Home গল্প সত্যের পথ

সত্যের পথ

ফাহাদ আলী মির্জা

আদিব ও সাকিব দুই বন্ধু। ষষ্ঠ শ্রেণীতে, নতুন স্কুলে ভর্তির প্রথম দিনেই তাদের পরিচয়। দুই বন্ধুই প্রাথমিক বিদ্যালয় সমাপনী পরীক্ষায় ভালো ফল করেছে। আদিবের বাবা ফারুক সাহেব কলেজের প্রভাষক আর সাকিবের বাবা মনিরুজ্জামান ভূমি অফিসার। ক্লাসে আদিব ও সাকিব সব সময় একসাথে বসে। নিয়মিত ক্লাসে উপস্থিত থাকে বলে বশির উদ্দিন স্যার তাদের খুব ভালবাসেন। এপ্রিল মাসে প্রথম সাময়িক পরীক্ষা শেষ হলো। এর পর এক সপ্তাহ ক্লাস করেই গ্রীষ্মের ছুটি হয়ে যায়। গ্রীষ্মের ছুটি কিভাবে কাটানো যায় এই নিয়ে দুই বন্ধুর ভাবনা। গত বছর সমাপনী পরীক্ষার কারণে কঠোর পরিশ্রম করেছে আদিব ও সাকিব। এমনকি ঈদেও যেতে পারেনি দাদার বাড়িতে আর বছরের শুরুতে ভর্তির তীব্র প্রতিযোগিতার কারণেও কোথাও বেড়াতে যাওয়া হয়নি। সব মিলিয়ে এবার গ্রীষ্মের এ সুযোগটাই তাদের দু’জনের।
আদিব বলল, বন্ধু এবার বড় খালাদের বাগানে লিচু, আম, কাঁঠাল, জামে নাকি ভরে আছে। লিচুর কথা শুনে সাকিবের মুখে রস এসে যায়, তাই সে নিজেই বলে ফেলে বন্ধু তাহলে আর দেরি নয় আগামীকাল আমরা বড় খালার বাসায় গিয়ে হাজির হবো। আদিবও দেরি না করে বলল ইনশাআল্লাহ।
বড় খালার ছোট ছেলে মিঠু সে আদিবের এক বছরের বড়। নিয়ামতপুর সদর থেকে মিঠু ভাইয়ার বাড়ি সেনগঞ্জে যেতে আদিব তার বাবার দেয়া নতুন সাইকেলটাই কাজে লাগাবে, বলল সাকিবকে। পরীক্ষায় ভালো করায় ফারুক সাহেব খুশি হয়ে সাইকেল উপহার দিয়েছিলেন আদিবকে। সাকিব বলল, যাবার সময় প্রথম অর্ধেক পথ সেই চালাবে, আর বাকিটা আদিব।
সবকিছু ঠিক করে দু’জনই বাড়ি ফিরল। আদিবের আব্বুও বাড়িতে, আব্বু বলেছেন গ্রীষ্মের ছুটিতে আদিবকে ইংরেজি ও কম্পিউটার শেখাবে। তাই আদিব আব্বুকে কিছু বলল না। রান্নারুমে আম্মুকে পেয়ে আদিব গলা জড়িয়ে ধরে বলল, আম্মু একটা কথা বলব রাখবে তো? মা বললেন, কী এমন কথা বাবাকে না বলে আমাকে? আদিব বলল, আম্মু মিঠু ভাইয়ার বাড়ি বেড়াতে যাব। সঙ্গে সাকিবও যাবে। আম্মু বুঝতে পারলেন গ্রীষ্মের ছুটিতে ও একটু বেড়াতে চায়। আর তাছাড়া মিঠুর সঙ্গে ওর অনেক দিন দেখা হয়নি। সেই ছোটবেলায় মুসলমানির সময় বড় আপা মিঠুকে আমাদের বাড়িতে এনেছিলেন তার পর আর আদিবের সঙ্গে দেখা নেই মিঠুর।
মা, বাবাকে বলতেই বাবা বললেন, তাহলে কম্পিউটার শেখার কী হবে? মা বললেন এবার না শিখলেও হবে সামনে রমজানে তো আবার ছুটি হবে। বাবাও বুঝে বললেন, আচ্ছা ঠিক আছে তবে এক সপ্তাহের বেশি থাকা যাবে না। আদিব খুশিতে ছুটল সাকিবের বাড়ির দিকে।
