Home গল্প মাটির টানে

মাটির টানে

নাহিদ জিবরান

সামনেই ঈদ। মনটা বাড়ির দিকে পড়ে রইল। ভাবছি এবার বাড়িতে ঈদ করবো। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে সে জন্য আব্বুর পারমিশন লাগবে। আম্মুকে কথাটি বললাম। আম্মু বললো, ঠিক আছে যাস্। পরে বলে উঠলো, তোর আব্বাজানকে বলতে হবে। আব্বুর সামনে উপস্থিত হলাম। আব্বু রাজি হলেন না। বললেন, বাড়ি থেকে এসেছিস দুই মাসও হয়নি, আবার এখন কেন? তারপর যথারীতি ঈদ এলো।
সন্ধ্যায় আমার মোবাইলে রিংটোন বেজে উঠলো। সৌরভ ফোন দিয়েছে। জানাল ওরা সাভার যাচ্ছে, ক্রিকেট খেলা আছে। আমিও যেন তৈরি হয়ে পরদিন সকাল ৭টার আগে ওদের সাথে মিট করি। ভাবলাম, যাক, বাড়িতে যাওয়া হয়নি, সাভার থেকে ঘুরে আসি।
আমার এক বন্ধুর বাড়ি সাভার। সকালে সে ফোন করে বলল, খেলা যাবে না! মুষলধারায় বৃষ্টি হচ্ছে। আমরা তো ততক্ষণে বাসে করে রওনা দিয়ে দিয়েছি। বাস থেকে নামার উপায় ছিল না। জুয়েল বলল, ঠিক আছে সাভারে যাই তারপর ওখান থেকে না হয় আবার ফেরত আসা যাবে। সাভারে নামার পর দেখলাম বৃষ্টি ফোঁটা ফোঁটা পড়ছে। মাঠ তো তাহলে শুকনা আছে। খেলা হতে পারে। কিন্তু জানা গেল মাঠে পানি জমে গেছে। সবার মন খারাপ হয়ে গেল। এবার কী করবো! কারোর মাথায় কিছু আসছে না। হঠাৎ আরেকটি কাণ্ড ঘটে গেল। সবাই তো যে যার মতো বাড়ি চলে যাচ্ছে। আমি চিন্তা করে দেখলাম পকেটে টাকা আছে যেহেতু দাঁড়িয়ে থেকে লাভ নেই। আমিও বাড়িতে চলে যাই। এই ভেবে বাড়ির টিকেট কাটলাম। বাসে ওঠার পর মনে হলো বাসায় কী বলবো? তারপর অবশ্য মন এমনিতেই স্থির হয়ে গেল। বাড়িতে গেলে সবাই তো জানতে পারবে এমনকি আব্বাজানও। অবশেষে রাত ৮টায় গিয়ে পৌঁছলাম ঝিকরগাছায়।
বাড়িতে ফোন করে কাউকে জানাইনি। নানুর বাসায় উঠলাম। যখন দরজায় নক করলাম তখন খালামণি তাকিয়ে চিনতে পারলো না। বলে উঠলো, কে আপনি। আমি বললাম, আমাকে চিনতে পারছো না? তাহলে আমি চলে যাচ্ছি। তখন খালামণি বলে উঠলো, কে, নাহিদ! আয় ভেতরে আয়। একটা ফোন করে আসবি না।
ভেতরে যেতেই লোকজন আমার দিকে তাকিয়ে হতবাক হয়ে গেল। নাহিদ তুই এসেছিস? বাসায় সবাই জানে? আমি আর তখন কিছু বললাম না। তারপর রাতে খাওয়া-দাওয়া করে সকালে গেলাম বড় চাচার বাসায়। সেখানে কাউকে না পেয়ে দাদুর বাড়ির উদ্দেশে রওনা হলাম। ঐখানেও একই অবস্থা। সবাই হতভম্ব হয়ে গেল।
বড় আব্বু ডেকে জিজ্ঞেস করলেন, সত্যি তুমি এসেছো? আমার পাশে একটু বসে থাকো। আমার বিশ্বাস হচ্ছে না।
আমি বললাম, হ্যাঁ, সত্যিই আমি এসেছি।
বাবু আমাকে দেখে অন্য রুমে চলে গেলেন। আমি কিছু বুঝতে পারলাম না। কিছুক্ষণ পরে এসে বললেন, তোমার আব্বুর কাছে ফোন দিয়েছিলাম। আমি মনে করেছিলাম বাসায় রাগারাগি করে চলে এসেছো।
