Home উপন্যাস ঘোর নিশুতি

ঘোর নিশুতি

শাহ মুহাম্মদ মোশাহিদ..
(গত সংখ্যার পর)
সাত.
চান্দেরটেকের প্রতিটি ঝোঁপ-ঝাড় চষে ফেললো পুলিশ। স্কুলঘরে খুঁজে পাওয়া গেলো কাফনের কাপড়। মাঠের দিককার জানালার গ্রিল ভাঙা। ইটের দেয়ালে ছোপছোপ রক্তের দাগ। কবরস্থানে হা হয়ে আছে একটি কবর। মাচানের বাঁশগুলো এলোমেলো ছড়িয়ে। কোনোটা ফেঁটে চৌচির, কোনোটা মচকানো। পুরনো আগাছাগুলো তুবড়ানো-মুচড়ানো। এতটুকু বুঝতে কষ্ট হবে না যে, গত রাতে কবরস্থানের ওপর বয়ে গেছে ভয়ঙ্কর ঝড়।
ভেঙ্গে খান খান হলো সমস্ত চান্দেরটেকের নীরবতা। দলে দলে ছুটে এলো সাংবাদিক। এ গ্রাম ও গ্রাম থেকে ভীড় করতে লাগলো হাজারো কৌতূহলী লোক। চোখ বড় বড় করে পিশাচ কাহিনী শুনাতে ব্যস্ত চান্দেরটেকের প্রতিটি মানুষ। টান টান উত্তেজনার মধ্য দিয়ে দুপুর গড়ালো। দুপুর গড়িয়ে বিকেল এলো। সূর্য পশ্চিম আকাশে হেলে পড়লো। বাড়ি খালি করে পালিয়ে গেলো অনেকেই। আর হাতেগোনা যারা থেকে গেলো, তাদের জন্য রইলো কড়া পুলিশ প্রহরা।
বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামলো। সেই সাথে নেমে এলো আতঙ্ক। আশপাশের দশ গ্রামের মানুষ দরজা বন্ধ করলো। চান্দেরটেকের ঝোঁপে-ঝাড়ে জ্বলে উঠলো কৃত্রিম আলো। দল বেঁধে টহলে নামলো শত শত পুলিশ। থেকে থেকে বাজলো টহল বাঁশি। দূরের গ্রামের মানুষ অপেক্ষায় থাকলো খারাপ কোনো খবরের।
কিন্তু সে রাতে চান্দেরটেকে খারাপ কিছুই ঘটেনি, কেবল মহাসড়কে একটি অ্যাক্সিডেন্ট ছাড়া। কী কারণে মাইক্রোবাসটি উল্টে গেলো কেউ বলতে পারেনি। চালকসহ তিন জনের লাশ পাওয়া গেলো। সবারই মাথা ধড় থেকে আলাদা, হাত-পা থেতলানো।
আতঙ্কে আতঙ্কে কেটে গেলো আরো একটি দিন। দিন গড়িয়ে রাত নামলো। আবার সেই পুলিশি টহল। ওসি সাহেবের সাথে টহল দিচ্ছেন জাফর হায়দারও। সেই বিদেশী পুরোহিতের সাথে একবার যোগাযোগ করা যায় না? জিজ্ঞেস করলেন ওসি সাহেব।
ছয় মাস আগে তিনি মারা গেছেন।
জবাব শুনে কিছুক্ষণ চুপ রইলেন ওসি সাহেব। চেহারাটা আরো ফ্যাকাশে হয়ে এলো। তারপর আবার লাইটারটি দেখতে চাইলেন। কবরস্থানের লোমহর্ষক ঘটনার পর কম করে হলেও পঞ্চাশবার নেড়েচেড়ে দেখেছেন এটি। সেই একই রকমÑ কুপির মতো আকৃতি, ঘোড়ার ছাপ। কী ক্ষমতা আছে এর!
দু’জন দাঁড়িয়ে আছেন সেই আগের জায়গাতেই। তবে পরিবেশটা আগের মতো নয়। স্কুলঘর আর কবরস্থানে জ্বলছে উচ্চক্ষমতার বৈদ্যুতিক বাতি। এদিক ওদিক ঘোরাফেরা করছে ইউনিফর্ম পরা পুলিশ।
যাই বলেন, আমার মনে হচ্ছে পালিয়েছে পিশাচটা, বললেন জাফর হায়দার।
পালিয়েছেতো বটেই। পুলিশের ভয় আছে না?
ওটা বোধহয় বুঝতে পারেনি আপনি পুলিশ। বুঝতে পারলে এমন ভুল করতো না, রসিকতা করলেন জাফর।
হা-হা-হাহ করে দিলখোলা হাসি দিলেন ওসি সাহেব, পিশাচগিরি করবি ভালো কথা। পুলিশের সাথে টক্কর দিতে এলি কেন? এবার বুঝলিতো, তল্পিতল্পা গুটিয়ে পালাতে হলো।
হন্তদন্ত হয়ে দৌড়ে এলেন এক কনস্টেবল- অ্যাক্সিডেন্ট স্যার!
অ্যাক্সিডেন্ট! থতমত খেলেন ওসি সাহেব।
হ্যাঁ স্যার, মহাসড়কে আরেকটি মাইক্রোবাস উল্টে গেছে।
তড়িঘড়ি পিক-আপে উঠলেন তারা। প্রস্তুত ছিলেন চালক। কাঁচা রাস্তা ধরে যতদ্রুত সম্ভব ছুটে চললো গাড়িটা। স্কুল ঘরের বাঁক ঘুরে হুঁশ করে বেরিয়ে এলো জঙ্গল থেকে। কয়েক মিনিটের মাঝেই গাড়িটা চলে এলো মহাসড়কের কাছাকাছি। দূর থেকে দেখা যাচ্ছে একটি মাইক্রোবাস উল্টে আছে। পাশেই এক ছায়ামূর্তির নড়াচড়া। কাঁচা রাস্তা যেখানটায় মিশেছে এর একটু উত্তরেই ঘটেছে দুর্ঘটনাটা। উত্তর থেকে দক্ষিণ দিকে চলে গেছে সড়ক। পূর্ব আর পশ্চিম দিকের এলাকায় ফসলি মাঠ। রাস্তার ধার ঘেঁষে গভীর খাদ।
পিক-আপটা এসে থামলো একেবারে মহাসড়কের ওপর। স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে সব। নড়ে উঠলো ছায়ামূর্তিটি। পনের-ষোল বছরের এক কিশোর। ভাঙ্গা কাচের ভেতর মাথা অবধি ঢুকিয়ে কী যেন করছে। আর কাউকে দেখা যাচ্ছে না ওখানটায়। আ-হা-রে, এতটুকু ছেলে পরিস্থিতি সামাল দেয়ার চেষ্টা করছে। ওদেরকে আসতে দেখে নিশ্চয়ই ভরসা পাবে ছেলেটা, ভাবলেন জাফর হায়দার।
পিক-আপ থেকে নামলেন ওরা দুইজনসহ মোট চারজন। ছেলেটার কোনো হুঁশ নেই। গাড়ির ভেতর কী যেন খটমট করেই যাচ্ছে। লাশ বের করার চেষ্টা করছে হয়তো। সড়কে পিঠ দিয়ে চিত হয়ে আছে মাইক্রোবাস। চারটি চাকা সোজা উপরে। আর নিচের দিকটা একেবারে চ্যাপ্টা হয়ে গেছে।
ওয়্যারলেসে আরো কয়েকজন কনস্টেবল ডেকে পাঠালেন ওসি। তারপর ছেলেটার উদ্দেশ্যে চেঁচালেন, এই যে ছেলে শান্ত হও। আমরা দেখছি ব্যাপারটা।
সাথে সাথে নড়ে উঠলো পুরো গাড়ি। দ্রিম করে একটা শব্দ হলো। তারপর গাড়ি থেকে বেরিয়ে এলো কিশোরের মুখ। চাঁদের আলোয় ঝিলিক মেরে উঠলো মায়াবি চেহারাÑ ডাগর চোখ, চঞ্চল অবয়ব। মায়া হলো ওদের। ভুলে গেলেন গাড়ি নড়ে ওঠার মতো বড় ধরনের অস্বাভাবিকতাটাও। আফসোস করলেন, আ-হা এমন নির্জনে বিপদের মুখে পড়তে হলো ছেলেটাকে! নিশ্চয়ই কোনো আপনজনের লাশ থেতলে গেছে গাড়ির ভেতর।
আবার নড়ে উঠলো গাড়িটা, যেন কেউ ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিলো। সরাসরি ছেলেটার মুখের দিকে তাকালেন জাফর। তারপরই দেখতে পেলেন দৃশ্যটা- কিশোরের দুই ঠোঁটের খাঁজ বেয়ে ঝরছে রক্তের ধারা, চাঁদের আলোয় কালচে রঙ নিয়েছে।
অশুভ সঙ্কেত বেজে উঠলো বুকের ভেতর । কিন্তু এরপরও জোর করে ভাবতে চাইলেন, ওটা হয়তো ছেলেটারই রক্ত। সম্ভবত দাঁতে বা মুখের ভেতর কোথাও আঘাত পেয়েছে।
ততক্ষণে থেমে গেছেন সবাই। কিন্তু নিজেকে নিজে অভয় দিয়ে আরো এক পা সামনে বাড়লেন জাফর হায়দার। হুড়মুড় করে গাড়ির ভাঙ্গাচোরা বডিটা গড়িয়ে এলো তার দিকে। আর ভাবার সময় নেই। পকেট থেকে বের করলেন লাইটার। স্পার্ক করলেন এবং ছেলেটা উধাও। তিনি আস্তে করে সরে দাঁড়ালেন কেবল। গাড়ির বডিটাকে দেখলেন গড়াতে গড়াতে খাদে পড়ে যেতে।

আট.
