Home স্মরণ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃতীছাত্র শহীদ নজীর

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃতীছাত্র শহীদ নজীর

ড. মুহাম্মাদ নূরুল ইসলাম

শহীদ নজীর আহমদ সরিমুর্লাহ মুসলিম হরের আবাসিক ছাত্র ছিলেন।

আজ তোমাদেরকে এক কৃতী ছাত্রের কথা বলব। তোমাদের কেউ কেউ তার কথা শুনেও থাকতে পার। তিনি হচ্ছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃতীছাত্র শহীদ নজীর।
১৯৪৩ সালের ২ ফেব্রুয়ারি বৃহস্পতিবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃৃতীছাত্র ও ছাত্রনেতা নজীর আহমদ হিন্দু ছাত্রদের সাম্প্রদায়িক জিঘাংসার শিকার হয়ে শাহাদাত বরণ করেন। শহীদ নজীর ছিলেন কৃতীছাত্র, আদর্শ ছাত্র আন্দোলনের অনন্য মডেল ও অসাধারণ জনপ্রিয় ছাত্রনেতা। তার জন্ম চৈত্র ১৩২৪ সালে। তদানীন্তন নোয়াখালী জেলার ফেনী মহকুমার বর্তমান ফেনী জেলা দাগনভূঞা উপজেলার দক্ষিণে আলিপুর গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম ছিল মৌলভী আবদুল মজিদ। চার ভাই ও দুই বোনের মধ্যে নজীর আহমদ ছিলেন তার বাবার দ্বিতীয় সন্তান। প্রাথমিক শিক্ষার গোড়াপত্তন হয় বাণীপুর উচ্চ প্রাইমারী স্কুলে। তৃতীয় শ্রেণী পর্যন্ত নজীর এই স্কুলে পড়ার পর কৃষ্ণরামপুর উচ্চ প্রাইমারি স্কুল চলে যান। সেখান থেকেই তিনি কৃতিত্বের সাথে উচ্চ প্রাইমারি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। তারপর দাগনভূঞা এমএ স্কুল বর্তমানে কামাল আতার্তুকা হাইস্কুল থেকে বিশেষ কৃতিত্বের সাথে পাস করেন। শহীদ নজীর ১৯৩৭ সালে নোয়াখালী কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা সদরের বসুরহাট হাইস্কুল থেকে বৃত্তি নিয়ে বিশেষ কৃতিত্বের সাথে ম্যাট্রিক পাস করেন। ১৯৩৯ সালে ফেনী কলেজ থেকে কৃতিত্বের সাথে আইএ পাস করেন। এরপর তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। তিনি সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের আবাসিক ছাত্র ছিলেন। তার আদর্শবাদিতা, নিঃস্বার্থপরতা, পরোপকার, সৎ সাহস, মেধা ও নিষ্ঠার কারণে অল্প দিনের মধ্যে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শীর্ষস্থানীয় ছাত্র হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. রফিকুল ইসলাম লিখেছেন, ‘১৯৪৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মেলনে হিন্দুছাত্রদের বন্দে মাতরম গান গাওয়া নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। টেনিস মাঠে দু’পক্ষের মধ্যে ইট ছোঁড়াছুঁড়ি চলছিল। একদল হিন্দু ছেলে কাছে দাঁড়িয়ে এতে উৎসাহ দিচ্ছিল। ব্যাপারটি যাতে সহজে মিটমাট হয়ে যায় সে জন্য তিনি (শহীদ নজীর) তাদের কাছে এগিয়ে গেলেন। নজীরের দৃঢ়বিশ্বাস ছিল, তারাও অন্তর থেকে অশান্তি চায় না। শান্তির প্রস্তাব ব্যর্থ যাবে না। কিন্তু তা হলো