Home গল্প রমজান নামের ছেলেটি

রমজান নামের ছেলেটি

আবদুল ওহাব আজাদ…

ছেলেটি রহমতের কোনো কথার তোয়াক্কা না করে সোজা চলে এলো রাহাতের অফিসে। রাহাত তখন সহকর্মীদের নিয়ে একটি জরুরি মিটিংয়ে ব্যস্ত। ছেলেটি তার কাঁধের ব্যাগটি নামিয়ে রেখে বলল, ‘কেমন আছেন স্যার? আমায় চিনতে পেরেছেন? আমি রমজান, স্যার।’
রাহাত আসলেই ছেলেটিকে চিনতে পারলেন না। রাহাত রহমতকে জরুরি তলব করে বললেন, ‘এসব রাস্তার ছেলেরা হুট করে অফিসে ঢুকে পড়ে, তুমি কী ডিউটি কর?’
রহমত মুখটা কাচু মাচু করে বলল, ‘ছেলেটি আমার কোনো বাধা-নিষেধ মানতে চাইল না স্যার, এক রকম জোর করে ঢুকেই বলল, আমি স্যারের কাছে যাবো, তার কাছে আমার খুব দরকার।’
রাহাতের ঠাণ্ডা মেজাজ হঠাৎ বিগড়ে গেল। এক রকম ধমকের সুরেই তিনি বললেন, ‘এই ছেলে, আমার কাছে তোমার কী দরকার? নাকি অন্য কোনো মতলব নিয়ে এসেছো?’
ছেলেটি দমবার পাত্র নয়, সে সাহসের সাথেই বলতে লাগলো, ‘সব পরে বলবো স্যার, আগে বলেন, আমায় চিনতে পেরেছেন কি না?’
রাহাত চেষ্টা করেও মনে করতে পারলেন না কোনো কথা। সহকর্মীদের চলে যেতে বললেন তার অফিস কক্ষ থেকে। পুরো অফিসজুড়ে এখন রাহাত, রহমত আর রমজান নামের ছেলেটি।
রাহাত এবার স্বাভাবিক কণ্ঠেই বললেন, ‘দেখো বাছা, অফিসিয়াল কয়েকটি ব্যাপার নিয়ে আমি খুব টেনশনে আছি, দয়া করে আর কোনো নতুন টেনশন না বাড়িয়ে এবার বিদায় হলে আমি সত্যি খুশি হই।’
ছেলেটি বলল, ‘বিদায় তো আমি হবোই স্যার, শুধুমাত্র আপনার আমানতটা ফেরত দিতে পারলেই আমি চলে যাবো স্যার।’
এবার রাহাত রীতিমতো চিন্তায় পড়ে যান, কী সব বলছে ছেলেটি! কোনো বড় ধরনের গোয়েন্দা সংস্থার সদস্য নয়তো? আজ-কাল তো সব ধান্দাবাজ।
রাহাত ছেলেটিকে বিদায় না করে কোনো কাজ করতে পারছেন না। রাহাত অতি শান্ত মেজাজে ছেলেটির গায়ে হাত বুলিয়ে বললেন, ‘বলতো বাবা, তুমি কী বলতে এসেছো?’
রমজান বলল, ‘স্যার, আপনার সঙ্গে আমার প্রথম দেখা হয় নওয়া বেকী খেয়াঘাটে, তা প্রায় বছরখানেক আগের ঘটনা। আপনি সম্ভবত গ্রামের বাড়িতে বেড়াতে যাচ্ছিলেন, তখন টিপ টিপ করে বৃষ্টি হচ্ছে।’
রাহাতের মনে পড়ে যায় সেদিনের ঘটনা, স্মৃতির ক্যানভাসে ভেসে ওঠে নওয়া বেকী খেয়াঘাট…
রাহাত প্লাটফরমের সিঁড়ি ভেঙে ভেঙে নিচে নামতে থাকেন, এমন সময় পেছন থেকে তার কানে আসে একটি কিশোরকণ্ঠের আওয়াজ, ‘আমায় এক শ’ টাকা দেবেন স্যার? আমার মায়ের চিকিৎসা করবো।’
রাহাত পকেট থেকে ২টা টাকা দেন ছেলেটির হাতে, ছেলেটি সেই টাকা না নিয়ে বলল, আমি ভিক্ষুক নই স্যার। আমার মায়ের চিকিৎসার জন্য অনেক টাকার দরকার। তাই আপনার কাছে এক শ’ টাকা চাচ্ছি স্যার।
রাহাত পেছন ফিরে ছেলেটিকে দেখলেন, না আসলেও ছেলেটিকে ভিখারি মনে হয় না। তার পরও রাহাত ছেলেটিকে বললেন, ‘লোকের কাছে হাত না পেতে কাজ করতে পারো না?’
ছেলেটি জবাব দিলো, ‘আগে আমার মাকে চিকিৎসা করে সারিয়ে তুলি, তারপর অবশ্যই কাজ করবো স্যার।’
‘লেখাপড়া করোনি কেন?’
‘সে অনেক কথা স্যার!’
‘তোমার সংসারে আর কে কে আছে?’
‘মা আর একটি বোন।’
‘বাবা নেই?’
‘না, জন্মের আগে মারা গেছেন, চোখে দেখিনি।’
‘তা তোমাদের সংসার কী করে চলে?’
‘অতি কষ্টে চলে স্যার।’
পারের নৌকা ছেড়ে দেবে, রাহাত নৌকায় উঠবে, হঠাৎ মনটা খুব নরম হয়ে যায়, পকেট থেকে একখানা পাঁচ শ’ টাকার নোট ছেলেটির হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললেন, ‘কী নাম যেন তোমার?’
ছেলেটি বলল, ‘রমজান।’