অসাড় পড়ে আছে মুমিতু। কামরাজুড়ে ছায়ার আনাগোনা। ছায়াগুলো নাচছে ধীরলয়ে। একেবারে নিঃশব্দে। কালো কুঁচকুঁচে শরীর ওগুলোর। মুখে চুন মাখা। এলোমেলো আঁকিবুকি নয়, কালো মুখে সাদা চুন, অনেকটা বৃদ্ধ মানুষের দাড়ির মতো। কিন্তু ছায়ামূর্তিগুলো বৃদ্ধ নয়। হ্যাংলা। ছিপছিপে। আর ওজনহীন। যেনো বাতাসে ভাসছে। শুরু হয়েছে উৎসব। কোনোটা নৃত্যের তালে ঝুলে পড়ছে বৈদ্যুতিক পাখার সাথে। কোনোটা মাথা উল্টো করে দাঁত কেলাচ্ছে। দাঁতগুলো ধবধবে সাদা।
ভয় পায়নি মুমিতু। ভাবছে কী নাম দেয়া যায় এই হ্যাংলাগুলোর।
নাহ, কোনো নাম খুঁজে পাওয়া গেলো না। নিশ্চয়ই কোনো না কোনো নাম আছে এদের। এখন কেবল মনে পড়ছে না, এই যা। কয়েকটা হ্যাংলা এবার উঠে এসেছে বিছানায়। কিন্তু একদম নড়তে পারছে না মুমিতু। পাশেই বেঘোরে ঘুমুচ্ছে মাশরাফি। ওকে নিয়ে যত জ্বালা। এমন একটা বিরক্তিকর সময়ে কোথায় ওর সাহায্য দরকার, তা না দুনিয়া কাত করে ঘুমুচ্ছে। হুঁশ-হুাঁশ শ্বাস টানছে আর ছাড়ছে। সম্ভবত এ কারণেই মাশরাফিকে ঘাটাতে চাইছে না ওগুলো। একেকটার যা ওজন, মাশরাফির এক নিঃশ্বাসের বাতাসে তিন পাক ঘুরে তারপর দাঁড়াতে হবে হ্যাংলাদের। নিঃশ্বাস ছাড়ছে মুমিতুও। কিন্তু কোনো শব্দ নেই। নেই তেমন গতিও।
এগিয়ে আসছে হ্যাংলারা। তাতা থৈ থৈ, তাতা থৈ থৈ করে উঠে বসলো ওর শরীরে। স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে। কিন্তু কোনো ওজন ঠাহর করতে পারছে না। ছোট বেলায় শুনেছে- রাতে জানালা খুলে ঘুমুলে ওরা নাকি ঘরে ঢোকে। ঘরের খাবারে ঢাকনা দেয়া না থাকলে সব চেটেপুটে বাসি করে রাখে। এতেই ক্ষান্ত হয় না। সুযোগ পেলে মানুষের শরীর চাটে। মুখ হা করা থাকলে দাঁত, জিহ্বা সব চেটে লুল লাগিয়ে দেয়। সে জন্যইতো সকাল সকাল দাঁত ব্রাশ করতে হয়, গোসল করতে হয়। রাতের হাঁড়িপাতিলগুলো সকালে মেজে নিতে হয়।
এখন মুমিতু আর সেই ছোট্টটি নেই। অনেক বড় হয়েছে। পড়ালেখা করছে।
মুমিতু ভাবলো এটাও হয়তো তার মনের ভুল। যেই না ভাবলো, অমনি ওগুলো মুমিতুর মুখের ওপর উঠে এলো। ওর মনে হলো হ্যাংলাগুলো এবার বিষাক্ত নিঃশ্বাস ছাড়ছে। কিন্তু এক বিন্দু টের পেলো না সে। তাহলে নিঃশ্বাসগুলো যাচ্ছে কোথায়?
যেখানেই যাক, তা নিয়ে ভাবার প্রয়োজন মুমিতুর নেই। আপাতত এই বিরক্তিকর অনুষঙ্গগুলো দূর করতে পারলেই হয়। এই যা, এবার আরো বেপরোয়া হয়ে এলো হ্যাংলারা। শরীরের চারদিকে কিলবিল কিলবিল করছে। কোথাও কোনো স্পর্শ নেই। বাতাসে ভাসছে। মুমিতুর অসহায়ত্ব দেখে মজা নিচ্ছে। ফুরফুর করে একেকটার ঠ্যাং উড়ে যাচ্ছে বাতাসে। আবার ডিগবাজি খেয়ে ঠিক হয়ে নিচ্ছে। কোনোটা কেলানো দাঁত নিয়ে ভয় দেখানোর চেষ্টা করছে, তো দাঁতের খাঁচাশুদ্ধ মাথাটাই উড়ে যাচ্ছে কাগজের মতো।
মুমিতু চেষ্টা করছে হাত-পা ছুঁড়তে। পারছে না। ইস, একবার নড়তে পারলেই হতো। হ্যাংলাগুলোর হ্যাংলামো ছুটিয়ে ছাড়তো সে। তালপাতার সেপাই, এসেছে মুমিতুকে ভয় দেখাতে! তালপাতারওতো ওজন আছে। ওদের তাও নেই।
আরেকবার নড়ার চেষ্টা করলো মুমিতু। কিন্তু না। হ্যাংলাগুলো মায়াজালে আটকে রেখেছে তাকে, কিছুতেই ভেদ করা যাচ্ছে না। মাশরাফিকে ঘুম থেকে জাগাতে পারলেও হতো। কিন্তু কিভাবে? কেবল অপেক্ষাই এখন একমাত্র উপায়। ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করছে মুমিতু।
কিন্তু মুহূর্তেই বদলে গেলো দৃশ্য। বদলে গেলো হ্যাংলাগুলোর ঠোঁটের রঙ। কালো কুঁচকুঁচে হ্যাঙলাদের গালে ছিলো সাদা দাড়ির মতো চুন। আর এখন সাথে যোগ হলো লাল টকটকে ঠোঁট। যেহেতু হ্যাংলাদের অবয়ব মানুষের ছায়ার মতোই, তাই নিশ্চিত হওয়া যায়, ওদের ঠোঁট আগেও ছিলো। কিন্তু ঠোঁটের রঙ কেমন ছিলো, তা মনে পড়ছে না মুমিতুর। অন্য যাই হোক অন্তত লাল ঠোঁটো ছিলো না ওগুলো। তাহলে নিশ্চিত চোখে ঠেকতো ওর।
মনে হলো, খ্যাক খ্যাক করে হেসে উঠলো হ্যাংলারা। কিন্তু কোনো শব্দ হলো না। কেবল দুই ঠোঁটের মাঝখানে বড়সর একটা ফাঁকা তৈরি হলো। আর সেই ফাঁকা দিয়ে লকলকে কালো জিভ বের করলো। কয়েকবার কেঁপে উঠলো জিভগুলো। তারপর আবার স্বাভাবিক।
শুরু হলো নতুন এক যন্ত্রণা। সেটা মোটেও কারো হ্যাংলামো নয়। ঠক ঠক করে দরজার কড়া নাড়ছে কেউ। নড়েচড়ে উঠলো মুমিতু। নড়েচড়ে উঠলো হ্যাংলারাও। পড়িমরি করে ছুট দিলো জানালার দিকে। তারপর বাতাসে ভাসতে ভাসতে ঘোর নিশুতিতে পালিয়ে গেলো।
শরীরে শক্তি ফিরে এলো মুমিতুর। কী কাণ্ড, এই শেষ রাতে কে আবার ডাকছে?
নাহ, ব্যাপারটা মোটেও ভালো ঠেকছে না মুমিতুর। কে হতে পারে! বাড়ির কেউ তো শেষ রাতে চোরের মতো ডাকতে আসবে না। ঘরের আলো জ্বাললো সে। তারপর জিজ্ঞেস করলো, কে?
