Home স্মরণ কবি বাহাদুর শাহ জাফর

কবি বাহাদুর শাহ জাফর

ড. মুহাম্মাদ নূরুল ইসলাম..

তোমরা শেষ মোগল স¤্রাট বাহাদুর শাহ জাফরের নাম হয়তো শুনেছ। বাহাদুর শাহ জাফর (১৭৭৫-১৮৬২) ছিলেন ভারতের শাসক বংশ মোগল বংশের (শাসনকাল ১৫২৬-১৮৫৮) শেষ স¤্রাট, দেশপ্রেমিক স্বাধীনতা সংগ্রামী মজলুম বাদশাহ, এক বেদনাহত অমর কবি ও লেখক। ভারতের স্বাধীনতা রক্ষার্থে সা¤্রাজ্যবাদী ইংরেজদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তার ভূমিকা অবিস্মরণীয়। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে সংগ্রামে স¤্রাট বাহাদুর শাহ জাফরের অবদান এ দেশবাসীর স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায় সূচনা করেছিল। মাতৃভূমির স্বাধীনতা রক্ষার্থে তিনি ব্রিটিশ বেনিয়াদের শায়েস্তা করার জন্য আমৃত্যু লড়াই করে গেছেন। ভারতের স্বাধীনতা রক্ষার শ্রেষ্ঠ প্রচেষ্টা হিসেবে স¤্রাট বাহাদুর শাহ জাফর মোগল সাম্রাজ্যের ঐতিহ্য ভুলে গিয়ে স্বেচ্ছায় রাজ মর্যাদা প্রত্যাহার করে জনগণের কাতারে নেমে এসে সত্যিকার একজন দেশপ্রেমিকের পরিচয় দিয়ে গেছেন।
তাঁর আসল নাম আবু মুজাফফর সিরাজউদ্দীন মুহাম্মদ, ডাক নাম জাফর। বাহাদুর শাহ জাফরের পিতা দ্বিতীয় মঈনুদ্দীন আকবর শাহ (শাসনকাল ১৮০৬-১৮৩৭)। তিনি ১৭৭৫ খ্রিষ্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন। পিতার মৃত্যুর পর ৬২ বছর বয়সে বাহাদুর শাহ জাফর (১৮৩৭-১৮৫৮ শাসনকাল) মোগল সিংহাসনে আসীন হন। তখন ইংরেজ সাম্রাজ্যবাদীরা ভারতে সর্বেসর্বা। ১৭৫৭ সালে বাংলা, ১৭৯৯ সালে মহীশুর চলে যায় ইংরেজদের হাতে। একে একে ১৮৫৭ সাল অবধি ভারতের অধিকাংশ এলাকার ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে ইংরেজরা। বাহাদুর শাহ জাফর পরিণত হলেন মোগল সাম্রাজ্যের প্রতিনিধি ও প্রতীকে। নামে মাত্র সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হয়ে কোনোদিনই সুখের মুখ দেখতে পাননি দ্বিতীয় বাহাদুর শাহ জাফর। দিল্লিতেও ইংরেজ ও তাদের দালাল মারাঠা হিন্দুদের আধিপত্য সুসংহত। মোগল রাজ পরিবারেরই কারো কারো রক্তে জেগে উঠলো স্বাধীনতা ও ঐতিহ্য চেতনার বন্যা। জগতে তোলপাড় করা মোগল ডাইনেস্টি ভারতের বুক থেকে বিদায় নেবে এ কথা ভাবতে কষ্ট হয় তাদের। অপর দিকে দেশের বীর সিপাহি-জনতার মনে এ চিন্তা-চেতনা দানা বেঁধে উঠল যে কোনোক্রমেই দিল্লির পতন ঘটতে দেয়া যায় না। নিজের দেশে ব্রিটিশ বেনিয়া সা¤্রাজ্যবাদীদের অধীনতাপাশে