না, অতর্কিতে তার বুকে ছুরি বসিয়ে দেয়া হলো। ‘ওহ্’ করে উঠে নজীর মাটিয়ে লুটিয়ে পড়লেন। দ্রুত তাকে হাসপাতলে নেয়া হলো। কিছুক্ষণ পর হাসপাতালে তাকে মৃত ঘোষণা করা হয়। মাত্র একদিন পূর্বে ছাত্রদের এক সংঘর্ষে কিছু ছাত্র আহত হয়। আহত হয়ে যারা হাসপাতলে ভর্তি হয় নজীর তাদের সেবায় আত্মনিয়োগ করেছিলেন এবং কি হিন্দু কি মুসলমান সকল ছাত্রই তার সেবা পেয়েছিল। মানবতার এমণ এক উৎসগী সেবাকে এভাবে শান্তি প্রতিষ্ঠার কাজে প্রাণ দিতে হবে এটা ছিল সবার কল্পনার বাইরে। (ড. রফিকুল ইসলাম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যাালয়ের ৭০ বছর, দৈনিক বাংলার বাণী, ৬ মার্চ ১৯৯২।)
নজীর ছিলেন ‘পাকিস্তান’ পত্রিকার পরিচালক। পাকিস্তান পত্রিকার জন্য নজীরকে একাধারে লেখক, প্রকাশক, মুদ্রাকর, সম্পাদনা ইত্যাদি সকল কাজই করতে হয়েছে। পত্রিকাটি মুসলমানদের স্বতন্ত্র আবাস পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আন্দোলন ত্বরান্বিত করছিল। জনমত সৃষ্টিতে এর অবদান ছিল অসীম। ব্রিটিশ আমলে এই উপমহাদেশের বাঙালী মুসলমানদের একমাত্র জাতীয় দৈনিক ছিল কলকতা থেকে প্রকাশিত দৈনিক আজাদ। বেনিয়া সাম্রাজ্যবাদী সরকার প্রত্রিকাটির প্রকাশ বন্ধ করে দিয়েছিল। তখন সংবাদপত্রগুলো বিরোধিতা করে অবিলম্বে দৈনিক আজাদ পত্রিকা পুনঃপ্রকাশের দাবি জানিয়ে নজীর ঢাকায় একটি জনসভা করেছিলেন।
সিরাজগঞ্জে যখন কায়েদে আজমের সভাপতিত্বে নিখিল ভাবত মুসলিম লীগ কনফারেন্স হয় তখন নজীর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ছাত্রদের এক বিরাট বাহিনী নিয়ে এ কনফারেন্সে যোগদান করে। মুসলমানদের স্বতন্ত্র আবাসভূমি প্রতিষ্ঠার আন্দোলন সফল করে তুলতে এই ছাত্রনেতার অক্লান্ত পরিশ্রম সর্বজন বিদিত। সে আন্দোলন স্তব্ধ করে দেয়ার জন্য আধিপত্যবাদী ভ্রাহ্মণ্যবাদী রামপন্থী হিন্দু ছাত্ররা শহীদ নজীরকে হত্যা করেছিল। তার শাহাদাত মুসলিম ছাত্রদের সচেতন করে। প্রমাণিত হয় মৃত নজীর জীবিত নজীরের চেয়ে শক্তিশালী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শুরু হলো শহীদ নজীর দিবস পালন। ১৯৪৪ সাল থেকে ১৯৫২ সাল পর্যন্ত প্রতি বছর ২রা ফেব্রুয়ারি যাথাযোগ্য মর্র্যাদায় এ দিবস পালিত হতো। এখানে উল্লেখ্য যে, মুসলিম প্রধান পূর্ব বাংলায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় তুমুল বিরোধিতা করেছিল হিন্দুব্রাহ্মণ্যবাদী আধিপত্যবাদীরা। তারা বিদ্রƒপ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম দিয়েছিল ‘মক্কা বিশ্ববিদ্যালয়’।
