Home প্রচ্ছদ রচনা বিজয়ের কথা

বিজয়ের কথা

ইকবাল কবীর মোহন

যে  কোন বিজয়ই আনন্দের। বিজয় মানে হাসি-খুশি উচ্ছলতা। আমাদের জীবনে বিজয়ের নানা দিক রয়েছে। কেউ খেলায় জিতে বিজয়ের আনন্দ লাভ করে, কেউ বা ব্যবসায় সাফল্য পেয়ে অর্থনৈতিক বিজয় অর্জন করে থাকে। ছাত্ররা পরীক্ষায় ভাল ফল করে বিজয়ের সীমাহীন স্বাদ লাভ করে এবং আনন্দ পায়। আবার কেউ কেউ যুদ্ধে-লড়াইয়ে প্রতিপক্ষকে হারিয়ে বিজয়ের আনন্দ উপভোগ করে। এভাবে মানুষ অনেকভাবেই বিজয় পেয়ে খুশি হয়। তবে জাতি হিসেবে আমাদের সবচেয়ে বড় বিজয় হলো স্বাধীনতা অর্জন। এ বিজয় আমাদের অহঙ্কার, আমাদের অনেক বড় গর্বের বিষয়। কারণ, এক নদী রক্ত ঢেলে আমরা মহান স্বাধীনতা ছিনিয়ে এনেছি। দীর্ঘ নয় মাসের প্রত্যক্ষ সংগ্রাম ও যুদ্ধের পর এসেছে আমাদের কাক্সিক্ষত বিজয়ের দিন। সেটা ১৯৭১ সালের কথা। দিনটি ছিল ১৬ ডিসেম্বর। এটি ছিল মহান গৌরবের সোনালি সোপানের এক বিরাট অধ্যায়। দিনটি ছিল এ দেশের লক্ষ-কোটি মানুষের অপার স্বপ্ন বাস্তবায়নের দিন।
একাত্তরে আমাদের এ স্বাধীনতা অর্জনের পেছনে রয়েছে দীর্ঘ এক ইতিহাস। এ ইতিহাস এ দেশের ছাত্র, শিক্ষক, কৃষক, শ্রমিক ও নারী-পুরুষসহ অগণিত মানুষের অকাতরে রক্ত ঝরার ইতিহাস।
এক সময় এই দেশটি রাজা লক্ষণ সেন শাসন করতেন। পরে তুর্কি সেনাপতি ইখতিয়ার উদ্দীন মুহাম্মদ বখতিয়ার খিলজী ১২০৩ খ্রিষ্টাব্দে রাজা লক্ষণ সেনকে যুদ্ধে পরাজিত করেন। মুসলমানরা দেশটির শাসনভার গ্রহণ করে এবং তা সাড়ে পাঁচশ বছর দীর্ঘ হয়। এ সময় দেশটি ত্বরিত উন্নতি সাধন করে বিশ্বের দরবারে পরিচিত হয়ে ওঠে। তারপর সপ্তদশ শতকের শুরুতে ভারতবর্ষে তথা এই দেশে ইংরেজে বণিকরা ব্যবসার নাম করে ঢুকে পড়ে এবং তৎকালীন নবাব সিরাজ উদদৌলার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র শুরু করে এক মীর জাফরের মতো আনীত বিশ্বাসঘাতকদের সহযোগিতায় ১৭৫৭ সালে ২৩ জুন নবাবকে পরাজিত করে এ দেশ তথা গোটা ভারতবর্ষের শাসনভার নিয়ে নেয়। ফলে নেমে আসে চরম দুর্দশা। এ দুর্দশা থেকেই শুরু হয় ইংরেজদের বিরুদ্ধে ক্ষোভ এবং ক্ষোভ থেকে বিদ্রোহ। ইংরেজদের দেশ থেকে হটিয়ে প্রায় পৌনে দু শ’ বছর পর জনগণ ভারত ভারতবর্ষকে আবার ফিরে পায়। মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর দ্বি-জাতিতত্ত্বের ওপর ভিত্তি করে ১৯৪৭ সালে ভারতবর্ষ দু’টি ভাগে ভাগ হয়ে যায়Ñ একটি হলো নিখিল ভারত অন্যটা স্বাধীন পাকিস্তান।
এই স্বাধীন পাকিস্তানকে দু’টি অংশে বিভক্ত করে দেয়া হয় ১৯৫৬ সালের ২৩ মার্চÑ একটি পশ্চিম পাকিস্তান এবং অন্যটি পূর্ব পাকিস্তান; তথা আজকের বাংলাদেশ। আমরা ছিলাম পূর্ব পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত। আমরা স্বাধীনভাবে গৌরবান্বিত হলেও প্রকৃত স্বাধীনতার স্বাদ থেকে একেবারেই বঞ্চিত হলাম।
ব্রিটিশের কলোনি থেকে মুক্তি পেয়ে এ দেশের মানুষ অনেক আশা-প্রত্যাশার স্বপ্ন দেখেছিল। মানুষ ভেবেছিল তারা সামাজিক ও অর্থনৈতিক শোষণ ও বৈষম্য  থেকে  এবার মুক্ত হতে পারবে। তারা ফিরে পাবে সুখ ও সমৃদ্ধি। শিক্ষা, চিকিৎসা, বাসস্থানসহ জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে উন্নতি লাভ করে মানুষ মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপন করতে সক্ষম হবে। অথচ তাদের সেই স্বপ্ন কিছুদিন যেতে না যেতেই যেন ভেঙ্গে পড়লো। তারা দেখতে পেল পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকরা পূর্ব পাকিস্তানের লোকদের অধিকার নিয়ে টালবাহানা করছে। ক্রমেই বৈষম্য ও ভেদাভেদের এক প্রাচীর তৈরি করল পাক শাসকশ্রেণী। ফলে আমাদের এ এলাকার মানুষ সর্বক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়তে থাকল। আমাদের ন্যায্য দাবিকেও তারা মানতে চাইল না। শাসন ক্ষমতায় আমরা অবহেলিত হলাম। সেনাবাহিনীতে আমাদের মর্যাদাপূর্ণ স্থান দেয়া হলো না। শিক্ষা-দীক্ষা ও চাকরির ক্ষেত্রে আমরা পিছিয়ে পড়তে থাকলাম। আমাদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নতি বাধাগ্রস্ত হতে লাগল। আমরা ভাষার ক্ষেত্রেও চরম বৈষম্য ও অবহেলার শিকার হলাম। পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ভাষা ছিল বাংলা। আমাদের বাংলা ভাষার অধিকার থেকে বঞ্চিত করার ষড়যন্ত্র করল পাক সরকার। সংখ্যালঘিষ্ঠ মানুষের ভাষা উর্দুকে আমাদের জাতীয় ভাষা হিসেবে চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা করা হলো।
১৯৪৮ সালের কথা। পাকিস্তানের স্বপ্নদ্রষ্টা মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ ১৯৪৮ সালে পূর্ববঙ্গ সফরে এসে ভাষার ব্যাপারে এক বিতর্কের জন্ম দিলেন। তিনি উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় ভাষা হিসেবে ঘোষণা করে এ দেশের মানুষের মনে প্রচণ্ড আঘাত হানলেন। বৈষম্য ও জাতিভেদের শুরুটা হলো এখান থেকেই। উর্দুকে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় ভাষা করার এ উদ্যোগের বিরুদ্ধে ফুসে উঠলো পূর্ববাংলার জনগণ। প্রতিবাদ শুরু হলো সর্বত্র। ক্রমেই ছাত্র-জনতার  রোষ বাড়তে লাগল। ভাষার দাবি ধীরে ধীরে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের রূপ নিল। পাক শাসকশ্রেণী বাংলা ভাষার দাবিকে অগ্রাহ্য করতে গিয়ে জুলুম ও অত্যাচারের পথ বেছে নিল।
ফলে ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্র“য়ারি ঢাকার বুকে পুলিশের গুলিতে ছাত্র-জনতার রক্ত ঝরল। এই বর্বর পাক হামলার রেশ ধরে আন্দোলন নতুন ধারার পথ ধরল। পশ্চিম পাকিস্তানের সাথে পূর্ববাংলার মানুষের সম্পর্ক ক্রমেই খারাপের দিকে যেতে লাগল। এ দেশের মানুষের মধ্যে  জন্ম নিল স্বাধীনতার মনোভাব। এভাবে রাজনৈতিক পরিণতির দিকে অগ্রসর হলো দেশ। স্বাধীনতার চেতনায় উজ্জীবিত মানুষ নিজস্ব মানচিত্র রচনায় পাগলপারা হয়ে উঠল। ফলে ইতিহাসের ধারাক্রমে  এলো ১৯৭১ সাল।
পাক শাসনের বিরুদ্ধে জেগে উঠল এ দেশের লক্ষ-কোটি মানুষ। মিছিলে মিছিলে কেঁপে উঠল গোটা দেশ। স্বাধীনতার দাবিতে মানুষ রাস্তায় নেমে পড়ল। এতে পাক সরকার দিশেহারা হয়ে পড়ল। তাই নিরুপায় হয়ে তারা বেছে নিল নির্যাতনের পথ।
বহু রক্ত আর ত্যাগের বিনিময়ে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর আমরা মুক্তির স্বাদ পেলাম। নতুন দেশ, নতুন পতাকা নিয়ে আমরা যাত্রা শুরু করলাম। বাংলার আলো-বাতাসে সিক্ত হয়ে নতুন জীবন, নতুন সমাজ গড়ার সংগ্রাম আবার শুরু হলো।
আমাদেরকে এ বিষয়গুলো মনে ও মগজে রেখে ভালো করে পড়ালেখা করতে হবে। হতে হবে অনেক বড় বড় জ্ঞানী মানুষ। বাংলাদেশকে করতে হবে সব কিছুতে সমৃদ্ধ। বাংলাদেশকে নিয়ে যেতে হবে উন্নতির উঁচু সাজানো মঞ্চে।

SHARE

1 COMMENT

  1. বিজয়ের প্রেরণায় উজ্জীবিত হোক প্রতিটি নবীন। বিভেদের দেয়াল ভেঙে ঐক্যের শ্লোগানে সবাই অনুপ্রাণিত হোক সমৃদ্ধ বাংলাদেশের চেতনায়।

Leave a Reply