আবদ্ধ থাকতে হবে এটি মেনে নিতে রাজি নয় বীর সিপাহি-জনতা। স¤্রাটের স্ত্রী জীনাত মহল এ সুযোগটি গ্রহণ করলেন অতি দক্ষতার সাথে। তিনি গোপনে যোগাযোগ করলেন এসব দেশপ্রেমিক সৈনিকদের সাথে। তিনি এসে দাঁড়ালেন দেশের সৈনিকদেরকে উৎসাহ জোগাতে স¤্রাটের কাজে। তিনি স¤্রাটকে বুঝাতে সক্ষম হলেন ইংরেজ সা¤্রাজ্যবাদীদের বিরুদ্ধে সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়তে।
স¤্রাটের সমর্থন লাভ করে সিপাহি-জনতার সাহস বহুগুণ বেড়ে গেল। একের পর এক ঘটনার মধ্য দিয়ে উত্তাল হয়ে উঠল দিল্লি। অযোধ্যা, আম্বালা, কানপুর, ঝাঁসি, বহরমপুর, লাক্ষেèৗ ইত্যাদি অঞ্চল থেকে সেনাদল এসে জমায়েত হতে লাগল দিল্লিতে। দিল্লি দুর্গে গোপনে সংগ্রাম-পূর্ব প্রস্তুতি নিতে লাগলেন বেগম জিনাত মহল। তিনি তাঁর তীক্ষè বুদ্ধি দিয়ে সিপাহি বিপ্লব কিভাবে সার্থক করা যায় তা নিয়ে বিপ্লবী সেনাদের সাথে পরামর্শ করলেন। অবশেষে ১৮৫৭ সালের ২৩ জুন বিপ্লবের দিন ঠিক হলো। ঠিক এক শ’ বছর আগে এমন এক দিনে বাংলার স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলা থেকে ইংরেজরা কেড়ে নিয়েছিলো স্বাধীনতার লাল সূর্য। এক শ’ বছর পর স্বাধীনতার সেই হারানো সূর্যকে ছিনিয়ে আনবে তেজোদীপ্ত সিপাহি-জনতা। কিন্তু তাদের এই পরিকল্পনা ব্যর্থ হলো এক অত্যুৎসাহী মঙ্গল পান্ডের কর্মকাণ্ডে। তিনি ২৯ মার্চ সবাইকে অবাক করে দিয়ে একাই অস্ত্র নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লেন ইংরেজদের ওপর। তার হাতে কয়েকজন ইংরেজ সামরিক অফিসার নিহত হলো। বন্দী হলেন মঙ্গল পান্ডে। একুশে এপ্রিল ফাঁসিতে ঝুলানো হলো মঙ্গল পান্ডেকে।
পান্ডের ফাঁসির প্রতিশোধ নিতে চারদিকে বিপ্লবের আগুন ছড়িয়ে পড়ল। সিপাহি-জনতা বুকের রক্ত ঢেলে প্রতিশোধ নিয়ে চললো। অতি শিগগিরই দিল্লি নগরী বিপ্লবীদের দখলে এল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বিপ্লব রক্ষা করা গেল না। ইংরেজদের ষড়যন্ত্র ও তাদের কূটবুদ্ধিতে জড়িয়ে গেল অনেক সেনা ও দেশীয় সেনা। হিন্দু ও শিখরাতো ইংরেজদের পাশে আগে থেকেই ছিল। জিনাত মহল সিপাহি-জনতাকে আত্মগোপনে গিয়ে বিপ্লব অব্যাহত রাখতে পরামর্শ দিলেন। বৃদ্ধ স¤্রাট বাহাদুর শাহ জাফরকে নিয়ে তিনি আত্মগোপন করেন হুমায়ুনের সমাধিতে। সেখানে ছিল এক মুসলিম ফকির। শোনা যায় সে ফকিরই একদিন ইংরেজ গুপ্তচর হাডসনের কাছে ধরিয়ে দেন স্বাধীনতা সংগ্রামী স¤্রাট ও তার বিবি জিনাত মহলকে। ২২ সেপ্টেম্বর বন্দী হলেন বাহাদুর শাহ জাফর ও স¤্রাজ্ঞী জিনাত মহল ইংরেজদের হাতে। অনেক সিপাহিকে হত্যা করল ইংরেজরা। ২৩ সেপ্টেম্বর নির্মমভাবে স¤্রাটের তিন পুত্রকে হত্যা করে তাদের খণ্ডিত মস্তক পেশ করা হয় স¤্রাট বাহাদুর শাহ জাফরের সামনে।
