Home স্মরণ কবি শামসুদ্দীন হাফিজ শিরাযী

কবি শামসুদ্দীন হাফিজ শিরাযী

ড. মুহাম্মাদ নূরুল ইসলাম…

তোমরা নিশ্চয়ই বিশ্ববরেণ্য কবি হাফিজের নাম শুনেছো। খ্রিস্টীয় চতুর্দশ শতাব্দীতে যে সকল কবি ও সাহিত্যিক ফারসি সাহিত্যের অগ্রযাত্রাকে অব্যাহত রেখেছেন তাদের মধ্যে অন্যতম প্রতিভাধর কবি হাফিজ শিরাযী। এছাড়াও সারা বিশ্বের ইতিহাসে এ পর্যন্ত যে সকল মরমী কবির সাক্ষাৎ পাওয়া যায়, পারস্যের খাজা শামসুদ্দীন মোহাম্মদ হাফিজ শিরাযী তাদের মধ্যে অন্যতম।
শামসুদ্দীন হাফিজ শুধু হাফিজ নামে পরিচিত। শিশুর চেহারায় প্রতিভার লক্ষন দেখে পিতামাতা তাঁর নাম রেখেছিলেন শামসুদ্দীন। ‘শামস’ অর্থ সূর্য। প্রকৃতই তিনি কবিকুলে সূর্যস্বরূপ। হাফিজ তাঁর উপনাম। পারস্যের শিরায নগরে জন্মগ্রহণ করেছেন বলে তাঁকে শিরাযী বলা হয়।
হাফিজের জন্ম হয়েছিল খ্রিস্টীয় চতুর্দশ শতাব্দীর প্রথম দিকে পারস্যের রাজধানী শিরায নগরে। তাঁর জন্ম ও বাল্য জীবন সম্পর্কে বিশেষভাবে কিছু জানা যায় না। হাফিজের পিতা বাহাউদ্দীন সুলগারী আতাবক বংশীয় শাসনামলে পারস্যের (ইরানের) ইসফাহান থেকে এসে শিরায শহরে বসবাস শুরু করেন। অধূনা পণ্ডিতগণ গবেষণা করে তাঁর জন্মসন সম্পর্কে যতটুকু কিনারা করতে পেরেছেন, গা হতে অনুমান হয় তিনি ১৩২৫ খ্রিস্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন। তবে এ. জে. আরবারীসহ অধিকাংশ লেখক হাফিজের জন্মসাল ১৩২৬ খ্রিস্টাব্দ (৭২৬ হিজরি) বলে উল্লেখ করেছেন।
অল্প বয়সেই হাফিজ তাঁর পিতাকে হারান। ফলে তাঁর লালন-পালন ও ভরণ-পোষণের দায়িত্ব মাতার উপর অর্পিত হয়। হাফিজের শিক্ষাজীবনে ব্যাঘাত হয়নি। কারণ তাঁর পারিবারিক অবস্থা মন্দ ছিল না। বিশেষ করে তাঁর জ্ঞান পিপাসা ছিল অদম্য। তাঁর প্রথম শিক্ষক ছিলেন কাওয়াম উদ্দীন আবদুল্লাহ (মৃত্যু ১৩৭০ খ্রিস্টাব্দ)। তাঁর তত্ত্বাবধানে থেকে হাফিজ প্রাথমিক শিক্ষা অর্জন করেন এবং পবিত্র কুরআন শরীফ হেফজ করেন। পরে তিনি সমসাময়িক যুগের বিখ্যাত আলেম মোহাম্মদ শামসুদ্দীন আবদুল্লাহ শিরাযী, আয-উদ্দীন আবদুর রহমান ও সৈয়দ শরীফ জুরজানীসহ বিভিন্ন আলেমের কাছে ইসলামের বিভিন্ন দিক, ইলমুল ফিকহ ও দর্শনতত্ত্ব বিষয়ে জ্ঞানলাভ করেন। দিন দিন যেমন হাফিজের প্রতিভার বিকাশ হতে লাগল, সেই সঙ্গে সঙ্গে তিনি সাহিত্য, দর্শন ইত্যাদিতেও সবিশেষ পাণ্ডিত্ব অর্জন করেন। মরমী (সুংঃরপ) সাহিত্যে তাঁর একাধিপত্য ছিল। হাফিজের আধ্যাত্মিক প্রেম, দার্শনিক চিন্তা ও হৃদয়ের গভীরতা বিশ্ব সাহিত্যে এক অমূল্য রত্ম উপহার দিয়েছে। তাঁর রচিত কাব্যগ্রন্থকে ‘দিওয়ান হাফিজ’ বলা হয়। এই দিওয়ান কাব্যে তাঁর জীবন দর্শন প্রতিফলিত হয়েছে।