এদিকে আবার সাকিবের বাবা আগে থেকেই ঠিক করে রেখেছিলেন তিনি সাবিককে নিয়ে বেড়াতে যাবেন বন্ধু রঞ্জন পালের বাসায়। সেখানে গিয়ে তারা দেখবেন ঐতিহাসিক পুঠিয়া রাজবাড়ী। সেখানে থেকে যাবেন নাটোরের রানী ভবানীর বাড়ি। প্রথমে বেড়াতে যাওয়ার কথায় সাকিবের বাবা রাজিই হননি, পরে শুনলেন যে পাশের বাসা থেকে ফারুক সাহেবের ছেলে আদিবের সঙ্গে যাবে। আদিবকে আসতে দেখে মনিরুজ্জামান সাহেব রাজি না হয়ে পারলেন না।
দু’জনের বাড়িতে নাটকীয়তা শেষে এবার শুরু হয় প্রস্তুতি। বিকেলে আম্মা পাশের বাড়ির রুমা আপার সঙ্গে পিঠা বানিয়ে নিলেন মিঠু ভাইয়ের জন্য। আর সাকিব আদিবের কাছ থেকে শুনেছে মিঠু ভাই নাকি নারিকেল খুব পছন্দ করতেন। তাই সে তার নানার বাড়ি থেকে আনা চারটা নারিকেল খোসা ছাড়িয়ে ব্যাগে ঢুকিয়ে নিলো। সকাল বেলা সাকিব আব্বু আম্মুর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে হাজির হলো আদিবের বাড়িতে। রাতেই আদিব নতুন সাইকেলটা ভালো করে পর্যবেক্ষণ করেছে কোন সমস্যা নেই। ব্যাগ গুছিয়ে নতুন জামা কাপড় পরে সেও প্রস্তুত। আদিব বলল ‘বিসমিল্লাহি তাওয়াক্কালতু আলাল্লাহ’। আব্বু আম্মু আদিবের মাথা নেড়ে ফি আমানিল্লাহ বলে দোয়া করে দিলেন। মা ভাবতে থাকলেন সাইকেলে প্রায় দুই ঘণ্টার পথ ছেলেদের ভালোই কষ্ট হবে। আবার ভাবলেন যাক ওরা এখন তরুণ, আনন্দ করতে করতে চলে যাবে। আবার একটু ভাবিয়ে তোলে মাঝি ছড়ার ঐ নদীটা সেখানে কোন ব্রিজ নেই আছে, বাঁশের সরু সাঁকো। পারাপার হতে হয় অনেক সাবধানে। অনেক সময় অনেককে পড়ে স্রোতে ভেসে যেতে দেখেছে আদিবের আব্বু। তবুও চিন্তা নেই আল্লাহতো আছেন, তিনিই রক্ষা করবেন।
আগের দিন ঠিক করা থাকলেও প্রথমটা শুরু করল আদিব নিজেই। প্রথম অর্ধেক রাস্তা শেষ হলে সাকিব চালাবে। আম্মু আগেই বড় খালাকে জানিয়ে রেখেছেন হয়তো বড় খালা পথ পানে চেয়ে আছেন বলে আদিব। দুই বন্ধুর গল্পে গল্পে কখন যে অর্ধেক পথ শেষ আদিব বুঝতেই পারেনি। এদিকে মাঝ পথে সেই বাঁশের সাঁকো। এবার সাকিবের মনে হলো অর্ধেক পথ শেষ। কিন্তু সাঁকোতো হেঁটে পার হতে হবে। প্রায় ২০ মিনিট লাগবে। একদিকে সরু সাঁকো আবার সঙ্গে সাইকেল, ব্যাগও আছে। আল্লাহর রহমতে তারা ভালোভাবেই সাঁকো পার হয়ে আবার পথ চলা শুরু করল। এবার পথটা একটু উঁচু নিচু আর আঁকাবাঁকা। বেলা একটু উপরে উঠে গেছে। কিন্তু রাস্তার দু’ধারে ঘন গাছপালা আর মাঝে মধ্যে হাল্কা বাতাস প্রাণটাকে জুড়িয়ে দেয়। দূরে ফসলের মাঠে তাকালে মনে হয় যেন সবুজের ঢেউ খেলা করছে আর কৃষকেরা মনের আনন্দে গান গেয়ে কাজ করে যাচ্ছেন। এসব দৃশ্য দেখে আদিব ও সাকিবের মনে পড়ে যায় পঞ্চম শ্রেণীর বাংলা বইয়ের সেই পড়ার কথাÑ সুজলা-সুফলা, শস্য-শ্যামলা আমাদের এই দেশ বাংলাদেশ। সত্যিই অপরূপ সুন্দর আমাদের এই দেশ। এই অধ্যায় থেকে তাদের সমাপনীতে বেশ কয়েকটি প্রশ্নও এসেছিল, লিখেছে তারা প্রাণ ভরে, আর এখন বাস্তবে দেখছে।