জবাব নেই।
এই কে, কে ওখানে?
এবারও কোনো উত্তর নেই। কয়েক সেকেন্ডের জন্য কড়া নাড়ার শব্দ থামলো কেবল। তারপর আবার শুরু হলো।
কী ব্যাপার, মুখে কথা নাই?
একবার ঠিক করলো মাশরাফিকে ডাকবে। কিন্তু পরক্ষণেই ভাবলো, এটা হবে বোকামি। যদি চোর বা ডাকাত কোনোটাই না হয়, তাহলে মাশরাফির কাছে ছোট হয়ে যাবে সে। শেষে একতরফা ওকে ভীতুর ডিম বলে খোঁচা দেয়া যাবে না।
যা আছে কপালে। দরজা খুলে দিলো মুমিতু। অমনি হুমড়ি খেয়ে পড়লো লোকটা।
বৈদ্যুতিক বাতির আলোয় চক চক করে উঠলো টাক। টুকটাক। হ্যাঁ, সেই ছিপছিপে টুকটাকওয়ালা লোকটা।
মুমিতুর পায়ের কাছে গড়াগড়ি খাচ্ছে- দেবতা, দেবতা। আপনের পায়ের কাছে আশ্রয় চাই দেবতা।
ঘুরে দাঁড়ালো মুমিতু। পুলিশে ফোন করতে হবে এখনি।

নয়.
দরজা ঠেলতেই নজরুলসঙ্গীত- ‘রুমঝুম রুমঝুম রুমঝুম ঝুম। খেঁজুর পাতার নূপুর বাজায়…’
তন্ময় হয়ে শুনছেন প্রফেসর ফিহির হোসাইন। ওরা যে দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকেছে টেরই পাননি তিনি। দু’চোখ বন্ধ। হেলান দিয়ে আছেন চেয়ারে। দুই হাতলে ছড়িয়ে দুই হাত। গানের তালে তালে নড়ছে টেকো মাথা। সামনের দিকটায় চুল একেবারেই নেই। চোখ চাওয়াচাওয়ি করলো মাশরাফি আর মুমিতু। সম্ভবত দু’জনেই একমতÑ এটা হলো সুখটাক।
গান বাজছে পেছনের কম্পিউটার থেকে। ভদ্রলোকের চেয়ারের পেছনে, ঠিক দেয়াল লাগোয়া একটি কম্পিউটার টেবিল। স্কয়ার সাইজের এলসিডি মনিটরে লাফালাফি করছে রঙবেরঙের ভিসুয়ালাইজেশন। টেবিলটার পাশেই বই ঠাঁসা কাঠের আলমিরা।
ঘরজুড়ে বেলি ফুলের গন্ধ। মৃদু শব্দে এসি চলছে। মনোরম, শীতল কামরা। পেছন দিকটায় জানালা, নীলাভ পর্দায় ঢাকা। হাতের ডানদিকে একটি র‌্যাক। ওখানে সাজানো প্রয়োজনীয় কিছু জিনিস।
একটি বড়সড় টেবিল সামনে নিয়ে তিনি ঘুমুচ্ছেন। ঘুমুচ্ছেন বললে ভুল হবে, সুরের লহরিতে ভাসছেন। তবে জলজ্যান্ত দু’টি মানুষের আগমন টের পেয়েছেন কি না, তা ঠিক ধরা যাচ্ছে না। টেবিলের সামনে তিনটি চেয়ার। ভয়ে ভয়ে দু’টি দখল করে বসলো মাশরাফি ও মুমিতু। তবুও চোখ খুলছেন না প্রফেসর।
কিছুই মাথায় ঢুকছে না ওদের। অথচ পিয়ন ছেলেটা তাড়া দিয়ে ভেতরে ঢুকিয়ে দিলো। বললো, তিনি নাকি ওদের জন্য অপেক্ষা করছেন। এই তাহলে অপেক্ষার নমুনা!
চোখ স্থির হলো টেবিলটায়। ভদ্রলোকের হাতের ডান দিকে ডেস্ক ক্যালেন্ডার, ডেস্ক ক্লক, স্লিপ বক্স। বাম দিকে দু’টি ফোল্ডার। আর সামনে পড়ে আছে পাতলা একটি ফাইল। মুমিতুদের হাতের কাছেই ছোট একটি পেপারওয়েট। দেখলেই খেয়ে ফেলতে ইচ্ছে করে। পুডিং এর মতো থকথকে মনে হলেও এটা আসলে পাথরের তৈরি। একবার প্রফেসরের চোখ পর্যবেক্ষণ করলো মুমিতু। তারপর আস্তে করে পেপারওয়েটটা চালান করে দিলো পকেটে। চোখ রাঙিয়ে আপত্তি জানালো মাশরাফি।
আরো কিছুক্ষণ গান, ভদ্রলোকের মাথার দুলোনি এবং ওদের চুপচাপ অপেক্ষা। তারপর আচমকা সোজা হয়ে বসলেন প্রফেসর ফিহির হোসাইন। থতমত খেলো মাশরাফি ও মুমিতু। গানের শব্দ নেই। মনিটরের ভিসুয়ালাইজেশন স্থির। স্থির ওরা দুইজন এবং ফিহির হোসাইনও। তিনি ছোট ছোট চোখ করে তাকিয়ে আছেন ওদের দিকে। তারপর আদুরে গলায় জিজ্ঞেস করলেন, তোমাদের মধ্যে কে মুমিতু…?
মাশরাফি আঙুল তুললো মুমিতুর দিকে। মুমিতু নির্বিকার। তাকিয়ে আছে ফিহির হোসাইনের চোখে। প্রফেসরের এমন আদুরে গলা পছন্দ হলো না ওর। নিজেকে কেমন বাচ্চা বাচ্চা মনে হলো। আর যাই হোক, কেউ ওকে বাচ্চা মনে করলে সহ্য করতে পারে না সে।
তুমিই তাহলে সেই দেবতা?
মুমিতুর মেজাজ গেলো বিগড়ে, আপনি পাগলের ডাক্তার, সেটা শুনেছি। কিন্তু নিজেও যে এক পাগল তা জানতাম না।
পরিমিত হতে ইশারা করলো মাশরাফি। ভ্রƒ কুঁচকে গেলো প্রফেসরের। এক দৃষ্টিতে কুঁচকানো কপাল নিয়েই কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলেন তিনি। তারপর বললেন, আচ্ছা, বেদন সাহার সাথে তোমার ঝামেলাটা বাধলো কী নিয়ে?
আকাশ থেকে পড়লো ওরা, বেদন সাহা আবার কে?
কেন, যে লোকটাকে তোমরা পুলিশে দিলে!
ও আচ্ছা, টুকটাক। এই টুকটাক লোকটার নাম তাহলে বেদন সাহা! বললো মুমিতু। হাসি ধরে রাখতে পারলো না মাশরাফি।
টুকটাক মানে? প্রশ্ন করলেন ফিহির হোসাইন
মানে আপনি বুঝবেন না, মুখের ওপর বলে দিলো মুমিতু।
বুঝিয়ে বললেইতো বুঝতে পারি।
সেটা বোঝার ক্ষমতা আপনার নেই।
তুমি কি জান, কার সামনে বসে কথা বলছ?
হ্যাঁ, জানি। আমরা যার সামনে বসে আছি তার নাম ফিহির হোসাইন। তিনি একজন মনোবিজ্ঞানি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর। তার কাছে পরামর্শ নিতে আসেন পাগল ও অর্ধ পাগলরা।
তুমি কি পাগল, নাকি অর্ধপাগল? রসিকতা করলেন প্রফেসর।
কেন, আমি পাগল হতে যাব কেন?
তাহলে আমার সামনে বসে আছো যে?
আপনি আমাকে ডেকে পাঠিয়েছেন, তাই এসেছি।
কেন ডেকে পাঠিয়েছি সেটা জান?
জানি না, তবে অনুমান করতে পারছি- পাগলরূপী একটা প্রতারককে আমরা পুলিশে ধরিয়ে দিয়েছি বলে।
একটা নয়, হাজারটা পাগলকে পুলিশে ধরিয়ে দিলেই বা আমার কী আসে যায়?
তাহলে আমাকে তলব করেছেন কেন?
চুপ হয়ে গেলেন প্রফেসর ফিহির হোসাইন। মাশরাফি হা হয়ে তাকিয়ে আছে ওদের দিকে। একজন প্রফেসরের সাথে মুমিতু যে ভাষায় কথা বলছে, মোটেও ভালো লাগছে না তার। তবুও করার কিছু নেই। মুমিতুর সাথে যেহেতু এসেছে, ওর মতের উল্টো কিছু করা যাবে না। এখানে সে নীরব দর্শক ছাড়া আর কিছুই নয়।
এর মধ্যে কয়েকবার চেয়ারে হেলান দেয়ার চেষ্টা করলেন প্রফেসর। মনে হলো যুতসই হচ্ছে না। এবার টেবিলের দিকে ঝুঁকে এলেন তিনি, বেদন সাহাকে আমার দায়িত্বে ছেড়ে দিয়েছে পুলিশ।
সেটাতো দেবেই, পাগলকে তো পাগলের ডাক্তারের কাছেই পাঠাবে।
তুমি কী নিশ্চিত ও পাগল?