এবার শুরু হলো বিচারের প্রহসন। অনেকে উৎসুক হয়ে তাকিয়ে ছিলো ইংরেজদের বিচারের দিকে। বিপ্লবের সময় অনেক সাধারণ ইংরেজকে আশ্রয় দিয়েছেলন জিনাত। কিন্তু না, ইংরেজরা কঠোর সিদ্ধান্ত নিলো। বাহাদুর শাহের বিরুদ্ধে চারটি মিথ্যা মামলা দায়ের করে সামরিক আদালতে তাঁর বিচার শুরু করে। তৎকালীন গভর্নর জেনারেল লর্ড ক্যানিং বিচারের রায়ে মোগল রাজ পরিবারকে রেঙ্গুনে নির্বাসন দেন।
এর পর থেকে মোগল সম্রাটের আরেক জীবন শুরু হলো। ৭ অক্টোবর ১৮৫৮ সালে ইংরেজ সিপাহিরা স¤্রাটকে নিয়ে চললো রেঙ্গুনের পথে। ইউরোপিয়ান হর্স আর্টিলারি পুলিশ ব্যাটালিয়ন নিয়ে গঠিত নবম ল্যান্সার বাহিনী স¤্রাটকে তার পরিবার-পরিজনসহ ঘেরাও করে নিয়ে চললো। রাজ পরিবারের মহিলা ও পরিচারিকাদের তিনটি টানা গাড়িতে তোলা হলো। স্থলপথ শেষ হলে জাহাজে তোলা হলো তাঁদের। অবশেষে বাংলার বিভিন্ন নদ-নদী, শহর-বন্দর পেরিয়ে সম্রাটকে নিয়ে ইংরেজদের জাহাজ ‘মেঘনা’ এসে পৌঁছল বার্মায়। ইতঃপূর্বে বার্মার পেগুরা কমিশনার মেজর এপি ফ্যালেকে ব্রিটিশ সরকারের ভারত বিষয়ক সেক্রেটারি, বাহাদুর শাহের জন্য একটি ভবন নির্মাণ করার নির্দেশ পাঠিয়েছিলেন। নির্দেশ মোতাবেক একটি দায়সারা গোছের কাঠের ভবন নির্মাণ করা হয়েছিল যা একটি কারাগার ছাড়া আর কিছুই ভাবা যায় না। আর এই কারাগার সদৃশ সাধারণ বাড়িটিতে অন্তরীণ অবস্থায় জীবন শুরু হলো মোগল সম্রাটের। ইংরেজ সরকার নির্বাসিত রাজ পরিবারের ১৬ জন বন্দীর জন্য খোরাকি বাবদ দিনে ১১ টাকা, প্রতি রোববার তাঁদের জন্য এক টাকা বেশি মানে মোট ১২ টাকা বরাদ্দের ব্যবস্থা করলো। আর মাসের প্রথম দিনই সবাই সাবান, তোয়ালে কেনার জন্য পেতেন মাথাপিছু ২ টাকা। কিন্তু কলম-কালি আর কাগজ ব্যবহার তাঁদের জন্য ছিল একেবারে নিষিদ্ধ। কোনো লোক তাঁদের সাথে দেখা করতে পারত না। চাকরদেরও পাস নিয়ে তাঁদের কাজে যেতে হতো।