এসব ভাবতে ভাবতে তাদের পথ চলা শেষ হয়ে যেতে থাকে। বড় খালা আগে থেকেই মিঠু ভাইকে বটতলায় এগিয়ে যেতে বলেছিল। তাই গ্রামের ভেতরে পথ চিনতে আর তাদের সমস্যা হলো না। প্রথমে তো আদিব মিঠু ভাইকে চিনতেই পারেনি, কিন্তু মিঠু ভাই তাকে ঠিকই চিনে ফেলেছিল। অবশেষে কুশল বিনিময় করতে করতে আদিব ও সাকিবকে নিয়ে মিঠু ভাই বাড়িতে এসে হাজির। বড় খালাকে সালাম দিল আদিব ও সাকিব। খালা জিজ্ঞাসা করলেন আব্বু-আম্মুর কথা। বড় খালা আদিব ও সাকিবকে পেয়ে খুব খুশি। আদিব ও সাকিবকে ফ্রেশ হয়ে আসার জন্য বললেন খালা। হাত মুখ ধুয়ে আসতে না আসতেই তাদের জন্য প্রস্তুত মধু মাসের মধু আহার। এতো সব ফল দেখে মন আনন্দে ভরে যায় দুই বন্ধুর। স্বাদে সতেজতায় আর সুমিষ্টি গন্ধে ভরপুর। একসাথে শুরু হয় সমবয়সী তিন ভাইয়ের ফলাহার। বড় খালার মন আনন্দে ভরে তিনজনের সমাচার দেখে। মিঠু ভাই বললেন, এরপর একটু বিশ্রাম নিয়ে আমরা যাবো বড় পুকুরে গোসল করতে। মিঠু ভাইয়ের কথা শুনেই সাকিব আশ্চর্য হয়ে বলে পুকুরে কেন? ঝরনার ব্যবস্থা নেই। আদিব, সাকিবকে থামিয়ে বলল, বন্ধু এটাই আমাদের সুযোগ এবার আমরা সাঁতারটা শিখে নেবো। সাকিবও রাজি হলো।
এক ঘণ্টা বিশ্রাম শেষে আদিব, সাকিব ও মিঠু ভাই বড় পুকুর পাড়ে উপস্থিত। পুকুরে শান বাঁধানো আছে আর চারদিকে উঁচু পাড়। আদিব ও সাকিব প্রথমে পানি দেখে ভয় পেয়ে গেল। মিঠু ভাই খুব ভালো সাঁতার জানে কিন্তু পুকুরে তো অনেক বেশি পানি। তাই আদিব ও সাকিব পানিতে নেমেই কয়েক ঢোক গিলে ফেলল। শেষমেশ সাঁতার আর শেখা হলো না। তবে কিছু অভিজ্ঞতা হলো। দুপুরে খেতে বসে আদিব বলে ফেলল, সাঁতার শেখার অভিজ্ঞতা । বড় খালু শুনে রেগে গেলেন। মিঠু ভাইয়ের ওপর। বড় খালা বললেন, সাঁতার শেখাতো ভালো তবে এখন পুকুরে পানি কিছুটা বেশি।
মিঠু ভাই খুব ভালো ক্রিকেটার। এতো ছোট বয়সেও খেলাধুলায় বেশ নাম তার। সে নাকি আবার দলের অধিনায়কও। বিকেলে পাশের গ্রামের সাথে তার দলের খেলা, দেখতে যাবে আদিব ও সাকিব। দুপুরে বিশ্রাম নিতে নিতে এসব কথা, কিছুক্ষণ পরে তারা রওনা হলো পাশের গ্রামের স্কুলের মাঠটার দিকে, সেখানে সব খেলোয়াড় চলে এসেছে। মাঠে এসে হাজির হতেই শুরু হলো ধুলা উড়ানো, বাতাস এর পর শুরু হলো বৃষ্টি। সে দিন আর খেলা হলো না। মিঠু ভাইয়ের মন কিছুটা খারাপ হয়ে গেল। কিন্তু কিছু করার নেই, ফুটবল হলে খেলা যেত। এভাবে প্রথম দিনটা কেটে গেল তাদের তিনজনের।
