Home ফিচার ভাষা নিয়ে ভাসা ভাসা

ভাষা নিয়ে ভাসা ভাসা

মুহাম্মাদ মাসুম বিল্লাহ
আমরা যখন সুন্দর একটি ফুল অথবা চমৎকার কোনো দৃশ্য দেখে পুলকিত হই, তখন সেই পুলক অন্যের মাঝে ছড়িয়ে দিতে না পারা পর্যন্ত স্বস্তি পাই না। ভয় পেলে তা মা-বাবার কাছে প্রকাশ করতে না পারলে মন শান্ত হয় না। ব্যথা পেলে ‘উহ্’ বলে তার জানান দেই। কিন্তু এসব অভিব্যক্তি প্রকাশ করতে না পারলে কী হতো? মনের দুঃখ মনেই চাপা থাকত। আনন্দ মনের গভীরেই চাপা পড়ে যেত। ব্যথার কথা, প্রয়োজনের কথা জমা হতে হতে পাহাড় হয়ে যেত। কিন্তু মহান আল্লাহ তায়ালা আমাদের মনের আবেগ-অভিব্যক্তি প্রকাশের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। আর সেটা করেছেন ভাষার মাধ্যমে। প্রথম মানব হযরত আদমকে (আ) সৃষ্টি করেই শিখিয়ে দিয়েছেন ভাষা। আমরা যাতে একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারি, মনের কথা অপরকে বুঝিয়ে বলতে পারি, নিজের চিন্তা অন্যের মাঝে ছড়িয়ে দিতে পারি, সে ব্যবস্থা করতেই আল্লাহ মানবজাতিকে শ্রেষ্ঠ উপহার দিয়েছেন।
যোগাযোগের প্রধান মাধ্যমই হলো ভাষা। এটা যে শুধু মানুষের ক্ষেত্রে তা না, প্রাণীদেরও কিন্তু ভাষা রয়েছে। তারাও একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ করে। বিপদের খবর দেয়। সতর্ক করে। আবার বিকট শব্দ করে অন্যদের ভয়ও দেখায় তাদের নির্দিষ্ট ভাষায়। কিন্তু মানুষের ভাষা প্রাণীদের ভাষা থেকে সম্পূর্ণ আলাদা ও উন্নত। কারণ মানুষের ভাষার বিবর্তন আছে। পরিবর্তন আছে। আজ যে শব্দ আছে, একটি নির্দিষ্ট সময় পর সে শব্দটি থাকবে না। নতুন শব্দ এসে জায়গা করে নেবে। নতুন বাক্যরীতি হবে। কিন্তু প্রাণীদের ভাষায় কোনো পরিবর্তন নেই। যেমন গরুর ‘হাম্বা’ ডাক কখনোই পরিবর্তন হবে না। একটি নির্দিষ্ট কাজে বা উদ্দেশ্য পর্যন্তই তাদের ভাষা সীমাবদ্ধ। মৌমাছির ‘গুনগুন’ শব্দ আর বিশেষ ধরনের নাচ শুধু মধু আহরণের জন্যই। অন্যদিকে মানুষের ভাষা বৈচিত্র্যময়। মানুষ ভাষা ব্যবহার করেই যোগাযোগ করে, মনের ভাব প্রকাশ করে। আবার এই ভাষায়ই গান গায়, সাহিত্য লেখে। অর্থাৎ মানুষের ভাষার ব্যবহারে বৈচিত্র্য আছে। এছাড়া মানুষের ভাষার আরেকটি বড় গুণ হলোÑ এর লিখিত রূপ রয়েছে। যা প্রাণীদের ভাষার নেই। মানুষের ইশারা-ইঙ্গিতও এক ধরনের ভাষা। কারণ যারা কথা বলতে পারে না তারা ইঙ্গিতের মাধ্যমে মনের ভাব প্রকাশ করে। ইংরেজিতে একে বলে ‘সাইন ল্যাঙ্গুয়েজ’।