১৮৬২ সালের নভেম্বর মাসের মাঝামাঝি সময়ে ডেভিস দিল্লিতে পত্র লিখে জানালেন, গত ৭ নভেম্বর বাহাদুর শাহ জাফর নামক একজন রাজবন্দী মারা গেছেন। দিল্লির শেষ মোগল সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফর ৬ নভেম্বর তৃতীয় বারের মত পক্ষাঘাতে আক্রান্ত হন এবং পরদিন মৃত্যুবরণ করেন। সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফর ২৬ অক্টোবর থেকেই অসুস্থ হয়ে পড়েন। উপযুক্ত চিকিৎসাও পাননি। এ অবস্থায় ডেভিস কাছে ইট আর চুন জোগাড় রাখতে বললেন যাতে বাহাদুর শাহকে কবর দেয়া যায়। যেদিন ভোরে তিনি মারা যান সেদিন বেলা ৪টায় কবর দিয়ে তা মাটির সমান করে ঘাসের আবরণে ঢেকে দেয়া হয়। ডেভিস বারবার এসে দেখতো যেন সম্রাটের কবরের সাথে অন্যদের কবরের কোনো ফারাক না থাকে এবং কবরটার সন্ধান যেন কেউ না পায়। একজন মৌলভী লাশ দাফনে সাহায্য করেন। অত্যন্ত দুঃখ ও পরিতাপের বিষয় এই যে, শেষ মোগল সম্রাটের মৃত্যুর পর ইংরেজ বেনিয়ারা তাঁর প্রতি শেষ শ্রদ্ধাটুকুও প্রদর্শন করার প্রয়োজন অনুভব করেনি। দাফনের সময় সম্রাটের কোনো উপাধি বা পদবি ঘোষণা করতে দেয়া হয়নি।
অনেক বছর পর বার্মার মুসলমানদের বারবার আবেদনের ফলে তহবিল সংগৃহীত হয়। ১৯৩৪ সালে গঠিত একটা কমিটি কবরের ওপর মামুলি ধরনের স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করে। সমাধিসৌধের পূর্ণাঙ্গ মডেল তৈরি করা হলেও তা আজও গড়ে ওঠেনি। আর সে স্মৃতিসৌধের গায়ে আজও উৎকীর্ণ রয়েছে সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফরের স্বরচিত কবিতার একটি এপিটাকÑ ‘কিতনা বদ-নসিব হ্যায় জাফর। দাফনকে লিয়ে/দো গজ জমিন না মিলে।’
উর্দু সাহিত্যের অমর কবি বাহাদুর শাহ জাফর। উর্দু সাহিত্যাঙ্গনে তিনি ‘জাফর’ ছদ্মনামে খ্যাত। জাফর এ ছদ্মনাম তার নিজের লেখা উর্দু কবিতার পঙ্ক্তিতে পঙ্ক্তিতে বিশেষভাবে বিধৃত হয়ে আছে। বাহাদুর শাহ জাফরের কাব্য প্রতিভার উজ্জ্বল স্বাক্ষর ভাস্বর হয়ে ওঠে তাঁর রচিত অসংখ্য পঙ্ক্তিমালায়। তাঁর রচিত কবিতাকে ‘শেরু’ (দ্বিপদী কবিতা), গজল (আধ্যাত্মিক অনুষঙ্গের কবিতা) ও নজম (গীতি কবিতা)Ñ এ তিন ভাগে ভাগ করা যেতে পারে। জাফরের কবিতায় উপদেশ, প্রেম ও আধ্যাত্মিক অনুষঙ্গ যেমন আছে, তেমনি আছে আপন দুর্ভোগের অনুতাপ আর অনুশোচনায় ভরা মর্মবেদনা।
মোগল সম্রাট হওয়ার পরও বাহাদুর শাহ জাফরের শেষ জীবন কেটেছে অত্যন্ত করুণ অবস্থায়। তাঁর অন্তিম দিনগুলো ছিল ব্যথা আর বেদনায় ভরা। কিন্তু বাহাদুর শাহ জাফর দেশবাসীর মুখের দিকে তাকিয়ে সেই মানবেতর জীবন যাপন করেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

SHARE

1 COMMENT

  1. লেখাটি পড়ে অনেক কিছু জানতে পারলাম। ভালো লেগেছে আমার। অনেক ধন্যবাদ। ইতি সুমাইয়া

Leave a Reply