হাফিজ শিক্ষাজীবন সমাপ্ত করে কবিতা রচনায় আত্মনিয়োগ করেন। তিনি যা কিছু রচনা করতেন তা সবার কাছে গ্রহণযোগ্যতা লাভ করতো। তাঁর কাব্যখ্যাতি দেশের সীমানা ছাড়িয়ে বিদেশেও ছড়িয়ে পড়ে। হাফিজের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়লে বিশ্বের বিভিন্ন স্থান থেকে তাঁকে সফরের দাওয়াত করা হয়।
ভারতবর্ষে দাক্ষিণাত্যের স্বাধীন মুসলিম বাহমনী রাজ্যের সুলতার দ্বিতীয় মুহম্মদ শাহ বাহমনী (১৩৭৮-১৩৯০) কবি হাফিজকে ভারতের দাক্ষিণাত্য সফরের আমন্ত্রণ জানান। উল্লেখ্য, দক্ষিণ ভারতের বাহমনী সুলতান দ্বিতীয় মুহম্মদ শাহ আরবি-ফারসি ভাষা ভালো জানতেন এবং নিজে কবিতা লিখতেন। হাফিজ তাঁর দাওয়াত কবুল করেন। তিনি দক্ষিণ ভারতে আসার জন্য হরমুজ বন্দরে পৌঁছে দ্বিতীয় মুহম্মদ শাহের প্রেরিত শাহী জাহাজে আরোহন করেন, তখন সমুদ্রে ভীষণ তরঙ্গ ওঠে। হাফিজ জাহাজ থেকে নেমে পড়েন। এ সময় কবি হাফিজের কণ্ঠে শেখ সাদীর একটি বিখ্যাত কবিতার চরণ উচ্চারিত হয়। চরণটির অনুবাদ হলোÑ ‘সাগরের ব্যবসা খুবই লাভজনক। তবে যদি নিরাপদে থাকতে চাও, তা কূলেই আছে।’ পরে তিনি একটি গজল রচনা করে সুলতানের কাছে প্রেরণ করেন। তৎপর দক্ষিণ ভারতের সুলতান দ্বিতীয় মুহম্মদ শাহ একসহস্র স্বর্ণমুদ্রা ও অন্যান্য সামগ্রী উপঢৌকন হিসেবে হাফিজকে প্রেরণ করেন।
বাংলার স্বাধীন সুলতান গিয়াসউদ্দীন আজম শাহ (শাসনকাল ১৩৯৩-১৪১০) পারস্যের প্রখ্যাত এই কবির সাথে পত্র বিনিময় করার সৌভাগ্য লাভ করেন। তিনি কবি হাফিজের কাছে দূতও পাঠান। কবি হাফিজ বাংলার সুলতানের রচিত গজলের একটি চরণের সাথে মিল রেখে পুরো একটি গজল রচনা করে বাংলায় পাঠান।
কবি হাফিজের একমাত্র কাব্যগ্রন্থ দিওয়ান হাফিজ। তাঁর কবিতাসমূহ সংগ্রহ করে দিওয়ানে হাফিজ নামে প্রকাশ করা হয়। হাফিজের জীবদ্দশায় তাঁর গজলগুলো সঙ্কলন করা হয়নি। শুধু জনপ্রিয় গজল হিসেবে এগুলো লোকমুখে গীত হয়েছিল। হাফিজের মৃত্যুর পর তাঁর বন্ধু গুল আন্দাম সেগুলো সংগ্রহ ও সঙ্কলন করেন। তার সংগ্রহীত গজলের সংখ্যা ছিল পাঁচশ’রও বেশি। তবে এ সঙ্কলন গ্রন্থটি দু®প্রাপ্য। অপরদিকে হাফিজের মৃত্যুর পর তাঁর এক ভক্ত সাইয়েদ করিম আনোয়ার হাফিজের সমস্ত কবিতা সংগ্রহ করে দিওয়ানে হাফিজ নামে বিখ্যাত কাব্য সঙ্কলনটি প্রকাশ করেন। এ কাব্যে ৫৯৯টি কবিতা রয়েছে। এ কবিতাগুলোর অধিকাংশই আধ্যাত্মিক ভাবধারায় পূর্ণ। বর্তমানে সাইয়েদ আবদুর রহীম খালখালীর সম্পাদনায় প্রকাশিত দিওয়ান কাব্যে ৪৯৬টি গজল, ৪২টি রুবায়ী ও একটি মসনবী কবিতা রয়েছে। মোটকথা হাফিজের গজল সংখ্যা যাই হোক না কেন, তিনি ছিলেন ইরানের শ্রেষ্ঠ গজল রচয়িতা। তাঁকে ‘গজল কবিতার ওস্তাদ’ বলা হয়। তাঁর কবিত্বের বিশালতা সাগরের ন্যায়। সাগরের মতোই তা অতলস্পর্শী ও রতœগর্ভ। সন্ধানীর নিকট দিওয়ানে হাফিজ হলো ভাবরাজ্যের অমূল্য সম্পদ। দিওয়ানের একমাত্র সুর আল্লাহর প্রেম ও আল্লাহর আনুগত্য।
হাফিজ কোনো সাধারণ কবি ছিলেন না। কেননা, হাফিজের দিওয়ান কাব্যের প্রতিটি গজলের মধ্যেই ইসলামী চেতনার পরিস্ফুটন দেখা যায়। ফারসি সাহিত্যে কবি হাফিজ যেসব আধ্যাত্মিক উপমা ও রূপকের ব্যবহার ঘটিয়েছেন তা বিশ্ব সাহিত্যে বিরল। তিনি যে একজন ইসলামী রেনেসাঁর কবি ও আধ্যাত্মিক কবি ছিলেন তা তাঁর কাব্যকর্ম ও জীবন দর্শনে ফুটে উঠেছে।
হাফিজের কাব্য ও দর্শনের প্রভাব প্রাচ্য থেকে পাশ্চাত্যে ছড়িয়ে পড়ে। যুগে যুগে ইউরোপের বিভিন্ন দেশের কবি-সাহিত্যিকগণ হাফিজের জীবন দর্শনে আকৃষ্ট হয়ে দিওয়ানে হাফিজ কাব্য ইংরেজি, জার্মান, ফ্রেন্স, ল্যাটিন, স্প্যানিশ বিভিন্ন ভাষায় গদ্য ও পদ্যে অনুবাদ প্রকাশ করেন। ১৮১৪ খ্রিস্টাব্দে জার্মান কবি গ্যেটে হাফিজের দিওয়ান কাব্য পাঠ করে মন্তব্য করেন, ‘হঠাৎ প্রাচ্যের আসমানী খুশবু এবং ইরানের পথ-প্রান্তর থেকে প্রবাহিত চিরন্তন প্রাণ সঞ্জীবনী সমীরণের সাথে পরিচিত হলাম। আমি এমন এক অলৌকিক ব্যক্তিকে চিনতে পেলাম, যার বিস্ময়কর ও জীবন-দর্শন আমাকে তাঁর জন্য পাগল করেছে।’ বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম হাফিজের ৩০টি গজলের বঙ্গানুবাদ করেছেন। বর্তমান কালের কবি-সাহিত্যিক ও গবেষকগণ হাফিজের কাব ও দর্শনের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে তাঁর ওপর গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন।
এই মহান কবি হাফিজের শেষ জীবন শিরায নগরীতেই অতিবাহিত হয়েছে এবং এই নগরীতেই তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। শিরায নগরেই তাঁকে সমাহিত করা হয়। আজ থেকে ছয়শ’ বছর পূর্বে কবি হাফিজ মৃত্যুবরণ করলেও আজও তিনি তাঁর কাব্য ও জীবন-দর্শনের মাধ্যমে বিশ্ববাসীর কাছে চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন।

SHARE

1 COMMENT

Leave a Reply