প্রথম দিনের ব্যর্থতার কথা চিন্তা করে আদিব মিঠু ভাইকে বলল, ভাইয়া আসলে আমাদের পরিকল্পনা নেয়া উচিত যে আমরা কিভাবে আমাদের এই দিনগুলো অতিবাহিত করব। মিঠু ভাই আদিবের এই প্রস্তাবে খুব খুশি হয়ে বললো, এবার তাই করা যাক। তিনজন বিছানায় গোল হয়ে বসে শুরু হয় পরিকল্পনা।
প্রথমে শুরু হয় মিঠু ভাইয়ের বক্তব্য। ‘তোমরা হয়তো শুনেছ আমাদের এই গ্রামটা সুন্দর গ্রাম।’ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর আর এ গ্রামে আমার দাদার হাতের তৈরি তিনশ বিঘার বিশাল বাগান রয়েছে। সেখানে আছে আমের বাগান, কাঁঠাল বাগান, লিচু বাগান, বিভিন্ন ধরনের ফলের মেশানো একটি বাগান। আর বনজ ও ভেষজ উদ্ভিদের সমাহারে তৈরি আরেকটি বাগান। আদিব ও সাকিব তো এ কথা শুনে অবাক আদিব বলল, ভাইয়া আমরা একেক দিন একেকটা বাগান ঘুরবো আর বৃক্ষগুলোর সাথে পরিচিত হবো। সাথে সাকিব বলল, তাহলে আমরা সাথে একটা নোটবুক নিতে পারি সেখানে আমরা গাছপালা ও সেখানে বসবাস করা পাখ-পাখালির নামও লিখে রাখতে পারব। সম্ভব হলে আমরা আমাদের ক্যামেরাটাও ব্যবহার করব। খুব মজা হবে। এবার তিনজন ঘুমিয়ে পড়ল।
সকালবেলা মিঠু ভাইয়ের দাদা এসে সবাইকে নামাজের জন্য ডাকতে লাগলেন। মিঠু ভাই একলাফে উঠে আদিবকে ডাকল, কিন্তু সাকিবের উঠতে একটু কষ্ট হলো। সাকিব সকালে উঠতে অভ্যস্ত না। যা হোক এটা একটা সুযোগ তার এখান থেকে সে শিখে নেবে কিভাবে সকালে উঠতে হয়। সকালে তিনজন দাদার সাথে মসজিদ থেকে নামাজ শেষ করে এসে তাদের অভিযান শুরু হলো পরিকল্পনা মতো। খুব ব্যস্ত আর আনন্দের সাথে কেটে যাচ্ছিল তিন তররুণ প্রকৃতিপ্রেমীর। দিনগুলো যে কিভাবে শেষ হয়ে এলো দুই বন্ধুর। আগামীকাল সপ্তম দিন আব্বুর কথা মতো বাড়ি ফিরে যেতে হবে আদিবকে। আদিব বড় খালাকে বলল, বড় খালা চেয়েছিলেন পুরো ছুটিটাই তারা এখানে কাটাবে। কিন্তু আদিবের আম্মুও তাকে আগে জানিয়ে ছিলেন তারা যেন সাত দিনের বেশি আর না থাকে। তাই বড় খালা আগে থেকেই বাগানের ফলফলাদি জোগাড় করে রেখেছিলেন। গ্রামের এ সকল ফলফলাদি যেমন সতেজ তেমনি স্বাদের। আর শহরের এসকল ফলমূল দেখতে সুন্দর হলেও তাতে মেশানো থাকে বিষ। আমরা মানুষ হয়ে মানুষকে বিষ খাওয়াই আবার দামও নিই উচ্চ হারে। এসব ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়ে আদিব।