ভাবের পাগল। পাগল সেজে প্রতারণা করে বেড়ায়। মানুষকে বিপদে ফেলে টাকা আদায় করে। তক্কে তক্কে থাকে। চুরি করার সুযোগ খোঁজে।
এতো কথা বলো কেন ছোঁকড়া? আচমকা ধমকে উঠলেন প্রফেসর।
চুপ মেরে গেলো মুমিতু। প্রফেসরের কুঁচকানো চেহারা দেখে বুঝতে পারলো একটু বেশিই বাড়াবাড়ি হয়ে গেছে। কয়েক সেকেন্ড পর চেহারা সহজ হয়ে এলো। আশ্বস্ত হলো মুমিতু।
আচ্ছা বাদ দাও বেদন সাহার কথা। কফি খাবে?
হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়লো মুমিতু। বেল চেপে ডাকলেন পিয়ন ছেলেটাকে। তিনটি কফির কথা বললেন। তারপর সামনে রাখা এক টুকরো কাচের ওপর আঙুল দিয়ে টোকা দিতে লাগলেন। যেন একেকটি টোকায় একটি করে আইডিয়া খুঁজে পাচ্ছেন। কিছুক্ষণ পর বড়সড় মগ ভর্তি কফি চলে এলো। আগে চুমুক দিলেন ফিহির হোসাইন।
আচ্ছা প্রফেসর, আমি কি একটা প্রশ্ন করতে পারি?
কেন নয়! হাজারটা প্রশ্ন কর।
আপনি কী আমাকে কাউন্সেলিং করছেন?
ফিহির হোসাইন চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। পায়চারি করতে আরম্ভ করলেন। দুই হাত সামনের দিকে ভাঁজ করে টেবিল থেকে আলমিরা পর্যন্ত কয়েক চক্কর দিলেন। তারপর টেবিলে দু’হাতে ভর দিয়ে কুঁজো হলেন মুমিতুর দিকে। চোখে বিস্ময়- এই যে খোকা, আমাকে যেন কী প্রশ্ন করেছো তুমি?
জিজ্ঞেস করেছিলাম, আপনি কি আমাকে পড়ার চেষ্টা করছেন?
আমার কাজই তো অন্যকে পড়া।
কখনো কী নিজেকে পড়ে দেখেছেন?
বাহ, ভালো কথা বলতে পারোতো তুমি! তোমার কী মনে হয়?
আমার মনে হয় নিজেকে পড়ার ক্ষমতা কারো নেই।
টেবিল কাঁপিয়ে হা হা করে হাসলেন প্রফেসর ফিহির হোসাইন। তারপর শান্ত হয়ে বসলেন চেয়ারে, নিজেকে পড়ার ক্ষমতা থাকুক আর নাই থাকুক তোমাকে পড়ার ক্ষমতাটুকুতো আছে আমার, নাকি?
আর কী কী ক্ষমতা আছে আপনার?
এই ধরো আমি চোখ বন্ধ করে বলে দিতে পারবো, তোমার বুক পকেটে যা আছে সেটা পুডিং নয় একটা পেপারওয়েটমাত্র।
থতমত খেলো দু’জনই। তাপরও ঝটপট নিজের বুক পকেটটা দেখে নিলো মুমিতু। মাশরাফিও তাকিয়ে আছে ওদিকে। ওরা বোঝার চেষ্টা করলো, বাইরে থেকে পেপারওয়েটটা দেখা যাচ্ছে কি না।
কিভাবে জানলাম, এই প্রশ্নটাইতো করবে? ওদের মনের কথা পড়তে পারলেন প্রফেসর। এটাইতো আমার ক্ষমতা। একদিনে অর্জন করিনি, বহু সাধনার ফল।
মুমিতুর কাছে মনে হলো, হেরে যাচ্ছে সে। নাহ, কোনোভাবেই এই সুখটাকওয়ালা পাগলের ডাক্তারের কাছে পরাজয় মানা যাবে না। তাই কথা ঘুরিয়ে প্রফেসরকে খেপানোর চেষ্টা করলো সে, আরো দু’একটি ক্ষমতার উদাহরণ দেখান না।
টোপ গিললেন প্রফেসর। সাথে সাথে বলে উঠলেন অন্য আরেক ক্ষমতার কথা, মেডিটেশন করে তোমাকে এখন ঘুম পাড়িয়ে দিতে পারি আমি।
ঠোঁটের কোনায় হাসি দেখা দিলো মুমিতুর। প্রফেসরকে ঘায়েল করার যুতসই একটা সুযোগ পেলো সে- ও…উ মেডিটেশন! মেডিটেশন করে আমাকে ঘুম পাড়িয়ে দেবেন?
হ্যাঁ তোমাকে ঘুম পাড়িয়ে দেবো।
ঘুমতো ভালো জিনিস। আমি এখন ঘুমানোর জন্য প্রস্তুত।
মাশরাফি, তুমি কি একটু বাইরে অপেক্ষা করতে পারবে?
অবশ্যই পারবো, বলে বিনয়ের সাথে উঠে দাঁড়ালো মাশরাফি।
ফিহির হোসাইন অভয় দিলেন, বেশি সময় লাগবে না। কিছুক্ষণ পর আমিই তোমাকে ডাকবো।
চেয়ার ছেড়ে দরজার দিকে যাওয়ার সময়ই নিভে গেলো কামরার বাতি। তারপর মাশরাফিকে বাইরে এগিয়ে দিয়ে ভেতর থেকে দরজা বন্ধ করে দিলেন প্রফেসর ফিহির হোসাইন। মাশরাফির অপেক্ষা ওয়েটিং রুমে। একেকটি মিনিটকে মনে হচ্ছে ঘণ্টা। ভেতরের অবস্থা কী অনুমান করা যাচ্ছে না। ইস, কামরার এক কোনে তাকেও যদি দাঁড়ানোর অনুমতি দিতেন প্রফেসর। মুমিতুকে কী করে ঘুম পাড়ায় সে দৃশ্যটা হতো দেখার মতো। সবসময় নিজের বাহাদুরি। মেডিটেশন করে মাশরাফিকে নিয়ে চলে যায় মনের বাড়িতে। ওর ভেতর থেকে গোপন কথা বের করে মজা নেয়। এবার হবে উচিত শিক্ষা। ওস্তাদের উপরও ওস্তাদ আছে।
সময় গড়াচ্ছে। এক, দুই, তিন করে তিরিশ মিনিট পার হয়ে গেলো। কোনো খবর আসছে না ভেতর থেকে। পিয়ন ছেলেটা বাইরে থেকে দরজা আগলে দাঁড়িয়ে। মুমিতু কি এখন ঘুমিয়ে পড়েছে, নাকি আরো কিছুক্ষণ সময় নেবে? ঘুমন্ত অসহায় মুমিতুকে দেখার জন্য উদগ্রীব হয়ে আছে মাশরাফি। আর কতক্ষণ?
আরো মিনিট দশেক অপেক্ষা করতে হলো তাকে। তারপর খট করে খুলে গেলো দরজা। প্রফেসর নন, ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো মুমিতু, পাগলের ডাক্তারকে ঘুম পাড়িয়ে দিলাম।
মানে?
মানে বাসায় গিয়ে বলছি। চল এবার। অনেকক্ষণ হলো এখানে এসেছি, বলে মাশরাফিকে টানতে টানতে বাইরে হাঁটা ধরলো মুমিতু। যাওয়ার আগে অন্ধকার কামরাটার দিকে একবার চোখ ঘুরালো মাশরাফি। চেয়ারে হেলান দিয়ে আরাম করে নাক ডাকছেন প্রফেসর ফিহির হোসাইন।

দশ.
কামিনী ফুলের কড়া গন্ধ মাতাল করে তুলেছে জাফরকে। কামরার সামনেই বারান্দা। বারান্দার পাশ ঘেঁষে পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে বেড়ে উঠেছে গাছটা। কাচ ভাঙা জানালা দিয়ে আসছে মাতাল ঘ্রাণ। বাইরে ডানা ঝাপটাচ্ছে রাতজাগা পাখি। কলজে কাঁপানো স্বরে ডাকছে পেঁচা। থেকে থেকে বেজে উঠছে পুলিশের টহলবাঁশি। আর বিছানায় শুয়ে ঘুমানোর চেষ্টা করছেন জাফর হায়দার। ঘুম এসেও আসছে না। কাল সকালেই সুরাইয়া বুবুকে নিয়ে চলে যেতে হবে ঢাকায়। ভেবেছিলেন কিছুদিন থেকে পিশাচ রহস্যের একটা কিনারা করে যাবেন। কিন্তু চান্দেরটেকের সহজ সরল মানুষগুলো উল্টো তাকেই সন্দেহ করে বসলো। এরচেয়ে দুর্ভাগ্য আর কী হতে পারে। দীর্ঘশ্বাস ফেললেন তিনি। তারপর একরকম জোর করেই চোখ দুটো বন্ধ করতে চাইলেন। কিন্তু আবার সেই বীভৎস দৃশ্য!
