Home নিয়মিত পেনাল্টি কিলারদের গল্প

পেনাল্টি কিলারদের গল্প

রাফিউল ইসলাম
স্ট্রাইকারদের মতো আলোচনায় সচরাচর থাকেন না গোলরক্ষকেরা। কিন্তু তাঁরাও স্ট্রাইকারদের আটকে বিশেষ করে পেনাল্টি রুখে দিয়ে হয়ে যান ম্যাচ জয়ের নায়ক।
১ ফেব্রুয়ারি, ২০১২। ভ্যালেন্সিয়ার এস্তাদিও মেস্তালা স্টেডিয়ামে ম্যাচ শেষে দেখা গেল অপরিচিত এক দৃশ্যÑ হতাশা-বিধ্বস্ত চেহারায় মাথা নিচু করে মাঠ ছাড়ছেন লিওনেল মেসি!
ওই সময় বার্সেলোনাকে ঘন ঘনই ড্রর হতাশা নিয়ে মাঠ ছাড়তে হচ্ছিল। কোনো কোনো ম্যাচে হেরেও যাচ্ছিল তারা। কিন্তু ওই দিন ব্যালেন্সিয়ার বিপক্ষে কোপা ডেল রের সেমিফাইনালের প্রথম লেগে বার্সার ড্রয়ের পুরো দায়ই ছিল মেসির! তিনিই পেনাল্টি মিস করে জয়ের সহজ সুযোগ হাতছাড়া করেন। যদিও আমাদের আজকের বিষয় পেনাল্টি মিসের ‘ট্রাজিক হিরো’ মেসি নয়। তবে যাঁদের নিয়ে এই খেলার চমক, মেসি তাঁদেরই একজনের শিকার।
যুগে যুগে ফুটবলের অনেক রথী-মহারথীই পেনাল্টি মিস করেছেন। পেনাল্টি ঠেকিয়ে অনেক গোলরক্ষকই ম্যাচ শেষে নায়ক কিন্তু ইতিহাস এমন কিছু গোলরক্ষকের সন্ধান দেয়, যাদের নামের সঙ্গেই যুক্ত ‘পেনাল্টি ঠেকাতে পারদর্শী’র পরিচিতি। গোলপোস্টের সামনে এমনিতে পারফরম্যান্স যেমনই হোক, পেনাল্টি ঠেকাতে তাঁরা সিদ্ধহস্ত। শট নিতে আসা খেলোয়াড়ের শরীরী ভাষাটা মুহূর্তেই পড়ে নিতে পারেন। ব্যালেন্সিয়ার গোলরক্ষক দিয়েগো আলভেজ সেই বিরল প্রজাতির গোলরক্ষকদের একজন।
প্রথমে ব্রাজিলিয়ান গোলরক্ষক হিসেবে স্পেনের শীর্ষ লিগে খেলা আলভেজের পেনাল্টি ঠেকানোর পরিসংখ্যানটা ঈর্ষণীয়। ভ্যালেন্সিয়ায় এ পর্যন্ত ১৭টির বেশি পেনাল্টির মুখোমুখি হয়েছেন, যার ১১টিতেই সফল! আর নন্দিত তারকাদের মধ্যে মেসিই তাঁর প্রথম শিকার নন। ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো, ফার্নান্দো লেেরন্তে, ফ্রেডেরিক কানুটের মতো তারকাদেরও স্পটকিক ঠেকিয়েছেন তিনি। এই সাফল্যের গোপন রহস্য কী? ভ্যালেন্সিয়ার এক নম্বর গোলরক্ষকের উত্তর, ‘পেনাল্টি হলো মনস্তাত্ত্বিক লড়াই। গোলরক্ষককে অবশ্যই নির্ভার থাকতে হবে এবং প্রতিপক্ষ খেলোয়াড়ের মগজের ভেতরে ঢুকে পড়তে হবে। আমি পেনাল্টি শট নেওয়াদের ভিডিও নিয়ে গবেষণা করি এবং বিশ্লেষণ করি, তারা কোথায় শট নিতে পছন্দ করেন এবং শরীর কোন্ দিকে ঝোঁকান। শট নেয়ার আগে চূড়ান্ত পদক্ষেপগুলোই গুরুত্বপূর্ণ।’
আলভেজের স্বদেশী ক্লদিও তাফারেলও পেনাল্টি ফেরানোই বিশেষজ্ঞ। তবে যদি একটি ম্যাচকেই বিবেচনায় নেয়া হয় তাহলে আগেভাগেই চলে আসেন স্টুয়া বুখারেস্টের রোমানিয়ান গোলরক্ষক হেলমুট দুকাদামের নাম। ১৯৮৬ সালে ইউরোপিয়ান কাপের ফাইনালের পেনাল্টি শ্যুটআউটে তিনি বার্সেলোনার চারটি পেনাল্টি শটই ঠেকিয়ে দিয়েছিলেন!