ভাষার পরিচয়টা বলা কঠিন। কারণ ভাষার পরিচয় বা সংজ্ঞা দিতে হবে ভাষা দিয়েই। তাই এই জটিল দিকে না যেয়ে, আমরা সহজ কথায় ধরে নিতে পারি ভাষা আমাদের যোগাযোগের প্রধান হাতিয়ার। ভাষা মানুষের মস্তিষ্কজাত এক অপূর্ব মানসিক ক্ষমতা যা বাকসঙ্কেতে রূপান্তর করে মানুষ মনোভাব প্রকাশ করে। পৃথিবীর সব মানুষই ভাষা ব্যবহার করেই আবেগ-অনুভূতি প্রকাশ করে। ভাষার রয়েছে হাজারো রকম। ইংরেজিতে যা কাউ  বাংলায় তা গরু। স্পেনের মানুষ যে ভাষায় কথা বলে, ভারতের মানুষ সে ভাষায় বলে না। পৃথিবীতে কত রকমের ভাষা রয়েছে তার সঠিক হিসাব ভাষাবিজ্ঞানীরা দিতে না পারলেও অনুমান করতে পেরেছেন। তাদের অনুমান অনুযায়ী ছয় থেকে সাত হাজার ভাষায় মানুষ কথা বলে। তবে সবাই একটি মাত্র নির্দিষ্ট ভাষার সঙ্গেই ঘনিষ্ঠভাবে পরিচিত। এটা নির্ভর করে ভৌগোলিক অবস্থানের ওপর। যেমনÑ যার জন্ম ইংল্যান্ডে সে স্বভাবতই ইংরেজির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে পরিচিত হবে। একইভাবে যার জন্ম হবে বাংলাদেশে সে শুধু বাংলার সঙ্গেই পরিচিত হবে।
ভাষা বিষয়ক এতো কথার পর মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, ভাষার উৎপত্তি হলো কীভাবে? ভাষার জন্ম কোথায়? বিজ্ঞানের ভাষায় এই প্রশ্নের উত্তর দেয়াও কঠিন। ডারউইন বলেছেন নানা ধরনের প্রাকৃতিক শব্দ, প্রাণীর ডাক, চিৎকার নকল করে মানুষ ভাষা শিখেছে। এছাড়া মানুষ তার নিজের কান্না থেকে ভাষা শিখেছে। ডারউইনের বক্তব্যকে সমর্থন করে এমন আরও মতবাদ রয়েছে। যেমন ১৮৬১ সালে বিখ্যাত ভাষাবিদ ম্যাক্স মুলার কয়েকটি তত্ত্ব উপস্থাপন করেন। এর মধ্যে বো-ওয়াউ বা কুকো তত্ত্ব অন্যতম । এই তত্ত্ব অনুযায়ীÑ মানুষ বুনো পশু ও পাখির কান্না-চিৎকার নকল করে ভাষা শিখেছে। পু-হ পু-হ তত্ত্বে বলা হয়েছেÑ বিভিন্ন সময়ে ব্যথা, ভয় ও বিস্ময়বোধ থেকে মানুষের মুখ থেকে যেসব শব্দ বের হয়েছে তার থেকে ভাষার উৎপত্তি। কিন্তু এসব তত্ত্ব থেকে ভাষার উৎপত্তির নির্ভরযোগ্য কোনো সূত্র খুঁজে পাওয়া যায় না। এর সমাধান খুঁজব আমরা কুরআন থেকে। ভাষার উৎপত্তি সম্পর্কে কুরআনের দেয়া এই তত্ত্ব ডিভাইন সোর্স বা ঐশ্বরিক উৎস হিসেবেও পরিচিত। এই তত্ত্বে বলা হয়েছেÑ ভাষা মানুষের জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে উপহার। সূরা বাকারার ৩১ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেছেন, “এবং তিনি (আল্লাহ) আদমকে সকল বস্তুর নাম শিখিয়ে দিলেন।” আদম (আ) প্রথম মানব হওয়ায় এটা স্পষ্ট যে ভাষার উৎপত্তি এখান থেকেই হয়েছে। আর আদমকে প্রথম মানব হিসেবে অন্য ধর্ম বিশেষ করে খ্রিষ্টানরাও মানে। বাইবেলেও ভাষার ব্যাপারে বলা হয়েছে, “আদম সমস্ত জীবকে নাম ধরে ডাকল”।