এবার পিশাচটা চলে এসেছে বাড়ির ভেতর। একেবারে জাফর হায়দারের শিয়রে। দাঁড়িয়ে আছে মাঝারি শরীর নিয়ে। হুবহু সেদিনের সেই রিকশাওয়ালাটা। ঘাড়ে ঘোড়ার মতো কেশর। কাঁচাপাকা দাড়ি বেয়ে ঝরছে রক্ত। পায়ের দিকে তাকালেন তিনি। হ্যাঁ, ঘোড়ার মতো ক্ষুর। তবে আরো তীক্ষè ও সূঁচালো।
মুখে কোনো কথা নেই। বড় বড় চোখ করে তাকিয়ে রইলো কয়েক সেকেন্ড। তারপর হাত এগিয়ে দিলো জাফর হায়দারের গলার দিকে। তড়াক করে তিনি উঠে গেলেন বিছানা ছেড়ে। লাফ দিলেন কাপড় রাখার হ্যাঙ্গার লক্ষ্য করে। মাপ মতোই হলো। পাগলের মতো টেনে নামালেন ব্ল্যাকস্যুট। পকেট হাতড়ালেন। নেই, লাইটারটা পকেটে নেই। তাহলে কোথায়? প্যান্ট-শার্টের পকেট তছনছ করে খুঁজলেন। নেই, কোথাও নেই। অতএব গগনবিদারি চিৎকার ছাড়া আর কোনো উপায়ই খোলা নেই। কিন্তু ততক্ষণে জাফর হায়দারের টুটি চেপে ধরেছে পিশাচটা। একদম স্বর বেরুচ্ছে না গলা দিয়ে। মাথা ঝিমঝিম করে উঠলো। স্তব্ধ হয়ে এলো কান। চোখের সামনে সবকিছু হলুদ। উষ্ণ একটা পরশ পেলো গলার দিকটায়। একটা মানুষের মুখ যেন পরম আদরে চুমু খাচ্ছে গলায়। বোঁটকা গন্ধে নাক ভরে গেছে জাফর হায়দারের।
এরপর কী ঘটলো কিছুই জানেন না তিনি। তবে যখন জ্ঞান ফিরলো, দেখলেন বিছানায় শুয়ে। মাথায় পানি ঢালছে কাজের মেয়ে। তার গলার দিকটায় কি যেন মালিশ করে দিচ্ছেন সুরাইয়া বুবু। সামনে উদগ্রীব বসে আছেন ওসি সাহেব। আর মেঝেয় বসে অঝোরে কাঁদছে আউয়াল মিয়া।
ভয়ের কিছু নেই, গলার রগ ফুটো করতে পারেনি। জাফর হায়দারকে আশ্বস্ত করলেন ওসি সাহেব। ছল ছল চোখে তাকিয়ে আছেন তিনি। বুবুর হাত সরিয়ে গলার দিকটা একবার পরখ করলেন, না সত্যিই তেমন কিছু হয়নি। সামান্য একটু দাঁত বসানোর দাগ। আর টুটি চেপে ধরায় গলাটা কেমন চিঁ চিঁ করছে এই যা।
আউয়াল মিয়ার আবার কী হলো, কাঁদছে কেন? জিজ্ঞেস করলেন জাফর হায়দার।
জড়ানো কণ্ঠে আবোল-তাবোল বকতে শুরু করলো আওয়াল মিয়া। ধমকে উঠলেন ওসি সাহেব, কান্না থামাও। যা বলার স্পষ্ট করে বলো।
সাথে সাথে কান্না থামিয়ে মাথা নিচু করল আউয়াল। বলল, স্যার, সব দোষ আমার।
নড়েচড়ে বসলো কামরার সবাই। জাফর হায়দারও চেঁচিয়ে উঠলেন চিঁহি গলায়, তোমার দোষ মানে!
আমিই আপনের গ্যাস লাইটটা সরাইছিলাম।
গরম চোখে তাকিয়ে আছে সবাই। সুরাইয়া সুলতানার দিকে একটু ঘেঁষে বসলো আউয়াল মিয়া। তারপর বললো, ঘটনা কী ঘটছে কইতে রাজি আছি। কিন্তুক জেলের ভাত খাইতে আমি রাজি না।
রে রে করে উঠলেন সুরাইয়া সুলতানা, কিরে আউয়াল, কী করেছিস তুই? তোরে আমি এতো বিশ্বাস করতাম। তুই আমার এতো বড় সর্বনাশ করতে পারলি!
আরে আরে মহা সমস্যাতো। কী করেছে সেটা না জেনেই বলে দিচ্ছো এত বড় সর্বনাশ! ধমকে উঠলেন জাফর হায়দার।
তুই কোনো কথা বলবি না। এতবড় সর্বনাশ না হলে জেলের কথা উঠবে কেন? ওকে আমি …
আ..হা, আগে আউয়াল মিয়াকে বলতে দাও। তারপর বিচার করো সে বড় নাকি ছোট সর্বনাশ করেছে।
হাতের লাঠিতে ইশারা করলেন ওসি সাহেব। এবার গড়গড় করে বলতে শুরু করলো আউয়াল মিয়া, স্যার যেদিন পয়লা এইখানে আহেন, ওইদিন আমি স্যারের মাথায় বাড়ি মারছিলাম।
হ্যাঁ, এটা আর নতুন করে বলার কী আছে? অধৈর্য হয়ে বললেন ওসি সাহেব।
ডাণ্ডার বাড়ি দেয়ার আগে আমি জাফর স্যারকে ঠিকই চিনতে পারছিলাম। কিন্তু তবুও সন্দেহ হইলো…
তোমার এই কথাও সবাই জানে।
স্যারের মাথায় রক্ত দেইখা খুব খারাপ লাগছিলো আমার। রক্তাক্ত জাফর স্যাররে ম্যাডামের কাছে দিয়া আমি সামনের গেইট লাগাইতে গেলাম। গিয়া দেহি বাচ্চা একটা পোলা গেইটের সামনে খাড়ায়া আছে। গলা দিয়া গড়গড়াইয়া রক্ত ঝরতাছে।
কী বলছো তুমি!
যা কইতাছি হাছা কইতাছি স্যার। আমি মনে করলাম, পোলাডারে পিশাচে কামরাইছে। আন্ধাইরের মইদ্যে বেশি কিছু দেহা গেলো না। ডরে আমার গতর জুইরা কাঁপন উঠলো। তারপরেও পোলাডার লাই¹া মায়া অইল। এই রাইতের বেলা বাইরে থাকলে আর জানে বাঁচতে পারবো না। তাই ইশারা করলাম ভিতরে আইতে। কিন্তুক পোলাডা আমারে উল্টা ইশারা করলো বাইরে যাইতে। আমি তো তাইজ্জব! পোলাডা ‘ভূত’, ‘ভূত’ কইরা চিক্কর পারতে শুরু করলো। আমি জিগাইলাম কই? হ্যায় কইলো, ভূত নাকি আমগো বাড়ির ভিতরে। ভূতটা নাকি জাফর স্যারের রূপ ধইরা আইছে। স্যারের মইদ্যে ভূতের আত্মা আছে।
ফাজিল কোথাকার, এক থাপ্পড়ে সবগুলো দাঁত ফেলে দেবো। আউয়াল মিয়ার দিকে তেড়ে আসতে চাইলেন সুরাইয়া সুলতানা। তাকে টেনে ধরলেন জাফর হায়দার। তাকে শান্ত হওয়ার জন্য ইশারা করলেন ওসি সাহেব। তারপর আউয়াল মিয়াকে কথা চালিয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত করলেন তিনি।
স্যার, সত্যি কইরা কইতাছি। পোলাডায় আমারে কইলো, হ্যার গলায় নাকি জাফর স্যারে কামরাইছে। পোলাডা ডরে পলায়া গেলো। হের পরে থেইক্কা আমি স্যারের সামনে কম যাই। স্যার এক দিকে গেলে আমি অন্য দিকে থাকি। খেয়াল করলাম, নিশি রাইতে জাফর স্যার কই যেন বাইর অইয়া যায় গা।
তাহলে তুমিই কী জাফর সাহেবের বিরুদ্ধে গ্রামবাসীকে খেপিয়ে তুলেছো? প্রশ্ন করলেন ওসি সাহেব।
আমি পরথমে কিছু কইতে চাই নাই। যহন হুনলাম গেরামের কয়েকটা পোলাও নাকি স্যাররে দেইখা ডরাইছে, তহন মনে অইলো আসলেই ঘটনাডা সত্যি। তাই গেরামের কয়েকজনের লগে সলা করছিলাম।
কিন্তু তুমি ওনার লাইটার সরাতে গেলে কেন?