রাহাত বললেন, ‘এই টাকা নিয়ে অবশ্যই তোমার মায়ের চিকিৎসা করো, তোমার মায়ের জন্য দোয়া করি, তিনি যেন সুস্থ হয়ে উঠতে পারেন।’
রমজানের চোখে আনন্দের অশ্রু। টাকা হাতে পেয়ে কোনো কথা বলতে পারলো না সে, শুধু রাহাতের পারের নৌকার দিকে তাকিয়ে থাকলো।
এক সময় রাহাত খেয়া পার হয়ে অদৃশ্য হয়ে যান।
রমজান খেয়াঘাটে ঐদিন একটা কাপড়ের হাত ব্যাগ পেয়েছিল, তাতে অনেক জরুরি কাগজপত্র আর কিছু টাকাও ছিল। যতদূর লোকের কাছ থেকে জেনেছিল, তাতে ব্যাগটি রাহাতের মনে করেছিল সে। কিন্তু পৌঁছে দেয়ার কোনো পথ জানা ছিল না তার।
রাহাত চেয়ার ছেড়ে উঠে রমজানের কাঁধে একটা ঝাঁকুনি দিয়ে বললেন, ‘হ্যাঁ রমজান, আমার সব মনে পড়েছে, সব। এখন বলো, তোমার মা কেমন আছেন?’
রমজানের চোখ দুটো ছল ছল করে উঠলো। কাঁদো কাঁদো ভাবে সে বলল, ‘মা নেই স্যার!’
‘সে কি, কী বলছ তুমি?’
‘জি স্যার, মা আমায় ছেড়ে চলে গেছেন।’
‘চিকিৎসা করাওনি?’
‘জি স্যার, করিয়েছিলাম। মায়ের অপারেশনের পর ক্যান্সার ধরা পড়লো। ডাক্তাররা বললেন, একবার বিদেশ নিয়ে যেতে পারো। অত টাকা কোথায় পাবো স্যার?’
রাহাত দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন, ‘ভেরি স্যাড রমজান, ভেরি স্যাড।’
নিজেকে সামলিয়ে নিয়ে রাহাত আবার বললেন, ‘তা তুমি আমার অফিস চিনলে কী করে রমজান?’
‘অনেকের কাছে শুনে শুনে এ পর্যন্ত এসেছি স্যার, আর তা ছাড়া আমার একটা জরুরি কারণও ছিল স্যার।’
‘কারণ?’
‘জি স্যার, আপনার আমানতটা ফেরত দিতে এলাম।’
‘কিসের আমানত? আমি তো তোমার কথা কিছু বুঝতে পারছি না রমজান।’
রমজান সেই কাপড়ের ব্যাগটা রাহাতের সামনে মেলে ধরে বলল, ‘এটি সম্ভবত আপনার ব্যাগ স্যার, যেটি আমি খেয়াঘাটে কুড়িয়ে পেয়েছিলাম।’
রাহাত দেখলেন, সত্যিতো তার সেই হারিযে যাওয়া ব্যাগ। চেন টেনে দেখলেন, তার সেই জরুরি কাগজপত্রগুলো আজও ঠিকঠাক রয়েছে। তাছাড়া ব্যাগের ভেতর পাঁচখানা এক হাজার টাকার নোটও রয়েছে। রাহাত বললেন, ‘জানো রমজান, এই ব্যাগটা আমি কত খুঁজেছি। এর মধ্যে আমার অনেক জরুরি কাগজপত্রও ছিল। কী বলে যে তোমায় আমি ধন্যবাদ দেবো, তার ভাষা জানা নেই আমার।’
রমজান বলল, ‘আমি আপনার কথা রেখেছি স্যার, আমি নওয়া বেকী বাজারে ছোট্ট একটা পান-সিগারেটের দোকান দিয়েছি। পুঁজির অভাবে তেমন চালাতে পারি না স্যার। হঠাৎ আপনার কথা মনে পড়ে গেল, তাই ভাবলাম, একজন মহৎ মানুষের দোয়া নিয়ে আসি, আর স্যারের আমানতটা ফেরত দিয়ে আসি। আমার জন্য দোয়া করবেন স্যার, আর গ্রামে গেলে আমার দোকানটা অবশ্যই একবার দেখে আসবেন।’ তারপর ব্যাগটা কাঁধে ঝুলিয়ে বলল, ‘চলি স্যার!’
রাহাত বললেন, ‘দাঁড়াও রমজান। তুমি এই টাকাটা রাখো।’
রাহাত সদ্য পাওয়া ব্যাগটার মধ্যে থেকে ৫ খানা এক হাজার টাকার নোট রমজানের দিকে বাড়িয়ে দিলেন।
রমজান বলল, ‘এ হয় না স্যার, এ টাকা আমি কিছুতেই নিতে পারবো না।’
রাহাত বললেন, ‘কেন হয় না রমজান, আমি তোমাকে সন্তুষ্ট হয়ে দিচ্ছি। এ টাকা তো তুমি আমায় ফেরত দিতে না-ও পারতে। আমাকে মহৎ বলে লজ্জা দিচ্ছ কেন? মহৎ তো তুমি, তোমার কাছে আমার অনেক শেখার আছে রমজান।’
রাহাত জোর করে রমজানের পকেটে টাকাটা গুঁজে দিয়ে বললেন, ‘আমি তোমার দোকানের কিছুটা হলেও পুঁজি করে দিলাম। তুমি অনেক বড় হবে রমজান, অনেক বড় হবে।’
রমজান আবারও সালাম জানিয়ে পথে নামলো।
আজ আর রাহাতের কোনো কাজে মন বসছে না, হয়তো বসবেও না সারা দিন।

SHARE

2 COMMENTS

Leave a Reply