীয় বিষয় হলো, সবার কাছে সব সম্পদ না থাকলেও একটি সম্পদ কিন্তু সবার কাছেই আছে, সেই সম্পদের নাম ভাষা। এ কারণেই বলা যায়, ভাষা হলো মানুষ ও প্রকৃতির সর্বজনীন সম্পদ।
ভাষা নিয়ে আমাদের এই জনপদে ঘটে গেছে ঐতিহাসিক ঘটনা। পাকিস্তানের তখনকার শাসকরা উর্দুকে আমাদের ওপর চাপিয়ে দিতে চেয়েছিল। ফলে মাতৃভাষা বাংলার অধিকার প্রতিষ্ঠায় জনপদের ছাত্রজনতা হয়ে ওঠে সংগ্রাম মুখর। যার চূড়ান্ত পরিণতি ঘটে ১৯৫২ সালে ২১ ফেব্রুয়ারি। রক্তের বিনিময়ে, প্রাণের বিনিময়ে বাংলা পায় রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা। আজও আমরা শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করি রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের শহীদ সালাম, বরকত, রফিক, জব্বারদের। অন্যায়ের কাছে মাথা নত না করার শিক্ষা দিয়ে গেছেন আমাদের ভাষাশহীদরা। আগে ২১ ফেব্রুয়ারি পালিত হতো ‘শহীদ দিবস’ হিসেবে। ২০০০ সালে জাতিসংঘ দিনটিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। এরপর থেকে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ২১ ফেব্রুয়ারি ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেব পালিত হয়ে আসছে। এর লক্ষ্য মানুষকে মাতৃভাষার গুরুত্ব সম্পর্কে আরও সচেতন করা।
মাতৃভাষা মানুষের জন্মগত অধিকার, মৌলিক অধিকার। জন্মের পর মায়ের কোলেই শিশু মায়ের ভাষার সাথে পরিচিত হয়। পরে বয়স বাড়ার সাথে সাথে শিশুর মাতৃভাষা শেখার বিষয়টি পূর্ণতা পেতে থাকে। তবে এর জন্য প্রয়োজন হয় শিক্ষার এবং চর্চার। আমরা জানি, শিক্ষা তথা জ্ঞান অর্জন ছাড়া মানুষ যোগ্য হতে পারে না। জাতিও এগুতে পারে না। কিন্তু ভাষা ছাড়া কি জ্ঞান অর্জন সম্ভব? জ্ঞান বলি, ভাব বলি কোনো কিছুরই প্রকাশ ভাষা ছাড়া সম্ভব নয়। ভাষা এতটাই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এ কারণেই মহান আল্লাহ মানুষকে বিভিন্ন নেয়ামতের পাশাপাশি উপহার দিয়েছেন ভাষার মত অমূল্য নেয়ামতও। মহাগ্রন্থ আল কুরআনে ভাষা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ কিছু কথা বর্ণিত হয়েছে। যেমন, “আল্লাহ মানুষ সৃষ্টি করেছেন এবং তাকে ভাব প্রকাশের জন্য ভাষা শিক্ষা দিয়েছেন।” (সূরা আর-রাহমান, আয়াত ৩-৪) আর ভাষা শিক্ষার ক্ষেত্রে মাতৃভাষা যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ তা উপলব্ধি করা যায় এই আয়াতে, “আমি প্রত্যেক রাসূলকেই তাঁর স্বজাতির ভাষাভাষী করে পাঠিয়েছি তাদের নিকট পরিষ্কারভাবে ব্যাখ্যা করার জন্য…।” (সূরা ইব্রাহীম, আয়াত ৪) পবিত্র কুরআনের আর একটি আয়াত থেকে