পরদিন ফজরের সময় হলে আদিব, সাকিব ও মিঠুভাই ঘুম থেকে জেগে ওঠে। আজকে তারা দাদার ডাকার আগেই উঠে পড়েছে দেখে দাদা খুব খুশি হন। বয়স তার আশির ঊর্ধ্বে তবুও যেন সতেজতার হাসি বলে, চল্লিশও নয়। আসলে এসব ভালো মানুষগুলো দিয়েই আল্লাহতায়ালা আমাদের এ পৃথিবীকে সুজলা-সুফলা করে সাজিয়েছেন। আমাদের জন্য পাঠিয়েছেন অফুরন্ত রিজিক। সবাই ফজরের নামাজ শেষ করে আসে। বড় খালা খুব সকালেই তাদের জন্য নাশতা তৈরি করে রেখেছেন। সাইকেল চালিয়ে যেতে হবে এতো রাস্তা সকালবেলা বের হলেই ভালো। নাশতা শেষ করে আদিব ও সাকিব খালা ও খালুকে সালাম জানিয়ে বিদায় নিল। যাবার পথেও তারা দু’জনে মিলে সাইকেল চালাবে। মিঠুভাই তাদেরকে এগিয়ে দেয়ার জন্য বের হলেন। তারা মিঠু ভাইকে স্মরণ করে, মিঠুভাই তাদের এ সফরে সার্বক্ষণিক সঙ্গী হয়ে শিখিয়েছিলেন সাঁতার, গাছে চড়া, বিভিন্ন ধরনের দিশীয় খেলা, পশুপাখি ও বৃক্ষ পরিচিতি। আদিব ও সাকিব চেয়েছিল মিঠু ভাইও তাদের সাথে তাদের বাড়িতে যাবে। কিন্তু ব্যস্ততার কারণে তা আর হলো না।
প্রথম অর্ধেক এবার চালালো সাকিব। এরপর আবার সেই বাঁশের সরু সাঁকো পার হওয়া শুরু হলো। ব্যাগ নিয়ে বাঁশের ওপর দিয়ে যাওয়া শুরু করল সাকিব। আর আদিব তার সাইকেল নিয়ে চলতে লাগল। যাওয়ার সময়ের চেয়ে এবার নদীকে খুব ভয়ানক দেখাচ্ছে পানি বেড়ে গেছে, আকাশে মেঘ, বাতাসে মাঝে মাঝে বড় বড় ঢেউ এসে ঝাঁকিয়ে দিয়ে যায় সাঁকোটাকে। এবার পার হওয়া বেশ কষ্ট হবে। মাঝ পথে এসে বাতাসের তীব্রতা আরও বেড়ে গেল। হঠাৎ সাকিবের পা পিছলে সে নদীতে পড়ে গেল। আদিব তার সাইকেলটাকে একটা বাঁশের খুঁটির সাথে রেখে তাড়াতাড়ি সে সাকিবকে উঠাতে গেল। সাকিব নদীর প্রচ- স্রোতে হাবুডুবু খেতে খেতে একটা বাঁশের খুঁটির সাথে গিয়ে বাধে। আদিব তাকে উঠানোর জন্য সাঁকোর ওপর শুয়ে পড়ে হাত বাড়িয়ে দেয়। অত্যন্ত কষ্টে যে সাকিবের হাত ধরতে পারে। এরপর তারা পরস্পর হাত শক্ত করে ধরে। অবশেষে আল্লাহর অশেষ মেহেরবানিতে সে সাকিবকে তুলে আনতে পারে। আদিব পেছনে ফিরে দেখে যে তার সাইকেলটা যেখানে রেখেছিলো সেখানে আর নেই। খুব সাবধানে তারা সাঁকোটা পার হলো তারা। কিন্তু এরপর আবার বৃষ্টি এলো। প্রচ- বৃষ্টি, কোথাও কোন মানুষ রিকশা, ভ্যান, যানবাহন বলতে কিছু নেই। হেঁটে হেঁটে চলতে থাকলো দুই বন্ধু আর আল্লাহকে ডাকতে শুরু করলো। বেলা ২টার সময় আদিব ও সাকিব বাড়ি পৌঁছালো। আদিবের মা তাদের অবস্থা দেখে কেঁদে ফেললেন। আল্লাহ তায়ালা অত্যন্ত মেহেরবান। তিনি তার সন্তানদের চরম বিপদ থেকে আবার তার কোলে ফিরিয়ে দিয়েছেন। মা দুই রাকায়াত নফল নামাজ পড়ে আল্লাহর কাছে আদিব ও সাকিবের জন্য দু’আ করলেন।