স্যার, আইজ রাইতে হিবার হেই পোলাডা আইছিলো। কইয়া গেলো এই কুপির মতো দেখতে লাইটের মইদ্যেই নাকি ভূতের আত্মা আছে। জাফর স্যারের কাছ থেইকা লাইটটা লইয়া যাইতে পারলে নাকি আমগো স্যার আবার ভালা মানুষ অইয়া যাইবো।
আমি চিন্তাও করতে পারি নাই ভূতটা বাচ্চা পোলাপানের বেশ ধইরা আইবো। স্যারের পকেট থেইকা লাইটটা চুরি কইরা আমি আমার ঘরে গেছি। মনে করলাম, সুযোগ অইলে এই জিনিসটা নয়া দীঘিতে ফালায়া দিমু। কিন্তুক কিছুক্ষণ পরেই হুনি স্যারের ঘরে ধস্তাধস্তির শব্দ। আমি পয়লা বুঝতে পারি নাই। মনে করলাম স্যারের ভিতর থেইকা বুঝি পিশাচটা বাইর অইয়া যাইতাছে। খুব ডরাইছিলাম। কিন্তুক কি কারণে জানি মনডা মোচর দিয়া উঠল। মনে অইলো স্যারের খুব কষ্ট অইতাছে। ভয় ডর সব উইরা গেলো। মন ভুলে স্যারের কুপির মতো লাইটটা হাতের মইদ্যে লইয়াই গেলাম। দরজা খুলতেই দেহি হুলস্থুল কাণ্ড। স্যারের কাছ থেইকা চুরি করা লাইটটাই জ্বালাইলাম। দেহি এক ভয়ঙ্কর কাহিনী, জাফর স্যারের গলা চাইপা ধরছে পিশাচটা। আমার লাইটের আলো দেইখাই কেমুন ছ্যারাবেরা অইয়া গেলো পিশাচের চেহারা। স্যাররে ছাইরা দিয়া বাইরে নাই অইয়া গেলো। আমি জানালা দিয়া চাইয়া দেহি ওই বাচ্চা পোলাডা জঙ্গল ভাইঙ্গা পলাইতাছে।
এতটুকু বলে মেঝের দিকে তাকিয়ে রইলো আউয়াল মিয়া। সবাই চুপচাপ শুনছিলো, হঠাৎ থেমে যাওয়ায় কিছুটা ছন্দপতন হলো। তবুও কিছুক্ষণ চুপ থাকলো কামরার সবাই।

এগাারো.
মধ্যরাত। মুমিতু বসে আছে প্রফেসর ফিহির হোসাইনের ওয়েটিং রুমে। কফির কাপে চুমুক দিচ্ছে, আর অপেক্ষা করছে মাশরাফির জন্য। ভেতরে মাশরাফির সাথে কথা বলছেন প্রফেসর। সেদিন প্রফেসরকে ঘুম পাড়িয়ে চলে যাওয়ার পর তিনি যোগাযোগ করেছেন মুমিতুর বাবার সাথে। বাবা একরকম জোর করে ওদের দু’জনকে আবার পাঠিয়ে দিলেন এই সুখটাকওয়ালার কাছে। আসার সময় বলে দিলেন, প্রফেসর ওদের কাউন্সেলিং করবেন। ঠিক যত সময় চান তত সময়ই দিতে হবে ওদের।
সম্ভবত ওইদিন মুমিতুকে ঘুম পাড়াতে গিয়ে নিজেই ঘুমিয়ে যাওয়ার ঘটনাটা সাঙ্ঘাতিক লেগেছে প্রফেসরের। এ কারণেই তাকে শাস্তি দিতে চাইছেন তিনি। কিন্তু বাবাকে ম্যানেজ করলেন কিভাবে?
যেভাবেই করুক, এখন আর এসব নিয়ে ভেবে লাভ নেই। কোনো রকম পাগলের ডাক্তারের কাছ থেকে মুক্তি পেলেই হলো। কফির কাপে শেষ চুমুকটি দিলো সে। তারপরই ভেতর থেকে বেরিয়ে আসতে দেখলো মাশরাফিকে। মুখে বললো, তোকে ভেতরে যেতে বলেছেন প্রফেসর।
মুমিতু উঠে দাঁড়ালো। ভেতরের দিকে পা বাড়াতে যাবে, ঠিক ওই মুহূর্তে আবার ঘুরে দাঁড়ালো মাশরাফির দিকে, আচ্ছা, তোর সাথে কী কী কথা হলো রে?
অনেক কথা। সব তোর ব্যপারে। তুই দিন রাত কী কী করিস, কোথায় যাস এইসব।
তুই কী বললি?
যা যা করিস তাই বললাম।
আর কথা বাড়ালো না মুমিতু। দরজা ঠেলে কামরায় ঢুকলো সে।
সেই নজরুল সঙ্গীত, মনিটরের ভিসুয়ালাইজেশন। আর তন্ময় প্রফেসর। তবে মুমিতু যে কামরায় ঢুকেছে সেটা টের পেয়েছেন তিনি। হাত ইশারায় বসতে বললেন। এই মুহূর্তে প্রফেসরকে মনে হচ্ছে আগের চেয়ে আরো সতর্ক, আরো আত্মবিশ্বাসী। মুহূর্তের মাঝে চেয়ার টেনে নিলেন কম্পিউটার টেবিলটার দিকে। মাউস নাড়াচাড়া করে সাটডাউন করলেন। তারপর ফিরে তাকালেন মুমিতুর দিকে, সেদিন তোমাকে মাপতে ভুল করেছিলাম আমি।
আজ মেপে কী মনে হচ্ছে, আমি কি আহামরি কিছু?
আহামরি না হলে এই মধ্যরাতে আমার সামনে বসে থাকতে হতো না তোমার।
আমার ধারণাই ছিলো না, তোমার মতো পিচ্চি একটা ছেলের প্যারা সাইকোলজির ওপর এতটা দখল আছে।
প্যারা সাইকোলজি কী?
এই যে তুমি মেডিটেশনসহ আরো যা যা অদ্ভুত কাজ করো এসব কাজকে পর্যালোচনা করে প্যারাসাইকোলজি। প্যারাসাইকোলজি হলো সাইকোলজিরই একটি শাখা। মানুষের অতৈন্দ্রিক ক্ষমতা, অস্বাভাবিক কর্মকাণ্ডগুলোই এর বিষয়। এই ধরো টেলিপ্যাথি, অর্থাৎ অন্য মানুষের মনের কথা বুঝতে পারা। প্রি রিকোগনিশান, অর্থাৎ ভবিষ্যৎ বলতে পারা। টেলিকিনসিস, অর্থাৎ কোনো ধরনের শারীরিক সম্পৃক্ততা ছাড়াই কোনো জিনিস নাড়ানো। সাইকোমেট্রিক, অর্থাৎ কোন বস্তু, প্রাণী বা জায়গাকে স্পর্শ করে সেটা সম্পর্কে সব জেনে যাওয়া। মৃত্যু স্পর্শ, অর্থাৎ মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসার অভিজ্ঞতা। বাইলোকেশান, অর্থাৎ একই সময় দুই জায়গায় অবস্থান করা।
আমিতো এসবের কিছুই জানি না। তবে প্যারা সাইকোলজির ওপর আমার দখল আবিষ্কার করলেন কিভাবে?
এগুলোর ওপর পুঁথিগত বিদ্যা তোমার নেই। অনেক ব্যবহারিক বিদ্যা রয়েছে। তোমার আচরণকে তুমি সংজ্ঞায়িত করতে পারছো না, এই যা। প্যারাসাইকোলজির পর্যালোচনা হয় পুরোপুরি বিজ্ঞানসম্মতভাবে। এ বিদ্যা একটি ঘটনা কেন ঘটেছে সেটা ব্যাখ্যা করতে পারে। তবে ঠিক কিভাবে কিভাবে ঘটেছে এর স্বচ্ছ কোনো ছক এখন পর্যন্ত আঁকতে পারেনি। প্যারাসাইকোলজির সবচেয়ে আলোচিত যে বিষয় সেটা হলো টেলিপ্যাথি। আমরা সবাই জীবনের কোনো না কোনো ক্ষেত্রে এর প্রমাণ পেয়ে থাকি। যেমন ধর তুমি মাশরাফির কথা গভীরভাবে চিন্তা করছো। ঠিক সেই মুহূর্তে তোমার ফোনে মাশরাফির কল বেজে উঠলো। অথবা তোমার কোনো বন্ধু হুট করে এমন কোনো কথা বলে ফেললো, যা কখনো তুমি তাকে জানাওনি। কথাগুলো কিন্তু মিথ্যে নয়। এই কথাগুলো তোমার মনের ভেতর ছিলো। মনের কথা জানা বা অনুমান করার এই অদ্ভুত ক্ষমতাকেই টেলিপ্যাথি বলে। এসব বিষয়কে আমরা খুব সহজেই কাকতালীয় ঘটনা বলে পাশ কাটিয়ে যাই। অথচ স্বীকার করি না যে, এটা আমাদের মস্তিষ্কের এক অতীন্দ্রিয় সংবেদনশীলতা। যেখানে আমাদের অবাধ প্রবেশাধিকার নেই।
শুনেছি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে নাকি সোভিয়েত ইউনিয়ন, আমেরিকা এবং ব্রিটেন সাই এজেন্ট নিয়োগ করেছিলো?
