Home সাহসী মানুষের গল্প জীবনজয়ী জায়নামাজ

জীবনজয়ী জায়নামাজ

কাএয়স মাহমুদ..

মক্কার আকাশ-বাতাস মথিত করে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছে বর্বর কুরাইশদের ঢেড়া পেটানোর শব্দ।
কিসের ঢেড়া!
কিসের শব্দ!
মক্কার সবাই কান পেতে আছে। সবাই শঙ্কিত। তাদের কানে প্রবেশ করলো গরম সীসার মতো একটি মর্মান্তিক ধ্বনি। ঢেড়া পিটিয়ে কে যেন বলছে, ‘এসো যদি দেখতে চাও তবে বেরিয়ে এসো। খুবাইবকে বন্দী করা হয়েছে। সবার সামনে তার অঙ্গপ্রত্যঙ্গ কেটে তারপর হত্যা করা হবে শূলে চড়িয়ে। এই মজার দৃশ্য যারা দেখতে চাও তারা দ্রুত চলে এসো।’
কী বেদনার কথা!
কী নির্মম নিষ্ঠুরতা!
একজন সাহাবীকে বন্দী করে নরপশুরা এমনি উল্লাসে মেতে উঠেছে।
দুরু দুরু বুকে অনেকেই হাজির হলো।
তাদের মধ্যেই ছিলেন এক টগবগে তরুণ।
নাম তার সাঈদ ইবন আমের।
তিনিও জনতার ফাঁক দিয়ে দেখছেন খুবাইবের ওপর নেমে আসা কঠিন এবং ভয়ঙ্কর নির্যাতন।
শুধু দেখছেনই না। শুনছেনও বটে।
শুনছেন খুবাইবের দৃপ্তকণ্ঠ। শুনছেন একজন মৃত্যুপথ যাত্রী ব্যক্তির ঈমানের সাহসী উচ্চারণ।
খুবাইবকে শূলে চড়ানোর জন্য সব কিছু প্রস্তুত।
এখন কেবল তাকে লটকানোর কাজ বাকি।
এ সময় সাঈদের কানে ভেসে এলো এক প্রগাঢ় উচ্চারণ। খুবাইব জালিমদেরকে বলছেন, ‘যদি অনুমতি দাও, তাহলে শূলে চড়বার আগে আমি দুই রাকায়াত নামাজ আদায় করতে পারি।’
বিস্মিত হলেন সাঈদ। এটা কী করে সম্ভব? মৃত্যু নিশ্চিত জেনেও কি এভাবে স্থির ও শান্ত থাকতে পারে কেউ!
তারা ভাবলো, মাত্র তো দুই রাকায়াত নামাজ! সুতরাং শেষ ইচ্ছা পূরণে তারা রাজি হয়ে গেল।
খুবাইব গভীর মনোযোগের সাথে নামাজে দাঁড়ালেন। তার মধ্যে কোনো উদ্বেগ নেই। নেই ভয়, শঙ্কা বা উৎকণ্ঠার বুদ্বুদ।
তিনি প্রভুর সামনে দাঁড়িয়ে গেলেন। তারপর প্রশান্ত এবং কোমল হৃদয়ে আদায় করলেন প্রতিটি রুকু ও সিজদা। নামাজ শেষে সালাম ফিরিয়ে বর্বর কুরাইশদের দিকে ফিরলেন।
আহ কী নিষ্পাপ এবং সাহসী একটি মুখ!
কী তার ঈমানের তেজ!
তিনি ধীরকণ্ঠে বললেন, ‘আল্লাহর কসম! তোমরা যদি মনে না করতে যে, মৃত্যুর ভয়ে আমি নামাজ দীর্ঘ করছি, তাহলে আমি নামাজ আরও দীর্ঘ করতাম।’
সাঈদ শুনলেন খুবাইবের এই সাহসী নিষ্কম্প উচ্চারণ। তিনি আরও অবাক হলেন।
কিন্তু তার চেয়েও বেশি হতবাক হলেন, শিউরে উঠলেন কুরাইশদের নিষ্ঠুরতা দেখে।
তিনি দেখলেন, এই তেজোদীপ্ত খুবাইবের শরীর থেকে একের পর এক কেটে নিচ্ছে তার অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলো! আর স্থির পর্বতের মতো দাঁড়িয়ে আছেন খুবাইব।
তারা কাটছে আর কৌতূহল মিশিয়ে জিজ্ঞেস করছে, ‘কি হে! তোমার জায়গায় মুহাম্মাদকে আনা হোক, আর তুমি মুক্তি পেয়ে যাওÑ এটা কি তুমি পছন্দ কর না?’
খুবাইবের দেহ থেকে ফিনকি দিয়ে বয়ে চলেছে রক্তের ধারা। যেন শত ফোয়ারা। একই সাথে প্রবাহিত হচ্ছে। তখনো, তখনো শান্ত এবং স্থির খুবাইব। বলছেন :
‘আল্লাহর কসম! আমি আমার পরিবার ও সন্তান-সন্ততির মধ্যে নিরাপদে বাস করি, আর বিনিময়ে নবী মুহাম্মদের (সা) গায়ে কাঁটার একটি আঁচড়ও লাগুকÑ তাও আমার পছন্দ নয়। আমি এ রকম মুক্তি বা জীবন কিছুই চাইনে। সেটা আমার আদৌ কাম্য নয়।’
সাঈদ শুনলেন এবং দেখলেন।
খুবাইবের এই জবাবের পর ভিড় করা জালিমদের দোসররা চিৎকার দিয়ে বলে উঠলো : ‘হত্যা কর। ওকে হতা কর।’