জাতীয় অধ্যাপক প্রাক্তন শিক্ষামন্ত্রী সৈয়দ আলী আহসান লিখেছেন, সম্ভবত এটা ছিল মেয়েদের হোস্টেলের অভিষেক অনুষ্ঠান। অনুষ্ঠানটি হয়েছিল সম্ভবত লিটন হলে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মুসলিম মেয়েদের সংখ্যা ছিল খুবই কম। অনুষ্ঠান কর্মকাণ্ড ও পরিচর্যায় যারা নিযুক্ত ছিল তারা সকলেই ছিল হিন্দু। গেট সাজানো থেকে আরম্ভ করে প্রবেশ পথ, সভাকক্ষ এবং মঞ্চও সাজানো হিন্দু মেয়েরা করছিল। তাদের দেয়া আল্পনার মধ্যে স্বস্তিকার চিহ্ন ছিল। প্রবেশ পথের দু’পাশে মাটির হাড়ির উপর সিঁদুর চিত্রিত শুকনো নারকেল ছিল, মঞ্চটিও হিন্দুদেবীর পূজার চত্বরের মতো সাজানো হয়েছিল। অনুষ্ঠান যখন আরম্ভ হবে তখন দু’জন মুসলিম ছাত্রী প্রবেশ করে ও মঞ্চের হিন্দুয়ানী স্টাইলের বিরোধিতা করে সেখান থেকে বেরিয়ে আসেন। তাদের দুজনের একজন হলেন আছিয়া খাতুন। . এই প্রতিবাদের ফলে বাইরে অবস্থানরত মুসলিম ছাত্ররা প্রতিবাদ সমাবেশ করে। অভিষেক অনুষ্ঠান শেষ পর্যন্ত হতে পেরেছিল কি না আজ আমার মনে মনে নেই। কিন্তু প্রতিবাদ যে প্রবল এবং সুস্পষ্ট ছিল তা আমার মনে আছে। ঢাকার চতুর্দিকে এ খবর ছড়িয়ে যায় এবং মুসলমান ছাত্রদের মধ্যে একটি প্রবল প্রতিক্রিয়া ঘটে। রাতে বিভিন্ন হলে আলোচনা হতে থাকে পরবর্তী পদক্ষেপ কী হতে পারে। নজীর আহমদ সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের ছাত্র ছিলেন। তিনি পরবর্তী নেতৃত্ব দেবেন এটাই ঠিক হয়। ছাত্রদের বুদ্ধি দেবার ক্ষেত্রে কবি জসীম উদ্দীনের সহযোগিতা স্মরণযোগ্য। সিদ্ধান্ত হয় যে, পরের দিন মুসলিম ছাত্ররা ক্লাসে যাবে এবং শান্তিপূর্ণভাবে সভা ও মিছিল করবে। আমরা ধারণাও করতে পরিনি যে, হিন্দুরা বিকল্প ব্যবস্থা নিতে পারে। শুনেছিলাম হিন্দু ছাত্ররা ইংরেজির অধ্যাপক পিকে গুহ এর বাসায় মিটিং করেছিল। পিকে গুহ আমার শিক্ষক ছিলেন। তাঁর বাসভবনে যে সভা হয়েছিল তা আমি স্পষ্ট জানতাম না। আমি শুনেছিলাম কবি জসীম উদ্দীনের কাছ থেকে। যাই হোক দুর্ঘটনা হলো পরের দিন এবং প্রচণ্ডভাবে। সভা মিছিল শান্তিপূর্ণভাবে চলছিল। কিন্তু অকস্মাৎ হিন্দু ছেলেদের আক্রমণে সংঘর্ষ বাঁধে এবং নজীর আহমদ মারাত্মকভাবে আহত হন। তিনি ছুরিকাবিদ্ধ হন। প্রথমে এই আঘাতটি কেউ গুরুতর ভাবেনি। অভ্যন্তরীণ রক্ত-ক্ষরণে নজীর আহমদ দুর্বল হতে থাকেন। এবং মিটফোর্ড হাসপাতালে তাকে নিয়ে যাওয়া হয়। কবি জসীম উদ্দীন হাসপাতালে সর্বক্ষণ তার শয্যাপাশে ছিলেন। সন্ধার দিকে নজীর আহমদ শাহাদাৎ বরণ করেন। তার মুত্যুতে কবি জসীম উদ্দীনের হাহাকার ও আকুল কান্নাকে আমি কখনো ভুলবো না। (সৈয়দ আলী আহসান, শহীদ নজীর (প্রবন্ধ), দৈনিক ইনকিলাব, ২ ফ্রেব্রুয়ারি ১৯৯১।)
বিশাল জানাযা শেষে শহীদ নজীরকে অজিমপুর কবরস্থানে দাফন করা হয়। তার সমাধিলিপিতে উৎকীর্ণ রয়েছে কুরআনের আয়াতের বঙ্গানুবাদ : “খুনে রাঙা পথে শহীদ হয়েছে যারা আল্লাহর রাহে রুহ বিলায়েছে যারা / মৃত্যু তাদের মৃত্যুই নয় জীবন এনেছে সাথে।”
নজীর দুঃস্থ মানবতার সেবায় এদেশের সাহিত্য সংস্কৃতি সাংবাদিকতা আজাদী সংগ্রামে বিরাট সম্ভাবনাময় প্রতিভা ছিলেন। শহীদ নজীরের শাহাদাতে বাংলার মুসলমানদের অপূণরণীয় ক্ষতি হয়েছিল।

SHARE

Leave a Reply