লেভ ইয়াসিন, রাশিয়ার (সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন) কিংবদন্তী গোলরক্ষক অনেকের চোখেই সর্বকালের সেরা গোলরক্ষক। ক্যারিয়ারে ১৫০টিরও বেশি পেনাল্টি ঠেকিয়েছিলেন তিনি। জার্মারি রুডি কারগাসও ‘পেনাল্টি কিলার’ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন অনন্য উচ্চতায়। বুন্দেসলিগায় ৭০টি পেনাল্টি শটের মুখোমুখি হয়ে রেকর্ড ২৩টি শট ঠেকিয়েছেন তিনি।
পেনাল্টি রুখে দিয়ে ‘নায়ক’ বনে যাওয়ার আরেক উদাহরণ কেনেডি এমউইন। গত ১২ ফেব্রুয়ারি আফ্রিকান নেশনস কাপের ফাইনালে শক্তিশালী আইভরি কোস্টকে টাইব্রেকারে হারিয়ে জাম্বিয়া প্রথমবারের মতো আফ্রিকান নেশনস কাপ জিতেছে এমউইনির গ্লাভসজোড়ার জাদুতেই। দেশে এমউইন তখন থেকে ‘জাতীয় বীর’।
এমন অনেক গোলরক্ষকও আছেন, যাঁদের এই দক্ষতা ছিল প্রকৃতি-প্রদত্ত। সার্জিও গয়কোচিয়া তাঁদের অন্যতম। সাবেক ইে আর্জেন্টাইন গোলরক্ষকের নামের সঙ্গে ‘পেনাল্টি কিলার’ পরিচিতিটা জুড়ে যায় ১৯৯০ বিশ্বকাপে। দ্বিতীয় রাউন্ডে সে সময়ের যুগোস্লাভিয়ার বিপক্ষে এবং সেমিফাইনালে স্বাগতিক ইতালির বিপক্ষেÑ দু’বারই টাইব্রেকারে আর্জেন্টিনাকে জিতিয়ে দিয়েছিলেন গয়কোচিয়া।
২০০৬ বিশ্বকাপের অভিজ্ঞতাটা আবার আর্জেন্টাইনদের জন্য উল্টো। তারাই এবার জার্মান গোলরক্ষক জেন্স লেম্যানের ‘শিকার’। উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগে ভিয়ারিয়ালের আর্জেন্টাইন মিডফিল্ডার হুয়ান রোমান রিকেলমের পেনাল্টি ঠেকিয়েছিলেন আর্সেনালের হয়ে। বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে রিকেলমেদের আর্জেন্টিনার মুখোমুখি লেম্যানের জার্মানি। ম্যাচ গড়ায় টাইব্রেকারে। আর্জেন্টাইনদের প্রতিটি শট নেয়ার আগে লেম্যান সঙ্গে নিয়ে আসা কাগজ বের করে পড়ছিলেন। ফলাফল, রবার্তো আয়ালা ও এস্তবান কাম্বিয়াসোর শট ঠেকিয়ে দিয়ে লেম্যান জার্মানিকে তুলে দেন সেমিফাইনালে।
কী লেখা ছিল ওই কাগজে? এ নিয়ে আলোচনা আজো শেষ হয়নি। তবে ফিফাডটকমকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে রিকেলমে দাবি করেছিলেন, ওটা ছিল স্রেফ এক টুকরো সাদা কাগজ, আর্জেন্টাইনদের মনোযোগ ভিন্নমুখী করার একটা প্রতারণা!
এক পেনাল্টি ঠেকানো এবং শিরোপা জেতার কীর্তি ইকার ক্যাসিয়াসের। তাও একবার নয়, দু’বার। ২০০৮ ইউরোতে এবয় ২০১০ বিশ্বকাপে। পেনাল্টি ঠেকানোর দক্ষতার পরিচয় তরুণ ক্যাসিয়াস দিয়েছিলেন ২০০২ বিশ্বকাপেই। দ্বিতীয় রাউন্ডে আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে স্পেন জিতেছিল টাইব্রেকারে। ২০০৮ ইউরোতে ক্যাসিয়াসের গ্লাভস টুর্নামেন্ট থেকে ছিটকে ফেলে ইতালিকে। পরে ফাইনালে জার্মানিকে হারিয়ে স্পেন তো জিতেছিল শিরোপাই। ২০১০ বিশ্বকাপেও ঘটে প্রায় একই ঘটনা। কোয়ার্টার ফাইনালে প্যারাগুয়ের অস্কার কার্দোজের পেনাল্টি ঠেকিয়ে দেন ক্যাসিয়াস। শেষ পর্যন্ত স্পেন হয় প্রথমবারের মতো বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন।
সবশেষে বলতে হয় ইংলিশ ক্লাব সোয়ানসি সিটির ডাচ গোলরক্ষক মিকেল ফর্মের কথা। নিজের দক্ষতায় এরই মধ্যে তিনি হয়ে উঠেছেন ‘পেনাল্টি ঠেকাতে পারদর্শী’ গোলরক্ষক।
ওয়াইড বলে বোল্ড!