সাঈদ ক্রুদ্ধ জনতার দিকে তাকালেন। তারপর খুবাইবের দিকে।
খুবাইব শূলি কাষ্ঠের ওপর দিয়ে নিঃসীম আকাশের দিকে তাকিয়ে বললেন : ‘হে আমার পরওয়ার দিগার, আল্লাহ! তাদের সংখ্যা তুমি গুনে রাখো। তাদেরকে তুমি এক এক করে হত্যা করো এবং কাউকেই তুমি ছেড়ে দিও না।’
সাঈদ শুনলেন খুবাইবের শেষ মুনাজাতের বাণী। শুনলেন ঈমানের তেজে বলীয়ান একজন সাহসী মুজাহিদের কথা। তারপর দেখলেন, কিভাবে পাপিষ্ঠ জালিমরা তরবারি ও বর্শার আঘাতে খণ্ড বিখণ্ড ও জর্জরিত করলো একজন মুমিনের পবিত্র দেহ!
শহীদ হলেন খুবাইব।
সাঈদ ফিরে এলেন আপন গৃহে। কিন্তু কোথায় সেই প্রশান্তি? কোথায় সেই আরাম?
ঐ বীভৎস, হৃদয় বিদারক দৃশ্য দেখার পর থেকেই সাঈদের মন থেকে দূরে গেল সকল প্রকার আনন্দ-উল্লাস। হারিয়ে গেল ঘুম আর প্রশান্তির নিঃশ্বাস। তিনি ঘুমের মধ্যে, জাগরণেÑ সকল দেহের উপস্থিতি। সেই চাহনি, সেই সাহসী উচ্চারণ আর সেই শেষ মুনাজাত।
যখনই তার মনে পড়তো খুবাইবের শেষ মুনাজাতের কথা, তখনই তিনি ভয়ে কেঁপে কেঁপে উঠতেন। না জানি তার ওপরও আল্লাহর গজব নেমে আসে! ভয় হতো, না জানি এখনই তার ওপর নেমে আসবে বজ্রপাত কিংবা আকাশ থেকে বর্ষিত হবে কোনো পাথরবৃষ্টি।
ঘুমের বিছানায়, খাবার থালায়, পানির গেলাসেÑ সর্বত্রই তিনি দেখতে পেতেন শহীদ খুবাইবের অস্তিত্ব। যতই দেখতেন, ততই তিনি ভয়ে সন্ত্রস্ত হয়ে পড়তেন। আবার খুবাইবের সাহস ও ঈমানের শক্তিতে তিনি উজ্জীবিত হয়ে উঠতেন। ভাবতেন, কেবলই ভাবতেনÑ এখন তার কী করা উচিত!
ভাবতে ভাবতেই তিনি এক সময় খুঁজে পেলেন প্রশান্তির উপত্যকা।
তার সামনে তখন শূলে বিদ্ধ হবার পূর্ব মুহূর্তে সেই নামাজরত খুবাইবের আলোকিত চেহারা। তার সেই সাহস আর ঈমানের উজ্জ্বলতা। আর তার চারপাশ পরিব্যপ্ত নবী মুহাম্মদের (সা) সেই ভুবন আলো করা এক সুদীপ্ত আহবান।Ñ
এসো আলোর পথে।
এসো আল্লাহর পথে।
এসো ইসলামের পথে।
এসো নবীর (সা) পথে।
তবে আর কিসের প্রতীক্ষা!
কিসের দেরি!
দেরি নয়। সাঈদের হৃদয়টি ইসলামের জন্য উন্মুক্ত করে দিলেন মহান বারি তায়ালা। আর সাথে সাথেই সাঈদ উঠে দাঁড়ালেন।
তারপর কুরাইশদের সামনে, তাদের দেব-দেবী ও অসংখ্য মূর্তির সাথে তার সকল সম্পর্ক ছিন্ন করে তিনি ইসলাম গ্রহণের ঘোষণা দিলেন দৃপ্তকণ্ঠে।
গোপনে নয়, প্রকাশ্যে। ভয়ে ভয়ে নয়, সাঈদের জীবন ধারা। তিনি মক্কা ছেড়ে হিজরত করে চলে এলেন মদিনায়। সেখানে রয়েছেন দয়ার নবীজী (সা)। তাঁর কাছে উপস্থিত হয়ে জুড়িয়ে নিলেন তার তাপিত ও পিপাসিত হৃদয়।
অত্যন্ত আপন করে নিলেন রাসূলকে (সা)। একেবারে নিজের করে। সকল সময় ছায়ার মত থাকতেন রাসূলের (সা) সাথে। নবীজীর সার্বক্ষণিক সাহচর্যের মাধ্যমে নিজেকে সকল দিক থেকেই যোগ্য করে গড়ে তোলেন সাঈদ।
সেটা ছিল খাইবার যুদ্ধের আগের কথা। এরপর তার জীবদ্দশায় খাইবারসহ যত যুদ্ধই সংঘটিত হয়েছে, সাঈদ প্রতিটি যুদ্ধেই অংশগ্রহণ করেছেন অত্যন্ত সাহসের সাথে।
এর পরের ইতিহাসÑ সে তো কেবল সাঈদের ঈমান, সাহস, ত্যাগ ও কুরবানির ইতিহাস।
সে তো কেবল আল্লাহর রাস্তায় একজন মুমিনের জীবন অকাতরে বিলিয়ে দেবার ইতিহাস। সে যেন এক জীবনজয়ীর জায়নামাজ।
সে তো দুনিয়াবিমুখ কেবল জান্নাতমুখী এক সফেদ সাম্পানের ইতিহাস।

SHARE

1 COMMENT

Leave a Reply