সবাই বলে উঠলেন, যারা যেখানে যাই কিছু করুক না কেন, সবচেয়ে নিরাপদ স্থান হলো দাদুর বাড়ি। এখানে কোনো সমস্যা হবে না। সবাই হাসতে লাগলেন।
দুপুরে খাওয়ার পর মিয়াভাই আমাকে বললেন, কোথাও যেয়ো না যেন। আমি মনে মনে বললাম, কী ব্যাপার! কোনো কুটুম আসবে নাকি? কিন্তু না, মিয়াভাই বললেন, আজকে আমাদের বাড়ি এবং দরগাডাঙা পাড়ার সাথে খেলা। আমাদের জিততে হবে। আমার আনন্দ তখন দেখে কে!
প্রথমে খেলা হলো চানাচুর ভাজা দুই প্যাকেট। প্রথম খেলায় আমরা জিতে গেলাম। আবার খেলা শুরু হলো। এটাতেও আমরা জিতে গেলাম। চানাচুর ভাজা কিনে সবাই মিলে খেলাম। রাতে চার থেকে ছয়জন ছেলে এসে বাবুর সাথে কথা বললো যে আগামীকাল সকাল ৭টায় খেলা হবে। বাবু একটু হেসে বলে উঠলো, তোমাদের খেলা যা না খেলা একই কথা। কিন্তু পরদিনও আবার তারা হেরে গেল। এরকম করে ঐ দিন ছয়টা খেলা হলো। সেটাতেও আমরা জিতে যাই। তারপর সবাই যখন বাড়ির দিকে রওনা হবো ঠিক তখনই বাবুকে ডেকে বললো, দাদা, আর একটা খেলা হোক। বাবু বললো, না, দুপুরের খাবারটি খাওয়া হলো না এখনো। আর খেলা যাবে না। ওরা বললো, দাদা, এখন তিনটা বাজে। আমরা ঠিক চারটার দিকে বাগানে উপস্থিত থাকবো। বাবু বললো, একদিনে এতো খেলা যায় নাকি? তখন মিয়াভাই বললো, বাবু খেলতে চাচ্ছে খেলুক না। ওরা তো বারবার হেরে যাচ্ছে।
ওদের মধ্যে একজন বলে উঠলো, ঠিক আছে, চারটায় খেলা হবে দুই প্যাকেট চানাচুর। মিয়াভাই বললো, ঠিক আছে, পাঁচ কেজি চমচম। রাজি থাকলে বিকালে এসো। আর না থাকলে দরকার নেই। কিছুক্ষণ ধরে ওদের মধ্যে কথা কাটাকাটি হলো। বাবু বললো, বোঝা গেছে তোমরা খেলতে পারবে না। তখনই রেগে গিয়ে বললো খেলা হবে।
দুপুরে খাওয়ার পর আবার চলে আসলাম বাগানে। টসে জিতে ওরা আমাদেরকে ব্যাটে পাঠালো। ১২ ওভার খেলার কথা বললো। খেলা শুরু হবার কিছুক্ষণ পরই আমাদের ব্যাটিংয়ে ধস নামা শুরু হলো। একে একে সবাই আউট হতে লাগলো। আমি আর মিয়াভাই দুই ওভার খেলার পর আমিও আউট হয়ে গেলাম। দলীয় রান মাত্র ৩৭। মিয়াভাই আর আমার ছোট ভাই নাদিম দু’জনে মিলে কোনো মতে ৫৪ রান করে। এদিকে বাবুর মাথায় হাত। পাঁচ কেজি চমচম! এত টাকা কোথায় পাওয়া যাবে! হেরে গেলে তো মান-সম্মান বলে আর কিছুই থাকবে না।
যাইহোক, ওদেরকে ব্যাট করতে দিলাম। মিয়াভাই এক ওভারে দিলো ১৭ রান। জেতার আর কোনো রাস্তাই খোলা নেই। এবার নির্ঘাত হেরে গেছি। বাবু বল করতে এসে একই দশা তবে এই ওভারে একটি উইকেট তুলে নিলেন। মিয়াভাই আমাকে বল দিয়ে বললেন, টেনশন করবে না। তুমি তোমার মত বল করতে থাক। আমি প্রথম ওভারে বল করে মাত্র ৩টি রান দেই। এরপর আবার আমাকে আনা হলো। আমি করতে চাইলাম না। তারপরও করতে হলো। ওই ম্যাচে আমি ৭টি উইকেট হাতিয়ে নিলাম। আমার জীবনে এই প্রথম এতগুলো উইকেট নিলাম। ওরা রান করেছিল মাত্র ৪২। আমাকে কোলে নিয়ে নাচতে লাগলেন মিয়াভাই। সেই দৃশ্য সত্যিই স্মরণীয় হয়ে থাকবে। আমরা সব খেলাতেই জিতে গেছি আল্লাহর রহমতে।