ক্যানসারের সঙ্গে লড়াইয়ে দাপটে জিতেছেন। যুবরাজ সিংয়ের লড়াই এখন নিজের সঙ্গে। মাঠে ফেরার স্বপ্নে বিভোর যুবরাজ নিজের সঙ্গে লড়াইয়ের প্রথম ধাপও জিতেছেন। জায়গা পেয়েছেন ভারতের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ দলে। খেলেছেনও ভালো। ক্যারিয়ারে নতুন মোড় নেয়ার এই সময়ে তাঁর ক্যারিয়ারের শুরুর দিকের আজব এক ঘটনা জেনে নেয়া যাক। বিস্ময়কর হলেও সত্য, যুবরাজ একবার বোল্ড হয়েছিলেন ওয়াইড বলে!
বিচিত্র সব ঘটনার শেষ নেই ক্রিকেটে, উপহার দেয় কতই না বিস্ময়। তবু অনেকে বলতে পারো, ওয়াইড বলে বোল্ড হওয়াটা একটু বাড়াবাড়ি হয়ে গেল না? বিশ্বাস না হলে ড্যারেল হারপারকে জিজ্ঞেস করে নিতে পারো। ওয়াইড বলে বোল্ড কাণ্ডের জন্ম তো এই অস্ট্রেলিয়ান আম্পায়ারের হাত ধরেই। ঘটনা ২০০০ সালে শারজা চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে ভারত-জিম্বাবুয়ে ম্যাচের। সীমিত ওভারের ক্রিকেটে লেগ স্ট্যাম্পের ওয়াইড আম্পায়ারদের কড়াকড়ি একটু বেশিই, স্ট্যাম্পে বাতাস লাগিয়ে গেলেও ওয়াইড দেয়া হয় প্রায়ই। যুবরাজকে করা পেসার ট্রাভিস ফ্রেন্ডের এক ডেলিভারি তেমনি বাতাস লাগিয়ে জমা পড়ল অ্যান্ডি ফ্লাওয়ারের গ্লাভসে। হারপার ওয়াইড সঙ্কেত দিতেও দেরি করলেন না। কিন্তু উইকেটকিপার ফ্লাওয়ার খেয়াল করলেন, বেল তো পড়ে আছে মাটিতে! ফ্রেন্ডের ডেলিভারির বাতাস একটু জোরেই লেগেছিল, হয়তো লেগস্ট্যাম্পে আলতো চুমু খেয়েও এসেছিল বল। একটা বেল পড়েছে তাতেই, বোল্ড হওয়ার জন্য তো সেটাই যথেষ্ট! প্রসারিত দুই হাত নামিয়ে এক হাত তুলে হারপার উঁচিয়ে ধরলেন তর্জনী। একটা বাড়তি ডেলিভারি পাওয়ার বদলে বোল্ড হয়ে চোখে-মুখে অবিশ্বাস নিয়ে ফিরলেন যুবরাজ!

SHARE

Leave a Reply