ছয় অথবা সাত হাজার ভাষার মধ্যে সবগুলোর গুরুত্ব কিন্তু আবার সমান নয়। কোনোটার গুরুত্ব প্রভাবের দিক দিয়ে। আবার কোনোটার গুরুত্ব বোঝা যায় কত মানুষ এই ভাষায় কথা বলে তা দিয়ে। প্রভাবের দিক থেকে ইংরেজি প্রথম। কারণ এটি আন্তর্জাতিক ভাষা। আর ব্যবহারের দিক থেকে প্রথমে রয়েছে চীনা ভাষা। ইংরেজিতে এর নাম মান্দারিন। ৮৮৫ মিলিয়ন লোক কথা বলে এই ভাষায়। ব্যবহারের দিক থেকে দ্বিতীয় স্থানের স্প্যানিশে কথা বলে ৩৩২ মিলিয়ন লোক। আর তৃতীয় স্থানে থাকা ইংরেজিতে কথা বলে ৩২২ মিলিয়ন এবং চতুর্থ স্থানে থাকা আমাদের মাতৃভাষা বাংলায় কথা বলে ২৩০ মিলিয়ন। পৃথিবীর এই গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি ভাষা নিয়েই আজকের আয়োজন।

বাংলা
প্রভাবশালী আন্তর্জাতিক ভাষা ইংরেজি, ব্যবহারের দিক থেকে সেরা মান্দারিন থাকতে প্রথমেই কেন বাংলা এই প্রশ্ন অন্তত বাঙালিদের মনে জাগবে না। কারণ হৃদয়ে লেখা আছে এই ভাষার রক্তস্নাত ইতিহাস। অন্যদের মতো আমরাও পূর্বপুরুষ থেকেই ভাষা পেয়েছি। কিন্তু একমাত্র আমাদের ভাষাকেই রক্ষা করতে হয়েছে বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়ে। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনে রফিক, সালাম, বরকত ও জব্বার রক্ত না দিলে, বাংলা মায়ের সাহসী ছেলেরা গর্জে না উঠলে হয়তো এতদিনে কালের আবর্তে হারিয়ে যেত আমাদের মুখের এই প্রিয় বোল। হয়ত অন্য কোনো ভাষায় কথা বলতাম। অন্য কোনো ভাষায় বুকে ক্ষত নিয়ে লিখতাম আমাদের মাতৃভাষা হারিয়ে যাওয়ার করুণ ইতিহাস। যে বাংলার পেছনে এত ত্যাগ এত রক্ত, সেই বাংলার কথাই যদি প্রথমে না বলতে পারি, তাহলে রক্তের ঋণ শোধ হবে কী করে।
বাংলা ভাষার ইতিহাস বা ইতিবৃত্ত লিখতে গেলে একটি বই লেখা হয়ে যাবে। আর তথ্য ভারাক্রান্ত এই জটিল ইতিহাস পড়ার মনোযোগও হয়ত থাকবে না। তাই সংক্ষেপেই ইতিহাস তুলে ধরব।
বাংলা ভাষার উদ্ভব হয় খ্রিস্টপুর্ব ১০০০ থেকে ১২০০ অব্দে মাগধী প্রাকৃত ও পালির মতো মধ্য ভারতীয় আর্য ভাষা থেকে। আর এই আর্য এসেছে বৈদিক ও ক্লাসিক্যাল সংস্কৃত থেকে। বাংলার আজকের এই রূপে আসতে সংস্কৃত থেকে অনেক ধার করতে হয়েছে। আর আধুনিক বাংলা অর্থাৎ যে ভাষায় আমরা সাহিত্য লিখি তার বিকাশ ঘটেছে আঠারশ শতাব্দিতে নদীয়া নামক অঞ্চলকে কেন্দ্র করে। বাংলা ভাষার ইতিহাসকে তিন ভাগে ভাগ করা যায়। প্রাচীন বাংলা যুগÑ ৯০০/১০০০ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৪০০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যবর্তী এই সময়ের অন্যতম লিখিত নিদর্শন চর্যাপদ। এই সময়ে আমি, তুমি ইত্যাদি সর্বনামের আবির্ভাব