এ কথা স্পষ্টভাবে উপলব্ধি করা যায়, পৃথিবীতে এত যে ভাষা তা বৈচিত্র্যের এক অনুপম উদাহরণ। তাই ভাষাকে কেন্দ্র করে মানুষে মানুষে বিদ্বেষ কিংবা উগ্র জাতীয়তাবাদ কোনো বিবেকবান মানুষের কাম্য হতে পারে না। যেমন পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে, “এবং তাঁর নিদর্শনাবলীর মধ্যে রয়েছে আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সৃষ্টি এবং তোমাদের ভাষা ও বর্ণের বৈচিত্র্য। এতে জ্ঞানীদের জন্য অবশ্যই রয়েছে নিদর্শন।” (সূরা রুম, আয়াত ২২)
পবিত্র কুরআনের আলোকে আমরা স্পষ্টভাবেই জানলাম যে, জ্ঞান ও ভাব প্রকাশের জন্য ভাষার কোনো বিকল্প নেই। তআ ভাষাচর্চা মানুষের মৌলিক দায়িত্ব ও অধিকারের  অন্তর্ভূক্ত । আর ভাষাচর্চার ক্ষেত্রে প্রথমেই দৃষ্টি দিতে হবে মাতৃভাষার প্রতি। কারণ জীবনের শুরুতে কোনো কিছু পরিষ্কারভাবে বুঝতে হলে মাতৃভাষার সাহায্য নেওয়াটাই হবে সহজ ও স্বাভাবিক। কিন্তু মাতৃভাষার চর্চা করতে গিয়ে, মাতৃভাষাকে ভালোবাসতে গিয়ে অপর কোনো ভাষার প্রতি যেন আমাদের মনে না জাগে কোনো দিদ্বেষ। কারণ প্রতিটি মানুষের কাছে তার মাতৃভাষা প্রিয় এবং সেই ভাষায় কথা বলা তার জন্মগত অধিকারও বটে। পৃথিবীতে বহু ভাষার অস্তিত্বকে পবিত্র কুরআন ভাষা-বৈচিত্র্য হিসেবে বিবেচনা করার শিক্ষা দিয়েছে মানবজাতিকে। তাই ভাষাভিত্তিক বিদ্বেষ কিংবা ভাষাভিত্তিক উগ্রজাতীয়তাবাদ কোনো মানবিক বিষয় হতে পারে না।
বাংলাভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে প্রধান দাবিটি ছিল সর্বস্তরে মাতৃভাষার প্রতিষ্ঠা। কিন্তু সেই দাবি এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি। আইন-আদালতে, প্রশাসনে চলছে ইংরেজি ভাষা। জনসাধারণের কাছে বিদ্যুৎ, পানি ও টেলিফোনের বিল আসে ইংরেজি ভাষায়। ডাক্তার সাহেবরা বাংলাভাষী মানুষকে ব্যবস্থাপত্র দেন ইংরেজি ভাষায়। এতে জনসাধারণকে পড়তে হয় অসুবিধায়। কিন্তু জনসাধারণকে এই অসুবিধায় ফেলার কারণ কী? এখনতো ইংরেজ কিংবা উর্দুভাষীরা দেশ চালান না। বাংলাভাষীরা দেশ পরিচালনার পরও কেন এতদিনেও বাংলাদেশের সর্বস্তরে বাংলাভাষা  প্রতিষ্ঠিত  নয়? এর কোনো সদুত্তর আছে কী? সর্বস্তরে বাংলাভাষা প্রতিষ্ঠিত করতে হলে অন্তরিকতার পাশাপাশি বিজ্ঞান-প্রযুক্তিসহ আরো কিছু বিষয়ে গবেষণা ও অনুবাদকর্মের প্রয়োজন রয়েছে, পরিভাষা সৃষ্টিরও প্রয়োজন রয়েছে। এই ক্ষেত্রে কিছু কাজ হয়েছে, বাকি রয়েছে অনেক কিছু।
এসব দৈন্য দূর করতে হলে আবেগের চাইতেও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বাস্তবভিত্তিক কর্ম-পরিকল্পনা।

SHARE

Leave a Reply