সবাই খুব আনন্দ পেয়েছিল। বড় আব্বু বলে উঠলো, বাড়ির সম্মানটা রেখেছো তাহলে। আমি মুচকি হাসলাম। পরের দিন খেলতে যাব তখন খুব বৃষ্টি হলো। বৃষ্টি থামার পর দেখলাম যে যার মতো মাছ ধরতে ব্যস্ত হয়ে গেল। আমি আমার ছোট ছোট দুটি ভাই নাদিম ও নাজিবকে নিয়ে মাছ ধরা দেখলাম। কিন্তু বেশিক্ষণ দেখতে ইচ্ছে করলো না, কারণ ওরা মাছ ধরে আনন্দ পাচ্ছে আর আমরা আঙুল চাটবো তা কি হয়! আমি নাদিমকে বললাম বড়শি আছে কি না। সে বলল আছে। বড়শি নিয়ে এলো কিন্তু কী দিয়ে ধরবো? নাদিম বলল ভাইয়া আটা দিয়ে ধরা যাক। আমি বললাম, এখন আটা কোথায় পাব? নাজিব বলে উঠলো, ভাইয়া, এক কাজ করা যাক, কেঁচো নিয়ে আসি। কিন্তু কেঁচো কে তুলবে? নাজিবই একটু পরে এক ব্যাগ কেঁচো নিয়ে এলো। সমস্যা হলো আমরা কেউ কেঁচো ভরতে পারি না। পরে অবশ্য একটি ছেলে বড়শিতে পরিয়ে দিয়েছিল। প্রথমে ধান ক্ষেতে দিয়েছিলাম কিন্তু কোনো ফল এলো না। তারপর একটা পুকুরে দিয়েছিলাম সেখানেও অনেকক্ষণ অপেক্ষা করেও লাভ হলো না। রেগে গিয়ে আবার ফেললাম তখন পাড়ার ভাবীরা বললো, তুই মাছ পাবি না। বাড়ি যা ভাত খেয়ে আয়। আমি যেই তাদের দিকে তাকালাম অমনি বড়শি টানতে থাকলো। টান দিয়ে দেখলাম মাছ কেঁচো খেয়ে ফেলেছে। তখন বাবুকে দেখলাম তার সারা শরীরে কাদা এবং হাতে পলিথিন। আমাকে বললো, বাবু দেখি যা কিরাম মাছ ধরেছি। বাড়ি আয়।
কিন্তু বাড়িতে গেলাম না। মাছ না নিয়ে বাড়িতে যাওয়া যাবে না। তখন আর সেখানে না ফেলে চলে গেলাম মাঠের দিকে। সেখানে দোস্তদের পুকুর আছে। বাবু সেখানে গোসল করতে এসেছিল। আমি মন খারাপ করে বড়শি ফেললাম। এর কিছুক্ষণ পরই একটা বড় ট্যাংরা পেলাম। মনটা আনন্দে ছটফট করতে লাগলো। বাড়ির দিকে আসতেই চাচা-চাচীরা বললো ট্যাংরার ভাগ চাই। নয়াব্বু বলে উঠলো তোমরা কি চাও না চাও আমার কিন্তু লেজটা চাই। আমি হেসে উঠলাম।
গ্রামে গেলে সেখান থেকে আর চলে আসতে ইচ্ছা করে না। ঢাকার মত যানবাহনের শব্দ নেই, নেই কোনো গ্যাঞ্জাম, নেই কালো ধোঁয়া, নেই নোংরা আবর্জনা। শুধু আছে মুক্ত বাতাস। আছে সোনালি ধানের ক্ষেত। আছে বিভিন্ন প্রজাতির গাছ। আছে খেজুর গাছ। শীতের সময় রস খাওয়াটা আরও মজাদার। ঢাকার মত ভেজাল খাবার নেই, যা আছে সবই টাটকা। ঢাকায় আর আগের মত থাকতে ইচ্ছা করে না। তারপরও থাকতে হয় কষ্ট করে।
যাই হোক, গ্রাম ছেড়ে ঢাকায় চলে এলাম। আবার সেই আগের মতো দম বন্ধ হয়ে আসবে। আবার যখন সময় পাবো চলে যাবো মাটির টানে, নদীর টানে সেই কপোতাক্ষ নদের বাঁকে।

SHARE

Leave a Reply