ঘটে। মধ্য বাংলা যুগÑ ১৪০০ থেকে ১৮০০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত এই সময়কার লিখিত নিদর্শন চণ্ডিদাসের শ্রীকৃষ্ণকীর্তন। যৌগিক ক্রিয়ার প্রচলন হয় এ সময়ে। এছাড়া বাংলার ওপর ফার্সিরও প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। আধুনিক বাংলাÑ ১৮০০ খ্রিস্টাব্দ থেকে সুচনা হয় আধুনিক বাংলা যুগের। এ সময়ে ক্রিয়া ও সর্বনাম সংক্ষিপ্ত রূপ লাভ করে। যেমন- তাহার থেকে তার। এভাবে বাংলা ভাষা বিবর্তনের পথে হেঁটে আধুনিক যুগে আমাদের কাছে দুটি আঙ্গিকে হাজির হয়েছে। একটি হলো কাব্যসাহিত্য। আরেকটি গদ্যসাহিত্য। কাব্যসাহিত্যে ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত, মধুসুদন দত্ত, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম এবং গদ্যসাহিত্যে উইলিয়াম কেরি থেকে শুরু করে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, রবীন্দ্রনাথের হাত ধরে বাংলা আজকের এই পরিশীলিত রূপ পেয়েছে। বাংলাদেশের শতকার ৯৮ ভাগ মানুষ বাংলায় কথা বলে। ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও আসাম রাজ্যের লোকরাও বাংলায় কথা বলে। এটি আমাদের দেশের স্বীকৃত রাষ্ট্রীয় ভাষা। ভারতের সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃত ২৩টি সরকারি ভাষার মধ্যে বাংলা অন্যতম। পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা ও আসামের বরাক উপত্যকার তিন জেলা কাছাড় করিমগঞ্জ ও হাইলাকান্দিতেও স্বীকৃত সরকারি ভাষা বাংলা। এছাড়াও এই বাংলা ভারতের আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের অন্যতম প্রধান স্বীকৃত ভাষা।
একুশে ফেব্রুয়ারি বাংলাভাষার জন্য গৌরবোজ্জ্বল একটি দিন। এটি শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবেও সুপরিচিত। ১৯৫২ সালের এই দিনে (বাংলা ৮ ফাল্গুন, ১৩৫৯) বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে আন্দোলনরত ছাত্রদের ওপর পুলিশের গুলিবর্ষণে কয়েক তরুণ শহীদ হন। ১৯৯৮ সালে কানাডার ভ্যানকুভার শহরে বসবাসরত দুই বাঙ্গালি রফিকুল ইসলাম ও আবদুস সালাম প্রাথমিক উদ্যোক্তা দিসেবে দিনটিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণার জন্য তৎকালীন জাতিসঙ্ঘের মহাসচিব কফি আনানের কাছে আবেদন করেন। ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর ইউনেস্কোর প্যারিস অধিবেশনে একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ঘোষণা করা হয়। ২০০০ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি থেকে দিবসটি জাতিসঙ্ঘের সদস্য দেশগুলোতে যথাযথ মর্যাদায় পালিত হয়ে আসছে।