সাকিব তার বাড়ি ফিরে গেল। সাকিব তার মাকে কিছু না বলে হাসি খুশি থাকার চেষ্টা করল। রাতে বাবা এলে সাকিবকে তার বন্ধুর বড় খালার বাড়ি বেড়ানোর অভিজ্ঞতা জানতে চাইলেন। সাকিব বাবার সাথে তার সব আনন্দের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরল। তবে যখন সবশেষে তার বাড়িতে ফেরার পথে যে চরম বিপদ ঘটেছিল তা তুলে ধরল। এ ঘটনায় সাকিবের বাবা বিস্মিত হলেন এবং আদিবকে পরদিন তাদের বাসায় ডাকলেন। আদিবের কাছ থেকে পুরো ঘটনা শুনে মনিরুজ্জামান সাহেব আদিবকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন আর বললেন, সত্যিই তুমি আমার সাকিবের প্রকৃত বন্ধু। তুমি চাইলেই তোমার সাইকেল নিয়ে নিজেই সেতু পার হয়ে যেতে পারতে কিন্তু তুমি সাকিবকে বাঁচাতে গিয়ে তোমার সাইকেলটা হারিয়েছো।
আদিব, সাকিবকে ডেকে বলল, বন্ধু তুমি এসব কেন বলেছো? সামান্য এ সম্পদের চেয়ে একজন মানুষের জীবন অনেক অনেক মূল্যবান। আমাদের জীবনে প্রত্যেকেই এমন সরু সেতু অতিক্রম করতে হবে, যার চার পাশে অথৈ স্রোতের ধারা সবসময় বহমান আর মাঝে মাঝে আছড়ে পড়ে তীব্র বাতাসে বাহিত শক্তিশালী ঢেউ যা আমাদের মতো অসাবধান পথিকদের সেই স্রোতে ভাসিয়ে মুহূর্তের মধ্যেই শেষ করে দিতে পারে। আর আমরা যদি আমাদের এই সরল পথ খুবই সাবধানে চলে পার করতে পারি তাহলে ঐ পারে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে সুন্দর সুসজ্জিত বাগান চিরশান্তি চির সুখের স্থান।
সাকিবের আব্বু তাদের এ পরম বন্ধুত্ব ও আদিবের ভাবনার কথায় মুগ্ধ হয়ে পড়েন। সারারাত তিনি আদিবের কথাটা নিয়ে ভাবলেন সত্যিই আমাদের জীবনটা এমনই একটা সেতু যার চারপাশে শুধু অন্যায়, জুলুম, অপসংস্কৃতির স্রোত প্রবাহিত হচ্ছে আর এতে প্রতি মুহূর্ত আছড়ে পড়ছে নবীন পথের যাত্রীরা। যারা এ পৃথিবীটাকে সুন্দর করে সাজাবে বলে আমরা আশা করি তারাই এর করাল গ্রাসে জর্জরিত।
আর আজ আদিবের মতো কিছু তরুণ প্রাণ যারা তাদের পথকে চিনে নিয়েছে এবং দৃঢ়ভাবে এগিয়ে যাচ্ছে, এরাই অন্যায় জুলুম, অপসংস্কৃতির প্রবল স্রোত থেকে তুলে এনে নতুন করে বাঁচতে শিখাচ্ছে। এভাবেই তারা এগিয়ে যাবে। ঐ পাশে আমাদের জন্য যে সাজানো সুন্দর ও চিরস্থায়ী ভুবন অপেক্ষা করছে। এসব ভাবতে ভাবতে মনিরুজ্জামান সাহেবের ভোর হয়ে যায়। ফজরের আজান হয়। মনিরুজ্জামান সাহেব উঠে সাকিবকে সঙ্গে নিয়ে মসজিদের দিকে রওনা হলেন। তিনি বললেন, চলো তোমাকেও সত্যের সেতু গড়তে হবে।

SHARE

1 COMMENT

Leave a Reply