হ্যাঁ, ঠিক শুনেছো। এই সাই এজেন্টদের কাজ ছিলো টেলিপ্যাথি বিদ্যা ব্যবহার করে গোয়েন্দাগিরি করা, মানুষের মনোজগতে প্রবেশ করা। তারা নিজেদের মন ব্যবহার করে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ জায়গা এবং বস্তু সম্পর্কে তথ্য দিতেন।
মেডিটেশন, টেলিপ্যাথি নিয়ে যতক্ষণ কথা হলো, ঘড়ি ধরলে কমপক্ষে ঘণ্টাখানেক তো হবেই। তবুও মুমিতুকে নিস্তার দিচ্ছেন না প্রফেসর ফিহির হোসাইন। ঘুমে চোখ ঢুলুঢুলু হয়ে এসেছে ওর। একটি আরামদায়ক বিছানার জন্য আকুপাকু করছে মন। প্রফেসরও বুঝতে পারছেন ওর অবস্থা। কিন্তু বুঝেও না বোঝার ভান করছেন। কথায় ব্যস্ত রাখতে চাইছেন মুমিতুকে। কিন্তু কী কারণে!
বাথরুম থেকে ফিরে এসে ঢকঢক করে এক গ্লাস পানি খেলো মুমিতু। তারপর শান্ত হয়ে আবার বসলো চেয়ারে। চরম বিস্ময় নিয়ে তাকালো প্রফেসরের দিকে। যেন কোটর থেকে বেরিয়ে আসতে চাইছে চোখ দুটো।
আচ্ছা, হরর বই পড়তে তোমার ভালো লাগে, তাই না?
মাথা নাড়লো মুমিতু।
অতিপ্রাকৃত কিছুতে বিশ্বাস করো?
মোটেই না।
বইগুলোতে ভয়ঙ্কর কোনো বর্ণনা পড়লে ভয় লাগে?
জ্বি না প্রফেসর।
তাহলে কেন পড়?
থ্রিলের জন্য। তাছাড়া … ভয়ঙ্কর মুহূর্তগুলো নিয়ে কল্পনা করতে ভালো লাগে।
কল্পনায় তুমি ভয়ঙ্করকে আরো বেশি ভয়ঙ্কর করে তোলো। একা একা থাকলে, নিজেই নিজের মন মতো একটা কুৎসিত চরিত্র বানাতে ভালোবাসো। তারপর এই চরিত্রকে দিয়ে একেকটি হরর কাহিনী তৈরি করো। বাস্তবে যা অসম্ভব, তেমন অনেক কাজ তাকে দিয়ে করিয়ে নাও।
কিন্তু … আমি জানি এগুলো আমার অলীক কল্পনা।
হ্যাঁ, সেটা তুমি জানো। আর জানো বলেই কল্পনায় অনেক কুৎসিত ও ভয়ঙ্কর কাজ করতে বিবেক বাধা দেয় না। তোমার কল্পিত চরিত্র কি কখনো কখনো বীভৎস রক্তপাত ঘটায়?
প্রয়োজন হলে।
রক্তপাত কি ভালো লাগে তোমার?
আমার কেন ভালো লাগবে? চরিত্রের প্রয়োজনে এসে যায়।
হাত তুলে মুমিতুকে থামিয়ে দিলেন প্রফেসর, কল্পিত চরিত্রের জায়গায় মাঝে মাঝে নিজেকে বসাতে ভালো লাগে না?
সেটা তো হতেই পারে।
বাস্তবে কল্পিত চরিত্রের মতো অসম্ভব ক্ষমতাবান হওয়ার ইচ্ছে হয়?
বাস্তবে যা অসম্ভব এমন ক্ষমতা পাওয়ার সুপ্ত ইচ্ছা সবারই থাকে।
সবার থাকে। তবে তোমার ইচ্ছাশক্তিটা প্রবল। আচ্ছা বেশ। এবার কল্পনা থেকে বাস্তবে আসা যাক। তুমি কী কখনো মানুষ খুন হতে দেখেছো? বড় ধরনের কোনো রক্তারক্তি?
কয়েক সেকেন্ড চিন্তা করলো মুমিতু। তারপর বললো, রক্তারক্তি বলতে একটা বড় ধরনের অ্যাক্সিডেন্ট দেখেছি। নরসিংদীর শিবপুরে। বাস অ্যাক্সিডেন্ট।
চেয়ার থেকে প্রায় লাফিয়ে উঠলেন প্রফেসর ফিহির হোসাইন। তারপর কী মনে করে আবার স্বাভাবিক হয়ে এলেন। স্থির বসে জানতে চাইলেন ঘটনার বিবরণ।
মুমিতু বলতে শুরু করলো, বেশ কয়েকবছর আগের কথা। বাসে করে কিশোরগঞ্জ যাচ্ছিলাম। শিবপুর পার হওয়ার পর হঠাৎ প্রচণ্ড শব্দে কানে তালা লেগে গেলো। থেমে গেলো আমাদের বাস। ঘটনা কী বোঝার জন্য সামনে তাকালাম। চোখের সামনেই একটি মিনিবাসকে উল্টে খাদে পড়ে যেতে দেখলাম। আর সামনের দিকটা ভোতা করে কোনোরকম রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলাম বড় বাসটিকে। চোখ গেলো সড়কের দিকে। পিচঢালা পথে তাজা রক্তের স্রোত গড়াচ্ছে। এক-দুইজনের নয়, অসংখ্য মানুষের রক্ত। রক্তের মাঝখানেই পড়ে আছে চুলসহ মানুষের মাথা। একেকজনের মগজ কয়েক ভাগ হয়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। তাকিয়ে থাকতে পারছিলাম না আমি। চোখ বন্ধ করে বসেছিলাম কিছুক্ষণ। যখন চোখ খুললাম, দেখলাম চারদিক থেকে মানুষের ঢল এসে ঘিরে ধরেছে দুর্ঘটনাস্থল। রক্তমাখা আহতদের তোলা হচ্ছে আমাদের বাসে। তারপর আবার চোখ বন্ধ।
আর কোনো অ্যাক্সিডেন্ট? জিজ্ঞেস করলেন ফিহির হোসাইন
না প্রফেসর। আর কোনো অ্যাক্সিডেন্ট দেখিনি।
এবার চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন প্রফেসর, আজকের মতো আলোচনা এ পর্যন্তই।
আমি কি এখন ঘুমুতে যেতে পারি? অনুমতি চাইলো মুমিতু।
উহু, সকালের সূর্য উঠবে, তারপর তোমার ঘুম।
তাহলে এখন কী করবো?
চলো ছাদে গিয়ে জোসনা দেখি।

বারো.
রাত দুইটা বেজে সতের মিনিট।
বেশ ফুরফুরে মেজাজে আছেন প্রফেসর, তোমরা তাহলে আজই ঢাকায় এসেছো?
জ্বী স্যার, আজই এলাম। জবাব দিলেন জাফর হায়দার।
জাফর হায়দার ছাড়াও প্রফেসর ফিহির হোসাইনের সামনে বসে আছেন ওসি, আউয়াল মিয়া ও বেদন সাহা।
আপনার কথা অনেক শুনেছি স্যার, দেখা করার সৌভাগ্যও যে হয়ে যাবে ভাবিনি। বিনয়ের সাথে বললেন ওসি সাহেব। নিজের চেয়ারটা একটু সামনে টেনে টেবিলের ওপর উবু হলেন, স্যার, চাকরি জীবনে এমন কেস একটাও পাইনি। তাই এর সমাধান শোনার জন্য উদগ্রীব হয়ে আছি।
তাহলে তো এখনি আলোচনা শুরু করা প্রয়োজন। পিশাচ বিষয়ে আলোচনা করতে হলে ঘরের আলো নিভিয়ে দিতে হবে।
ভয়ে কুঁকরে উঠলো সবাই, আলো নেভাতে হবে কেন?