ইংরেজি
সবচেয়ে প্রভাবশালী ও আন্তর্জাতিক ভাষা ইংরেজি। এটি ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা পরিবারের জার্মানীয় শাখার পশ্চিম দলের একটি ভাষা। জার্মানীয় গোত্র অ্যাংগল্স, স্যাক্সন ও জুটদের ভাষা থেকে ইংরেজি ভাষার উৎপত্তি। এই গোত্রগুলো ৪৫০ খ্রিস্টাব্দের দিকে ব্রিটিশ দ্বীপপুঞ্জের দক্ষিণ ও পূর্ব উপকূলে পা রাখে এবং সেখানকার কেল্টীয় ভাষাভাষী আদিবাসীদের উত্তরে ও পশ্চিমে স্কটল্যান্ড, কর্নওয়েল, ওয়েলস ও আয়ারল্যান্ডে হটিয়ে দেয়। এই হানাদার জার্মানীয় গোত্রে লোকদের মুখের ভাষাই প্রাচীন ইংরেজির ভিত্তি গড়ে দেয়। পরবর্তীতে ৮ম ও ৯ম শতকে নরওয়েজীয় ভাইকিং হানাদারদের প্রাচীন নর্স ভাষাও প্রাচীন ইংরেজিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে।
১০৬৬ সালে উত্তর ফ্রান্সের নরমঁদি অঞ্চলে বসবাসকারী নর্মান জাতি ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দিয়ে ইংল্যান্ড আক্রমণ করে। নর্মানদের ইংল্যান্ড বিজয়ের পর প্রায় ৩০০ বছর ধরে ইংল্যান্ডের রাজারা ছিলেন নর্মান বংশোদ্ভূত। এ সময় রাজকীয় ও প্রশাসনিক কাজকর্ম কেবল নর্মানদের কথ্য এক ধরনের প্রাচীন ফরাসি ভাষায় সম্পন্ন হত। এই যুগেই প্রচুর ফরাসি শব্দ প্রাচীন ইংরেজি ভাষায় প্রবেশ করে। ইংরেজি ভাষার  বেশির ভাগ বিভক্তি লুপ্ত হয় এবং ফলস্বরূপ মধ্য ইংরেজি ভাষার আবির্ভাব ঘটে। প্রাচীন ও মধ্য ইংরেজির সবচেয়ে বিখ্যাত সাহিত্যকর্মের মধ্যে রয়েছে  বেওউল্ফ এবং চসারের দ্য ক্যান্টারবেরি টেলস।
১৫০০ সালের দিকে বিরাট স্বরধ্বনি সরণ (এৎবধঃ ঠড়বিষ ঝযরভঃ) সংঘটিত হয় এবং আধুনিক ইংরেজির উদ্ভব ঘটে। শেক্সপিয়রের রচনাসহ আধুনিক ইংরেজি সাহিত্যের পুরোটাই এই আধুনিক ইংরেজিতে লেখা।
এথ্নোলগ অনুসারে ইংরেজি ভাষার মাতৃভাষীর সংখ্যা প্রায় ৩৪ কোটি। এ দিক থেকে ইংরেজির স্থান ম্যান্দারিন, হিন্দি ও স্পেনীয় ভাষার পরেই। প্রথমে ইংল্যান্ড ও পরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, বৈজ্ঞানিক ও সাংস্কৃতিক প্রভাবে বিশ্বের অন্য যে কোনো ভাষার চেয়ে ইংরেজিই বেশি বিস্তার লাভ করেছে। ইংরেজি প্রায় ৫২টি দেশের জাতীয় বা সরকারি ভাষা। আর বিশ্বের ইন্টারনেট ব্যবহারকারী জনসংখ্যার ৩৫ শতাংশই ইংরেজিভাষী। আধুনিক যোগাযোগ ও বিভিন্ন পেশায় ইংরেজির ব্যাপক ব্যবহারের ফলে বর্তমানে এটি বিশ্বের সবচেয়ে বেশি অধীত দ্বিতীয় ভাষা। সংস্কৃতি ও প্রযুক্তির নতুন নতুন আন্তর্জাতিক পরিভাষার অধিকাংশই ইংরেজি থেকে এসেছে। আবার ইংরেজি শব্দভাণ্ডারের অধিকাংশ গুরুত্বপূর্ণ শব্দ এসেছে ল্যাটিন থেকে। যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, আয়ারল্যান্ড, নিউজিল্যান্ড ও ক্যারিবিয়ান অঞ্চলের কিছু সংখ্যক দেশের অধিকাংশ জনগোষ্ঠী ইংরেজিতে কথা বলে।
চীনা
বিশ্বের সবচেয়ে বেশি মানুষ কথা বলে চীনা ভাষায়। চীনা তিব্বতীয় ভাষা পরিবারে চীনা শাখার ভাষাগুলোই মূলত চীনা ভাষা হিসেবে পরিচিত। ইংরেজিতে এটি মান্দারিন নামে পরিচিত। এটি গণচীন ও তাইওয়ানের একমাত্র সরকারি ভাষা হলেও কথ্য চীনা ভাষার অনেক রূপ রয়েছে। ভাষাবিজ্ঞানীদের মতে সাত অথবা দশটি উপভাষাগোষ্ঠী নিয়ে চীনাভাষা গঠিত। এর মধ্যে অন্যতম হলোÑ মান্দারিন, ইউয়ে, মিন, শিয়াং, খেচিয়া, কান, চিন, হুয়েচৌ ও ফিং। মান্দারিন ভাষায় কথা বলে প্রায় ৮৫০ মিলিয়ন লোক। চীনা ভাষার একটি মজার বৈশিষ্ট্য হলোÑ এর কথ্য রূপ অনেক হলেও লিখিত রূপ এক। অর্থাৎ একই বর্ণমালা দিয়ে লেখা হয়। অনেক চীনা নাগরিকই মনে করেন, বিভিন্ন উপভাষার উচ্চারণ আলাদা হলেও, আসলে ভাষা একটাই।
অধিকাংশ ভাষাবিজ্ঞানীদের মতে চীনা তিব্বতীয় ভাষা পরিচার থেকে চীনা ভাষার উৎপত্তি ঘটেছে। এই ভাষার প্রাচীন রূপের ব্যবহার দেখা যায় খ্রিস্টপূর্ব ২৫৬ থেকে ১১২০ অব্দ পর্যন্ত জু ডাইনাস্টিতে। এই সময়কার ব্রোঞ্জের তৈরি বিভিন্ন হাতিয়ারে, শিংচিনের বিভিন্ন কবিতায় এই আদি রূপের দেখা পাওয়া যায়। এরপর ষষ্ঠ থেকে দশম শতাব্দিতে বিকাশ ঘটে মধ্য চীনা ভাষার। আর প্রাচীন থেকে বর্তমান কথ্য চীনা ভাষা বেশ জটিল আকার ধারণ করেছে। ভৌগোলিক অবস্থার তারতম্যের কারণে এটি লাভ করে বৈচিত্র্যতা। জন্ম নেয় বেশ কয়েকটি উপভাষার। বর্তমানে চীনের মূল ভূখণ্ড ও তাইওয়ানের অধিকাংশ তরুণ-তরুণী ও মধ্যবয়সী নাগরিক মান্দারিন ভাষায় কথা বলে। বিশেষ করে ১৯৯৭ সালের পর থেকে মান্দারিন ক্রমশই প্রভাবশালী হয়ে উঠছে।
জাতিসঙ্ঘের অফিসিয়াল ৬টির ভাষার মধ্যে চীনা ভাষা অন্যতম। গণচীন, হংকং, তাইওয়ান ছাড়াও সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড, মিয়ানমার, কম্বোডিয়া, জাপান, উত্তর কোরিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া, ফিলিপাইন দ্বীপপুঞ্জে চীনা ভাষা প্রচলিত রয়েছে। একসময় চীনের পার্শ্ববর্তী পূর্ব এশীয় দেশগুলো বিশেষ করে জাপান, কোরিয়া ও ভিয়েতনামে শতাব্দির পর শতাব্দি ধরে যোগযোগের আনুষ্ঠানিক ভাষা ছিল ক্ল্যাসিকাল চীনা ভাষা। এমনকি উপনিবেশবাদ শুরুর আগ পর্যন্ত কোরিয়া ও ভিয়েতনামের সকল দাপ্তরিক কাগজপত্র লেখা হত চীনা ভাষায়।

আরবি