কারণ এটা উজ্জ্বল আলো। আর আমরা যা নিয়ে আলোচনা করবো, সেটা কালো রঙের আলো।
প্রফেসরের কথার মাথা মুণ্ডু কিছুই বুঝলো না কেউ। কিন্তু প্রফেসর যেহেতু বলেছেন, আলো নেভাতেই হবে। তবে মৃদু আপত্তি জানালো বেদন সাহা।
ভয়ের কিছু নেই, তোমার কিচ্ছু হবে না। ঐ পিশাচটা এখন জাফরের পিছু নিয়েছে। বললেন প্রফেসর।
তড়াক করে লাফিয়ে উঠলেন জাফর হায়দার। সাথে সাথেই নিভে গেলো কামরার আলো। অন্ধকারে জাফর হায়দারের চেহারার অবস্থা কী হলো, তা কেউ দেখতে না পেলেও অনুমান করতে পারলো। গাঁইগুই শুরু করলেন তিনি। তাকে অভয় দিলেন প্রফেসর, এতো ভয় পাচ্ছো কেন?
তাহলে বললেন যে, পিশাচটা আমাকে টার্গেট করেছে?
তুমি কী ভুলে গেছো যে, তোমার কাছে অদ্ভুত এক লাইটার রয়েছে?
জ্বী না স্যার, ভুলব কেন?
তুমি এই লাইটার জ্বালিয়ে বেশ কয়েকবার পিশাচের হাত থেকে বেঁচে এসেছো।
জ্বী স্যার।
পিশাচটারে অন্য গেরামে খেদায়া দেওনের কোনো ব্যবস্থা আছে স্যার? আগ্রহ নিয়ে প্রফেসরের কাছে জানতে চাইলো আউয়াল মিয়া।
ওটাকে কোথাও না তাড়িয়ে ধ্বংস করলে কেমন হয়?
অবশ্যই ভালা অয় স্যার। পিশাচটার ধ্বংস চাই, মরণ চাই। আইজ এইখানে আপনের সামনে ওইটার মরণ দেইখা হের পর বাড়িত যাইতে চাই।
আচ্ছা জাফর, প্যারা সাইকোলজির বিষয়গুলো কী তোমার মনে আছে?
জ্বী স্যার আছে?
‘বাইলোকেশান’ কী বলতে পারবে?
‘বাইলোকেশান’ হলো একই সময়ে দুই জায়গায় অবস্থান করা। অর্থাৎ যাকে বলে ডুয়েল অ্যাক্সিসটেন্স বা দ্বৈত সত্তা। মানুষের গভীর চিন্তা থেকে তার ভেতরে আরো একটি সত্তার জন্ম নেয়।
কেমন সেই সত্তা? কপাল কুঁচকে প্রশ্ন করলেন ওসি সাহেব।
সেটা হতে পারে কেবল চিন্তার জগতেই সীমাবদ্ধ, আবার চিন্তাটা গভীর থেকে গভীরতর হলে নতুন একটি শরীরি অস্তিত্বেরও জন্ম দিতে পারে।
তাই নাকি! হাঁ হয়ে তাকিয়ে রইলেন ওসি সাহেব। তারপর জাফর হায়দারের কথা সত্যি কি না জানতে চাইলেন প্রফেসরের কাছে। প্রফেসর মাথা দোলালেন এবং জাফর হায়দারকে ইঙ্গিত করলেন চালিয়ে যেতে, একটি উদাহরণ দিলে আপনার কাছে স্পষ্ট হবে বিষয়টা।
আউয়াল মিয়া আর বেদন সাহা এ আলোচনার মাথা মাণ্ডু ধরতে না পারলেও এতটুকু বুঝতে পারছে যে, এটা এক চমকপ্রদ বিষয়। তাই হা হয়ে তাকিয়ে আছে জাফর হায়দারের মুখের দিকে।
আপনার প্রচণ্ড একটি ইচ্ছার কথা বলুন। ওসি সাহেবকে উদ্দেশ্য করে বললেন জাফর হায়দার।
এইতো ফেলে দিলেন ফ্যাসাদে। একটু ভাবলেন। তারপর বললেন আবার, আমি পরিবারের সবাইকে নিয়ে আগামী মাসে কক্সবাজার যেতে চাই।
আচ্ছা। এবার ধরুন আগামী মাসে আপনার ছুটি মিললো না। তখন কী করবেন?
খুবই খারাপ লাগবে। পরিকল্পনা করবো এর পরের মাসে যাওয়ার।
পরের মাসেও ছুটি পেলেন না।
তখন চাকরি ছেড়ে দিতে ইচ্ছে করবে।
চাকরি ছেড়ে দেয়া আপনার সম্ভব নয়। তাই ছুটি নেয়ার জন্য আবার চেষ্টা করবেন, তাই না?
হ্যাঁ।
একসময় বহু চেষ্টা-তদবিরের পর ছুটি পেলেন। তবে আপনাকে বলে দেয়া হলো এলাকার বাইরে কোথাও যাওয়া যাবে না। যে কোনো জরুরি মুহূর্তে আপনার ডাক পড়তে পারে।
তখন আর কী করব, হাল ছেড়ে দেবো। বাসায় বসে বসে কক্সবাজারের কথা কল্পনা করবো।
হ্যাঁ, এইতো লাইনে আসছেন। বাইরে অফিসের কোনো ডিউটি নেই। বাসায় বসে শুধু খাওয়া দাওয়া আর কক্সবাজারের কল্পনা করা, এমনটা যদি হয়ে ওঠে আপনার রুটিন?
হতেও পারে। যেহেতু আমার অন্য কোনো কাজ নেই, কক্সবাজারও যেতে পারছি না। কল্পনাই তখন অবলম্বন।
সেই কল্পনাটা গভীর থেকে আরো গভীরতর হলো। কল্পনা করলেন সৈকতের সামনে হোটেল প্রাসাদ প্যারাডাইসে আপনি উঠেছেন। সকালে নাশতা করে সমুদ্র অবগাহনে যাচ্ছেন। বিকালে হিমছড়ি, ইনানি ইত্যাদি ইত্যাদি।
হ্যাঁ দেখতেই পারি।
দেখতে পারেন, তাতে কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু সমস্যাটা হবে তখন, কিছুদিন পর যখন হোটেল প্রাসাদ প্যারাডাইস থেকে একটি ফোন পাবেন।
কেন, ওরা আমাকে ফোন করবে কেন? আমিতো বাস্তবে নয়, কল্পনায় গিয়েছি সেখানে।
কল্পনাটা এতটাই গভীর ছিলো যে, সেটা আপনার আরো একটি অস্তিত্ব তৈরি করে ফেলেছে। সেই দ্বিতীয় আপনি রীতিমত আপনার ঠিকানা, ফোন নম্বর, স্বাক্ষর দিয়ে প্রাসাদ প্যারাডাইসে বুকিং মানি দিয়ে উঠেছেন। তারপর চার রাত থেকে দুই রাতের বিল না দিয়েই নিখোঁজ হয়েছেন। তাই হোটেল কর্তৃপক্ষ খোঁজ নেয়ার জন্য আপনাকে ফোন করলো। অথচ আপনার প্রথম সত্তা, অর্থাৎ আপনি এসবের কিছুই জানেন না। এর কারণ, ঘুম ভাঙার পর গভীর কল্পনার বা দ্বিতীয় সত্তার সবকিছুই ভুলে যান আপনি।
আশ্চর্য ব্যাপার তো, এমন হতে পারে নাকি!
প্যারা সাইকোলজি তো তাই বলে।
এবার কথা বললেন প্রফেসর, প্যারা সাইকোলজির ‘বাইলোকেশন’ পরিষ্কার হলো তো আপনার?
জ্বী, পানির মতো পরিষ্কার। জানালেন ওসি সাহেব।
প্রফেসর এবার দৃষ্টি দিলেন বেদন সাহার দিকে, তুমি তোমার ‘দেবতা কাহিনী’টা শুনাওতো এদের।
ধীরে-সুস্থে কাহিনী বলতে আরম্ভ করলো বেদন সাহা, আমি মাইক্রোবাসের ডেরাইভার। একবার এক ক্ষ্যাপ লইয়া পড়ছিলাম মহা বিপদে। ওই বিপদ থেইক্কা আমারে উদ্ধার করছিলো আমার দেবতা। রাস্তার মইধ্যে হঠাৎ খেয়াল করলাম আমার মাইক্রোবাস স্থির অইয়া গেছে। চাক্কা ঘুরতাছে, কিন্তু গাড়ি আগায় না। আমি স্পিড বাড়াই, জোরে চাক্কা ঘোড়ে। ঘুরতে ঘুরতে গাড়িটা গেলো উইল্টা। আমার তেমন কিছু অয় নাই, দুই এক জায়গায় ছিঁড়ে গেছিলো।

SHARE

2 COMMENTS

Leave a Reply