ভাষাভাষীর সংখ্যার দিক থেকে আরবির অবস্থান ষষ্ঠ। এটিও জাতিসঙ্ঘের একটি দাপ্তরিক ভাষা। ৩১০ মিলিয়নেরও বেশি লোক আরবিতে কথা বলে। এটি সেমিটীয় ভাষা পরিবারের টিকে থাকা সদস্যগুলোর মধ্যে বৃহত্তম। হিব্রু ও আরামীয় ভাষার সঙ্গে এ ভাষার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। আধুনিক আরবিকে “ম্যাক্রোভাষা” আখ্যা দেয়া হয়েছে। এর ২৭ রকমের উপভাষা রয়েছে। সমগ্র আরববিশ্ব জুড়ে এই উপভাষাগুলো প্রচলিত। আর আদর্শ আরবি ইসলামী বিশ্বের সর্বত্র পড়া ও লেখা হয়। আধুনিক আদর্শ আরবি চিরায়ত আরবি থেকে এসেছে। মধ্যযুগে আরবি গণিত, বিজ্ঞান ও দর্শনের প্রধান বাহক ভাষা ছিল। বিশ্বের অনেক ভাষা আরবি থেকে শব্দ ধার করে শব্দভাণ্ডার সমৃদ্ধ করেছে। বাংলা ভাষায় অনেক আরবি শব্দ ঢুকে পড়েছে।
হযরত মুহাম্মদের (সা) ওপর কুরআন অবতীর্ণের মাধ্যমে ইসলামের আবির্ভাবের ঠিক আগের যুগে আরব উপদ্বীপে আরবি ভাষার উৎপত্তি ঘটে। প্রাক-ইসলামী আরব কবিরা যে আরবি ভাষা ব্যবহার করতেন, তা ছিল অতি উৎকৃষ্ট মানের। তাঁদের লেখা কবিতা মূলত মুখে মুখেই প্রচারিত ও সংরক্ষিত হত। তখন আরবি ভাষাতে সহজেই বিজ্ঞান ও শিল্পের প্রয়োজনে নতুন নতুন শব্দ ও পরিভাষা তৈরি করা যেত। এখনও সম্ভব। ইসলামের প্রচারকেরা ৭ম শতাব্দীতে আরব উপদ্বীপের সীমানা ছাড়িয়ে এক বিশাল আরব সাম্রাজ্য গড়ার উদ্দেশ্য নিয়ে বেরিয়ে পড়েন এবং প্রথমে দামেস্ক ও পরে বাগদাদে তাঁদের রাজধানী স্থাপন করেন। এসময় ভূমধ্যসাগরের তীরবর্তী এক বিশাল এলাকা জুড়ে আরবি প্রধান প্রশাসনিক ভাষা হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ভাষাটি বাইজেন্টীয় গ্রিক ও ফার্সি থেকে ধার নিয়ে এবং নিজস্ব শব্দভাণ্ডার ও ব্যাকরণ পরিবর্তন করে ক্রমেই সমৃদ্ধ  হয়ে ওঠে।
আরবিকে সাধারণত ধ্রুপদি আরবি, আধুনিক লেখ্য আরবি এবং আধুনিক কথ্য বা চলতি আরবিÑ এই তিন ভাগে ভাগ করা যায়। ধ্রুপদি আরবি ৬ষ্ঠ শতক থেকে প্রচলিত এবং এতেই পবিত্র কুরআন শরীফ অবতীর্ণ হয়েছে। আল-মুতানাব্বি ও ইবন খালদুন ধ্রুপদী আরবির বিখ্যাত কবি।
আধুনিক লেখ্য আরবিতে আধুনিক শব্দ যোগ হয়েছে এবং একইসঙ্গে অতি প্রাচীন শব্দগুলো বর্জন করা হয়েছে। কিন্তু তারপরও ধ্রুপদী আরবির সঙ্গে এর তেমন একটা পার্থক্য নেই। আরবি সংবাদপত্র ও আধুনিক সাহিত্য এই আধুনিক লেখ্য আরবিতেই প্রকাশিত হয়। তাহা হুসাইন ও তাওফিক আল হাকিম আধুনিক লেখ্য আরবির দুই অন্যতম প্রধান লেখক ছিলেন। আলজেরিয়া, মিসর, ইরাক, সৌদি আরব, সিরিয়া, তিউনিসিা, ইয়েমেনসহ ৫২ দেশের সরকারি ভাষা আরবি।

স্প্যানিশ
ভাষাভাষীর সংখ্যার দিক দিয়ে মান্দারিনের পরেই স্প্যানিশের অবস্থান। প্রায় ৪০৫ মিলিয়ন লোক কথা বলে এই ভাষায়। এটিও জাতিসঙ্ঘের ৬টি দাপ্তরিক ভাষার একটি। ইউরোপীয় ইউনিয়নেও এটি দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে ব্যবহৃত হয়। স্পেনের ক্যাস্টাইল অঞ্চলে এই ভাষার উদ্ভব ঘটে। স্প্যানিশ ইন্দো-ইউরোপিয়ান পরিবারের আইবেরো-রোম্যান্স গোষ্ঠীর অংশ। পুরো আঠারশ শতাব্দি জুড়ে কেন্দ্রীয় ও উত্তর আইবেরো অঞ্চলে কথ্য লাতিনের কয়েকটি উপভাষা থেকে উদ্ভব হয় আইবেরো-রোম্যান্স ভাষাগোষ্ঠীর। পরবর্তীতে মধ্যযুগে ক্যাস্টাইল রাজ্যের (বর্তমান উত্তর স্পেন) সম্প্রসারণের ফলে এই ভাষাগোষ্ঠী কেন্দ্রীয় ও দক্ষিণ আইবেরিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে। স্প্যানিশের জন্মের গোড়ার দিকেই বাসক্, আরবি, আইবেরিয় ও রোম্যান্স ভাষাগোষ্ঠী থেকে ধার করা শব্দ নিয়ে এর শব্দভাণ্ডার সমৃদ্ধ হয়। পরবর্তীতে এই ভাষায় বিদেশী ভাষা থেকে শব্দ ধার করার পরিমাণ আরও বাড়তে থাকে। পনেরশ থেকে ঊনবিংশ শতাব্দী পর্যন্ত সময়ে স্পেন সাম্রাজ্য সম্প্রসারণের ফলে স্প্যানিশ আমেরিকা, আফ্রিকা ও প্যসিফিক এশিয়ার অনেক অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে এটি সরকার ও বাণিজ্যক্ষেত্রে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভাষা হয়ে ওঠে। আমেরিকানদের কাছে দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে স্প্যানিশ খুবই জনপ্রিয়। যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রাজিলে অন্তত এক কোটি লোক খুবই সাবলীলভাবে এই ভাষায় কথা বলতে পারে। স্পেন, ভেনিজুয়েলা, কলম্বিয়া, ইকুয়েডর, পানামা, এলসালভেদর, কিউবা, কোস্টারিকাসহ প্রায় ২২টি দেশের দাপ্তরিক ভাষা স্প্যানিশ। এছাড়া আমেরিকার বিশাল অংশ, অ্যান্ডোরা, সুইজারল্যান্ড, বেলিজ, ফিলিপাইন ও জিব্রাল্টারের কিছু জনগোষ্ঠী এই ভাষায় কথা বলে।

হিন্দি
ভারতের সরকারি ভাষা। এটি কেন্দ্রীয় ইন্দো-আর্য ভাষা পবিরারের সদস্য। এটি মূলত উত্তর, মধ্য ও পশ্চিম ভারতের প্রায় ৪৮ কোটিরও বেশি মানুষের মাতৃভাষা। এছাড়া ভারতের বাইরে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক হিন্দিভাষী রয়েছেন। দক্ষিণ আফ্রিকায় ১০ লাখ, মরিশাসে ৭ লাখ, বাংলাদেশে সাড়ে ৩ লাখ, ইয়েমেনে আড়াই লাখ ও উগান্ডায় প্রায় দেড় লাখ মানুষ হিন্দিতে কথা বলেন। দেবনাগরী লিপিতে  লেখা সাহিত্যক বা লেখ্য হিন্দিতে সংস্কৃতের বেশ প্রভাব রয়েছে। হিন্দির একটি উপভাষা ব্রজ ভাষায় ১৫শ শতক থেকে ১৭শ শতক পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্য রচিত হয়। আওয়াধি, বাঘেলি, ছত্তিশগড়ি, বুন্দেলি ও কানাউজি এর অন্যতম কয়েকটি উপভাষা।

SHARE

Leave a Reply